নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে পিৎজা হাট ছিল রীতিমতো উদ্ভাবনী পাওয়ারহাউজ। আজ থেকে বছর বাইশ আগে পিৎজা হাট এমন খাদ্যবিজ্ঞানীদের নিযুক্ত করেছিল, যারা চমত্কার পিৎজা ক্রাস্টের পেটেন্ট পেয়েছিল। এ ক্রাস্ট রসুনের সঙ্গে মিশ্রণ তৈরির প্রক্রিয়ায় ভেঙে যায় না। এক পর্যায়ে সে সময়ের অতি জনপ্রিয় বিগ ফুট, দি এজ, ট্রিপল ডেকারের মতো পিৎজা ভ্যারাইটিকে ছাপিয়ে যায় এর জনপ্রিয়তা। ১৯৯৫ সালে স্টাফড ক্রাস্ট রোল পিৎজা চালু হওয়ার পরের বছর যুক্তরাষ্ট্রে পেপসির চাহিদা ৫০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল।

নতুন, অদ্ভুত প্রকৃতির পিৎজার উদ্ভাবন বাজারে প্রবৃদ্ধি আনে। কিন্তু নতুন সহস্রাব্দে এসে পিৎজা হাট তেমন একটা চমকপ্রদ কিছু উপহার দিতে পারেনি। পিৎজা হাটের শেষ উদ্ভাবন ছিল এর স্টাফড ক্রাস্ট পিৎজার মধ্যে মোজারেলা চিজের পরিবর্তে চ্যাডার চিজের সংযোজন এবং পনির ভক্তদের জন্য বিশেষ নিবেদন, ‘স্টাফড চিজ ইট’ বাজারে আনা।

পিৎজা হাটের মূল কোম্পানি ইয়াম ব্র্যান্ড ২০১৭ সালে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে ২২ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে, যা গত বছরগুলোর চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম। কেননা পিৎজা হাটের স্বর্ণযুগ নব্বইয়ের দশকে তারা এর চেয়ে ১০ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয় করত গবেষণা বাবদ। একই সময়ে ইয়াম পিৎজা ডেলিভারি ও মার্কেটিং খাতে ব্যয় করেছিল ১৩০ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু যখন একটি চিকেন স্যান্ডউইচ অনলাইন হাইপ হয়ে যায় এবং টাকো বেলের মতো প্রতিষ্ঠান কেবল ১০ সপ্তাহে ১০০ মিলিয়ন ডরটিও টাকোস বিক্রি করে তাক লাগিয়ে দেয়, সেখানে শুধু ডেলিভারি চেইন ম্যানেজমেন্ট করে ফাস্ট ফুড ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকা চ্যালেঞ্জ হয়ে যায়। পিৎজা হাটের উদ্ভাবন প্রক্রিয়া রীতিমতো স্থবির হয়ে পড়েছে।

পিৎজা হাটের উত্থান

শৈশব থেকেই আমি পিৎজা হাটের খাবারের ভক্ত। প্রায় প্রতি বুধবারে আমার পরিবার পিৎজা অর্ডার করত। সে অর্ডারের বেশির ভাগ হতো পিৎজা হাট থেকে। মাঝে মাঝে পাপা জোনস বা ডোমিনোজ থেকে পিৎজা আনা হতো।

আমেরিকার মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের নাগরিকদের কাছে পিৎজা হাট অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি পিৎজা চেইনশপ ছিল নব্বইয়ের দশকে। এ সময়ে পিৎজার পুরো মার্কেট শেয়ারের ২৫ শতাংশ পিৎজা হাটের দখলে। পিৎজা হাট প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৫৮ সালে ক্যানসাস রাজ্যের উচিটা শহরে। ড্যান ও ফ্র্যাঙ্ক কার্নি উচিটা স্টেইট ইউনিভার্সিটি থেকে বেশ দূরে একটি সাধারণ ইটের ভবনে তাদের প্রথম রেস্তোরাঁটি স্থাপন করেন। ১৯৬০ সালে রেস্তোরাঁটি লাল ইটের ছাদসংবলিত একটি ভবনের আকৃতির রূপ পায় এবং ধীরে ধীরে এর প্রসার শুরু হয়। ১৯৭৩ সালে ব্র্যান্ডটির ১ হাজার ৮০০টি দোকানে বার্ষিক প্রায় ২২৫ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পিৎজা বিক্রি হতো।

