ভূমিকা
বাঙালি
আসলে কী?
আমাদের ঘোলাটে
ইতিহাস, আমাদের
সিজোফ্রেনিক আবেগ
আর আমাদের
তীব্র আত্মশ্লাঘার
আড়ালে আমরা
আসলে কারা?
যাবতীয় স্টেরিওটাইপের
আবরণ সরিয়ে
বাঙালি ও
তার স্বদেশ
ভাবনার মূলে
কী? কালের
গতি স্তব্ধ
করে দেয়া
কোন মুহূর্তগুলোকে
দিয়ে বাঙালির
সংজ্ঞা দেয়া
সম্ভব?
উত্তর খুঁজতে
হলে আমাদের
ইতিহাসের দিকে
তাকাতে হবে।
কিন্তু শুধু
ইতিহাসের পথে
অবিচল থাকলে
সব উত্তর
মিলবে না।
এর উত্তর
লুকিয়ে আছে
আমাদের চেতনাপ্রবাহে।
বিপুল ইতিহাস,
গভীর ট্র্যাজেডি
আর অপরিসীম
প্রত্যাশার মাঝে
এক অনন্ত
পরীক্ষা যেন।
উত্তর খুঁজতেই
আমি লিখি—The Bengalis : A Portrait of a Community।
এই বই
অনেকটাই আমার
ব্যক্তিগত যাত্রাও
বটে। ইতিহাস,
রাজনীতি, সংঘাত,
সংস্কৃতি এবং
পূর্ব ও
পশ্চিমে ছড়িয়ে
থাকা দুই
বাংলায় আমাদের
স্বদেশভূমির কাহিনীতে
মিশে গিয়েছে
আমার নিজস্ব
অনেক গল্পও।
এই বই
পশ্চিমবঙ্গের, এই
বই পূর্ববঙ্গেরও।
ইংরেজ আমলের
পূর্ববঙ্গ, স্বাধীনতার
পরবর্তী পূর্ব
পাকিস্তান এবং
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের
পর জন্ম
নেয়া বাংলাদেশও
এ বইয়ে
সমান গুরুত্ব
পেয়েছে। শুধু
বাংলায় কথা
বলতে চেয়ে
লাখ লাখ
বাঙালির রক্ত
ঝরিয়ে জন্ম
নেয়া বাংলাদেশ
এ বইয়ের
অচ্ছেদ্য অঙ্গ।
কোটি কোটি
বাঙালির মতো
আমার ব্যক্তিগত
ইতিহাসও তো
এই দুই
বাংলাতেই ছড়িয়ে।
পূর্ব ও
পশ্চিম দুই
বঙ্গেই শিকড়
আমাদের।
এই বই
লিখতে গিয়ে
দেখলাম বাঙালির
গল্প আসলে
অলৌকিক সারল্য,
ভালোবাসা, আবেগ
আর স্বপ্নের
আলেয়ার মতো।
আমাদের গল্পে
তীব্র ঘৃণা,
নিশ্চিন্ত নিরাপত্তাহীনতার
সঙ্গেই গলা
জড়িয়ে আছে
নিকষিত হেমের
মতো প্রেম।
আমাদের ইতিহাসে
একদিকে যেমন
অতিকায় মহামানবের
কুসুমাস্তীর্ণ রাজপথ,
তেমনই নরকের
পূতিগন্ধময় কানাগলি।
এই মাটিতে
ধনকুবেরের সঙ্গেই
বাস হরিপদ
কেরানির, নিরন্ন
ভিখারির। শিক্ষার
আলোকশিখার নিচেই
নিরক্ষরতার অন্ধকার।
আমাদের ইতিহাস
চোখের পলকে
সম্রাটকে আছড়ে
ফেলেছে মাটিতে,
আবার সভ্যতার
ধ্বংসস্তূপেই জন্ম
নিয়েছে নতুন
প্রাণের বীজ।
এ বইয়ে
আমি গল্প
বলতে চেয়েছি
আমাদের, বাঙালিদের।
সেই গল্পে
আমাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা,
দুর্বলতা একই
সুতোয় বোনা।
আমাদের আকাশছোঁয়া
সাফল্যের পাশেই
রয়েছে ধ্বংসমুখী
কালসাপ। দেশভাগের
ইতিহাস তার
রক্তাক্ত সাক্ষী।
পার্টিশনের সময়
পরিস্থিতি এতটাই
ভয়ংকর হয়ে
ওঠে যে
স্বয়ং মহাত্মা
গান্ধীকে ১৯৪৬
সালের নভেম্বরে
কলকাতা থেকে
নোয়াখালী ছুটে
যেতে হয়েছিল।
কিন্তু ততদিনে
পুড়ে খাক
হয়ে গেছে
মানুষের বসতি,
জনপদ, জীবন-জীবিকা।
বাংলাদেশ বদ্বীপের
পূর্ব প্রান্তে
নোয়াখালীতে যখন
মহাত্মা মানুষের
ক্ষতবিক্ষত দেহমনে
সান্ত্বনার প্রলেপ
দিচ্ছেন, তখন
পাল্টা প্রতিশোধের
আগুনে জ্বলছে
পশ্চিমের বিহার।
স্বাধীনতা আন্দোলনের
শেষ পর্বে
এসে সাম্প্রদায়িক
অশান্তির আগুনে
জ্বলেপুড়ে শেষ
হয়ে যায়
বাংলা। সে
বছর আগস্টে
