রুহানীর সঙ্গে তাতানের আবার যখন দেখা হলো, ততদিনে পুরনো সম্পর্ক ঝালাইয়ের সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। জীবনটা ‘দিল হ্যায় তো মানতা নেহি’ সিনেমা না যে নিজের ঠিক করা পাত্র যখন হেলিকপ্টার থেকে মণ্ডপে নামছে, তখন পাত্রী স্বয়ং মণ্ডপ ছেড়ে প্রেমিক ঠিক নয়, প্রেমের দিকে ছুটে চলেছে! চেখভের ভাষ্য অনুযায়ী সব ভালো গল্পের শেষটা বিয়েতে গিয়ে ঠেকলেও জীবনে বিয়ে যে কোনো আলটিমেট সমাধান নয়, এটা তো বিবাহবিচ্ছেদের হারই বলে দেয়।
সেদিন রুহানীর দিনটা মোটেই ভালো কাটছিল না। অফিসে একটা মিটিং ছিল, তার একটা প্রেজেন্টেশনও। কিছুই ভালো হয়নি। একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে তার মাথামোটা বস পুরো কনসেপ্টটাই এলোমেলো করে দিয়েছে। অফিস থেকে বিগড়ে যাওয়া মেজাজ নিয়ে অফিস ছুটির ২ ঘণ্টা আগেই বাসায় ফিরে এসেছে সে। চাকরিটাও ছেড়ে দেবে কিনা ভাবছে, এমন সময় ডোরবেলটা বেজে উঠল।
প্রায় জনমানবহীন ফ্ল্যাটে ডোরবেলে পাখির কলকাকলির আওয়াজ যেন প্রতিটি ঘরে ছড়িয়ে পড়ল। বিরক্তিতে চোখ কুঁচকাল রুহানী, কে এল এ সময়ে? এ সময়ে অন্য দিন তো সে বাড়িতেই থাকে না। আর পরিচিত কেউ হলে নিশ্চয়ই ফোন করে জেনে আসবে। তাহলে কি পাশের ফ্ল্যাটের কেউ? সে সাধারণত মানুষজনের সঙ্গে খুব কম মেশে। দেখা হলে হাই-হ্যালো এই পর্যন্তই। তাই তার বাড়িতে পাড়া-প্রতিবেশী কেউ কখনো আড্ডা দিতে আসে না। মেয়েদের ওই মেয়েলি শাড়ি-গহনা, ঘর-সংসার, ছেলে-মেয়ের গল্পে সে কোনো ইন্টারেস্ট খুঁজে পায় না। এসব বিষয়ে কেউ যখন আলোচনা শুরু করে, তখন মনের বিরক্তি চেপে রেখে মুখে হাসি ফুটিয়ে বসে থাকার মতো লৌকিক ভদ্রতাও সে করে না অনেক সময়। তাই এমন মানুষের সঙ্গে যেচে কেউ গল্প করতেও আসবে না স্বভাবিকভাবে। তাছাড়া তার পরিচিতের গণ্ডিও সীমিত। দু-একজন বন্ধু, তাও তাদের সঙ্গে কালেভদ্রে দেখা হয়। তার এ রকম ঠিক এ স্বভাবটার জন্যই সারা জীবন তাকে একাকীই কাটিয়ে যেতে হবে। এ কথাটা সে জেনে গেছে।
আবারো ডোরবেলের শব্দ। কাজের বুয়া দুবার কে-কে করে দরজা খুলে দিল।
মেয়েটার এই এক অদ্ভুত বাজে স্বভাব! এত বলেও সে ওকে বোঝাতে পারল না যে অপরিচিত কাউকে দরজা খুলবে না। স্পাই হোলে দেখে নেবে। আর না চিনলে আমাকে বলবে। ওকে আজ আচ্ছা বকুনি দিতে হবে। কাকে দরজা খুলল সে? রুহানী রাগে গরগর করতে করতে আসছিল ড্রইং রুমের দিকে।
এমন সময় কণ্ঠস্বরটা ভেসে এল ভেতরে, রুহানী আছে?
ডাইনিং অবধি এসে থমকে গেল রুহানী, এটা কার গলার আওয়াজ? এ স্বরটার সঙ্গে তার কত নিবিড় যোগাযোগ! তারুণ্যের মধুর স্মৃতি। ওই ভারি অথচ মিষ্টি স্বরটা যেন তার কান ছুঁয়ে পৌঁছে গেছে রক্তের কণিকায় কণিকায়! ঝটিতে সে ফিরে গেল নিজের ঘরে।
বুয়া এসে দাঁড়াল দরজায়।
কে এসেছে, এ প্রশ্নটা করার প্রয়োজন ছিল না। রুহানী জানত যে কে এসেছে, তার পরও বলল, কে এসেছে বুয়া?
- ওনার নাম বলতেছে তাতান।
- ঠিক আছে, তুমি যাও।
রুহানী মুহূর্তে আলমিরার কার্নিশ থেকে নিচ পর্যন্ত সেট করা বেলজিয়াম আয়নায় নিজেকে দেখে নিল। এতক্ষণ শুয়ে থাকলেও জামাকাপড় ঠিকই আছে। চুলে হয়তো চিরুনি চালালে ভালো হতো, কিন্তু ওসব কিছুই করল না সে।
রুহানীকে আসতে দেখেই সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল তাতান।
- হ্যালো রুহানী, কেমন আছ?
রুহানী প্রায় শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া গলা থেকে কোনোক্রমে ঠেলে বের করল শব্দটা— ‘ভালো’। তুমি? রুহানী নিজের ভেতরের এ পরিবর্তনের, এ ভীষণ রকম তোলপাড়ের কোনো মানে খুঁজে পাচ্ছিল না। এ যেন সেই কিশোর বয়সে তাতানের প্রেমে পড়ার অনুভূতি এতকাল পর এসেও একই মাত্রায় রয়ে গেছে। অথচ এতকালের অদেখায় এটা কখনো সে অনুভবই করেনি! সে প্রাণপণে তার ভেতরের এ আলোড়ন ঢাকার চেষ্টা করে যাচ্ছিল। তার মস্তিষ্কের ভেতরের এ ইরেশনাল প্রতিক্রিয়া তাতান যেন কিছুতেই বুঝতে না পারে, সে চেষ্টাই করে যাচ্ছিল সে।
অ-নে-ক দিন পর, প্রায় আট-নয় বছর তো হবেই, তাই না?
- নয় বছর তিন মাস। জবাব দেয় তাতান।
- বাহ্, হোয়াট এ মেমরি! তুমি এতটা মনে রেখেছ?
- আমি শুধু তোমাকেই মনে রেখেছি, হা-হা-হা।
হেসে বিষয়টার গভীরতাকে হালকা করার চেষ্টা, এটা ওর স্বভাবগত।
সে যাক, তুমি কিন্তু আরো সুন্দর হয়েছ।
রুহানী ভেতরে একটু আলোড়িত হলেও খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বলল, থ্যাংকস! তো হঠাৎ দেশে কবে ফিরলে?
- এই ১০-১২ দিন।
- আমার ঠিকানা কীভাবে পেলে?
