সকাল সকাল মিনারার হাঁড়িপাতিল নাড়ার ঘটরমটর শব্দে ফিকে হয়ে আসা ঘুমটা চোখ থেকে পুরোপুরি উধাও হয়ে গেল হারিস মিয়ার, সদ্য ঘুম ভাঙার বিরক্তিতে নিজের অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এল— মাগী। হালকা শীতে আলস্যটা মেয়েদের বিলাসিতার মতো লেপ্টে আছে সারাটা গাজুড়ে। শরীরের আড়মোড়া ভেঙে কাঁথাটা টেনে নিয়ে আবার আরাম করে চোখ বুজল হারিস। মিনারা মাটির কলসি থেকে বাসি পানি ঢক ঢক শব্দ করে টিনের জগে ঢালছে। পানির এই ঢক ঢক শব্দ শুনে বোজা চোখেই হুক্কার কথা মনে পড়ল, মনে পড়ল হুক্কার টোলের পানিও বদলাতে হবে। কথাটা মনে পড়তেই আলস্যটাও উড়ে যাওয়া ঘুমের মতোই দৌড়ে পালিয়ে গেল। মনে পড়ল আজ কলপাড়ের চারিধারে বেড়াটা দিতেই হবে। যেভাবেই হোক, এ কাজটা দ্রুত শেষ করতে হবে।

কলপাড়ের বেড়ার কথা ভাবতে ভাবতেই দিনের প্রথম হুক্কার নেশাটা যেন চনমনিয়ে জেগে উঠল হারিসের। নেশা বলতে ওই একটাই— জায়গায় বসে এক ছিলিম তামাক পোড়ানো। জনার্ধন মিস্ত্রি বলে, মিয়া, তুমি এখনো সেকেলেই রয়ে গেলা? আজকাল আর কিডা হুক্কা টানে? কত নামের বিড়ি-সিরগেট বাইর অইছে, তুমি মিয়া হুক্কাতেই পইড়া রইলা। হারিস মিয়া মিটি মিটি হেসে জবাব দেয়, দাদা যে কি কন! নয়ার ন’গুণ পুরানার আঠারো গুণ। নিজের হাতে বানানো তামুকের লগে সিরগেটের তুলনা চলে? রাব মাখানো রংপুইরা তামুকের যে গন্ধ, নাকে গেলে মনে লয় হাজার বছর তামুক টানতে টানতে এক বওয়ায় জীবন কাটাই দিই।

কাঁটাখালী বাজারে যেতে তিনমাথার মোড়েই জনার্ধন মিস্ত্রির ফার্নিচারের কারখানা। জনার্ধন নিজেই আসল মিস্ত্রি, সাথে সহকারী হিসেবে আছে ছেলে অনিমেষ, আরো দুজন কর্মচারী। বাপের খুব বাধ্যগত ছেলে অনিমেষ, কাজেও খুব মনোযোগী। বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে হারিস মিয়া মাঝে মধ্যে জনার্ধনের কারখানায় বসে মনের সুখ-দুঃখ নিয়ে দু-চারটা কথা বলে। কথা বলতে বলতে মিস্ত্রি নিজের কোমরে লুঙ্গিতে গুঁজে রাখা সুরমা সিগারেটের প্যাকেট থেকে দুই শলা সিগারেট খুলে একটা নিজের ঠোঁটে গুঁজে অন্যটি হারিসের দিকে এগিয়ে দেয়। দিয়াশলাই জ্বেলে নিজের ঠোঁটে চেপে রাখা সিগারেটটি ধরিয়ে জ্বলন্ত দিয়াশলাইয়ের কাঠিটি বাতাস আগলে কৌশলে এগিয়ে দেয় হারিস মিয়ার দিকে।

সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে মুখভর্তি ধোঁয়া নাক-মুখ দিয়ে বের করে হারিস মিয়া বলে—

বুঝলা, এই সিগারেটে তেমন তেজ নাই, ঘরের বউয়ের লাহান পানসা মনে লয়।

কথাটা শুনে জনার্ধন মিস্ত্রি পলকে হারিস মিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে, কও কি মিয়া? স্বাদের কিছু পাইলানি? নাকি ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া খোয়াব দেখো খালি।

সে কথায় হারিস মিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে— আমার আর কপাল!

