অনুবাদ: সালেহ ফুয়াদ
সাদাত হাসান মান্টো (১৯১২-১৯৫৫) উর্দু ভাষার একজন বিখ্যাত লেখক। এতটাই বিখ্যাত যে, তার পরিচয় নতুন করে দেয়ার কিছুই নেই। মান্টো দেশ পরিচয়ে ভারতীয়, আবার পাকিস্তানিও। মাত্র ৪৩ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনের ২১ বছর লেখালেখির পেছনে উৎসর্গ করেছেন। এর ভেতর কয়েকটি অনুবাদ গ্রন্থ, ২২টি ছোটগল্পের বই, একটি উপন্যাস, তিনটি প্রবন্ধ গ্রন্থ, দুটি স্মৃতিকথা, কয়েকটি বেতার নাটক ও বেশকিছু চিত্রনাট্য লিখেছেন। পাক-ভারতের বিখ্যাত উর্দু কবি মির্জা গালিবের জীবনকাহিনী নিয়ে সোহরাব মোদির পরিচালিত ছবি ‘মির্জা গালিব’-এর চিত্রনাট্যও মান্টোর লেখা। ‘আটদিন’ নামক ছবিতে মান্টো নিজে অভিনয়ও করেছেন।
১৯১২ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগের শহর অমৃতসরে যে মান্টোর জন্ম, তিনি জীবিকার টানে বোম্বেতে (মুম্বাই) এসে থিতু হোন ১৯৩৬ সালে। তারপর এ শহর তার এতটাই আপন হয়ে উঠে যে, নিজেই বলতেন, ‘মে চালতা ফিরতা বম্বাই হু,’ মানে আমি ভ্রাম্যমাণ বোম্বাই শহর। কিন্তু সাতচল্লিশের দেশভাগের কারণে আর সবার মতো তাকেও প্রিয় শহর মুম্বাই থেকে ছিটকে পড়তে হয়। ভয়াবহ হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, ১৯৪৭-এর দেশভাগ তাকে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত করে। সে সময় মান্টো মুম্বাইয়ের সিনেমাজগতে চাকরি করতেন। দাঙ্গা আর দেশভাগের কারণে সেখান থেকে চাকরিহারা হয়ে সব হারানোর বেদনা নিয়ে ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে করাচি হয়ে লাহোরে চলে আসতে হয় তাকে। সেখানে আগে থেকে থাকা স্ত্রী সাফিয়া ও তিন মেয়ের সঙ্গে মিলিত হন মান্টো, ভারতের সবচেয়ে খ্যাতিমান উর্দু ছোটগল্পকার। পেছনে পড়ে থাকে আপন পিতা-মাতা ও একমাত্র পুত্র আরিফের কবর। খণ্ডিত হয়ে পড়েন মান্টো, দক্ষিণ এশিয়ার শক্তিমান এক গল্পকার।
মুম্বাই ছেড়ে লাহোরে হিজরত করা ও তার পরবর্তী অবস্থা নিয়ে মান্টো ‘ঠাণ্ডা গোশতের মামলা’ প্রবন্ধে নিজেই লিখেছেন, ‘বোম্বাই ছেড়ে ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে করাচি হয়ে লাহোর এসেছি। তিন মাস ধরে দারুণ টানাপড়েনের মধ্যে কাটাই। বুঝতে পারতাম না কোথায় বসে আছি, করাচিতে আমার বন্ধু হাসান আব্বাসের বাড়িতে, বোম্বেতে, নাকি লাহোরে। লাহোরে কয়েকটি হোটেলে কায়েদে আজম ফান্ডের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে নৃত্যগীতের আসর লেগেই আছে।’
ব্রিটিশ ভারতের পরাধীন মান্টো স্বাধীন পাকিস্তানে এসেও স্বাধীনতার দেখা পাননি। পেয়েছেন ডানাকাটা পাখির স্বাধীনতা। অখণ্ড ভারতে শুধু লেখালেখির কারণে তার ওপর তিনটা মামলা হয়। স্বাধীন শিশুরাষ্ট্র পাকিস্তানে হয় আরো তিনটি। অভিযোগ একই, অশ্লীলতা। পাকিস্তানে আসার পর মান্টোর যে গল্পটি প্রথম প্রকাশ পায়, তা হলো ‘খোল দো’। দেশভাগের প্রেক্ষাপটে লেখা গল্প।
মান্টোর বন্ধু আহমাদ নাদিম কাসমি সম্পাদিত উর্দু সাময়িকী ‘নাকুশ’-এ গল্পটি ছাপা হলে পাঠকমহলে আলোড়ন ওঠে। কিন্তু পাকিস্তান সরকার এ আলোড়নকে জননিরাপত্তার জন্য ‘খাতরাহ’ (ক্ষতিকর) মনে করেন। সরকার বাহাদুর ‘নাকুশ’ সাময়িকীটিই ছয় মাসের জন্য প্রকাশনা নিষিদ্ধ করে দেন।
‘খুলে দাও’ গল্পটি মান্টোর পাকিস্তানে হিজরতের পর প্রকাশিত গল্প হিসেবে প্রথম হলেও এটিই প্রথম লিখিত গল্প নয়। মান্টোর পাকিস্তানে লিখিত প্রথম গল্প হলো ‘ঠাণ্ডা গোশত’। মান্টোর বন্ধু আরিফ আবদুল মতিন সম্পাদিত সাহিত্য সাময়িকী ‘জাবিদ’-এর ১৯৪৯ সালের মার্চের বিশেষ সংখ্যায় গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয়। কিন্তু প্রকাশের মাসাধিককাল পর জাবিদ পত্রিকার অফিসেও পুলিশ অতর্কিত হামলা চালিয়ে পত্রিকা বাজেয়াপ্ত করে এবং লেখক, সম্পাদক ও প্রকাশকের ওপর মামলা ঠুকে দেয়। অভিযোগ সেই একই— অশ্লীলতা।
ঠাণ্ডা গোশত গল্পের প্রেক্ষাপটও ১৯৪৬-এর দাঙ্গা। দাঙ্গায় মুসলমানের খুনে হাত রাঙানো শিখ যুবক ঈশ্বর সিং ঘরে ফিরে কোনোভাবেই আপন স্ত্রীর সঙ্গে সঙ্গম করতে গিয়ে সহজ হতে পারে না। আখ্যানের তীব্র সংবেদনশীলতা কিংবা গল্পকৌশল কোনোটিরই ধার না ধেরে বরাবরের মতো অশ্লীলতার অভিযোগে মান্টোর ওপর নেমে আসে মামলার খড়্গ। ‘আমরা মুসলমানরা এতই আত্মমর্যাদারহিত যে, আমাদের মৃত কন্যাদেরও শিখরা ধর্ষণ করে যায়’ গল্পের এমন বেহুদা ব্যাখ্যা ও আপত্তি তুলে মামলা ঠুকে দিলে লাহোর আদালত ১৯৫০ সালের ১৬ জানুয়ারি তারিখে তাকে তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৩০০ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো ২১ দিন কারাদণ্ডের আদেশ দেন। অবশ্য আপিল করলে ১০ জুলাই তারিখে বরাবরের মতো এ মামলা থেকেও মান্টো বেকসুর খালাস পান।
