[ইউসুফ কার্শ (২৩ ডিসেম্বর ১৯০৮-১৩ জুলাই ২০০২), তাকে বলা হয় বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফার। আর্মেনিয়ার গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া কার্শ পাড়ি জমান কানাডায়, শরণার্থী হিসেবে। ১৯৩০ সালের দিকে অটোয়ায় কার্শ নিজেকে একজন গুরুত্বপূর্ণ আলোকচিত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। জীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি এই শহরেই কাটান, তবে কাজের সুবাদে প্রায় দুনিয়া চষে বেড়িয়েছেন। তার ৬০ বছরের আলোকচিত্রীর জীবনে সত্যিকারের উদযাপনের মুহূর্ত হয়ে আসে ১৯৪১ সালে উইনস্টন চার্চিলের আলোকচিত্র। তারপর তিনি অসংখ্য রাষ্ট্রপ্রধান, রাজনৈতিক নেতা, লেখক-কবি-সাহিত্যিক ও অভিনয়শিল্পীর ছবি তুলেছেন। ১৯৯২ সালে অবসর নেয়ার আগ পর্যন্ত কার্শের প্রায় ২০টি ছবি দিয়ে লাইফ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ হয়।]

 

অক্টোবর ৬, ১৯৬২

১৯২৫ সালের নববর্ষের ঠিক আগের রাতে নোভা স্কোশিয়ার হ্যালিফেক্স বন্দরে নতুন দুনিয়া প্রথমবারের মতো আমার জন্য হূদয় উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। আমি তখন ১৬ বছর বয়সের এক আর্মেনীয় কিশোর, বৈরুত থেকে সবে ঘাটে ভেড়া ফরাসি জাহাজ ভার্সেইয়ের সবচেয়ে উত্তেজিত যাত্রী। আমার কাছে জীবনের সুন্দরতম নববর্ষের পূর্বক্ষণ ছিল সেটা।

কানাডায় একাই এসেছিলাম, যদিও ওই একই জাহাজে বেশ কজন দূরসম্পর্কীয় আত্মীয় ছিল—আমার মায়ের তিন কি চারজন চাচাতো ভাই; মাতৃভাষা ছাড়া ভিন্ন কোনো ভাষা জানা ছিল না তাদের। তাদের আমাকে পথ দেখাতে বলা হয়েছিল কিনা মনে নেই; আসলে যাত্রার পুরো সময় আমিই তাদের নিজেদের প্রতি খেয়াল রাখতে সাহায্য করছিলাম। ফরাসি বা ইংরেজি জানা কারো দরকার ছিল তাদের, আমি দুই ভাষাতেই মোটামুটি কথা বলতে পারতাম, যদিও খুব বেশি না। ইংরেজির বেলায় আমি ‘ডগ’ আর ‘গড’ শব্দগুলোর পার্থক্য করতে পারলেও কোনটার মানে যে কি, সেটা আর মনে ছিল না। ফরাসিতে কিছুটা ভালো ছিল আমার অবস্থা।

গ্যাংপ্ল্যাংক বেয়ে নামতেই আমার মামা নাকাশ স্বাগত জানালেন। আমার সেই জন্মের সময় থেকেই কানাডায় আছেন তিনি। এর আগে তাকে কখনো না দেখলেও আমার কানাডায় আসার ব্যাপারে আমার পরিবারের সঙ্গে চিঠি চালাচালি হয়েছিল তার, শেষমেশ এ নতুন দেশে অভিবাসী হিসেবে আমার স্পন্সর হন তিনি।

মায়ের পাঠানো ছবির সুবাদে আমাকে নিমেষে চিনে ফেললেন নাকাশ মামা। একইভাবে আমিও চিনতে পারি তাকে। আমার মায়ের ভাষা আরবিতে স্বাগত জানালেন, সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে হয়েছিল—সেই থেকে ঠিক এমনটাই মনে হতো—ভীষণ সুন্দর নতুন এ দেশে আমি বন্ধুদের সঙ্গেই আছি। আর্মেনীয় ভাষার বদলে আরবি ভাষার তালিম দিয়ে বড় করা হয়েছিল আমাকে, তার কারণটা সহজ, তুরস্কের মার্দিনে আমার বাড়িতে আর্মেনীয় ভাষায় কথা বলার মানে ছিল খিস্তিখেউড় এবং প্রায়ই রাস্তাঘাটে পাথর ছুড়ে মারা হতো। গির্জা ছাড়া কচিৎ আর্মেনীয় ভাষায় কথা বলতে শুনতাম আমরা।

১৯০৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর পূর্ব তুরস্কের মার্দিনে আর্মেনীয় মা-বাবার ঘরে আমার জন্ম। বাবা মোটামুটি সফল বণিক ছিলেন। শিল্পকর্ম থেকে শুরু করে গালিচা, সূক্ষ্ম আসবাবপত্র এবং মসলাপাতি আমদানি-রফতানি কাজে জড়িত ছিলেন তিনি। ব্যবসার কাজে কেনাকাটা করতে দূরের দেশে সফরে যেতেন এবং তরুণ শিল্পী হিসেবে কমিশনের বিনিময়ে অন্যদের পক্ষে সুন্দর ও বিরল জিনিস বিক্রি করতেন। ব্যবসায় এমনি সন্দেহাতীত নৈপুণ্য সত্ত্বেও বাবা কিন্তু লিখতে বা পড়তে জানতেন না। তার সময়ে দেশে এসব নৈপুণ্য কোনো বিচারেই সর্বজনীন ছিল না। অবশ্য অবাক করার মতো ব্যাপার ছিল আর্মেনিয়ায় শিক্ষিত নারী বিরল হলেও আমার মা বেশ ভালো লেখাপড়া জানতেন। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে বাইবেল সম্পর্কে ভালো ধারণা ও দখল ছিল তার। চমৎকার শব্দগুলোর অসাধারণ ব্যাখ্যা দিতেন।

