[ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী কর্মী সুহাসিনী দাস (মৃত্যু ২০০৯) ১৯৪৬ সালের অক্টোবরে নোয়াখালীতে সহিংতায় বিধ্বস্ত এলাকায় ছুটে গিয়েছিলেন আক্রান্তদের সেবা ও পুনর্বাসনের কাজে। নোয়াখালীতে অবস্থানকালে তিনি প্রতিদিনের কর্মকাণ্ড এবং প্রত্যক্ষ করা বিভিন্ন ঘটনা তার ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। এ ডায়েরি ১৯৯৯ সালে সুহাসিনী দাস সংবর্ধনা গ্রন্থে প্রথমবার প্রকাশিত হয়। এরপর দীপংকর মোহান্তের সম্পাদনায় ‘নোয়াখালী: ১৯৪৬’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। বইটি প্রকাশ করেছে সাহিত্য প্রকাশ। ‘নোয়াখালী: ১৯৪৬’ থেকে সুহাসিনী দাসের ডায়েরির কয়েকটি দিনের বিবরণী এখানে সংকলিত হলো]

 

২৩ ডিসেম্বর ১৯৪৬

সকাল ১০টার গাড়িতে সরলাবালা দেব, কিরণশশী দেব, লীলা দাসগুপ্ত ও আমি এই চারজন নোয়াখালী যাত্রার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইলাম। কুলাউড়া আসিয়া গাড়ি না পাওয়ায় সেইদিন কর্ম্মী ভবনে সারাদিন রহিলাম। রাত্রে খাওয়ার পর আটটার গাড়িতে গোপাল দাসকে সঙ্গে নিয়া আমরা রওয়ানা হই। ভোর ৭টায় চৌমুহানী পৌঁছাইব। সেইখানে গিয়া যোগেন বাবুর বাড়ীতে আমাদের থাকিবার কথা আছে।

 

২৪ ডিসেম্বর

(চৌমুহানী-রামগঞ্জ মধুপুর-শ্রীরামপুর)

ভোরে আমরা যোগেন্দ্র মজুমদারের বাড়িতে উঠিলাম—নিকুঞ্জদা, নৃপেন বসু, ননীদি তাহাদের সেইখানে পাইলাম। ননীদি (লাবণ্য লতা চন্দ) নৃপেন বসু তাহাদের সঙ্গে কথাবার্তা হইল। ননীদি আমাদের এইখান হইতে কিছুদিন কাজ করিতে বলিলেন। সকালের খাওয়া সারিয়া আমরা রামগঞ্জ রওয়ানা হইলাম। যোগেন বাবুর বাড়ীতে আসিয়া ঢাকার আরো কয়েকজন কর্ম্মীর সঙ্গে দেখা হইল। আমরা একই সঙ্গে রামগঞ্জ রওয়ানা হইলাম। বিভাবতী দাশগুপ্তা, লাবণ্যপ্রভা দত্ত, আরো কয়েকজন কর্ম্মী ছিলেন। রামগঞ্জ হইতে মধুপুর এক মাইল—মধুপুরে পৌঁছিয়া আমরা শ্রযুক্তা লীলা রায় (নাগ) পরিচালিত ন্যাশনাল সার্ভিস কোরের একটি কেম্প আছে সেইখানেই অতিথি হইলাম। এইখানে ১০১২ জন ছেলে ও মেয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরিয়া কাজ করিতেছেন। এইখানে ডাক্তার জে. এম দাশগুপ্ত পরিচালিত একটি হাসপাতাল আছে। দুপুরে খাওয়ার পর আমরা এক মাইল হাঁটিয়া শ্রীরামপুর গান্ধীজির কেম্পে পৌঁছাইলাম। রাস্তার দুই পাশে পোড়া বাড়িগুলি দেখিতে দেখিতে শ্রীরামপুর গেলাম। সেইখানে ‘রাজবাড়ি’ নামে পরিচিত একটি অর্ধদগ্ধ বাড়িতে গান্ধীজির কেম্প খোলা হইয়াছে। বাড়ির বাহিরে একটি ধ্বংসগ্রস্ত দালানে মিলিটারি প্রহরী ও সাংবাদিকদের কেম্প। একখানি গৃহে খাট পাতিয়া গান্ধীজির শয়নকক্ষ ও পাশেই চালাঘর করিয়া সাধারণভাবে অফিসের কাগজপত্র রাখা হইয়াছে। অন্য একটি ঘরে অধ্যাপক নির্ম্মল বসু ও পরশুরাম থাকেন। আজ গান্ধীজির প্রার্থনা সভায় প্রায় ৫০০ লোক সমবেত হইয়াছিল। প্রার্থনার শেষে গান্ধীজি বেড়াইতে বাহির হইলেন—আমরা ফিরিয়া আসিলাম। সুচেতা কৃপালনী ও আভা গান্ধীর সহিত আলোচনা হইল।

