আমার গোপন পাপগুলি এতদিন পর

বিরূপ-বৈরিতায় শাস্ত্রপাণি হয়ে উঠছে

এবার তাদের বজ্র নির্ঘোষ কণ্ঠে

উচ্চারিত হলো— আমার কঠোর দণ্ডাজ্ঞা

আমার মাথার ওপর উত্তোলিত তীক্ষ কৃপাণ

চোখের সামনে জ্বলন্ত লাল লৌহশলাকা

ওদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবার ওরা অটল

আমার সর্বাঙ্গ ছেঁকে ধরেছে মাছির মতো

বিস্ফোটক দগদগে ঘা পুঁজ আর শটিত গরল

গোপন পাপের শরশয্যায় শুয়ে আমি

নিদারুণ তৃষ্ণায় ছটফট করছি— হায়রে জলধারা

কিন্তু এবার ওরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ— নিষ্কৃতি নেই আমার

নির্বাসনে মৃত্যুদণ্ড— ঠাণ্ডা চোখে দেখছি আমি

নীল কুয়াশায় ঢাকা পড়ছে আমার দেহ।   

প্রতিনায়কের স্বগতোক্তি: বেলাল চৌধুরী

 

বলা হয়— ষাটের দশক হলো বাংলা কবিতার বোহেমিয়ান দশক। ষাটের কোনো কোনো কবি বোহেমিয়ান স্বভাবকে ভেবে নিয়েছিলেন কবি চরিত্র। বেলাল চৌধুরী সেই বোহেমিয়ান স্বভাবীদের একজন। কবিতার চেয়ে কবি চরিত্র যখন প্রধান হয়ে ওঠে, তখন কবিতা বিষয়টি অনালোকিত থেকে যায়। বেলাল চৌধুরীর ক্ষেত্রে সেটা প্রধান হয়ে উঠেছিল। ফলে তার কবিতার চেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে উদ্দাম স্বভাবের গল্প। নানা মিথ। সেই গল্প কিংবা মিথ সাহিত্যিক সৃষ্টিশীলতায় যত না রটেছে, তার চেয়ে বেশি রটেছে সাহিত্যিক সমাজের মুখে মুখে। এটা যেন কোনো কবির জন্য দুঃখজনক ব্যাপার। বেলাল চৌধুরীর কবিতা পড়লে সেই দুঃখ হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়। ‘প্রতিনায়কের স্বগতোক্তি’ কবিতায় বেলাল বলছেন, ‘ঠাণ্ডা চোখে দেখছি আমি/ নীল কুয়াশায় ঢাকা পড়ছে আমার দেহ’। যেন নীল কুয়াশায় ঢাকা পরা এক বেদনার্ত কবি। কিংবদন্তি নানা মিথ আর কাহিনীর নিচে চাপা পড়ে গেছে কবিতা। যে দৃশ্য কবির চোখকে ঠাণ্ডা কিংবা নিস্তেজ করে দেয়, তা তো জীবন সঙ্গিনতার নৈঃশব্দ্যেরই প্রতিফলন। মানে শেষ নাগাদ কবির আর কিছুই করার থাকে না। একাকার কবিত্ব যেখানে নিশ্চল বাসনার কুঠুরিতে ঠাঁই নেয়। কেন?

প্রশ্ন হচ্ছে— বোহেমিয়ান কবি বেলাল চৌধুরী কি নিজেকে ‘প্রতিনায়ক’ ভেবেছিলেন? বোহেমিয়ান তো কোনো রূপকল্প নয়। এটা স্বভাবজাত পদ, যা ব্যক্তির রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই আচরণ। এমনকি— বোহেমিয়ান রূপকল্প অনুশীলননির্ভর নয়। রাজনৈতিক আচরণের দুটি ভাবগত দিক আছে। একদিকে প্রচলিত সমাজ কাঠামো থেকে বেরিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে ক্ষমতা কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। বেলাল চৌধুরীর জীবন শুরু হয়েছিল সেইরূপ আকাঙ্ক্ষা দিয়ে। আচরণগত দিক দিয়ে তিনি তরুণ বয়সে প্রচলিত সমাজ কাঠামো থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতা-কাঠামো থেকে কতটুকু বেরোতে পেরেছিলেন, সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ ব্যাপার। বোহেমিয়ান জীবনের সঙ্গে সাহিত্যিক সম্পর্ক যত না, তার চেয়ে বেশি শৃঙ্খলহীন জীবনের আনন্দ উদযাপন করেছেন তিনি, যা জীবন স্রোতের বিপরীতে পাল্টা স্রোত সৃষ্টি করেছে। সেই স্রোতে বেলাল নিজেকে বিশেষ অপচয় করেছেন বলা যাবে না। বরং পাল্টা স্রোতে মিশে নিজের ঠিকুজি চিনে নিতে চেয়েছেন। সাহিত্যে এটা নিদারুণ খেলা! সেই অর্থে— বেলাল চৌধুরী নিজেকেই উদযাপন করেছেন। ‘নিরুদ্দেশ হাওয়ায় হাওয়ায়’ পুস্তকে সেসব কথা প্রস্ফুটিত হয়ে আছে।   

