‘দাঙ্গা! শব্দটি কানে যাওয়ামাত্র সর্বাঙ্গ দিয়ে হিম-শিহরণ প্রবাহিত হয়ে যায়। কারণ এর সঙ্গে অপরিহার্যভাবে যুক্ত নির্বিচারে হত্যা, নিরপরাধের রক্তস্রোত, আঘাত, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অসহায়ের অশ্রু, বুক ফাটা হাহাকার, অগ্নিসংযোগ, দরিদ্র দেশের কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি, লক্ষ লক্ষ কর্মদিবসের বিনষ্টি এবং তাবৎ অসামাজিক ক্রিয়াকলাপ। মানুষের শত শতাব্দীর সাধনায় অর্জিত সভ্যতা সংস্কৃতি যুক্তিবাদের অনুশীলনকে নির্মিষে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে তাকে রক্তলোলুপ উন্মত্ত এক জীবে পরিণত করে।’ (দাঙ্গার ইতিহাস-শৈলেশকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়)

ওই যে রক্তলোলুপ উন্মত্ত এক জীব—সে কি কখনো হিন্দু বা মুসলমান, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান, শিখ বা পারসিক হতে পারে? পারার কথা নয়, তবুও হয়!

শেষ পর্যন্ত হিসাব হয় কতজন হিন্দু মরল আর কতজন মুসলমান। সবার মরদেহ গুনে বলা হয় না মোট কতজন মানুষ মারা গেল।

রবীন্দ্রনাথ এখানে প্রাসঙ্গিক:

হিন্দু-মুসলমানের সম্বন্ধ লইয়া আমাদের দেশের একটা পাপ আছে, এ পাপ অনেক দিন হইতে চলিয়া আসিতেছে। ইহার যা ফল তাহা না ভোগ করিয়া আমাদের কোনো মতেই নিষ্কৃতি নাই।

রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী দেখাচ্ছেন:

‘দক্ষিণ দেশে হায়দ্রাবাদে নিজাম মুখ্যতঃ মুসলমান সমাজের উপর আধিপত্য করিতেছেন, আর উত্তর দেশে কাশ্মীরে জম্বুপতি মুখ্যতঃ মুসলমান সমাজের উপর আধিপত্য করিতেছেন, কিন্ত কোথাও তো হিন্দু-মুসলমানের ছুরি চালাচলি শুনিতে পাই না।’

বাস্তবতা মেনে নেয়া উত্তম। বাংলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যে কথা বুদ্ধিজীবীরা বলে থাকেন তা আংশিক সত্য। সম্প্রীতি বরাবরই হুমকির মুখে ছিল মূলত বৈষম্যের কারণে।

১৬ আগস্ট ১৯৪৬ কলকাতা জেলা মুসলিম লীগের সেক্রেটারির বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে পালিত হওয়ার কথা। ১৩ আগস্টের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ ঘোষিত অল ইন্ডিয়া ডাইরেক্ট অ্যাকশনে কলকাতা জেলা মুসলিম লীগের নির্দেশনায় যৌথভাবে পশ্চিম বাংলার হাওড়া, হুগলি, মেটিয়াবুরুজ ও ২৪ পরগনার কারখানা এলাকায় পালন করা হবে।

কর্মসূচি: নাগরিক জীবন, বাণিজ্যিক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান পূর্ণ হরতালের আওতায় আসবে। গীতবাদ্যসহ বর্ণিত স্থান ঘুরে ১৬ আগস্ট বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত অক্টারলনি মনুমেন্টের পাদদেশে সমবেত হবে। বেঙ্গল মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির নেতা এবং বাংলায় প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী সেখানকার সভার সভাপতিত্ব করতে সম্মতি জানিয়েছেন। সব সংখ্যালঘু (বর্ণ হিন্দু, আদিবাসী, পাহাড়ি, খ্রিস্টানসহ) বঞ্চিত ও স্বাধীনতাকামী হিন্দু-মুসলমান সভায় আমন্ত্রিত। সব মসজিদের তালিকা করে তাতে তিনজন করে কর্মী মোতায়েন করতে হবে। জুমার নামাজের পর ভারতের স্বাধীনতার জন্য সব মসজিদে মোনাজাতে অনুষ্ঠিত হবে। মুদ্রিত মোনাজাত ৮ নম্বর জাকারিয়া স্ট্রিট থেকে সংগ্রহ করা যাবে।

