দুই বাংলায় তাঁত বয়ন মসলিন নিয়ে এ-যাবত্কালে প্রকাশিত গবেষণা গ্রন্থে একটি ছোট্ট শব্দ সবসময় উল্লিখিত হয়েছে। শব্দটি কার্পাস আর মসলিনের ইতিহাসের সঙ্গে বইয়ের পাতায় মুদ্রিত হয়ে আছে। শব্দটি একটি গ্রামের নাম। চলেন নমুনা দেখি— তিনবাদী, তিতাবাদি, টিটবাদি, তীতবাদী, তিতবদ্দি, তিতাবাদী, তিতাবাটি ইত্যাদি।

১. ‘ঢাকা, সোনারগাঁ, ডুমরাই, তিনবাদী, মঙ্গলবাড়ি এবং বাজিতপুর, তুলার প্রধান আড়ং বলিয়া পরিচিত ছিল।’ -বয়নবিদ্যা, পৃষ্ঠা ২০, লেখক-অজ্ঞাত (আনুমানিক ১০০ বছর আগের প্রকাশনা।)

২. ‘ঢাকা জিলার তাঁত শিল্প ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে জেমস টেলর নিজের চোখে দেখেছেন। তাঁর মতে ঢাকা জিলার প্রত্যেক গ্রামেই কম-বেশি তাঁতের কাজ চলত, কিন্তু উত্কৃষ্ট ধরনের মসলিন তৈরির জন্য কয়েকটি স্থান বিশেষ প্রসিদ্ধ ছিল। এইগুলি হচ্ছে, ঢাকা, সোনারগাঁ, ধামরাই, তিতাবাদি, জঙ্গলবাড়ি ও বাজিতপুর।’

‘তিতাবাদি কাপাসিয়া থানার অন্তর্গত, লখ্যা নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম। এখানে উত্কৃষ্ট ধরনের ফুটি কার্পাস জন্মাতো এবং এখানে মোলায়েম ও সূক্ষ্ম মসলিন তৈরি হতো। জেমস টেলর তিতাবাদিতে প্রায় ২০০ ঘর তাঁতি পরিবার দেখে ছিলেন।’

-ঢাকাই মসলিন, আব্দুল করিম, পৃষ্ঠা ১১-১২-১৩-১৪ (a descriptive and historical account of the cotton manufacture of dacca, p. 4), বাংলা একাডেমি, ঢাকা।

৩. ‘লাক্ষা নদীর পূর্বে কাপাসিয়া থানার তিতবাদি ছিল এক সমৃদ্ধ গ্রাম। এখানে জন্মাতো ফুটি কার্পাস যা দিয়ে তৈরি হতো সূক্ষ্ম মসলিন।’

- ঢাকার মসলিন, মুনতাসীর মামুন, পৃষ্ঠা ১৩, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।

৪. বাংলার বস্ত্র সম্বন্ধে ই. বেন্স নামক একজন ইংরাজ লেখক ‘ব্রিটেনের কার্পাস শিল্পের ইতিহাস’ নামক পুস্তকে লিখিয়াছেন যে বাংলার কোন কোন বস্ত্র এমন সূক্ষ্ম যে মনে হয় ইহা কোনো পরী বা পতঙ্গ কীটের বয়ন, মানুষের হস্তজাত নহে। এই প্রদেশের মসলিন খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীতে বিখ্যাত হইয়াছিল। ঢাকা জেলার মধ্যে ঢাকা, সোনারগাঁ, ডুমরোর, তীতবাদী, জঙ্গলবাড়ী, বাজিতপুর, কাপাসিয়া প্রভৃতি স্থান কার্পাস শিল্পের আড়ং ছিল।

ডুমরোর সাভারের নিকটে, বংশী নদীর তীরে। ইহা এ প্রদেশের প্রাচীনতম শিল্পস্থান। অধিবাসী প্রধানত হিন্দু। এখানে বস্ত্র অপেক্ষা সূক্ষ্ম বস্ত্রের উপযোগী সুসূক্ষ্ম সূত্র অধিক উত্পন্ন হয়। তাঁতির সংখ্যা ৪০০ ঘর। তীতবাদী লক্ষীয়া নদীর তীরে, কাপাসিয়ার নিকটে।

উত্তম তুলা এই প্রদেশে উত্পন্ন হয়; সেই জন্য এই প্রদেশের নামই হইয়াছে কাপাসিয়া।

-ঢাকার বস্ত্র ব্যবসায়ী, প্রবাসী, ৫ম সংখ্যা, পৃষ্ঠা ২৭১-২৭৮

৫. ‘ঢাকা, সোনারগাঁও, ডেমরা ও তিতবদ্দি নামক স্থানে সর্বোত্কৃষ্ট মসলীন প্রস্তুত হইত। মুড়াপাড়া, বালিয়াপাড়া এবং লাক্ষ্যা নদীতীরস্থ অন্যান্য গ্রামে নানাবিধ মসলীন সর্ব্বদাই প্রস্তুত হইত।’

