১৯৪৬ সালের ১০
অক্টোবর কোজাগরী
পূর্ণিমার রাতে
নোয়াখালীর দাঙ্গার
সূত্রপাত ঘটার
পরপর এর
সংবাদ কোনো
দৈনিক পত্রিকায়
প্রকাশ পেয়েছিল
বলে পরিলক্ষিত
হয় না।
তখন নোয়াখালী
জেলার সঙ্গে
ঢাকা কি
কলকাতার যাতায়াত
ব্যবস্থা চরম
দুর্গম ও
তাত্ক্ষণিক যোগাযোগের
উপায় সীমিত
ছিল বটে,
তবে সম্ভবত
প্রশাসনযন্ত্রের অনীহা
বা দ্বিধাও
এ-সংক্রান্ত
সংবাদ প্রকাশ্যে
আসার বিলম্বের
অন্যতম কারণ।
বাংলার প্রাদেশিক
সরকার কর্তৃক
এ সম্পর্কে
১৪ অক্টোবর
প্রেসনোট প্রকাশের
পরই তার
ওপর ভিত্তি
করে মুখ্যত
খবর প্রকাশ
শুরু হয়।
ওই প্রেসনোটের
ভাষ্য নিয়ে
ভারতীয় কমিউনিস্ট
পার্টি পরিচালিত
দৈনিক স্বাধীনতায়
১৫ অক্টোবর
প্রকাশিত সংবাদের
শিরোনাম ছিল:
‘নোয়াখালীতে
আটটি থানায়
ব্যাপক অরাজকতা/সশস্ত্র
গুণ্ডা দল
কর্তৃক লুটতরাজ,
হত্যাকাণ্ড ও
অগ্নিসংযোগ, উপদ্রুত
অঞ্চলে মিলিটারি
ও সশস্ত্র
পুলিশ প্রেরণ।’
সংবাদের ভেতরের
বয়ানের অংশবিশেষ
এমন: ‘বাঙ্গালা
সরকারের একটি
প্রেসনোটে বলা
হইয়াছে যে,
নোয়াখালী জেলায়
গুরুতর অরাজকতার
প্রাথমিক রিপোর্ট
গভর্নমেন্ট পাইয়াছেন।
বিস্তৃত রিপোর্ট
চাহিয়া পাঠানো
হইয়াছে। বৃহৎ
একটি সশস্ত্র
পুলিশ বাহিনী
নোয়াখালী জেলায়
পাঠানো হইয়াছে
এবং মিলিটারিকেও
আহ্বান করা
হইয়াছে। সরবরাহ
সচিব মি.
আবদুল গফরান
মঙ্গলবার চট্টগ্রাম
মেইলে নোয়াখালী
যাইতেছেন।’ অমৃতবাজার
পত্রিকায় একই
দিন লেখা
হয়: ‘Riotious mobs with deadly
weapons are raiding villages and looting, murder and arson are continuing...on
a very large scale...’ কাকতালীয়
কিনা জানা
নেই, তবে
ওই প্রেসনোট
প্রকাশের পরদিনই
জওহরলাল নেহরু
লর্ড ওয়াভেলকে
একটি চিঠিতে
নোয়াখালী দাঙ্গার
পরিপ্রেক্ষিতে নিজের
ক্ষোভের কথা
লিখেছিলেন। একই
দিন ওয়াভেল
তার দিনলিপিতেও
একই প্রসঙ্গের
উল্লেখ করেছেন।
প্রখ্যাত সাংবাদিক
শংকর ঘোষের
বয়ানে পাওয়া
এ তথ্য
দুটি মেলালে
মনে হতে
পারে, এ
দুই কর্তাব্যক্তিও
নোয়াখালী দাঙ্গার
খবর আদতে
পেয়েছিলেন বিলম্বে—বাংলা
সরকারের ‘প্রাথমিক’
প্রেসনোট মারফত।
সেজন্য প্রশ্ন
উঠতে পারে,
অন্য কোনো
সূত্রই কি
তাদের আগেভাগে
খবরটা জানাতে
পারেনি?