কলকাতাজুড়ে যে
ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক
দাঙ্গা হয়,
ইতিহাসবিদদের ভাষায়
সেই গ্রেট
ক্যালকাটা কিলিংয়ের
সমতুল হিংসার
ইতিহাস ভারতের
মতো দাঙ্গাবিধ্বস্ত
দেশেও বিরল।
আমাদের স্বভূমির
এ পূতিগন্ধময়
নরকে, আমাদের
তৈরি করা
আবর্জনার স্তুপে
যে ক’জন
অবাঙালি স্বেচ্ছায়
পা দিয়েছিলেন,
তাদের মধ্যে
অন্যতম হলেন
মোহনদাস করমচাঁদ
গান্ধী। একটা
সময় গান্ধীজি
নিজেকে বাঙালি
বলেও ঘোষণা
করেছিলেন। কিন্তু
জাত হিসেবে
বাঙালির মধ্যে
গান্ধীর প্রতি
যে ঘৃণা
ও অশ্রদ্ধা
জমা হয়ে
রয়েছে, তাতে
তা কতটা
কমেছিল জানি
না। হিন্দু
সাম্প্রদায়িকরা মনে
করেন, তিনি
স্বেচ্ছায় মুসলমানদের
প্রাপ্যের অধিক
দিয়েছেন। উল্টোদিকে
মুসলমানরা তাকে
হিন্দুত্ববাদী বলে
মনে করে।
আবার বাঙালিদের
একটা বড়
অংশ কংগ্রেসের
অভ্যন্তরে সুভাষচন্দ্র
বসুর ‘অসম্মান’-এর
জন্য গান্ধীকে
কোনোদিন ক্ষমা
করেনি। কংগ্রেসের
সভাপতি হিসেবে
অসময়ে সুভাষের
মেয়াদ শেষ
করে সে
জায়গায় নিজের
প্রিয়পাত্র জওহরলাল
নেহরুকে নিয়ে
আসার পেছনেও
গান্ধীর ‘চক্রান্ত’
দেখতে পায়
বাঙালি।
কিন্তু যখন
দেশের কেউ
এখানে আসার
কথা ভাবেননি,
তখন গান্ধীজিই
এসেছেন। জীবনের
উপান্তে এসে
হিংসা তাড়া
করে বেড়িয়েছে
গান্ধীকে। কলকাতা
থেকে নোয়াখালী
পৌঁছার আগেই
এ ভয়াবহ
হিংসার স্রোত
তার মন
ভেঙে দিয়েছিল।
কলকাতার আগুন
প্রথমে নোয়াখালী
ও তারপর
সেখান থেকে
ছড়িয়ে পড়ে
বিহারে। নোয়াখালীর
প্রতিশোধ নিতে
বিহারে হিন্দুরা
মুসলমানদের ওপর
হামলা করতে
শুরু করে।
১৯৪৬ সালের
৬ নভেম্বর
তিনি বিহারের
মানুষের মনের
পরিবর্তনের আশায়
অনশন শুরু
করেন। বিহারের
গণহত্যার প্রায়শ্চিত্ত।
কলকাতায় আসার
আগেই খাওয়া-দাওয়া
প্রায় বন্ধ
করে দিয়েছিলেন
গান্ধী।
কলকাতায় এসে
তা পরিণত
হলো আমরণ
অনশনে। বিহারিরা
তাদের ভুল
বুঝতে পেরে
নতুনভাবে সবকিছু
শুরু না
করা পর্যন্ত
গান্ধীর অনশন
চলবে। তার
আশঙ্কা ছিল,
‘বিহারি
হিন্দুদের এই
অপরাধের সূত্রে
কায়েদে আজম
জিন্নাহ ফের
তার কটাক্ষ
শুরু করবেন,
কংগ্রেস আসলে
হিন্দুদের দল।
তা তারা
মুখে যতই
বলুক না
কেন, তাদের
দলে শিখ,
মুসলিম, খ্রিষ্টান,
পার্সিরা সকলেই
সমান মর্যাদা
পায়, আসলে
কংগ্রেস হিন্দুদেরই
সংগঠন। বিহারি
হিন্দুদের তাদের
মুসলিম ভাইদের
সমান মর্যাদা
দিতেই হবে,
সংখ্যাগুরু হিন্দুদের
সঙ্গে তাদেরও
বেঁচে থাকার
সমান অধিকার
আছে সেটা
বুঝতে হবে।’
কংগ্রেস বা
মুসলিম লীগের
হিসাব অনুযায়ী
বিহারে মারা
গিয়েছিল ২
থেকে ৩০
হাজার মুসলমান।
নোয়াখালীর সংখ্যাটা
ঠিক কোথায়
গিয়ে পৌঁছয়
তা আজও
স্পষ্ট নয়।
কিন্তু সংখ্যার
হিসাব না
থাকলেও নোয়াখালীর
জবাবে বিহারে
যা ঘটেছিল
তার ভয়াবহতা
আঁচ করতে
পেরেছিলেন গান্ধী।
কংগ্রেসে নিজের
সহকর্মীদের কাছে
তার আকুল
প্রশ্ন ছিল,
‘মুসলিম
লিগের বিরুদ্ধে
যে সাম্প্রদায়িকতার
অভিযোগ এতদিন
কংগ্রেস করে
এসেছে, সেই
সাম্প্রদায়িকতাই কি
তবে আমাদের
একমাত্র উত্তর?