- ঢাকার ইতিহাস, ১ম খণ্ড পৃষ্ঠা ১৫৮, শ্রী যতীন্দ্রমোহন রায়, প্রকাশ ১৯১২। কলকাতা

৬. ‘লাক্ষা নদীর পূর্বতীরে কাপাসিয়া থানার তিতাবাদী ছিল একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম। এখানে খুব উত্কৃষ্ট ধরনের কার্পাস জন্মাত, যা দিয়ে অতি সূক্ষ্ম ও মোলায়েম মসলিন তৈরি হত। জেমস টেলর এখানে দু’শো ঘর তাঁতি দেখেছিলেন।’

- পৃথিবীর তাঁতঘর, পৃষ্ঠা-৪৮, সুশীল চৌধুরী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৭. ‘ঢাকার শ্রেষ্ঠ প্রসিদ্ধ মসলিন উৎপাদনকারী এলাকাগুলোর মধ্যে ছিল ঢাকার সোনারগাঁ, পশ্চিমে ধামরাই এবং উত্তরে ভাওয়ালের বর্তমান গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার অন্তর্গত তিতাবাটি ও কিশোরগঞ্জের জংগলবাড়ি। এই কাপড় এত সূক্ষ্ম ছিল যে, চল্লিশ হাত লম্বা ও দুই হাত চওড়া এক টুকরো একটি আংটির মধ্য দিয়ে নেয়া যেত। কাপাসিয়া তিতাবাটি অঞ্চলের ফুটি কার্পাস কেবল ভারতেই শ্রেষ্ঠ ছিল না, ছিল সমগ্র বিশ্বের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, যার দ্বারা বিশ্বের সেরা সূক্ষ্ম মসলিন তৈরি হতো।’&dquote;&dquote;

- গাজীপুর জেলা ফেসবুক পেজ

একটি গ্রামের নাম কেন একেক লেখকের লেখায় একেক রকম? এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? বিষয়টি কৌতূহলোদ্দীপক বৈকি! আমি নিজে একজন তাঁতসেবক, যা আমার নিতি দিনলিপি। তাঁত ও বস্ত্র বয়ন বিষয়ে আমার পাঠ যথেষ্ট সমৃদ্ধ হয়তো নয়, হলে আরো কিছু উদাহরণ হাজির করা সহজ হতো। সে যা-ই হোক, বাংলাদেশের ৬৮ হাজার গ্রামের মধ্যে এ গ্রামটি ঠিক কোথায়, তা জানতে পারলে তার নামবৈচিত্র্যের কারণও হয়তো অনুধাবন করা যেতে পারত। মসলিনখ্যাত এ গ্রাম তার অনিবার্য বানান শুদ্ধতা নিয়ে হাজির হতে পারতো।

নিতান্তই নিরীহ এ শব্দটি একেক প্রকাশনায় আছে ভিন্ন ভিন্ন বানান ও নামে। বস্ত্র বয়ন শিল্পের একটি খুব সামান্য বিষয় এখানে উল্লিখিত হলো। দুর্ভাগ্যের বিষয় তারা কেউই এখানে উল্লিখিত জায়গার নামধাম ও বিশেষত্ব অনুসন্ধানের সরেজমিন পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনও বোধ করেননি বোধহয়। তবে কি প্রত্যেকেই অন্ধের মতো কোনো সূত্রকে ব্যবহার করেছেন? এমনকি বিলাতি প্রশাসকদেরও যে বিস্তর ভুলভাল হতে পারে, সে সন্দেহও দেখা দেয়নি তাদের মনে? ফলে শীতলক্ষ্যা নদীর নামটিও কোথাও পরিপূর্ণভাবে লিখিত হয়নি। এমনকি এই নামের কোনো গ্রাম আদৌ আছে কিনা, আর থেকে থাকলে তার সন্ধান ও এর পরিশুদ্ধ নামটি কী? এমন কি হতে পারে যে, ইংরেজ ‘সাহেব-সুবোদের’ লেখনী থেকে গ্রাম নামটি ইংরেজি থেকে বাংলা তর্জমা করতে গিয়ে এ নাম বানান বিপর্যয়?

শীতলক্ষ্যা নদীকে সংক্ষেপে লক্ষ্যা বলে স্থানীয়রা। যে নদীটি ঢাকার অদূরে একদা বৃহত্তর ঢাকা জেলার অধুনা গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। লক্ষ্যা নদীর দুই পাশেই কাপাসিয়া উপজেলা। এ নদীর কোনো ভাঙন নেই যে শত বছর আগের কোনো গ্রাম ভাঙনে বিলীন হয়ে থাকবে। কাপাসিয়া উপজেলার বর্তমান মানচিত্রে যেসব প্রধান প্রধান গ্রাম নাম আছে, তাতে উল্লিখিত ‘বর্ধিষ্ণু’ গ্রাম হিসেবে তিতাবাদির উল্লেখ নেই! আমার বেড়ে ওঠা যে কাদামাখা গ্রামে, তা থেকে এক কিলোমিটার দূরে ব্রহ্মপুত্র নদ, আর তার ওপারে কাপাসিয়া উপজেলা। সেখান থেকে কিলো ১০ ভাটিতে যেখানে শীতলক্ষ্যা আর ব্রহ্মপুত্র মিলিত হয়েছে, সেখানটার দুই কিলোমিটার আগে বলা যায় পূর্বদিকে একটি গ্রাম আছে, যার নাম কীর্তিবাসদী। এই কীর্তিবাসদী গ্রামটি কিন্তু কাপাসিয়া ও মনোহরদীর সীমানাঘেঁষা গ্রাম। তবে কি কালের পরিক্রমায় তিতাবাদী (!) আজকের কীর্তিবাসদী? যা স্থানীয় উচ্চারণে কিস্তিবাদী! নাকি এই কিস্তিবাদীই ইংরেজ উচ্চারণে তিতাবাদী হয়েছে? এসবই সম্ভাবনা, যা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না!