স্যাম চাচার বৃত্তান্ত
স্যাম চাচা বা আংকেল স্যাম নামের একটা ইতিহাস থাকলেও একটা সময়ে স্যাম চাচা হয়ে যায় আমেরিকান সরকারের পরিপূরক। আংকেল স্যাম নামটির জনপ্রিয়তায় খোদ আমেরিকান সরকারও পরবর্তীতে তাদের প্রতীক হিসেবে দেখা শুরু করে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকান সেনাবাহিনীতে সেনা সংগ্রহের জন্য আংকেল স্যামের ছবি দিয়ে একটি পোস্টার ছাপিয়ে তা সাঁটিয়ে দেয়া হয়। পোস্টারে দেখা যায় তারাখচিত সাদা ক্যাপ পরা, গায়ে নীল স্যুট ও সাদা চুল-দাড়িওয়ালা একজন লোক আঙুল উঁচিয়ে বলছেন, I WANT YOU FOR U.S. ARMY। পোস্টারের এ লোকটিই আংকেল স্যাম, ব্যক্তিরূপে কল্পিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
মান্টো যে কারণে স্যাম চাচাকে পত্র লিখলেন অথবা মান্টোর পত্র যে কারণে আমরা পড়ব
১৯৫১ সাল। সময়টা কোরিয়ার যুদ্ধের। পাকিস্তানকে কোরিয়ায় সেনা পাঠানোর আহ্বান করে যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তান এ আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে। এ প্রত্যাখ্যানের পর পাকিস্তানের রাজনৈতিক, সামাজিক ও শিল্প-সাহিত্য বলয়ের সহমর্মিতা পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্র। কোল্ড ওয়ারে রাশিয়া ও আমেরিকা— দুই শিবিরে বিভক্ত পাকিস্তানি কবি-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের নানাভাবে দলে ভেড়ানোর তদবির ও তত্পরতা চালায় আমেরিকা।
একদিন লাহোরের মার্কিন অফিস United State Information Service (USIS)-এর অফিসার মিস্টার স্মিথ একজন পাকিস্তানি স্টাফকে সঙ্গে নিয়ে মান্টোর বাসায় হাজির হোন। স্মিথ মান্টোকে অনুরোধ করেন ইউএসআইএসের ম্যাগাজিনের জন্য তিন যেন কিছু লিখেন। মান্টো বলেন, আমি কেবল একজন উর্দু সাহিত্যের লেখক। ইংরেজিতে লিখি না। স্মিথ আশ্বস্ত করেন, লেখা উর্দুতেই প্রকাশিত হবে। তার উর্দু লেখাই চাই। উত্তরে মান্টো বলেন, আমি শুধু তাই লিখব, যা আমি চাই। স্মিথ বলেন, এতে কোনো সমস্যা নেই। লেখার ক্ষেত্রে মান্টো স্বাধীন।
লেখার সম্মানীর প্রশ্নে স্মিথ বলেন, প্রতিটি লেখার বিপরীতে ইউএসআইএস তাকে ৫০০ রুপি সম্মানী দেবে। মান্টো তা নাকচ করে দেন। তিনি ২০০ রুপির বেশি নিতে পারবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন। শেষমেশ স্মিথের চাপাচাপিতে ৩০০ রুপি নিতে রাজি হন মান্টো। টাকাপয়সা নিয়ে আর কোনো বাতচিত করে তাকে বিরক্ত না করতেও বলে দেন।
কয়েকদিন পর হাস্যোজ্জ্বল মুখে মান্টো ইউএসআইএস অফিসে গিয়ে হাজির হন। থলে থেকে একটি খাম বের করে সিনিয়র মার্কিন অফিসার মিস্টার উইথুসের হাতে দেন। খামের ভেতর ছিল ‘স্যাম চাচাকে লেখা মান্টোর প্রথম চিঠি’। প্রথম চিঠিতে মান্টো তীব্র ভাষায় ভারতের দাঙ্গা ও দেশভাগের অসারতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। উত্তর-ঔপনিবেশিক পাকিস্তান ও ইংরেজদের শাসন-শোষণ অত্যন্ত শ্লেষের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। বাক্স্বাধীনতার দাবিদার আমেরিকাও গডজ লিটল অ্যাক্টর উপন্যাসের লেখক আরস্কিন কল্ডওয়েলের বিরুদ্ধে অশ্লীলতার দায়ে মামলার ঠুকেছে, সে প্রসঙ্গ টেনেও বিদ্রূপের ছলে সমালোচনা করেছেন। আংকেল স্যামকে একে একে আরো আটটি চিঠি লিখলেন মান্টো। এক চিঠিতে মান্টো বলছেন, ‘আপনি তো বহু পুণ্যের কাজ করেছেন এবং এখনো করে যাচ্ছেন। আপনি হিরোশিমাকে দুনিয়া থেকে মুছে দিয়েছেন। নাগাসাকিকে ধোঁয়া ও ভাগাড়ে পরিণত করেছেন। এর সঙ্গে সঙ্গে জাপানে লাখ লাখ আমেরিকান শিশুর জন্ম দিয়েছেন।’ এসব জানিয়ে মান্টো স্যাম চাচার কাছে কখনো সাহিত্য ভাষায় কখনো কখনোবা কৌতুকরসে বর্ণনা করে গেছেন দেশভাগ ও ভারত-পাকিস্তান নিয়ে আমেরিকার হস্তক্ষেপের কথা— কখনো সরাসরি, কখনো অর্থবহ ইঙ্গিতের মাধ্যমে। মান্টো এসব চিঠিতে ধর্ম ও রাজনীতির এমন বহু তর্কিত বিষয়ে আলোচনা করেছেন, যেসব বিষয় আজও সমান সত্য ও বাস্তব।
উপমহাদেশের তীব্র তেজী আর ত্যাড়া এই লেখকের চিঠিগুলো তাই সময়ের তাগিদেই পাঠ করা জরুরি।
প্রথম চিঠি
৩১ লক্ষ্মী ম্যানশন
হল রোড, লাহোর
তারিখ: ১৬ ডিসেম্বর ১৯৫১ ইং
চাচাজান, আসসালামু আলাইকুম!