জনার্ধন মিস্ত্রি গভীর সন্দেহে হারিস মিয়ার দিকে তাকায়। এই দীর্ঘশ্বাসের লক্ষণ তো বেশি সুবিধার না, তীক্ষ দৃষ্টিতে হারিসের মুখে কিছু একটা খোঁজে মিস্ত্রি। হারিসের চোখ চলে যায় ক্যাশ বাক্স পার হয়ে তার পেছনে জনার্ধনের ভগবানের দিকে— রাধা-কৃষ্ণের যুগল মূর্তি, কি সুখী সুখী মুখ নিয়ে বাঁশি বাজাচ্ছে রাধার গায়ে হেলান দিয়ে!

এই সাতসকালে হুক্কার কথা মনে পড়তেই জনার্ধন মিস্ত্রির কথা মনে পড়ল কেন কে জানে! নাহ আর আলস্য নয়, বিছানা ছাড়তে হবে এখনই।

দুদিন আগে সে দুপুরে বাড়ি এসেছিল। এই অসময়ে বাড়ি বরাবর রাস্তার পাশে বুরুম আর মেরা গাছের ঘন ছায়ার নিচে পাড়ার কটি উঠতি বয়সের ছেলেদের জটলা বসেছে। ওকে দেখে জটলা ফাঁকা হয়ে গেলেও যেতে যেতে চুক চুক শব্দটি ঠিকই কানে গিয়েছিল হারিস মিয়ার। বাড়ি বরাবর উঠতি বয়সের যুবকদের অসময়ে গোল হয়ে বসে থাকার কারণটি বুঝতে পেরেছিল রিকশা থেকে নেমে। বউ কলপাড়ে গোসল করছে— দৃশ্যটা হারিস মিয়া রাস্তা থেকেই দেখল। পিঁপড়ে জমার কারণটা তখনই বুঝল। তা মিষ্টির চারপাশে পিঁপড়ের দল তো থাকবেই— লাল পিঁপড়ে, কালো পিঁপড়ে, মাদাইল।

যমুনা নদী বৃন্দাবনের ওপর দিয়ে প্রবাহিত। সেই নদীতে রাধা গোপীদের নিয়ে প্রত্যহ যায় কলসি কাঁখে জল আনতে, কলসিতে জল ভরতে বুক পানিতে নামে। ওপরের জল কলসি ঘুরিয়ে ময়লা সরিয়ে পরিষ্কার জল একটু নিচ থেকে নেয়। কলসিতে জল ভরতে ভরতে সখীদের নিয়ে রাধা প্রতিদিনই ঘাট মুখরিত করে জলকেলিতে মাতে। কৃষ্ণও যায় তাদের পিছু পিছু। সে চুরি করে করে দেখে, রাধা আর তার সখীদের গোসলের দৃশ্য। একদিন কৃষ্ণ যমুনার জলে নেমে ডুব দিয়ে আর ভেসে ওঠে না। সবাই ভাবে কৃষ্ণ ডুবে গেছে। রাধা ও সখীরা জলে নেমে কৃষ্ণকে খুঁজতে থাকে। এদিকে সে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে নদীতীরে রাখা মেয়েদের কাপড় আর রাধার খুলে রাখা হারসমেত লুকিয়ে কদম গাছে বসে বসে দেখতে থাকে রাধার ভেজা শরীরের মনোমুগ্ধকর রূপ। ঘাটে উঠে রাধা ভেজা শাড়িতেই কাপড় খুঁজতে থাকে, না পেয়ে অবশেষে এভাবেই কলসি কাঁখে বাড়ি ফিরে আসে।

