বিলেতের বিখ্যাত প্রকাশক হার্স্ট অ্যান্ড কোম্পানি বাংলাদেশী গবেষক সামিয়া খাতুনের ‘অস্ট্রেলিয়ানামা: দ্য সাউথ এশিয়ান ওডেসি ইন অস্ট্রেলিয়া’ প্রকাশ করেছে। অত্যন্ত সুখপাঠ্য এ গ্রন্থটির লেখক-গবেষক সামিয়া খাতুনের মাতামহী জোবায়দা মীর্যা সত্তরের দশকে ঢাকা কলেজে আমার শিক্ষক ছিলেন। যখন জানতে পারি, আমার এই শিক্ষকের পিতার নাম ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেন, আমি তাতে বাড়তি আনন্দ পাই। ডক্টর কখনো নামের অংশ নয় জেনেও লিখছি— সে সময় ‘ডক্টর’ অন্তত তিনজন জ্ঞানতাপসের নামের অংশ বলেই আমরা বিবেচনা করতাম— ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেন ও ডক্টর কুদরাত-এ-খুদা।
এ গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায় ‘সেভেন ভয়েজেস অব খাজা মুহাম্মদ বক্স’-এর কেবল কাহিনী অংশটুকু গুরুত্বপূর্ণ হলেও একাডেমিক বিশ্লেষণ এড়িয়ে গেছি, এই ভেবে যে দৈনিকের কাছে কাহিনী পাঠের সুখটুকুই বেশি কাঙ্ক্ষিত।
১৮৭৫ সালের কাছাকাছি সময়ে ‘লাহোরের সিন্দাবাদ’ খাজা মুহাম্মদ বক্স ভারত মহাসাগরে প্রথম সমুদ্রযাত্রা করলেন, তখন তার বয়স ১৮ বছর। ততদিনে বাষ্পীয় জাহাজের বিপ্লব সমুদ্রপথে ইউরোপের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করেছে। একটা গোটা জীবন বাষ্পীয় জাহাজে জলপথে পরিভ্রমণ করে ১৯২০ দশকে অবসর নেয়া অবস্থাপন্ন ব্যবসায়ী মুহাম্মদ বক্স যখন লাহোর ফিরে এলেন, তার পরিবারের সদস্যরা তখন অস্ট্রেলিয়াওয়ালা নামে পরিচিত।
ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনে থেকে ইউরোপের বাইরের কোনো কোনো ব্যবসায়ী বেশ উন্নতি করেছেন, কিন্তু কেবল ‘সাদা অস্ট্রেলিয়ান’— এই বর্ণবাদী সীমান্তের কারণে খুব কম জনই অস্ট্রেলিয়ায় ব্যবসা করে টাকাকড়ি করতে পেরেছেন— তখন এ নিয়ে মূলধন ও শ্রম উভয়ের ওপর সাদা অস্ট্রেলিয়ার নিষেধাজ্ঞা। তার পরও ১৯২৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার পার্থে বক্স পরিবারের নগদ মূলধন ৪০ হাজার পাউন্ড আর লাহোরে ৫০টির বেশি বাড়ি।
জীবনের শেষ দশকে মুহাম্মদ বক্স তার অর্থ লাহোরের তিনটি জনবসতিতে বিনিয়োগ করেন— সেই জনবসতির নাম অস্ট্রেলিয়া চক বা অস্ট্রেলিয়া বাজার। অস্ট্রেলিয়া চকে একটি মসজিদ ও একটি বালিকা বিদ্যালয়ও স্থাপন করেন।
তার ভ্রমণকাহিনী লিপিবদ্ধ করার জন্য তিনি একজন মুনশি নিয়োগ করেন। ১৯২৫ সালেই যখন অস্ট্রেলিয়া চকে তার বাড়ির সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়ে, সে সময় তিনি তার মুনশিকে বলেছেন, তার জীবনের শুরুটা ছিল বড্ড কষ্ট, যাতনা ও পরিশ্রমের।
মুহাম্মদ বক্স ১৯২৯-এ প্রয়াত হলেন। মুনশির সঙ্গে তার বহু বৈঠকের কাহিনী লেখা রইল মুনশির খাতায়। সে কাহিনী উদ্ধারের জন্য তার পরিবার বারবার ফিরে এল মুনশির কাছে।
১৯৪০ দশকে তার ছেলে আমীর বক্স, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং লাহোরে অস্ট্রেলেশীয় ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা বাবার কাহিনী লিখে আনার জন্য একজন উর্দু ক্যালিগ্রাফার নিযুক্ত করলেন। ১৯৭১ সাল নাগাদ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অস্ট্রেলেশীয় ব্যাংকের ১০০-এরও বেশি শাখা স্থাপিত হয়। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পরিবারটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ওদিকে অস্ট্রেলিয়াতেও ‘সাদা অস্ট্রেলিয়া’র পর দাপ্তরিকভাবে বহুজাতিক সংস্কৃতি গৃহীত হয়েছে।
