বাংলাদেশ ১৯৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়ে। থ্রি নট থ্রি হচ্ছে .৩০৩ লি-এনফিল্ড রাইফেল। পয়েন্ট থ্রি জিরো থ্রি বা থ্রি নট থ্রি হচ্ছে রাইফেলে ব্যবহূত বুলেটের ব্যাস।
এনফিল্ড উত্তর-পূর্ব লন্ডনের একটি ছোট মফস্বল শহর, এখানে লি নদীর তীরে আগ্নেয়াস্ত্র কারখানা স্থাপন করা হয়।
শতবর্ষের অধিককাল এ রাইফেল রাজত্ব করেছে, তবে একে-৪৭ এর গুরুত্ব অনেকটা কমিয়ে দিয়েছিল। পরবর্তীকালে আধুনিক স্বয়ংক্রিয় ক্ষুদ্র অস্ত্রের কাছে আরো মার খেয়ে যায় থ্রি নট থ্রি। বহু বছর আগে এনফিল্ড কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু এখনো থ্রি নট থ্রির হুবহু অনুকরণে অস্ত্র নির্মিত হচ্ছে খাইবার গিরিপথের দুই নম্বরি অস্ত্রের জিঞ্জিরায়।
সেনাবাহিনী আর লি-এনফিল্ড ব্যবহার করছে না। বাংলাদেশ পুলিশের ব্যবহূত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ৯ মিলিমিটার পিস্তল, পয়েন্ট থ্রি জিরো থ্রি লি-এনফিল্ড রাইফেল, পয়েন্ট থ্রিএইট এস ডব্লিউ রিভলভার, শটগান, ৭.৬২ মিলিমিটার চাইনিজ রাইফেল, একে-৪৭, ৭.৬২ সাবমেশিনগান, গ্যাস গ্রেনেড, টিয়ার শেল, পেপার স্প্রে ইত্যাদি। পুলিশের হাতের থ্রি নট থ্রি হস্তান্তর হচ্ছে আনসার সদস্যদের হাতে।
১ কোটি ৬০ লাখ লি-এনফিল্ড
রয়্যাল অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরির লিভারপুল শাখায় একসময় শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয়। সে সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অন্যদিকে লি-এনফিল্ডের বৈশ্বিক চাহিদাও তখন ক্রমহ্রাসমান। এ অবস্থায় রয়্যাল অর্ডন্যান্স লিভারপুলের ফাজাকার্লিতে অবস্থিত কারখানাটি বন্ধ করে দেয়। এ কারখানার সব যন্ত্রপাতি পাকিস্তান অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি কিনে নেয় এবং পয়েন্ট ৩০৩ বোরের নম্বর ৪ রাইফেল উৎপাদন ও মেরামত অব্যাহত রাখে।
বার্মিংহামের স্মল আর্মস ফ্যাক্টরিও উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। এনফিল্ড কারখানায় এ রাইফেল উৎপাদন অনেক আগেই বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৮৭তে কারখানাটি বন্ধ করে দেয়া হয়।
লি-এনফিল্ড রাইফেলের প্রধান ব্যবহারকারী ছিল ব্রিটেন এবং ব্রিটেনের তখনকার সব কলোনি। লি-এনফিল্ডের পয়েন্ট থ্রি নট থ্রি বোরের রাইফেল ব্যবহারকারীর দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে— আফগানিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ, বেলজিয়াম, বারমুডা, কানাডা, চেক ও স্লাভ দেশগুলো, ফ্রান্স, ফিজি, গ্রিস, আইসল্যান্ড, ইন্ডিয়া, আয়ারল্যান্ড, ইসরায়েল, জ্যামাইকা, জর্ডান, কোরিয়া, লুক্সেমবার্গ, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, নেপাল, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড, নাইজেরিয়া, নরওয়ে, পাকিস্তান, পাপুয়া নিউগিনি, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, কাতার, রুয়ান্ডা, সিঙ্গাপুর, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলংকা, তিব্বত, থাইল্যান্ড, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, ব্রিটেন এবং এমনকি যুক্তরাষ্ট্র।