 

২৫ ডিসেম্বর

কাজিরখিল-শ্রীরামপুর

সকালে আমরা কাজিরখিল খাদি প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রে রওয়ানা হইলাম। যাওয়ার পথেই শ্রীযুক্ত সতীশ দাসগুপ্তের সঙ্গে দেখা হইল। কাজিরখিল গ্রামে সতীশ বাবু তাহাদের কেন্দ্রে পরিদর্শনে যাইতেছিলেন। এই কেন্দ্র কাশী পণ্ডিতের বাড়িতে স্থাপিত হইয়াছে। কাশী পণ্ডিত ও তার দুই ছেলেকে কাটিয়া ফেলিয়াছে দাঙ্গার সময়। এই কেন্দ্রটি গান্ধীজির প্রধান অফিস বলা হয়। হেমপ্রভা দাসগুপ্তের সঙ্গে আমাদের আলাপ হইল। গান্ধীজির পরিকল্পনা এবং নোয়াখালীর অবস্থান তিনি বিবৃত (ব্যাখ্যা) করিলেন। সর্দ্দার অজিত সিংহের পরিচালনায় ২০ জন শিখ কর্মী কাজিরখিলে থাকেন। চারু চৌধুরীর সঙ্গে অনেকক্ষণ আলাপ হইল, পরে আমরা মধুপুরে ফিরিয়া আসিলাম। দুপুরের খাওয়ার পর আমরা শ্রীরামপুর রওয়ানা হইলাম। শ্রীরামপুর গ্রামটা ঘুরিয়া পরে পাঁচটায় আমরা প্রার্থনা সভায় যোগ দিলাম। প্রার্থনার পর গান্ধীজি বড়দিন উপলক্ষে বক্তৃতা করিলেন। সকল ধর্মই সমান—সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাপোষণ করিতে গান্ধীজি বলিলেন। আমাদের সহযাত্রী লীলা দাসগুপ্ত প্রার্থনা সভায় একটা গান করিয়াছিলেন। পরে গান্ধীজির সহিত সাক্ষাতের অভিলাষ জানাইলাম। প্রার্থনার পর বেড়াইতে যাইবার সময় গান্ধীজি আমাদের আহ্বান জানাইলেন। আমরাও সঙ্গে সঙ্গে চলিলাম। আভা-গান্ধীর মধ্যস্থতায় গান্ধীজির সঙ্গে কথা হইল। আজকের প্রার্থনা সভায় বক্তৃতা হূদয়ঙ্গম করিতে এবং আমরা গ্রামে গিয়া কাজ করিব শুনিয়া গান্ধীজি আনন্দ প্রকাশ করিলেন। নির্ম্মল বাবুর সঙ্গে এই সম্পর্কে আলাপ করিতে বলিলেন। নির্ম্মল বাবুর সঙ্গে বিস্তৃতভাবে আলাপ হইল। গান্ধীজির পরিকল্পনা ও চিন্তাধারা সম্পর্কে বিস্তৃতভাবে আলোচনা করিলেন। নির্ম্মল বাবু বলিলেন গঠনমূলক কর্মীদের স্ব-স্ব কেন্দ্রেই কাজ করা উচিত। নোয়াখালীতে যাহারা আসিতে চাহেন, তাহারা যতদিন প্রয়োজন ততদিন থাকিতে হইবে। এই সংকল্প নিয়া আসিতে বলিলেন। রাত্রি আটটায় আমরা মধুপুর ফিরিয়া আসিলাম।