নতুন সহস্রাব্দে মুহাম্মদ বক্সের অস্ট্রেলিয়াবাসী পৌত্র খালিদ বক্স পিতামহের সফরনামা উর্দু ও ইংরেজিতে প্রকাশ করেছেন। ইংরেজি বইটির নাম ‘অ্যামেজিং মাইগ্রেন্ট’ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং কবি আল্লামা ইকবাল পরিবারের সঙ্গে বক্স পরিবার ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।
কাশ্মীর থেকে লাহোরে আসা পরিবারটির সবচেয়ে বড় ছেলের বড় ছেলে মুহাম্মদ বক্স, জন্ম ১৮৫৭ সালে। তার পূর্বপুরুষের ব্যবসা হাতে বোনা পোশাক ও উট বেচাকেনা।
তার মা এসেছেন লাহোর থেকে ৫০ মাইল দূরে রাভি নদীর ওপারে গুজরানওয়ালা থেকে। ১১ বছর বয়সে মুহাম্মদ বক্স আবিষ্কার করলেন, যে নারী তাকে দুধ খাইয়েছেন, তিনি সত্যিকারের মা নন, তিনি আসলে দাদি। সৎ মায়ের সংসারে ভীষণ মার খেয়ে বক্স ১৩ বছর বয়সে বাড়ি ছাড়েন।
এমনিতে বাবা যখন তার সৎ মায়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন, তিনি গোপনে সৎ মায়ের মাকে খবর দিয়ে আসতেন এবং তিনি এসে মেয়ের পক্ষ নিয়ে ঝগড়া করতেন। একবার তাকে খবর দেয়ার জন্য সৎ মায়ের আদেশ প্রত্যাখ্যান করলে তার ওপর খড়্গ নেমে আসে।
শার্ট, জুতো, পাগড়ি কিছুই ছিল না তার, এমনকি সেতু পার হওয়ার কানাকড়িও না; বক্স রাভি নদী পাড়ি দিয়ে হেঁটে মায়ের বাড়ি গুজরানওয়ালারা হাজির হন। তার এ দুরবস্থা দেখে মায়ের পরিবারের সদস্যরাই কিছুদিন তাকে লালন-পালন করেন। কিন্তু পরে একসময় বক্সের চাচা তাকে আবার লাহোর ফিরিয়ে নিয়ে যান।
এই সৎ মা বেশিদিন বাঁচেননি। কিন্তু তারপর সৎ মা হয়ে যিনি এলেন, তিনিও কম নিষ্ঠুর নন। পারিবারিক সহিংসতা থেকে বাঁচার জন্য ১৮ বছর বয়সে ২০০ টাকা চুরি করে কাউকে কিছু না বলে তিনি বাড়ি ছাড়লেন, এবার লক্ষ্য বোম্বাই, এখনকার মুম্বাই। কয়েক দশক পর তিনিই তার সন্তানদের শুনিয়েছেন শেখ শাদির কথা, ‘সারা জীবন যদি বাড়িতেই থাকো, তাহলে মানুষ হিসেবে অপরিনতই থেকে যাবে। বেরিয়ে যাও, পৃথিবীটা দেখো।’
বোম্বাই থেকে বসরা: প্রথম সমুদ্রযাত্রা
বোম্বাই পৌঁছে পারফিউমের কারখানায় শিক্ষানবিশী শুরু করলেন। দিনের বেলা ঘুরে ঘুরে সেন্ট বিক্রি করেন, রাতে ভিণ্ডিবাজার ফুল গলিতে করম দীনের চুলকাটার দোকানে ফিরে আসেন। ভিণ্ডিবাজারে নাপিতের দোকানে মানুষের মুখে সমুদ্রের শত শত গল্প শোনেন। সুগন্ধি বেচতে যখন বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন— কেউ শহরের বড় ধনী, কেউ সম্ভ্রান্ত, কেউ বোম্বাইয়ের বড় অফিসার। সুগন্ধি তাকে বোম্বাইর দেহপসারিণীদের কাছেও নিয়ে গেছে— সেখান থেকে নিজের যৌনসম্ভ্রম রক্ষা করে ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার বলে তার মন্তব্য।
ব্রিটিশ জাহাজের সারেং শাদি খান পাঠান দক্ষিণ এশিয়া নাবিকদের হর্তাকর্তা। তার সঙ্গে সমঝোতা করেই ব্রিটিশ জাহাজে মুহম্মদ বক্স চাকরি পেয়ে গেলেন। ফায়ারম্যানের চাকরি। কাজ বেলচা দিয়ে জাহাজের ইঞ্জিনে কয়লা তুলে দেয়া। মর্যাদায় লস্কর। ১৮৩০ দশকে ক্রীতদাসত্ব বিলোপের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পনিও ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে বন্দোবস্ত অনুযায়ী লস্কররা নব্য ক্রীতদাস ইউরোপিয়ান নাবিকের এক-পঞ্চমাংশ বেতন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে, ব্রিটিশ ভারতীয় বন্দরের বাইরে অন্য দেশের বন্দরে পৌঁছলে নিজেদের গতিবিধি কেবল বন্দর এলাকাতেই সীমিত রাখতে তারা বাধ্য।
ইঞ্জিনে কয়লা-ঢালা বাষ্পীয় জাহাজে সেবার একেবারে আনকোরা লস্কর তিনজন। জাহাজ বোম্বাই বন্দর ছেড়ে যাওয়ার পর তৃতীয় দিন সমুদ্রে প্রবল ঝড় উঠল, ঢেউয়ের আঘাতে জাহাজ সোজা হয়ে থাকা অসম্ভব হয়ে উঠল। জাহাজের অফিসার লস্করদের আদেশ করলেন, নিজেদের শরীর দড়ি দিয়ে জাহাজের সঙ্গে বেঁধে ইঞ্জিনে কয়লা চালানের কাজ চালিয়ে যাও— তাদের কেউ যদি নিজের জায়গা ছেড়ে জাহাজের আপার ডেকে ওঠে ক্যাপ্টেন পিটিয়ে তাকে আবার নিচে পাঠান।