পরদিন ১৬
অক্টোবর স্বাধীনতায়
নোয়াখালী দাঙ্গার
পরিপ্রেক্ষিতে ‘নোয়াখালীকে
বাঁচান’ শিরোনামে
একটি মর্মস্পর্শী
সম্পাদকীয়ও ছাপা
হয়: ‘নোয়াখালীর
ভয়াবহ ঘটনাবলির
সংবাদে সমস্ত
বাংলাদেশ শিহরিয়া
উঠিয়াছে। ব্যাপক
গ্রামাঞ্চলে হাজার
হাজার শান্তিপ্রিয়
পল্লীবাসীর জীবন
দুর্বহ হইয়া
উঠিয়াছে। খুন,
জখম, লুট
প্রভৃতি কোনো
দুষ্কর্মই বাকি
নাই। পাশবিক
জঘন্যতার এই
সব ব্যাপারে
অনেকে হয়তো
ক্রুদ্ধ হইয়া
প্রতিশোধের জন্য
গুমরিয়া উঠিতেছেন,
আবার অনেকে
স্বীয় সম্প্রদায়ের
দুষ্কার্যে লজ্জা
ও দুঃখ
প্রকাশ করিতেছেন।
এই দুইটির
কোনোটিতেই কাজ
হইবে না।
শান্তিকামী নেতাদের
আজ হাঙ্গামার
এই সময়কার
মূল প্ররোচকদের
খুঁজিয়া বাহির
করিয়া শাস্তি
দিবার ব্যবস্থা
করিতে হইবে।’
অমৃতবাজার ও
স্বাধীনতার উল্টো
ভাষ্য আবার
দেয়া হয়
মুসলিম লীগপন্থী
দৈনিক ‘মর্নিং
নিউজ’-এ।
সেখানে নোয়াখালী
দাঙ্গাকে নিছক
‘স্থানীয়
হাঙ্গামা’ বলার
পাশাপাশি এ
অভিযোগও তোলা
হয় যে
‘হিন্দু’
পরিচালিত পত্রিকাগুলো
একে অতিরঞ্জিত
করে দেখাচ্ছে।
স্বাধীনতার পাতায়
১৭ অক্টোবর
‘নোয়াখালীতে
অরাজকতা: কমিউনিস্ট
নেতাদের আবেদন’
শিরোনামে প্রকাশ
পায় নোয়াখালী
দাঙ্গা সম্পর্কে
কমিউনিস্ট নেতাদের
বক্তব্য: ‘ভারতের
কমিউনিস্ট পার্টির
বাংলা কমিটির
পক্ষ হইতে
কমরেড মুজফফর
আহমদ ও
কমরেড ভবানী
সেন নিম্নলিখিত
আবেদন প্রকাশ
করিয়াছেন...নোয়াখালীর
যে অসহায়
জনসাধারণ উন্মত্ত
জনতার হাতে
অবর্ণনীয় অত্যাচার
সহ্য করিতেছেন
তাহাদের এখনই
সাহায্যের প্রয়োজন।
যে সকল
পুরুষ এখনও
উন্মত্ত জনতার
কবলে আটক
হইয়া আছেন,
বিশেষ করিয়া
মুসলিম লীগ
নেতাদের সেই
সকল আক্রান্ত
গ্রামে গিয়া
তাহাদের উদ্ধার
করিবার দায়িত্ব
গ্রহণ করিতে
হইবে। কারণ
তাঁহাদের হাতেই
মন্ত্রিত্বের ক্ষমতা
এবং যেখানে
গোলযোগ ঘটিতেছে
সেই স্থানের
অধিকাংশ জনসাধারণ
তাহাদের সংগঠনের
অনুগামী। জনসাধারণের
যে অংশের
তাহারা প্রতিনিধিত্ব
করেন তাহাদের
কলঙ্কের হাত
হইতে রক্ষার
জন্যই মন্ত্রীদের
এই দায়িত্ব
পালন করা
দরকার। আমরা
বিশ্বাস করি,
নোয়াখালীর বিধ্বস্ত
এলাকার ভিতরে
এবং আশেপাশে
এমন শত
শত মুসলমান
কৃষক আছেন
যাহাদের ঐ
এলাকায় হিন্দু
ভাইদের সাহায্য
করিবার ও
সমস্ত নর-নারীকে
উদ্ধার করিবার
মতো আগ্রহ
ও সাহস
আছে। আমরা
তাহাদের নিকট
বিপন্নদের সাহায্য
করিতে এবং