কানু বসে দেখে রাধার সিক্ত যৈবন,

লেপ্টিয়া রয় তব সর্বাঙ্গ মোটন,

উপুড় হইয়া রাধা কলসে ভরে জল,

যৈবন পড়িল উথলি কাঁপাইয়া ভূতল।

ভেজা শাড়িত সিক্ত যৈবন দেখিয়া,

কানাই না পারে গাছেতে থাকিয়া,

ভেজা অঙ্গে রাধা হেলিয়া দুলিয়া,

কলসি কাঁখে যায় বাড়িত চলিয়া।

তা হারিস মিয়ার বাড়ির কাছে না আছে যমুনা নদী, না আছে কদম গাছ। থাকার মধ্যে আছে রাস্তার পাশে একটা বুরুম গাছ, দু-তিনটা মেরা গাছ। গ্রামগঞ্জে রাস্তার পাশে এমন গাছ আপনাতেই গজায়। বড় হলে গ্রামবাসী এই গাছ কেটে লাকড়ি করে। এই বুরুম গাছের ফল দেখতে একেবারে কয়েতবেলের মতো। কিন্তু এ ফলের গন্ধ এমন বিকট যে, নাকের কাছে গেলেই নাড়ি-ভুঁড়ি সব মুখ দিয়ে বের হতে চায়। এ গাছের ডাল আবার বড়ই নাজুক, এক টানেই ভেঙে পড়ে। তাই গাছে চড়ার জটিলতায় হারিস যায়নি, তলে দাঁড়িয়েই আজ বাঁশিবিহীন কৃষ্ণ হয়ে উঠল। নতুন বউয়ের গোসলের পুরো দৃশ্য বুরুম গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল হারিস। চোখ যেন নতুন বউয়ের দেহের প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে আটকে গিয়েছে। আর তখনই মনে মনে ভেবে রেখেছে, কয়েকটা বাঁশ আর বারো ফুটি এক বান টিন এনে বেড়াটা তুলে ফেলবে আজ-কালই।

পিঁপড়ে থেকে দূরে রাখতে হবে মিষ্টির হাঁড়ি।

বিছানা ছেড়ে হারিস মিয়া অনেক সময় নিয়ে যত্ন করে হুক্কাটি সাজাল। পুরনো দুর্গন্ধযুক্ত পানি ফেলে পুকুরের পানিতে ঢেউ খেলিয়ে নারকেল খোলটি আধা ডুবিয়ে নতুন পানি ঢুকিয়ে গুড়গুড় টান দিয়ে পানির পরিমাণ পরখ করে নিল। লোহার চিকন শিক দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হুক্কার কাঠের বডি আর কল্কের নিচের দিকটা পরিষ্কার করে এক ছিলিম তামাক কল্কেয় ভরে বাতাসার আকৃতির মতো কুচকুচে কালো রঙের গোল টিক্কা নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকল।

মিনারা একমুখী মাটির চুলায় চাল ধুয়ে ভাত চাপিয়েছে। মেরা গাছের চিলি খুব ভালো শুকিয়েছে বলে চুলার জ্বালটাও পড়ছে ভালো। অল্পক্ষণেই মধ্য দুপুরের গনগনে সূর্যের মতো চিলির আগুন পুরো চুলা ভরে লাল শিখা বাইরে বেরিয়ে এল। গোল টিক্কাটা মাটির চুলার এক চোখে রেখে একটু অপেক্ষা করতেই আগুন ধরে টিক্কাটির একধার তৃতীয়ার চাঁদের মতো বাঁকা হয়ে লাল হয়ে উঠল। হারিস মিয়া টিক্কা হাতে নিয়ে ফুঁ দিতে দিতে বউকে বলল, ‘রান্নাটা একটু তাড়াতাড়ি শেষ করো। আইজ হাটে যামু। কলপাড়ে টিনের বেড়া দেওন উচিত। বাড়ির বউ-ঝিরা গোসল করে আর সাতগাঁওয়ের লোকজন দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া দেখে, এটা সুবিধার লাগে না।’ মিনারা ‘হুঁ’ বলে জবাব দিয়ে রান্নায় মন দিল।

কাঁটাখালী বাজারে ফজল আলী মাতবরের গুদাম পাহারাদারের কাজ করে হারিস ছ’বছর ধরে। ২ হাজার টাকা মাইনেতে ঢুকেছিল, এখন ৬ হাজার টাকা মাইনে হয়েছে। তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলছে। চলছে নয়, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চালাচ্ছে। তিন ছেলে-মেয়ে, মিয়া-বিবি নিয়ে পাঁচজনের সংসার তো আর ৬ হাজার টাকায় চলে না। নিজেদের কোনো ধানি জমি নেই। খরচের আধিক্যে বর্গা করারও সাহস পায় না। তাই যেভাবে সংসার চলছে, উপরওয়ালার সুদৃষ্টি আছে বলতেই হবে!