মা-বাবার জীবিত সন্তানদের মধ্যে আমি ছিলাম সবার বড়। আমার বড় এক ভাই ছিল, তবে শিশু অবস্থাতেই মারা যায় সে। আমি তাকে দেখিনি। আমার পরে একটা বোন ছিল, সে-ও আর্মেনিয়ায় টাইফয়েডের মহামারীর সময় মারা যায়। তারপর আমার ভাই ইভরাক, ১৯১৬ সালে ওর জন্ম। তারপর ১৯২০ সালে জন্ম নেয় ভাই জামিল। আমার সবচেয়ে ছোট ভাই সেলিমের জন্ম ১৯২৬ সালে সিরিয়ায়, আমাদের জন্মভূমিতে অচিরেই তুঙ্গে পৌঁছাতে চলা ভয়ঙ্কর নির্যাতনের কবল থেকে রেহাই পেতে পালিয়ে যাওয়ার পর।

 

বিশ্বযুদ্ধ&dquote;&dquote;

আমার ছেলেবেলায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বমুহূর্তে মার্দিন মোটামুটি ২৭ হাজার জনসংখ্যার শহর ছিল। মার্দিনের দালানকোঠাগুলো একটা চোঙের মতো টিলার খাড়া দক্ষিণ ঢালকে এমনভাবে ঢেকে রেখেছিল আর বাড়িঘরের একটা স্তর তার নিচের স্তরের ওপর এমনভাবে খাড়া হয়ে থাকত যে, গোটা দৃশ্যটাকে অনেকটা ব্যাবিলনের শূন্য উদ্যানের মতো মনে হতো। টিলার একদম চূড়ায় একটা প্রাচীন দুর্গের ধ্বংসাবশেষ ছিল, আগের যুগে মুসলিমরা এখানে মোঙ্গল বাহিনীকে প্রতিহত করেছিল।

অবিকল বুনো এলাকায় ইসরায়েলের সন্তানদের মতো মার্দিনেও আমরা মান্নার স্বাদ পেয়েছিলাম। বিশেষ মৌসুমগুলোয় কোনো কোনো গাছের শরীরে সুস্বাদু সবুজ চিনি দেখা দিত, এগুলো ছেঁচে তুলে রুটিতে মাখানো যেত কিংবা শুকিয়ে জমাট বাঁধার সুযোগ দিতে পারতে তুমি; সত্যি ভীষণ জমাট বাঁধার পর ছুরি কিংবা হাতুড়ির বাড়িতে ভেঙে ম্যাপল সুগারের মতো চিবোনো যেত। মান্নার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পড়লেও ছেলেবেলায় যেমন মনে হয়েছিল, সেভাবে ভাবতেই পছন্দ করতাম, খোঁজে না থাকার সময় বরাবর তোমার সেরা পছন্দের স্বাদের হুট করে দেখা দেয়া সুস্বাদু খাবার ছিল আমার কাছে এটি।

আমার গোড়ার দিকের শিক্ষায় ধর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, যদিও এর বয়ান আমার আধ্যাত্মিক গঠন নিয়ে অতিরিক্ত উদগ্রীব পাঠককে নির্ঘাত বিচলিত করবে। বাবা নিবেদিতপ্রাণ রোমান ক্যাথলিক ছিলেন, অন্যদিকে মা—আমার জানা মহত্তম ক্রিশ্চান নারী—প্রটেস্ট্যান্ট ধর্মবিশ্বাসে জন্ম নিয়েছিলেন। রোমার ক্যাথলিক চার্চে অপ্সুদীক্ষা দেয়া হয় আমাকে, পরে মার্দিনের এক রোমান ক্যাথলিক স্কুলে পাঠানো হয়। আসলে পরে যাজকবৃত্তি নেয়ার উদ্দেশ্যে পড়াশোনা করার ব্যাপারে গুরুতর চিন্তাভাবনা ছিল আমার। শেষতক উল্টো সিদ্ধান্ত নেন মা। পরের বছরগুলোয় নতুন দুনিয়ায় আসার পর প্রায়ই আমরা দুজনই তাকে এই বলে ক্ষেপাতাম, ‘বেশ, আমাকে যাজকবৃত্তির জন্য পড়ালে কিন্তু পোপের প্রথম প্রটেস্ট্যান্ট মা হতে পারতে।’&dquote;&dquote;

মাকে আমি ভালোবাসতাম, বাবার ভালো মানুষীকে সমীহ করতাম। ধর্মীয় পার্থক্য নিয়ে বাবা-মা কখনই কথা বলেননি। ছোটবেলায় ক্রিশ্চানদের বিভিন্ন ভাগ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলাম না কিন্তু ইসলাম থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন করা ফারাক সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় ছিল।

