১৯৫৩ সালে ফ্লোরিডার জ্যাকসনভিলের বাসিন্দা কিথ জে ক্র্যামার একটি রেস্টুরেন্ট চালুর পরিকল্পনা করেন। এতে মূল অনুপ্রেরণা ছিল ক্যালিফোর্নিয়ায় চালু হওয়া ম্যাকডোনাল্ড’স রেস্টুরেস্ট। ফ্লোরিডায় নতুন রেস্টুরেস্ট চালুর পরিকল্পনায় ক্র্যামারের সঙ্গে যোগ দেন তার চাচা শ্বশুর ম্যাথিউ বার্নস। ১৯৫৩ সালের ২৩ জুলাই চালু হওয়া তাদের রেস্টুরেন্টটির বিশেষত্ব ছিল ইনস্টা-ব্রয়লার নামে একটি বিশেষ গ্রিল মেশিন। স্বত্বাধিকার নেয়া মেশিনটির নামে ইনস্টা-বার্গার কিং হিসেবে যাত্রা করে রেস্টুরেন্টটি।

কয়েক মাসের মধ্যে আরো কয়েকটি এলাকায় রেস্টুরেন্টটি বিস্তৃত হয়। কর্নেল ইউনিভার্সিটির দুই সহপাঠী জেমস ম্যাকলামোর ও ডেভিড এজারটনের নজরে আসে নতুন রেস্টুরেন্টটি। ১৯৫৪ সালে মিয়ামিতে ইনস্টা-বার্গার কিংয়ের একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি কিনে নেন তারা। মেট্রোপলিটান শহর হিসেবে মিয়ামির উত্থান নতুন একটি চেইন শপের বিকাশের উপযোগী পরিবেশ উপস্থাপন করে। তবে ইনস্টা-ব্রয়লার মেশিনের একটি পরিবর্তন জরুরি হয়ে পড়ে। কারণ এ মেশিনে তৈরি বার্গার দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল।

ফ্লেম ব্রয়লার নামে নতুন একটি গ্যাস গ্রিল নিয়ে আসেন ম্যাকলামোর ও এজারটন। নতুন এ যন্ত্র আগের ইনস্টা-ব্রয়লারের সমস্যা দূর করে দেয়। ১৯৫৯ নাগাদ ইনস্টা-বার্গার চেইনের পথচলা মসৃণ থাকলেও পরিচালনায় সমস্যায় পড়েছিলেন ক্র্যামার-বার্নস। এ সময়ে পুরো চেইনটি কিনে নেন ম্যাকলামোর ও এজারটন। তারা বার্গার কিংয়ের পুরো কাঠামো সম্পূর্ণ ঢেলে সাজান এবং পরিচালনায় শৃঙ্খলা নিয়ে আসেন। ১৯৬১ সালে বার্গার কিং নামে যাত্রা করে রেস্টুরেন্ট চেইনটি। যুক্তরাষ্ট্রর বিভিন্ন শহরে শাখা বিস্তৃত হয়। এ সময়ে বার্গার কিং তাদের একটি সিগনেচার বার্গার হুপার বাজারে নিয়ে আসে। ম্যাকলামোর ও এজারটনের হাতে বার্গার কিংয়ের প্রায় আট বছরের মসৃণ এ যাত্রার মধ্যেই আবার মালিকানা পরিবর্তন হয়।

বার্গার কিং করপোরেশনকে ১ কোটি ৮০ লাখ ডলারে কিনে নেয় পিলসবারি কোম্পানি নামে বেকিং প্রতিষ্ঠান। পিলসবারির মোটা অংকের বিনিয়োগে ভর করে ১৯৭০-এর দশকে ম্যাকডোনাল্ড’সের পরই যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহৎ বার্গার চেইন হিসেবে দাঁড়ায় বার্গার কিং। ১৯৭০-এর দশকে পেপসি ও কোকা-কোলার লড়াইয়ে যুক্ত হয়ে পড়ে ম্যাকডোনাল্ড’স ও বার্গার কিং। এ সময়টাতেই ম্যাকডোনাল্ড’সকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল দ্বিতীয় শীর্ষ চেইনটি। এ সময়ে আরো কয়েকটি জায়গায় শীর্ষস্থানে রদবদল হয়। জনপ্রিয় টেলিভিশন নেটওয়ার্ক হিসেবে এনবিসি ও সিবিএসকে পেছনে ফেলে দেয় এবিসি। এ সময়ে গ্রাহকদের কাছে কোমল পানীয় হিসেবে পেপসির চেয়ে কোকা-কোলা জনপ্রিয় হয়ে পড়ে। বার্গারের সঙ্গে কোকা-কোলা দিতে শুরু করে বার্গার কিং।