বিহারের ১৪
শতাংশ মুসলিম
জনতাকে নৃশংসভাবে
নিকেশ করাই
কি জাতীয়তাবাদ?’
দুর্ভাগ্যের বিষয়
উত্তরটা দুপক্ষেই
ছিল এক—‘হ্যাঁ’।
সে বছর
৫ নভেম্বর
নেহরুকে এক
চিঠিতে মহাত্মা
লিখেছিলেন, ‘আমার
অন্তরাত্মা বলছে,
এই অর্থহীন,
নির্মম গণহত্যার
সাক্ষী হিসেবে
আমি আর
বেঁচে থাকব
না। যা
দিনের আলোর
মতো স্পষ্ট
তা দেখেও
মানুষ যদি
তোমার কথা
না শোনে,
তাহলে বুঝতে
হবে তোমার
দিন শেষ
হয়েছে।’
প্রায় চার
মাস ধরে
দাঙ্গাবিধ্বস্ত বাংলার
বিভিন্ন প্রান্তে
ঘুরে বেড়ান
গান্ধীজি। কুষ্টিয়া,
শ্রীরামপুর, দত্তপাড়া—যেখানেই
তিনি গিয়েছেন,
তাকে গ্রাস
করেছে হতাশার
কালো ছায়া।
যে মানুষটি
আজীবন তার
জেদ ও
অনশনের অস্ত্রে
বহু কঠিন
সমস্যার সমাধান
করেছেন, তিনিই
অসহায় হয়ে
পড়েন তার
চারপাশের ধ্বংসের
চেহারা দেখে।
সে সময়
এক চিঠিতে
গান্ধী লিখেছেন,
‘চারপাশে
সাংঘাতিক অবিশ্বাস।
পুরনো বন্ধুত্বের
লেশমাত্র নেই।
গত ৬০
বছর ধরে
যে সত্য
ও অহিংসার
ওপর আমি
নিজের বিশ্বাসের
ভিত্তি স্থাপন
করেছিলাম, এই
অন্ধকারে তারা
আমাকে আর
পথ দেখাতে
পারছে না।’
সে সময়
তার সঙ্গী
ও জীবনীকার
নির্মল কুমার
বসু একটি
চিঠিতে লিখেছেন,
মাঝে মাঝেই
মহাত্মা নিজের
মনে হিন্দিতে
বিড়বিড় করতেন,
‘ম্যায়
কেয়া করুঁ।’
সোদপুর থেকে
গান্ধী কুষ্টিয়া
যাওয়ার ট্রেন
ধরেন। কুষ্টিয়া
পৌঁছে ভিড়
করে আসা
জনতার উদ্দেশে
কিছু কথা
বলেই তিনি
রওনা হন
পদ্মা নদীর
গোয়ালন্দ ঘাটে।
এসএস কিউই
নামের স্টিমারে
চড়ে তার
পরবর্তী গন্তব্য
ছিল নোয়াখালী।
স্টিমারের ডেকে
উঠে উপস্থিত
জনতার দিকে
চেয়ে তিনি
বলেন, ‘আসুন
প্রার্থনা করি,
বাংলার সমস্ত
হিন্দু ও
মুসলিম জনতার
হূদয় যেন
এক হয়ে
যায়। কিন্তু
তাদের হূদয়
এক হয়ে
যাওয়ার অর্থ
এই নয়
যে তারা
কোনো একটি
নির্দিষ্ট ধর্মকে
গ্রহণ করতে
বাধ্য হবে।’
আসুন। চলি
সেই সময়ের—এই
সময়ের—ভ্রমণে।
***
[সুদীপ
চক্রবর্ত্তীর The Bengalis : A Portrait of a Community (2017)
গ্রন্থ থেকে।
অনুবাদ: শর্মিষ্ঠা রায়]
গান্ধী ছিলেন
এক আশ্চর্য
মানুষ। গুজরাটি
এই বৃদ্ধ
তার যাত্রা
শুরু করেছিলেন
দক্ষিণ আফ্রিকা
থেকে, সাম্রাজ্যবাদী
শাসন থেকে
দেশকে মুক্ত
করার লক্ষ্যে
ভারতের জাতীয়তাবাদী
আন্দোলনের পুরোধা
মানুষটি তার
রাজনৈতিক জীবনে
সহ্য করেছেন
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী
উইনস্টন চার্চিলের
তীব্র, উদ্ধত
ঘৃণা। ভগ্নস্বাস্থ্য,
রোগজীর্ণ, ভগ্নমনোরথ
মানুষটি সে
সময় দাঁড়িয়েছিলেন
জীবনের উপান্তে।
তার এই
সফরের দুই
বছরের মধ্যে
এক হিন্দু
যুবকের হাতে
প্রাণ দিতে
হয় তাকে
(ইতিহাসের অপার
সৌভাগ্য, কোনো
মুসলিম ঘাতকের
হাতে গান্ধীর
হত্যা হলে,
ভারতে মুসলমানের
সংখ্যা অনেক
কম হতো)।
নোয়াখালীর শ্রীরামপুর
গ্রামে গান্ধী
পৌঁছার পর
ঘোষণা করেন,
‘আমি
সর্ব অর্থে
বাঙালি হয়ে
গেছি আজ।’
তার ওই
একটি কথা
দাঙ্গাপীড়িত মানুষের
মন জিতে
নিয়েছিল, গান্ধীর