মিনারা যতটা তাড়াতাড়ি পারে আলু-বেগুন কেটে থালায় রাখল। গতকালের সাতলিয়ে রাখা শোল মাছের ক’টা টুকরো বের করে পেঁয়াজ-কাঁচামরিচ কেটে এক পাশে রাখল। আগুনের কড়া আঁচে ভাতের হাঁড়িতে রীতিমতো কালবৈশাখী উঠেছে। বাঁশের ছাঁচ দিয়ে বানানো কাঠিতে ভাত নেড়ে কটা ভাত তুলে টিপে দেখল ফুটেছে কিনা। নাহ! আরো একটু সময় লাগবে। টোস্ট-বিস্কুটের মতো পাতলা মেরা কাঠের চিলিটা চুলার ভেতরে আরো একটু ঠেলে দিয়ে সে স্বামীর কাছে গেল।&dquote;&dquote;

হারিস মিয়া ততক্ষণে হুক্কার গভীর নেশায় মগ্ন।

দুচোখ বন্ধ করে লম্বা লম্বা কয়টা টান দিল টিক্কা থেকে তামাকে আগুন ধরানোর জন্য। লম্বা নিঃশ্বাসের ধমকে চার-পাঁচ টানেই পুরো টিক্কাটা সকালের উদীয়মান সূর্যের মতো কমলা রঙ ধারণ করেছে। টিক্কা থেকে তামাকে আগুন ধরে কল্কেটি যখন জ্বলন্ত ইটের ভাটার রূপ নিয়েছে, একটা সুখের ভাবনা মনে নিয়ে ছোট ছোট টানে মুখ ভরে ধোঁয়া ছাড়ছে, যেন ধ্যানমগ্ন এক ঋষি, গুড়গুড় শব্দে হালকা কোনো মিউজিক বাজছে। মিনারা এসে স্বামীর এ গভীর ধ্যান দেখে কথাটা তুলবে কিনা ভাবনায় পড়ল। ওদিকে চুলায় ভাত। দেরি হয়ে গেলে ভাত নরম হয়ে জাউ হয়ে যাবে। তাই আর ইতস্তত না করে বলেই ফেলল, ‘বড় মেয়েটা স্কুলে যায়, একটা ভালোমন্দ কাপড় নাই। বড় অইয়া যাইতাছে। মেয়েটার দিকে একটু নজর দেওয়া লাগব। পারলে এক সেট জামা আর এক জোড়া জুতা আনিয়েন। ছোট পুলাটার একটা হাফপ্যান্ট আর বড়টার জন্য একটা লুঙ্গি আনিয়েন। আরবি পড়তে পারে না লুঙ্গির অভাবে।’

কথা শেষ করে মিনারা ফের রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকল। হাঁড়ির কালবৈশাখী এখন পড়তির দিকে। মিনারা দ্রুত ভাতের অবস্থা দেখে মাটির সরাটি ভাতের পাতিলে চাপিয়ে মাড় ঝরানোর জন্য মাটির টিলায় উপুড় করে দিল। দ্রুত হাতে তরকারির পাতিল চাপিয়ে সব মসলা কষিয়ে কেটে রাখা নিজের ক্ষেতে চাষ করা ছোট ছোট লাল আলু আর বেগুন দিয়ে সাতলিয়ে রাখা শোল মাছ ছেড়ে দিল। দাগানো পেঁয়াজের ঝাঁঝে হ্যাঁচ্চো হ্যাঁচ্চো করতে করতে মিনারার চোখ-মুখ লাল হয়ে চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগল।