এই পত্র আপনার পাকিস্তানি ভাতিজার পক্ষ থেকে, যাকে আপনি চেনেন না। যাকে আপনার সাত স্বাধীনতার দেশের কেউ-ই হয়তো জানে না।
আমার দেশ ভারত থেকে দ্বিখণ্ডিত হয়ে কেন জন্ম নিল, কীভাবে স্বাধীন হলো— এসব তো আপনার ভালো করেই জানা। বলতে গেলে এ কারণেই আপনাকে পত্র লেখার সাহস করছি। যেভাবে আমার দেশ ভারত থেকে খণ্ডিত হয়ে স্বাধীন হয়েছে, ঠিক সেভাবে আমিও খণ্ডিতভাবে স্বাধীন হয়েছি। চাচাজান, এ কথা তো আপনার মতো সবজান্তা পণ্ডিতের অজানা থাকার কথা নয় যে, যে পাখিকে ডানা কেটে স্বাধীন করা হয়, সে পাখির স্বাধীনতা কেমন হয়। যাকগে, এই কেচ্ছা বাদ দিন।
আমার নাম সাদত হাসান মান্টো। যে মাটিতে আমি জন্মেছিলাম, তা এখন ভারতের অংশ। আমার মা সেখানে কবরস্থ আছেন। ওখানে আমার পিতার দাফন হয়েছে। আমার প্রথম সন্তানটিও সে মাটিতেই শুয়ে আছে। কিন্তু এখন সে মাটি আর আমার দেশ নয়! আমার দেশ এখন পাকিস্তান, ব্রিটিশ পিরিয়ডে যে ভূখণ্ডটিকে ইংরেজদের গোলাম হওয়ার সুবাদে পাঁচ-ছয়বার দেখেছিলাম মাত্র।
আগে আমি পুরো ভারতবর্ষের একজন নামজাদা গল্পকার ছিলাম। এখন আমি পাকিস্তানের একজন বড় গল্পকার। আমার গল্পের কয়েকটা সংকলন বেরিয়েছে। মানুষ আমাকে ইজ্জতের চোখে দেখে। অখণ্ড ভারতে আমার ওপর তিনটে মামলা ঝুলেছিল; এখানে, এই পাকিস্তানে একটি। যদিও পাকিস্তানের এখনো শৈশবকাল।
ইংরেজ সরকারও আমাকে অশ্লীল লেখক মনে করত। আমার নিজের দেশও আমার সম্পর্কে তাই মনে করে। ইংরেজ সরকার আমাকে ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু আমার স্বদেশ আমাকে ছাড়বে বলে মনে হচ্ছে না। নিম্ন-আদালত আমাকে তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৩০০ রুপি জরিমানা করে সাজা ঘোষণা করলে উচ্চ আদালতে আপিল করে আমি বেকসুর খালাস পাই। কিন্তু রাষ্ট্র মনে করল, তাদের সঙ্গে ইনসাফ করা হয়নি। তারা হাইকোর্টে আপিল করল যেন রায় আবার নিরীক্ষণ করা হয় এবং আমাকে প্রাপ্য শাস্তি দেয়া হয়। দেখা যাক, উচ্চ আদালত কী রায় দেন।
আমার দেশ আপনার দেশের মতো নয়। আমার আপসোস হয়, উচ্চ আদালত আমার সাজা ঘোষণা করলে আমার ছবি ছাপবে ও আমার বিচারকার্যের আদ্যোপান্ত লিখবে—দেশে এমন একটা কাগজও নেই।
আমার দেশ অত্যন্ত গরিব। এখানে আর্ট পেপার নেই। ভালো একটা ছাপাখানা নেই। এ দেশের দারিদ্র্যের সবচেয়ে বড় নমুনা আমি নিজে। আপনার বিশ্বাস হবে না চাচাজান, বিশ-বাইশটা বইয়ের লেখক হওয়ার পরও বসবাসের জন্য আমার একটা বাড়ি নেই। আরো অবাক হবেন, আমার কাছে যাতায়াতের জন্য না আছে কোনো প্যাকার্ড, না আছে কোনো ডজ! এমনকি একটা সেকেন্ড হ্যান্ড মোটর কারও নেই!
কোথাও যেতে হলে সাইকেল ভাড়া করে নিই। খবরের কাগজে আমার কোনো লেখা প্রকাশ পেলে ৭ রুপি ফি কলাম হিসেবে ২০-২৫ রুপি মিলে গেলে টাঙ্গায় চড়ে বসি এবং এখানকার চোলাই মদও পান করি। এ এমন এক মদ যে, আপনার দেশে তা চোলাই করা হলে জঘন্য চোলাই কারখানাটাকেই (ডিস্টিলারি) অ্যাটম বোমা মেরে উড়িয়ে দিতেন। এ জঘন্য বস্তুটি বছর না ঘুরতেই মানুষকে নাস্তনাবুদ করে ছাড়ে।
কোথা থেকে কোথায় চলে যাচ্ছি। আসলে আপনার মাধ্যমে ভাইজান আরস্কিন কল্ডওয়েলকে আমার সালাম পৌঁছে দিতে চাইছিলাম। তাকে তো আপনি ভালো করেই চেনেন। তার লেখা গডজ লিটল অ্যাক্টর উপন্যাসের ওপর তো আপনি মামলা ঠুকে দিয়েছেন। অপরাধ তাই ছিল, যা এখানে আমার হয়ে থাকে আরকি। মানে সেই অশ্লীলতা।
বিশ্বাস করুন চাচাজান, তার উপন্যাস নিয়ে সাতস্বাধীনতার দেশে অশ্লীলতার দায়ে তার ওপর মামলা হয়েছে শুনে খুবই বিস্মিত হয়েছি। আপনাদের ওখানে তো সবই নগ্ন। আপনারা তো সবকিছুরই খোসা ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে আলমারিতে সাজিয়ে রাখেন। তা ফল হোক বা আওরত, যন্ত্র কি জানোয়ার, বই কিংবা ক্যালেন্ডার। আপনারা তো নগ্নতার সম্রাট। আমার ধারণা ছিল আপনাদের দেশে পবিত্রতার নামই হবে অশ্লীলতা। কিন্তু চাচাজান, আপনি একি সর্বনাশ করলেন, ভাইজান আরস্কিন কল্ডওয়েলের ওপর মামলা ঠুকে দিলেন!
