সাম্প্রদায়িক সহিংসতা উপমহাদেশের ইতিহাসের কালিমালিপ্ত অধ্যায়। তার পরও তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বাংলায় এমন সহিংসতার একটি নিদর্শন নোয়াখালী, সময়কাল ১৯৪৬। কয়েকজন ঐতিহাসিকের দৃষ্টিতে সে বেদনার্ত ঘটনাকে ফিরে দেখার চেষ্টা করা হবে এ লেখায়। দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক রাকেশ বটব্যালের কাজ এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। তার পিএইচডি গবেষণার শিরোনাম ছিল কমিউনালিজম ইন বেঙ্গল: ফ্রম ফেমিন টু নোয়াখালী ১৯৪৩-৪৭। তার মতে, নোয়াখালীর সহিংসতা ১৯৪৬-এর আগস্টে কলকাতার দাঙ্গার প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এর কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ছিল। প্রথমত, নোয়াখালীর ঘটনা ছিল গ্রামকেন্দ্রিক, দ্বিতীয়ত, পরিকল্পিত প্রচারণার ঘটনা স্থানীয় কৃষক সমাজকে উত্তেজিত করে তুলতে ভূমিকা রেখেছিল। এবং যে বিষয়টি এক্ষেত্রে রাকেশের মতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো ভারতজুড়েই এ ঘটনা মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছিল। একটি ঘটনার উল্লেখ করে তিনি এ প্রভাবের তীব্রতাকে উপস্থাপন করেছেন। ঘটনাটি ছিল এমন: প্রতাপগড়-এলাহাবাদ প্যাসেঞ্জার ট্রেনটি প্রয়াগ স্টেশনে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন পুরুষ ও নারী মিলে ট্রেনের বিভিন্ন কামরায় তল্লাশি চালান যে সেখানে নোয়াখালী বা বাংলার অন্য কোনো জেলা থেকে অপহূত কোনো নারী আছেন কিনা। এ তল্লাশির সময় একজন ছুরিকাঘাতে নিহত হয়। ট্রেনটিকে এলাহাবাদে ফিরিয়ে নেয়া হয় এবং সশস্ত্র প্রহরায় আবার যাত্রা করে। সবচেয়ে ভয়ানক প্রতিক্রিয়াটি হয়েছিল বিহার ও উত্তর প্রদেশে মুসলিমদের ওপর চলানো হত্যাযজ্ঞে। ২৫ থেকে ২৮ অক্টোবরের মধ্যে ছাপরা, সরণ জেলায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। শিগগিরই পাটনা, মঙ্ঘির, ভাগলপুরে তাণ্ডব শুরু হয়। রাকেশ বটব্যালের কথায়, এসব কারণে ১৯৪০-এর দশকের অন্য সব সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার তুলনায় নোয়াখালীর সহিংসতার প্রভাবের মাত্রা ছিল অনেক বেশি বিস্তৃত ও তাত্পর্যপূর্ণ।

১৯৪৬ সালের ১০ অক্টোবর নোয়াখালীর উত্তরাংশের রামগঞ্জ থানায় সহিংসতার সূত্রপাত হয়েছিল। এরপর দ্রুতই তা নোয়াখালীর রায়পুর, লক্ষ্মীপুর, বেগমগঞ্জ ও সন্দ্বীপে ছড়িয়ে পড়ে। তত্কালীন ত্রিপুরা জেলার ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর, চৌদ্দগ্রামেও সহিংসতা শুরু হয়।