মিনারার কথা শুনে হারিস মিয়া আর দেরি না করে উঠে দাঁড়াল। এখনই বড় বাজারে যেতে হবে। তার আগে কাঁটাখালী বাজারে গিয়ে মহাজনকে হাতে-পায়ে ধরে দুই মাসের বেতন নিতে হবে, যেভাবে হোক নিতেই হবে। মহাজন বড় কৃপণ স্বভাবের, ওকে দেখলেই হারিসের মুখ দিয়ে আপনাই বের হয়ে আসে— শালা ইতর। সহজে ট্যাঁক থেকে টাকা খুলতে চায় না। এত বড় একজন ধানের ব্যবসায়ী, কিন্তু খরচের হাত একেবারে মহানন্দার চর। ব্যাপারিরা আসলে আবার চরে জোয়ার আসে, ভুলে যায় সে যে আস্ত এক কৃপণ। জামাই আদর করে তাদের খাওয়াবে। কোথায় জল দিলে কোথায় তেল পড়বে, সে জ্ঞান টনটনে। মহাজনের কথা— ওরাই তো ব্যবসার লক্ষ্মী, ওরা আছে বলেই তো আমরা দুইটা পয়সাকড়ির মুখ দেখি। সেয়ানা নাম্বার ওয়ান, নিজের ব্যাপারে পুরাই ষোলআনা, শালা ইতর কোনখানকার!

সকালের খাবার খেয়ে হারিস মিয়া মহাজনের কাছে গেল টাকা আনতে। মহাজন তার স্বভাবসুলভ কৃপণতায় এক মাসের বেতনই দিল। পীড়াপীড়িতে ১ হাজার অ্যাডভান্সসহ ৭ হাজার টাকা দিল। টাকা নিয়ে মনে মনে একটা গালি দিয়ে হারিস বড় বাজারে রওনা হলো।

২.

আমির আলী বয়সে হারিসের ছয় বছরের বড়। আমির আলীর মায়ের মৃত্যুর পর তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন ছোট শালী খোদেজা বেগমকে। তখন আমিরের বয়স কেবল সাড়ে চার বছর। শেষের তরফে হারিস মিয়া আর ছোট বোন শিউলীর জন্ম। সৎ ভাই-বোন হলেও বাইরে থেকে পরিবারটিকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে, ওরা সৎ ভাই-বোন। খোদেজা বেগম তিনজনকেই নিজ ছেলেমেয়ের আদরে মানুষ করেছেন। আমিরের সাথে খোদেজা বেগমের সম্পর্ককে কিছুতেই সৎ মা-ছেলের সম্পর্ক বলা যাবে না। বাবা গত হয়েছেন সেই কবে! মাকে হারিয়ে মনে এতই কষ্ট পেয়েছিল, পাগলপ্রায় আমির বহু কষ্টে সংসারে মন দেয়।

হারিসও বড় ভাইয়ের জন্য কম করেনি। পাঁচ বছর আগে আমির আলির বউ আছিয়া প্রথম সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে যমে দাইয়ে টানাটানির একপর্যায়ে বুড়ি দাইকে টা টা বাই বলে যখন যমের হাত ধরে পরপারে চম্পট দিল, একদিনের শিশুটিকে হারিসের বউ মিনারাই কোলে তুলে নিয়েছিল। বাচ্চা ও বাচ্চার বাবার সব দায়দায়িত্ব হারিস মিয়া নেয়। আছিয়ার মৃত্যু আমিরকে একেবারে সংসার বিবাগী করে তোলে। কিন্তু তিন বছরের ছেলেটিকে দেখাশোনা করার জন্যও একজন মায়ের দরকার। আমির আলীও পাঁচ বছরে মা হারান, তেমনি ছেলের ভাগ্যও তার মতোই— মা হারাল জন্মের সাথে সাথেই। পিতা-পুত্রের ভাগ্য একই সূত্রে গাঁথা।

বছর দুই আগে একই গ্রামের মুমিন মণ্ডলের বিধবা মেয়ে ময়নাকে পুনরায় আমির আলী বউ করে ঘরে আনে। মেয়েটির বয়স বেশি নয়। ১৭ কি ১৮ হবে। প্রথম স্বামী প্রবাসী ছিল। সৌদি আরবে এক শেখের গাড়ি চালাত। অ্যাকসিডেন্টে স্বামী মারা যায়। সেই সাথে শেখের বেটাও নাকি মরেছিল। লাশ আর দেশে আনেনি, ক্ষতিপূরণও তেমন পায়নি। নাবালিকা মেয়েটি স্বামী কী রত্ন চেনার আগেই হারিয়ে ফেলে সেটি। আমির আলীর সাথে বিয়ে হওয়ার সাথে সাথেই তিন বছরের ছেলেসহ নিজের থেকে প্রায় ২০ বছরের বড় একজন স্বামী পায়। এতে ময়না কতটুকু খুশি হয়েছিল, সে কেবল বিধাতাই জানে!