১৯৭৮ সালে ম্যাকডোনাল্ড’স থেকে ডোনাল্ড এন স্মিথকে বাগিয়ে আনে বার্গার কিংয়ের পরিচালনা পর্ষদ। তিনি এসে কোম্পানিটিতে ‘অপারেশন ফিনিক্স’ নামে বেশকিছু বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেন। ফ্র্যাঞ্চাইজি চুক্তিকে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজান তিনি। একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম ছিল বার্গার কিংয়ের কোনো মালিক অন্য কোনো চেইনের শেয়ারহোল্ডার হতে পারবেন না। বার্গার কিংয়ের কোনো চেইনের মালিক হতে হলে স্টোর থেকে ১ ঘণ্টার ড্রাইভিং দূরত্বে থাকতে হবে তাকে। এতে প্রাতিষ্ঠানিক আনুগত্যের সংস্কৃতি তৈরি হয়। এ নিয়মের ফলে অলাভজনক অনেক ফ্র্যাঞ্চাইজি ঝরে পড়ে।

সম্প্রসারণমূলক এ কর্মসূচির মধ্যে বেশ কয়েকটি ফিশ স্যান্ডউইচ ও চিকেন স্যান্ডউইচ চালু করে বার্গার কিং। ১৯৮০-এর দিকে কোম্পানির বিক্রি ১৫ শতাংশ বাড়ে। কিন্তু এ সময়ে শীর্ষ নেতৃত্বে ফের পরিবর্তন আসে। সম্প্রসারণ ও সফলতায় নেতৃত্ব দেয়া স্মিথকে টোপ ফেলে নিয়ে যায় পেপসিকো। পেপসিকোর দায়িত্ব নেন বার্গার কিংয়ের সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ডোনাল্ড স্মিথ। শীর্ষ নির্বাহীর প্রস্থানে বার্গার কিংয়ের বিক্রি কমতে থাকে। এ সময়ে নেতৃত্বের হাল ধরেন নরম্যান ই ব্রিংকার। শিশু-কিশোরদের আকৃষ্ট করতে বিজ্ঞাপন দেয়া শুরু করে। অনেক বিজ্ঞাপনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ম্যাকডোনাল্ড’সকে আঘাত করতে থাকে বার্গার কিং। শুধু ম্যাকডোনাল্ড’সই নয়, কেএফসি ও ওয়েন্ডিজের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিও এ আঘাতের লক্ষ্যবস্তু হয়। করপোরেট ইতিহাসে এ বিজ্ঞাপন যুদ্ধকে বার্গার ওয়ার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। বার্গার কিং ও তাদের ওই সময়ের বিজ্ঞাপন সহযোগী জে ওয়াল্টার থম্পসনের বিরুদ্ধে মামলা করতে বাধ্য হয়েছিল ম্যাকডোনাল্ড’স। এমনকি বার্গার কিংয়ের বিজ্ঞাপনের শিশু অভিনেত্রী সারাহ মিচেল গেলারের বিরুদ্ধেও অভিযোগের তীর নিক্ষেপ হয়। বিতর্কের মধ্যেও বার্গার কিংয়ের বিক্রি ও বাজার বিস্তৃত হতে থাকে। ১৯৮২ সাল পর্যন্ত বার্গার কিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন ব্রিংকার। তারপর তিনি পিলসবারির খাদ্য পরিষেবা বিভাগের প্রেসিডেন্ট হন, যেখানে বার্গার কিংসহ গ্রুপটির মালিকানায় থাকা অন্যান্য চেইন আওতাভুক্ত ছিল। কিন্তু ১৯৮৪ সালে পিলসবারি গ্রুপ ছেড়ে দেন ব্রিংকার। দায়িত্ব নেন ডালাসভিত্তিক বার্গার চেইন চিলি’জ।

