দরজা ঠেলে
ছোট্ট দোকান
কিংবা রেস্তোরাঁয়
ঢুকে কাউন্টার
নয়তো টেবিলে
রাখা মেনুকার্ডটা
এক নজর
দেখলেন, নাও
দেখতে পারেন,
কী খাবেন
তা তো
জানাই। সরাসরি
কাউন্টারে গিয়ে
টাকা জমা
দিলেন। কয়েক
মিনিট পরই
প্লাস্টিক ট্রেতে
চলে এল
গরম খাবার।
এটাই ফাস্ট
ফুড কালচার।
অনেকে বলেন,
ফাস্ট ফুড
হলো আমেরিকান
ওয়ে অব
লাইফ। এভাবেও
বলা যায়
যে আধুনিক
জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয়তা
থেকে ফাস্ট
ফুডের আবির্ভাব।
দিনে আমেরিকার
প্রাপ্তবয়স্কদের এক-
চতুর্থাংশ অন্তত
একবার কোনো
না কোনো
ফাস্ট ফুডের
দোকানে ঢুঁ
মারে।
১৯৭০ থেকে
২০০০ সাল—এ
৩০ বছরে
আমেরিকার দূরতম
প্রান্তে জায়গা
করে নেয়
ফাস্ট ফুড।
গুটিকয় হট
ডগ আর
হ্যামবার্গারের স্ট্যান্ড
দিয়ে দক্ষিণ
ক্যালিফোর্নিয়ায় যাত্রা
হয়েছিল ফাস্ট
ফুডের। এখন
আমেরিকার যেখানে
কেনার মতো
টাকাওয়ালা মানুষ
আছে সেখানেই
ফাস্ট ফুডের
দোকান আছে।
১৯৭০ সালে
আমেরিকানরা ৬
বিলিয়ন ডলার
ব্যয় করেছিল
ফাস্ট ফুডের
পেছনে। ২০০০
সালে সে
ব্যয় বেড়ে
হয় ১১০
বিলিয়ন ডলারের
বেশি। ফাস্ট
ফুড নেশন
বইয়ে এরিক
শ্লসার জানিয়েছেন,
নতুন সহস্রাব্দে
আমেরিকানরা উচ্চশিক্ষা,
পারসোনাল কম্পিউটার,
সফটওয়্যার কিংবা
নতুন গাড়ির
চেয়ে ফাস্ট
ফুডের পেছনে
বেশি অর্থ
ব্যয় করে।
সিনেমা, ম্যাগাজিন,
বই, পত্রিকা.
মিউজিকের পেছনে
একজন আমেরিকান
যত অর্থ
ব্যয় করে
তার চেয়ে
বেশি করে
ফাস্ট ফুডের
পেছনে।
ফাস্ট ফুড
কী বস্তু?
নামেই এর
উদ্দেশ্য পরিষ্কার।
ঝটপট এ
খাবার হাজির
করা যায়
ভোক্তার সামনে।
যুক্তরাষ্ট্রে ব্যস্ত
নগরবাসী, যাত্রী,
শ্রমিকদের জন্য
তৈরি করা
হয়েছিল ফাস্ট
ফুড। কারণ
বাসায় কিংবা
রেস্তোরাঁয় বসে
সময় নিয়ে
আয়েশ করে
খাবার খাওয়ার
সময় তাদের
হতো না।
ফাস্ট ফুডের
ধারণা নগরায়ণের
সঙ্গে বিকশিত
হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে
নতুন নতুন
আধুনিক শহরে
আবাসন সুবিধা
নিশ্চিত করাটা
কঠিন ছিল।
রান্নাঘরগুলো নেহাতই
নামেমাত্র। এ
সমস্যা এখনো
বড়, ব্যস্ত
শহরগুলোয় দেখা
যায়। রান্নার
জন্য দরকারি
উপকরণ কিনে
রান্না করতে
যে খরচ
সে খরচে
বা তার
চেয়ে কমে
ফাস্ট ফুড
পাওয়া গেলে
ধীরে ধীরে
সবাই সেদিকেই
ঝুঁকতে থাকে।
রেস্তোরাঁয় রান্না
করা খাবার
বসে খাওয়াটা
কারো উদ্দেশ্য
নয়। সবাই
রেস্তোরাঁ কিংবা
স্টলে ঢুকে
তৈরি খাবার
কিনে যত
দ্রুত বাসায়
বা কর্মস্থলে
ফিরে যেত।
তারপর সুবিধামতো
খেয়ে নিত।
প্রাচীন রোমে
রাস্তার পাশে
স্ট্যান্ড থাকত,
যেখান থেকে
মানুষ খাবার
ও পানীয়
কিনতে পারত।
রোমান শহরগুলোয়
দিনের খাবারের
জন্য খাদ্য
বিক্রেতাদের ওপর
নির্ভর করত।
সেঁকা রুটি
ও মাংস
ছিল নিত্যদিনের
খাবার। সকালে
মদে চোবানো
