৬০০ শতকে কীভাবে গজল আরব থেকে পারস্যে এল, তারপর ভারত হয়ে পশ্চিমা বিশ্বে

সমাজের প্রবহমান ধারা ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গজল বিভিন্ন ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে। গজলের গতিপথ অন্যান্য সাহিত্যকর্মের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন, যা তার স্থানীয় সীমানা অতিক্রম করে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল ও বিস্তৃতি লাভ করে। কাব্যিক রূপ এবং বিভিন্ন ধারার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এর সর্বজনীন তা এখনো বিদ্যমান। যখন গজল আরবের ভূখণ্ড পেরিয়ে মধ্যযুগীয় স্পেনে প্রবেশ করে, তখন এটা আরবি ও হিব্রু দুই ভাষাতেই লেখা হতে থাকে। অন্য আরেকটি সূত্র থেকে জানা যায়, গজল একটা সময় আফ্রিকার হাউসা ও ফুলফুলিতেও পৌঁছে গিয়েছিল। গজলগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে বিকশিত হলেও তা মূলত আরবি ঐতিহ্য মিটার ও ফর্মে রয়ে যায়। অষ্টম শতকে গজল পারস্য অঞ্চলে পৌঁছালে এর আরেকটি রূপ উন্মোচিত হতে থাকে। আরবি গজলের প্রকৃত আনুষ্ঠানিক রূপ থেকে খানিকটা বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। পরবর্তীকালে ফার্সি গজল তার নিজস্ব চরিত্র অর্জন করেছিল। প্রথম শাহ্ মাতলার মাধ্যমে গজলের নিজস্ব শৈলীগত চিন্তাধারা গড়ে ওঠে। প্রতিটি শেরের দ্বিতীয় লাইনের শেষ এককে এসে সন্নিহিত হতে থাকে। এটি গজলের দৈর্ঘ্যকে ৭ থেকে ১৫ চরণে শৃঙ্খলিত করে। কবিদের রচনার শেষ মাত্রায় তাদের নাম ব্যবহারের রীতি শুরু হয়। 

নবম শতকের শেষ দিকে পারস্যের প্রথম ক্যানোনিকাল লেখক আবদুল্লাহ জাফর রুদাকি ১২ শতকে সানাই গজনাবি ও ফরিদ উদ্দিন আত্তারের মতো অন্য প্রধান কবিরা, ১৩ শতকে হাফিজ সিরাজি, ১৪ শতকে শাদি সিরাজি ও জালালুদ্দিন রুমি। পরের শতাব্দীতে শাস্ত্রীয় মডেলগুলোর পর পারস্য গজল আরো পরিপক্ব হয়ে ওঠে। তবে এটি তা দুটি স্বতন্ত্র গুণাবলির জন্য পৃথক হয়ে থাকে। এর তীব্র রহস্যময় উদ্দীপনা ও গভীর দার্শনিক দর্শন শ্রোতাদের মাঝে বেশ উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। মধ্য এশিয়া ও ভারতের প্রভাবশালী সাহিত্যিক কর্তৃক লিখিত গজল সবার মাঝে অসাধারণ প্রভাব ফেলে এবং আগের কাব্যিক অভিব্যক্তিগুলোর একটি গৌরবীয় রূপ হিসেবে গজলের নতুন বিকাশ বেশ ফলপ্রসূ হয়।                                            

 

পারস্য কিংবা তুরস্কের গজল   

পারস্যে প্রবেশের পর গজলের মাত্রায় আরো কিছু বিষয় যুক্ত হয়। অনন্য এক উত্কর্ষে অলংকৃত হয় গজল। অন্যান্য দেশের কবিরাও তখন পরিপক্ব একটি মডেলের জন্য তাকিয়ে থাকত পারস্যের দিকে। বলা যায় গজলের আরেক জন্মস্থান হলো পারস্য, যা গজলকে নতুন আরেকটি বৈচিত্র্য দিয়েছে। উজবেক সাহিত্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত আফগান বংশের আলি শিরি নবাই গজলকে নতুন একটি ভাষার কাছাকাছি নিয়ে আসেন এবং ১৫ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তুরস্কের বিলুপ্ত ছাগাতাই ভাষায় এটা প্রকাশ করেন তিনি।

