এ মুহূর্তে কেউ কি হ্যামবার্গার বা সুস্বাদু ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খাওয়ার কথা ভাবছেন, যা ফাস্ট ফুড হিসেবে সবচেয়ে সহজলভ্য ও সুস্বাদু খাবার?

তাহলে রয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ হ্যামবার্গার ফাস্ট ফুডের রেস্তোরাঁ—ম্যাকডোনাল্ড’স (পুরো নাম ম্যাকডোনাল্ড’স করপোরেশন)।

ফাস্ট ফুড ও সস্তা প্রস্তুত খাবারের ইতিহাস অনেক পুরনো। প্রাচীনকালে রোমান শহরগুলোয় রাস্তার পাশে খাবারের দোকান ও সরাইখানা ছিল। সেখানে রান্না করা সবজি ও স্টুতে ভিজিয়ে রাখা রুটি বিক্রি হতো। জানা যায়, মধ্যযুগীয় আমলেও অনেক শহরে রাস্তার ধারে খাদ্যবিক্রেতা ছিল। সে বিক্রেতারা বিভিন্ন ধরনের খাবার, যেমন মিট পাই, পেস্টি, ফ্ল্যান, ওয়াফলস, ওয়েফার, প্যানকেক ও রান্না করা মাংস বিক্রি করত, বিশেষ করে দরিদ্রদের কাছে, যাদের নিজেদের জন্য খাবার প্রস্তুত করার কোনো উপায় বা সংগতি ছিল না। আধুনিককালে প্রথম ফাস্ট ফুড দোকান, যেখানে ‘ফিস অ্যান্ড চিপস’ বিক্রি হতো, শুরু হয়েছিল ১৮৬০ সালে ইংল্যান্ডের ওল্ডহ্যাম শহরের টমিফিল্ড মার্কেটে।

ম্যাকডোনাল্ড’স শুরু হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে। ১৯৩৭ সালে ম্যাকডোনাল্ড পরিবারের পিতৃপুরুষ প্যাট্রিক ম্যাকডোনাল্ড  ক্যালিফোর্নিয়ার মনরোভিয়া বিমানবন্দরের কাছে ‘এয়ার ডোম’ নামে একটি ছোট্ট খাবার দোকান চালু করেন। সেখানে তিনি হট ডগ বিক্রি শুরু করেন এবং পরে খাদ্যতালিকায় হ্যামবার্গার ও কমলার রস যুক্ত করেন।

প্যাট্রিক ম্যাকডোনাল্ডের দুই ছেলে মরিস ও রিচার্ড ম্যাকডোনাল্ড ১৯৪০ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সান বার্নার্ডিনোতে খাবারের দোকান (ক্যাফে) হিসেবে স্থানান্তরিত করেন এবং তারা নতুন দোকানের নাম রাখেন ‘ম্যাকডোনাল্ড’স বার-বি-কিউ’। সেখানে ২৫টি খাদ্যের মধ্যে বেশির ভাগই ছিল বিভিন্ন ধরনের বার-বি-কিউ। তার আট বছর পর অর্থাৎ ১৯৪৮ সালে ম্যাকডোনাল্ড ভাইয়েরা বুঝতে পেরেছিলেন, তাদের লাভের বেশির ভাগই হ্যামবার্গার বিক্রি থেকে আসছে। তখন তারা দক্ষতা প্রয়োগ করে সর্বাধিক লাভজনক করার জন্য তাদের পরিষেবা পদ্ধতি সহজতর করার দিকে মনোনিবেশ করেন। তাদের ছোট রেস্তোরাঁটি কম দামে প্রচুর পরিমাণে খাবার উৎপাদনের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল। তাই তারা খাদ্যতালিকায় মাত্র কয়েকটি খাবার রেখেছিল, যেমন হ্যামবার্গার, চিজবার্গার, ফ্রাই, মিল্কশেক ও আপেল পাই। তারা একটি সহজ ও দক্ষ পদ্ধতি চালু করেছিল, যা তারা ‘স্পিডি সার্ভিস সিস্টেম’ নাম দিয়েছিল । সেখানে ‘সেলফ-সার্ভিস’ কাউন্টার অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং যেখানে ওয়েটার বা ওয়েট্রেসের প্রয়োজন ছিল না। এছাড়া গ্রাহকরা তাদের খাবার দ্রুত সংগ্রহণ করতে পারত। কেননা হ্যামবার্গার আগেই রান্না করে কাগজে মুড়িয়ে গরম রাখা হতো। তারা একটা হ্যামবার্গারের জন্য মাত্র ১৫ সেন্ট (তত্কালীন) মূল্যে বিক্রি করত, যা প্রতিযোগিতামূলক রেস্তোরাঁর দামের প্রায় অর্ধেক ছিল। অল্প সময়ের মধ্যে ম্যাকডোনাল্ড’স একটি বিশাল সফল ব্যবসা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে এবং পরবর্তী সময়ে তারা একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি প্রোগ্রাম শুরু করে। যাই হোক, ১৯৫২ সালে দোকানের নাম ম্যাকডোনাল্ড’স বার-বি-কিউ থেকে সংক্ষিপ্ত করে ম্যাকডোনাল্ড’স নাম রাখা হয়।