আর্মেনীয় নাম আসলে ক্রিশ্চান না বোঝালেও গোটা তুরস্কে পরিভাষাগুলোকে সমার্থকই ভাবা হতো। নিশ্চিত করে বলতে গেলে আর্মেনিয়া— যদি বিস্মৃত না হই— বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ক্রিশ্চান জাতি ছিল। আমার মাতৃভূমি তুরস্কে ক্রিশ্চানরা সংখ্যালঘু হলেও ব্যবসা, শিল্প, স্থাপত্য (বহু মসজিদই আর্মেনীয়দের হাতে নির্মিত ছিল) এবং প্রকৃতপক্ষে যেকোনো ধরনের কাজের জন্য মুসলিমরা ক্রিশ্চানদের ওপর নির্ভর করত। ছেলেবেলার পুরো সময় এ সম্পর্কের মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়ার পেছনের কারণ খুঁজে বের করা আমার কাজ নয়। এটুকু বললেই হবে যে, আমার জাতির তুর্কি মনিবদের হাতেই হিটলারি অর্থে গণহত্যার উদ্ভাবন ঘটেছিল। প্রায় কুড়ি বছর আমার জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে আর্মেনীয়রা পদ্ধতিগত অভিযানের লক্ষ্য হয়ে ছিল। উনিশ শতকের শেষদিকে সূচিত এ জঘন্য নির্যাতন মার্দিনে আমার স্মৃৃতির একটা অংশ তৈরি করেছে। ১৯১৫ সালের রক্তাক্ত নৃশংসতার সময়ে সেটা তুঙ্গে পৌঁছে এবং ১৯২২ সালে আমরা জীবন হাতে করে—আর কিছু না—সিরিয়ায় পালানোর অনুমতি লাভের আগে আমার নিকট পরিবার তখনো আক্রান্ত হচ্ছিল।

আমার দুজন মামার কথা মনে আছে, তারা ছিলেন দক্ষ কারিগর। একেবারেই বিনা কারণে তাদেরকে বাড়ি থেকে আটক করা হয়। এই দুই মামার মৃত্যু সংবাদ পাঠানো হয়েছিল আমাদের কাছে। একজন আলমিরার ভেতর ঘণ্টার পর ঘণ্টা কিংবা দিনের পর দিন (কোনটা জানি না আমি) খাবার বা পানি এবং নিঃশ্বাস নেয়ার মতো বাতাস ছাড়া দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করা করায় দম আটকে মারা যান। অন্যজনকে জীবন্ত একটা কুয়োয় ফেলে দেয়া হয়েছিল।&dquote;&dquote;

নাকাশ পরিবারের আরেকজন সদস্য ছিলেন, নাজলি খালা। তাকেও মরার জন্য কুয়োয় ফেলে দেয়া হয়। এক তুর্কিকে ঘুষ দিয়ে বাবা তাকে উদ্ধারে রাজি করিয়েছিলেন। পরে আমরা সেবাশুশ্রূষা দিয়ে আবার তাকে সুস্থ করে তুলি। শেষপর্যন্ত কানাডায় এসে বিয়ে করেন তিনি এবং একটা চমৎকার পরিবার গঠন করেছিলেন; অল্প কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। আরেকবার নিজের চোখে কসাইয়ের হুক থেকে মরা শিশুকে ঝুলতে দেখেছি, ঠিক যেভাবে জবাই করা ভেড়া ঝোলানো হতো।

আমি বলেছি, বয়সে আমার ঠিক ছোট একটা বোন ছিল। মার্দিনে আমরা অনাহারে ভীষণ কষ্ট পোহানোর সময় ভয়ঙ্কর টাইফয়েড জ্বর দুর্গতি আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল। আমার বোনটি অসুখে পড়ে। মায়ের সযত্ন সেবার পরও কয়েক দিন রোগে ভুগে মারা যায় ও। মহামারী এমন ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল যে, দাফনের জোগাড়যন্ত্র করারও জো ছিল না। শেষে লুসিয়া খালা কবর দেয়ার জন্য ওর মরদেহ দূরে নিয়ে যেতে রাজি দুজন লোক জোগাড় করেছিলেন। পাঠকদের রেহাই দিতে না পারায় ক্ষমা চাইছি, কিন্তু পরে লুসিয়া খালা কবর দিতে নয়, লোকগুলো ভিন্ন উদ্দেশ্যে আমার ছোট বোনের মরদেহ নিয়ে যাওয়ার মতলবের কথা জানলে আমাদের সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠার কথা মনে আছে। আমি শুধু বলতে পারি, ওই সময় মার্দিন অনাহারে ছিল।&dquote;&dquote;

ছোটবলায় মনে আছে, মার্দিনে গোটা পরিবার আরামদায়ক গ্রীষ্মের রাতে বাইরে ঘুমাত। আমাদের বাড়ির টেরেসে বা ছাদে কাঠের কাঠামোর খাটিয়া বা ডায়াসে ঘুমাতাম আমরা। আরো মনে আছে, বড়জোর সাত বছর বয়সী কালো চুলো এক চাচাতো বোন প্লাটফর্মে আমার এবং আমার ভাইয়ের পাশে ঘুমাত। তারাভরা আকাশের নিচে খাটিয়ায় শুয়ে থাকার সময়, নিকট প্রাচ্য ছাড়া আর কোথাও এমন তারাজ্বলা আকাশ থাকতে পারে না, এই শিশুটি জাহাজ ভাসানো এবং দূরদেশের মানুষ এবং মুসাফিরদের অলৌকিক ঘটনার রূপকথার জাল বুনত। হাজার এক রাতের কাহিনী এর চেয়ে চমৎকারভাবে, এমন পটভূমিতে আর কেউ বলতে পারেনি, নিশ্চিত ছিলাম আমি, যেখানে গল্পগুলোকে ঢের বেশি সম্ভবপর মনে হয়েছে।

 

তুরস্কের নির্দেশ: ‘আর ফিরে এসো না।’