ফুজুলি ১৬ শতকে গজলকে আজারবাইজানীয় তুর্কি ভাষায় নিয়ে আসেন। আরবে যার উত্পত্তি হয়েছিল আরবের বাইরে তুরস্কে গিয়ে সেটি পরিপক্ব রূপ ধারণ করে। ভারতবর্ষে প্রবেশের পর এটি অতিথির মর্যাদা লাভ করে এবং যেন তার স্বকীয় গন্তব্য খুঁজে পায়। যদিও ১৩ শতকের দিকে আমির খসরুর কাজে গজলের অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়। ১৬ শতাব্দীর শেষ দিকে মোহাম্মাদ কুলি কুতুব শাহ এবং পরবর্তী শতাব্দীতে ভালি দক্ষিণ ভারতে এর বিকাশ ও সমৃদ্ধির জন্য অনেক পরিশ্রম করেন। পরে বিভিন্ন পর্যায় পেরিয়ে ভারতের দক্ষিণ, দিল্লি ও লক্ষেৗর বিখ্যাত সাহিত্য কেন্দ্রগুলো গজলের উন্নয়নের জন্য প্রতিযোগিতামূলক অবস্থার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। ভারতে গজলের ব্যাপক বিস্তৃতি ও সমাদরের পেছনে উল্লেখযোগ্য কারণ ছিল বিভিন্ন ভাষা, বহুমাত্রিক আঞ্চলিকতা ও নানা ধর্মের সংমিশ্রণ, যা এর বিকাশ ও বিস্তারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

 

গজল সাহিত্যের উত্কর্ষ একটি রূপ&dquote;&dquote;

গজল এমন একটি সাহিত্য সম্ভার, যার সঙ্গে দ্বিতীয় কোনো কিছুর তুলনা চলে না। আবেদন ও শ্রুতিমধুর হওয়ার কারণে এটা আরব বিশ্ব ও ভারতবর্ষ ছাড়িয়ে পশ্চিমাদেরও নজর কাড়ে। ১৯ শতকে জার্মান প্রাচ্যের প্রতি প্রলুব্ধ হলে পারস্যের অন্যান্য অনূদিত কাজের সঙ্গে গজলও ইউরোপে পৌঁছে যায়। ফ্রিডরিক শ্লেগাল প্রাচ্য বিশারদ, তখন তিনি সংস্কৃতচর্চা করছিলেন। তিনি সাহসের সঙ্গে গজল নিয়ে পরীক্ষা শুরু করলেন। তার সমসাময়িক ইয়োহান ভোল্ফগাং ফন গ্যোটে আগ্রহী হয়ে উঠেন পারস্যের গজল রচনার প্রতি, তিনিও গজলের অনুবাদ করেন। প্রাচ্যের রচনাশৈলীতে প্রভাবিত হয়েই তিনি রচনা করেন তার ‘ভেস্ট-ওস্টলিখে ডিফান’। এই একই ধারাবাহিকতায় পাওয়া যায় ফ্রিডরিখ রুকার্ট, আরেক প্রাচ্যবিদ, তিনিও তার গজল রচনা করে প্রকাশ করেন গাজেলেন। আরেক উদাহরণ হলেন ১২টি ভাষাজ্ঞানের অধিকারী আগুস্ট গ্রাফ ফন প্লাতেন, তিনি এই ফর্ম নিয়ে কাজ করেন, গজলের অনুকরণে ছন্দ কাফিয়া আর রাদেফের অনুসরণে প্রকাশ করেন তার সংগ্রহ গাজেলেন এবং নয়া গাজেলেন।