কয়েক বছরের ব্যবধানে স্মিথ ও ব্রিংকারের প্রস্থানের পর বিভিন্ন কঠোর নীতিমালা শিথিল করে পিলসবারি। এ সময়ে বার্গার কিংসহ পিলসবারি গ্রুপেরই বাজার আয় ও বাজার মূল্যধন কমে যায়। ১৯৮৮ সালে ৫৭০ কোটি ডলারে পিলসবারি গ্রুপকেই অধিগ্রহণ করে ফেলে গ্র্যান্ড মেট্রোপলিটান। নয়া স্বত্বাধিকারী নিয়ন্ত্রণ বুঝে নিয়েই বার্গার কিংয়ে নিজেদের ছাপ রাখা শুরু করে। এর আগের নিয়ন্ত্রকরা যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে বাজার সম্প্রসারণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন সেখানে গ্রান্ড মেট বৈশ্বিক বাজার সম্প্রসারণে নেতৃত্ব দিয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইউনাইটেড বিস্কিটস ও ৪০০টি বার্গার চেইনের উইম্পি অধিগ্রহণের মাধ্যম ইউরোপে বিস্তৃত হতে থাকে বার্গার কিং।

নব্বইয়ের দশকে ওয়াল্ট ডিজনি কোম্পানির সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছায় বার্গার কিং। এ চুক্তির আওতায় দ্য লায়ন কিং, আলাদিন ও টয় স্টোরিসহ ১০টি ডিজনি মুভির সঙ্গে স্পন্সরশিপ ছিল তাদের। ওয়াল্ট ডিজনির বাণিজ্যিক পুনর্জন্মের সময়ে এ দ্বিপক্ষীয় চুক্তি উভয় প্রতিষ্ঠানের জন্যই সোনায় সোহাগা হয়। এতে সহযোগী হয় বার্গার কিংয়ের কিডস ক্লাব প্রোগ্রাম, যা শিশুদের মধ্যে বার্গার কিংয়ের জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেয়। ১৯৭০-এর দশকে বার্গার কিং প্রোগ্রামের পর কিডস ক্লাব ছিল শিশুদের লক্ষ্য করে সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন কর্মসূচি। এ প্রোগ্রাম চালুর দুই মাসের মাথায়ই এক মিলিয়নের (১০ লাখ) বেশি শিশু এতে নিবন্ধন করে।

১৯৯২ সালে আঘাত হানা হারিকেন অ্যান্ড্রুতে কোম্পানির প্রধান কার্যালয় তছনছ হয়ে যায়। মিয়ামির ওল্ড কাটলার রোডে ছিল ওই কার্যালয়, যে রোডে হারিকেনটি প্রবেশ করে শহরে তাণ্ডব চালায়। এতে কোম্পানিটির ২ কোটি ৪০ লাখ ডলারেরও বেশি আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এমনকি কোম্পানির সাত শতাধিক কর্মীর মধ্যে ৩০০ জনই ঘরবাড়ি হারান।

তবে বিপর্যয়ের প্রভাব সামলাতে ভূমিকা রাখে তত্কালীন শীর্ষ নির্বাহী গিবনসের নেয়া কিছু পদক্ষেপ। হারিকেনের পূর্বাভাসে করপোরেট ব্যাক অফিস ডাটা ওয়াশিংটনের সিয়াটলে নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া হারিকেন শেষের আটদিনের মাথায়ই মিয়ামির ডোরাল রিসোর্ট অ্যান্ড কান্ট্রি ক্লাবে অস্থায়ী ‘কমান্ড সেন্টার’ স্থাপন করা হয়। অন্যান্য কার্যক্রম আঞ্চলিক কয়েকটি কার্যালয়ে সরিয়ে নেয়া হয়। প্রধান কার্যালয় সচল করতে বার্গার কিংয়ের প্রায় এক বছর লেগে যায়। ১৯৯৩ সালে মিয়ামির প্রধান কার্যালয় পুনরায় চালু হয়।