সত্যিই কখনো ভয়ঙ্কর স্পষ্ট, আবার কখনো ম্লান সেসব দিনের স্মৃতি রক্ত এবং সৌন্দর্য, নির্যাতন এবং শান্তির এক অদ্ভুত মিশেল। এর আংশিক কারণ, নির্যাতন চলেছে বহু বছর ধরে এবং জীবন চলতে বাধ্য ছিল, যদিও আতঙ্কের সঙ্গে, সবসময়।&dquote;&dquote;

সারাক্ষণ মুক্তির একটা দিনের স্বপ্ন দেখতাম আমরা, যখন সবকিছু পেছনে ফেলে যেতে পারব। বাবা-মা এরই ভেতর আমাকে কানাডায় পাঠানোর কথা বলে ফেলেছেন, ওখানে শেরব্রুকে নাকাশ মামার সঙ্গে থাকব। ১৯২২ সালে এল সেই দিন, তুর্কি সরকার আর্মেনীয়দের অভিবাসনের অনুমতি দিয়েছে, খবর পেলাম আমরা। অবশ্যই শর্ত ছিল কঠোর, কিন্তু বাবা সবার আগে মেনে নিয়েছেন। কাপড়চোপড়ের মতো ব্যক্তিগত জিনিসপত্র বিক্রির অনুমতি দেয়া হবে আমাদের (অবশ্য আমাদের বেশির ভাগ জিনিসই ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল), তারপর আমরা বাড়ির দরজা খোলা রেখে বিদায় হতে পারব। আর কখনো দেশে ফিরে না আসার মুচলেকা দিতে হবে। আমি ফিরিনি।

১৯২৫ সালের জানুয়ারিতে নাকাশ মামা আমাকে কুইবেকের শেরব্রুকে তার বাড়িতে নিয়ে তোলার সময় তিনি সেখানকার নামকরা ফটোগ্রাফার হিসেবে খ্যাত।

আমি নাকাশ মামার সঙ্গে থাকতে যাই যখন, তিনি তখনো বিয়ে করেননি, তবে গোড়া থেকে আমাকে ছেলের মতো দেখতেন এবং একজন ভালো বাবার মতো শেরব্রুকে পৌঁছার অল্প দিনের মধ্যে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। অবশ্যই সবার আগে পেরোতে হয়েছে ভাষার বাধা। সম্ভবত আগে &dquote;&dquote;থেকে ফরাসি ভাষা কিছুটা জানা থাকায়—সিরিয়ায় থাকতে শিখেছিলাম—ইংরেজি শেখার জন্য মামা আমাকে ইংরেজিভাষী স্কুলেই ভর্তি করেন। অচিরেই আমাকে ফরাসি ভাষায় ক্লাসের সবচেয়ে উপরের শ্রেণী সপ্তম গ্রেডে তুলে দেয়া হয়; সেখানে আমি ভালো ছাত্র বলে প্রমাণিত হই। অন্যান্য ক্লাসের বেলায় আমার ধারণায় নিশ্চয়ই কিন্ডারগার্টেনে ছিলাম এবং পাঠ্যবিষয় ডিফারেনশিয়াল ক্যালকুলাসের মতোই কঠিন মনে হতো।

আমার সহপাঠীরা অবশ্য (সপ্তম ও কিন্ডারগার্টেন) বেশ সহানুভূতিশীল ছিল এবং আমি দ্রুতই শেরব্রুকে নতুন জীবন ভালোবেসে ফেলি। এবং এমনকি ইংরেজিতে কিছুটা উন্নতিও ঘটিয়েছি।

অনেক সময় শিক্ষকরা কীভাবে আমার ওখানে হাজির হওয়ার ঘটনা নিয়ে ছোটখাটো বক্তৃতা দিয়ে আমার সঙ্গে ভালো আচরণ করার পরামর্শ দিতেন, কারণ আমার আবার ভীষণ ভদ্র হিসেবে নামডাক ছিল। জানতাম আমার কথাই বলছে ওরা, আমার ব্যবহারের তারিফ করছে, সেটা ভুলক্রমে আমার বাড়াবাড়ি ধরনের ভদ্রতা নিয়ে ছিল বলে বরাবর সন্দেহ ছিল। আমি তখন উঠে ক্যাম্পাসের সবখানে হাসিমুখে কুর্নিশ জানাতাম। এটা শিক্ষকসহ সবাইকে খুশি করেছে বলেই মনে হয়েছে, সম্ভবত এ কাজটাই সবচেয়ে ভালো পারতাম এবং ওরাও সেটা বুঝত।&dquote;&dquote;

বলতে গেলে শুরু হওয়া মাত্রই নতুন বিশ্বে আমার আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বন্ধ হয়ে যায়। ছয় মাস পর গ্রীষ্মের ছুটি শুরু হলে পুরোপুরি স্কুল ছেড়ে মামার ফটোগ্রাফিক স্টুডিওতে কাজ করতে চলে আসি। আমার পেশাদারি জীবনে আরেকটা বাঁকবদলের ঘটনা ছিল এটা। ব্যাপারটা তখন ঠিকমতো না বুঝলেও ওই মুহূর্ত থেকেই পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফির সঙ্গে সম্পর্কিত শিল্পকলার প্রতিটি বিষয়ই আমার কৌতূহল আর উদ্যমকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। সেটা ছিল ১৯২৫ সালের জুলাই।