এ মামলার রায় তাত্ক্ষণিকভাবে না পড়ে থাকলে বিস্ময়ে মাত্রাতিরিক্ত দেশীয় চোলাই মদ পান করে নিশ্চিত মারা যেতাম। দুর্ভাগ্য যে, আমার মতো মানুষ থেকে নিজেকে মুক্ত করার এমন একটা সুযোগ আমার দেশের হাতছাড়া হয়ে গেল। তেমনটা হলে আপনাকে এ পত্র কেমন করে লিখতাম। সে হিসেবে আমি বড়ই সৌভাগ্যবান। আমি আমার দেশকে ভালোবাসি। ইনশাআল্লাহ অল্প দিনের মধ্যেই আমি মরে যাব। যদি আত্মহত্যা না করি তবু আপসেই মারা যাব। কারণ যেখানে প্রতি রুপিতে পৌনে তিন সের আটা মিলে, সেখানে নির্লজ্জ ব্যক্তিই শুধু জীবনের গল্প চারদিনে টেনে নিতে পারে।
হ্যাঁ, আমি মামলার রায়টা পড়লাম এবং অতিরিক্ত চোলাই মদ পান করে জীবনকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার ইচ্ছেটাও ফেলে দিলাম। চাচাজান, আপনার ওখানে প্রতিটি বস্তুতে ঝুলে রয়েছে কৃত্রিমতা। কিন্তু সেই বিচারক যিনি আরস্কিন ভাইকে অশ্লীলতার অপরাধ থেকে মুক্তি দিয়েছেন, তার মাথায় নিশ্চয়ই কোনো কৃত্রিমতার মুখোশ ছিল না। যদি সেই বিচারক (আফসোস, আমি তার নামটা জানিনে) বেঁচে থাকেন, তবে তাকে অবশ্যই আমার প্রাণের প্রণতি জানাবেন।
বিচারকের রায়ের এই শেষ লাইনটি তার বুদ্ধির প্রশস্ততার পরিচয় দেয়:
‘আমি ব্যক্তিগতভাবে উপলব্ধি করি, এ ধরনের বইপত্র বল প্রয়োগের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করলে পাঠকের মনে অহেতুক সন্দেহ ও কৌতূহল সৃষ্টি করে, যা তাদেরকে অশ্লীলতার সন্ধানী করে তোলে অথচ আদতে বইটার উদ্দেশ্য মোটেও তা নয়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এ বইয়ে লেখক শুধু সেসব বিষয়ই নির্বাচন করেছেন, যা তিনি আমেরিকান জীবনের কোনো বিশেষ শ্রেণীর ব্যাপারে সত্য বলে মনে করেন। আমার মতে, সাহিত্যে সর্বদা সত্যকে তুলে ধরার অনুমোদন দেয়া উচিত।’
আমিও নিম্ন আদালতকে এ কথাই বলেছিলাম। কিন্তু আদালত আমাকে তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৩০০ রুপি জরিমানা করে সাজা ঘোষণা করলেন। তার রায় ছিল যে, সত্যকে সবসময় সাহিত্য থেকে দূরে রাখা উচিত। যার যার ব্যক্তিগত মতামত!
আমি তিন মাস সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে প্রস্তুত আছি। কিন্তু এই ৩০০ রুপির জরিমানা আমাকে দিয়ে আদায় হবে না। চাচাজান, আপনি জানেন না, আমি অত্যন্ত দরিদ্র মানুষ। কায়িক পরিশ্রমের উপযুক্ত হলেও রুপি আদায়ের সামর্থ্য আমি রাখি না। আমার বয়স ৩৯ বছরের কাছাকাছি এবং এই পুরো সময়টাই পরিশ্রমের মধ্যে কেটেছে। একটু ভাবুন তো, এত বড় লেখক হওয়ার পরও আমার কাছে কোনো প্যাকার্ড পর্যন্ত নেই!
আমি দরিদ্র এ কারণে যে, আমার দেশ দরিদ্র। আমার তো কোনো না কোনোভাবে দুই বেলা রুটির ব্যবস্থা হয়ে যায়। কিন্তু আমার এমনও ভাইবেরাদর রয়েছেন, যাদের ভাগ্যে তাও জুটে না।
আমার দেশ দরিদ্র, মূর্খ। কিন্তু কেন? এর উত্তর আপনার ভালো করেই জানা চাচাজান। এ তো আপনার এবং আপনার ব্রাদার বিলের যৌথ ষড়যন্ত্রের এমন এক শিকল, যা নিয়ে আমি আলাপ তুলতে চাই না। সে আলাপ আপনার কাছে তিক্ত লাগবে। এ চিঠি আমি আপনার এক সুহূদ হিসেবে লিখছি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সুহূদ হিসেবেই থাকা চাই।
আপনি নিশ্চয়ই খুব অবাক হয়ে জানতে চাইবেন— আমার দেশ থেকে তোমার দেশে এত এত প্যাকার্ড, বাকস কার এবং ম্যাক্স ফ্যাক্টর কসমেটিকস যাচ্ছে, তবু তোমার দেশ দরিদ্র কীভাবে? এ সবই ঠিক আছে চাচাজান, কিন্তু আমি আপনার এ প্রশ্নের উত্তর দেব না। আপনার অন্তরকে জিজ্ঞেস করলেই এর উত্তর পেয়ে যাবেন (অবশ্য আপনার যোগ্য সৈনিককে ডেকে হূদয়কে যদি বের করে ফেলে না দিয়ে থাকেন আরকি)।
আমার দেশের যে অভিজাত অংশের নাগরিকরা প্যাকার্ড আর বাকসে চড়ে বেড়ান আদতে তা আমার দেশ নয়; যেখানে আমার মতো অথবা আমার চেয়েও দরিদ্র মানুষের বাস, সেটাই আমার দেশ।
দুঃখের কথা কী বলব, আমাদের এখানে কৃতজ্ঞতার বড় অভাব। অন্যথায় আমি বাড়িয়ে-চড়িয়ে আমার কথামালা আপনার সামনে পেশ করতাম। যাকগে, এ প্রসঙ্গ ছাড়ুন। সম্প্রতি আপনার বন্ধু রাষ্ট্রের এক ঔপন্যাসিক ইভেলিন ওয়াহর লেখা The Loved One উপন্যাসটি পড়লাম। পড়ে এতটাই প্রভাবিত হলাম যে, সোজা আপনাকে পত্র লিখতে বসে গেলাম।
আপনার দেশের ব্যক্তি-প্রতিভায় আগে থেকেই মুগ্ধ ছিলাম। কিন্তু এ বইটা পড়ে আমি সারা জীবনের জন্য তার ভক্ত হয়ে গেলাম। কী লেখা! যা বলেছে না, একেবারে লা-জাওয়াব। চাচাজান, খোদার কসম, মুগ্ধ হয়ে গেছি। কত কত জাগ্রত হূদয়ের বসবাস আপনার দেশে!