তবে সবাই ধীরে ধীরে লি-এনফিল্ড রাইফেল সেনাবাহিনী থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে, পুলিশের কাছ থেকেও প্রত্যাহূত হচ্ছে। আর একথা বলার অপেক্ষা রাখে না, পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই সন্ত্রাসীর অস্ত্র পুলিশের অস্ত্রের চেয়ে আধুনিক।
ভারতবর্ষের অস্ত্র
সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত অস্ত্র ছিল তরবারি। নিকট দূরত্বে থেকে আক্রমণ ও লড়াইয়ের জন্য পাঁচ ধরনের হাতিয়ার— ঢাল-তলোয়ার, গদা, কুঠার, বল্লম ও খঞ্জর। দূর থেকে আক্রমণের জন্য বেশি ব্যবহূত তীর, কামান ও বন্দুকও ছিল। বড় যুদ্ধ হতো অশ্বারোহী সৈন্যদের মধ্যে।
তরবারি ছিল বেশ কয়েক ধরনের— খান্দা, সিরোহি, পাটা ও গুপ্তি। ঢাল ছিল— চিরওয়াহ ও তিলওয়াহ।
গদার বেশ কয়েক ধরন— গুর্জ, শ্বাসবুর, ধারা, গারগাজ, খুণ্ডলি ফাঁস, কস্তুনী, খার-ই-মাছ ও গুজবাগ।
কুঠারেরও বিভিন্ন শ্রেণী— জাঘনল, তারানগালাহ ও বাসোলাহ। বর্শারও বিভিন্ন শ্রেণী— লেজাহ্, বার্সাহ, সাঙ, সাইন্থি ও সেলাবাহ।
বল্লমও বিভিন্ন ধরনের— পাণ্ডি, পাঞ্জমুখ, লাঙ্গে, গর্হিয়া, আলম, কণ্ট ও গান্দাসা।
খঞ্জরের মধ্যে ছিল— কাটারা, জমাধার, বিছুয়া, খাপওয়াহ, পেশকাজ, কারুদ ও সাইলবাহ-ই-ক্কালমাক্কি।
ধনুকের মধ্যে ছিল— চার্য, তক্ষকামান, কামান-ই-গুরোহাহ্, গোভান, কামখাহ, নওয়াক ও তুফাক-ই-দাহান।
বন্দুকের শ্রেণী— কাইলেটক— বগলতলে বহন করা হতো। জামাইল ৭-৮ ফুট লম্বা ও জিনখাল।
পিস্তলও ছিল, পিস্তলকে বলা হতো তামানচাহ। তবে তামানচাহ ব্যবহারের অধিকার ছিল কেবল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের। ১৭২০ সালে গুপ্তঘাতকের পিস্তলের গুলিতে বিশিষ্ট ভারতীয় ব্যক্তির নিহত হওয়ার নজির রয়েছে। গোলন্দাজদের হাতে ছিল ১৪ ফুট লম্বা কামান।

এনফিল্ড অস্ত্র কারখানা
১৯৯৬ সালে নিবন্ধকারের উত্তর-পূর্ব লন্ডনের এনফিল্ড ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছে। প্রাচীন ইংরেজিতে এনফিল্ড মানে মেষের চারণক্ষেত্র। ১০৮৬ সালের ডুমসডে বুকে এনফিল্ডের উল্লেখ রয়েছে। ধীরে ধীরে এলফিল্ড একটি ছোট মার্কেট টাউনে পরিণত হয়। ১৩০৩ সালে ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম এডওয়ার্ডের ফরমান অনুযায়ী সেখানে সপ্তাহে বাজার বসতে শুরু করে। বাজারের চারপাশে জনপদও গড়ে উঠতে থাকে। ১৮০১ সালে এনফিল্ডের জনসংখ্যা ১০ হাজার ৭৮৯ জন আর ভারতে সিপাহি বিদ্রোহকালীন সেখানকার লোকসংখ্যা ২০ হাজারের কাছাকাছি। ইংল্যান্ডের প্রথম ক্ষুদ্র অস্ত্রের কারখানাটি ১৮০৭ সালে লিইউশানে স্থাপিত হয়— এ এলাকায় চতুর্দশ শতক থেকেই অস্ত্রের বেচাকেনা চলে আসছিল।