বেনিয়া ব্রিটিশের তত্ত্বাবধানে ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগ বাংলার সর্বমানসে দাগ কেটেছিল। হিন্দু-মুসলমানের এই ধর্মীয় বিভাজন শুধু ভূখণ্ড ভাগ করেনি। ভাগ করেছে বাংলা ভাষাকে। পূর্ব পাকিস্তান নামের নতুন ভূখণ্ডেও তা গভীর রেখাপাত করেছিল, যা ভূমি আর ভৌগোলিক সীমারেখায় নতুন আশা-আকাঙ্ক্ষার বদলে আরো এক নতুন [বাংলা] দেশের ইশারা দেয়। সেই ইশারা পঞ্চাশ আর ষাটের কবিদের ভেতর নতুন উন্মাদনা সৃষ্টি করেছিল। বিশেষত পঞ্চাশের তিনজন কবি শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী আর আল মাহমুদ রাষ্ট্রকে ছেঁকেছুঁকে কবিতার সঙ্গিন করেছেন। পরবর্তী ষাটের উজ্জীবিত কবিরা চেতনাগতভাবে সেই পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। বলে রাখা ভালো, রাষ্ট্র ব্যক্তি স্বাধীনতার নিয়ামক নয়। ব্যক্তি স্বাধীনতার নিয়ামক গণতন্ত্র আর সাম্য। ফলে রাজনীতিও সঙ্গিন হয় কবিদের। বেলাল চৌধুরীর বেলায় সেটা কীভাবে ঘটেছে?  

জীবন আর সংগ্রাম কবি বেলাল চৌধুরীকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে গেল, তা ভাবলে অবাক লাগে। মধ্যবিত্ত সাধারণ পরিবারের সন্তান বেলাল চৌধুরী। জন্ম চাটগাঁতে, ১৯৩৮ সালের ১২ নভেম্বর। বাবা চাকরি করতেন পূর্বাঞ্চল রেলওয়েতে। সাহিত্যের হাতেখড়ি ফুফার হাতেই। তবে বেলাল ছাত্রাবস্থায় জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। ‘নিরুদ্দেশ হাওয়ায় হাওয়ায়’ বেলাল জানান, ‘তখন দেশে ৯২[ক] ধারার শাসন চলছে। তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার। চিফ সেক্রেটারি জবরদস্ত আমলা এনএম খান। কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্রকর্মী হিসেবে আকস্মিকভাবে আমাদের মহকুমা শহর ফেনী থেকে গোয়েন্দা পুলিশ আমাকে রাস্তা থেকে থানায় নিয়ে গেল। প্রথমে চলল জিজ্ঞাসাবাদের পালা। দিন দুই তো হবেই। এদিকে মাত্র দু’মাইল দূরে বাড়িতে চলল পুলিশি তল্লাশি।’ ঘটনার সূত্রপাতেই বোঝা গেল জেলজীবন দীর্ঘ হতে লাগল তার। তিনি সাক্ষাত্কারে বলছেন, ‘ডাণ্ডাবেড়ি পরে প্রথম আমি ঢাকায় প্রবেশ করেছি।’ বস্তুত জেলজীবনই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। জেলে বসেই প্রবীণ-তরুণ বিপ্লবী আর তাত্ত্বিকদের সান্নিধ্য ও অনুশীলনের ছায়া দীর্ঘদিন বয়ে বেড়িয়েছেন তিনি। কেন?&dquote;&dquote;