মূলত এ ডাইরেক্ট অ্যাকশন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকে উসকে দেয় এবং তা পূর্ব বাংলাসহ ভারতের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে।

 

ডাইরেক্ট অ্যাকশন: নোয়াখালীতে কলকাতার আগুন

ডাইরেক্ট অ্যাকশন সাম্প্রদায়িক লড়াইয়ের একটি অ্যাকশনে পরিণত হয়। নোয়াখালীতে ১০ অক্টোবর ১৯৪৬ কোজাগরি লক্ষ্মীপূজার দিনে হিন্দুরা একটি বিশেষ শ্রেণীর মুসলমানদের আক্রমণের শিকার হয়। শ্যামপুর দায়রা শরিফের প্রয়াত খাদিমের দৌহিত্র ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ প্রার্থীর কাছে পরাজিত গোলাম সরোয়ার হুসেইনি কলকাতায় ডাইরেক্ট অ্যাকশন-পরবর্তী দাঙ্গা এবং মুসলমান নিধনের কিছু কাহিনী বয়ান করে জনগণকে উত্তেজিত করতে থাকেন। তিনি তার অনুসারীদের শাহাপুর বাজারে সমবেত হওয়ার নির্দেশ দেন। তার নিজস্ব একটি বাহিনী ‘মিয়ার ফৌজ’ ছিল। শাহাপুর বাজারে আরেকটি বাহিনী ‘কাশেমের ফৌজ’ও মিলিত হয়। তারা সম্মিলিতভাবে জমিদার সুরেন্দ্রনাথ বসুর কাচারি আক্রমণ করে। সে সময় জমিদারের মুসলমান রায়তদের একটি অংশ তাদের সঙ্গে ধ্বংসাত্মক কাজে যোগ দেয়। নোয়াখালী উকিল বারের সভাপতি এবং নোয়াখালী হিন্দু মহাসভার প্রধান রাজেন্দ্রলাল রায় চৌধুরীর বাড়ি আক্রমণ করে। তার পরিবারের সদস্যরা অগেই নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছিল। দ্বিতীয় দিন ১১ অক্টোবর পুনরায় আক্রমণ করে তারা রাজেন্দ্রলালকে হত্যা করে। ১২ অক্টোবর তারা চিত্তরঞ্জন রায় দত্ত চৌধুরীর বাড়ি আক্রমণ করে হত্যাকাণ্ড চালায়, লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগ করে। মূলত গুজবভিত্তিক এবং প্ররোচনামূলক বক্তৃতা থেকে সৃষ্ট অমানবিক এমন দাঙ্গার সমতুল্য কোনো ঘটনা পূর্ব বাংলায় কখনো ঘটেনি। এর সঙ্গে আরো জড়িয়েছিল ধর্ষণ ও ধর্মান্তরকরণ। এ ধরনের দুই হাজার বলপূর্বক ধর্মান্তরকরণের অভিযোগ রয়েছে, দাপ্তরিক হিসেবে সংখ্যাটি ২০০। নোয়াখালীর দাঙ্গা দ্বীপাঞ্চল সন্দ্বীপ থেকে শুরু করে প্রায় সমগ্র ত্রিপুরায় ছড়িয়ে পড়ে। হিন্দুদের রক্ষা করতে গিয়ে সন্দ্বীপে বিপ্লবী লালমোহন সেন নিহত হন। ত্রিপুরায় ৯৮৯৫ জনকে ধর্মান্তর করা হয়েছে বলে সংসদীয় প্রশ্নের জবাবে সোহরাওয়ার্দী জানালেন, এডওয়ার্ড সিম্পসন এ সংখ্যা ২২ হাজার ৫০০ বলে উল্লেখ করেন। ধর্ষিত নারীর প্রকৃত সংখ্যা জানার উপায় নেই। কারণ সামাজিক মর্যাদার কথা ভেবে অনেকে স্বীকারই করেননি।