সম্পর্কে অপার
শ্রদ্ধা আজও
দেখা যায়
ওই অঞ্চলে।
আসলে এর
পেছনে ছিল
সাহস। বাঙালি
না হয়েও
গান্ধীজি যা
দেখাতে পেরেছিলেন।
এমন সাহসের
অনেক নজির
অকথিত রয়ে
গেছে ইতিহাসে।
মুসলমান হয়ে
যারা হিন্দু
প্রতিবেশীকে ধর্ষণ,
নির্যাতন, হত্যার
হাত থেকে
রক্ষা করার
সাহস দেখিয়েছেন।
সেই অপরিচিত
মানুষগুলোই ঈশ্বরের
দূত হয়ে
নরকের অন্ধকারে
মানবতার প্রদীপ
শিখাটি জ্বালিয়ে
রাখতে পেরেছিলেন।
কলকাতায় গান্ধীর
উপস্থিতি দাঙ্গার
রক্তস্রোত অনেকটাই
থামাতে পেরেছিল।
পূর্ববঙ্গেও তার
উপস্থিতি ম্যাজিক
দেখিয়েছিল। কিন্তু
সেখানকার স্থানীয়
মুসলিম লিগের
নেতারা গান্ধীর
মুণ্ডুপাত করতে
ছাড়েননি। তাদের
অভিযোগ ছিল,
গান্ধী সেখানে
গিয়ে আদতে
মুসলিম ধর্মাবলম্বী
মানুষকে অপমান
করছেন, তাদের
সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে
জনমত তৈরি
করছেন। আমি
বুক ঠুকে
বলতে পারি
সেই ১৯৪৬-এর
অন্ধকার দিনগুলোতে
ওই গুজরাটি
যা করতে
পেরেছিলেন বাংলা
ও বাঙালির
জন্য, তা
সুভাষ বসুর
হেনস্থার জন্য
গান্ধীকে অহোরাত্র
অপমান করা
বাঙালি জাতি
সম্মিলিতভাবেও করতে
পারেনি। সেই
সময় অবশ্য
বাঙালি বলে
কেউ ছিল
না। ছিল
শুধু হিন্দু
ও মুসলমান,
ঘটনাচক্রে যারা
দুই পক্ষই
বাংলায় কথা
বলে। দুই
সম্প্রদায়ের মধ্যে
এতকালের ভাষা
ও সাংস্কৃতিক
সম্পর্ক যখন
ভেঙে খান
খান, তখন
লেংটি পরা
ওই বৃদ্ধ
একমনে, গভীর
অধ্যবসায়ে বাংলা
ভাষা শিখছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে
তার পারস্পরিক
শ্রদ্ধার সম্পর্ক,
রবীন্দ্রনাথের দেয়া
‘মহাত্মা’
নামটির সার্থকতা
প্রমাণ হয়ে
গিয়েছিল সেদিন।
তবে পূর্ববঙ্গে
পারলেও এ
ঘটনার এক
বছর পর
দেশের পশ্চিম
প্রান্তে পাঞ্জাবে
দেশভাগের ফলে
নরহত্যার আগুন
নেভাতে পারেননি
গান্ধীজি। বাংলায়
যেভাবে ধর্মান্ধতার
আগুন গিলে
খেয়েছিল দুই
প্রতিবেশীর পারস্পরিক
ভালোবাসা, বিশ্বাস
ও সাংস্কৃতিক
নৈকট্যকে, পাঞ্জাবের
ক্ষেত্রেও তাই
হয়েছিল। তবে
বাংলার ক্ষেত্রে
উচ্চবর্ণের হিন্দু
বাঙালি তার
আভিজাত্যের অহংকারে
অন্য সম্প্রদায়টিকে
দীর্ঘদিন ধরেই
দূরে ঠেলে
রেখেছিল। এক
বছর পর
ঠিক বাংলার
ধাঁচেই পাঞ্জাবের
সর্বত্র জ্বলে
উঠেছিল আগুন।
নিখুঁত পরিকল্পনা
করে দেশভাগের
দ্বিতীয় পর্বও
শুরু হলো।
বাংলা ও
বাঙালির দেখানো
পথেই।
****
পঞ্চাশ বছর
পর ইতিহাসের
কানাগলিতে আমি
সেই সংক্ষিপ্ত
সময়ের বাঙালি,
গান্ধীজিকে খুঁজতে
বেরিয়েছিলাম। সেকালের
পূর্ববঙ্গে সেই
দাঙ্গার দিনগুলোতে
তার উপস্থিতি
কতটা ছাপ
ফেলেছিল আমাদের
অতীতে, হিন্দু-মুসলমান
নির্বিশেষে বাঙালির
জীবনে, তা
খুঁজে দেখতে।
নিজের বসতভিটে
ছেড়ে আসার
বিচ্ছেদের যন্ত্রণা
কেবল আমাদের
মতো উদ্বাস্তুরাই
বুঝতে পারবেন।
আমার প্রথম
গন্তব্য ছিল
নোয়াখালীর প্রত্যন্ত
গ্রাম জয়াগের
গান্ধী আশ্রম।
আমি ও
আমার সহকর্মী
ফটোগ্রাফার শৈবাল
দাস ছিলাম
একটা অত্যন্ত
সাধারণ ডরমিটরিতে।
আশ্রমের সাদামাটা
