অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত ইউরোপ ও দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি, জীবনযাত্রার মান প্রায় কাছাকাছি ছিল। কিন্তু এশিয়ায় ব্রিটিশ উপনিবেশ পরিস্থিতি বদলে দেয়। ভারতবর্ষের ইতিহাস সবারই জানা। ভারতের বিকাশমান শিল্পকে ধ্বংস করে দেয়াটা ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ আঘাত। একদিকে যেমন স্থানীয় শিল্পকে তারা ধ্বংস করেছিল, অন্যদিকে এ উপমহাদেশ থেকে পুঁজি পাচার করে এবং এ অঞ্চলকে বাজারে পরিণত করে ব্রিটিশরা নিজেদের শিল্প বিপ্লবকে মসৃণ করেছিলো। আর শিল্প খাতের এ লড়াইয়ে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হলো আগ্নেয়াস্ত্র খাত। অষ্টাদশ শতকে ব্রিটেন ও ভারত উভয় স্থানেই আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি হতো। অস্ত্রের মানও ছিল নিকটবর্তী। ম্যাচলক, মাসকেট বা ফ্লিন্টলক আগ্নেয়াস্ত্রের পর্বে ভারতীয় কারিগররা ব্রিটিশ প্রযুক্তির সঙ্গে সমানতালে পাল্লা দিয়েছেন। বিষয়টি ব্রিটিশ শাসকদের দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। অস্ত্রের উৎপাদন মানে ভারতীয়দের তরফ থেকে সশস্ত্র আক্রমণের আশঙ্কা। তাই ব্রিটিশ কর্মকর্তারা ভারতীয় অস্ত্র নির্মাণ শিল্পকে সমূলে উচ্ছেদ করতে চেয়েছিলেন। ব্রিটিশরা তাদের অস্ত্র নির্মাণ কলাকৌশলের জ্ঞানভাণ্ডার যেন কোনো অবস্থায়ই ভারতীয়দের হাতে না যায়, সে বিষয়ে চিলের নজর রেখেছিলেন। ব্রিটিশরা বিলক্ষণ জানতেন, শিল্পে অগ্রগতির মূলে রয়েছে অস্ত্র উৎপাদন। ফলে ব্রিটিশদের অস্ত্রের ওপর দক্ষিণ এশিয়ার নির্ভরতা বাড়ছিল। এ নির্ভরতা ব্রিটেনের শিল্প খাতকে ফুলেফেঁপে উঠতে সাহায্য করে, একই সঙ্গে ভারতীয় শিল্পের শ্বাসরোধ করে। ফলে ফ্লিন্টলক ভারতীয়রা ব্রিটিশদের চেয়ে ভালো তৈরি করলেও পরবর্তী বিকশিত পর্বে তাদের আর দাপট ছিল না। এ পর্বে ব্রিটিশরা হাজির করে এনফিল্ড রাইফেল, যা বিভিন্ন বিবর্তনের পর থ্রি নট থ্রি রাইফেল নামে দুনিয়াজুড়ে পরিচিতি পায়।
অষ্টাদশ শতকে ব্রিটিশরা যুদ্ধ উপকরণ উৎপাদন ও শিল্প উন্নয়নের মধ্যকার সম্পর্ককে বুঝতে পারেন, বিশেষত ওয়েস্ট মিডল্যান্ডে। ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দের একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, ‘ওয়েস্ট মিডল্যান্ডের বার্মিংহাম শহরে শিল্পোৎপাদনে ২০ হাজার হাত গর্বের সঙ্গে কাজ করছে এবং তারা যা উৎপাদন করছে, সেটা সরকারের কাজে লাগছে।’ ১৭৯৫-৯৬ সালে তখনকার একজন প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর ‘কোয়েকার গান’ প্রস্তুতকারক তার বন্ধুদের বলেছিলেন যে, এমন কোনো শিল্প উৎপাদন দুনিয়ায় নেই, যা কোনো না কোনোভাবে যুদ্ধকে সহায়তা করে না।
ভারতের সংঘাতে ইউরোপীয়দের সংশ্লিষ্টতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রের চাহিদাও বাড়তে থাকে। এ সময় ফ্রান্সের সঙ্গে ইংল্যান্ডের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ অস্ত্র উৎপাদন বিকশিত হতে থাকে। ব্রিটিশ অর্ডন্যান্স দপ্তর দেশের অস্ত্র উৎপাদন শিল্পের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ ও উৎপাদনে একচ্ছত্র আধিপত্য স্থাপন করে। ১৮০৪ থেকে ১৮১৫ সময়ে বার্মিংহাম ৭৬ লাখ ৬০ হাজার ২২৯টি আগ্নেয়াস্ত্র ও সেগুলোর খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরি করে। অস্ত্র উৎপাদন ও বাণিজ্যকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, এমন যেকোনো আইনকে বাতিল করতে এ শহর সবসময় তত্পর ছিল। শহরের মানুষ ভালোভাবেই জানত যে, অস্ত্র উৎপাদনে কোনো বাধা এলে তা পুরো পশ্চিম মিডল্যান্ডস অঞ্চলকে আঘাত করবে, অসংখ্য মানুষ বেকার হয়ে যাবে। ১৮১৫ সালে ফ্রান্সের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ব্রিটেনের অস্ত্র শিল্পে মন্দাভাব মিডল্যান্ডসের মানুষের ধারণার সত্যতা প্রমাণ করে দেয়। ১৮৫৭ সালে ঘটে এক তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা। সংসদে জন ব্রাইটের নির্বাচন নিয়ে তার বিরোধীরা আপত্তি তোলে; বিরোধীদের আপত্তির জায়গা ছিল, জন ব্রাইট শান্তিবাদী ধারণার কথা বললেও তার এলাকার অর্থনীতি টিকে আছে সামরিক কাজে ব্যবহূত ধাতব বস্তু উৎপাদনের ওপর।
ইংল্যান্ডের মতো আঞ্চলিক সামরিক শিল্প অর্থনীতি ভারতীয় উপমহাদেশেও অস্তিত্বমান ছিল। ষোড়শ শতকে অটোমান ও মোগলদের কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি অংশ ছিল অস্ত্র বিক্রি। বাবর ভারতবর্ষে প্রথমবারের মতো তুর্কি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে আসেন। পরবর্তীকালে মোগলদের প্রতিদ্বন্দ্বী রাজপুত ও আফগানরাও এ অস্ত্র গ্রহণ করে। পর্তুগিজ ও মিসরীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ ভারতে অস্ত্রপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে। মোগল সম্রাট আকবর আগ্নেয়াস্ত্র উৎপাদন নিয়ে গভীর আগ্রহী ছিলেন। তিনি সেরা বন্দুক কারিগরদের তার দরবারে ডেকে পাঠান।
সপ্তদশ শতক নাগাদ মোগলদের নিজস্ব অস্ত্র নির্মাণ কারখানা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। মালাবার থেকে বিহার পর্যন্ত বিভিন্ন রাজত্বে অস্ত্র নির্মাণ শিল্প গড়ে ওঠে। ভারতে সংঘাত বৃদ্ধি ও তাতে ব্রিটিশদের ভূমিকা অস্ত্রের চাহিদা বৃদ্ধি করে। ভারতীয় কারিগররা ইউরোপীয় আগ্নেয়াস্ত্রের অনুলিপি তৈরি করতে শুরু করেন। গাঙ্গেয় সমতলের কৃষকরা স্থানীয় কামারদের তৈরি সস্তা গাদা বন্দুক ব্যবহার করতেন। ট্রাভানকোর, কাশ্মীর, রাজস্থান, পাঞ্জাব ও সিন্ধে অস্ত্র কারখানা ছিল। ভারতের তৈরি বন্দুক ও যন্ত্রাংশ পারস্য, ওমান ও ভারতীয় মহাসাগরীয় অঞ্চলে ব্রিক্রি হতো। ব্রিটিশ সামরিক কর্তাদের নোট থেকে ভারতীয় ম্যাচলকের ভালো রেঞ্জ ও গতির কথা জানা যায়। ইউরোপীয় পর্যবেক্ষকরা গোলকোন্ডার মাসকেটেরও প্রশংসা করেছেন। ব্রিটিশদের ভারতীয় বন্দুকের নকশাকে স্বীকৃতি দিয়ে সেগুলোর কার্যকারিতার প্রশংসা করেছেন। ভারতীয় উপমহাদেশের আগেয়াস্ত্র তৈরি হয়েছিল কারিগরি জ্ঞানে একটি সমৃদ্ধ ও গতিশীল ঐতিহ্য থেকে।
ব্রিটিশ রাষ্ট্রের একটি বাণিজ্যিক হাত দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে ব্রিটিশ অস্ত্র বিক্রি করত। বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধা পেতে স্থানীয় প্রভাবশালীদের তারা ঘুষ হিসেবেও অস্ত্র দিত। ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মুনাফার ভিত্তিতে বছরে প্রায় এক হাজার টন ছোট আগ্নেয়াস্ত্র রফতানি করত। বিস্মিত কণ্ঠে এক ব্রিটিশ কর্নেল পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘এমন একটা জাহাজের দেখা পাওয়া যাবে না (১৭৬০-এর দশক), যেটা কামান ও ছোট আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রি করে না।’ ফরাসি ও ব্রিটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশে একে অন্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে অস্ত্র বিক্রির প্রতিযোগিতা করত। ব্রিটিশদের প্রতিটি সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গায়ে একটি করে নতুন সক্ষমতার মোহর লাগতে শুরু করল। তারা দিনে দিনে কোম্পানি আরো কার্যকরী কূটনৈতিক আদান-প্রদানের মাধ্যম হয়ে উঠতে লাগল। ১৮১৫ সালে কোম্পানির বোর্ড অব কাস্টমস এক প্রতিবেদনে জানায়, তারা দক্ষিণ এশিয়া, ইন্দোচীন দ্বীপপুঞ্জ ও চীনে এক বছরে দেড় লাখ বন্দুক রফতানি করেছে, যার আনুমানিক মূল্য ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার মার্কিন ডলার।
তবে একটা বিষয় নিশ্চিত যে, ব্রিটিশরা তাদের শত্রুদের কাছে অস্ত্র বিক্রি নিয়ে কিছুটা চিন্তিত ছিল। উদাহরণস্বরূপ একটি ঘটনার কথা বলা যায়, ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাদ্রাজ সরকার তাদের শত্রু হয়ে উঠতে পারে, এমন মানুষের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়া বন্ধ করার পদক্ষেপ নেয়ার দাবি তোলে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের বিশ্বস্ত দক্ষিণ ভারতের আরকোটের নওয়াবের কাছে সরবরাহ করা অস্ত্র যেন ‘অনুপযুক্ত হাত’-এ না পড়ে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নিয়েছিল। কিন্তু অনেক সময়ই নগদ লাভের লোভ কোম্পানির কর্তারা এড়াতে পারতেন না। বিক্রির বিস্তৃতি নিয়ে উদ্বিগ্ন কর্মকর্তাদের বিপক্ষ দল যুক্তি দিয়েছিল, অস্ত্র বিক্রি সংকুচিত করতে গেলে সেটা বরং ব্রিটিশদের আর্থিক মুনাফা ও প্রভাব খর্ব করবে। হায়দার আলীর ক্ষেত্রে ব্রিটিশদের নীতিতে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ব্রিটিশরা মনে করেছিল, হায়দার আলীর কাছে অস্ত্র বিক্রি করলে তা একদিকে যেমন আর্থিক মুনাফা বয়ে আনবে, তেমনি ব্রিটিশদের সঙ্গে হায়দারের সম্পর্কেরও উন্নয়ন ঘটাবে; হায়দার যেহেতু ব্রিটিশদেরও শত্রু মারাঠাদের সঙ্গে লড়াই করছে, তাই ব্রিটিশরা এর ফায়দা নিতে চেয়েছিলেন। ব্রিটিশরা মাথায় রেখেছিলেন যে, হায়দার আলী ফরাসি ও স্প্যানিশ আগ্নেয়াস্ত্র পাচ্ছিলেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও ব্রিটিশ অস্ত্র কিনত। ভারতে কোম্পানির নিজস্ব পেশাদার সেনাবাহিনী গড়ে তোলার জন্য দরকার হয়েছিল বিরাট অস্ত্রের চালান। ১৭৬৪ সালে কোম্পানির বার্ষিক অস্ত্রের চাহিদা ছিল পাঁচ হাজারটি। পরের বছর কলকাতার কর্মকর্তারা ১০ হাজার অস্ত্রের চাহিদার কথা জানান, একই সঙ্গে প্রতি বছর আরো চার হাজার অস্ত্রের ভবিষ্যৎ চাহিদাও পেশ করেন। একই বছর কোম্পানি বাংলায় রাজস্ব আদায়ের অধিকার পায়। ফলে অস্ত্র কেনার জন্য আর্থিক সক্ষমতা তাদের নিশ্চিত হয়েছিল। নিজস্ব সেনাবাহিনী ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে একটি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রশক্তিতে পরিণত করল।