নেপোলিয়নিক যুদ্ধের সময় অস্ত্রের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় রাজকীয় বোর্ড অব অর্ডন্যান্স লি নদীর পাড়ে এনফিল্ডের স্যাঁতসেঁতে জমিতে ১৮১২ সালে জমি অধিগ্রহণ করে এবং ১৮১৬ সালের মধ্যে বৃহৎ অস্ত্র কারখানাটির নির্মাণকাজ শেষ করে। ১৮৬০ সাল নাগাদ এ অস্ত্র কারখানা থেকে সপ্তাহে গড়ে ১ হাজার ৭৪৪টি রাইফেল প্রস্তুত ও সরবরাহ হতে থাকে।
এখান থেকে বহু ধরনের অস্ত্রের সরবরাহ হয়ে থাকলেও পয়েন্ট থ্রি জিরো থ্রি ক্যালিবারের বন্দুক, যা সবার কাছে থ্রি নট থ্রি নামেই পরিচিত— এটাই হয়ে ওঠে লি-এনফিল্ডের প্রধান ব্র্যান্ড প্রডাক্ট।
রয়্যাল স্মল আর্মস ফ্যাক্টরির কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এ কারখানায় ১৮৯৫ সালে প্রথম লি-এনফিল্ড থ্রি নট থ্রি উৎপাদিত হয়। তখন থেকে ১৯৫৭ পর্যন্ত ১৩ ধরনের পয়েন্ট থ্রি জিরো থ্রি ক্যালিবারের বন্দুক প্রস্তুত হয়।
এনফিল্ড অস্ত্র কারখানায় প্রস্তুত আগ্নেয়াস্ত্রের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা:
* এনফিল্ড প্যাটার্ন ১৮৫৩ রাইফেল মাস্কেট
* স্নাইপার-এনফিল্ড রাইফেল ১৮৬৬
* মার্টিনি-হেনরি রাইফেল ১৮৭১
* এনফিল্ড রিভলভার ১৮৮০
* মার্টিনি-এনফিল্ড রাইফেল; .৩০৩ ক্যালিবার ১৮৯৫
* লি-এনফিল্ড রাইফেল ১৮৯৫
* প্যাটার্ন ১৯১৪ এনফিল্ড রাইফেল
* ব্রেন লাইট মেশিনগান ১৯৩৬
* স্টেন (শেফার্ড টারপিন+এনফিল্ড) সাবমেশিনগান ১৯৪১
* ট্যাভেনগান .২৮০ ক্যালিবার মেশিনগান ১৯৫১
* ইএম ১, ইএম ২ অ্যাসল্ট রাইফেল ১৯৫১
* এল ১ এ ১ সেলফ লোডিং রাইফেল (এসএলআর ১৯৭০)
* রার্ডেন ক্যানন ১৯৭১
* এসএ ৮০ অ্যাসল্ট রাইফেল
রয়্যাল অর্ডন্যান্স ব্যক্তিখাতে ছেড়ে দেয়ার পর পরই ১২ আগস্ট ১৯৮৭ এনফিল্ডের অস্ত্র কারখানাটি বন্ধ করে দেয়া হয়। কারখানার সব মেশিন ১৯৮৮ সালে নিলামে বিক্রি করে দেয়া হয়। ব্রিটিশ অ্যারোস্পেস ও ট্রাফালগার হাউজ জায়গাটি কিনে নেয় এবং এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশে গৃহায়ণের কাজ শুরু করে দেয়। এই গৃহায়ণ প্রকল্পের নাম এনফিল্ড আইল্যান্ড ভিলেজ।

পুলিশের অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র
লর্ড ফ্রান্সিস রভন ময়রা ১৮১৩ থেকে ১৮২৩ পর্যন্ত ভারতের গভর্নর জেনারেল ছিলেন। পুলিশ বাহিনীর তিনি একজন অন্যতম সংস্কারক। ১৮১৬ সালের সপ্তদশ রেগুলেশন এবং ১৮১৭ সালের বিংশতম রেগুলেশন পুলিশের অস্ত্র ও অস্ত্র ব্যবহারের আইনগত ভিত্তি প্রদান করে। পুলিশের অস্ত্রের অন্তর্ভুক্ত হয় ব্যাটন (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বেলায় পোশাকের অংশ), বল্লম, তলোয়ার, ঢাল ও ম্যাচ-লকজাতীয় গাদা বন্দুক— বাংলার পুলিশের প্রথম আগ্নেয়াস্ত্র।
ম্যাচ-লক প্রযুক্তির উদ্ভব ১৪৫০ সালে। এ বন্দুকের ট্রিগার টেপা হলে জ্বলন্ত পলতে লাগানো অংশ এগিয়ে বন্দুকের নলের গোড়ায় বারুদে আগুন ধরিয়ে দিত। পুলিশ সরাসরি নতুন গাদা বন্দুক পেত না। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কিছুকাল ব্যবহারের পর (অস্ত্রের কার্যকারিতার ওপর ভিত্তি করে তিন থেকে সাত বছর) তা ভারতীয় পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হতো।
ম্যাচ-লক পর্বের সঙ্গেই ফ্লিন্ট-লক উদ্ভাবিত হয়। এতে ট্রিগার টিপলে ট্রিগারের সঙ্গে সংযুক্ত দ্যুতিময় পাথর ইস্পাতের পাতে আঘাত করত, তাতে আগুনের ফুলকি বের হতো। এ ফুলকি বারুদে আগুন ধরিয়ে দিত।
১৭৭৭ সালে পুলিশ পেল পয়েন্ট ৭৫০ ও পয়েন্ট ৭৮০ বোরের বন্দুক। তারপর ১৮৫৩ সালে এল এনফিল্ড রাইফেল, কিন্তু এটা পুলিশের জন্য নয়, সেনাবাহিনীর সেপাইদের।
উন্নত মানের এ রাইফেলের পুরো পরিচিতি: এনফিল্ড ১৮৫৩, থ্রি ব্যান্ড, ক্যাপলক, মাজল লোডার রাইফেল। এ রাইফেল ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থেকেই বিস্ফোরিত হলো সিপাহি বিদ্রোহ।
সিপাহি বিদ্রোহের পর ১৮৬১তে সেপাইরা পেল পয়েন্ট ৫৭৭ বোরের পারকাসান ক্যাপ বন্দুক। এটিও এনফিল্ড কারখানায় তৈরি ‘এনফিল্ড ৫৩ স্মুথ বোর মাস্কেট’। ১৮৭১-এ ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে এল কার্তুজ বন্দুক ‘মার্টিন হেনরি’ রাইফেল। পর্যায়ক্রমে তা ভারতীয় সিপাহিদের হাতে এবং পরে পুলিশের হাতে এল।
লি-এনফিল্ড রাইফেল মার্ক ৩ দীর্ঘকাল সেনাসদস্যদের ব্যবহারের পর তা রি-বোর করে পুলিশ বিভাগে পাঠানো হয়।
লি-এনফিল্ড রাইফেলের উন্নততর সংস্করণ বোল্ট অ্যাকশন রাইফেল পয়েন্ট ৩০৩ বোর, ১০ গুলির ম্যাগজিন ১৮৯৫ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে তাদের স্ট্যান্ডার্ড রাইফেল হিসেবে স্থান করে নিল। পয়েন্ট থ্রি জিরো থ্রি— জিরো নট, সেই থেকে মানুষের মুখে মুখে থ্রি নট থ্রি।
সৈনিকরা আজ আর থ্রি নট থ্রি ব্যবহার করে না, পুলিশরা থ্রি নট থ্রি থেকে বেরিয়ে আসছে। সবচেয়ে বড় কথা, থ্রি নট থ্রির আর উৎপাদন হচ্ছে না।
থ্রি নট থ্রি দিয়ে যুদ্ধ
পয়েন্ট থ্রি জিরো থ্রি ক্যালিবার কার্তুজ যেসব যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে, তার একটি তালিকা প্রদান প্রাসঙ্গিক হবে:
সেকেন্ড বোরের ওয়ার
বক্সার বিদ্রোহ
প্রথম মহাযুদ্ধ
অনেকগুলো উপনিবেশবাদবিরোধী যুদ্ধ
আইরিশ স্বাধীনতা যুদ্ধ
আইরিশ জনযুদ্ধ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ
ইন্দোনেশিয়ান ন্যাশনাল রেভল্যুশন
ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ
গ্রিক জনযুদ্ধ
মালয়ান ইমার্জেন্সি
ফরাসি-ইন্দোচীন যুদ্ধ
কোরিয়ান যুদ্ধ
আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ
সুয়েজ সংকর
মাউ মাউ বিদ্রোহ
চীন-ভারত যুদ্ধ
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ
আফগানিস্তানে সোভিয়েত আক্রমণ
নেপালি জনযুদ্ধ
আফগানিস্তান সংকট
পয়েন্ট থ্রি জিরো থ্রি ইঞ্চি হচ্ছে বুলেটের ব্যাস এবং এর গতি সেকেন্ডে ২ হাজার ৫৭০ ফুট থেকে ২ হাজার ৭৭০ ফুট।
থ্রি নট থ্রি রাইফেল কতটা পুরনো— এ প্রশ্নটি সংগ্রাহকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ব্যবহারকারীর কাছে অবান্তর। সঠিক যত্নে লালিত ও মরচে প্রতিরোধ হয়ে থাকলে এখনো ৭০-৮০ বছরের পুরনো বন্দুক একই গতিতে টার্গেটে আঘাত করবে। ১৮৯৫ থেকে ১৯৫৭ পর্যন্ত থ্রি নট থ্রি ছিল ব্রিটিশ ইনফ্যাট্রির সবচেয়ে আদৃত বন্দুক।
থ্রি নট থ্রি দিয়ে দুটি মহাযুদ্ধ জয়
মিত্রশক্তির জয়ের অনেক কারণের একটি— তাদের সাধারণ সৈন্যদের হাতে লি-এনফিল্ড থ্রি নট থ্রি ছিল। খুব সহজে স্বল্প প্রস্তুতিতে ব্যবহারযোগ্য এ অস্ত্র শত্রুকে ভড়কে দিতে তখন যথেষ্ট ছিল।
কেবল প্রথম মহাযুদ্ধের সময় উত্তর-পূর্ব লন্ডনের এনফিল্ড ফ্যাক্টরিতে ৩৮ লাখ রাইফেল প্রস্তুত করা হয়েছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় এর চাহিদা কিছুটা কমে গেলেও সাধারণ সৈনিকদের জন্য এটাই ছিল উত্তম অস্ত্র।
আনাতোলি কালাশনিকভ— একে-৪৭ অস্ত্রের বাজারে নামার পর থ্রি নট থ্রি মার খেতে থাকে। সৈন্যদের অধিকর্তারা নিজেদের জন্য পছন্দ করতে থাকেন ক্ষুদ্রাস্ত্র।
ছয়টি কারখানায় ব্রিটিশ অস্ত্র তৈরি হতো। অস্ত্রের গায়ে মার্কিং দেখে নিশ্চিত হওয়া যেত কোনটি কোন কারখানায় তৈরি। যেমন Enfield Lithgo
Enfield: রয়্যাল স্মল আর্মস ফ্যাক্টরি, এনফিল্ড, ব্রিটেন
Sparkbrook: রয়্যাল স্মল আর্মস ফ্যাক্টরি, স্পার্কব্রুক, ব্রিটেন
BSA Co.: বার্মিংহাম স্মল আর্মস কোম্পানি, ব্রিটেন
LSA Co.: লন্ডন স্মল আর্মস কোম্পানি, ব্রিটেন
Lithgo: লিথগো স্মল আর্মস ফ্যাক্টরি, অস্ট্রেলিয়া
GRI: ইশাপুর রাইফেল ফ্যাক্টরি, ব্রিটিশ ইন্ডিয়া
RFI: ইশাপুর রাইফেল ফ্যাক্টরি, ইন্ডিয়া (স্বাধীনতার পর)

GRI এখন সংগ্রাহকের প্রিয় আইটেম। এটি Georgius Rex, Imperor [লাতিন মানে রাজা জর্জ, (ভারত) সম্রাট]
সিপাহি বিদ্রোহের পেছনে এনফিল্ড রাইফেল
মিরাট, ২৪ এপ্রিল ১৮৫৭।
শুক্রবার। থার্ড বেঙ্গল ক্যাভালরি রেজিমেন্টের কমান্ড্যান্ট কর্নেল কারমাইকেল স্মিথ তার রেজিমেন্টের ৯০ জন সেপাইকে সমবেত হতে নির্দেশ দিলেন। তিনি আরো হুকুম দিলেন বিতর্কিত ‘তৈলাক্ত কার্তুজ’ ব্যবহার করতে হবে। ঠিক আগের দিন সন্ধ্যায় সেপাইরা শপথ নিয়েছে— তারা এই কার্তুজ স্পর্শ করবে না।
৯০ জন সেপাইয়ের মধ্যে ৮৫ জনই তাদের প্রতিশ্রুতি ভাঙতে অস্বীকার করল। কর্নেল কারমাইকেল হতবাক, সামান্য সেপাই তার নির্দেশ অমান্য করছে।
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের এই তো সূচনা। তবে জানুয়ারি থেকেই সেপাইরা তেতে উঠছিল। কারণটা তাদের ব্যবহূত এনফিল্ড রাইফেল থেকেই উদ্ভূত।
এনফিল্ড রাইফেল মাস্কেটের তৈলাক্ত কার্তুজের খোলস দাঁত দিয়ে ছিঁড়তে হতো। সেপাইরা জেনেছে, এই তৈলাক্ত দ্রব্য গরু ও শূকরের চর্বি মিশিয়ে তৈরি করা। গরু হিন্দুদের কাছে ধর্মীয় দিক থেকে পবিত্র এবং শূকর মুসলমানদের জন্য ধর্মীয় নির্দেশে হারাম। দাঁত দিয়ে কার্তুজ খুলতে গেলে হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষেরই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার কথা। এর সঙ্গে প্রচারণা চালানো হলো, হিন্দু ও মুসলমান উভয়ের ধর্মনাশ করার জন্য এটি একটি ব্রিটিশ/খ্রিস্টীয় ষড়যন্ত্র।
বেঙ্গল আর্মির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সুনির্দিষ্ট একটি সাধারণ নির্দেশ ছিল, সিপাহিদের যেন এই কার্তুজ ব্যবহারের নির্দেশ না দেয়া হয়। এ সম্পর্কে পরবর্তী নির্দেশ পাওয়ার পরই যেন কমান্ডাররা সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু কারমাইকেল স্মিথ নিজে উদ্যোগী হয়ে সিপাহিদের শেখাতে গেলেন, কেমন করে কামড় না দিয়ে কার্তুজ ব্যবহার করা যায়। কর্নেল স্মিথ যদি এ উদ্যোগ না নিতেন, তাহলে সেপাইদের বিদ্রোহ হতো না এমন নয়। এর মধ্যে তারা সঙ্গোপনে তাদের বিদ্রোহের তারিখ ধার্য করে রেখেছিল ৩০ মে ১৮৫৭।
ব্রিটিশ পক্ষ থেকে বলা হলো, কার্তুজে আপত্তিকর কিছু নেই। যেহেতু সেপাইরা অবাধ্য হয়েছে, তাই প্যারেড বাতিল করা হলো। এ নিয়ে তদন্ত হবে। তদন্তের ফলাফল দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
৯ মে ১৮৫৭ থার্ড বেঙ্গল ক্যাভালরি রেজিমেন্টের অবাধ্য সৈনিকদের কোর্ট মার্শাল হয়। মিরাট মিলিটারি ক্যান্টনমেন্টের প্যারেড গ্রাউন্ডের ফাঁকা তিন দিক থেকে চার হাজার ব্রিটিশ সৈন্য ও তাদের অনুগত সেপাই ‘অপরাধী’ সেপাইদের ঘিরে থাকে। তারা শাস্তির দর্শক, অপ্রীতিকর কিছু ঘটলে তারাই ব্যবস্থা নেবে। ৮৫ জন হিন্দু ও মুসলমান অবাধ্য সৈনিককে লাইন ধরিয়ে তাদের ইউনিফর্ম খুলে নেয়া হলো, তারপর সোজা মার্চ করিয়ে জেলখানায়।
১০ মে ১৮৫৭ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সিপাহি বিদ্রোহ শুরু হলো।
ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্ক— আণ্টাঘরে ফাঁসিতে ঝোলানো হলো এখানকার বিদ্রোহী সেপাইদের।
অস্ত্রাগার লুণ্ঠন: অস্ত্র মিলেছে গুলি মেলেনি
গান্ধীজি বলেছিলেন, ১৯২৯-এর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে স্বাধীনতা চাই।
কিন্তু অহিংস আন্দোলনে স্বাধীনতা এল না।
হাতে অস্ত্র চাই। তারও আগে ১৯২৩-এর ১৪ ডিসেম্বর অনন্ত সিং, দেবেন দে ও নির্মল সেন চট্টগ্রামের বাটালি হিল এলাকায় রেলওয়ের টাকা লুট করেন। লুটের ১৭ হাজার টাকা নিয়ে দলিলুর রহমান ও অম্বিকা চক্রবর্তী অস্ত্র কিনতে কলকাতা চলে গেলেন। ১৯২৪ সালে চট্টগ্রামের নোয়াপাড়ায় অস্ত্র লুট হয়। সন্দেহ করা হয় মাস্টারদা সূর্য সেনকে। সূর্য সেন চাকর সেজে চট্টগ্রাম পুলিশকে ধোঁকা দিয়ে পালিয়ে যান। কিন্তু কলকাতার আমহার্স্ট স্ট্রিটে গ্রেফতার হন। দুই বছর কারাবাস করে ফিরে এসে পরিকল্পনা বিস্তৃত করেন:
ক. নিজাম পল্টনের অস্ত্রাগার ও রেলওয়ে অক্সিলিয়ারির অস্ত্রাগার দখল লুণ্ঠন।
খ. টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ও টেলিগ্রাম অফিস দখল।
গ. ট্রেজারি দখল ও অর্থ অপসারণ।
ঘ. কারাগার আক্রমণ ও কয়েদিদের মুক্তি নিশ্চিতকরণ।
ঙ. ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ ও ইংরেজ হটিয়ে তা দখলকরণ।
চ. আদালত দখল ও জাতীয় সরকার গঠন।
আয়ারল্যান্ডের ইস্টার রাইজিংয়ের দিন ১৮ এপ্রিল অপারেশনের জন্য নির্ধারিত হলো।
ক. অনন্ত সিংহ ও গণেশ ঘোষের নেতৃত্বে নিজাম পল্টন অস্ত্রাগার ও রিজার্ভ পুলিশ লাইনস অবরোধ ও লুণ্ঠন।
খ. লোকনাথ বল ও নির্মল সেনের নেতৃত্বে রেলওয়ে অক্সিলিয়ারি বাহিনীর অস্ত্রাগার অবরোধ ও লুণ্ঠন।
গ. অম্বিকা চক্রবর্তীর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ এক্সচেঞ্জ অফিস অবরোধ ও লাইন বিচ্ছিন্নকরণ।
ঘ. উত্পল ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে রেললাইন অকেজোকরণ।
সূর্য সেন ৬৫ জন সহযোদ্ধা নিয়ে রাতের বেলা চট্টগ্রাম পুলিশ লাইনসের অস্ত্রাগার অবরোধ ও দখল করে নেন। সেনা পোশাকে সজ্জিত বিপ্লবীদের হাতে ছিল কয়েকটি রাইফেল ও রিভলভার। বিপ্লবীদের বাধা দিতে গিয়ে নিহত হন ব্রিটিশ সার্জেন্ট ব্ল্যাকবার্ন, সার্জেন্ট কলোন ও সার্জেন্ট মেজর ফেরেল।
বিপ্লবীদের দখলে এল রাইফেল, রিভলভার ও মেশিনগান। কিন্তু বিপ্লবীদের জানা ছিল না, মেশিনগানের গুলি ভিন্ন জায়গায় সুরক্ষিত থাকে। ফলে অসম্পন্ন রয়ে যায় অস্ত্রাগার লুণ্ঠন।

এনফিল্ড খাইবার পাস সংস্করণ
নকল দ্রব্য তৈরিতে বাংলাদেশের জিঞ্জিরা বিকাশের অন্তত ৫০ বছর আগে আগ্নেয়াস্ত্রের ‘দুই নম্বরি নির্মাতা’ হিসেবে বিশ্বখ্যাত হয়ে উঠেছিল পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের খাইবার পাস— খাইবার গিরিপথ।
সেখানকার গিরিপথের অস্ত্রের কথা বহু বছর আগে সৈয়দ মুজতবা আলী তার দেশে-বিদেশে’তে লিখে গেছেন।
খাইবার পাসে তৈরি থ্রি নট থ্রি হুবহু মাস্টার কপির মতোই। পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তপথে মার্টিনি-হেনরি ও মার্টিনি-এনফিল্ড প্রচুর পরিমাণে তৈরি হয়েছে এবং তা ব্রিটিশ ভারতে সার্ভিস রাইফেল হিসেবে ব্যবহূতও হয়েছে। অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, খাইবার গিরিপথে তৈরি কিছু অস্ত্র ব্রিটিশ ফ্যাক্টরিতে তৈরি অস্ত্রের হুবহু অনুলিপি, গুণগত মানও একই, তবে কিছুসংখ্যক অস্ত্র নির্মাণে ত্রুটির কারণে নিরাপদে ব্যবহারযোগ্য নয়। তাতে ব্যবহারকারীর জীবনই বিপন্ন হতে পারে।
তবে মার্কিংয়ে ভুল বানান কাঠের বাঁটের অপটু ফিনিশিং এবং অপেক্ষাকৃত কোমল ধাতব পদার্থ ব্যবহারের কারণে খাইবার অস্ত্র ধরা পড়ে যায়।
খাইবার অস্ত্রে ভারতীয় ব্রিটিশ সৈন্যরাও প্রতারিত হয়েছে। পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ভারতে লি-এনফিল্ড অস্ত্র এখনো ব্যাপক জনপ্রিয় হওয়ায় খাইবার পাস সংস্করণ থেমে নেই; উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে।
সফট পয়েন্ট ৩০৩ গুলি শিকারের জন্য ব্যবহার করা হয়। উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলেও মেরামত ও কিছুটা পরিবর্তন করে লি-এনফিল্ড পুরনো বন্দুকের এখনো উল্লেখযোগ্য ব্যবহার রয়েছে।
একাত্তরের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ থ্রি নট থ্রিতে
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও যুদ্ধের প্রথম আগ্নেয়াস্ত্র লি-এনফিল্ড পয়েন্ট ৩০৩ ক্যালিবারের বন্দুক।
২৫ মার্চ, ১৯৭১ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গতিবিধি ও বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের পুলিশ সদস্যদের অমঙ্গলের অশনিসংকেত দিয়েছিল।
থ্রি নট থ্রি রাইফেল হাতে নিয়ে প্রতিরোধ প্রস্তুতি নেয় রাজারবাগ পুলিশ। রাত সাড়ে ১১টায় পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী যখন আক্রমণ চালায়, প্রত্যাঘাতের জন্য তারা মোটেও প্রস্তুত ছিল না। পুলিশের পাল্টা গুলিবর্ষণে হতভম্ব হয়ে মর্টার শেল নিক্ষেপ করতে থাকে এবং ভারী মেশিনগানের অবিরাম গুলিবর্ষণ চালায়। সে সময় পুলিশ ওয়্যারলেসে পূর্ব পাকিস্তানের সব পুলিশ স্টেশনে বার্তা পাঠায়— আমরা আক্রান্ত হয়েছি, তোমরা নিজেদের প্রতিরক্ষা করো।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে লি-এনফিল্ড থ্রি নট থ্রি ছাড়া বহুল ব্যবহূত হয়েছে স্টেনগান ও হ্যান্ডগ্রেনেড।
অপরাজেয় বাংলায় থ্রি নট থ্রি
ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদের স্মরণীয় কীর্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে ৬ ফুট উঁচু বেদিতে ১২ ফুট উচ্চতার, ৮ ফুট প্রস্থের ভাস্কর্য ‘অপরাজেয় বাংলা’। এর নির্মাণকাজ শুরু ১৯৭৩-এ আর উদ্বোধন ১৯৭৯-র ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে। এতে তিনজন মুক্তিযোদ্ধা— দুজন পুরুষ ও একজন নারী মূর্ত। একজনের হাতে থ্রি নট থ্রি রাইফেল, মডেল হয়েছিলেন সৈয়দ হামিদ মকসুদ ফজলে, অন্য দুজন বদরুল আলম বেণু ও হাসিনা আহমেদ। একাত্তরের কীর্তিময় গতিময়তার অন্যতম হাতিয়ার ছিল থ্রি নট থ্রি রাইফেল। শিল্পী তা তুলে এনেছেন তার ভাস্কর্যে।