দোতলা বাড়ির
পাশেই ডরমিটরিটা।
ছিমছাম বাড়িটায়
রয়েছে গান্ধীর
অসংখ্য স্যুভেনির,
তার নোয়াখালী
সফরের সাদাকালো
ছবি, ডাইনিং
হল, প্রার্থনা
কক্ষ আর
ঝর্ণাদি। ঝর্ণাধারা
চৌধুরী তার
মহিলা সহকর্মীদের
সঙ্গে আশ্রমের
মূল ভবনে
থাকেন। লাগোয়া
ডরমিটরিটায় আশ্রমের
পুরুষ কর্মীদের
ঠাঁই।
ঝর্ণাদির সঙ্গে
কথা বলছিলাম।
তিনি বললেন,
আমি যেন
একবার পিরজাদা
সৈয়দ গোলাম
হাক্কানি হুসেইনির
সঙ্গে দেখা
করি। নোয়াখালীর
এই গান্ধী
আশ্রমে এটা
একটা পুরনো
ঠাট্টা। আমি
একা নই,
এই আশ্রমে
আসা অনেক
আগন্তুককেই ঝর্ণাদি
একবার হাক্কানি
সাহেবের কাছে
পাঠান। হাক্কানি
সাহেবের বাবা
গোলাম সারওয়ার
হুসেইনি ছিলেন
অবিভক্ত বাংলার
বিধানসভার সদস্য।
নোয়াখালীতে দাঙ্গা
শুরু হওয়ার
প্রধান কারিগর
তিনিই। আমি
আগেই তার
কথা পড়েছিলাম,
অনেক গল্পও
শুনেছি।
কলকাতায় মুসলমানদের
ওপর ডাইরেক্ট
অ্যাকশনের ঠিক
পরেই কিন্তু
পূর্ববঙ্গে দাঙ্গা
শুরু হয়নি।
প্রথমে অল্প
কিছু হিন্দুকে
খুন করা
হয়, আরো
বেশকিছুকে মারধর
করা হয়।
শুরু হয়
মন্দিরে মরা
গরুর মাংস
রেখে মন্দির
অপবিত্র করার
কাজ। শুরু
হয় মন্দিরে
লুটতরাজ, বিগ্রহ
ভাঙা, চুরি।
এলাকার হিন্দু
বাড়িগুলোকে টার্গেট
করে হামলা
শুরু হয়।
ঘৃণার এ
রক্তাক্ত নদীতে
সাঁতার কেটেই
ক্ষমতার শিখরে
পৌঁছান হাক্কানি
সাহেবের বাবা।
নোয়াখালীর শ্যামপুর
গ্রামে দায়রা
শরিফ মাজারে
তাদের বিরাট
এস্টেট। একটা
সময় ওই
মাজার ছিল
এলাকার হিন্দু
ও মুসলমানদের
পবিত্র তীর্থস্থান।
দাঙ্গার সময়
ওই মাজার
থেকেই হিন্দুবিরোধী
প্রচার শুরু
হয়। সিনিয়র
হাক্কানি হয়ে
ওঠেন তার
প্রধান মুখপাত্র।
১৯৪৬-এর
অক্টোবরের মাঝামাঝি
পরিকল্পিত হত্যালীলা
শুরু হয়।
পরিবারের সম্পত্তির
সঙ্গে সঙ্গে
পিরজাদা হাক্কানি
পারিবারিক এ
ইতিহাসও পেয়েছেন
উত্তরাধিকার সূত্রে।
‘পিরজাদাকে
তার বাবার
কথা জিজ্ঞেস
করবেন কিন্তু’।
ঝর্ণাদি বারবার
করে বলে
দিয়েছিলেন। গান্ধীজি
যখন নোয়াখালী
এসেছিলেন বেঁটেখাটো
ঝর্ণাদির বয়স
ছিল মাত্র
১০।
***
‘ঝর্ণাদি
পাঠিয়েছে তো
আপনাকে? ঠিক
বুঝেছি। উনি
সব সময়
আমাকে বিপদে
ফেলার চেষ্টা
করেন।’ হাসতে
হাসতে বললেন
হাক্কানি সাহেব।
জয়াগ থেকে
হাক্কানি সাহেবদের
শ্যামপুর গ্রামের
বিরাট এস্টেটে
পৌঁছতে ঘণ্টাখানেক
লাগল। সুজলা,
সুফলা বাংলাদেশের
শ্যামল ধানের
খেত দুপাশে।
আগের রাতের
বৃষ্টিতে কাদামাটির
রাস্তা দিয়ে
যেতে যেতে
এলাকার রক্ষণশীল
অন্দরের চেহারাটা
দেখতে পেলাম।
বোরখাপরা মেয়েদের
অনেকেরই হাতে
ছাতা। তাদের
হিজাবঢাকা মুখের
দিকে পাছে
পরপুরুষের নজর
পড়ে, তাই
ছাতায় মুখ
আড়াল করে
হাঁটছেন অনেকে।
গ্রাম্য প্রবাদ
বলে, এসব
এলাকায় মেয়েরা
কেউ কেউ
দুটো ছাতায়
মুখ ঢেকে
পথ চলেন।
তবে সে
অনেকটাই প্রবাদ।
‘সে
সময় তো
আমি জন্মাইনি।
আমার জন্ম
১৯৫২ সালে,’
পিরজাদা আমাকে
গল্প শোনাচ্ছিলেন।
আমি যখন
গিয়েছিলাম, তার
কয়েক বছর
আগেও পিরজাদা