ম্যাকডোনাল্ড’সের জন্য রে ক্রোক নামে একজন বিক্রেতার কাছ থেকে আটটি মল্ট এবং শেক মিক্সার কেনা হয়েছিল, যার জন্য রে ক্রোক রীতিমতো বিস্মিত হয়েছিলেন। তিনি ১৯৫৪ সালে রেস্তোরাঁয় গিয়ে দেখেন কীভাবে একটি ছোট দোকান এত মিল্কশেক (দুধের শরবত) বিক্রি করতে পারে। রেস্তোরাঁর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ উপলব্ধি করতে পেরে তিনি একজন ফ্র্যাঞ্চাইজি এজেন্ট হয়ে ওঠেন এবং ১৯৫৫ সালের ১৫ এপ্রিল ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের ডেস প্লেইনস শহরে ম্যাকডোনাল্ড’স সিস্টেমস, ইনকরপোরেটেড চালু করেন, যা পরে ম্যাকডোনাল্ড’স করপোরেশন নামে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তী সময়ে সেখানে তিনি মিসিসিপি নদীর পূর্বদিকে ম্যাকডোনাল্ড’সের প্রথম ফ্র্যাঞ্চাইজি খোলেন। অবশেষে ১৯৬১ সালে তিনি ম্যাকডোনাল্ড ভাইদের কাছ থেকে ২ দশমিক ৭ মিলিয়ন (তত্কালীন) মার্কিন ডলারে প্রতিষ্ঠানের সমুদয় শেয়ার ক্রয় করেন। তার পর থেকেই ম্যাকডোনাল্ড’সের ব্যবসা বিশ্বব্যাপী দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

যদিও ম্যাকডোনাল্ড’স হ্যামবার্গার, চিজবার্গার ও ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত। তবে মেনুতে মুরগির আইটেম, সকালের নাশতা সামগ্রী, কোমলপানীয়, সোডা, দুধের শরবত, সালাদ ও মিষ্টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ক্রেতার স্বাদ পরিবর্তন এবং নেতিবাচক সমালোচনার জন্য সংস্থাটি মিশ্র সবুজ শাকসবজি, মাছ, স্মুদি ও প্রাকৃতিক পণ্য যুক্ত করেছে। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য খাবারের মধ্যে রয়েছে বিগ ম্যাক, চিকেন ম্যাকনিগেটস ও ম্যাকচিকেন।

ম্যাকডোনাল্ড’সের লোগো এখন সারা বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীকগুলোর মধ্যে একটি, যা সোনালি খিলান (গোল্ডেন আর্চস) নামে বা ‘এম’ প্রতীক হিসেবে পরিচিত। যদিও ১৯৫৩ সালে শুরু হওয়া প্রতিটি নতুন ম্যাকডোনাল্ড’স রেস্তোরাঁর স্থাপত্যে সোনালি রঙের খিলান ছিল। তবে ১৯৬১ সালে ১৩ সেপ্টেম্বর ম্যাকডোনাল্ড’স ‘গোল্ডেন আর্চস’ লোগো ট্রেডমার্ক হিসেবে নথিভুক্ত করে। যাই হোক, ১৯৬১-২০০৩ সালের মধ্যে ম্যাকডোনাল্ড’সের লোগোটি বেশ কয়েকবার পরিবর্তন করা হয়েছে। ২০০৩ সালে লোগোটিও I’m Lovin’ It স্লোগানের ওপর স্থাপন করা হয়েছিল। সে সময়ে সব লোগোর মধ্যে লাল ও হলুদ রঙ ছিল। আসলে এ লাল ও হলুদ রঙের সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্ক আছে। লাল রঙটি উদ্দীপক ও সক্রিয়তার সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে হলুদ সুখের সঙ্গে যুক্ত এবং দিনের আলোয় সবচেয়ে দৃশ্যমান রঙ, যা দূর থেকে জনাকীর্ণ রাস্তায় সহজেই চোখে পড়ে।