মামার সঙ্গে তার স্টুডিওতে শিক্ষানবিশের কাজ করার সময় ডেভেলপিং, প্রিন্ট ও এনলার্জের সাধারণ কারিগরি কায়দাকানুনের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠি। তবে নাকাশ মামার খদ্দেরদের সিটিংয়ের জন্য আসার সেই মুহূর্তের রোমাঞ্চের কথা বিশেষভাবে মনে আছে। তখন সর্বোচ্চ আগ্রহ নিয়ে সবকিছু দেখেছি, শুনেছি। স্টুডিওর বিশেষ বুলি বোঝার জন্য কান খাড়া রাখতে হতো, কিন্তু ফটোগ্রাফার ও খদ্দেরের বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তা আমাকে সবসময় মুগ্ধ করত। আমার এমনি আগ্রহী মনোভাব মামাকে খুশি করে, অচিরেই ফটোগ্রাফিতে আমার আরো পড়াশোনার আভাস দিচ্ছিলেন। যথাসময়ে তখনকার উত্তর আমেরিকার অন্যতম সেরা পোর্ট্রেট শিল্পী জন এইচ গারোর সঙ্গে কাজ করার জন্য বোস্টনে যাওয়ার কথা বললেন তিনি।&dquote;&dquote;

নাকাশ মামার কাছে অসংখ্য ঋণের ভেতর আমাকে শিক্ষানবিশ হিসেবে গ্রহণে গারোকে রাজি করানো ছিল একটি, যে ঋণ কখনই শোধরাতে পারব না।

গারোও আর্মেনীয় ছিলেন, আমি যখন তার কাছে যাই, তখন তার বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি ছিল।

তার আসল নাম গারোইয়ান হলেও আমেরিকায় সেটাকে গারো রূপে সংক্ষিপ্ত করেছিলেন। ১৯২৮ সালে আমি বোস্টনে যাওয়ার মুহূর্তে ফটোগ্রাফি বিশ্বে তার নাম এত বিখ্যাত ছিল, আমার মনে মিকেলেঞ্জোলোর অধীনে কাজ করার মতো শিহরণ জেগেছিল।

বোস্টনের পাবলিক লাইব্রেরির অনতিদূরে বয়লস্টন স্ট্রিটের ৭৩৯ নম্বর বাড়ির তিন, চার এবং সবচেয়ে উপরের তলা মিলে গারোর স্টুডিও ছিল। সিঁড়ির মাথা এবং ফয়ে থেকে শুরু করে ছোট করিডরের শেষ মাথায় গারোর নাম লেখা কাচের দরজা ছিল। আলংকারিক ফারসি হরফে একটা বৃত্তের মাঝখানে লেখা ছিল তার নাম। আর্মেনীয় হয়েও গারো কেন ফার্সিতে নিজের নাম প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলা মুশকিল। মনে হয়, ব্যাপারটা কৌতূহলকর, শোভন ও অলংকারপূর্ণ এবং সম্ভবত আমেরিকানদের কাছে এটা তেমন লেগেছিল বলেই, যদিও তার কোনো খদ্দেরেরই ওখানে কী লেখা ছিল ধারণা থাকার কথা নয়।&dquote;&dquote;

গারো প্রফুল্ল হতে পারতেন বটে, কিন্তু আগাগোড়া ভদ্রলোক ছিলেন তিনি এবং এই ভদ্রতা তাকে কেবল বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে থাকার সময়টুকু ছাড়া মিতভাষী করে তুলেছিল। এমনকি এসব ক্ষেত্রেও হাসিঠাট্টায় আগ বাড়িয়ে কিছু করতেন না। কিন্তু কাজে ডুবে থাকার সময় হঠাৎ করে উদ্বিগ্ন কোনো সাবজেক্টের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে উঠতেন, ‘এবার আইদা থেকে একটি আইলা গেয়ে শোনাই আপনাকে!’ তারপর চমৎকার সুরেলা কণ্ঠে গাইতে শুরু করতেন। এভাবে স্টুডিওতে নিজের ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটালেও প্রকাশ্যে আড়ালেই থাকতেন তিনি।

আমাকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করলেন গারো। ছয় মাসের মধ্যে বেতনও দিতে শুরু করেন—সপ্তাহে ১ ডলার, সেই সময়ে যেকোনো পেশায় শিক্ষানবিশের জন্য ভালো মজুরি। প্রতিদিন কয়েকটি নতুন শব্দ রপ্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। প্রায়ই গারোর বেলায় সেগুলো প্রয়োগের চেষ্টা করেছি।

তার সব কাজকর্ম বোঝার চেষ্টা করতাম, যদিও তখন নিজের প্রতিটি সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করতে অক্ষম ছিলেন তিনি, যেমন আজকের দিনে কোনো আসনের সময় নিজের ইচ্ছা বুঝতে পারি না আমি। কিন্তু ফটোগ্রাফের কাজ শেষে তার কাছে সাবজেক্টের ফটোগ্রাফ কেন এভাবে নেয়ার কথা ভেবেছেন, কিংবা অমন সিদ্ধান্তে কীভাবে পৌঁছালেন জানতে চাইতাম। এ ধরনের বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে বাস্তব পোস্টমর্টেম আয়ত্ত করার সুযোগের মূল্য স্থির করা কঠিন, কেননা সাবজেক্ট হাজির হওয়ার মুহূর্ত থেকে গুরুর প্রিন্ট অনুমোদন পাওয়া পুরো সময়ই তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতাম। তার পরও গারো নিজের শিল্পকর্মের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দিতে পারতেন না; খুব অল্প মহান শিল্পীই পারেন। তাই আমি যেন ইংরেজি শিক্ষার পাশাপাশি বোস্টনে আর্ট ক্লাসে যোগ দিতে পারি, সেই ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি।&dquote;&dquote;