হাক্কানি সাহেবকে
লোকে চিনত
ঢাকার বিশিষ্ট
নাট্যকর্মী হিসেবেই।
হাসতে হাসতে
ভদ্রলোক আমাকে
বলেছিলেন ঢাকার
বিখ্যাত শেরাটন
হোটেলের সুইমিং
পুলের পাশে
তাকে রোদ
পোহাতে দেখা
যেত প্রায়ই।
এর পরেই
ঝরঝরে ইংরেজিতে
বাকি কথাবার্তা
চালালেন শ্যামপুর
গ্রামের পিরজাদা।
‘উত্তরাধিকার
সূত্রে আমি
বাবার পির
পদবি পেয়েছি,
তার রাজনৈতিক
উত্তরাধিকার আমার
নয়।’
এপার হোক
বা ওপার,
ইংরেজি বলে
বাঙালি একটি
বিশেষ আত্মতৃপ্তি
অনুভব করে।
তার বিলিতি
শিক্ষার স্মারক
হিসেবে পিরজাদাও
যে ইংরেজিতেই
বেশি স্বচ্ছন্দ
তা বুঝিয়ে
দিতে কসুর
করলেন না।
ইংরেজিতেই তিনি
বললেন, ‘অতীতে
যা হয়েছে
তা তো
সত্যিই ঘটেছে।
তখন মানুষ
রাগে-হিংসায়
উন্মত্ত। কী
করছে, কেন
করছে বোঝার
মতো অবস্থা
ছিল না
কারো। তবে
আমি মনে
করি গান্ধীজি
আসায় ভালোই
হয়েছিল। তিনি
আসার পর
পরিস্থিতি শান্ত
হয়।’
আমরা কথা
বলছিলাম হাক্কানি
সাহেবের ছিমছাম
সাজানো বসার
ঘরে। এই
ঘরে বসেই
তখনকার রাজনৈতিক
পরিস্থিতি নিয়ে
শ্যামপুর গ্রামের
নেতাদের সঙ্গে
আলোচনা করেছিলেন
গান্ধীজি। একটা
নিচু সোফায়
পা মুড়ে
বসেছিলাম আমি।
অনায়াসে সেটাকে
খাট হিসেবে
ব্যবহার করা
চলে। হঠাৎ
হাক্কানি সাহেব
আমার সোফার
দিকে আঙুল
তুলে বললেন,
‘আপনি
এখন যেখানে
বসে আছেন,
ঠিক ওইখানটিতেই
গান্ধীজি বসেছিলেন।’
***
আরো ঘণ্টাখানেক
গল্পগাছার পর
হাক্কানি সাহেবের
কাছ থেকে
বিদায় নিলাম।
আল্লাহর দোয়া
ছাড়াও আরো
একটি উপহার
তিনি দিয়েছিলেন
আমাকে। আমার
পূর্বপুরুষের দেশের
তেজপাতা আর
দারুচিনি।
কলকাতায় ফিরে
সেই মসলার
কিছুটা মাকে
দিয়েছিলাম। মা
আমার দিকে
যেভাবে তাকিয়েছিলেন,
তাতে মনে
হয়েছিল এতদিনে
আমি সত্যি
একটা কিছু
করতে পেরেছি।
সেই মসলার
বাকিটা আমি
সযত্নে দিল্লি
নিয়ে এসেছিলাম।
কাজের সূত্রে
আমি তখন
দিল্লির বাসিন্দা।
আমার বন্ধুবান্ধবদের
কয়েকজনকে সেই
তেজপাতা আর
দারুচিনির ভাগ
দিয়েছিলাম। আমার
মায়ের মতোই
তারাও আমার
দিকে ওইভাবে
তাকিয়েছিল। যেন
এতদিনে সত্যি
আমি একটা
কিছু করতে
পেরেছি। ওই
তেজপাতা আর
দারুচিনি দিয়ে
রান্না করার
জন্য বন্ধুরা
প্রায়ই আমাকে
জোর করত।
অবশ্যই বাঙালি
রান্না।
***
পুরনো নোয়াখালী
ভেঙে এখন
তিনটি জেলা।
সেখানে ঘুরতে
ঘুরতে কত
না গল্পের
জন্ম দেখেছি।
হাক্কানি সাহেব
ঠিকই বলেছেন,
নতুন বাংলাদেশের
সঙ্গে অতীতের
সেই পদচারণা
এক এক
সময় সুররিয়াল
বলে মনে
হচ্ছিল।
বারুইপাড়া গ্রামে
এমন একটা
বাড়িতে গিয়েছিলাম।
একটা বিশাল
উঠোন ঘেরা
লাল ইটের
পুরনো দিনের
জমিদার বাড়ি।
কার্নিশে ঝুলছে
কাপড় আর
পুরনো বটের
ঝুরি, শিকড়।
পায়রা আর
টিয়াপাখির ঝাঁক
সে বাড়ির
খোঁদলে বাসা
বেঁধেছে। অতীতের
ছায়ামাখা, অন্ধকার,
শ্যাওলাধরা ইটের
দেয়ালের গায়ে
সর্বত্র আঁকা
ধ্বংসের চিহ্ন।
সেই বাড়িতেও
বাস করছে
বহু পরিবার।
১৯৪৬ সালে
জমিদাররা বাড়ি
ছেড়ে পালানোর
পর থেকেই
ওই বাড়িতে
বাস করছেন
মহম্মদ লকিউতুল্লা।