যাই হোক ম্যাকডোনাল্ড’সের ইংরেজিতে ‘এম’ লোগোর তিনটি আলাদা ব্যাখ্যা চালু আছে: (১) ম্যাকডোনাল্ড’সের নামের প্রথম অক্ষরের প্রতীক, (২) বাঁকানো দুটি সোনালি-বাদামি রঙের ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ও (৩) মাতৃপ্রেমের প্রতীক, যা এক জোড়া উরজের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, শেষের ব্যাখ্যাটি নকশা পরামর্শদাতা ও মনোবিজ্ঞানী লুই চেস্কিনকে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

করোনাভাইরাস সংকটের সময় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার গুরুত্বের ওপর জোর দেয়ার জন্য ম্যাকডোনাল্ড’সের লোগো পরিবর্তন করা হয়েছে। ২০২০ সালের গোড়ার দিকে ব্রাজিলে ম্যাকডোনাল্ড’সের নতুন লোগোর প্রচার অভিযান উন্মোচন করা হয়। ব্র্যান্ড লোগোয় প্রতিনিধিত্বকারী সোনালি খিলানগুলো মহামারীর সময় একে অন্যের থেকে দূরত্ব বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা পৃষ্ঠপোষকদের স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য পৃথক করা হয়েছে ।

এ কথা স্বীকৃত, ম্যাকডোনাল্ড’সের প্রাথমিক টার্গেট হচ্ছে শিশু ও কিশোর-কিশোরী। এদের ওপর ম্যাকডোনাল্ড’সের প্রভাব এতটাই বেশি, দুই থেকে আঠারো বছর বয়সী শিশু এবং কিশোর-কিশোরীরা অন্য যেকোনো খাবারের চেয়ে ম্যাকডোনাল্ড’সের খাবার খেতে বেশি পছন্দ করে। ম্যাকডোনাল্ড’স-এ শিশুদের খাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে টেলিভিশনের চমকপ্রদ রঙিন বিজ্ঞাপন। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ম্যাকডোনাল্ড’স শিশুদের আকৃষ্ট করার জন্য যেসব ভিজুয়াল তৈরি করেছে, তার সঙ্গে টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন তাদের মনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে এবং ম্যাকডোনাল্ড’সের খাবার যুক্তরাষ্ট্রে শিশু-কিশোরদের স্থূলতা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। তবে শুধু টেলিভিশনই নয়, বিপণনের অন্যান্য চ্যানেল, যেমন মিডিয়া আউটলেট, বিলবোর্ড ও বাহ্যিক বিপণন কৌশল প্রত্যক্ষভাবে দায়ী। এসব চ্যানেলের মাধ্যমে ম্যাকডোনাল্ড’স শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের ক্রমাগত লক্ষ্যবস্তু করছে, যা তাদের কীভাবে, কী ও কোথায় ম্যাকডোনাল্ড’স খেতে হবে, তা তাদের অবহিত করছে। দেখা গিয়েছে, বছরের পর বছর ধরে ম্যাকডোনাল্ড’স ভোক্তাদের (যেমন এক ডলার মূল্যের খাবার) এবং শিশুদের খাবারের লক্ষ্যবস্তু করার জন্য খাদ্যতালিকা প্রবর্তন করেছে। এসব বিপণন ও মূল্যের কৌশল ম্যাকডোনাল্ড’সের প্রতি ভোক্তাদের পছন্দ বদলে গিয়েছে। এছাড়া ম্যাকডোনাল্ড’সের প্রতি শিশু-কিশোরদের দুর্বলতার অন্যতম কারণ হলো ম্যাকডোনাল্ড’সের লোগো। এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ৯০ শতাংশ শিশুরা ম্যাকডোনাল্ড’সের লোগো দেখে সহজেই চিনতে পারে। ম্যাকডোনাল্ড’স তার বিপণন বাজেটের অর্ধেকেরও বেশি মাসকট তৈরি এবং শিশুদের খাবারের সঙ্গে প্রশংসামূলক খেলনা সরবরাহের জন্য ব্যয় করে।