- ইচ্ছে থাকলে সবকিছুই পাওয়া যায়।
- আই ক্যান গেজ।
- ডোন্ট বি।
- আমিই বলে দিচ্ছি, থ্রু কমন ফ্রেন্ডস।
- সেই আগের মতোই আছ, আমাকে জিততে দেবে না।
- আমি জিততে দেব না তোমাকে! আমি যে সবসময় তোমার মেধা, তোমার ব্যক্তিত্বের কাছে হার মেনেই আছি।
- যাহ্! আমার সেই কৈশোরোত্তীর্ণ সময়ে নিশ্চয়ই ব্যক্তিত্বের অত ধার ছিল না।
- ভুল বললে। তোমার মতো ব্যক্তিত্বসম্পন্না নারী আমি জীবনে খুব কম দেখেছি রুহানী। তোমাকে ভালোবাসি, এ কথাটাই কখনো বলতে পারিনি সাহস করে।
- কথাটা সম্পূর্ণ ঠিক না। তুমি কিন্তু একসময় বলছিলে; ঠিক বলোনি, একটা চিঠি দিয়েছিলে। সেই চিঠিতে কোনো নাম ছিল না, কিন্তু আমি জেনে গিয়েছিলাম কে সে।
- হ্যাঁ। অনেক সাহস করে, প্রায় সারা রাত চিন্তাভাবনা করে। ভাবছিলাম তুমি যদি না বলো! যদি তুমি আর কোনোদিন আমার সঙ্গে কথা না বলো! আমি আর বাঁচতে পারব না।
- অথচ দেখো তুমি কিন্তু দিব্বি বেঁছে আছ। আর ও সময়ে আমি কিন্তু হ্যাঁও বলিনি! হাসতে হাসতে বলল রুহানী।
- আবার না ও তো বলোনি!
- তাই বেঁচে ছিলে?
- তাই এখনো বেঁচে আছি। তবে ওই যে অপ্রাপ্তিটা! বুকের মধ্যে একটা কাঁটার মতো বেঁধে সময় সময়।
পুরুষের এমন হেঁয়ালিপূর্ণ কথা রুহানীর একদম ভালো লাগে না। তাই প্রসঙ্গ পাল্টাতে বলল, এনিওয়ে, বাদ দাও ওসব, দেশে কেন এসেছ বলো। বেড়াতে নাকি অন্য কিছু?
- এই যেজন্য ম্যাক্সিমাম বাঙালি আসে, কাঁধ ঝাঁকাল তাতান।
- কী সেটা, বিয়ে করতে? ও দেশে কাউকে জোটাতে পারলে না!
- নাহ্, যে পারে না সে কোথাও পারে না।
- ওহ্, তাই বলো! তাতানের ব্যর্থতার এ সরল স্বীকারোক্তিতে এক ধরনের পুলক বোধ করল রুহানী। আর এ ধরনের স্বীকারোক্তি দিতে পেরে যেন স্বস্তি পেল তাতান, ফলে হেসে ফেলল দুজনই। মানুষের পক্ষেই একটা অভিন্ন কারণে দুই রকম আনন্দানুভূতি উপভোগ করা সম্ভব।
- তো পাত্রী ঠিক হয়ে গেছে?
- শুধু পাত্রী না, সবকিছুই ঠিক হয়ে গেছে। এই নাও বিয়ের কার্ড। তাতান অফহোয়াইট কার্ডটা এগিয়ে ধরল রুহানীর দিকে।
রুহানী যেন ঠিক এই সময়টারই অপেক্ষায় ছিল মনে মনে। একদিন তাতান এজন্য তার সামনে আসবে।
প্রত্যাখ্যাত প্রেমিক তার বিয়ের খবর জানানোর গৌরব কখনো হাতছাড়া করতে চায় না। এ ব্যাপারটাতে তারা খুব গৌরববোধ করে।
তাতানকে এ বোকামিটাও হতছাড়া করতে না দেখে মনে মনে হাসল রুহানী। বেচারা, কত ঘোরাঘুরি করেই না জানি তাকে খুঁজে বের করেছে!
অথচ এই তাতানকে রুহানীর একসময় ভীষণ ভালো লেগে গিয়েছিল। রুহানী তখন কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে। তাতান সেকেন্ড ইয়ার। গান গায় বলে কলেজ স্পেশালে বা অন্য কোনো ফাংশনে তার ডাক পড়বেই। তাতানের থাকত সব প্রোগ্রাম পরিচালনার দায়িত্ব। তাছাড়া তাতানরা কজন বন্ধু মিলে একটা ব্যান্ড গ্রুপও করেছিল। নামটা জানি কী ছিল, ভলকানো বা এ-জাতীয় কিছু হবে। কিছুটা পারিবারিক এবং কিছুটা শিল্পের এই সূত্র ধরে দুজন দুজনকে চিনত তারা।
ব্যান্ড গ্রুপে তাতান ড্রাম বাজাত। তার সাবলীল ড্রাম বাজানো দেখে রুহানীর মনে হতো, পৃথিবীতে যত মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে সহজ হলো ড্রাম বাজানো। তাতানকে সবসময়ই সে কি একটু আন্ডার ট্রিটমেন্ট দিয়ে গেছে! সে কি কখনো ভাবতে পেরেছিল, তাতান বার অ্যাট ল করবে! কেমন মিউজিক নিয়ে পড়ে থাকা একটা ছেলে ছিল সে। রুহানীর গান শেখা বা অকেশনে গান গাওয়া তো মায়ের ইচ্ছায়। অথচ তাতান তো তা না!