রুটি ছিল
নাশতা। পরে
পোপিনায় (এক
প্রকার মদের
দোকান) গিয়ে
রান্না করা
সবজি আর
সেদ্ধ মাংস
কিনত। চীনের
হান সাম্রাজ্যের
দ্বিতীয় শতাব্দীর
একটি দলিল
থেকে জানা
যায়, শহরগুলোয়
নুডলস স্ট্যান্ড
সারা রাত
খোলা থাকত।
দ্বাদশ শতাব্দীতে
চীনারা ভাজা
রুটি, স্যুপ
খেত যা
এখনো স্ন্যাকস
হিসেবে প্রচলিত
আছে। একই
সময়ে বাগদাদিরা
ঘরে তৈরি
খাবারের সঙ্গে
দোকান থেকে
তৈরি মটরশুঁটি,
মাংস কিনে
খেতে শুরু
করে। মধ্যযুগে
লন্ডন, প্যারিসের
মতো বড়
শহরগুলোয় অসংখ্য
বিক্রেতা পাই,
পেস্টি, ফ্লান,
ওয়াফেল, ওয়েফার,
প্যানকেক ও
রান্না করা
মাংস বিক্রি
করত। সেই
প্রাচীন রোম
থেকে মধ্যযুগ
পর্যন্ত এ
রকম স্টল,
বিক্রেতারা রান্না
করতে অসুবিধা
এমন মানুষদের
খাবার সরবরাহ
করেছে। শহরে
রান্নাঘরসহ আবাসন
তখন সাধারণ
আয়ের মানুষর
জন্য সহজলভ্য
ছিল না।
তাই তাদের
ফাস্ট ফুডের
ওপরই নির্ভর
করতে হতো।
পবিত্র ভূমিতে
তীর্থযাত্রায় যাওয়া
সফরকারীদের এসব
তৈরি খাবারের
ওপরই নির্ভর
করতে হতো।
ব্রিটেনে উপকূলীয়
অঞ্চলে নানা
ধরনের তৈরি
সামুদ্রিক খাবার
পাওয়া যেত।
ট্রলারে মাছ
ধরা জনপ্রিয়
হলে উনিশ
শতকের মধ্যভাগে
ফিশ অ্যান্ড
চিপস নামের
জনপ্রিয় খাবারটির
জন্ম হয়।
১৮৬০ সালে
এ খাবার
বিক্রির প্রথম
দোকানটি চালু
হয়। এ
ঘটনাকে ফাস্ট
ফুড ইন্ডাস্ট্রির
সূচনা হিসেবে
বিবেচনা করা
হয়। এ
ফাস্ট ফুডের
জনপ্রিয়তা কেমন
ছিল তা
বোঝা যাবে
১৯১০ সালের
মধ্যে যুক্তরাজ্যজুড়ে
২৫ হাজার
ফিশ অ্যান্ড
চিপস দোকান
গড়ে ওঠে।
সস্তা এবং
রেডিমেড বলে
ভিক্টোরিয়ান শ্রমিক
শ্রেণীর মধ্যে
এ খাবার
ব্যাপক জনপ্রিয়তা
পেয়েছিল। ১৯২০-এর
দশকে দোকানের
সংখ্যা বেড়ে
হয় প্রায়
৩৫ হাজার।
হ্যারি র্যামসডেন’স
নামে বিখ্যাত
ফাস্ট ফুড
চেইনটি তাদের
প্রথম দোকানটি
চালু করে
১৯২৮ সালে
এবং তাদের
সিগনেচার আইটেম
ছিল ফিশ
অ্যান্ড চিপস।
ব্রিটিশ ফাস্ট
ফুডে আঞ্চলিকতার
প্রভাব আছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
পর টার্কির
ব্যবহার বেড়েছে।
এছাড়া বিদেশী
ফাস্ট ফুড
হিসেবে পিৎজা,
ডোনার কাবাব
দেশটিতে জনপ্রিয়।
ফাস্ট ফুডের
আধুনিক ইতিহাসের
শুরু ধরা
হয় ১৯১২
সালের ৭
জুলাই। এদিন
নিউইয়র্কে অটোম্যাট
নামে একটি
ফাস্ট ফুড
রেস্টুরেন্ট চালু
হয়। কাচে
ঘেরা এ
দোকানে শুধু
ফাস্ট ফুড
সরবরাহ করা
হতো এবং
কয়েন-অপারেটেড
পদ্ধতিতে খাবার
নেয়া যেত।
হর্ন অ্যান্ড
হার্ডার্ট কোম্পানি
তাদের প্রথম
অটোম্যাট রেস্তোরাঁটি
চালু করেছিল
১৯০২ সালে
ফিলাডেলফিয়ায়। তবে
সাড়া ফেলেছিল
নিউইয়র্কের রেস্তোরাঁটি।
চাহিদা সামাল
দিতে এরপর
একের পর
এক রেস্তোরাঁ
চালু হতে
থাকে। ১৯৩০-এর
দশক পর্যন্ত
তাদের জনপ্রিয়তা
অব্যাহত ছিল।
তারা টেক-আউট
ধারণা জনপ্রিয়