গারো যেমন চেয়েছিলেন, আর্ট স্কুলের শিক্ষা আমার কাছে মূল্যবান ছিল, যদিও সেটা আমাকে আঁকাআঁঁকি শেখায়নি। এমনকি সেই সময়ও আমার বিশ্বাস ছিল যে আমার ভেতর লাইটিং, ডিজাইন এবং কম্পোজিশনের কিছুটা প্রতিভা আছে। ইনস্ট্রাক্টর প্রায়ই আমাকে বেছে নিয়ে বলতেন, ‘কার্শ, একটু কষ্ট করে ডায়াসে এসে এ মডেলের গায়ে চাদরটা ঠিক করে দাও।’ আমি তখন সাগ্রহে সামনে এগিয়ে মডেলের গায়ে চাদর জড়িয়ে দিতাম, সাধারণত নগ্ন তরুণী ছিল তারা এবং আমার ধারণামতো যত্নের সঙ্গে অবয়ব আলোকিত করে তুলতাম। অনেক সময় চেহারা ছায়ায় রাখতে চাইতাম এবং বিবর্ণ চাদরের দিকে কিংবা শরীরের নিচের অংশেই জোরালো আলো ধরতাম। অনেক সময় প্রোফাইল আলো দাবি করত। এভাবে আমি শিল্পকলার প্রশিক্ষকের কারিগরি সহকারীতে পরিণত হই; তার সঙ্গে কামরায় ঘুরে ঘুরে নিজে আঁকা বাদ দিয়ে ছাত্ররা ড্রইং বোর্ডে কী আঁকছে, তাই পরখ করতাম।

আমার তৈরি আলোর প্রভাব নিয়ে কথা বলতেন ইন্সট্রাক্টর, আমরা দুজন মিলে একে একে ছাত্রদের কাজের সমালোচনা করতাম। আর্ট ক্লাসটাকে অদ্ভুতভাবে কাজে লাগাচ্ছিলাম আমি, কিন্তু নিজের কাছে যেটা সেরা মনে হয়েছে, তাই করেছি। পরে বুঝতে পারি, আমি যখন স্রেফ মূলত আলোর সাহায্যে মডেলিংয়ের কথা ভাবছি, অন্য ছাত্ররা তখন ছবি আঁকা শিখছে।

তারপর গারোও আমাকে নিজের পথে চলার সুযোগ করে দেন। গারোর স্টুডিওতে আমরা শুধু কাচের প্লেট ব্যবহার করতাম বলে এসব প্লেটসহ নিজের মালমসলা নিজেই কিনতাম। সাপ্তাহিক ছুটিতে পাবলিক লাইব্রেরিতে যেতাম, বোস্টনে সেটা আমার দ্বিতীয় আবাসে পরিণত হয়েছিল। ওখানে মানুষের জটলা জরিপ করতাম। ওদের ভেতর সম্ভাব্য ক্যামেরা সাবজেক্ট হিসেবে আমার কল্পনার সঙ্গে মিলে যাওয়া কোনো তরুণী, নারী বা বয়স্ক লোকের দেখা পেলে—কোনজন তাতে কিছু এসে যেত না—আমার ভীষণ সংকোচ তুলে রেখে গারোর স্টুডিওতে আমন্ত্রণ জানাতাম তাকে। বেশির ভাগ সময় আমার পছন্দের সাবজেক্ট আমার সঙ্গে আসতেন এবং আমি আমার সুবিধামতো সময়ে তার ছবি তুলে ওস্তাদকে দেখাতাম।&dquote;&dquote;

‘বাহ, বেশ তো!’—বলতেন তিনি। ‘আমি হলে অবশ্য অন্যভাবে তুলতাম, কারণটা তোমাকে বলছি।’ তারপর আমার ক্যামেরার ভাষার ওপর সমালোচনামূলক মন্তব্য করার অবসরে নিজের একটা অংশ আমার কাছে এমনভাবে চালান করতেন, যেটা আমি কখনই হারাইনি।

গারো চিত্রশিল্পী হওয়ায় আমাকে সবসময় এ কথা মনে করিয়ে দিতেন যে, তুমি কোনো পুরুষ বা নারীর পোর্ট্রেট আঁকলে সই করার মতো ভালো ছবি বাছাই করার আশায় একটা কোনো আসনের ১২টা ক্যানভাস সৃষ্টি করতে পারতে না।

ফটোগ্রাফির ব্যাপারটাও একই রকম। তিনি বলতেন, ‘প্লেট এক্সপোজ করার আগেই ভাববে। একগাদা গড়পড়তা এক্সপোজারের ওপর নির্ভর করে হেলাফেলা করে এক্সপোজ কোরো না। প্রতিটি সাধ্যমতো নিখুঁত করে তোলার চেষ্টা করো।’ তাকে কাজে দেখার ব্যাপারটা চমকে দেয়ার মতো ছিল, আবার দর্শকের পাশাপাশি তার নিজের পক্ষেও বেশ ক্লান্তিকর ছিল।

গারোর স্টুডিওর আসনগুলো দিনের বেলায় হতো—গারোর তাই পছন্দ ছিল—তাই ৪টা বা বিকালের পর আর কোনো খদ্দের থাকত না। ফলে এই সময়টা গারো বা পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হতে আসা বিভিন্ন শাখার অগুনতি শিল্পীর আনন্দঘন ও নিশ্চিন্ত সমাবেশের সূচনা ছিল।

এসব সমাবেশের কোনো কোনোটা তিন বা চার সপ্তাহ আগেই স্থির করা থাকত। তখন বোস্টনে বেড়াতে আসার সম্ভাবনা আছে, থিয়েটার বা অপেরার সফররত শিল্পীদের অন্তর্ভুক্ত করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হতো। বিশেষ সন্ধ্যায় গারোর স্যালন প্রতিভাধর নারী-পুরুষ এবং সমঝদারদের উপস্থিতিতে ভরে উঠত।