শিশুদের ওপর ম্যাকডোনাল্ড’সের প্রভাব খুবই বেশি। এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, শিশুরা সাধারণ ব্যাগ থেকে ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের চেয়ে ম্যাকডোনাল্ড’সের ব্যাগ থেকে বেবি গাজর কিংবা অন্য যেকোনো ধরনের সবজি খেতে পছন্দ করে। এছাড়া আরেক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, হাসপাতালে অবস্থানরত শিশুরা হাসপাতালের ক্যাফেটেরিয়ার খাবার থেকে ম্যাকডোনাল্ড’সের খাবার বেশি পছন্দ করে।

বিশ্বজুড়ে ম্যাকডোনাল্ড’সের সাফল্যের বিপরীতে ক্রমবর্ধমান সমালোচনা ও অভিযোগের মুখোমুখি হতে হয়েছে এবং ম্যাকডোনাল্ড’স কর্তৃপক্ষ উত্থাপিত সমালোচনা ও অভিযোগ নিরসনের জন্য বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেয়।

জানা যায়, ভোক্তাদের সেসব সমালোচনা ও অভিযোগের মধ্যে বেশির ভাগই ছিল স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০০০ সালের গোড়ার দিকে যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাকডোনাল্ড’সের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা করা হয়েছে। যদিও কোনো বাদীই জয়ী হয়নি। তবে বেশ কয়েকটি রাজ্য ফাস্ট ফুড সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে স্থূলতার মামলা নিষিদ্ধ করে বিল পাস করেছে। তবে ম্যাকডোনাল্ড’স তার মেনুতে স্বাস্থ্যকর আইটেম যুক্ত করে সমালোচনার প্রতিক্রিয়া জানায় এবং ২০১৭ সালে তারা ‘ভেগান’ হ্যামবার্গার চালু করে। ২০১৮ সালে ম্যাকডোনাল্ড’স ঘোষণা করে, তারা বেশির ভাগ হ্যামবার্গারে প্রিজারভেটিভ ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার রেস্তোরাঁগুলোয় বেশ কয়েকটি খাবারে ট্রান্স ফ্যাট ব্যবহার বন্ধ করে দেয়। ম্যাকডোনাল্ড’সের সেসব পদক্ষেপ ভোক্তাদের মনে খুব বেশি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি।

এছাড়া ম্যাকডোনাল্ড’স মজুরি বাড়ানোর জন্য কর্মচারীদের মুখোমুখি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ‘ম্যাকজব’ শব্দটি মেরিয়াম-ওয়েবস্টার অভিধানে যোগ করা হয়েছে, যার অর্থ ‘কম বেতনের চাকরি’। উপরন্তু বেতনসহ ১০ মিনিটের বিরতির জন্য ম্যাকডোনাল্ড’সের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ায় কর্মচারীরা ক্লাস অ্যাকশনে গিয়েছিল।

পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের জন্যও ম্যাকডোনাল্ড’স সমালোচিত হয়েছিল, বিশেষ করে গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনের ক্ষেত্রে। একবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ম্যাকডোনাল্ড’স তার রেস্তোরাঁগুলোয় এবং তার সরবরাহকারীদের গরুর মাংসের উৎপাদনে নির্গমন হ্রাস করার উদ্যোগ নেয়। উপরন্তু ম্যাকডোনাল্ড’সের প্যাকেজিং উদ্বেগের কারণে তারা পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ, বাসনপত্র ও অন্যান্য জিনিসপত্র ব্যবহার করার জন্য বিভিন্ন প্রোগ্রাম চালু করে।