আমেরিকান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বার্মিংহামের কামারদের ভারতের এ অস্ত্রবাজারের লোভ থেকে দূরে রাখাটা কঠিন হয়ে পড়েছিল। ১৭৬৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাদ্রাজ কাউন্সিল কোম্পানির প্রত্যেক সেনাকে একটি করে অতিরিক্ত মাসকেট বরাদ্দ করার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে তাদের আরো ১৭ হাজার নতুন অস্ত্র এবং আরকোটের নবাবের জন্য আরো অতিরিক্ত অস্ত্রের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। ১৭৬৫ সালের আগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগ্নেয়াস্ত্র বাবদ বার্ষিক খরচ মাত্র তিনবার ১০ হাজার পাউন্ডের বেশি হয়েছিল, কিন্তু ১৭৬৫ সালের পর তাদের এ খরচ বেড়ে গেল বার্ষিক ২০ থেকে ৫০ হাজার পাউন্ডের মধ্যে। ১৭৬৭ ও ১৭৬৯ সালে অস্ত্র কিনতে কোম্পানির বার্ষিক খরচ ছিল ৬০ হাজার পাউন্ড। ভারতের আবহাওয়ায় ইংল্যান্ডের আগ্নেয়াস্ত্র বেশি দিন টিকত না। ইংল্যান্ডে যে অস্ত্র তিন বছর কর্মক্ষম থাকত, ভারতে সেই অস্ত্রের মেয়াদ থাকত বড়জোর এক বছর। আর অকেজো অস্ত্র বদলে নিতে কোম্পানি এক মুহূর্ত দেরি করত না। ১৭৭০-এর দশকে রাজনৈতিক পরিবেশ শান্ত থাকায় ব্রিটেনের অর্ডন্যান্স অফিস অস্ত্রের চাহিদা কমিয়ে দেয়, কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ছিল ভিন্ন যাত্রা, তারা সবসময়ই নিজেদের সামরিক শক্তিকে প্রস্তুত ও শক্তিশালী রাখতে চেয়েছিল। ১৭৭১ সালে কোম্পানি মাদ্রাজের জন্য ৪০ হাজার এবং আরকোট, বাংলা, অওধ, বোম্বের নবাব ও ট্রাভানকোরের রাজার জন্য আরো অস্ত্র কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এছাড়া ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠা স্বল্পমেয়াদি বিভিন্ন মিলিশিয়ার জন্যও অনেক অস্ত্রের চাহিদা সৃষ্টি হয়েছিল।
সে সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বছরে ২০ হাজার মাসকেট ভারতীয় উপমহাদেশে রফতানি করত এবং ৭৫ হাজার মাসকেট তাদের সংগ্রহে থাকত। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে চলা ১৭৯৩ থেকে ১৮১৫ সালের যুদ্ধে ব্রিটেনের অর্ডন্যান্স দপ্তর প্রয়োজনীয়সংখ্যক বন্দুক দ্রুত সংগ্রহ করতে পারছিল না, আর সে পরিস্থিতিতে সরকারকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। যুদ্ধ চলাকালে ব্রিটিশ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র সরবরাহকারী ছিল কোম্পানি। ১৭৯৪ সাল নাগাদ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দুনিয়াজুড়ে বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধে লিপ্ত ব্রিটিশ বাহিনীকে ৩০ হাজার বন্দুক সরবরাহ করেছিল। ব্রিটিশদের হাতে তৈরি ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ব্রিটিশ আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। ১৭৯৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তৈরি ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা ছিল ৮৮ হাজার এবং ১৮০৫ সালে তা বেড়ে হয় ১ লাখ ৯২ হাজার। ফ্রান্সের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হতে হতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে ব্রিটিশ সরকার ১ লাখ ৬২ হাজার বন্দুক কিনেছিল।