গোল্ডম্যান স্যাকস ও বেইন ক্যাপিটাল কর্তৃক অধিগ্রহণের আগ পর্যন্ত বার্গার কিং উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ২০০৬ সালে পুঁজিবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ছাড়ে বার্গার কিং। এর মাধ্যমে তাদের ৪২ কোটি ৫০ লাখ ডলার আয় হয়। তখন থেকে বার্গার কিংয়ের ফের উত্থান হতে থাকে। ২০১০ সালে কোম্পানিটির বাজার মূলধন দাঁড়ায় ৩২০ কোটি ডলার।

২০১১ সালে মেনু ও বিজ্ঞাপন প্রচারণা সম্পূর্ণ ঢেলে সাজায় বার্গার কিং। ২০১৪ সালে কানাডীয় রেস্টুরেন্ট ও কফি চেইন টিম হর্টনসকে একীভূত করে তারা। ২০১৮ সালে যৌথ রেস্টুরেন্ট ব্র্যান্ডটি ১৮০ কোটি ডলারে পপিজ কিনে নেয়। এ অধিগ্রহণের ফলে বার্গার ও ডোনাটসের বাইরেও ব্র্যান্ডটির মেনু বিস্তৃত হয়। কেএফসির সঙ্গে টেক্কা দিয়ে তারা ফ্রায়েড চিকেনও নিয়ে আসে।

মাঝখানে আরেক মার্কিন রেস্টুরেন্ট চেইন ওয়েন্ডিজ দ্বিতীয় স্থান থেকে বার্গার কিংকে সরিয়ে দিয়েছিল। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৯৬০ কোটি ডলার বিক্রির মাধ্যমে দ্বিতীয় শীর্ষস্থান পুনরোদ্ধার করে বার্গার কিং। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৩ হাজার ৭৬০ কোটি ডলার বিক্রির মাধ্যমে শীর্ষস্থান অটল ম্যাকডোনাল্ড’সের। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত উপাত্তে স্ট্যাটিস্টা জানায়, ২০২১ নাগাদ বিশ্বব্যাপী বার্গার কিংয়ের স্টোরের সংখ্যা ১৯ হাজার ১৯৬ দাঁড়িয়েছে। করোনা মহামারী শুরুর আগে পরবর্তী ১০ বছরে বৈশ্বিক স্টোরের সংখ্যা ৪০ হাজারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা হাতে নিয়েছিল বার্গার কিং। যুক্তরাষ্ট্রের সব বড় শহর, উত্তর আমেরিকা, লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপের বেশির ভাগ দেশসহ এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশে রয়েছে বার্গার কিংয়ের স্টোর। এমনকি মেক্সিকো ও স্পেনের মতো দেশে স্টোর চালুর দিক থেকে ম্যাকডোনাল্ড’সকে পেছেনে ফেলে দিয়েছে তারা।

১৯৭৯ সালের ৭ আগস্ট হংকংয়ের গ্রানভিল রোডে প্রথম স্টোরের মাধ্যমে এশিয়ায় যাত্রা শুরু বার্গার কিংয়ের। এটা ছিল বার্গার কিংয়ের আড়াই হাজারতম শাখা। ১৯৮২ সালের মধ্যে জাপান, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ পূর্ব এশিয়ার আরো কয়েকটি দেশে স্টোর চালু করে বার্গার কিং।

২০১৬ সালের ৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশে প্রথম আউটলেট খোলে বার্গার কিং। টিফিন বক্স লিমিটেড নামে স্থানীয় একটি কোম্পানির সঙ্গে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক এ চেইন চালু হয়। যাত্রার এক বছরের মাথায়ই যমুনা ফিউচার পার্কে পঞ্চম আউটলেট চালু করে তারা। রাজধানীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোয় আটটি আউটলেট রয়েছে বার্গার কিংয়ের।

 

সাবিদিন ইব্রাহিম: লেখক ও অনুবাদক