তাতানের সঙ্গে তখন তার স্বল্প পরিচয়। ওর বাবা তখন নতুন এ শহরে বদলি হয়ে এসেছেন। কোনো এক সূত্রে দুই পরিবারের মধ্যে সামান্য যোগাযোগ হয়েছে। এত স্বল্প পরিচয়ে এমন কথা বলা যায় না হয়তো, তার পরও রুহানী তার স্বভাব অনুযায়ী এ কথাটা তাতানকে বলেই ফেলল যে পৃথিবীতে যত মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে সহজ হলো ড্রাম বাজানো।
কথাটা শুনেই সে ভীষণ ক্ষেপে গেল। বলল, করে দেখাও তো। তুমি তো কিবোর্ড বাজাতে পারো, তাহলে ড্রামটাও তোমার কথা অনুযায়ী বাজানো কোনো ব্যাপারই না।
- কোনো ব্যাপার না-ই তো। তবে একবারও শিখিয়ে না দিলে আমি পারব কী করে?
- ওহ্ তাই বলো, হার মানলে তাহলে!
- হার মানলাম মানে?
- মানে স্বীকার করলে যে এটাও শিখতে হয়!
- শিখতে হয়, তবে ওটা বাজানো কঠিন কিছু না।
- তোমার এমন মনে হলো কেন? কপালে ভাঁজ ফেলে জানতে চায় ততান। ভেতরে ভেতরে সে নিশ্চয়ই অপমানিত বোধ করছিল। তাই জেরার এত ঘটা।
রুহানী প্রায় বলতে যাচ্ছিল যে তুমি বাজাও, তাই মনে হলো ওটা বাজানো কঠিন কিছু না বা তোমার সাবলীল ভঙ্গি! কিন্তু কোনোটাই বলল না। বলল, এমনি। দেখে মনে হলো তাই।
তারপর রুহানী রিহার্সেলে গিয়ে গানের নোটেশনগুলো তোলা বাদ দিয়ে ড্রাম শিখতে লেগে গেল। যতটা সহজ সে ভেবেছিল, ততটা সহজ হলো না বটে। তবে সেই সদ্য তারুণ্যে পা রাখা রুহানী বানের স্রোতের মতো তাতানের প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। যদিও এটা রুহানী কখনই তাতানকে বুঝতে দেয়নি। কোথায় যেন একটা ইগো ক্ল্যাশ বা নিজেকে সুপিরিয়র ভাবা কাজ করত তার ভেতরে।
অথচ তাতানের প্রায় রুটিন হয়ে গিয়েছিল রুহানীর মিউজিক স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা। ওদের বাড়ির সামনে দিয়ে হাঁটাহাঁটি করা বা কোনো ছুতো ধরে ওদের বাড়ি চলে যাওয়া।
কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে রুহানী যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছল, তখন সে বেশ স্বাধীন। সে স্বাধীনভাবে তার চিন্তার প্রয়োগ ঘটাতে পারে, কেউ বাধা দেবে না। সে ইচ্ছে করলেই অনেকক্ষণ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে পারে, কোনো বাইন্ডিংস নেই। চাইলে তাতানের সঙ্গেও প্রায় সারা দিন ঘুরে বেড়াতে পারে, তেমন বাধা ছিল না কোথাও। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়াল সে নিজেই।
তাতান হঠাৎ কিছু একটা প্রশ্ন করতে বর্তমানে ফিরল রুহানী।
তোমার হাজব্যান্ড কোথায় রুহানী?