ব্রিটিশ আগ্নেয়াস্ত্র বা অর্ডন্যান্স অফিসের মাসকেটের চেয়ে ভারতীয় বন্দুক হালকা ও সরল নকশার, তাই এগুলো উৎপাদন সহজ ছিল। এ ভারতীয় নকশাকে ব্রিটিশরা একটি আদর্শ পদাতিক অস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করে ১৭৯৭ সালে এবং এ ঘটনা ব্রিটিশ অস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। ভারতীয় নকশায় ব্রিটিশ মাজল-লোডিং অস্ত্রের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত। ভারতীয় নকশায় এ ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র ২৮ লাখের বেশি উৎপাদন হয়েছিল। ১৮১২ সালের দিকে অস্ত্রের চাহিদা কমে এলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মিডল্যান্ডের লোহার কারবারিদের বাঁচাতে এগিয়ে আসে। কোম্পানি তাদের পরবর্তী বছরের অস্ত্র উৎপাদনের জন্য মিডল্যান্ড থেকে চার-পাঁচ হাজার টন লোহা ক্রয় করে। সহজ কথায় বার্মিংহামের শিল্প উৎপাদনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ভারতে তাদের কর্মকাণ্ডের বিরাট ভূমিকা ছিল। নিজের ঘরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শিল্প বিপ্লবকে সহায়তা করলেও তারা ভারতের শিল্পকে ধ্বংস করে দিচ্ছিল। কিছু কিছু যুদ্ধাস্ত্র ও সরঞ্জাম তখন ভারতে স্থানীয়ভাবেই তৈরি হতো, যেমন— তাঁবু, তলোয়ার, বাঁকানো লম্বা ছোরা। স্থানীয় কারিগররা বন্দুক মেরামত করতে পারতেন। কিন্তু কোম্পানি ভারতের স্থানীয় অস্ত্র উৎপাদন শিল্পকে সীমারেখায় বেঁধে দেয়। কারণ তাদের ভয় ছিল, ভারতের শিল্প উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়লে তা ব্রিটেন ও ভারতে ব্রিটিশ শাসনকে হুমকিতে ফেলবে।
ব্রিটিশ কর্মকর্তারা ভারতীয় অস্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে বেশ কয়েকবার প্রশংসা করেছেন। ১৭৭০-এর দশকে ব্রিটিশ অস্ত্রের মান নিয়ে অভিযোগ ওঠে। তখন একটি প্রস্তাব দেয়া হয় যে, কোম্পানির জন্য অস্ত্র ব্রিটেন থেকে আমদানি না করে ভারতেই উৎপাদন করা হোক। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পরিচালক পর্ষদ এ প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। একই সঙ্গে বাংলায় সিসা, লোহা, তামা ও টিনের খনি খননের প্রস্তাবেও পানি ঢেলে দেন কোম্পানির পরিচালকরা। কারণ তাদের মতে, এ উদ্যোগ কোম্পানির মুনাফা ও কর্তৃত্বকে খর্ব করবে। উপনিবেশে কোনো ধরনের শিল্প উন্নয়ন সে দেশকেই শক্তিশালী করবে— এটাই ছিল কোম্পানির মতামত। একই সঙ্গে এতে ঔপনিবেশিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বীদেরও সহায়তা করতে পারে। তাই বাংলায় শিল্পোন্নয়নের ব্যাপারে কোম্পানির পরিচালকদের মত ছিল যে, ‘এ প্রস্তাব অত্যন্ত অবিবেচনাপ্রসূত ও সরকারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’ এসব উদ্যোগ বাংলার জন্য ‘বিরাট ও গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা’ বয়ে আনতে পারে, এমনকি তারা নিজেদের ‘স্বাধীন বলেও গণ্য’ করতে পারে। কিন্তু অবশ্যই বাংলা স্বাধীন নয়; সে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ।
বাংলার প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য ও কারিগরি জ্ঞানকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিজেদের জন্য হুমকিরূপে গণ্য করত। একজন ব্রিটিশ সরকারি কর্মকর্তা তার বিবরণীতে লিখেছিলেন, ‘বাঙালিরা লোহার আকরিক ব্যবহারে একেবারে অজ্ঞ।’ বাংলায় বিভিন্ন ধাতুর জন্য খনি খনন করা হলে ইউরোপ থেকে আমদানি করার চেয়ে সস্তায় উন্নত মানের ধাতু পাওয়া সম্ভব। আর একবার খনি চালু হলে বাঙালিদের ‘কৌতূহল ও মুনাফার লোভ জেগে উঠবে এবং তারা নিজেরা খনি খননের চেষ্টা শুরু করবে।’