সমুদ্রঝড়ে দোলায়মান জাহাজে যখন তাদের বমি শুরু হলো, আনকোরা তিনজনের আশা নিভে গেল। তাদের মনে হলো, সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করাই বরং উত্তম। মিশকালো অন্ধকারে জাহাজের ডেকে উঠে শিয়ালকোটের ইমাম উদ্দিন সমুদ্রে ঝাঁপ দিল।
মুহম্মদ বক্স নিজে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু একজন সাদা গার্ড তার কলার ধরে হেঁচকা টানে পেছনে নিয়ে এলেন। প্রথমবারের মতো কাছে আসা অন্য জনকেও তিনি আটকে দিলেন। কাজ ফেলে সমুদ্রে ঝাঁপ দেয়া অবশ্যই চুক্তিভঙ্গের অপরাধ। দুজনকে সারা রাত তালাবন্দি করে রাখা হলো। ভোর হতেই ঝড় নেমে গেল। সমুদ্র তখন শান্ত।
পারস্য উপসাগরের বু শের বন্দরে যখন জাহাজ ভিড়ল, দুজন জাহাজ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। পালাতে পারলেন না, ধরা পড়ে গেলেন, ক্যাপ্টেন তাদের বন্দি করে রাখলেন।
বু শের বন্দর থেকে পবিত্র নগরী বাগদাদ দূরের পথ নয়। শাদি খান পাঠান দুজনকে জাহাজের বন্দিখানা থেকে বের করতে না পেরে বন্দরের সৈনিকদের কাছে গিয়ে হাজির হলেন। এখানে অটোমান আইন বলবৎ হবে, ব্রিটিশের আইন নয়। তিনি পুলিশকে বললেন, তার দুজন সহকর্মীকে জাহাজে বন্দি করে রাখা হয়েছে, নামতে দেয়া হচ্ছে না।
অটোমান সৈনিকরা তখনই জাহাজে চলে এলে ক্যাপ্টেন তাদের এমনভাবে বোঝালেন যে সৈন্যরা আর তাদের মুক্ত করল না। ক্যাপ্টেন বললেন, এরা চুক্তি ভঙ্গ করেছে। এদের ছেড়ে দিলে পালিয়ে যাবে এবং এরা না থাকলে জাহাজ চালনায় লোকবলের ঘাটতি পড়বে, কারণ তাদের বিকল্প কর্মচারী জাহাজে নেই। অটোমান খলিফার সৈনিকরা জাহাজ থেকে নেমে যেতেই সারেং শাদি খান পাঠানের হাতে হাতকড়া পরানো হলো, তিনি গ্রেফতার হলেন এবং দুই তরুণের সঙ্গে তাকেও জাহাজের প্রকোষ্ঠে বন্দি করে রাখা হলো। বন্দি অবস্থায় মুহাম্মদ বক্সের বাণিজ্যিক আগ্রহের ঘাটতি পড়েনি।
তিনি দেখলেন বু শের বন্দর থেকে জাহাজে কাপড় ও গোলাপজল ওঠানো হচ্ছে। বোম্বাই বন্দরে জাহাজ ভিড়লে এসব নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে কাড়াকাড়ি গড়ে যায়।
কোনো পয়সাকড়ি না দিয়ে ক্যাপ্টেন দুজনকে বন্দরে নামিয়ে দেয় আর ব্রিটিশ কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার অপরাধে তাকে পয়সাকড়ি তো দেয়া হলোই না, তার সারেং সার্টিফিকেটও জব্দ করা হলো।
শূন্য পকেটে করম দীনের চুল কাটার দোকানের রাস্তা ধরে এগোনোর সময় তার সহকর্মী যে পাঞ্জাবি নাবিক সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করেছে, তার পরিবারের কথা মনে করে বিচলিত বোধ করল। তার নিজের কোনো উপার্জন হয়নি সত্য, কিন্তু লস্কর জীবনের কঠোর কানুনের সঙ্গে তো তার পরিচিতি ঘটেছে। এবার যখন তিনি ভিণ্ডিবাজারের ডেরায় প্রবেশ করলেন, তিনি কেবল শ্রোতা নন, তার নিজেরও অভিজ্ঞতা থেকে অনবদ্য সমুদ্রের গল্প বলার আছে।
বোম্বাই থেকে সাংহাই: দ্বিতীয় সমুদ্রযাত্রা
জেল খাটলেও, বেতন না পেলেও মুহাম্মদ বক্স আর আনকোরা লস্কর নন। একটি সমুদ্র সফরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লস্কর তিনি। যখন সাংহাইগামী জাহাজের লস্কর হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হলেন, তাকে এক মাসের বেতন ১৫ টাকা আগাম দেয়া হলো। এবার তিনি খালি হাতে যাচ্ছেন না। আগাম বেতনের অর্ধেকের বেশি ৮ টাকার পেঁয়াজ কিনে নিলেন। ব্রিটিশ জাহাজে এশিয়া ও আফ্রিকার সারেং লস্কর খালাসিদের কেউ কেউ একই সঙ্গে ব্যাপারীও ছিলেন।