তবে সবশেষে বলতে হয়, সমালোচনা এবং বিভিন্ন সমস্যার মাঝেও চরম জনপ্রিয়তা ও সস্তা প্রস্তুত খাবার পরিবেশনের কারণে ম্যাকডোনাল্ড’স কেবল পশ্চিমা বিশ্বেই নয়, বরং সারা বিশ্বে নাটকীয়ভাবে বাড়ছে। কারণ বর্তমানে ব্যস্ত জীবনে গ্রাহকরা ফাস্ট ফুড সম্পর্কে যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প বিষয় বিবেচনা করে, যেমন ভালো পরিষেবা, স্বল্প দূরত্বে অবস্থিত এবং দ্রুত ও বর্ধিত ডেলিভারি (যেমন উবার ইটস), ম্যাকডোনাল্ড’স তা সরবরাহ করছে এবং গ্রাহকদের চাহিদা পূরণে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে।

ম্যাকডোনাল্ড’স সম্পর্কে ২০টি উল্লেখযোগ্য জানা-অজানা তথ্য ও পরিসংখ্যান:

১.  ম্যাকডোনাল্ড’স আয়ের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় খাবারের নেটওয়ার্ক, যা বিশ্বে প্রতিদিন ৬৯ মিলিয়নেরও বেশি ক্রেতাকে খাবার পরিবেশন করে। ম্যাকডোনাল্ড’সের আয় আসে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর ভাড়া, রয়্যালটি ও ফি এবং নিজেদের পরিচালিত রেস্তোরাঁর বিক্রয় থেকে।

২.  ম্যাকডোনাল্ড’স বিশ্বের নবম ধনী প্রাইভেট কোম্পানি, যার সর্বমোট রাজস্ব মূল্য প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার।

৩. ২০২০ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১২০টি দেশে (বিশ্বের ৬১ শতাংশ দেশ) ৩৫ হাজারেরও বেশি ম্যাকডোনাল্ড’সের রেস্তোরাঁ রয়েছে।

৪.  মার্কিনরা গড়ে ফাস্ট ফুডের জন্য প্রতি বছর ১ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার ব্যয় করে। যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ প্রতি সপ্তাহে তিন বা ততোধিক ফাস্ট ফুড খাবার খায়।

৫. ম্যাকডোনাল্ড’সের জনপ্রিয়তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, রোনাল্ড ম্যাকডোনাল্ড মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সান্তা ক্লজের পরে সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্র। কেননা প্রায় ৯৬ শতাংশ স্কুলের ছেলেমেয়ে রোনাল্ড ম্যাকডোনাল্ডকে সহজেই শনাক্ত করতে পারে।

৬. রোনাল্ড ম্যাকডোনাল্ড একটি ক্লাউন চরিত্র, যা ম্যাকডোনাল্ড’সের প্রাথমিক মাসকট হিসেবে ব্যবহার হয়েছিল। মাসকটটি ছিল একজন শেফ বা বাবুর্চির টুপির ওপরে রক্ষিত হ্যামবার্গার। মাসকটটি ১৯৫৩ সালে তৈরি এবং নাম রাখা হয়েছিল ‘স্পিডি’।

৭.  জানা যায়, এক ব্যক্তি একনাগাড়ে ৩০ দিন ধরে ম্যাকডোনাল্ড’সের খাবার ছাড়া আর কিছুই খাননি, যা তার শরীর ও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। তিনি এ ৩০ দিনে ১৭ পাউন্ড ওজন লাভ করেন।

৮. ম্যাকডোনাল্ড’স রেস্তোরাঁ প্রতি বছর সারা বিশ্বে ১০০ কোটি কাপ কফি বিক্রি করে। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন আরো ৫০ কোটি কাপ বিক্রি করে।

৯. ম্যাকডোনাল্ড’স ১৯৬৫ সালে নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়।

১০.          ইতিহাসে দীর্ঘ সময় ব্যবহূত স্লোগান হলো ম্যাকডোনাল্ড’সের I’m Lovin’ It, যা দীর্ঘ ১৩ বছর স্থায়ী ছিল। এটি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্বীকৃত স্লোগানগুলোর মধ্যে অন্যতম। পুষ্পা টি নামে একজন র্যাপার স্লোগানটি সৃষ্টি করেন।