অস্ত্র উৎপাদন তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সামরিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। তাই এ-সংক্রান্ত জ্ঞান তারা নিজেদের হেফাজতেই রাখতে সচেষ্ট ছিল, এ জ্ঞানকে তারা পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে ভেদরেখা টানতে ব্যবহার করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের মধ্যে যাতে ধাতুর ব্যবহার ছড়িয়ে না পড়ে, সে ব্যাপারে কোম্পানি সচেষ্ট ছিল। কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামের অস্ত্র গবেষণাগারকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এক রহস্য হিসেবে সংরক্ষণ করত। এ গবেষণাগার নিয়ে তাদের মত ছিল:
‘কোনো ভারতীয়, কৃষ্ণাঙ্গ, মিশ্র বর্ণ, যেকোনো জাতির রোমান ক্যাথলিককে কোনো অবস্থায়ই ল্যাবরেটরি বা কোনো সামরিক কারখানায় প্রবেশ করতে দেয়া যাবে না। এসব জায়গায় তাদের কোনোভাবে নিয়োগও করা যাবে না। তাদের এত কাছেও আসতে দেয়া যাবে না, যাতে তার ভেতরে কী হচ্ছে তা দেখতে পান।’ এমনকি ১৮১৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের অস্ত্রের জ্ঞান ছড়িয়ে পড়বে, এ ভয়ে ফোর্ট উইলিয়ামের অস্ত্র তৈরির গবেষণাগার বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল। এই ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সাধারণ নীতিবৈষম্য তৈরি। নিজেদের দেশে শিল্প বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করলেও তারা উপনিবেশের শিল্পায়নকে সর্বোতভাবে বাধা দিয়েছে। কোম্পানির কর্তারা নিশ্চিত ছিলেন যে, অস্ত্র উৎপাদনই হলো শিল্প বিপ্লবের মূল শক্তি। তাই এ জ্ঞান কোনোভাবেই পুবের মানুষের হাতে তুলে দেয়া যাবে না। ব্রিটিশ শিল্পায়নকে সহায়তা করতে ভারতের অর্থনীতিকে ব্যবহার করা হয়েছিল।
ব্রিটিশদের আগ্রাসনে স্থানীয় শক্তিগুলো তাদের নিজস্ব বন্দুক উৎপাদন সক্ষমতাকে ব্যবহার করতে পারছিল না। ১৭৬০-এর দশকের শুরুর দিকে বাংলার নওয়াব মীর কাসিম বিহারের মুঙ্গেরে ফায়ারলক উৎপাদন শুরু করেন। ঠিক স্থানেই ষোড়শ শতকে রাজা টোডরমল বন্দুক উৎপাদন করেছিলেন। ১৭৬৪ সালে মীর কাসিমের পরাজয়ের পরও অস্ত্র উৎপাদন অব্যাহত ছিল, তবে তা তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অস্ত্র বিভাগের। মুঙ্গেরের অস্ত্র সে সময় ব্রিটিশ মিলিটারি মাসকেটের চেয়ে অধিকতর উন্নত মানের বলে খ্যাতি অর্জন করেছিল। এ উন্নত মানের পেছনে ছিল রাইফেলের ব্যারেল মেটালে রাজমহল হিলের আকীক পাথর ব্যবহার। এ পাথর রাইফেলের ধাতব পাতে আঘাত করে অগ্নস্ফুিলিঙ্গ সৃষ্টি করে এবং তা অস্ত্রের বারুদে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ ধরনের অস্ত্র ফ্লিন্টলক নামে পরিচিত। উনিশ শতকের মধ্যভাগে ভারতে ফরাসিদের অবস্থান ক্ষয় হতে থাকে, ফরাসি মার্সেনারিরা তাদের অস্ত্র তৈরিসংক্রান্ত জ্ঞান ভারতীয় উৎপাদকদের সঙ্গে ভাগ করে নেন। প্রাক্তন মোগল সাম্রাজ্যের কেন্দ্র আগ্রা, দিল্লি, গোয়ালিয়রে তৈরি অস্ত্র ইউরোপের অস্ত্রের সমমানের ছিল। লক্ষৌ, পণ্ডিচেরী, হায়দরাবাদ, লাহোর ও সেরিঙ্গাপট্টমে তৈরি অস্ত্র ব্যবহূত হয়েছিল প্রথম মোগল ও পরবর্তীতে ইংরেজ শাসনকে চ্যালেঞ্জ জানাতে।