রাকেশ বটব্যালের বইতে একটি অধ্যায়ের নাম লুকিং ফর দি অরিজিনস: দ্য নোয়াখালী-ত্রিপুরা রায়টস। শিরোনামেই বোঝা যায়, এ অংশে তিনি নোয়াখালীর সহিংসতার কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছেন। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলায় ইসলামের বিশুদ্ধতাবাদী আন্দোলন সক্রিয় হয়। ওয়াহাবি আন্দোলন শক্তিশালী হতে থাকে। নোয়াখালী অঞ্চলের মওলানা ইমাদুদ্দীন ছিলেন রায় বেরিলির ওয়াহাবি নেতা সৈয়দ আহমেদের সহযোগী। ১৮৫০-এ বালাকোটে ওয়াহাবি বাহিনীর পরাজয়ের পর মওলানা ইমাদুদ্দীন নোয়াখালী ফিরে আসেন। তিনি নোয়াখালী ও ত্রিপুরায় ওয়াহাবি মতাদর্শ প্রচার করতে শুরু করেন। আরেকজন ছিলেন মওলানা কেরামত আলী। নোয়াখালীর চুনুয়া গ্রামে তিনি বিয়ে করেছিলেন। ফরিদপুর, বাখরগঞ্জ থেকে তার প্রভাব নোয়াখালীতেও গভীর হয়। তার প্রভাবে নোয়াখালীতে ধর্মীয় বিধিবিধান কঠোরভাবে পালনের মাধ্যমে ধর্মীয় সংস্কৃতিতে বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল। ফরায়েজি আন্দোলনের উত্তাপও পৌঁছে গিয়েছিল এখানে। এসব ঘটনার প্রভাব সমাজে কতটা এবং কীভাবে পড়েছিল তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে। তবে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে রাকেশ বটব্যাল একটা বিষয় বলা যেতে পারে বলে মনে করেন। সেটা হলো এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে গোঁড়াভাবে ধর্মচর্চা ও জীবনযাপনের সংস্কৃতি। নানা ধরনের স্মৃতিকথা, দলিলে এর আভাস স্পষ্টভাবেই পাওয়া যায়। তবে এটাও ঠিক, সে সময় কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটেনি। এ আন্দোলনগুলো মুসলমানদের কঠোরভাবে ধর্ম পালনে উৎসাহিত করলেও তা কোনো সাম্প্রদায়িক সহিংসতার দিকে চালিত করেনি। তাহলে ১৯৪৬ কীভাবে সংঘটিত হয়েছিল? রাকেশ বটব্যাল থেকে সরাসরি উদ্ধৃত করা যায়—‘এ সহিংসতার বীজ এখানকার পশ্চাত্পদতা, পুনরুজ্জীবন আন্দোলন কিংবা অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে নেই। এগুলো বড়জোর বস্তুগত ও মতাদর্শিক প্রেক্ষাপট হিসেবে কাজ করতে পারে। বরং বলা যেতে পারে, এ সহিংসতার সূত্র লুকিয়ে আছে সাম্প্রদায়িকতার মতাদর্শ এবং তার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া রাজনীতির ওপর।’

এ পর্যায়ে নোয়াখালী অঞ্চলের সমাজ কাঠামোর গঠন সম্পর্কে একটি ধারণা রাখা প্রয়োজন। দলিল থেকেই দেখা যায়, সেকালের পূর্ববঙ্গের বেশির ভাগ এলাকার মতো নোয়াখালী ও ত্রিপুরার সমাজ কৃষিভিত্তিক। বেশির ভাগ মানুষ মুসলিম প্রান্তিক কৃষক। উচ্চবর্ণের হিন্দুদের বসবাস ছিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে এবং তারা ছিল মুখ্যত খাজনা আদায়কারী ও সুদের কারবারি। নোয়াখালীতে একটি বিষয় পূর্ববঙ্গের অন্য এলাকাগুলো থেকে কিছুটা ভিন্ন ছিল। এখানে জমির মালিক উচ্চবর্ণের মধ্যবিত্ত হিন্দুদের উপস্থিতি অন্য এলাকার তুলনায় কম ছিল।