১১.          ম্যাকডোনাল্ড’স কোনো দেশে কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি খুলবে না, যদি না তা সেই দেশে অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর হয়। তাই ম্যাকডোনাল্ড’সের উপস্থিতি কখনো কখনো দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার সূচক হিসেবে ব্যবহূত হয়।

১২.          পর্তুগালই একমাত্র দেশ, যেখানে ম্যাকডোনাল্ড’সের রেস্তোরাঁগুলোয় স্যুপ বা ঝোল পরিবেশন করা হয়। অন্যদিকে মালয়েশিয়ায় ম্যাকডোনাল্ড’স-এ ভাত-ঝোল পর্যন্ত পাওয়া যায়।

১৩.         আয়তনের দিক থেকে ম্যাকডোনাল্ড’সের সবচেয়ে বড় রেস্তোরাঁ (২৮ হাজার বর্গফুটেরও বেশি) চীনের বেইজিং শহরে অবস্থিত। অন্যদিকে সবচেয়ে ছোট রেস্তোরাঁ (মাত্র ৪৯২ বর্গফুট) জাপানের টোকিও শহরে অবস্থিত। তবে সবচেয়ে ব্যস্ত প্রথম ১০টি রেস্তোরাঁ রয়েছে হংকংয়ে।

১৪.          সবচেয়ে উত্তরে ম্যাকডোনাল্ড’স রেস্তোরাঁ ফিনল্যান্ডের রোভানিমির আর্কটিক সার্কেলে অবস্থিত এবং সবচেয়ে দক্ষিণে রেস্তোরাঁ নিউজিল্যান্ডের ইনভারকারগিলে অবস্থিত।

১৫.         ম্যাকডোনাল্ড’সের স্ট্রবেরি দুধের শরবতে প্রায় ৫০ ধরনের রাসায়নিক পদার্থ থাকে এবং স্ট্রবেরির স্বাদ ও ঘ্রাণ আনার জন্য সেগুলো ব্যবহার করা হয়।

১৬.         একজন লোক যদি একসঙ্গে একটি সুপার আকারের কোক, ফ্রাই ও বিগ ম্যাক খায়, তাহলে সেসব খাবার দেহ থেকে ঝেড়ে ফেলার জন্য তাকে ৭ ঘণ্টা হাঁটতে হবে অথবা ঘণ্টায় ১৩ কিলোমিটার গতিতে ১ ঘণ্টা সাইকেল চালাতে হবে।

১৭.          ম্যাকডোনাল্ড’স মিডিয়া বিজ্ঞাপনে বছরে ১০০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি ব্যয় করে।

১৮.         ম্যাকডোনাল্ড’স শিশুদের আকর্ষণ করতে আগ্রাসী বিপণন শুরু করে। গবেষকরা মনে করেন, ফাস্ট ফুড ব্র্যান্ডগুলো চায় শিশুরা যেন সেগুলো তাদের ‘প্রিয় মানুষ’দের মতো ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখুক।

১৯.          ১৯৪৮-২০১৬ পর্যন্ত ম্যাকডোনাল্ড’স চার ট্রিলিয়ন ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বিক্রি করেছে। যদি সেসব ফ্রাই একটার সঙ্গে আরেকটা স্থাপন করা হয় এবং তাতে যে দূরত্ব তৈরি হবে, তা প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার বার পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করার সমান অথবা ৩০৬ বার চাঁদে বা দুবার বৃহস্পতি গ্রহে যাওয়া-আসার সমান।

২০.         অল্প বয়সে অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি ম্যাকডোনাল্ড’স-এ কাজ করেছেন, যেমন মার্কিন চলচ্চিত্র অভিনেত্রী শ্যারন স্টোন, কানাডিয়ান সংগীতশিল্পী ও গীতিকার শানিয়া টোয়েইন, মার্কিন টেলিভিশন উপস্থাপক, কৌতুকাভিনেতা ও লেখক জে লেনো, কানাডিয়ান অভিনেত্রী র্যাচেল ম্যাকঅ্যাডামস এবং মার্কিন সংগীতশিল্পী পিঙ্ক (আসল নাম অ্যালেসিয়া বেথ মুর)।

 

ফজল হাসান: লেখক ও অনুবাদক