কিছু অবাধ্য শক্তিকেও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অস্ত্র সরবরাহ করত, উদ্দেশ্য ছিল সেসব শক্তিকে নিজস্ব অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা। ১৭৬০-এর দশকের শেষ দিকে ব্রিটিশরা অওধের নবাব সুজা-উদ-দৌলাকে অস্ত্র সরবরাহ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। ফলস্বরূপ যা ঘটল, তাতে ব্রিটিশরা উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। ব্রিটিশদের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে সুজা ফৈজাবাদে নিজেই অস্ত্র উৎপাদন শুরু করেছিলেন। ক্যাপ্টেন স্মিথ মুগ্ধ হয়ে ফৈজাবাদে ওলন্দাজ নকশায় তৈরি একটি আট পাউন্ডের পিতলের বন্দুক দেখেছিলেন, সঙ্গে বেয়নেটসহ এক হাজার নতুন ম্যাচলক তৈরি হতেও দেখেছিলেন। ভালো মানের ফায়ারলক ধীরে ধীরে তৈরি করা হতো। দুজন বাঙালি বড় বন্দুকের ঢালাই করতেন, একজন ফরাসি প্রকৌশলী ক্যারিজ তৈরি করতেন এবং শ্রমিকদের বোরিং মেশিন ব্যবহার শিক্ষা দিতেন। সুজা একটি ফার্নেস তৈরিরও পরিকল্পনা করেছিলেন। সুুুুুুুুুজার উচ্চাভিলাষ দেখে ব্রিটিশরা সতর্ক অবস্থান নেয়। তারা সুজাকে দুই হাজার মাসকেট সরবরাহ করে। ১৭৭৫ সালে সুজার মৃত্যু হয় এবং তারপর সিংহাসনে আরোহণ নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার সুযোগে ইংরেজরা অওধের সল্টপিটারের বিপুল মজুদ দখল করে নেন। এ সল্টপিটার হচ্ছে বারুদের প্রাথমিক উপাদান। এরপর নতুন নবাব আসফ-উদ-দৌলাকে সব ধরনের সামরিক সহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় ব্রিটিশরা। ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য ছিল নবাবের অস্ত্র তৈরিতে যুক্ত থাকা ফরাসিদের বিতাড়িত করা। এ বিতাড়নের পরিবর্তে আসফ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পাঁচ হাজার বন্দুক পেয়েছিলেন এবং সেগুলোকে নিজ খরচে ও নিজের কারিগরদের দিয়ে মেরামত করিয়েছিলেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আসফের রাজত্বের সীমানার মধ্যে অবস্থানরত নিজেদের সেনাদের জন্য তার কাছে ১৪ হাজার বন্দুক বিক্রি করে। পরে আসফের সেনাদলের একটি অংশ এ অস্ত্রসহ কোম্পানির কাজে নিয়োজিত হয়। এসবের মাধ্যমে কোম্পানি অওধের সামরিক শক্তি ও অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতাকে নিজেদের কুক্ষিগত করে নেয়। নতুন রাজধানী লক্ষৌতে আসফ নিজের অস্ত্র উৎপাদন কারখানা নির্মাণের অনুমতি পান, কিন্তু সব অস্ত্র তৈরি হতো ব্রিটিশ নকশায় এবং কোম্পানির একজন কর্মকর্তা কারখানার পরিদর্শক হিসেবে নজরদারি করতেন। ১৭৮৭ সালের পর ব্রিটিশদের আর লক্ষৌয়ের অস্ত্র ও আসফের সেনাদের প্রয়োজন হয়নি। এর মাধ্যমে অওধের অস্ত্র উৎপাদন শিল্পের যবনিকা নেমে আসে। উল্লেখ্য, অস্ত্রের প্রতি আসফের দারুণ আকর্ষণ ছিল। তার ব্যক্তিগত অস্ত্রের সংগ্রহটি ছিল সেকালে যথেষ্ট আকর্ষণীয়।
মহীসুরের গল্পটাও অওধের মতো। শুরুতে হায়দার আলীর কাছে অস্ত্র বিক্রি করলেও ১৭৮০ সালে দ্বিতীয় অ্যাংলো-মহীসুর যুদ্ধের পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তার কাছে অস্ত্র বিক্রি বিষয়ে সতর্ক হয়ে ওঠে। হায়দার আলী লোহা গলাতে ২০টি ফার্নেস স্থাপন করেন। ১৭৮২ সালে হায়দারের মৃত্যুর পর তার পুত্র টিপু সুলতান ইউরোপীয় প্রযুক্তি নকল করে অস্ত্র তৈরি শুরু করেন। ফরাসি পর্যবেক্ষকদের মতে, মহীসুরের কামান ও আগ্নেয়াস্ত্র তখনকার ইউরোপের সেরা অস্ত্রের সমকক্ষ ছিল। টিপু ফরাসিদের অস্ত্র পরিত্যাগ করেছিলেন। কারণ সেগুলো তার নিজের অস্ত্রের চেয়ে খারাপ মানের। টিপুর কারখানায় একটি বোরিং মেশিন ছিল, যা জলশক্তির পরিবর্তে ষাঁড়ের শক্তি দিয়ে চলত। ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশরা টিপুকে পরাজিত করে তাকে হত্যা করে। ব্রিটিশরা টিপুর অস্ত্র কারখানা বন্ধ করে দেয়। এরপর মহীসুর ব্রিটিশ অস্ত্রে ছেয়ে যায়। আর টিপুর সংগ্রহ ব্রিটিশ অস্ত্র সংগ্রাহকদের হাতে চলে যায়। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা টিপুর রকেট উইলিয়াম কনগ্রেভ পরীক্ষা করে দেখেন উলউইচের ল্যাবরেটরিতে। উইলিয়াম ছিলেন উলউইচের ল্যাবরেটরির পরিচালক। এ রকেট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে উইলিয়াম লোহার টিউবের মাধ্যমে ব্রিটিশ সেনাদের জন্য এক ধরনের রকেট তৈরি করেন। ব্রিটিশরা তাদের শিল্প বিপ্লবের নেটওয়ার্কে ভারতের প্রযুক্তিগত জ্ঞানকে ব্যবহার করেছিলেন, কিন্তু নিজেদের জ্ঞানকে ভারতীয়দের নাগাল থেকে দূরে রেখেছেন। ভারতীয় অস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে দেয়াটা ব্রিটিশ উপনিবেশ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ছিল।
ব্রিটিশরা মারাঠাদের জ্ঞান ও শিল্প নেটওয়ার্কও ভেঙে দিয়েছিল। ১৭৮৫ সাল নাগাদ সিন্ধিয়াদের অস্ত্র নির্মাণ করাখানা ছিল আগ্রায়। বার্মিংহামের মতো মারাঠাদেরও একটি সমর অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল। মারাঠাদের কামাররা অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন, মন্দিরের নকশা হোক বা আগ্নেয়াস্ত্র— সবকিছুর কাজ করতেই তারা সিদ্ধহস্ত ছিলেন। পশ্চিম মিডল্যান্ডের মতো মারাঠা শহরগুলোও বিভিন্ন সামরিক চুক্তির ফলে লাভবান হতো। সিন্ধিয়াদের খুবই উন্নত মানের ফ্লিন্টলক (ছোট রাইফেল জাতীয় আগ্নেয়াস্ত্র) ছিল। এক মার্সেনারি সেগুলোকে ‘সাধারণ ইউরোপীয় অস্ত্রের চেয়ে অনেক উন্নত মানের... চমত্কার অস্ত্র’ বলে অভিহিত করেছিলেন। তাছাড়া স্থানীয় আবহাওয়া ও বারুদের জন্য মারাঠাদের আগ্নেয়াস্ত্র ইউরোপীয় অস্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর ছিল। মারাঠাদের কামানের বহির্ভাগ তৈরি হতো লোহা ও পিতলের মিশ্রণে, যা ইউরোপীয় কামানের তুলনায় সেগুলোকে হালকা ও দীর্ঘায়ু করেছিল।
১৮০৫ সালে মারাঠাদের পরাজিত করার পর ব্রিটিশরা মারাঠাদের কামান উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে দিতে এক মুহূর্তও নষ্ট করেননি। একই সঙ্গে তারা মারাঠাদের ছোট আগ্নেয়াস্ত্র তৈরির কারখানাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন।
ভারতে আরো অনেক এলাকার মতো বাংলা, মহীসুর ও মারাঠা ভূমিতে অনেক কায়দা-কসরত করে ব্রিটিশরা স্থানীয় আগ্নেয়াস্ত্র শিল্প ও সংশ্লিষ্ট জ্ঞানকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। সে সময় ব্রিটিশদের অস্ত্র ও ভারতের স্থানীয় প্রযুক্তিতে তৈরি আগ্নেয়াস্ত্র প্রায় সমমানের ছিল। তাই ভারত দখল ব্রিটিশদের জন্য কঠিন ও সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছিল। এ কারণে স্থানীয় অস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়া এবং অনেক জায়গায় সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়াটা ব্রিটিশদের জন্য দরকারি হয়ে উঠেছিল।
প্রিয়া সাতিয়ার গ্রন্থের আলোচনা অবলম্বনে






