রুমানা এখন গন্ধভুক। ধৌরী তেলের গন্ধ ছড়াচ্ছে আজ গাছের বাকলে। পাখি কি ডানা ঝাপটাচ্ছে জল খেতে? আজ তবে বৃষ্টি। পাখির শিস শুদ্ধ গিরি ঝরনা সৃজিত হলে রুমানা বলে, ‘আজ রোদ উঠবে দেখো।’
রুমানা ঘুটঘুটে কুয়াশাময় ডেইজি ফুলের জংলি ছাপা জামায় হাত রেখে বলে, আমি আজ সেপিয়া টোনের বাদামি খয়েরি ছিট প্রন্ট পরেছি। রঙের এ আলাদা আলাদা রহস্য, স্পৃশ্য লেহ্য ভাষা শিল্পী লুসিও ফন্টানা ছাড়া আর জানে রুমানা।
আব্বা তার লজিং মাস্টারি করার সময় নিরালা পল্লীতে রাত্রি নিকষ হলে ভিতরবাড়ি থেকে জবা কুসুম তেলের গন্ধঅলা একজন মূর্তি আব্বার হারিকেনটা নিতে আসত, মুখ এক হাত লম্বা চাদরে ঢাকা। অন্যদিকে মেঝেতে তাকিয়ে থাকা নিঃশব্দ মুখ। পাড়াগাঁয়ের ঝিঁঝিঁ ডাকা নিকষ রাতের সেই শুধু জবা কুসুম মার্কা একটা তেলতেলে স্মৃতি নিয়ে আব্বার যৌবনকাল ম-ম করেছিল। (পুনশ্চ: আমাদের জন্য আব্বাকে সারা জীবন আঠালো সবুজ জবা কুসুম ছাড়া অন্য কোনো তেল কিনতে দেখিনি।)
রুমানার চোখে অ্যাকোয়ামেরিন পাথর বসানো। গভীর সমুদ্র তলদেশ থেকে আহরিত এ পাথরে আছে ধূসর সবুজাভ দ্রবণ দ্যুতি। মনুষ্যচোখের মতোই তা বিদ্যুত্ময়। অ্যাকোয়ামেরিন ধূসর নীলাভ। রুমানার চোখের জায়গাটায় একটা আস্ত চাঁদের আদল কেটে বসিয়ে দেয়া। চাঁদ ডোবা অন্ধকারের মতো একটা গোল কর্নিয়াঘেঁষে স্যাঁতসেঁতে কৃষ্ণ সাগর দিয়ে একটা ঢাল নেমে গেছে সরু হলুদাভ। যেন বিমর্ষ পাপড়িসমেত ডানা ঝাপটানো জেরেনিয়াম ফুটে আছে ওর চোখে। সমুদ্র তলদেশের ম্যাগনেট, জাদুবিদ্যায় শানিত টোল খাওয়া টিনের হাঁড়ির জলের মতো ছলকে ওঠে। জলে ঝিরঝিরে হাওয়া নিয়ে বাদামি বল দুটি কেঁপে ওঠে শিয়ালের ক্যাঁই ক্যাঁই শব্দে। একটা অচেনা বুদ্বুদ চোখ থেকে বেরিয়ে আসে, মনুষ্যচোখের মতোই নিঃসীমতা। বিমর্ষ বাদামি চোখের পাতা জবজবে জলে আর্দ্র। মেঘ কল্পনা, বিস্মৃতি, অন্যমনষ্কতা, ওর চোখের অ্যাকোয়ামেরিনে ঠিক ঠিক ফোটে। নিরুপায় হাসলেও চিকচিকে রশ্মি খেলে। বাইরে বৃষ্টি নামল এইমাত্র, এমন মনে হয় দীপ্ত সজল ওর চক্ষুদ্বয়। জগতের সব স্বাভাবিক প্রয়াসে রুমানা আশ্চর্য দক্ষ। এমনকি সূর্যগ্রহণের দিনটা ও মনে করে। কাচ দিয়ে আলো জ্বেলে গ্রহণ দেখার স্মৃতি, সরাসরি তাকানো বারণ ছিল। তবুও খ্রিস্টজন্মের ১২০০ বছর আগের নিয়মে কাচে দেখা