সেই সময়ের
কথা জিজ্ঞেস
করতেই চুপ
করে গেলেন
প্রবীণ মানুষটি।
আস্তে আস্তে
ঘরের দরজাটা
আমার মুখের
ওপর বন্ধ
করে দিলেন।
অতীত নিয়ে
প্রশ্ন করায়
বৃদ্ধ ভদ্রলোকের
এ আচরণের
মধ্যে যে
কোনো অস্বাভাবিকতা
নেই, তা
আরো স্পষ্ট
হলো যখন
কিছুক্ষণ পর
তার ছেলে
মহম্মদ শাহবুদ্দিন
দরজাটা খুলে
আমাকে তাদের
বসার ঘরে
ডেকে নিলেন।
চট্টগ্রামের বন
দপ্তরের কর্মী
শাহবুদ্দিন এমন
অনায়াস দক্ষতায়
আমার সঙ্গে
ম্যালথাস নিয়ে
আলোচনা শুরু
করলেন, যেন
কয়েক মিনিট
আগের ঘটনাটা
ঘটেইনি!
১৯৪৬-এর
সেই নরসংহারের
পরও যে
গুটিকয় হিন্দু
নোয়াখালী ছেড়ে
চলে যাননি,
তাদের একজন
দত্তপাড়ার মৃণালকান্তি
মজুমদার। যাননি
বটে, কিন্তু
আজও সেই
নরকের স্মৃতির
অভিঘাত তাড়া
করে তাকে।
তাদের পুরনো
ভাঙাচোরা ভিটে
ছেড়ে আজও
নড়তে চান
না মৃণালবাবু।
কিন্তু তার
ছেলে জীবন
সেই ভাঙা
বাড়ি ছেড়ে
পাশেই তার
নতুন বাড়ি
ও ইলেকট্রনিক
মেরামতির দোকান
করেছেন। নতুন
জীবনের খোঁজে।
মৃণালবাবুর বাড়ির
কাছেই দেখা
হয়েছিল অবসরপ্রাপ্ত
অধ্যাপক মাহবুবুর
রহমানের সঙ্গে।
তখনই তার
বয়স ৮৫
পেরিয়েছে। কথায়
কথায় তিনি
আমাকে জানিয়ে
দিলেন, ঐক্য
ও অনৈক্য
নিয়ে গান্ধীজির
সঙ্গে কেমন
তর্ক করেছিলেন
তিনি। আমি
অতি উৎসাহে
বাংলায় কথা
বললেও, প্রফেসর
সাহেব আগাগোড়া
ঝরঝরে ইংরেজিতে
কথা বলে
গেলেন। অবশ্য
এ ব্যাপারটায়
আমি মোটেই
অবাক হইনি
আর।
মাহবুবুর সাহেব
আমাকে বলেছিলেন,
‘আমি
গান্ধীজিকে বলেছিলাম,
মুসলিমদের জন্য
যখন পাকিস্তান
তৈরি হচ্ছে
তখন ভারতে
মুসলিমরা কী
করেই বা
নিরাপদে এবং
ঐক্যবদ্ধ হয়ে
থাকতে পারে!
মুসলিমরা কতটা
শক্তিশালী সে
তো প্রমাণ
হয়েই গেছে
ব্রিটিশরা তাদের
জন্য আলাদা
একটা দেশ
গড়ে দিতে
বাধ্য হওয়ায়।
তা মুসলিমরা
এত শক্তিশালী
হয়েও ইন্ডিয়ায়
কীভাবে দুর্বল
হয়ে থাকতে
পারে?’ খিক
খিক করে
হেসে উঠে
বৃদ্ধ মানুষটি
বলেছিলেন, ‘গান্ধীজি
কিন্তু আমার
কথার জবাব
দিতে পারেননি।’
মাহবুবুর সাহেবের
টিন আর
খড়ের চাল,
মাটির দেয়ালের
বাড়ির উঠোনে
বসে কথা
হচ্ছিল। বাড়ির
চারদিকে জবা,
লেবু আর
লঙ্কা গাছের
ঝোপ। উঠোনে
গুলি খেলছে
ছোট ছোট
ছেলেরা, একটা
নধর মুরগি
তার ছানাপোনা
নিয়ে দানা
খুঁটে খাচ্ছে।
শান্ত গেরস্থালির
এই ছবির
মাঝে বসে
বৃদ্ধকে প্রশ্ন
করেছিলাম, কেন
ওই দাঙ্গা
হয়েছিল? বাংলাদেশে
হিন্দু জমিদার
ও তাদের
মুসলমান প্রজাদের
সম্পর্কটা সহজ
ছিল না।
হিন্দু ভূস্বামীদের
বাড়িতে বা
জমিতে প্রাণ
দিয়ে খেটেও
মুসলমান প্রজার
বরাতে চিরটাকাল
অসম্মান, অপমানই
জুটেছে। উচ্চবর্ণের
হিন্দু জমিদারদের
কাছে মুসলমান
প্রজারা ছিল
কেবলই খাজনা
মেটানোর যন্ত্র।
তাই কি
এত শতাব্দীর
দীর্ঘ সামাজিক
বঞ্চনার প্রতিশোধ
নেয়ার সুযোগ
আসতে তারা
এত সহজে
ঝাঁপিয়ে পড়তে
পেরেছিল প্রভুদের
ওপর। বঞ্চনা
ও ঘৃণার
জবাবে আত্মসম্মানের
অধিকার বুঝে
নেয়ার পথটা
মৃত্যু, রক্ত
ও ধ্বংসে
পিছল হয়ে
গিয়েছিল?