আমার বাড়ির ঠিকানা খুঁজে বের করলে, আর আমি যে এখন সিঙ্গল, এটা জানো না?
সিঙ্গল! তাতানের বুকের ভেতরে কেউ যেন এক ড্রাম গরম সিসা ঢেলে দিয়েছে, এমন অনুভূতি হতে লাগল। তার মুখটা নিমেষে ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
রুহানী বলল, সিঙ্গল, তবে ভেবো না আবার যে কিশোর বয়সের প্রেমের হ্যাংওভার বয়ে বেড়াচ্ছি।
- কিশোর বয়সে তোমার প্রেম হয়েছিল বুঝি?
- হলেই বা, তাতে কার কী?
তাতান হঠাৎ উঠে দাঁড়াল, এবার তাহলে আমি আসি রুহানী। ৩০ তারিখে সন্ধ্যায় রিসিপশন, তুমি এসো কিন্তু। আর তুমি এলে সত্যিই ভালো লাগবে। আস্তে করে বলে সে।
- হ্যাঁ নিশ্চয়ই যাব। রুহানী হাসিমুখে বিদায় জানাচ্ছিল তাতানকে ।
দরজা পর্যন্ত গিয়ে হঠাৎ আবার ঘুরে দাঁড়াল তাতান। বলল, একটা প্রশ্নের উত্তর দেবে রুহানী? এ প্রশ্নের উত্তর জানাটা আমার জন্য ভীষণ জরুরি। বলো দেবে! তুমি আজ অন্তত আমাকে ফিরিয়ে দেবে না! অনুনয় ঝরে পড়ে তাতানের স্বরে।
কী বলো? প্রশ্নটার উত্তর কি আমি জানি?
জানো, একমাত্র তুমিই জানো। তাই তোমার কাছেই জানতে চাইছি। আমি জানতাম রুহানী, যদিও তুমি মুখে কখনো বলনি। কিন্তু সব কথা তো মুখে বলতে হয় না। আই নিউ ইউ লাভড মি। কিন্তু কিছুদিন পর তুমি আমাদের গ্রুপে আসা এমনকি আমার সঙ্গে কথা বলাও বন্ধ করে দিয়েছিলে কেন?
প্লিজ, প্লিজ রুহানী, আমার এ প্রশ্নের জবাবটা দাও প্লিজ! আর কোনোদিন কিছু জানতে চাইব না।
রুহানী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। যেন ভেতরে ভেতরে গুছিয়ে নিচ্ছিল সব। এরপর ধীরে যেন কোনো এক অজানা গভীর খাদ থেকে উঠে আসছে তার কণ্ঠস্বর এভাবে বলল, আমি আসলে তোমার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম তাতান।
- কেন?
- যেন আমার অবর্তমানে তোমার উপলব্ধিটা তীব্র হয় যে আসলে তুমি কী চাও।
- মানে?
- মানে, তোমার মনে আছে তাতান, একদিন তুমি গল্প করতে করতে আমাকে বলছিলে আমার বান্ধবী মুন সম্পর্কে। আর বলছিলে যে মুন খুব ভালো মেয়ে, কারণ সে প্রেম করে না। কোনো ছেলের সঙ্গে মেশে না। তখনই বুঝতে পেরেছিলাম কত কনজারভেটিভ তুমি! আসলে জানো কি তাতান, বয়সের কারণে হোক বা বড়দের মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া সংস্কার থেকেই হোক, তোমার ভেতরে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল যে, যে মেয়ে স্বাধীনচেতা, যে মেয়ে পুরুষের বানানো সংস্কারে মোড়ানো না, সে মেয়ে ভালো না। এমনকি যে প্রেমে পড়ে সেও না। অথচ তুমি কিন্তু প্রকৃতির নিয়মেই তখন প্রেমে পড়ে গিয়েছ, আর সেটা বুঝতে না পেরে এসব নীতিবাক্য আওড়াচ্ছ।
আমার খারাপ লেগেছিল এটা ভেবে যে, মুন সম্পর্কে তোমার ধারণাটাও ঠিক ছিল না। ও রাখঢাক করতে জানত, আর আমি তার ধার ধারিনি কখনো। আসলে তুমি ওরও প্রেমে পড়েছিলে। ওর সৌন্দর্য তোমাকে টানত। সে যেহেতু তোমাকে পাত্তা দিত না, তাই তুমি আমাকে ওসব কথা শুনিয়েছ।
- আমি মোটেই সেজন্য ও কথাটা বলিনি, এসব তোমার ভুল ধারণা। আমি তোমাকে সত্যি ভালোবাসতাম রুহানী!