করেছিল। তাদের
স্লোগান ছিল
বেশ কৌতূহলোদ্দীপক—‘লেস
ওয়ার্ক ফর
মাদার’ (মায়ের
ওপর কাজের
চাপ কমাও)।
অবশ্য অনেকে
মনে করেন,
প্রথম আধুনিক
ফাস্ট ফুড
চেইন আউটলেট
হচ্ছে হোয়াইট
ক্যাসেল। দুনিয়ার
প্রথম হ্যামবার্গার
চেইন এ
কোম্পানি। শুরুতে
৫ সেন্টে
একটি হ্যামবার্গার
বিক্রি করত
তারা। উইলিয়াম
ইনগ্রাম ও
ওয়াল্টার অ্যান্ডারসন
মিলে এ
চেইন প্রতিষ্ঠা
করেন। বর্তমানে
তাদের আউটলেট
আছে ৩৭৭টি।
২০১৪ সালে
টাইম ম্যাগাজিন
হোয়াইট ক্যাসেল
স্লাইডারকে দুনিয়ার
সবচেয়ে প্রভাবশালী
বার্গার হিসেবে
স্বীকৃত দিয়েছে।
ফাস্ট ফুডের
ইতিহাসে হোয়াইট
ক্যাসেল আরো
কয়েকটি কারণে
গুরুত্বপূর্ণ। তারাই
প্রথম ফাস্ট
ফুড সাপ্লাই
চেইন তৈরি
করে। মাংস,
বান, দরকারি
প্যাকেজিং কাগজ
সরবরাহ, এমনকি
কীভাবে আউটলেট
তৈরি হবে
সেজন্য একটি
কনস্ট্রাকশন বিভাগও
তৈরি করেছিল
তারা।
ফাস্ট ফুডের
বিকাশ আমেরিকান
সমাজ ও
অর্থনীতির মৌলিক
পরিবর্তনের সাক্ষী।
অটোমোবাইল জনপ্রিয়
হয়ে ওঠা
ফাস্ট ফুডকে
আরেক দফা
জনপ্রিয় করে
তোলে। এতে
ড্রাইভ-ইন
রেস্তোরাঁগুলো জনপ্রিয়
হয়ে ওঠে।
মুদ্রাস্ফীতি সামাল
দিতে সত্তরের
দশকে আমেরিকায়
শ্রমিকদের মজুরি
বৃদ্ধি হতে
থাকে, যা
চূড়ায় ওঠে
১৯৭৩ সালে।
কিন্তু পরবর্তী
২৫ বছর
তা ক্রমান্বয়ে
কমেছে। এ
সময়ে রেকর্ডসংখ্যক
নারী কাজে
প্রবেশ করেছেন।
ফলে রেডিমেড
খাবারের চাহিদা
বাড়তে থাকে।
১৯৪০-এ
প্রতিষ্ঠিত ম্যাকডোনাল্ড’স
করপোরেশন আমেরিকার
সেবা খাতের
শক্তিশালী প্রতীক
হয়ে ওঠে।
১৯৬৮ সালে
ম্যাকডোনাল্ড’সের
রেস্তোরাঁ ছিল
এক হাজারের
মতো আর
এখন তা
বেড়ে দাঁড়িয়েছে
প্রায় ৪০
হাজারে। আমেরিকার
নতুন কর্মসংস্থান
তৈরির বড়
উৎস এই
ফাস্ট ফুড
চেইন। আমেরিকার
বেসরকারি কর্মসংস্থানে
বড় অবদান
তাদের। বিশ্বের
সবচেয়ে মূল্যবান
ও বিখ্যাত
ব্র্যান্ডগুলোর একটি
ম্যাকডোনাল্ড’স।
২০১৯ সালে
বৈশ্বিক ফাস্ট
ফুড ইন্ডাস্ট্রির
বাণিজ্য ৫৭০
বিলিয়ন মার্কিন
ডলারের। এক
গবেষণামতে, ২০২৭
সাল নাগাদ
বৈশ্বিক ফাস্ট
ফুড মার্কেট
হবে ৯৩১
বিলিয়ন ডলারের।
আবার একটি
গবেষণায় উল্লেখ
করা হয়েছে,
২০২১ সালে
ফাস্ট ফুডের
বাজার ছিল
৫৯৩ বিলিয়ন
ডলারের আর
২০২৮ নাগাদ
তা হবে
৮১৩ বিলিয়ন
ডলারের। রেস্তোরাঁর
সংখ্যা বৃদ্ধি,
কর্মক্ষেত্রে নারীদের
আরো বেশি
অংশগ্রহণ ও
ডিজিটাল পদ্ধতিতে
অর্ডার, মানুষের
বিদেশী খাবার
খাওয়ার চাহিদা
এ বৃদ্ধিতে
ভূমিকা রাখবে।
তবে ফাস্ট
ফুডের স্বাস্থ্যঝুঁকি
বিবেচনা ও
নতুন আউটলেট
চালুর খরচ
বৃদ্ধি এ
প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত
করতে পারে।
জনসংখ্যা ও
অর্থনীতির হিসাবে
সামনের দিনে
চীন, ভারত
ও ব্রাজিল
ফাস্ট ফুডের
ভোক্তা হিসেবে
বড় ভূমিকা
রাখবে।
অমিত রহমান: লেখক