ময়নার বাপের বাড়ি কিছুটা অবস্থাসম্পন্ন। এখানে এসে নিজেকে মানিয়ে নিতে বেশ কষ্ট হচ্ছে বোঝা যায়। বোঝা যায়, স্বামীকেও তেমন পছন্দ হয়নি। পরনির্ভরশীল বাঙালি মেয়েদের পছন্দ-অপছন্দের ধার কেউ ধারে না। তিন বছরের বাচ্চাটিকে বুকে করেই বাঁচতে শেখার চেষ্টা করে চলছে প্রতিনিয়ত, ভাগ্যের সাথে মনের যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে নিত্যদিন। বাড়ির মানুষগুলোকেও আপন করার প্রাণান্ত চেষ্টা চালাচ্ছে। ছোট জা মিনারা খাতুন বয়সে ময়নার ১২-১৩ বছরের বড়। অথচ দেবরের বউ বলে ভাবিও ডাকতে পারছে না আবার হাসুর মা বলতেও জিহ্বায় বাধে। তাই বুবু বলেই ডাকে ময়না। যেদিন এই বাড়িতে প্রথম ময়না পা দিয়েছিল, এই মিনারা বেগমই স্বাগত জানিয়েছিল শাশুড়িহীন শাশুড়ির বাড়িতে।

মেদহীন মাঝারি গড়নের কালো রঙের মিনারা বেগম দেখতে মোটেও সুশ্রী নয়, কিন্তু অন্তরটি তার বড় সুন্দর, বড় মোলায়েম। প্রথম দেখায় মিনারাকে পছন্দ না হলেও তার মাতৃসুলভ আচার-ব্যবহার ময়নার বড়ই ভালো লেগেছে। তবে একমাত্র দেবর হারিস মিয়া বেশ হাসি-খুশি আর প্রাণবন্ত। ছোট দেবর হারিস মিয়ার সাথে ময়নার বেশ কথাবার্তা হয়। চোখের মাঝে এমন একটি মায়াবি দৃষ্টি রয়েছে, যেন সহজেই নির্ভর করা যায়, বিশ্বাস করা যায়। কিন্তু স্বামীটি যেন কেমন! সাত চড়ে রা নেই। সারাক্ষণ শুয়ে-বসেই সময় কাটায়। পুরুষ মানুষের কাজের প্রতি কোনো আগ্রহ নেই, জীবনে এই প্রথম দেখল ময়না। তবে ওদের দুই ভাইয়েরই গায়ের রঙটি বেশ সুন্দর— উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণ। কিন্তু একমাত্র ননদ শিউলির রঙ কিছুটা চাপা।

৩.