এরপর » পৃষ্ঠা ২৩
ইভেলিন ওয়াহ আমাদেরকে জানান, আপনার ক্যালিফোর্নিয়ায় মুর্দা? মানে হারিয়ে যাওয়া আত্মীয়দেরও নাকি অলংকৃত করা হয় এবং এ কাজের জন্য নাকি বড় বড় প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। মৃত স্বজনের মুখ অপছন্দ হলে এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো একটিতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ফরম রয়েছে, নিজেদের সজ্জাচাহিদা তাতে লিখে দিলেই হয়। কাজ যথাযথ হয়ে যাবে। অর্থাৎ একজন মুর্দাকে আপনি যত সুন্দর বানাতে চান দাম চুকিয়ে দিয়ে বানাতে পারেন। খুবই দক্ষ কর্মী রয়েছে, যারা মুর্দার চোয়ালের অপারেশন করে মুখের ওপর মিঠে হাসি বসিয়ে দিতে পারে। চোখে জ্যোতি তৈরি করতে পারে। মাথায় প্রয়োজনমতো আলোক দিতে পারে। আর এসবই এত নিখুঁতভাবে করা হয় যে, মুনকার-নাকির ফেরেশতাও ধোঁকা খেয়ে যায়।
খোদার কসম চাচাজান, আপনাদের দেশটির কোনো নজির কেউ পয়দা করতে পারবে না।
জীবিতদের অপারেশনের কথা শুনেছিলাম। প্লাস্টিক সার্জারি করে জীবিত মানুষের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা যায়। এদিকেও এর কিছুটা চর্চা দেখা গেছে। কিন্তু আপনারা যে মুর্দারও রূপ পাল্টে দিতে পারেন, তা কখনই শুনিনি।
এখানে আপনার দেশের একজন পর্যটক এসেছিল। কিছু বন্ধুবান্ধব আমার সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেয়। আমি তখন ইভেলিন ওয়াহর বইটা পড়ে ফেলেছি। ওর কাছে ওর দেশের তারিফ করে এ কবিতাটি আবৃত্তি করি:
এক হাম হ্যাঁয় ক্যাহ লিয়া আপনিহি সুরত কো বিগার
এক ও হ্যাঁয় জিনহেঁ তাসবির বানা আতি হ্যায়।
(আমরা; যারা নিজেরাই আপন আকৃতি বিকৃত করে ফেলেছি
আর ওরা; যারা নিজেরাই আকৃতি গঠন করতে সক্ষম।)
পর্যটক মহোদয় আমার কবিতার মানে না বুঝুক কিন্তু চাচাজান, বাস্তবতা হলো আমরা আমাদের আকৃতি বিকৃতই করে ফেলেছি। এতটাই বিকৃত করে রেখেছি যে, এখন আর ওটাকে চেনাই যায় না। এমনকি নিজেই নিজেকে চেনা মুশকিল। আর আপনারা? নিজেদের অনপছন্দ মৃতমুখও পাল্টে ফেলছেন। আসলে এই দুনিয়ায় একমাত্র আপনার জাতিরই বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। অন্যরা সবাই বোকামী করছে।
আমাদের উর্দু ভাষার কবি গালিব আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগে বলে গিয়েছিলেন:
হোয়ে মরকে হাম জো রিসওয়া হোয়ে কিঁউনা গরকে দরিয়া
না কাহিঁ জানাজা উঠতা, না কাহিঁ মাঝার হোতা।
(মরে গিয়ে যতটা অপমানিত হলাম, তার চেয়ে সমুদ্রে কেন ডুবে গেলাম না
কোথাও জানাজা হতো না, মাজার হতো না কোথাও।)
জীবদ্দশায় গরিবের অপমানের ভয় ছিল না। জীবনের শুরু থেকে শেষ অবধি অপমানকালই তো ছিল। ভয় ছিল, মৃত্যুর পরে না আবার অপমান হয়। মানুষটা স্থিরচিত্তের ছিল। আশঙ্কা নয় বরং বিশ্বাস ছিল, আর এজন্যই সে সমুদ্রে ডোবার আকাঙ্ক্ষা করেছিল, যেন তার জানাজা না হয়, মাজার না হয়।
হায়, সে যদি আপনার দেশে জন্ম নিত! বড় জাঁকজমকভাবে আপনারা তার জানাজা করতেন। আকাশছোঁয়া মাজার বানাতেন। আর তার ইচ্ছা পূরণ করলে কাচে ঘেরা একটি হাউজ বানাতেন। সে হাউজে তার মরদেহ থাকত। সেই জাদুঘরে গিয়ে সারা বিশ্বের দর্শনার্থীরা তাকে দেখে আসত।
ইভেলিন ওয়াহ জানান, ওখানে নাকি শুধু মৃত মানুষের জন্য নয়, মৃত জন্তু-জানোয়ারদের শ্রী বৃদ্ধি করার জন্যও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দুর্ঘটনায় কোনো কুকুরের লেজ কেটে গেলে নতুন লেজ লাগিয়ে দেয়া হয়। মৃতের চেহারা-সুরতে জীবিত অবস্থায় যত ত্রুটিই থাক, মৃত্যুর পর দক্ষ হাত সব নিখুঁত করে দেয়। তাকে জাঁকজমকভাবে কাফন-দাফন করানো হয়। তার সমাধিতে ফুল দেয়ার আয়োজনও করা হয়। প্রতি বছর পালিত পশুর মৃত্যুবার্ষিকীতে মুনিবের বাসায় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কার্ড পাঠিয়ে দেয়া হয়। কার্ডে লেখা থাকে: স্বর্গে আপনার প্রিয় টমি অথবা সনি আপনার স্মরণে তার কান অথবা লেজ দোলাচ্ছে।
আমাদের চেয়ে আপনার দেশের কুকুরও উত্তম। এখানে আজ মরলে কালকে ১৮ দিন। কারো নিকটাত্মীয় মারা গেলে স্বজনের ওপর আসমান ভেঙে পড়ে। মনে মনে তীব্র চিত্কার করে উঠে? এই কপালপোড়া কেন মরল... আমার কেন মরণ হয় না! সত্য কথা বলতে কী চাচাজান, আমরা শুধু মরতেই জানি, বাঁচতে নয়।
আপনার দেশের এক সাহেব চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন। মৃত্যুর পরে সম্মান ও মর্যাদায় তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠান যে সম্পন্ন করা হবে, সে বিশ্বাস তার ছিল না। অতএব তার জীবদ্দশাতেই নিজের কাফন-দাফনের আয়োজন দেখা হয়ে যায়। এটা তার প্রাপ্য ছিল। তিনি অত্যন্ত সাংস্কৃতিক ও অভিজাত জীবন যাপন করতেন। প্রতিটি বস্তুই তার প্রত্যাশামতো হতো। হতে পারত মৃত্যুর পর তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে কোনো খামতি থেকে যেত। খুব ভালোই করেছেন তিনি, জীবিত অবস্থাতেই নিজের মৃত্যুর আয়োজন— সাজসজ্জা দেখে ফেলেছেন। এবার মৃত্যুর পর যা হওয়ার হোক।
‘লাইফ’-এর নয়া সংখ্যা (৫ নভেম্বর ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দ, ইন্টারন্যাশনাল এডিশন) দেখলাম। খোদার কসম, আপনাদের জীবনের আরো একটি শিক্ষণীয় দিক আমার সামনে উন্মোচিত হলো। এতে দুই পৃষ্ঠাজুড়ে ছবিসহ আপনাদের দেশের বিখ্যাত ‘গ্যাংস্টার’-এর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার বর্ণনা রয়েছে। Willie Moretti (তার আত্মা শান্তি পাক)-এর একটি ছবি দেখলাম। ৫৫ হাজার ডলারে তার সম্প্রতি কেনা আলিশান বাড়িটি দেখেছি। তার সেই পাঁচ একরের জায়গাটিও দেখেছি, যেখানে কোলাহলহীন শান্ত জীবন কাটাতে চেয়েছিলেন। তার সে মৃত অবস্থার ছবিটাও দেখেছি, যেখানে চোখ বন্ধ করে চিরনিদ্রায় তিনি শায়িত রয়েছেন। ৫ হাজার ডলারের শববাহী খাট এবং ৭৫টি গাড়ি নিয়ে তার শবযাত্রার একটি ছবিও দেখেছি। খোদা সাক্ষী, আমার চোখে জল এসে গেছে!