মাহবুবুর রহমানের
উত্তর ছিল,
‘হ্যাঁ
তাই। কাজটা
সহজেই করা
গিয়েছিল। তবে
একটা কথা
জানবেন, ওই
দাঙ্গা কিন্তু
স্বতঃস্ফূর্ত ছিল
না, তার
পেছনে চতুর
পরিকল্পনা ছিল।’
সে তো
সর্বত্রই তাই।
নোয়াখালী দাঙ্গার
সময় সবচেয়ে
বড় রিফিউজি
ক্যাম্পগুলোর একটা
ছিল দত্তপাড়ায়।
সেখানে একটি
মেয়েদের স্কুলে
গিয়েছিলাম। তার
কাছেই একটা
চায়ের দোকানে
বসে বাংলাদেশের
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে
কথা হচ্ছিল
এইচ বি
এম শামসুল
বাশেরের সঙ্গে।
২৪ বছরের
শামসুল সোসিওলজি
নিয়ে গ্র্যাজুয়েট,
১৯৭১ সালের
আগে বাংলাদেশের
কোনো ইতিহাসকেই
স্বীকার করেন
না তিনি।
চায়ের দোকানের
দেয়ালে বাংলাদেশের
স্টার সামিরা,
শাবনূর ও
মৌয়ের রঙিন
পোস্টার সাঁটা।
ভাঙা একটা
টেপ ডেকে
তারস্বরে বাজছে
সিলভিয়া খান
ও জুয়েল
মাহমুদের গলায়
এক্সপ্লোশন
অ্যালবামের
ম্যাকারেনা গানটির
বাংলা তর্জমা।
শামসুলের সোজাসাপ্টা
উত্তর, ‘অতীতের
কথা ভেবে
লাভ নেই।
আমার একটা
চাকরি দরকার।
সেটাই হলো
আসল কথা।’
এর মধ্যে
ঝর্ণাদির গান্ধী
আশ্রমটাও টিকে
রয়েছে। মুসলমান
বাচ্চারা ওই
আশ্রমের স্কুলে
পড়তে আসে,
মুসলমান মাছচাষীরা
আশ্রমের হ্যাচারি
থেকে মাছের
পোনা কিনে
নিয়ে যায়।
আশ্রমের উদ্যোগে
এলাকায় বেশ
কয়েকটি টিউবওয়েল
ও টয়লেট
তৈরি হয়েছে।
আশ্রমে উড়ছে
বাংলাদেশের লাল-সবুজ
পতাকা।
ঝর্ণাদি ও
তার সহকর্মীদের
ডাকে আশ্রমের
রামধুন ও
ভজনের আসরে
গিয়ে বসেছিলাম।
সকাল সন্ধ্যায়
গান্ধীজির প্রিয়
‘রঘুপতি
রাঘব রাজা
রাম’ গানের
সুরে মনটা
আপনা থেকেই
শান্ত হয়ে
আসে। গান
শেষ হওয়ার
পর সকলে
বলে উঠলেন,
‘বিসমিল্লাহির
রাহমানির রাহিম।’
পরম করুণাময়ের
নামে, তাকে
স্মরণ করেই
সব কাজের
শুরু ও
শেষ।
সুদীপ চক্রবর্ত্তী: সংঘাত,
সমঝোতা, গণতন্ত্র,
মানবাধিকার বিষয়ে
ভারতের অন্যতম
স্বাধীন বক্তা।
তার রচিত
The Bengalis : A Portrait of
a Community (2017) (প্রকাশক:
Aleph
Book Company) গ্রন্থটি
বাঙালি জাতির
ইতিহাস ও
সংস্কৃতি বিষয়ে
গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন
বলে স্বীকৃত।
তার সর্বশেষ
গ্রন্থ পলাশী: দ্য
ব্যাটল দ্যাট
চেঞ্জড দ্য
কোর্স অব
ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি সমালোচকদের
দৃষ্টি কেড়েছে।
শর্মিষ্ঠা রায়:
The Bengalis : A Portrait of
a Community গ্রন্থের
অনুবাদক।
কলকাতার ‘এই সময়’ পত্রিকার সহকারী বার্তা সম্পাদক।