১৯৪৩ সালে দুর্ভিক্ষ এবং পরবর্তী বিভিন্ন সংকট নোয়াখালী অঞ্চলকে গুরুতরভাবে আঘাত করেছিল। বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান সিঙ্গাপুর ও মালয় দখল করে নেয়ার পর নোয়াখালী ও ত্রিপুরা থেকে যথাক্রমে ৭৫ ও ২০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। বিশ্বযুদ্ধের কারণে এ অঞ্চলের অন্যতম কৃষিপণ্য পাটের দাম মার খেয়েছিল। অন্যদিকে বাড়ছিল চালের দাম। এ পরিস্থিতি ১৯৪৬ সালের শেষ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। সে বছর অক্টোবরে নোয়াখালী ও ত্রিপুরায় চালের দাম ছিল মণপ্রতি ৩০ রুপি অথচ পূর্ববঙ্গের বড় জেলাগুলোর বড় বাজারে দাম ছিল ১৭ রুপির কিছু বেশি। সুরঞ্জন দাস তার কমিউনাল রায়টস ইন বেঙ্গল ১৯০৫-১৯৪৭ গ্রন্থে লিখেছেন, এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় কৃষক মুসলিমরা অপেক্ষাকৃত ধনী হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি ক্রুদ্ধ হচ্ছিল। এ ঘটনার কিছু লক্ষণ সহিংসতার ময়দানে দেখা গেছে। ধনী হিন্দুদের পরিবারে হামলার সঙ্গে তাদের সম্পদের ওপরও আক্রোশ দেখা গেছে। কেউ বাধ্য হয়েছেন কলকাতার দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত মুসলমানদের সহায়তা তহবিলে দান করতে। নারায়ণপুরে জমিদার সুরেন্দ্রনাথ বসুর কাচারিতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছিল। এসব সহিংস ঘটনাকে অংশত অর্থনীতিতে হিন্দুদের শক্তিশালী অবস্থানের প্রতি গরিব মুসলমানদের ক্ষোভের অংশ বলে মনে করেন সুরঞ্জন। তিনি আরো জানিয়েছেন, যেসব দোকানে হামলা, লুটপাট হয়েছিল সেগুলোর মালিকরা ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের সময় মুসলিম কৃষক ক্রেতাদের দুর্দশাকে কাজে লাগিয়ে বহু টাকার মালিক হয়েছিলেন। নিচু জাতের গরিব হিন্দু কৃষককেও হামলাকারীরা রেহাই দেয়নি। তবে তাদের লুটপাট বা হত্যা না করে ধর্মান্তর করে ছেড়ে দেয়া হতো।

নোয়াখালীর ঘটনা বিশ্লেষণ করে রাকেশ বটব্যাল ও সুরঞ্জন দুজনই একটি জায়গায় একমত যে নানা রকম প্রেক্ষিত থাকলে এ সহিংসতা হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের কোনো স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহের মতো বিষয় নয়। বরং এখানে সাংগঠিনক কর্মযজ্ঞের নিদর্শন দেখা যায়। সুরঞ্জন লিখেছেন, ‘নোয়াখালীতে জনতার কর্মকাণ্ড থেকে বোঝা যায় “উচ্চপদস্থদের মস্তিষ্ক” দ্বারা অগ্রিম পরিকল্পনা ও সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনা ছিল।’ রাকেশ বটব্যাল লিখেছেন, ‘মুসলিম লীগের পতাকা, পাকিস্তানের মানচিত্র এবং “পাকিস্তান জিন্দাবাদ” স্লোগানসহ হাজার হাজার নতুন টুপি সরবরাহ করা হয়েছিল। এটা প্রমাণ করে যে সব ব্যবস্থাপনা বেশ সম্পদশালী সংগঠন আগেই করে রেখেছিল। সে সময় বাজারে কাপড়ের অভাব ছিল।’

গোলাম সারওয়ার হুসেইনি ১৯৩৭ সালে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির সদস্য হয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৪৬ সালে তিনি মুসলিম লীগের প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। কলকাতার দাঙ্গার পর থেকেই তিনি ধর্মীয় উসকানিমূলক বক্তৃতা দিতে শুরু করেন। তাকেই নোয়াখালী দাঙ্গার মূল সঞ্চালক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার নেতৃত্বে সহিংসতার শুরুর দিনে হাজারো দাঙ্গাকারী এসেছিল বাইরে থেকে। পরবর্তী সময়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় গ্রামবাসী তাতে যুক্ত হতে শুরু করে। সুরঞ্জন দাস সিদ্ধান্ত টেনে লিখেছেন, ‘নোয়াখালী-ত্রিপুরা দাঙ্গা অসংগঠিত ও মাঝেসাঝে শ্রেণীভিত্তিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা থেকে রাজনৈতিক শক্তির সরাসরি সংযোগে সংগঠিত দাঙ্গার দিকে রূপান্তরের উদাহরণ। এ সহিংসতা স্বতঃস্ফূর্ত কিংবা তাত্ক্ষণিক নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির নেতাদের উৎসাহে পরিকল্পিত ঘটনা।’

 

এসএম রশিদ: লেখক