আমার মুখে ছাই পড়ুক! আপনি মৃত্যুবরণ করলে খোদা আপনাকে Willie Moretti-এর চেয়েও বেশি সম্মানিত করবেন। এটি একজন দরিদ্র পাকিস্তানি লেখকের আন্তরিক প্রার্থনা? যাতায়াতের জন্য যার নিজস্ব একটি ভাঙা সাইকেলও নেই। আমি এটাও প্রত্যাশা করি, আপনিও আপনার দেশের দূরদর্শী ব্যক্তিটির মতো নিজের জীবদ্দশাতেই আপন শবযাত্রা দেখে যান। নতুবা মানুষ ভ্রমপ্রবণ, কারো ভুলচুক হয়ে যেতে পারে, আপনার চেহারার কোনো খুঁত সার্জারি করা থেকে বাদ পড়ে গিয়ে আপনার আত্মার কষ্ট হতে পারে। কিন্তু এটাও সম্ভব যে, আমার এ পত্র আপনার কাছে পৌঁছার আগেই ধুমধাম করে আপনার ইচ্ছামতো আপন শবযাত্রা অনুষ্ঠান দেখে ফেলেছেন। এসব বলছি, কারণ আপনি তো আমার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বুদ্ধিমান এবং আমার চাচাজান।
ভাইজান আরস্কিন কল্ডওয়েল এবং সেই জজকেও আমার সালাম দিবেন, যিনি তাকে পর্নোগ্রাফির চার্জ থেকে বাঁচিয়েছেন। কোনো গোস্তাকি করে থাকলে ক্ষমা করবেন। আপনার প্রতি পরম শ্রদ্ধা।
ইতি
আপনার দুর্ভাগা ভাতিজা
সাদত হাসান মান্টো
পাকিস্তানের বাসিন্দা
(ডাকটিকিট কিনতে না পারার কারণে এ চিঠি পোস্ট করা সম্ভব হয়নি।)
দ্বিতীয় চিঠি
মুহতারাম চাচাজান,
সালাম জানবেন। আপনার কাছে একটি পত্র পাঠিয়েছিলাম। আপনার পক্ষ থেকে এখনো এর কোনো প্রাপ্তিস্বীকার আসেনি। কিন্তু কিছুদিন আগে এক সন্ধ্যায় আপনাদের এম্বাসি থেকে একজন সাহেব এই অধমের গরিবালয়ে আসেন, যার নামটা এ মুহূর্তে মনে করতে পারছি না। তার সঙ্গে একজন স্বদেশী তরুণও ছিলেন। তাদের সঙ্গে আমার যা আলাপ হয়েছিল, তার মোদ্দাকথা আপনাকে লিখছি।
তার সঙ্গে আমার ইংরেজিতে বাতচিত হয়। আমি অবাক হচ্ছিলাম চাচাজান, লোকটা আমার সঙ্গে ইংরেজিতে আলাপ করছিল, আমেরিকান ল্যাংগুয়েজে নয়; যে ভাষা আমি সারা জীবনেও বুঝতে পারতাম না।
সব মিলিয়ে তার সঙ্গে আধঘণ্টা থেকে পৌনে ১ ঘণ্টার মতো আলাপ হয়। যেভাবে সব আমেরিকানই যেকোনো পাকিস্তানি বা হিন্দুস্তানির সঙ্গে মিলিত হয়ে খুশি হয়ে থাকে, ঠিক তেমনই তিনিও আমার সঙ্গে পরিচিত হতে পেরে অত্যন্ত খুশি হয়েছেন। আমিও বুঝিয়েছি, তার সাক্ষাৎ পেয়ে আমিও বেশ আনন্দিত। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, সাদা চামড়ার আমেরিকানদের সাক্ষাতে আমার কোনো ভালো লাগা বা আনন্দ কাজ করে না।
দয়া করে আমার শুকনো কথায় বেজার হবেন না চাচাজান। সর্বশেষ যুদ্ধের সময়টা আমার বোম্বেতে কেটেছে। একদিন নিজেকে আমি বোম্বের সেন্ট্রাল রেলস্টেশনে আবিষ্কার করি। ওখানে তখন আপনাদের রাজত্ব চলছে। ওই সময়টাতে বেচারা ইংরেজ-সৈনিকদের কেউই পুঁছত না। বোম্বের যেসব অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান, ইহুদি ও পারসি তরুণীরা বিছানায় যাওয়াকে ফ্যাশন মনে করত, তাদের প্রায় সবাইকে আমেরিকান সৈনিকরা বগলদাবা করে রেখেছিল।
বিশ্বাস করুন চাচাজান, আমেরিকান সৈন্যদের ইহুদি, পারসি অথবা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান তরুণীদেরকে বাহুতে পেঁচিয়ে নিয়ে যেতে দেখলে ইংরেজ সৈনিকগুলো হিংসায় জ্বলেপুড়ে মরে যেত।