মরণপণ সাহসের
সহিত দুর্বৃত্তদের
নিবৃত্ত করিতে
অনুরোধ করিতেছি।
নোয়াখালীতে যাহা
ঘটিয়াছে তাহা
বাংলার হিন্দু
ও মুসলমান
উভয়ের পক্ষেই
দুর্দৈব এবং
উভয়ের পক্ষেই
কলঙ্কজনক। নোয়াখালীর
হত্যাকাণ্ডের ভিতর
দিয়া বিদেশী
শাসনের ফল
সবচেয়ে ঘৃণ্যভাবে
প্রকাশ পাইয়াছে।’
১৮ অক্টোবর
জাতীয়তাবাদী ঘরানার
‘যুগান্তর’
দৈনিকে নোয়াখালী
দাঙ্গার খবরটি
বড় আকারে
এবং দুর্গত
এলাকার মানচিত্রসমেত
ছাপা হয়।
মূল হেডিং
‘নোয়াখালীতে
পাঁচ সহস্রাধিক
নিহত ও
অর্ধলক্ষাধিক বিপন্ন’র
অধীনে ছিল
একাধিক উপশিরোনাম:
‘চাঁদপুর
শহরের দিকে
উন্মত্ত আক্রমণকারী
দল’, ‘মহকুমার
সর্বত্র ব্যাপক
হত্যাকাণ্ড ও
গুণ্ডামী’, ‘কংগ্রেসী
নেতৃবৃন্দের বিমানযোগে
উপদ্রুত অঞ্চল
পরিদর্শনের ব্যবস্থা’
ইত্যাদি। মূল
খবরের পাশাপাশি
প্রকাশ পায়
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ
সংবাদ, ‘নোয়াখালীতে
হত্যা অবাধ
গুণ্ডামী: কেন্দ্রীয়
সরকারকে হস্তক্ষেপ
করিতে অনুরোধ,
শরত্চন্দ্রের নিকট
শ্যামাপ্রসাদের তার’।
সংবাদ সংস্থা
এপির বরাত
দিয়ে ওই
একই তারিখে
স্বাধীনতা জানায়,
নোয়াখালী থেকে
‘হাজার
হাজার লোকের
পলায়ন’ সত্ত্বেও
হাতে এসেছে
শুধু ‘বাঙ্গলা
সরকারের মামুলী
প্রেসনোট’: ‘সরকারি
প্রেসনোটে বলা
হয়, হাঙ্গামা
এখন উত্তর
নোয়াখালী হইতে
ত্রিপুরা জেলার
দক্ষিণ-পশ্চিম
এলাকার হাজীগঞ্জ,
চাঁদপুর ও
লাকসাম অঞ্চলের
দিকে ছড়াইয়া
যাইতেছে। ঐ
সকল অঞ্চলে
অতিরিক্ত সৈন্য
ও পুলিস
পাঠানো হইতেছে
এবং হাঙ্গামা
সীমাবদ্ধ ও
বন্ধ করিবার
জন্য প্রয়োজনীয়
সমস্ত ব্যবস্থা
অবিলম্বিত হইয়াছে।’
বোঝা যায়,
সরকারি সংবাদভাষ্যটি
হুবহু ছাপলেও
নিজেদের দেয়া
শিরোনামে এর
সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে
খোঁচা দিতে
ছাড়েননি স্বাধীনতা
কর্তৃপক্ষ—‘মামুলী
প্রেসনোট’ শব্দবন্ধ
এরই ইঙ্গিতবাহী।
দৈনিক সংবাদপত্রের
পাশাপাশি ওই
সময়ের নানা
সাপ্তাহিক-পাক্ষিক-মাসিক
সাময়িক পত্রেও
নোয়াখালী দাঙ্গা
নিয়ে বহু
সংবাদভাষ্য ও
মতামতধর্মী আলোচনা
প্রকাশ পেয়েছিল।
সঙ্গে পাঠকদের
চিঠিপত্রও। অবশ্য
তাতে ঘটনার
বিবরণ কিংবা
বিশ্লেষণের পাশাপাশি
কিছু বিষয়ে
তর্ক তোলারও
প্রবণতা দেখা
যায়। সজনীকান্ত
দাস সম্পাদিত
মাসিক ‘শনিবারের
চিঠি’র
১৩৫৩ বাংলা
সনের অগ্রহায়ণ
সংখ্যায় প্রকাশিত
একটি চিঠির
কথা উদাহরণ
হিসেবে তুলে
ধরা যাক।