১৯৩১ সাল পর্যন্ত তিন বছর গারোর ওখানে ছিলাম, তারপর শেরব্রুকে নাকাশ মামার সঙ্গে নিজের মতো পেশার চর্চা করতে ফিরে আসি। কিন্তু ততদিনে আমার আগ্রহ কেবল পোর্ট্রেচার থেকে ব্যক্তিত্বে সরে গেছে এবং নিজের মতো চলার আকাঙ্ক্ষা আমার ভেতর চাপ বাড়িয়ে চলছিল।

যেহেতু আমাদের জীবনে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিত্বদের ছবি তুলতে আগ্রহী ছিলাম, বিশ্বের একটা রাজধানীই থিতু হওয়ার পক্ষে উপযুক্ত জায়গা বলে মনে হয়েছিল। আমার পক্ষে ওয়াশিংটন চিন্তার বাইরে ছিল, কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন কোটা নিয়ন্ত্রিত ছিল আর তখন আর্মেনীয়দের জন্য কোনো কোটা ছিল না। অবশ্য অটোয়া আমার জন্য সুগম ছিল, আমার মনে হয়েছে লন্ডন থেকে অটোয়া এবং অটোয়া থেকে ওয়াশিংটন এবং অটোয়া হয়ে ওয়াশিংটন থেকে লন্ডনে বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের যাতায়াতের একটা সাধারণ জায়গা হবে। মামার স্টুডিওতে আগত ইস্টম্যান কোডাক কোম্পানির প্রতিনিধিত্বকারী সফরকারীদের অটোয়ায় কোনো কাজের খবর থাকলে আমাকে জানাতে বলে রাখতে শুরু করেছিলাম। একদিন তাদেরই একজন, তার নাম বেল, আমাকে জানালেন, অটোয়ার জন পাওইস ‘ঠিক তোমার মতো অভিজ্ঞ এক তরুণের খোঁজ করছে। ঠিক তোমার মতো কাউকেই তার দরকার।’ পাওইসের কাছে কাজের নমুনা পাঠালাম আমি। আমাকে সাক্ষাৎকারের জন্য যেতে চিঠি লিখলেন তিনি। ফলে আমার অটোয়ায় পাড়ি জমানোর ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে উঠলেন তিনি। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ১৯৩২ সালের শরতে আমার সবকিছু দুটি স্যুটকেসে ভরে পাওইসের স্টুডিওতে কাজ করতে রাজধানীতে চলে আসি।

প্রথমদিকে পাওইসের তোলা নেগেটিভগুলো থেকে পোর্ট্রেটের কাজ শেষ করতাম। পরে বেশি করে সত্যিকারের পোর্ট্রেট নিতে শুরু করি, যেগুলো তার নামে ছাড়া হতো। শেষে জানতে পারলাম, জন পাওইস বাড়ি ভাড়া আর নবায়ন করবেন না, ব্যবসা গোটানোর পরিকল্পনা করছেন। আমাকে ভাড়া দেয়ার ব্যাপারে কথা বলতে বাড়িঅলা ই.এস শেরউডের কাছে গেলাম। মাসিক ৬৫ ডলার ভাড়ায় ১৩০ স্পার্কস স্ট্রিটের আমার কোয়ার্টারটা ভাড়া দিয়ে আমার পক্ষে অনেক কিছু সহজ করে দেন তিনি, সেজন্য তার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আজও আমার বাড়িঅলাই আছেন তিনি।

প্রথম মাসগুলোয় অটোয়ায় অল্প কজন বন্ধু ছিল আমার, কিন্তু ১৯৩২ সালের অক্টোবরে এক তরুণের সঙ্গে দেখা হলে আমাকে সে বলল, ‘আজ রাতে থিয়েটারে যাব আমি, যাবে আমার সঙ্গে?’ আমাকে সে জানাল, লা বেলে দে হাগতেনা নামে মঞ্চনাটক ওটা, ওর চেনা এক মেয়ে তাতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করছে।

নাটক দেখে দারুণ অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম (ইংরেজি ভাষায় ছিল বলে ঠিকমতো বুঝতে কষ্ট হচ্ছিল), কিন্তু প্রধান চরিত্রে অভিনয়কারী মেয়েটার কণ্ঠস্বরেই বেশি মুগ্ধ হয়েছিলাম, কারণ বরাবরই কণ্ঠস্বরের প্রতি আমি স্পর্শকাতর ছিলাম। নাটক শেষে আমার নতুন বন্ধু আমাকে ব্যাক স্টেজ হয়ে সোজা সাজঘরে নিয়ে গেল। নক না করেই ঢুকে পড়ল সে। ওখানে পায়ের মোজা খোলার সময় একটা পা ছাদের দিকে উঁচুতে তুলে দিয়ে কাত হয়ে শুয়েছিল মেয়েটা। বন্ধুর উদ্দেশে আমোদিত হাসি দিল সে, তার সঙ্গে আসা হাস্যকর চেহারার বিদেশী ছেলেটার উদ্দেশেও হাসল। চমৎকার টানে জোর গলায় বলল, ‘বেশ, আমি স্টকিংস খোলার সময় আমার ড্রেসিং রুমে ঢুকে পড়তে পারলে।’ পরক্ষণেই সংস্কারহীন কায়দায় অন্য মোজাও খুলে ফেলল। পরে আমাদের প্রথম দেখার ধাক্কা সামলে উঠতে বেশ কয়েক বছর সময় লাগার কথা বলেছিল ও, কিন্তু আসলে তা ছিল না: তখনকার মতো বরাবর ওকে চমৎকার মনে হয়েছে। আমরা তিনজন একসঙ্গে সন্ধ্যাটা কাটাই, তবে বেশির ভাগ শুনে গেছি আমি। নিমেষে বুঝে গিয়েছিলাম, সোলাঞ্জ গথিয়ারকে আমার ভালো লাগে, ওকে আমি ভালোবাসি।