ফ্র্যাঙ্ক ও ড্যানকে ফ্র্যাঞ্চাইজিং জগতের সাহসী উদ্যোক্তা হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো সে সময়ে। কেননা তারা প্রথাগত ক্যারিয়ারের বাইরে গিয়ে একটি পিৎজা চেইন খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তত্কালীন সময়ের ছোট শহরগুলোয় লাল ইটের ছাদওয়ালা ভবনটি পেত শহরের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রেস্তোরাঁর মর্যাদা এবং সেটা হতো নিঃসন্দেহে পিৎজা হাট। সে সময়ে যারা আমার মতো তখনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র, যদি মাসে একটি বইপড়া শেষ করতে পারতাম, তাহলে ‘বুক ইট’ প্রোগ্রামের আওতায় মাসে একটি প্যান পিৎজা বরাদ্দ পেতাম।

পিৎজা হাটের দুই বছর পরই মিশিগানে প্রতিষ্ঠিত হয় ডোমিনোজ পিৎজা। সে সময়ে দ্রুত খাবার সার্ভ করার জন্য ডোমিনোজ, কম দামের জন্য লিটল সিজার ও গুণমানের জন্য পাপা জোনস বাজারে পরিচিত ছিল। কিন্তু পিৎজা হাট সবার চেয়ে এগিয়ে ছিল তার নিত্যনতুন ক্রাস্ট আর ফ্লেভারের জন্য।

উদ্ভাবনের কাল

পিৎজা হাটের আধিপত্য ধরে রাখতে ডেভিড নোভাককে নিয়োগ করা হয়। তাকে আশির দশকে মার্কেটিংয়ের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় ডোমিনোজ ও লিটল সিজারের বিস্তৃতি রোধ করার জন্য। নোভাক যুক্তি দিয়েছিলেন, পিৎজার নতুন ভ্যারাইটি আরো বেশি ক্রেতা আকর্ষণ করবে, যার একাংশ ডোমিনোজ ও লিটল সিজারের খণ্ডকালীন ক্রেতা। একই সঙ্গে সে সময়ে পিৎজা হাটে নিযুক্ত হন কয়েক ডজন খাদ্যবিজ্ঞানী, যারা মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি দেখতেন এবং অত্যাধুনিক প্রক্রিয়ায় পিৎজা তৈরির কাজটি পর্যবেক্ষণ করতেন প্রকৌশলীরা। অন্যদিকে নোভাক একটি নতুন দল গঠন করেছিলেন। তার নির্দেশ ছিল পিৎজা হাটে প্রতি আট সপ্তাহ পর পর একটি নতুন পিৎজা উদ্ভাবন করতে হবে। এজন্য নিবিড়ভাবে গবেষণা প্রয়োজন হতো। নতুন একটি পিৎজা বাজারে আনতে অন্তত ১৮ মাস সময় লাগত। তাই নোভাকের কাজের গতি ও মনোযোগ এক্ষেত্রে স্পষ্ট হয়।

গবেষণা শুরু হয় তিনজন সদস্য নিয়ে, যেটা নব্বইয়ের দশকে এসে ৬০ জনে উন্নীত হয় এবং একটি নির্ধারিত সময়ের পর পিৎজা হাটের ক্রেতাদের নির্দিষ্ট ফোকাস গ্রুপে ভাগ করে জটিল এবং ফলপ্রসূ এক জরিপ করা হয়। জরিপ থেকে মজার কিছু তথ্যও বেরিয়ে আসে। ক্যালিফোর্নিয়ায় পিৎজা হাটের এক মধ্যবয়সী ক্রেতা পিৎজার হাড়গুলো বাড়ি নিয়ে যেতে চাইতেন, তার কুকুরকে খাওয়াবেন বলে। তিনি বুঝিয়ে বললেন, পিৎজার হাড় বলতে তিনি পিৎজা ক্রাস্টকে বুঝিয়েছেন। কেননা কেউ পিৎজা ক্রাস্টগুলো খায় না। তথ্যটিকে কাজে লাগিয়ে গবেষকরা বাজারে স্ট্রিং পনিরের খোঁজ শুরু করেন পিৎজা ক্রাস্টে সংযোজিত করার জন্য। পরবর্তী তিন বছর পিৎজা হাটের নিযুক্ত খাদ্যবিজ্ঞানীরা ক্রাস্টের একটি পেটেন্ট তৈরি করেছিলেন, যা ভঙ্গুর হবে না আবার খুব শক্তও থাকবে না। একই সময়ে স্টাফড ক্রাস্ট পিৎজা বাজারে আসে। সে সময়ে স্টাফড ক্রাস্ট পিৎজা এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে চার সপ্তাহের ট্রায়াল টেস্টের সময়কাল পেরিয়ে পিৎজার বিক্রি উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে। স্টাফড ক্রাস্টের বিক্রি প্রথম বছর ১ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়। এ সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প পিৎজা হাটের একটি বিজ্ঞাপনে অংশ নিয়েছিলেন।