‘সংবাদ
সাহিত্য’ বিভাগে
নাম প্রকাশে
অনিচ্ছুক নোয়াখালীর
দুর্গত এলাকায়
স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে
কাজ করা
জনৈক ব্যক্তি
একটি কড়া
চিঠিতে ‘শনিবারের
চিঠি’র
কার্তিক সংখ্যায়
প্রকাশিত নোয়াখালী
দাঙ্গাবিষয়ক বিবরণীর
সঙ্গে দ্বিমত
প্রকাশ করেছিলেন।
সম্পাদকের উল্লেখ
করা একাধিক
ব্যক্তি নোয়াখালীর
দুর্গত অঞ্চলে
সেভাবে তত্পর
ছিলেন না
দাবি করে
ওই পত্রকার
লেখেন: ‘...দু-একটা
জায়গায় কিছু
সত্যের অপলাপ
না হলেও
বিকৃতি থাকায়
এই চিঠিখানা
লিখছি।...শ্রীযুক্তা
কৃপালনীর [সুচেতা
কৃপালিনী] কথা
আমাদের ভোলা
শক্ত হবে,
এ কথা
সত্যি। কিন্তু
বীণা দাসকেও
আপনি তার
পঙিক্ততে স্থান
দিলেন কোন
সংবাদের ওপর
ভিত্তি করে?
শ্রীযুক্তা দাস
দু-একদিন
ঘুরে এসে
কাগজে বিবৃতি
দিয়েছেন। তাই
বলে আপনার
তাকে বড়
করা উচিত
হয়নি। লীলা
রায়ও উল্লেখযোগ্য
কিছু করেননি।...যারা
নেতৃত্ব বজায়
রাখতে, জনসাধারণকে
ধোঁকা দিতে,
শুধু মজা
দেখতে নোয়াখালী
বেড়িয়ে এসে
কাগজে বিবৃতি
দিয়েছেন সবজান্তার
ভূমিকা নিয়ে,
তাদের মুখোশ
অন্তত আপনি
খুলে দেবেন
আশা ছিল।
বহু নেতা
ও নেত্রীর
ব্যবসায় লালবাতি
জ্বলেছে, নোয়াখালীর
পর আবার
অনেকে উত্তীর্ণ
হয়েছেন এই
কঠিন পরীক্ষায়।...’
বসুমতী পত্রিকার
‘সাময়িক
প্রসঙ্গ’ বিভাগে
অবশ্য নোয়াখালীতে
সুচেতা কৃপালনী
প্রশংসনীয় ভূমিকা
রেখেছেন এমন
খবর মেলে।
‘বসুমতী’র
১৩৫৩-এর
কার্তিক সংখ্যায়
‘পূর্ববঙ্গের
অবস্থা’ শীর্ষক
সংবাদে লেখা
হয়েছে: ‘শ্রীযুক্ত
সুচেতা কৃপালনী
অপহূতা হিন্দু
নারীদের উদ্ধার-সাধন
কার্যে আত্মনিয়োগ
করিয়াছেন। তিনি
এক বিবৃতিতে
বলিয়াছেন, সরকারের
কর্তব্য পালন
চেষ্টার শৈথিল্য
শোচনীয়; এখনও
বহুসংখ্যক দুর্বৃত্তকে
গ্রেফতার করা
হয় নাই
এবং তাহারা
এখনও উপদ্রব
করিতেছে।...এখনও
লোকের ধন-প্রাণ-মান
নিরাপদ করা
সরকারের দ্বারা
সম্ভব হয়
নাই।...’ উল্লেখ্য,
নোয়াখালী দাঙ্গা
নিয়ে একাধিক
সংবাদ-মন্তব্য
প্রকাশ পেতে
দেখা যায়
‘বসুমতী’র
পাতায়। পূর্বোক্ত
সংখ্যায় তীব্র
ভাষায় দাঙ্গার
নেপথ্যে ইংরেজ
কর্তৃপক্ষ ও
বাংলার প্রাদেশিক
সরকারের দায়
নিয়েও মন্তব্য
করা হয়েছে
একটি দীর্ঘ
প্রতিবেদনে: ‘...বাঙ্গলার
গর্ভনর ও
প্রধানমন্ত্রীর এখনও
চেষ্টা চলিতেছে
এই ভীষণ
নারকীয় তাণ্ডবলীলাকে
লোকচক্ষে অতিশয়
লঘু প্রতিপন্ন
করিবার।...১৯৩৫