মুহাম্মদ বক্স দেখলেন, তার সহকর্মীদের অনেকেই তাদের পেঁয়াজ সাংহাইয়ের পথে প্রথম দুই বন্দর পেনাং ও সিঙ্গাপুরের বাজারে বিক্রি করেছেন। জাহাজ যখন ব্রিটিশ উপনিবেশ হংকংয়ে বন্দরে ভিড়ল, তিনি দেখলেন, পেঁয়াজের দর বেশ ভালো— তিনি তার কেনা ৮ টাকার পেঁয়াজ ১৬২ টাকায় বিক্রি করলেন; লাভ দাঁড়াল ১৫৪ টাকা।
১৮৩৯ সালের প্রথম আফিম যুদ্ধের পর হংকং ব্রিটিশ অধিকারে চলে আসে। বাষ্পীয় জাহাজের উন্নতি আর টেলিগ্রাফ, যোগাযোগ ব্যবস্থার সাফল্যে ব্রিটিশ আধিপত্যের জাল বিস্তার লাভ করে। মুহাম্মদ বক্স যে শহরেই যাচ্ছেন, সেখানকার মসজিদে কিংবা সেনা গ্যারিসনে পাঞ্জাবের মানুষ খুঁজে পাচ্ছেন। তিনি হংকংয়ে বাণিজ্যের বিভিন্ন স্তর এবং তাতে দক্ষিণ এশীয়দের অংশগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করলেন।
হংকং থেকে সাংহাই। সাংহাই বন্দরে জাহাজ ১৫ দিন থাকল, বক্স সেখানে ‘ছাগলের পায়ের মতো পায়ের অধিকারী’ নারীদের দেখলেন— মসজিদে যেসব মুসুল্লির দেখা পেলেন, তারাও দেখতে সাংহাইয়ের মানুষদের মতোই।
বোম্বাইর পথে জাহাজ ছাড়ার আগে জাহাজের কর্মচারীরা বাণিজ্যের জন্য মাদুর, লেপ ইত্যাদি কিনতে শুরু করেন। কিন্তু অনভিজ্ঞ ও ব্যবসায়ের সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা না থাকার কারণে তিনি তার লাভের টাকায় সিল্কের রুমাল ও শাল কিনলেন। কম বয়সেই সিল্কের ভালোমন্দ সম্পর্কে তিনি কিছুটা জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। পরবর্তীকালের বড় ব্যবসায়ী মুহাম্মদ বক্স তার ছেলেদের বলে গেছেন, কেমন করে বাজার পর্যবেক্ষণ করতে হয়, হিসেবে রাখতে ও পরিদর্শন করতে হয়।
যে মুনশি তার সফরনামা লিপিবদ্ধ করেছেন, তিনি সেই মুনশিকে বলেছেন, এক রাতে আকস্মিকভাবে এক দেহপসারিণীর বাড়ি গিয়ে হাজির হন। সুন্দরী ও ইউরোপীয় ক্রেতার দেহপসারিণীরা বাজারের এক প্রান্তে চেয়ারে বসে থাকে। তাদের দালালরা খদ্দের ধরে আনে। ভারতীয় ও মালয়ান দেহপসারিণীদের পাশাপাশি জাপানি দেহপসারিণীও রয়েছে।
প্রথম সফরের আগে বাড়ি থেকে পালানোর সময় বাবাকে না বলে নিয়ে আসা ২১৭ টাকা এবার মানি অর্ডার যোগে লাহোরে পাঠিয়ে দিলেন।
তার সফরনামায় পাঠকদের উদ্দেশে বলেছেন: পাঠক সে সময় আমি ছিলাম যৌবনের তুঙ্গে এবং হাতেও ছিল অঢেল টাকা, কিন্তু সর্বশক্তিমানের আশীর্বাদে আমি লোভনীয় এই নারীসঙ্গ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পেরেছি।
জাহাজ যখন বোম্বাই বন্দরে ভিড়ল, তাদের আনা মালপত্র কেনার জন্য ব্যবসায়ীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তিনি দ্বিগুণ লাভে সিল্কের রুমাল ও শাল বিক্রি করলেন। এবার পকেট ভর্তি টাকা। লস্কর এখন ব্যবসায়ী। তিনি যখন বোম্বাইর রাস্তা ধরে ডিঙি বাজারের ডেরায় এলেন— তখন তার বলার মতো আরো অনেক গল্প— পেঁয়াজ, সিল্ক, নারকেল ও দারচিনির গল্প’ দেহপসারিণীর গল্প।
বোম্বাই থেকে মক্কা: তৃতীয় সমুদ্রযাত্রা
লস্করের কাজের যে পরিবেশ, তাতে ক্লান্ত মুহাম্মদ বক্স একবার লাহোর ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছেন, একবার ভাবছেন বোম্বাই থেকে যাবেন। এ সময় অমৃতসরের অসুস্থ মানুষ ফোজদার খান তাকে বললেন, চলো হজ করতে যাই। তাহলে পুরো সফরটাই হবে আল্লাহর আশীর্বাদে পরিপূর্ণ। দুজন টিকিট কিনতে হাজি কাসুম অ্যান্ড কোম্পানিতে এলেন। এটাই মক্কায় ভ্রমণের প্রধান এজেন্সি। দুজনের টিকিটের দাম ৬০ টাকা।
মুহাম্মদ বক্স কোম্পানির সঙ্গে দরকষাকষি করলেন, নিজেদের বললেন দুস্ত, ২০ টাকা হিসেবে নিজেদের জন্য টিকেট নিলেন।
সিন্দাবাদের সাত সফরের অনুবাদক রিচার্ড বার্টন আফগান ডাক্তারের ছদ্মবেশে মক্কা সফরে এসেছিলেন।