আজ ঘুম ভেঙে ময়না দেখল, বড় জা অনেক আগেই রান্না চাপিয়ে দিয়েছে। দুটি পাটকাঠি ভেঙে চার টুকরা করে আগুন আনতে গেল মিনারার রান্নাঘরে। পাঠকাঠির মাথায় মশালের মতো আগুন নিয়ে এসে ময়না নিজের চুলা ধরাতে ধরাতে শুনল ওদের দুই ভাইয়ের কথা। আমিরকে বলছে, কলপাড়ের চারদিকে জংলি গাছগুলো তুইল্লা পরিষ্কার করে রাইখেন। বিকাল নাগাদ টিন, বাঁশ আর গুনা এনে বাকি দিনটা আর আগামীকাল মিলেই বেড়া শেষ করে ফেলব। ময়নার স্বামী বিড়বিড় করে কী বলল শুনতে পায়নি সে। এ কথা বলেই হারিস বাজারের উদ্দেশে রওনা হলো। ময়না আগুন আনতে গিয়ে শুনেছিল, হারিস আজ গঞ্জে যাবে টিন আনতে, কলঘরের চারধারে বেড়া দেয়ার জন্য। শুনে মিনারা খুশিই হলো। এমন উদেল কলপাড়ে গোসল করতে ময়নার বড় অস্বস্তি লাগে। যে ঝোপঝাড়টি এতদিন কলপাড়টিকে ঘিরে রেখেছিল, বর্ষার পানিতে সেগুলো মরে গিয়ে জ্বালানি হয়ে নিঃশেষ হয়েছে সেই কবেই ময়নার প্রথম জীবনের স্বপ্নের মতো। প্রায় দিনই রাস্তা থেকে কিছু ছোকরা লাইভ বিনোদন উপভোগ করে, সেটা ময়না বোঝে। মিনারা আর তার মেয়ে হাসু গোসল, ধোয়া পাকলা করতে চলে যায় বাড়ির পশ্চিমের ডোবায়। সেখানে বাড়ির জোয়ান পুরুষ, মহিলারা এমনকি গাই গরুকেও একসাথে গোসল করানো হয় বলে ময়নার ভালো লাগে না। তাই সে বাড়িতেই টিউবওয়েল চেপে গোসল করে। পরশু গোসল করতে করতেই ময়না শুনতে পেয়েছিল রিকশার টুংটাং শব্দ। কৌতূহলী হয়ে রাস্তায় তাকাতেই দেখল, হারিস মিয়া রিকশা থেকে নামল। মিনারার সারা শরীরে তখন ভেজা কাপড় লেপ্টে আছে। ব্লাউজহীন শরীরটাকে যতই আড়াল করতে চাইছে, ততই যেন শরীরটি নিজেকে মেলে ধরতে চাইছে। ময়নার এ ইতস্তত ভাব মনে হয় হারিস বুঝতে পেরেছিল, তাই যতক্ষণ না গোসল শেষ হয়, ততক্ষণ হারিস বাড়িতে ঢোকেনি। হারিসের এ সৌজন্য বোধে ময়না মনে মনে কৃতজ্ঞ হয়ে উঠেছিল তার প্রতি।

সন্ধ্যার কিছু আগে হারিস বাজার থেকে ভ্যানে করে সব সরঞ্জাম পাঠিয়ে দিল। নিজে দুটো শপিং ব্যাগ হাতে নিয়ে বাড়িতে ঢুকেই ময়নার জানালার কাছে গলা হাঁকারি দিল। কোনো সাড়াশব্দ নেই। একবার ডান হাতের ব্যাগের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবল। ভেতরে এসে দেখে, ঘরের দরজায় তালা ঝুলছে। ব্যাপার কী? ব্যাগটি কোথায় লুকাবে, তা ভাবার আগেই ছোট ছেলে বাবাকে দেখতে পেয়ে সব ব্যাগ হ্যাঁচকা টানে হাতে নিয়ে ভোঁ দৌড়ে ঘরে এসে উপুড় করে ফেলল চৌকিতে। আরেক হাতে জিলাপির ঠোঙা থেকে জিলাপি বের করে মুখে পুরল। হাসু হা-হা করে তেড়ে এল— সর সর... কাপড়ে রস পড়বে, রাইতের বেলায় ইন্দুরে কাটবে... বলতে বলতে হাসুর চোখ আটকে যায় বেগুনি রঙের জারুল ফুলের নকশার শাড়িটায়। নিজের থ্রিপিস না খুলে বিস্ময় নিয়ে শাড়িটির ভাঁজ খুলে বিকট চিত্কার দিল— মা মা ওমা... ঘটনাগুলো এতই দ্রুত ঘটে গেল যে, পরিস্থিতি হারিস মিয়ার প্রতিকূলেই চলে গেল। মিনারা ঘরে ঢুকতেই তারেকের মায়ের কথা জানতে চাইল। মিনারা বলল— ময়না তার বাপের বাড়ি গেছে। তালুই সাবের শরীর নাকি বড়ই খারাপ। এখন তখন অবস্থা। আমাদেরও যাওয়া উচিত। তারেকের মা অবস্থা বুইজ্যা ফোন দিলেই আমরা যামু।