খৃষ্টাব্দের প্রাদেশিক
স্বায়ত্ত শাসন
আইনের জোরেই
ইহা সম্ভব
হইয়াছে। প্রাদেশিক
ব্যাপারে একমাত্র
বড়লাটই হস্তক্ষেপ
করিতে পারিবেন।
তিনি নির্বাক
থাকিলেন। গর্ভনর
সোজাসুজি বৃটিশ
পার্লামেন্টের সহিত
বোঝাপড়া করিলেন।
তাহা হইলে
অন্তর্বর্তী সরকারের
সদস্যদের ক্ষমতা
কী এবং
কতটুকু? কেন্দ্রের
সদস্যদের প্রাদেশিক
ব্যাপারে হস্তক্ষেপ
করিবার অধিকার
নাই। কিন্তু
বড়লাটের তো
সে ক্ষমতা
আছে। তবু
তিনি সে
ক্ষমতা ব্যবহার
করিলেন না
কেন?...ওদিকে
নোয়াখালী অঞ্চলে
গুণ্ডাদের বীভৎস
লীলা চলিতেছে,
এদিকে প্রধানমন্ত্রী
ঘোষণা করিতেছেন—“অল
কোয়াইট অন
নোয়াখালী ফ্রন্ট”।
লীগদলীয় সংবাদপত্রে
লীগ সচিবসঙ্ঘের
কার্যের ভূয়সী
প্রশংসা বাহির
হইয়াছে। কিন্তু
স্টেটসম্যান পত্রিকার
স্টাফ রিপোর্টার
বলিয়াছেন, গভর্নমেন্ট
নোয়াখালী ও
ত্রিপুরার অরাজকতা
দমন সম্পর্কে
অসমর্থ হইয়াছেন।
তাহাকে কোনো
বিধ্বস্ত অঞ্চলের
একজন নেতৃস্থানীয়
লীগদলীয় মুসলমান
বলিয়াছেন, “সমস্ত
অশান্তি ও
অরাজকতা দমন
করিবার একমাত্র
উপায় ঐ
জেলার শাসনভার
সামরিক কর্তৃপক্ষের
ওপর ছাড়িয়া
দেওয়া।”...মিস্টার
সুরাবর্দি ইহার
কোনো উত্তর
দেন নাই।
কারণ উত্তর
দিবার মতো
তাহার কিছুই
সম্বল নাই।
তবে সেই
ব্যক্তির নাম
নিশ্চয়ই লীগ-তালিকায়
এনিমি নম্বর
ওয়ান হইয়া
গিয়াছে!...’
বসুমতী অবশ্য
সংবাদভাষ্যের পাশাপাশি
বৃহত্তর প্রেক্ষিতে
দাঙ্গা প্রসঙ্গে
গভীরতর বিশ্লেষণও
ছেপেছে। ১৩৫৩-এর
অগ্রহায়ণ সংখ্যায়
প্রকাশিত তরুণ
চট্টোপাধ্যায়ের ‘সাম্প্রদায়িক
দুর্যোগের নানাদিক’
নিবন্ধে তাত্ক্ষণিক
ক্ষোভের বাইরে
গিয়ে সংকটকে
তলিয়ে দেখার
প্রচেষ্টা লভ্য:
‘সাধারণ
মুসলমানরা লীগের
অনুগামী হয়ে
নোয়াখালীতে নৃশংস
ব্যাপার করেছে
সত্যি কথা।
কিন্তু প্রশ্ন
হচ্ছে, খালি
ধর্মের দোহাই
দিয়েই কি
তাদের লীগনেতারা
এই কাজ
করাতে পেরেছেন?...শাসন
ব্যাপারের সঙ্গে
ধর্মের যে
কোনো সম্পর্ক
নেই এটা
তারা সাম্প্রদায়িক
নির্বাচন ব্যবস্থার
কল্যাণে এখনো
জানে না।...জমিদার
অত্যাচার করে
জমিদার হিসেবে,
মিল মালিক
শোষণ করে
পুঁজিপতি হিসেবে।
আর ব্রিটিশরাজের
কোটাল হিসেবে
দুজনেই তারা
লুটের মাল
ব্রিটিশের হাতে
তুলে দেয়।...এমনকি
টাটায় ধর্মঘট
হলে টাটা
এবং জিন্নাহ
একসঙ্গে বসে
হিন্দু ও
মুসলমান মজুরদের
উপযুক্ত শিক্ষা
দেবার জন্যে
শলাপরামর্শ করেন।...’