বোম্বাই থেকে জেদ্দা নেমে খান ও বক্স মক্কার পথে তিনদিন ধরে হাঁটলেন। সেখানে মুহাম্মদ হোসেন নামে একজন ব্যবসায়ী তার দেশী দরিদ্র হজ ইচ্ছুক ব্যক্তিদের সহায়তা করে থাকেন। তিনি এ দুজনকেও সহায়ক হলেন। বক্স বললেন, আল্লাহর ঘরের বাইরে থেকেও মানুষ জুতো চুরি করে। ফোজদার খানের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তিনি মদিনাগামী এক কাফেলায় শামিল হলেন। কাফেলার সদস্যরা যদিও উটের পিঠে তিনি ৩০০ মাইল পথ পাড়ি দিলেন হেঁটে— ফুলে ওঠা জখম হওয়া পা নিয়ে— এছাড়া মদিনায় পৌঁছার অন্য কোনো পথও তার অজানা।
ছয়দিন একটানা হাঁটার পর যখন মদিনায় নবীজীর রওজায় পৌঁছলেন, তার আর শক্তি নেই, সেখানেই ঘুমিয়ে পড়লেন। পরদিন সকালে কাজের সন্ধানে বেরিয়ে গেলেন। একজন ভারতীয় সুর্মা দোকানদার তাকে কাজ দিলেন; কাফেলা যখন মক্কা ফিরে যাচ্ছে, তিনি রয়ে গেলেন, ভারতীয় তাকে বলেছেন, মক্কায় যাওয়ার একটি সংক্ষিপ্ত রুট রয়েছে।
কিছুদিন পর মুহাম্মদ বক্স এবং অন্য একজন দক্ষিণ এশীয় তীর্থযাত্রী সুর্মাওয়ালার নির্দেশিত পথে যাত্রা করলেন। তাদের প্রথম রাত কাটল একজন অতিথিপরায়ণ বেদুইনের পরিবারের সঙ্গে। দ্বিতীয় দিন যখন আর হাঁটতে পারছিলেন না, ছাগলের পাল দেখভাল করছে এমন একজন বালিকার সহায়তায় আর একটি বেদুইন কুটিরে যাওয়ার পথ পেলেন। বেদুইন দম্পতি তাদের খাবার দিলেন এবং ঘুমোবার জন্য মাদুরও পেতে দিলেন।
তৃতীয় দিন তারা একটি তেমাথায় এসে হাজির হলেন— তিনদিকে তিনটি রাস্তা চলে গেছে। কোন রাস্তা অনুসরণ করবেন— এ নিয়ে দুজন একমত হলেন না। দুজন দুই পথ ধরলেন।
মুহাম্মদ বক্স অনেকটা হাঁটার পর বুঝতে পারলেন তার পথে কেবল মরুভূমি, কোনো বৃক্ষ কিংবা গৃহের নিশানা নেই, সন্ধ্যা হতে হতে তার পানির পাত্রও শূন্য হয়ে গেল। ঘন কালো মেঘে দিগন্ত ছেয়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো ভয়ংকর হারিকেন। বৃষ্টির পরিবর্তে শীলাবর্ষণ, প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। তিনি দৌড়াতে শুরু করলেন। ঝোপের মতো একটা জায়গা পেয়ে আগুন ধরাতে চেষ্টা করলেন— শেষে দেশলাইয়ের কাঠি থেকে আগুন নয় কেবল ধোঁয়া বেরোল। তারপর শুরু হলো অবিরাম বৃষ্টি। তিনি ভাবলেন, তার বেঁচে থাকার আর কোনো সম্ভাবনা নেই।
চতুর্থ দিন ভোরে বৃষ্টি থামল। বক্স দেখলেন, বৃষ্টি পথের সব চিহ্ন মুছে দিয়েছে, তিনি কোন দিকে যাবেন? তার পরও হাঁটতে শুরু করলেন। দীর্ঘসময় পর একজন বেদুইন ও তার উটের দেখা পেয়ে তিনি এগিয়ে গেলেন। বেদুইনকে তার কাহিনী শোনালেন। এই দয়ালু বেদুইন তাকে বাড়িতে নিয়ে পোলাও মাংস খাওয়ালেন।
পঞ্চম দিন এই দয়ালু বন্ধুটির নির্দেশিত পথে মাইল পাঁচেক হাঁটার পর দেখলেন ডাবল ব্যারেল বন্দুক নিয়ে দুজন বেদুইন তার দিকে এগিয়ে আসছে। তার যা কিছু ছিল, এমনকি পরনের পোশাকও খুলে তাকে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় রাস্তায় ফেলে চলে গেল। পঞ্চম রাত কাটল নগ্ন অবস্থায় বালির ওপর ঘুমিয়ে।
ষষ্ঠ দিন এ অবস্থাতে হাঁটতে হাঁটতে একটি মসজিদে পৌঁছে তার কাহিনী বললে মুসুল্লিরা তাকে কাপড় দিলেন, ভরপেট মাংস-রুটি ও খেজুর খাওয়ালেন।
সপ্তম দিন তিনি সত্যিই মক্কা শহরে এসে পৌঁছলেন। হজের সব আচার শেষ করে ব্যবসায়ীদের বদান্যতায় কপর্দকহীন মুহাম্মদ বক্স বোম্বাই এসে পৌঁছলেন। সেখান থেকে সোজা ভিণ্ডিবাজারে করম দীনের সেলুনে। এবার তার বলার মতো গল্পের শেষ নেই।
বোম্বাই থেকে সোমালিয়া: চতুর্থ সমুদ্রযাত্রা
পূর্ব আফ্রিকার উপকূল থেকে মুহাম্মদ বক্স নিয়ে এলেন স্বর্ণদ্বীপের গল্প।