 

ভারত ভাগের শেষ ঘণ্টাধ্বনি

ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের আগেকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভাষ্য:

১৯৪৬ সালের শেষভাগে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির যে অবনতি তা আকস্মিক নয়। দীর্ঘদিনের কর্মকাণ্ডের পরিণতি। সে যা-ই হোক, এ সহিংস ঘটনার আশু কারণ হিসেবে মুসলিম লীগের ডাইরেক্ট অ্যাকশনের ডাক এবং ভাইসরয়, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে সমঝোতা করতে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতাকে চিহ্নিত করা যায়। এসব কারণে ১৯৪৬ সালের মধ্য আগস্টে কলকাতায় ভয়ংকর সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে এবং অক্টোবর-নভেম্বরে নোয়াখালী, ত্রিপুরায় হিন্দুদের ওপর আক্রমণ হয়েছে। আর এসব ঘটনায় শত-সহস্র হিন্দু ও মুসলমানকে ভিটে ছেড়ে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে হয়েছে। মুসলিম লীগের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব প্রকাশ্যে সাম্প্রদায়িক আহ্বান জানিয়েছে, কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব এ কাজটা প্রকাশ্যে করেনি। পূর্ব বাংলা মুসলিম লীগ সরকার এবং বিহার ও যুক্ত প্রদেশে কংগ্রেস সরকার সাম্প্রদায়িকতার এ বৃত্ত নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে, শুধু তা-ই নয়, উভয়েই সাম্প্রদায়িকতা উসকে দিয়েছে।

নোয়াখালীতে নিহত হিন্দু এবং বিহার ও যুক্ত প্রদেশে নিহত মুসলমানরা প্রায় সবাই দরিদ্র জনগণ। নোয়াখালীতে বলপূর্বক অমুসলমানদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়েছে; পাঞ্জাব ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশেও ধর্মান্তর ঘটেছে। ডাইরেক্ট অ্যাকশনের পর যা ঘটেছে তার দোহাই দিয়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন, হিন্দু-মুসলমানের আর একসঙ্গে বসবাস সম্ভব নয়। দুই ধর্মের মানুষের জন্য দুটি দেশ।

পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে পাশে পাওয়ার পরও প্রাদেশিক সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দমনে ব্যর্থ হয়েছিল। দাঙ্গা ভারত ভাগ ত্বরান্বিত করেছে।

২১ আগস্ট ১৯৪৬ ভারতে ব্রিটিশ ভাইসরয়ের গভর্নর জেনারেল ফিল্ড মার্শাল ভিসকাউন্ট আর্চিবল্ড ওয়ালেস লিখলেন, গত সপ্তাহান্তে কলকাতা দেখেছে এক ডেডফুল রায়ট আর নোয়াখালী দাঙ্গার পর ২২ নভেম্বর তিনি লিখলেন, ভারতের সবকিছু ছেয়ে ফেলেছে পূর্ব বাংলা, বিহার আর যুক্ত প্রদেশের দাঙ্গা।

আর ২৬ নভেম্বর জিন্নাহ বললেন, সংখ্যাগরিষ্ঠের হাতে কোরবানি হওয়া থেকে সংখ্যালঘিষ্ঠদের রক্ষা করতে প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত এখনই ‘পপুলেশন এক্সচেঞ্জ’ শুরু করা। অর্থাৎ মুসলমান যাবে মুসলিম অধ্যুষিত অংশে, হিন্দু যাবে হিন্দু অধ্যুষিত অংশে। কার্যত এটাই ছিল ভারত বিভাজনের মৌল দর্শন।

 

এম এ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা