হুমায়ূন ও আরো কটি প্রত্যাখ্যানের গল্পনানা কারণেই একটি ভালো লেখাও প্রকাশক প্রত্যাখ্যান করতে পারেন, তার কারণে একজন লেখক প্রকাশককে কতখানি দোষারোপ করতে পারেন! লেখক বিরক্ত হতে পারেন, প্রকাশকের ব্যাখ্যায় অসন্তুষ্ট হতে পারেন, কিন্তু তিনি কি ওই প্রকাশককে মূর্খ বলে গাল দিতে পারেন? কিংবা পত্রিকার পাতায় বিশাল এক আর্টিকেল ফেঁদে বসতে পারেন? কিংবা হালের ফেসবুক নামের অরাজক রাজ্যে পারেন কি আরেকটি শোরগোল তুলে দিতে?

দীর্ঘদিন পরিচিতজনদের লেখালেখি এবং নিজেও দু-একবার পাণ্ডুলিপি পুস্তকাকারে প্রকাশের জন্য বিভিন্ন প্রকাশকের শরণাপন্ন হওয়ায় প্রত্যাখ্যানের বেদনা জানি; এবং পরিচিত লেখক-প্রকাশকের কাছেও প্রত্যাখ্যাত হওয়া ও প্রত্যাখ্যান করার এন্তার গল্প শুনেছি।

প্রয়াত লেখক হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে খানিকটা সখ্য ছিল, আর তারুণ্যের দীর্ঘ একটা সময় অন্য অনেক তরুণের মতো তখন সোভিয়েত রাশিয়া আর সেবা প্রকাশনীর বই পড়ে বড় হয়েছি, সেই সুবাদে সেবা প্রকাশনীতে নিয়মিত যাতায়াতও ছিল। সেবার কর্ণধারের সঙ্গে খানিকটা জানাশোনাও ছিল সে সুবাদেই; (এখানে বলতে হয়, দেশের অনেক বিখ্যাত লেখক-চিত্রশিল্পী একসময় সেবা প্রকাশনীতে নিয়মিতই লিখেছেন, সেবার বইয়ের প্রচ্ছদও এঁকেছেন কেউ কেউ। কাজী আনোয়ার হোসেনের বন্ধু কথাশিল্পী রাহাত খানও সেবায় লিখেছেন। কাজী আনোয়ার হোসেনের চালু করা, তুমুল জনপ্রিয় থ্রিলার মাসুদ রানার ঊর্ধ্বতন অর্থাৎ অ্যাসাইনমেন্ট বসের নামও রেখেছিলেন বন্ধু রাহাত খানের নাম থেকে নিয়েই। সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন শিল্পী হাশেম খান, বিচিত্রা সম্পাদক শাহাদত চৌধুরী— তিনিই প্রথম বাংলাদেশে পেপারব্যাক বইয়ের প্রচ্ছদ করতে কাগজ-তুলি-রঙে আঁকার পরিবর্তে কাহিনীর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বিদেশী ম্যাগাজিন থেকে বিভিন্ন ছবি নিয়ে কোলাজ প্রচ্ছদ চালু করেন—সেবার প্রচ্ছদ এখনো এই কায়দাতেই হচ্ছে। শাহাদত চৌধুরী শুনেছি এক-দুটো মাসুদ রানা লেখারও চেষ্টা করেছিলেন। তাই আমি অনেককে দেখেছি, শুনেছিও: সেই সময়ের এবং পরে বিখ্যাত হওয়া অনেক লেখকই একসময় সেবার নিয়মিত লেখক ছিলেন। এবং এই কাতারে শামিল হয়েছিলেন বাংলাদেশের কিংবদন্তিতুল্য লেখক হুমায়ূন আহমেদ এবং তার সহোদর বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর লেখক জাফর ইকবালও)।

হুমায়ূনের প্রথম পাণ্ডুলিপি সেবায় প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল: সেবায় জমাকৃত পাণ্ডুলিপির ক্ষেত্রে বেশির ভাগই কাজী আনোয়ার হোসেন নিজেই যাচাই-বাছাই ও সম্পাদনার কাজটি করতেন, সেবার স্বর্ণযুগে প্রচুর পাণ্ডুলিপির চাপ সামলাতে প্রয়োজনে কিছু পাণ্ডুলিপি তিনি অন্যদের দিয়েও সম্পাদনা করাতেন।

হুমায়ূন পাণ্ডুলিপি জমা দিয়েছেন (টাকার প্রয়োজনেই তিনি সেবায় লেখা নিয়ে গিয়েছিলেন, এটা পরে তার কোনো স্মৃতিচারণ কিংবা সাক্ষাত্কারে উল্লেখ করেছিলেন), পাণ্ডুলিপি পড়ে হুমায়ূনকে কিছু জায়গা নির্দেশ করে জানানো হলো: ভুলভাল আছে এগুলো ঠিক করতে হবে...। হুমায়ূন তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি কাজী আনোয়ার হোসেনের হাত থেকে পাণ্ডুলিপি নিজ হাতে নিলেন, পাণ্ডুলিপিতে নির্দেশিত অংশ দেখলেন মনোযোগ দিয়ে, সম্পাদকের বক্তব্য শুনলেন, তারপর উঠে দাঁড়ালেন। মুথ থম থম করছে তার।

পাণ্ডুলিপি বগলে নিয়ে এরপর সোজা বেরিয়ে এলেন কাজী আনোয়ার হোসেনের অফিস থেকে। তাত্ক্ষণিক অসন্তুষ্টি বা রাগ যা-ই বলি, তিনি দ্রুত তা সামলে নিয়ে আবার ফিরে এলেন কাজী আনোয়ার হোসেনের দপ্তরে, প্রকাশকের প্রস্তাবেই সম্মতি দিয়ে ফিরে গেলেন।

এরপর এ বিষয়ে হুমায়ূন আহমেদ লিখিত আকারে আর কখনো কোনো কথা বলেছেন কিনা, আমার জানা নেই। দু-একবার ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তিনি কাজী আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে একমত ছিলেন না বলেছেন। যে কারণে সেবার সঙ্গে হুমায়ূনের সম্পর্ক খুব বেশি দীর্ঘ হয়নি। বরং সেই সময়ের প্রতিদ্বন্দ্বী পেপারব্যাক প্রকাশনা অবসর থেকে বের করেছিলেন ‘দেবী’ বইটি, যদি স্মৃতি বিশ্বাসঘাতকতা না করে থাকে। আর মনে পড়ছে পরে, হুমায়ূনের উপন্যাসে ব্যবহূত একটি শব্দ নিয়ে প্রায়ই সেবার রহস্যপত্রিকা অফিসে তখন হাসিঠাট্টা হতো; হুমায়ূন জ্বরের তীব্রতা বোঝাতে লিখেছিলেন ‘আকাশ-পাতাল জ্বর’।

 

২.

১৯৫০ সালের এক গ্রীষ্মকালে মানসম্পন্ন এবং সুরুচিপূর্ণ প্রকাশনার জন্য সুবিদিত প্রকাশনা সংস্থা আলফ্রেড এ. নপ ডাচ ভাষায় রচিত একটি বই ইংরেজি ভাষায় প্রকাশের জন্য সম্মত হয়েও, প্রকাশের আগে পাঠকের কাছ থেকে পাওয়া তীব্র সমালোচনা-প্রতিবেদনের কারণে প্রকাশনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়ায়; কী ছিল রিপোর্টে? পাঠকের কাছে এক কথায় পুস্তকটিকে মনে হয়েছে ‘খুবই নিরানন্দের’, পাঠক জোরের সঙ্গে বইটি সম্বন্ধে বলেছেন, ‘পারিবারিক কলহের অতি একঘেয়ে বর্ণনা, সাধারণ তুচ্ছ সব দুঃখ-কষ্ট আর যুবক-যুবতীর আবেগে ভরপুর।’ খুব বেশি বিক্রির সম্ভাবনা নেই, কারণ মূল চরিত্র আমেরিকানদের কাছে পরিচিতও না, আর তেমন একটা আকর্ষণীয়ও না। ‘কাজটি যদি আরো পাঁচ বছর আগেও প্রকাশিত হতো, যখন বিষয়বস্তুর সমসাময়িকতা ছিল, তাহলে কিছু সাড়া হয়তো মিলত’, একজন পাঠক আরো বলেছেন, ‘আমি এই বইয়ের কোনো সম্ভাবনা দেখছি না।’

নপ একা না। আরো আছে। ‘দ্য ডায়েরি অব এ ইয়ং গার্ল’, আনা ফ্রাঙ্কের জগদ্বিখ্যাত বই, শুনলে অবাক হবেন, ১৯৫২ সালে ডাবলডে প্রকাশনা সংস্থা ছাপার আগে এ বইটির কপালে প্রত্যাখ্যানের টিকা জুটেছিল ১৫ বার। তিন কোটিরও বেশি কপি বাজারে আছে বইটির, বলা যায় সর্বাধিক বিক্রীত বইয়ের ইতিহাসে শুরুর দিকেই আছে বইটি।

আনা ফ্রাঙ্কের বইটি নিয়ে আরো কিছু ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যারি র্যানসন হিউম্যানিটিজ রিসার্চ সেন্টারে প্রতিষ্ঠিত নপ প্রকাশনা সংস্থার মহাফেজখানার কিছু কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেল: এর মধ্যে একটি হলো প্রকাশকের প্রত্যাখ্যানের নথি। দুনিয়ার সব দেশের প্রকাশকই বুঝি এক, তাদের হাত গলে কোনো কালজয়ী উপন্যাস কিংবা সর্বাধিক বিক্রীত বইয়ের পাণ্ডুলিপিটি বেরিয়ে গেলেও তারা কিছুমাত্র লজ্জিত হন না! এ নথিতে একজন প্রকাশকের কথা বলা হচ্ছে, যিনি ১৯৩২ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়া পার্ল বাকের উপন্যাস ‘দ্য গুড আর্থ’ প্রত্যাখ্যানের কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন: আমেরিকার পাঠকরা চীনের কোনো বিষয় নিয়েই আগ্রহী না। আরেক ফাইলে দেখা যাচ্ছে জর্জ অরওয়েলের ‘অ্যানিমেল ফার্ম’ বইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রত্যাখ্যান করে প্রকাশক কারণ উল্লেখ করছেন এই বলে: ‘আমেরিকায় জীবজন্তুর গল্পের বই বিক্রি করা অসম্ভব।’ টনি হিলারম্যান নামে এক লেখককে প্রকাশক পর্যন্ত যেতে হয়নি, তার আগেই এজেন্ট তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এই বলে: ‘আপনার ইন্ডিয়ানদের ওসব ব্যাপার-স্যাপার আগে ছেঁটে নিয়ে আসুন।’

বইয়ের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখবেন প্রায় গোটা একটা শতক পশ্চিমা দুনিয়ায় নপ প্রকাশনা সংস্থা প্রকাশনার সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন প্রকাশক হিসেবে বিবেচিত ও রাজত্ব করে এসেছে। দুনিয়ায় তারাই এককভাবে ১৭ জন নোবেলজয়ী, ৪৭ জন পুলিত্জারজয়ী লেখকের বইয়ের প্রকাশক। নপ হয় তাদের কারো উপন্যাস, নন-ফিকশন, জীবনী কিংবা ইতিহাসের বই প্রকাশ করেছে। নপের এসব নথিতে পাঠকদের কিছু প্রতিক্রিয়াও সন্নিবেশিত আছে, যা থেকে স্পষ্ট হয়ে আছে তাদের ভালো লেখা বোঝার অক্ষমতাও, বিশেষ করে নতুন প্রতিভা শনাক্ত করায় তারা নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। প্রত্যাখ্যানের এই নথিভুক্ত হয়েছে ১৯৪০ থেকে ১৯৭০ সালের বড় বড় প্রত্যাখ্যানের চিঠিপত্রও। এর মধ্যে রয়েছে হোর্হে লুইস বোর্হেসকে বাতিলের সিদ্ধান্ত (‘পুরোদস্তুর অনুবাদের অযোগ্য’), আইজাক বশোভিস সিঙ্গার ( ‘আবারো পোল্যান্ড আর ধনী ইহুদি’র গল্প), মার্কিন কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক আনাস নিন (‘তাকে ভেড়ানোয় কোনো বাণিজ্যিক সুবিধা পাওয়া যাবে না, আর এক্ষেত্রে তার লেখা আমার মতে, অশৈল্পিক’), সিলভিয়া প্লাথ (‘নিশ্চিত করেই বলা যায় আমাদের নজর দেয়ার মতো, সত্যিকারের তেমন কোনো প্রতিভা না’) আর জ্যাক কেরুয়াক (‘তার ক্ষিপ্ত আর বিক্ষিপ্ত গদ্য সুচারুভাবে বিট জেনারেশনের জ্বরগ্রস্ত ভ্রমণকেই প্রকাশ করেছে। কিন্তু আমাদের জন্য এটা কি যথেষ্ট? আমার মনে হয় না’)।

এক নপের প্রত্যাখ্যানের ইতিহাসই এত সমৃদ্ধ যে, পরবর্তী দুই বছরের ব্যাপ্তিতেই দেখা যাচ্ছে ১৯৫৫ সালের শুরুতে তারা ‘প্রত্যাখ্যাত’ সিল মেরে ফিরিয়ে দিচ্ছে জাঁ পল সার্ত্রে, মোর্দেকায় রিখলার, আর ঐতিহাসিক এ. জে. পি. টেইলরকে, বলতে দ্বিধা হচ্ছে কিন্তু এই একই সময়ে তারা ভ্লাদিমির নবোকভের ‘ললিতা’ বাতিল করেছে (বেশি তীব্র) বলে, আর জেমস বল্ডউইনের ‘গিওভান্নি’স রুম’ সম্পর্কে মূল্যায়ন, (‘হতাশাজনক বাজে’)।

এবার আশি-নব্বইয়ের দশকের এদেশর কজন তরুণ লেখকের সাময়িক প্রত্যাখ্যান তথা সম্পাদক ভাগ্যের কথাও বলি (নামধাম অনুল্লেখ রেখেই), হুমায়ূন আহমেদের মতো না হলেও ছোট পরিসরে তাদেরও বিচিত্র প্রত্যাখ্যানের গল্প আছে। তার কিছু আমি সরাসরি দেখেছি, কিছু লেখকদের কাছ থেকে শোনা। ঢাকার একটি নাম করা পেপারব্যাক প্রকাশনা সংস্থা, তাদের উত্তুঙ্গ জনপ্রিয় অবস্থায় মাসে চার-পাঁচটি করে বই প্রকাশ হতো, কখনো আরো বেশি। ওই সময় কিছু প্রকাশনীর কজন বাঁধা লেখক ছিলেন, তারা পুরোদস্তুর লেখালেখি করেই সংসার চালাতেন, ফলে প্রতি মাসে তাদের একটি বই না প্রকাশিত হলে কেয়ামতের মতো এক মহাবিপর্যয় নেমে আসত: ‘হায় হায় আগামী মাসে সংসার চালাব কী করে হে!’ হাহাকারের মতো হয়ে উঠত তাদের কারো কারো এই আর্তি। এবং তাদের এই হাহাকার লাঘবে একসময় প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠত সদ্য আগত কিংবা দুই-তিন মাস অন্তর একটা-দুটো বই প্রকাশিত হয় এমন তরুণ লেখকরা, তখন তারা করুণ মুখে আকারে-ইঙ্গিতে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করতেন: ভাই, তোমার তো সংসারের কোনো চাপ নেই, বইটা পরের মাসে বেরোলে এমন কী ক্ষতিবৃদ্ধি হবে, তোমার বইটা এক মাস পিছিয়ে দিই কি বলো! চক্ষুলজ্জার খাতিরে হলেও বেশির ভাগ সময়ই সম্মতি মিলে যেত ওই তরুণ লেখকের, তখন প্রকাশককে বলে এক মাস পিছিয়ে দেয়া হলো তরুণের বইটি। কিন্তু পরের মাসে যখন আবার শিডিউলে ঢুকল বইটা, এবার? এবার তরুণ লেখক জায়গা ছেড়ে দিলেও পেছানোর কোনো উপায় নেই। কারণ, প্রকাশক বারবার কোন যুক্তিতে পেছাবেন? তখনই নতুন এক ধরনের প্রত্যাখ্যানের উপায় বেরিয়ে গেল: প্রকাশনার সেই স্বর্ণযুগে, পাণ্ডুলিপির বিপুল সমারোহ ছিল; নিজের লেখা, প্রকাশনার প্রাত্যহিক কাজ— সব মিলিয়ে মহাব্যস্ত প্রকাশক একপর্যায়ে কিছু কিছু পাণ্ডুলিপি ওই নিয়মিত পেশাদার লেখকদের এক-দুজনকে এবং তাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলায় পড়ুয়া গৃহিণীর কাছে সম্পাদনার জন্য পাণ্ডুলিপি বিতরণ শুরু করলেন। ফলাফল দাঁড়াল: প্রায় তরুণের লেখাতেই প্রচুর ‘ভুলভাল’ বের হতে শুরু করল, দায়িত্বপ্রাপ্ত সম্পাদককে প্রচুর ‘সম্পাদনা’ করতে হচ্ছে, ফলে কোনো পাণ্ডুলিপির সম্পাদনা এক-দুই মাসেও শেষ হয় না, কোনো কোনো সময় যদি পাণ্ডুলিপির সম্পাদক ও লেখকের একই ধরনের অর্থাৎ বিদেশী কাহিনী অবলম্বনে উপন্যাস বা শুধু অনুবাদ হয়, তাহলে সেই পাণ্ডুলিপি দু-তিন মাসেও শেষ হবে না, স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়াল। এবং চূড়ান্তভাবে সেই পাণ্ডুলিপি যখন সম্পাদিত হয়ে আসত, দেখা যেত তার পাতাজুড়ে শুধু লাল কালির আঁকিবুঁকি— অর্থাৎ ব্যাপক ‘সম্পাদনা’ হয়েছে— তাই তো এত কাটাকুটি, দেরি তো হবেই! কাটাকুটির দু-একটা নমুনা দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল: মূল লেখক লিখেছে— ‘সবাই চুপচাপ’, সম্পাদক মহাশয় কেটে লাল কালি দিয়ে বেশ গোটা গোটা করে লিখে দিয়েছেন— ‘সবাই নীরব’, আবার এক জায়গায় লেখা হয়েছে— ‘সে কাজটি শেষ করতে পারল’; সম্পাদক সাহেব ওই বাক্য কেটে লিখেছেন, ‘সে কাজটি শেষ করার প্রয়াস পেল’, নিঃসন্দেহে অতি মনোহর সম্পাদনা। এ পর্যন্ত হলেও চলত, তারপর এই সম্পাদকদের একজন টনি হিলারম্যানের এজেন্টের মতো সংশোধনের ফর্দ লিখে দিতে শুরু করল পাণ্ডুলিপির উপরের পৃষ্ঠায়, ‘সিলি মিসটেক’ ‘গুরুচণ্ডালী দোষ’ ‘কষ্ট কল্পনা’; তো সম্পাদকের প্রস্তাব কী? এগুলো লেখক আগে ঠিক করে দিলে তারপর তিনি সম্পাদনার কাজে হাত দেবেন। পাণ্ডুলিপি মূল লেখকের কাছে ফেরত গেল (মানে সম্পাদক অন্তত আগামী দুই-তিন মাস তার শিডিউল ফেঁসে যাওয়া আটকে দিতে পারলেন)। তরুণ লেখকদের কারো কারো কাছে একে সাময়িক হলেও প্রত্যাখ্যানই মনে হতো। এক-দেড় মাস পর ওই পাণ্ডুলিপিই কিছু না করেই তিনি জমা দিতেন এবং সেই সম্পাদক মহাশয় চরম নিষ্ঠায় পূর্ববৎ দুই মাস সময় নিয়ে নীরবকে চুপ, চুপকে নীরব, মধ্যম সারিকে মাঝারিগোছের জাতীয় সম্পাদনাসমেত পাণ্ডুলিপি ছাপার জন্য প্রকাশকের কাছে পাঠাতেন। আজ বহু বছর পর পেছন ফিরে বিস্ময় নিয়ে ভাবি, সেই স্বর্ণপ্রসবকারী প্রকাশনার স্বর্ণযুগ কীভাবে অন্তর্নিহিত হলো!

সম্পাদক ও পাঠকের পাণ্ডুলিপি মূল্যায়নের ভয়াবহতার আরো কিছু নজিরের কথা বলি, ১৯৪০ সালের দিকে নপ প্রকাশনার কতিপয় সম্পাদক (উদ্দেশ্যমূলকভাবে, পক্ষপাতিত্বের বশবর্তী হয়ে) এমন সব মারপ্যাঁচে পাণ্ডুলিপি ফেরত পাঠাতে শুরু করলেন, তাও উপরের সম্পাদনার উদাহরণের চেয়ে কোনো অংশে কম বিস্ময়কর নয়। নপের এক নথিতে দেখা যায়, জনৈক সম্পাদক অতি পরিচিত এক মার্কিন ঐতিহাসিককে প্রায় ধসিয়ে দিচ্ছেন নেতিবাচক মন্তব্য করে, তার গবেষণাকে উল্লেখ করছেন, ‘মারাত্মক রকম অপ্রতুল কাজ’ লেখার ধরনকে বলছেন ‘একেবারেই নিষ্প্রভ’। আরেকজন সম্পাদক, একজন উদীয়মান পণ্ডিত ব্যক্তির লেখাকে বর্ণনা করছেন, ‘পিএইচডির ইংরেজির চেয়ে কিঞ্চিৎ ভালো ইংরেজি’ আর পুরো লেখাকে বাতিল করছেন এই মন্তব্যে— ‘পর্বতপ্রমাণ গবেষণা করে তিনি প্রসব করেছেন মূষিক।’ এবং এখানেই পেপারব্যাক প্রকাশনীর তথাকথিত সম্পাদকদের একজনের মতো হাজির হচ্ছেন ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের মতলব নিয়ে, প্রফেসর এক্স ‘আমার পরিচিত, তিনি অত্যন্ত ভালো মানুষ, তাকে আমি খুবই পছন্দ করি।’ এই মন্তব্যে অনুচ্চারিত যে বিষয়টি সেটি হলো— ব্যক্তিগত ঈর্ষা, লেখক ভদ্রলোককে তিনি চেনেন, তাই তিনি চান না বইটি নপ থেকে প্রকাশিত হোক!

(পরে ওই লেখকের বই বিপুল প্রশংসিত হয়ে অন্য প্রকাশনী থেকে বের হয়েছিল)।

৩.&dquote;&dquote;

সত্যিকার অর্থে, এ রকম অবিমৃশ্যকারী ঘটনা যে আকছারই ঘটে তা কিন্তু নয়, আর সব প্রত্যাখ্যানের ঘটনা অযৌক্তিক, উদ্দেশ্যমূলক তাও নয়। এর বাইরেও কিছু কারণ থাকে। পর্যালোচনায় গেলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রত্যাখ্যানের ঘটনাগুলো বোধযোগ্য ও যৌক্তিক।

পাণ্ডুলিপি প্রত্যাখ্যানের নেপথ্যে অনুল্লেখিত, কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী কারণ থাকে অর্থনৈতিক। প্রকাশক তার অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণেও অনেক সময় ভালো লেখা ফিরিয়ে দেন। আমাদের দেশের প্রকাশকরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা গোপন করে অন্য অজুহাতে পাণ্ডুলিপি প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু জাঁদরেল প্রকাশক আলফ্রেড নপ নিজে আর.আর পামারের ক্ল্যাসিক, ‘দি এজ অব দ্য ডেমোক্রেটিক রেভল্যুশন’ প্রত্যাখ্যানের সময় প্রিন্সটনের এ ঐতিহাসিককে সরাসরি বলেছিলেন, ‘এই বই কখনই মোট প্রকাশনা খরচ (৭.৭৫০ ডলার) আয় করতে পারবে না। কাজেই এ বই ছাপা আমার জন্য বড় ধরনের একটি ভুল হবে।’ আরেকবার ১৯৫৮ সালে আলফ্রেড নপ বিখ্যাত মার্কিন ইতিহাসবিদ টি. হ্যারি উইলিয়ামসকে ছোট্ট একটি চিরকুট পাঠিয়ে জানালেন, ‘‘প্রিয় হ্যারি, তোমার কাছ থেকে ভালো পাণ্ডুলিপিই আমি সবসময় আশা করি, কিন্তু জানো তো ‘আমেরিকা অ্যাট ওয়ার’ তাই না!” উল্লেখ্য, আমেরিকা তখন ভিয়েতনামের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে।

(হ্যারি উইলিয়ামসও কম যান না। তত্ক্ষণাৎ তিনি জবাব লিখলেন, ‘এক ডলারের একটা চেক পাঠালাম চিঠির সঙ্গে। প্রথম শ্রেণীর ফিরতি ডাক খরচ হিসেবে এটা যথেষ্ট আশা করি। দ্রুত আমার পাণ্ডুলিপি ফেরত পাঠালে বাধিত হব।)

প্রকাশক-লেখকের চিঠি চালাচালির এই শিল্প হারিয়ে গেছে। পশ্চিম মুলুকে প্রকাশকরা এখন আর মূল পাণ্ডুলিপি হাতে নিয়ে দেখেন না, তারা পরিপূর্ণ-সমাপ্ত পাণ্ডুলিপি এড়িয়ে চলেন, কয়েক লাইনের সংক্ষিপ্ত রূপরেখার ওপর ভিত্তি করে তারা চুক্তিতে উপনীত হন, কাজেই প্রত্যাখ্যানপত্র লেখার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে। এ সময়ে এ রকম একটা দৃশ্য কল্পনা করা খুবই দুরূহ হবে যে, আলফ্রেড নপ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত এক ইতিহাসবিদের পাণ্ডুলিপি পাঠ শেষে জবাব লিখেছেন, ‘এবার তোমার প্রতি সদয় হওয়ার কোনো কারণ দেখি না, তোমার পাণ্ডুলিপি দস্তুরমতো হতাশাজনক আমাদের তালিকার জন্য। কেটে পড়ো, ম্যাকডাফ।’

এই প্রত্যাখ্যানপত্রের পর ফেসবুক কাঁপাবেন? কাঁপাতে পারেন।