- তুমি আমাকে ভালোবাসো, এমন ফিল করতে। ওটা ছিল তোমার ইনফ্যাচুয়েশন।
- ইনফ্যাচুয়েশন তাহলে এতদিন থাকে!
- মানে?
- মানে, তুমি এত কিছু জানো আর এটা জানো না, এটা বুঝতে পারোনি যে তোমার ভেতরে একটা ঈর্ষা জাগানোর জন্য ওইসব বলছি!
- প্রতিটা মানুষ তার নিজের মতো তাতান। আমাকে স্পষ্ট করে তোলার জন্য অন্য কারো সঙ্গে তুলনা চলে না। আর এভাবে অপমান করে জেলাস সৃষ্টি! তোমরা পারোও! তবে কি জানো? মুন দেখতে সুন্দর। তুমি ওর সৌন্দর্য আমার মধ্যে খুঁজতে। মুনের সৌন্দর্য আর রুহানীর পার্সোনালিটি। এ দুয়ের কম্বিনেশন। তুমি আমার দিকে তাকিয়ে ওকে খুঁজতে। তাই তুমি ভাবটা প্রকাশ না করে পারোনি। ওটা তো আসলে মনের ভাব লুকানোর বয়স না। ওই বয়সে মানুষ খুব স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড হয়। তুমি যদি প্রেমই চাইবে তাতান, তবে কেন তোমার এমন মনে হলো যে, যে মেয়ে প্রেম করে না, সে ভালো মেয়ে! তুমি কোনো মেয়ের প্রেমে পড়বে আবার তারই সঙ্গে অন্য মেয়ের প্রশংসা করবে এই বলে যে, সে প্রেম করে না, এজন্যই ভালো মেয়ে! এ কেমন পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা! তবে যে তোমাদের জন্য দেবী আসতে হবে স্বর্গ থেকে!
- আমি খুবই দুঃখিত রুহানী, আমি এ নিয়ে আর তর্ক করব না। তুমি যথেষ্ট বুদ্ধিমতি অথচ তুমি কারণটা বুঝতে পারবে না এখনো? হ্যাঁ এটা ঠিক, তখন হয়তো ভুল করে তোমার ইগো হার্ট করেছিলাম। তাই এ পরিণতি!
রুহানী জানে, সে এ মুহূর্তে তাতানকে হার্ট করছে। তবে জানে না, কেন তার জীবনে এত চড়াই-উতরাই পার হওয়ার পর এখনো তাতানের জন্য কোথাও ভালোলাগা কাজ করে! কেন কোনো কোনো ভোর রাতের স্বপ্নে তাতান তার ড্রাম নিয়ে এসে হাজির হয়! প্রথম জীবনের প্রেম আসলে কী? অন্য কোনো প্রেম, কোনো ঘর বাঁধা, ঘর ভাঙা কিছুই তার উপরে ছাপ ফেলতে পারে না! রুহানী বোঝে না এখনো।
তবে আজ তার ভেতরে ভালোলাগা, ভালোবাসা, আন্দোলন, ভুল সংশোধন যাই থাক, নতুন জীবন শুরু করতে যাওয়া একজন মানুষকে এর বাইরে কিছু বলে আর বিভ্রান্ত করা যায় না। নতুন জীবনে সুখী হোক সে। আর ভালোবাসা, সে না— হয় রইল গোপনে।