বাহাদুর খেতাবধারী একজন দক্ষিণ এশীয় তাকে একটি সরকারি জাহাজের কাজ জুটিয়ে দেন। ততদিন মুহাম্মদ বক্স যথেষ্ট অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছেন। এ জাহাজের সারেং অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে এ দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তখন তার অধীনে ১৫০ জনেরও বেশি নাবিক। তার বেতন মাসে ১৮ টাকা থেকে লাফিয়ে ৫০ টাকায় উঠে গেল।
এ পদোন্নতি তাকে জাহাজের আপার ডেকের সাদা মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্কিত হওয়ার সুযোগ এনে দিল। তাকে বলা হলো, ইংল্যান্ড থেকে একজন অফিসার এসেছেন, তাকে আশপাশের ছোট ছোট উপহ্রদ (অ্যাটল) ঘুরিয়ে দেখাতে হবে। ১০ জন লস্করের একটি টিম, মুহাম্মদ বক্স তাদের হেডম্যান। এডেন থেকে জাহাজ ছাড়ার দুদিন পর ব্রিটিশ সোমালিল্যান্ড পৌঁছল। যে ভিআইপিকে নিয়ে তাদের কারবার, তিনি স্বর্ণ ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর সার্ভেয়ার। বক্স জানালেন, তিনি তাদের নিয়ে দুদিন ধরে চষে বেড়ালেন, পাথর সংগ্রহ করে তাদের রাখতে দিলেন, পাহাড়ে উঠে চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে চারদিক দেখলেন। মুহাম্মদ বক্সের মনে পড়ছে, তিনি বলেছেন যে তিনি অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছেন এবং অস্ট্রেলিয়া একটি সুন্দর দেশ, যারা স্বর্ণ রফতানি করে।
স্বর্ণসমৃদ্ধ অস্ট্রেলিয়ার নামটি তার মাথায় ঢুকে গেল। অনেক দিন ব্রিটিশ সরকারের জাহাজে চাকরি করার পর তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন আর সফর নয়, তিনি বাড়ি ফিরে যাবেন এবং পৈতৃক তাঁত পেশায় যোগ দেবেন। এমনকি সারেংয়ের পদও তাকে আটকে রাখতে পারল না। এবার বোম্বাই বন্দরে নামার পর ভিণ্ডিবাজারে করম দীনের সেলুনে না গিয়ে পকেটভর্তি টাকাসহ লাহোরে ফিরে এলেন। সব টাকা বাবা ও সৎ মায়ের হাতে তুলে দিলেন।
লাহোর থেকে লন্ডন: পঞ্চম সমুদ্রযাত্রা
তাঁতের কাজে তিনি হাঁপিয়ে উঠলেন। বাবাকে বললেন, এ কাজ নিয়ে পড়ে থাকলে হয়তো রুটি-রুজি হবে, আর কিছু হবে না। সুতরাং, তিন মাস না হতেই আবার বেরিয়ে পড়লেন। এবার লাহোর থেকে বোম্বাই, সেখান থেকে অস্ট্রেলিয়া। প্রায় শূন্য হাতেই বেরিয়ে এলেন। বোম্বাই এসে শুনলেন, অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত যেতে জাহাজের থার্ড ক্লাসের ভাড়া ১৫০ টাকা— সারেং হিসেবে তার তিন মাসের বেতনের সমান টাকা। তার জানা হলো, বর্ণবাদী অস্ট্রেলিয়ায় দক্ষিণ এশীয়দের ঠাঁই নেই। তবে ভারতীয়রা শ্রমিক হিসেবে গায়ানা, মরিশাস, ফিজি, জ্যামাইকা, ত্রিনিদাদ, তানজানিয়া, কেনিয়া, উগান্ডা ও দক্ষিণ আফ্রিকায় যাচ্ছে।
মুহাম্মদ বক্স পরিকল্পনা করলেন অস্ট্রেলীয় জাহাজে চাকরি নেবেন, তারপর কোনো অস্ট্রেলীয় বন্দরে জাহাজ থেকে নেমে সটকে পড়বেন। কিন্তু অস্ট্রেলীয় জাহাজে চাকরির চেষ্টা ব্যর্থ হলে তিনি লন্ডনের জাহাজে চড়লেন। ফ্রান্সের মার্শেই বন্দরে জাহাজ ভিড়লে তিনি এবং তার দুই দক্ষিণ এশীয় সঙ্গী একজন ধোপা, একজন সুইপার নেমে পড়লেন। তারপর একসময় সুইপার এমন কান্না জুড়ে দিল যে তিনি বিচলিত হয়ে পড়লেন। তার কান্নাকে ভিনদেশী সংগীত মনে করে ফ্রেঞ্চ জনতা ভিড় জমায়। একসময় পুলিশ এসে তিনজনকে গ্রেফতার করে এবং সেই জাহাজে নিয়ে যায় ও যাত্রী অবৈধভাবে নামার অপরাধে জাহাজ কোম্পানিকে মাথাপিছু ১০০ পাউন্ড জরিমানা করে। এই কোম্পানির পরবর্তী ভারতগামী জাহাজে উঠিয়ে তাদের লস্করের কাজে লাগানো হলো। কাজ করিয়ে জরিমানার টাকা ওসুল করে পলাতক নাবিক তকমা লাগিয়ে শূন্য হাতে বোম্বাই বন্দরে নামিয়ে দেয়া হয়।