আসলে প্রতিটি ক্ষেত্রেই আপনারা অনন্য ও ব্যতিক্রম। আমাদের সেনাদের খোরপোশ এতই নগণ্য যে, তা দিয়ে আধপেটা খেয়েও বাঁচা অসম্ভব। অথচ একজন মামুলি অফিস বয়কেও আপনারা এতটাই উদার হস্তে দেন যে, একটি নয়, তার দুই পেট হলে তাও অনায়াসে নাক পর্যন্ত খাদ্যে ডুবিয়ে রাখতে পারে।
চাচাজান গোস্তাকি মাফ করবেন, এটা কি ফেরেব্বাজি নয়? এত এত টাকা কোথা থেকে পান আপনারা? ছোট মুখে বড় কথা। তবুও মনে হয়, আপনারা যা করেন, তার একটাই উদ্দেশ্য? প্রদর্শন। হতে পারে আমার ধারণা ভুল। ভুল তো মানুষেরই হয়। আমার মতে, আপনিও মানুষ। যদি না হয়ে থাকেন, তাহলে এ ব্যাপারে আমার আর কিছু বলার নেই।
কোথা থেকে কোথায় চলে যাচ্ছি। কথা হচ্ছিল, বোম্বে সেন্ট্রাল রেলস্টেশন প্রসঙ্গে। ওখানে আপনার কয়েকজন সৈনিককে দেখি। বেশির ভাগই শ্বেতাঙ্গ। কয়েকজন কৃষ্ণাঙ্গও ছিল। সত্য কথা বলতে কী, কালো সৈনিকরা শ্বেতাঙ্গদের চেয়ে অনেক বেশি সুঠাম ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছিল।
আমার বুঝে আসে না, আপনার দেশের লোকেরা এত বেশি চশমা ব্যবহার করে কেন। শ্বেতাঙ্গরা তো চশমা পরেই ছিল, এই কৃষ্ণাঙ্গ? যাদেরকে আপনারা ‘নিগ্রো’ বলে ডাকেন এবং প্রয়োজনমতো তাদের জাত চিনিয়ে দেন? ওরাও কেন চশমার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করবে, বুঝে আসে না। আমার মনে হয় এটিও আপনার বৃহৎ কৌশলেরই অংশ। আপনি যেহেতু পঞ্চ-স্বাধীনতার দাবিদার, সেহেতু আপনি চাইছেন যাদেরকে খুব সহজেই চিরদিনের জন্য আরামের ঘুমে ডুবিয়ে রাখতে পারেন এবং রাখছেনও তাদেরকে আপনার চশমায় আপনার জগত্টাকে একবার দেখার সুযোগ করে দিতে।
বোম্বে সেন্ট্রাল রেলস্টেশনে একজন পেশিবহুল নিগ্রো সৈনিককে দেখতে পাই। সে এতই সুঠামদেহী ছিল যে, তাকে দেখেই ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে আধখানা হয়ে যাই। তার পরও সাহস করে এগোই। সে পেছনের দেয়ালে হেলান দিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল। তার কাছে গেলাম। তার চোখ দুটো আধবোজা। বুট দিয়ে ফ্লোরে ঘষে শব্দ তৈরি করি। সে চোখ মেললে তাকে ইংরেজিতে যা বলি, তার সারমর্ম হলো, ‘আমি এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, কিন্তু আপনার ব্যক্তিত্ব দেখে থমকে দাঁড়াই।’ এরপর হ্যান্ডশেক করার জন্য তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিই। চশমাপরা সেই কুচকুচে কালো সৈনিক তার ইস্পাতকঠিন হাতের ভেতর আমার হাতখানা পুরে ফেলে। আরেকটু হলেই আমার হাতের সব হাড্ডিগুড্ডি ভেঙে চুরমার হয়ে যেত, আমি তার কাছে প্রার্থনা করি, ‘ফর গড, এতটুকুই যথেষ্ট...!’ তার কালো কালো আর মোটা মোটা ঠোঁটে হাসির সৃষ্টি হয়। তারপর সে ঠিক পাক্কা আমেরিকান ভঙ্গিতে আমাকে জিজ্ঞেস করে, হু আর ইউ?
হাতখানা কচলাতে কচলাতে বলি, আমি এখানকার বাসিন্দা। স্টেশনে আপনাকে দেখে হুট করে মনে হলো, আপনার সঙ্গে দুটো কথা বলা যাক।
সে আমাকে বড় অদ্ভুত প্রশ্ন করল, এখানে এত সৈনিক থাকতে আপনার কেন আমার সঙ্গেই কথা বলতে ইচ্ছে হলো?