ভারতবর্ষ পত্রিকার
অগ্রহায়ণ ১৩৫৩
সংখ্যার ‘সাময়িকী’
বিভাগে সংবাদভাষ্য
নয়, নোয়াখালী
দাঙ্গা বিষয়ে
বেশ কয়েকটি
টুকরো খবর
ছাপা হয়েছিল।
নোয়াখালীর দাঙ্গা-পরবর্তী
পরিস্থিতিতে খাদ্যাভাবের
শঙ্কা নিয়ে
‘বাঙ্গালার
খাদ্যাভাব’ শীর্ষক
সংবাদে লেখা
হয়, ‘বর্তমান
দাঙ্গাহাঙ্গামার ফলে
বাঙ্গালা দেশের
সর্বত্র ভীষণ
খাদ্যাভাব দেখা
দিয়াছে। বহু
জেলায় চাউল
৩০-৪০
টাকা মণদরে
বিক্রয় হইতেছে।
যানবাহন চলাচল
বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায়
এক স্থানের
খাদ্য অন্য
স্থানে লইয়া
যাওয়া যায়
না। ওদিকে
ধান কাটার
লোকের অভাবে
মাঠে পাকা
ধান নষ্ট
হইয়া যাইতেছে।
বর্তমান ভ্রাতৃদ্রোহী
সংগ্রাম বন্ধ
না হইলে
বাঙ্গালার বহু
লোক খাদ্যাভাবে
মারা যাইবে।...’
নোয়াখালী দাঙ্গা
নিয়ে একাধিক
সংবাদের ভুল
ব্যাখ্যাও হয়েছে।
১৯৪৭-এর
২ মার্চ
নোয়াখালী ত্যাগ
করার পর
দিল্লিতে বসে
৭ এপ্রিল
তারিখে মহাত্মা
গান্ধী হিন্দু
সম্প্রদায়ের সদস্যদের
‘হয়
নোয়াখালী ছাড়ো,
নয় তো
মরো’ এমন
হুঁশিয়ারি দিয়েছেন
বলে ৮
এপ্রিল নিউইয়র্ক
টাইমসে খবর
বেরোয় ‘Quit
Noakhali Or Die, Gandhi Warns Hindus’ শিরোনামে।
গান্ধীর বিরুদ্ধপক্ষ
এখনো খবরটি
নিয়ে তত্পর।
৩১ জানুয়ারি
নোয়াখালীতে তিনিই
বলেছিলেন, ‘ভীরুতা
প্রদর্শন অপেক্ষা
বরং হিংসার
পথ গ্রহণীয়’।
আত্মরক্ষার সপক্ষে
বলা সেই
বয়ান দুই
মাসের মাথায়
এতটা পাল্টে
যাবে, এমনটা
মেনে নেয়া
মুশকিল। তবে
এটা ঠিক,
গান্ধীর নোয়াখালী
যাত্রা সাংবাদিকদের
কাছে যতটা
গুরুত্ব পেয়েছিল,
তার শান্তি
কামনার মর্মবাণী
ততটা পায়নি।
গান্ধীর নোয়াখালী
যাত্রার আদৌ
শেষমেশ কোনো
গুরুত্ব আছে
কিনা তা
নিয়ে তার
সফরসঙ্গী সাংবাদিকদেরও
মনে দ্বিধা
ছিল। সমসাময়িক
পত্রপত্রিকায় তাই
নোয়াখালীগামী গান্ধীর
‘স্পিরিট’
তুলে ধরার
চেয়ে তাকে
ঘিরে প্রচ্ছন্ন
নির্মম সমালোচনাই
শেষমেশ অধিকতর
ঠাঁই পেয়েছে।
শাকের আনোয়ার: প্রাবন্ধিক