আধুনিক সময়ের কবিদের মধ্যে স্প্যানিশ কবি ফ্রেডরিকো গার্সিয়া লোরকা প্রথম গজল রচনা করেছিলেন, যার নাম দিয়েছিলেন গেসেলুস। এবং তার সর্বশেষ কবিতা সংগ্রহ দিভান দেল তামারিতে সংকলিত হয়েছে, যা থেকে তার আরব আন্দালুসিয়ান সংস্কৃতির প্রতি তীব্র টানই প্রকাশ পেয়েছে। তারপর গজলের পথ পরিক্রমা সমৃদ্ধ করেছে ফরাসি, ইতালি ইংরেজি ভাষাতেও।

বর্তমান সময়ে এসে গজল ইংরেজি ভাষাভাষীদের কাছে বৃহত্তর স্বীকৃতি পেয়েছে। কানাডার অ্যাড্রিয়েন রিচ, ডগ্লাস বারবার, জন হলান্ডার, আমেরিকার রবার্ট ব্লাই, জিম হ্যারিসন, জন টমসন, ফিলিস ওয়ে, অস্ট্রেলিয়ার জুডিথ রাইটসহ আরো বেশ কয়েকজন কবি গজলকে সাহিত্যের একটা নতুন স্থানে নিয়ে এসেছেন। সাহিত্যের বিভিন্ন আঙ্গিকে তারা গজলকে শ্রেণীবিন্যাস করেছেন কীভাবে এটাকে আরো সমৃদ্ধ ও সবার জন্য অনুকরণীয় করা যায়।

গালিবকে জানার পর ও গালিবের গজলের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর কবি অ্যাড্রিয়েন রিচ গজলের ফর্ম নিয়ে বেশ আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি স্বাধীনভাবে অনেক গজল লিখেছিলেন এবং ‘গালিবের প্রতি শ্রদ্ধা’ শিরোনামে পরবর্তীতে তা প্রকাশ করেছিলেন।  তিনি তার ঋণ স্বীকার করেছিলেন ও লিখেছিলেন ‘আমার গজল ব্যক্তিগত ও সর্বজনীন, আমেরিকান ও বিংশ শতাব্দীর জন্য’। আমার মনের ভেতর গালিবের উপস্থিতি ভীষণ। তিনি এমন একজন কবি, যিনি স্বশিক্ষিত, বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান, যার নিজস্ব কোনো সম্পদ বা বই ছিল না অথচ যিনি ছিলেন জ্ঞানের আধার।

অনুরূপভাবে কবি জন হলান্ডার গজলকে তার নিজের ভাষায় সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। গজল নিয়েই তিনি একটি গজল রচনা করেছিলেন। ছোট ছোট পঙিক্ততে রচিত সেসব লেখা কাফিয়া ও রাদিফে স্থান পেয়েছিল। রিচ ও হলান্ডারের কাছ থেকে অপসারণের পর বেশ কয়েকজন কানাডিয়ান কবি নতুন একটি ফর্ম তৈরি করেন। জিম হরিসন পায় ৬৫টি গজল প্রকাশ করেছিলেন। তিনি আরবি ও ফার্সি গজল সম্পর্কে অবহিত ছিলেন এবং বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে ধারণা রাখতেন। গজল নিয়ে যাদের বিশেষ অবদান ও গবেষণা আছে, তিনি তাদের একজন। তিনি বলেন, ‘অনেক বছর কাটানোর পর আমার মনে হলো আমি নাচের কিছু স্বতঃস্ফূর্ত মুদ্রা অর্জন করেছি। এটি এমন একটি দার্শনিক সংগীত, যা কোনো রকম বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই মূর্ছনা সৃষ্টি করে। আরেক কবি জন থম্পসন গজলকে তার স্বতন্ত্র সত্তার জন্য বিশেষভাবে মূল্যায়ন করেছেন। তিনি এর মধ্যে আধ্যাত্মিক ও পরাবাস্তববাদ যুক্ত করতে ভোলেননি।