বন্দরে দৈনিক ৭ আনার মজুর খেটে মুহাম্মদ বক্স তার অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার স্বপ্ন লালন করতে থাকেন। সেই সঙ্গে প্রার্থনা চালিয়ে যান। একসময় নিশ্চয়ই তা কবুল হবে।
লাহোর থেকে মেলবোর্ন: ষষ্ঠ সমুদ্রযাত্রা
মুহাম্মদ বক্স শুনেছেন, সিঙ্গাপুর থেকে অস্ট্রেলিয়া দূরে নয়। অস্ট্রেলিয়া সফরের অনেকগুলো উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি জাহাজে সিঙ্গাপুর এসে নেমে গেলেন। সেখানে তার রাত কাটছে মসজিদে, আর দিনের বেলা কাটছে অস্ট্রেলীয় জাহাজের সন্ধান করে। একটি অস্ট্রেলিয়াগামী জাহাজ এল, কিন্তু সে জাহাজে চাকরি পাওয়ার সব প্রচেষ্টা তার ব্যর্থ হলো। সে জাহাজের কর্মচারী সবাই মালয়ান আর আমি এক বর্ণমালাও জানি না।
হাতে টাকাও নেই, ভাষাও জানা নেই। কিন্তু তাকে তো অস্ট্রেলিয়া যেতেই হবে। তিনি জাহাজের দুটি ইমার্জেন্সি বোটের মাঝখানে নিজেকেই লুকিয়ে ফেললেন। জাহাজ সিঙ্গাপুর বন্দর ছেড়ে এল। ক্ষুধা ও পিপাসায় আর সহ্য করতে না পেরে একসময় নিজেই বেরিয়ে এলেন। ক্যাপ্টেন যখন দেখলেন, তার কাছে কানাকড়িও নেই, তিনি তাকে মালয়ান ও চাইনিজ শঙ্করদের সঙ্গে কাজে লাগিয়ে দিলেন। ‘যেখান থেকে স্বর্ণ উত্তোলন করা হয়’— তার কাছে রূপকথার সেই দেশটির যে অংশ প্রথম চোখে পড়ল, তা হচ্ছে উত্তর-পশ্চিম অস্ট্রেলীয় উপকূল।
সিঙ্গাপুর ছাড়ার সাতদিন পর জাহাজ যে বন্দরে ভিড়ল, মুহাম্মদ বক্স বললেন, সে বন্দরের নাম ‘বাল্ক’ মুক্তা আহরণের কেন্দ্র। গবেষক বলছেন, তিনি সম্ভবত পোর্ট ওয়ালকটের কথা বলেছেন। মুহাম্মদ বক্স বলেছেন, সেখানে তিনি হাজার লঞ্চ দেখেছেন, খালাসিরা সবাই জাপানি কিংবা মালয়ান। তাদের কাজ মুক্তা উত্তোলন করা।
এরপর জাহাজ ভেড়ে মেলবোর্নের পোর্ট উইলিয়ামসন। ১৮৮৫ সালের কোনো এক সময় খাজা মুহাম্মদ বক্স অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পা রাখেন। নেমে স্থানীয়দের কাছে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, মেলবোর্নে অনেক ভারতীয় রয়েছে। দুটো পাড়ায় তাদের বসবাস।
দুটোর একটিতে পৌঁছার উদ্দেশে তিনি ট্রেনে ওঠেন। টিকিট না থাকার কারণে যখন তাকে আটকানো হয়, তিনি বলেন, এখন আমার কাছে টাকা নেই সত্যি, কিন্তু আমাকে যদি কোনো ভারতীয়র কাছে নিয়ে যান, আমি তার কাছ থেকে টাকা নিয়ে ট্রেনের ভাড়া শোধ করতে পারব। তখনই তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ট্রেন থেকে নামিয়ে দেয়া হয়নি। রাত ১১টায় তাকে যখন ফিটজরয় এলাকায় ইয়ং স্ট্রিটে আনা হয়, কোনো কিছু না জেনে বক্স যে বাড়ির দরজায় টোকা দেন, সেটি ৭৯ নম্বর বাড়ি। এটি একটি বোর্ডিং হাউজ।
যিনি দরজা খুললেন বাড়িটি তার নামেই। ইজারা নেয়া, নাম দরবেশ আলী, তিনি বাংলায় কথা বলেন। ‘আমি কীভাবে শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া এসে পৌঁছলাম তাকে বললাম।’
সেই বোর্ডিং হাউজ কিছু পাঞ্জাবি ও বাঙালির বসবাস। দরবেশ আলী চাটনি বানান এবং তার বোর্ডাররা তার বানানো চাটনি বিক্রি করেন। তারা প্রতি পাউন্ডে ৫ শিলিং কমিশন পান। তিনি সদ্য আসা কপর্দকহীন মুহাম্মদ বক্সকেও এ সুযোগ দিলেন।
প্রথম দিন মেলবোর্ন মার্কেটে তার বিক্রি ১০ শিলিং। খাওয়ার জন্য ১ শিলিং দিয়ে আরো দেড় শিলিং কমিশন হিসেবে রেখে বাকিটা দরবেশ আলীকে দিলেন।
তখন ১ শিলিং মানে চৌদ্দ আনা। মুহাম্মদ বক্স দেখলেন, চাটনি বেচেই মাসে ৩৮ টাকা রোজগার করা সম্ভব, লস্কর হিসেবে ১৮ টাকা বেতনের দ্বিগুণেরও বেশি। বক্স বললেন, অনেক টাকা কামাই করার জন্য এটি একটি চমত্কার দেশ।