সন্ধ্যার অন্ধকারে কেউ দেখল না, হারিস মিয়ার মুখে সন্ধ্যাটা যেন আরো গাঢ় হয়ে নেমে এল অমাবস্যা রাতের মতো। মিনারার দুচোখ খুশিতে চকচক করছে এত সুন্দর শাড়ি দেখে। পড়ন্ত সূর্যের লাল আভাটুকু সবটাই যেন মিনারার মুখ শোষণ করে নিল। আর গাঢ় অন্ধকারটি যেন লেপে দিল হারিস মিয়ার মুখে। মিনারা একটু কপট রাগেই বলল— ঘরে কত দরকারি জিনিস আনতে হবে, তা না করে কোন আন্দাজে আমার জন্য এত দামি একখান শাড়ি নিয়ে এলেন? আপনার আক্কলবুদ্ধি আর কোনোদিনও হবে না। বলছে বটে মিনারা কপট রাগ মিশিয়ে, কিন্তু তার গলায় যে মধু ছিল, হারিসের মন খারাপ সত্ত্বেও টের পেয়েছিল। কিছুদিন আগেও এমন কপট অভিযোগ শুনলে হারিসের মন ভরে যেত, আজ আর কোনো কথারই কোনো মানে বোঝার মন রইল না।

মিনারা যে এ শাড়ি পেয়ে কতটা খুশি হয়েছে, তা রাতে খাওয়ার সময়েই বুঝেছে হারিস। রাতে খেতে বসে হারিস মিয়া অবাক হয়ে দেখল, মুরগির গোস্তের বাটি এগিয়ে দিচ্ছে বউ। মুরগি কেন জানতে চাইলে বউ লজ্জা পেয়ে বলেছিল— চারটা মুরগির বাচ্চা ছিল ঘরে। বেরাম টেরাম ধরবার আগেই ভাবলাম জবাই করে ফেলি। হারিস মিয়া জানে, নতুন শাড়ি পেয়ে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ এই রান্না। হারিস মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবে, হায়! মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক, কার জিনিস কে ভোগ করে। জারুল গাছের ডালে বসে ময়নার আর গান গাওয়া হলো না।

গভীর রাত। বাচ্চারা সব খেয়েদেয়ে ঘুমিয়েছে। হারিস মিয়া মাটির বারান্দার একপাশে বসে এক মনে হুক্কা টানছে শূন্য মনে— সেই মনে নেই কোনো রাগও আবার নেই বিষাদও, আছে কেবলই শূন্যতা। হারিসের কানে ভাসছে জনার্ধন মিস্ত্রির কণ্ঠ— মিয়া, ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া খোয়াব দেখো নাকি? আর চোখের সামনে ভেসে উঠছে রাধা-কৃষ্ণের যুগল মূর্তি।

মিনারা পাশে এসে বসল। স্বামীর কাঁধে হাত রেখে বলল— ঘরে চলুন। হারিস ঘরে যাওয়ার কোনো তাগাদা অনুভব করে না। সে চুপচাপ শূন্য মন নিয়ে বসেই থাকে। মিনারা স্বামীকে হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় বিছানায়। মিনারা স্বামীকে আলিঙ্গনে আর আদরে জাগিয়ে তুলতে চাইছে। নতুন কাপড়ের মচমচে শব্দ আর গন্ধ, মিনারার বাড়তি আদর হারিস মিয়াকে নিয়ে গেল ১৫ বছর আগের একটি রাতে। মিনারার আগুনের তাঁতে হারিস একটু একটু গরম হয়ে উঠছে। মিনারার গা থেকে জারুল গাছের বাঁধন খুলতে খুলতে হারিস অনুভব করল— তার দুহাতের বেষ্টনীতে গলে পড়ছে গতকাল দেখা কলপাড়ের ভেজা শাড়ি লেপ্টে থাকা রহস্যময়ী সেই মানবী, যার শরীরের প্রতিটি ভাঁজ হারিস আবিষ্কার করে চলেছে আদিম এক উন্মাদনায়।