আড্ডাচ্ছলে বেলাল চৌধুরী একবার বলেছিলেন, ‘জেল হচ্ছে রাষ্ট্রের নিপীড়নের প্রতীক। জেল না থাকলে রাষ্ট্রের কার্যকারিতা অর্ধেক হয়ে যায়।’ ষাটের দশকে নিপীড়নের ভয়ে বেলাল পালিয়ে যান ভারতে। কবিত্বের বীজটি তাকে মেলালেন কলকাতার কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়দের কৃত্তিবাস পত্রিকার ডেরায়। নিজের মাতৃভূমি ছেড়ে আরেক শহরে জীবন খুঁজে নেয়ার পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি? নিপীড়ন তো এক দশা। কিন্তু অন্য দশা হলো— সাহিত্যে যশপ্রার্থিতাও তখন কলকাতাকেন্দ্রিক। অমূলক নয় যে— সাংস্কৃতিক সেই ব্যপ্তিকে তার বোহেমিয়ান জীবন দিয়ে অতিক্রম করতে পারেননি। বেলাল মনে করতেন, ‘সাংস্কৃতিকভাবে কলকাতার সাথে বাংলাদেশের কোনো ফারাক নাই।’ তার আমূল একাত্মতার সংস্কৃতি সেই পদই নির্দেশক। যেই প্রশ্নের সুরাহা হয়নি, সেটা হলো— সংস্কৃতি এক হলে ভৌগোলিক শাসন কাঠামো কেন আলাদা? বাংলা ভাষাভাষীরা কেন দুই ভাগ হলো? ঐতিহাসিক কারণে সেই প্রশ্ন কোনো না কোনোভাবে আমাদের সামনে আসবেই। তবে আজ নয়!       

বোহেমিয়ান কবি দেশে ফেরেন সত্তরের দশকে। থিতু হন বাংলাদেশে। সম্পাদনার দায়িত্ব ভারত বিচিত্রার। বেলাল চৌধুরীর বড় গুণ— তিনি আড্ডারু কবি। পরোপকারী মানুষ। ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল চিরতরে বিদায় নিলেন কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক বেলাল চৌধুরী। বয়স বেশি নয়, তবে আশি পূর্ণ হয়নি। শোকের সময় কবিকে অন্য প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করানো ঠিক নয়। বরং বলা যায়— বাংলা কবিতায় তিরিশের দশক এক আধুনিক বলয়। সে বলয় বাংলা কবিতাকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে শাসন করেছে দীর্ঘদিন। কবিতার ভাষা, প্রকরণ, ছন্দ, কাঠামো, সৌন্দর্য চিন্তা— সব মিলিয়ে যে আবহ সৃষ্টি হয়েছিল, কবি বেলাল চৌধুরী তার পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন মাত্র। বলে রাখা ভালো অনুকরণ আর অনুসরণ এক ভাব নয়। দুটো ভিন্ন ভিন্ন রূপেই ভাষার্থে বলবৎ।

ঐতিহাসিক কারণে বেলাল চৌধুরী আমাদের দুয়ারে কড়া নাড়বেন। একটি হলো অপ্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক সংগ্রামের মুখাবয়ব হিসেবে। অন্যটি হলো একজন বোহেমিয়ান কবি কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের স্তরে পৌঁছে ছিলেন। কবিতার সঙ্গে সংস্কৃতির যে সম্পর্ক, তার মূল্যায়ন করতে বেলাল চৌধুরীকে দরকার হবে। তার সংস্কৃতি চিন্তা আমাদের ঐতিহাসিকতার মুখে দাঁড় করাবে। পদ্ধতিগতভাবে বলা যায়— প্রথমত. কবির আয়নায় বেলাল চৌধুরীকে দেখা, দ্বিতীয়ত. সংস্কৃতির ভেদাভেদের ক্ষত চিহ্নটির হদিস এতে দৃশ্যমান। বলা চলে বেলাল চৌধুরী এহেন সংস্কৃতির প্রতিনায়ক। এমন স্বগতোক্তি কবির নিজেরই। কারণ চিন্তার জগতে ব্যক্তি থেকে সংস্কৃতিকে আলাদা করে দেখার জায়গা নেই বললেই চলে। কেননা ব্যক্তির আয়না হচ্ছে সংস্কৃতি। কবিতা আর সংস্কৃতির সম্পর্ক সূত্রেই অন্য নাম যুগ। তার বিদায়ের ভেতর দিয়ে সে যুগের অবসান হলো।

কবি নিরুদ্দেশ— এ কথা ঠিক। কিন্তু তার ছায়ার অমলিন চিহ্নটি আমাদের নতুন করে ভাবাবে। নতুন জিজ্ঞাসার পরিসর তৈরি করবে। নতুন পন্থে যাওয়ার রাস্তাটিও দেখাবে। ছোট্ট আশাটুকু ছোট্ট পরিসরে জিইয়ে রাখলাম। পরোপকারী, আড্ডারু প্রয়াত কবি বেলাল চৌধুরীর প্রতি রইল ভালোবাসা।