গজলের আরেকটি ভিন্ন মাত্রা লক্ষ করা যায় ফিলিস ওয়েবের সানডে ওয়াটার অ্যান্ড ওয়াটার অ্যান্ড লাইটে। তার লেখায় গজলবিরোধী ধারণা প্রকাশ পায়। তিনি দ্বন্দ্ব ও ব্যক্তিক স্থান খুঁজে পান। তিনি গজলের চলমান ধারাকে এক প্রকার ভিন্ন প্রকরণে রূপ দেন। ডগলাস বারবারের ভিষন অ্যান্ড ব্রেথটেক্সের মাধ্যমে গজল সবার কাছে আরো এক ধাপ পরিচিতি লাভ করেছিল।    

উত্তর আমেরিকার গজলে সম্পূর্ণ নতুন একটা মাত্রার যোগ করেন কবি বারবার। বলতে গেলে বিশেষ একটি ধারায় তিনি এটাকে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, ‘‘যখন আমি গজল শুনি মনে হয় যেন এটি নিঃশ্বাসের সঙ্গে আন্দোলিত হচ্ছে। তখন এটাকে আমি নাম দেই নিঃশ্বাসের গজল। ডগলাস লোচহেড কর্তৃক ‘দ্য টাইগার ইন দ্য স্কুল ও ম্যাক্স প্লাটার ইন রেইন অন দ্য মাউন্টেইনস’ উত্তর আমেরিকার কবিদের দ্বারা সুরারোপিত এক গুচ্ছ গজল সংকলন।

অস্ট্রেলিয়ার প্রসিদ্ধ কবি, জুডিথ রাইট, যিনি প্রথাগত লেখায় বিশ্বাসী। জীবনের শেষের দিকে এসে গজল নিয়ে চর্চা শুরু করেন। ‘শেডো অব ফায়ার’ ও ‘ফ্যান্টম ডুয়েলিন’ তার দুটি গজল সংকলন। অন্য কবিদের মতো তিনি জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়কে তার রচনায় স্থান দিয়েছেন। কল্যাণ, জন্ম, মৃত্যু, অবক্ষয়, সমসাময়িক জীবন সবকিছু তুলে ধরেছেন তার গজলের মধ্যে।                                                                                        

 

ইউরোপীয় কাব্যরাজ্যে গজলের আবির্ভাব 

কিছু ভিন্ন মত ছাড়া গজল ইংরেজি ভাষায় ভালো একটা অবস্থান করে নিয়েছিল। আগা শহীদ আলী অনেক গজল রচনা করেছিলেন। কবিদের গজল লেখার ক্ষেত্রে তিনি কিছু ধারার প্রবর্তন করেছিলেন। তার মতে এগুলো খুব নৈমিত্তিক কিছু বিষয়, যা এর আবেদনকে আরো বেশি আকর্ষণীয় ও শ্রুতিমধুর করে তুলবে। কবিদের জন্য তিনি মুক্ত পঙিক্তর লেখনীর প্রবর্তন করেছিলেন, যদিও এতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটা দ্বৈরথের সৃষ্টি করেছিল। মূলত বিভিন্ন দেশের কবিদের হাত ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গজলের আবির্ভাব ও বিস্তার। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে গজলের সৃষ্টি ও প্রচলন হলেও ইংরেজ বিশ্বে এর প্রবেশ ও পরিচিতির জন্য আগা শহীদ আলীর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। মূলত তার রেখে যাওয়া কাজের মাধ্যমে এটি সর্বজনীন একটি রূপ পায়, যা যেকোনো কবি লেখকের কাছে সহজে অনুধাবনযোগ্য হয়ে ওঠে। এভাবে আরব, পারস্য, ভারতবর্ষ হয়ে ইংরেজি ভাষা জয় করার মাধ্যমে গজল বিশ্বে তার পরিক্রমা শেষ করে।