তিন মাস পর জমানো ৫০ পাউন্ড নিয়ে যখন লাহোরে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলেন, ৭৯ নম্বর ইয়ং স্ট্রিটের বোর্ডিং হাউজে খবর পেলেন, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন থেকে ভারতের মাদ্রাজে কিছুসংখ্যক ঘোড়া পাঠানো হচ্ছে। এ কাজের জন্য ১০ পাউন্ডের চাকরিটা তিনিই নিলেন। ভাড়ার টাকা উঠে এল। মাদ্রাজ থেকে ট্রেনে লাহোর। টাকাগুলো তুলে দিলেন বাবা ও সৎ মায়ের হাতে।
লাহোর থেকে ফ্রিম্যান্টেল: সপ্তম সমুদ্রযাত্রা
এটিই খাজা মুহাম্মদ বক্সের সপ্তম সফর। এবার একা নয়, স্ত্রীও সঙ্গে আছেন। তার বয়স যখন ১৬ বছর ১৮৭৩ সালে, তার প্রথম সমুদ্রযাত্রারও আগে ফাতিমাকে বিয়ে করেন। এতদিন ফাতিমা লাহোর সুলতান মাহমুদ স্ট্রিটের দেয়ালঘেরা বাড়িতেই ছিলেন, এখানেই মুহাম্মদ বক্সের মাঝেমধ্যে আগমনের সুবাদে তিনি দুই কন্যার জননী হন।
ফাতিমাকে নিয়ে লাহোর থেকে কলকাতা, সেখান থেকে জাহাজে সিঙ্গাপুর। সিঙ্গাপুরে একটি বাড়ি ভাড়া করে বক্স পরিবার ক’দিন অবস্থান করে; মুহাম্মদ বক্স অস্ট্রেলিয়ায় বিক্রি করার জন্য সিল্ক ও অন্যান্য দ্রব্য কেনেন। সিঙ্গাপুর থেকে জাহাজ ছাড়ে। তিন সপ্তাহ পর সূর্য ডোবার ঠিক আগে জাহাজ ভেড়ে। অনেকটাই লোকচক্ষুর অন্তরালে তিনি ফাতিমাকে নিয়ে ঘর-সংসার শুরু করেন। ফাতিমা পর্দা মেনে চলেছেন। কিছু কিছু বিষয়ে মুহাম্মদ বক্স ইসলামী আচারে সংস্কারমূলক প্রস্তাবনা রাখেন।
সাদাদের জন্য অস্ট্রেলিয়া এ ধরনের বর্ণবাদী আন্দোলনের সময় ১৮৯৩ সালে একদিন পুলিশ আদালতের সমন নিয়ে তার কাছে হাজির হয়। তাতে বলা হয়:
আশপাশে বসবাসকারী লোকজন জানিয়েছে যে তাদের এলাকায় একজন ভারতীয় একটি দোকান খুলেছে। দোকানদার তার পরিবারকেও এনেছে এবং তাদের দোকানের ওপরতলায় তাদের বন্দি অবস্থায় রেখেছে। তারা জানিয়েছে যে ভারতীয় লোকটি তার পরিবারের ওপর নির্যাতন চালায় এবং প্রতিবেশীরা সবসময়ই সেখান থেকে বিলাপের শব্দ শুনতে পায়।
ম্যাজিস্ট্রেটকে বলা হয়, তার স্ত্রী পর্দা করেন। এটা ভালোভাবে ইংরেজিতে অনুবাদ করে বোঝাতে না পারলেও ম্যাজিস্ট্রেট বুঝতে পারেন এটি ধর্মীয় বিষয়, সুতরাং এটি তার অধিক্ষেত্রের বাইরে।
১৮৯৫ সালের ১৩ জানুয়ারি ফাতিমা ব্রিটিশ ভারতের উদ্দেশে আলবেনি বন্দর ত্যাগ করেন, সঙ্গে কন্যা ও দুই ছেলেও চলে যায়। ফাতিমা ফিরে আসেন লাহোরের দেয়ালঘেরা বাড়িতে।
মুহাম্মদ বক্স স্ত্রীকে অস্ট্রেলিয়া ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনেক চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।
কয়েক বছর পর মুহাম্মদ বক্স তার সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করতে হবে এ শর্তে জান্নাত বেগমকে বিয়ে করেন। যেদিন সাদা অস্ট্রেলিয়ার পার্থের উদ্দেশে জান্নাত বেগম যাত্রা করলেন, মুহাম্মদ বক্সের ভাষায় ফাতিমা সেদিন বড় স্বস্তি বোধ করলেন যে তাকে তার প্রিয় পরিবেশ ছেড়ে আর যেতে হবে না।
১৯২৯ সালে অগাধ সম্পদ ও বিশাল ব্যবসায়ের মালিক বিচিত্র সমুদ্র অভিযানের সিন্দাবাদ খাজা মুহাম্মদ বক্স মৃত্যুবরণ করেন।
সামিয়া খাতুন তার অস্ট্রেলিয়ানামায় মুহাম্মদ বক্সকে নিয়ে রচিত কয়েকটি গ্রন্থের উল্লেখ করেছেন: অ্যামাজিং মাইগ্রেন্ট (২০০৪), লাহোরকে সিন্দাবাদ (২০০৬), মুসলিম অস্ট্রেলিয়ান কনট্রিবিউশনস (২০০৯), আন্ডার দ্য রাডার অব এম্পায়ার (২০১১), সাওয়ানিহ-ই-উমরি (১৯৪৪)। তার আত্মজীবনী ‘দ্য মেময়ার্স অব খাজা মুহাম্মদ বক্স’ প্রকাশিত হয়েছে ২০১৬ সালে।
সামিয়া খাতুনের অস্ট্রেলিয়ানামা অত্যন্ত কৌতূহল সৃষ্টিকারী একটি গ্রন্থ, এটি বাংলায় অনূদিত হওয়ার দাবি রাখে। বাংলায় অনূদিত কাসাসুল আম্বিয়া বই দেড় শতাধিক বছর আগে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছে এবং সুরক্ষিতও থাকে—এ অনুসন্ধান থেকেই অস্ট্রেলিয়ানামার সূচনা।