কেননা উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ‘আমরা যাহাকে টানা-পাতা বা টানা-ফেলা বলি, ঢাকা অঞ্চলের তন্তুবায়েরা তাহাকে টানা সুতনা বা টানা সুতানো বলিয়া থাকেন। পূর্ববঙ্গের অনেক স্থানে অশিক্ষিত লোকের উচ্চারণে স হ হয়। এইজন্যই আমাদিগকে ঢাকাই তন্তুবায়দিগের মুখে সুতার বদলে হুতা, সানার বদলে হানা ইত্যাদি শুনিতে হয়। টানা-পাতা অর্থাৎ টানা-সুতনা যে, পূর্ববঙ্গীয় মুখে টানা-হুতনা হয়; বস্তুত সুতনা আর হুতনা যে একই শব্দ, তাহা যাঁহারা না বুঝেন, তাঁহারাই গোলে পড়েন। বঙ্গীয় বয়নবিদ্যার ইতিহাস লিখিতে গিয়া, অনেক ইংরেজকেই এইরূপ গোলে পড়িতে হইয়াছে। তাঁহাদের বস্ত্রঘটিত ইতিবৃত্তেই স স্থানে হ দেখিতে পাইবেন। কিন্তু ঢাকার দীর্ঘ প্রবাসী অভিজ্ঞ ইংরেজরাও সুত-নাটানী, সুত-মোড়া, সুত-বাতান প্রভৃতি লিখিতে লিখিতে, টানা-হুতানো বা টানা-হুতানা লিখিয়া বসিয়াছেন, ইহাও ত দেখিতে পাওয়া যায়।’ ১

আবার এই অঞ্চল একদা ভাওয়াল রাজা তথা সন্ন্যাসীর ভাওয়াল পরগণার অন্তর্ভুক্ত ছিল। তখন তা কাপাসিয়া থানার অন্তর্ভুক্ত ছিল? যা পরবর্তীতে নানা প্রশাসনিক পরিবর্তনে বর্তমানে মনোহরদী উপজেলার অন্তর্গত? প্রবাসে থেকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে এ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে এখনো গ্রামটির কোনো হদিস মেলেনি (অনুসন্ধান অব্যাহত)! তবে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে গেলে সরেজমিন অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য বলেই মনে হয়। ফলে আজকে যদি এই নামে কোনো গ্রাম কাপাসিয়াতে না থেকে থাকে, তবে পূর্বোক্ত গবেষণা রচনাবলির মান সম্পর্কে প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক!

বাংলার বস্ত্রশিল্পের চূড়ান্ত বিকাশের সময়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে ব্রিটিশ পরবর্তী সময়ে অতীত রোমন্থন জাতীয় ইতিহাস চর্চাই জারি থেকেছে এমন ভাষ্যও ঘুরেফিরে! এ কথা মনে করার কোনো কারণ নেই যে কোম্পানি আমলের বা তার আগের বিদেশী বেনিয়াদের দলিল-দস্তাবেজের বিবরণ বিশ্লেষণ প্রয়োজনীয় নয়। তবে কি নিজস্ব তথ্যস্বল্পতার কারণে অতিমাত্রায় এই তথ্য আদর? কিন্তু পক্ষান্তরে এসব ইংরেজ প্রশাসকদের অত্যাচার আর দেশ তথা বয়নবিরোধী অবস্থান আমাদের তো অজানা নয়। বাংলার বস্ত্র বয়ন ইতিহাসের সূত্রা-সূত্র হিসেবে একটা বিশাল জায়গা নিয়েছে কোম্পানি আমলের দলিল-দস্তাবেজ। সেটাকেই আমরা গবেষণার আকর বা নিয়ামক ধরে নিয়েছি। কারো কারো মতে, ‘কোম্পানির রেকর্ডসের ওপর অত্যধিক নির্ভরতার ফলে এদেশীয় চিত্রটি সম্বন্ধে তাঁদের খেয়াল থাকে না, বা তা নিয়ে বিশেষ যত্নবান হন না।’

আশা করি, এ বিষয়ে যথাযথ অনুসন্ধান করে এ তথ্য বিভ্রান্তি দূরীকরণে কেউ না কেউ উদ্যোগী হবেন।

১. বয়নবিদ্যা, পৃষ্ঠা ৫৩, লেখক-অজ্ঞাত