কিন্তু এ উদ্ভাবন এক সময়ে ম্লান হতে থাকে। ২০০৯ সালে ফ্রোজেন পিৎজার জনপ্রিয়তা প্রচলিত পিৎজা চেইনগুলোয় বিপুলভাবে আঘাত হেনেছিল। পিৎজা হাটের বিক্রয় ২০০৯ সালে আগের বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ হ্রাস পায়। হিমায়ত পিৎজার আড়ালে ক্রেতাকে প্রলুব্ধ করা সহজ, সেখানে খাদ্যমান বা পরিবেশনের দ্রুততার বিষয় তেমন বিবেচিত হয় না।

১৯৯৪ সালে ডোমিনোজ একটি ওয়েবসাইট তৈরি করে, যেখানে গ্রাহকরা একটি অনস্ক্রিন পিৎজা-ডোর ওপর ভার্চুয়াল টপিং টেনে আনতে পারে। সে বছর স্ট্যানফোর্ডের অর্থনীতিবিদ নাথান রোজেনবার্গ এটাকে ‘অত্যাধুনিক প্রযুক্তির তুচ্ছ ব্যবহার করার উদাহরণ’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। কিন্তু তিনি ভুল ছিলেন। পরে অনলাইন ডেলিভারি পিৎজা ব্যবসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ২০১০ মন্দা-পরবর্তী দশকে ডোমিনোজ, পিৎজা হাটসহ অন্য সবাই ডেলিভারি অ্যাপ এবং আপডেটকৃত ওয়াবসাইট পরিষেবায় উন্নীত করে নিজেদের। সোশ্যাল মিডিয়াগুলোকে বিপণনের টুল হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে এ প্রতিষ্ঠানগুলো। ডিএক্সপি গাড়ির একটি বহরের মাধ্যমে অর্ডার দেয়ার প্রবর্তন করে। ডোমিনোর গ্রাহকদের পুনরুদ্ধার করার জন্য বিশেষ পিৎজা ব্যবহার করতে হয়নি, প্রযুক্তিই যথেষ্ট ছিল।

ফাস্ট ক্যাজুয়াল রেস্তোরাঁগুলো তাদের ফ্রেশ উপাদানগুলোর জন্য বাজারে খ্যাতি লাভ করেছে। তারা নতুন ধারণাগুলো বাজারে নিরীক্ষার এমন সুযোগ পায় যেটা পিৎজা হাট আর পায় না। পিৎজা হাটের শেষ নতুন অফারগুলোর মধ্যে একটি ছিল মিনি চিজ বার্গারসহ একটি পিৎজা, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে পাওয়া যেত। কিন্তু এটি কোনো ভালো ফলাফল লাভ করেনি। বরং দ্য গার্ডিয়ান পণ্যটিকে আসন্ন বিশ্বব্যাপী খাদ্যসংকটের পোস্টার চাইল্ড হিসেবে বর্ণনা করে।

পিৎজাকে আবার নতুন করে তুলি

পিৎজা হাট এ দৌড়ে টিকে থাকার জন্য অনেক চেষ্টা করেছে। ব্র্যান্ডটি একটি স্বচালিত গাড়িতে বিনিয়োগ করেছে। চিন্তা করা হচ্ছে ৫০০টির মতো আউটলেট বন্ধ করে দিয়ে আইকনিক স্টোরগুলোকে রিডিজাইন করা হবে। সর্বশেষ তাদের উদ্ভাবনে সংযোজিত হয় একটি গোল পিৎজা বক্স। আশা করা যায় এটি কিছু ক্রেতা আকর্ষণ করবে। কিন্তু ফলাফল এখন পর্যন্ত মিশ্র। কিন্তু পিৎজা হাটের বিপণন বিভাগ বিশ্বাস করছে এখনো এখানে উদ্ভাবনের বেশকিছু সুযোগ আছে। নতুন কিছু হতে চলেছে।