চাচাজান, প্রশ্নটা ত্যাড়া হলেও উত্তরটা আমার মুখ থেকে আপসে বেরিয়ে আসে, তাকে বলি, আমি কালো, আপনিও কালো, আমি কালোদের ভালোবাসি।
সে আবার প্রশস্ত হাসি দেয়। তার কালো এবং পুরো ঠোঁট দুটো আমার এত ভালো লাগে যে, ইচ্ছে করছিল তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়ে বসি।
চাচাজান, আপনাদের ওখানে বড় সুন্দরী নারীদের বসবাস। আপনাদের একটি চলচ্চিত্র দেখেছিলাম। কী যেন নাম... হ্যাঁ মনে পড়েছে, ‘বাথিং বিউটি’। ফিল্মটা দেখে আমার বন্ধুদের বলেছিলাম, ‘এত আকর্ষণীয় পায়ের সমাবেশ চাচাজান কোথা থেকে করলেন।’ আমার ধারণা, দুই থেকে আড়াইশ পা-তো হবেই। চাচাজান, সত্যিই কি আপনার দেশে এত আকর্ষণীয় পা হয়? যদি সত্যিই হয়, তাহলে আল্লাহর ওয়াস্তে (অবশ্য আপনি যদি আল্লাহকে বিশ্বাস করেন আরকি), অন্তত পাকিস্তানে তাদের প্রদর্শন বন্ধ করুন। হতে পারে এখানেও আপনার নারীদের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় পা রয়েছে। কিন্তু চাচাজান, এখানে তা দেখে কেউ জ্বলে উঠবে না। প্লিজ, বুঝতে চেষ্টা করুন, আমরা শুধু আমাদের স্ত্রীদের পা দেখে থাকি। পরনারীদের পা দেখা আমরা আমাদের ওপর হারাম মনে করি। আমরা বড়ই অর্থডক্স কিসিমের মানুষপ্রাণী।
কথা কোথা থেকে শুরু করেছিলাম, কোথায় চলে গিয়েছি। তবে এ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করব না। জানি, আপনি এ ধরনের লেখাই পছন্দ করেন।
বলতে চাইছিলাম, আপনার সেই সাহেব যিনি এখানকার দূতাবাসের দায়িত্বে রয়েছেন, তিনি আমার কাছে একটি আবেদন নিয়ে এলেন, আমি যেন তাকে একটি ছোটগল্প লিখে দিই। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। ভয়ের কারণ আর কিছু নয়, আমি তো ইংরেজিতে লিখতে জানি না। তাকে বললাম, স্যার, আমি উর্দু ভাষার একজন লেখক। আমি ইংরেজিতে লিখতে জানি না। তিনি বললেন, আমার উর্দু গল্প চাই। আমাদের একটি জার্নাল রয়েছে, যা উর্দুতেই ছাপা হয়। এরপর আর বেশি ঘাঁটানো নিষ্প্রয়োজন মনে করলাম। তাকে বলে দিলাম, আমি রাজি। কিন্তু খোদা সাক্ষী, আমি একদমই জানতাম না যে, সে আপনারই আদেশে আমাকে দেখতে এসেছে এবং যে চিঠি আমি আপনাকে আগে পাঠিয়েছিলাম আপনি সেটিও তাকে পড়তে দিয়েছেন।
যাকগে, এ কেচ্ছা বাদ দিন। যতদিন পাকিস্তানের গমের প্রয়োজন রয়েছে, ততদিন পর্যন্ত আমি আপনার সঙ্গে বেয়াদবি করতে পারি না। তাছাড়া পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবে (যদিও সরকার আমাকে তার সুনাগরিক বলে মনে করে না) খোদার কাছে আমার প্রার্থনা যে, খোদা যেন কখনো আপনারও ভুট্টা ও সবুজ শাকের প্রয়োজন সৃষ্টি করেন, বেঁচে থাকলে সেদিন আমি আপনাকে তা পাঠিয়ে দিব।
এবার শুনুন, আপনি যে সাহেবকে পাঠিয়েছিলেন, তিনি কী বলেন। তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন, ‘একটি গল্পের জন্য আপনি কত নেবেন?’
চাচাজান, আপনি সম্ভবত মিথ্যে বলেন... বলেন তো অবশ্যই, তবে তাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে বলেন। এই আর্ট এখনো আমি রপ্ত করতে পারিনি। কিন্তু সেদিনই প্রথম আমি মিথ্যে বললাম। তাকে বললাম, আমি একটি গল্পের জন্য ২০০ রুপি নেব।
সত্য কথা হলো, এখানকার প্রকাশকরা একটি গল্পের জন্য আমাকে বেশি তো বেশি ৪০ থেকে ৫০ রুপি দেয়। আমি তো বলেই দিলাম, ২০০ রুপি! এজন্য ভেতরে ভেতরে আমার নিজের ওপর প্রচণ্ড ঘৃণা হলো, এত বড় একটা মিথ্যা কেন বলতে গেলাম। কিন্তু একবার বলেই যখন ফেলেছি, এখন তো আর কিছুই করার নেই।
চাচাজান, আমি তাজ্জব বনে গেলাম যখন আপনার পাঠানো সাহেব লোকটি খুব অবাক হয়ে (জানি না তা কৃত্রিম না প্রাকৃতিক) বলল, মাত্র ২০০ রুপি! খুব কম করে হলেও তো একটি গল্পের জন্য অন্তত ৫০০ রুপি নেয়া উচিত।
আমি বিস্ময়ে মরে গেলাম, একটিমাত্র গল্পের জন্য ৫০০ রুপি! এ তো আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না। যা-ই হোক, আমার কথা থেকে কীভাবে আর নড়ব। অগত্যা তাকে বললাম, দেখুন মশাই, ২০০ রুপি দিলেই চলবে। দয়া করে এ নিয়ে আপনি আর কথা বাড়াবেন না।
তিনি চলে গেলেন। সম্ভবত তিনি ধরেই নিয়েছেন আমি পান করে মাতাল হয়ে আছি। আমি কী পান করি, তা তো প্রথম চিঠিতেই আপনাকে বলেছি। চাচাজান, আমি সত্যিই বিস্মিত যে, এখনো বেঁচে আছি। অথচ আমার পাঁচ বছর হয়ে গেল এখানকার চুয়ানো বিষ পান করছি। আমার ইচ্ছা আছে, আপনি কখনো এ দেশে এলে এ বিষ আপনাকে অফার করব। আশা করি, আপনিও আমার মতোই বিস্ময়করভাবে বেঁচে রইবেন। সঙ্গে আপনার পাঁচস্বাধীনতাও বেঁচে থাকবে।
যাকগে, প্যাঁচাল বাদ দিন। পরদিন সকালে যখন বারান্দায় বসে সেভ করছি আপনার সেই সাহেবটি আবার আগমন করেন। সংক্ষিপ্ত কথা হয়। লোকটা আমাকে বললেন, ‘দেখুন, ২০০ রুপির রেটটা ছাড়ুন। ৩০০ নিয়ে নিন।’
বললাম, ঠিক আছে, তাই দিন। তার থেকে ৩০০ রুপি নিয়ে নিলাম। রুপিটা পকেটে রাখার পর বললাম, আপনার কাছ থেকে ১০০ রুপি অতিরিক্ত নিয়ে নিলাম বটে, কিন্তু একটা কথা স্পষ্ট জেনে রাখুন, আমি যা লিখব তা আপনার মর্জিমোতাবেক হবে না। তাছাড়া লেখায় কোনো ধরনের রদবদলের এখতিয়ারও আমি আপনাকে দিব না।
তিনি চলে গেলেন। এরপর আর আসেননি। চাচাজান, তিনি যদি আপনার কাছে গিয়ে থাকেন এবং আপনার কাছে কোনো রিপোর্ট পৌঁছে দিয়ে থাকেন, দয়া করে আপনার এই পাকিস্তানি ভাতিজাকে তা অবহিত করবেন।
আমি সেই ৩০০ রুপি এরই মধ্যে খরচ করে ফেলেছি। আপনি তা ফেরত চাইলে, আমি প্রতি মাসে ১ রুপি হারে ফেরত দেব।
আশা করি, আপনি আপনার পাঁচস্বাধীনতা নিয়ে সুখে আছেন।
ইতি
আপনার একান্ত অনুগত ভাতিজা
সাদত হাসান মান্টো
৩১, লক্ষ্মী ম্যানশন,
হল রোড, লাহোর।