আমার প্রথম বা দ্বিতীয় দফা প্রস্তাবই গ্রহণ করেছিল ও, তা নয়, তবে শেষ পর্যন্ত রাজি হয় এবং ১৯৩৯ সালে আমরা বিয়ে করি। ১৯৬১ সালের জানুয়ারিতে এক ধরনের ম্যালিন্যান্সিতে ভুগে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত সোলাঞ্জ আমার অনুপ্রেরণা, ব্যবসার ব্যবস্থাপক এবং প্রধান শক্তি হয়েছিল। ও-ই আমাকে অটোয়া লিটল থিয়েটার আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত করে। মোটামুটি এ সম্পর্কের সুবাদেই বর্তমান পেশা শুরু করেছিলাম আমি।

একজন অভিনেত্রী হিসেবে সোলাঞ্জের ছবি তুলেছি। নাটক নির্দেশনা দিতে দেখেছি ওকে। পরিচালকদের দেয়া আলোকসম্পাতের নির্দেশনা থেকে আমার সামনে এক নতুন দুনিয়া উন্মুক্ত হয়েছিল। মঞ্চের আলোয় অভিনেত্রীদের ছবি তোলার এ অভিজ্ঞতা চমকপ্রদ ছিল। গারো দিনের আলোয় কাজ করতে শিখিয়েছিলেন আমাকে, এসব ক্ষেত্রে সঠিক আলোর জন্য অপেক্ষা করতে হয়। নতুন পরিস্থিতিতে পরিচালক তার ইচ্ছামতো আলোকসম্পাতের নির্দেশ দিতে পারেন। কৃত্রিম আলোকসম্পাতের অমিত সম্ভাবনা আমাকে অভিভূত করে দিয়েছিল।

একই সময়ে ১৯৩৩ সালে অটোয়ায় অনুষ্ঠিত প্রথম ডোমিনিয়ন ড্রামা ফেস্টিভ্যালের সরকারি ফটোগ্রাফার হিসেবে নিয়োগ পাই। শৌখিন থিয়েটার কর্মকাণ্ডে মনোযোগী একমাত্র ফটোগ্রাফার হওয়ার কারণেই আমাকে বেছে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু খুব বেশি দিনের জন্য মনোযোগী ছিলাম না, সম্ভবত কয়েক মাস হবে।

এ সময়ের কানাডার গভর্নর জেনারেল লর্ড বেসবোরো উৎসবের মূল উদ্গাতা ছিলেন এবং বেসবোরা ট্রফি আসলে বিজয়ী নাটককে দেয়া হয়েছিল। কানাডার রাজার প্রতিনিধির ছবি তোলার অনুমতি আদায় করা গেলে সেটা বিরাট সাফল্য হবে বলে মনে হয়েছিল। তাই তার ছেলে লর্ড ডানকানোনকে কথাটা বলি, তিনি তার বাবা এবং মাকে আমাকে তাদের ছবি তোলার সুযোগ দিতে বলেন। আমাকে যারপরনাই পুলকিত করে তিনি তাদের সম্মতি আদায় করেন। তারা স্টুডিওতে এলে আমি ছবি তুললাম, কিন্তু আমার প্রথম বড় ধরনের কাজে ভীষণ উত্তেজিত ও হতাশ ছিলাম এবং আমার ভুল ইংরেজি রীতিমতো বিব্রতকর ছিল। মনে আছে লর্ড বেসবোরার ছবি তোলার পর লেডি বেসবোরার একাকী ছবি তুলতে উদগ্রীব থাকায় হুট করে বলে বসেছিলাম, ‘মহামান্য, দয়া করে রিসেপশনে আমার সেক্রেটারির সঙ্গে শুয়ে পড়ুন!’

পরিণামে ওই ছবিগুলো পুরোপুরি ব্যর্থ ছিল; ক্যামেরা ঠিকভাবে ফোকাস করেছিলাম বলে বিশ্বাস করি না। তো কয়েক দিন পরে লর্ড ডানকানোনকে দারুণ আতঙ্কের সঙ্গে জানালাম, ‘আমি ভীষণ দুঃখিত, আমার খুবই খারাপ লাগছে, এটা সম্পূর্ণ দুর্ভাগ্য, কিন্তু বড় বেশি উত্তেজিত ছিলাম আমি।’ আমাকে অবাক করে লর্ড এবং লেডি বেসবোরা আবার ছবি তুলতে এলেন এবং এবার ছবিগুলো ছিল বিশাল সাফল্য। সর্বত্র প্রকাশিত হয় ওগুলো, ইলাস্ট্রেটেড লন্ডন নিউজের দুই পাতা জুড়ে, দ্য টলার, দ্য স্কেচ-এ, সারা কানাডার বহু প্রকাশনায়।

অবশেষে আমার পেশার সূচনা ঘটল।

 

[ইউসুফ কার্শের ইন সার্চ অব গ্রেটনেস বই থেকে অনূদিত। দ্বিতীয় পর্বে থাকবে কার্শের বিখ্যাত ব্যক্তি: বার্নার্ড শ, এলিজাবেথ টেইলর, পোপ এবং হইচই ফেলে দেয়া উইনস্টন চার্চিলের ছবি তোলার ঘটনা]

 

অনুবাদ: শওকত হোসেন