গ্রহণকাল সত্যি পরীক্ষা করতে নভোমণ্ডলে আধখাওয়া অন্ধকার সরাসরি দেখেছিল বলেই কি তবে চোখ গেল? কথা বলার খসড়া স্বর, আকস্মিকতার রকমারি বৈচিত্র্য সূক্ষ্ম ধ্বনিবিনিময় সব আলাদা আলাদা করে বোঝে ও। কী করে বোঝে ও আমাদের? রুমানার বন্ধু ব্রেন্দাকে যখন দেখে দৃষ্টি মেলেই দেখে, পাথরের যে দেখার ক্ষমতা নেই, তা সত্যি নয়। ব্রেন্দার অপ্রস্তুত ভাব, বিমোহিত হওয়া, বিস্ময় প্রাণ— সব বোঝে। ওর তর্জনী স্পর্শ করতে ইচ্ছে করে ব্রেন্দার। ও কী করে এমন দগদগে ইন্দ্রিয়জ পৃথিবীকে পরিহার করার অভ্যাস রপ্ত করেছে, অবলোকনের ধ্যান, জীবজ বৈভব কী করে নিমেষে একরত্তি গাত্রগন্ধে আটকে দিতে পারল? রুমানার কি পুরোটাই মধ্যরাত? চন্দ্রালোক আর সূর্যালোকের হিসাব অথবা ভেদরেখাটা কী করে টানে ও দেখা আর না দেখায়? মনুষ্যজন্মের প্রথম দেখা কি স্মৃতিস্থ হতে পারে জীবনভর? বৃষ্টির ঝাঁপি বাঁচিয়ে রাস্তা চলায়, তিনরঙা অ্যালুমিনিয়াম ছড়ি ঠেকিয়ে ড্যাবডেবে উপত্যকার জলটা পার হয় ঠিক যেন পূর্বজন্মের দর্শন অবধান। এমনকি জলে যে সড় সড় শব্দ, বাদামি স্কার্টের প্রান্ত তুলে হাঁটার ভঙ্গিতে জল ঝরা, বৃষ্টির পত্রচ্ছিন্ন ঝপাস্স... রুমানা অনুসরণ করে স্টাডিরুমের বারান্দা পর্যন্ত। ও অন্ধ চোখের আন্দাজে জলস্রোত, ধনে, আদা, চিনিগুঁড়া চাল অথবা লোয়ার সিলেরু চেনার আলাদা স্মৃতি থেকে বোঝে, বিকালের মেঘটা আজ ফসলপ্রসবী, এ মেঘের হাওয়া থেকে যে নয়নতারা জন্মাবে, যে অধুনা শৈবাল ঘাপটি মেরে পড়ে থাকবে তার ফলোদয় ঘটবে অস্পন্দ। বেডরুমের জানালা বরাবর বুনো সেওড়ি ঝোপ, পুরনো সাইকেল, কুণ্ডলী পাকানো মেঘ, ছোটবেলার মেমসাব গল্পের মতো শৈবালী পাহাড় দেখে রুমানা। হাতের আন্দাজে টেবিলে কনুই ঠেকিয়ে যেখানে জলদানটা রাখে, সেখানটা বরাবর একটা কাঠবিড়ালি বাইরে খুঁ খুঁ শব্দে ডাল বাইছে। জামাটা খাটের ডান পাশে পুরনো বাতিল পাইন কাঠের দেরাজে গুছিয়ে রাখে। বিছানায় পাতা ওর ওপেন ক্লসেট। খয়েরি স্কার্ফটা থেকে ইংলিশ আইভি নিভৃত গন্ধ ছড়ায়। বাইরে পড়ার জামাগুলো বিছানার উপরে ওপেন ক্লসেটে সারিবদ্ধ রাখে ও। হাতের আন্দাজে বাদামি পুলওভারের নিচ থেকে অরগ্যান্ডি ফুলের ছোট পাড় ছাঁটা কাপ্তানটা বের করে। নিচে দলা পাকানো পানা ফুল ডিজাইন অলিভ গ্রিন রাউন্ড নেক ব্ল্যাক পম্পার, ক্রেপ টপ টি শার্ট, তার উপরে লং স্কার্টটা হাতের তালুতে নেয় প্রথমে, গন্ধটা চন্দননগরের জেঠিমার জলভর্তি কুয়ার বুনো শ্যাওলা শ্যাওলা। এদিকে কলাভবনের দুপুরগুলো ঢুকে পড়েছে অফ হোয়াইট টপসে। ঝাঁ ঝাঁ রোদের গন্ধ আসে স্তেফান এলে। পরীক্ষা ডিউটির ঘন চায়ের একটা হরষিত গন্ধ শার্টিন পিংক স্কার্ফে। মধুমিতা সিনেমা হলের হিম ঠাণ্ডা গন্ধ পায় ও ব্রেন্দার গায়ে। জজ কোর্টের পুরনো ফাইলের বিষম চাপা গন্ধ, অ্যালুমিনিয়াম হাঁড়িতে ধক ধক বাসমতি ভাত সিদ্ধর গন্ধ, ঘোর বর্ষায় ডেও পিঁপড়ের দলবেঁধে বাড়ি বদলের গন্ধ, শ্রাবণের দুপুরে কল্কে মোড়ানো পোস্টকার্ডের ঝিম গন্ধ, জলঘাস, গরু, চীনাবাদাম, গাছতলা, এলিফেন্ট রোডের সিম্ফনি দোকানের কর্ডিয়াক গন্ধ সব আলাদা থাকে রুমানার দেরাজে। নাকের কাছে শুঁকে চিনে নেয় ও একেকটা জামা। বেডরুমের পাটাতন পেরিয়ে বিছানার কুইল্ট হাতড়ে আন্দাজে ও পা মেপে মেপে পেয়ে যায় ওপেন ওয়্যারড্রোবটা। নিজেই গুছিয়ে রাখে সব। কানের দুল, চোখের কাজল। হাতের খুব কাছে থাকে ওর জীবনের যা কিছু জরুরি। গন্ধগুলো কখনো নিউমার্কেটের নভেলটির আইসক্রিম, কখনো রোকেয়া হলের করবী গাছ আবার কখনো মানুষ। রুমানার ঢালু বিছানার কোণে সন্নিহিত জীবন্ত সব তারা। ঘরে কোনো আয়না নেই। এক পাশে সাদা বেডসাইড টেবিলে ছোট ছোট কাগজি লেবুর শুকনো বিব্ধস্ত টুকরা, অন্য পাশে চিমশানো শুকনো ফুল, স্ফটিক পাথর আর একথোকা চুল চিরুনিতে আঁটকে থাকা, যেন কত যুগ আগে রুমানা চুল আঁচড়েছিল, বাসি চুলে স্বেদ গন্ধ, তোরঙ্গে মরা একটা ঘাসফড়িং বিবর্ণ পুরনো ফুল রাখা ফ্লাওয়ার ভাসে অনেকদিন সেখানে খয়েরি দাগ, ফুল আর চুল কবে পচে লেপ্টে শুকিয়ে গুচ্ছকুঁড়ি হয়েছে, বিদ্রাবিত একটা গন্ধ। রুমানা কাজল পরে, আয়না লাগে না এখন আর। চোখ ছাড়া চোখের কাজল কৌতুকপ্রদ ওর কাছে। এমনকি চোখের উপরে এমারাল্ড গ্রিন শেড, যা একটুখানি মাখলেই ঝমঝম করতে থাকে সারা শরীর। চোখ থাকার সময়ের স্মৃতি আসে। বডিশপের নিগ্রো মেয়েটা ওকে এটা খুঁজে দিয়েছিল। বলেছিল, ‘তোমার কমপ্লেকশন আর চোখের আদি-অন্তহীনতায় এ রঙটা জুতসই...’ স্রেফ উপমাটার জন্য রুমানা এটা কিনেছিল সেবার দেশে যাওয়ার আগে। এ কাজলে রুমানা এখন রোষ ক্ষিপ্ত, সুনয়না। ‘তাহাদের কথার’ গল্পের মতো রুমানা ভাবে, ‘সে চোখ ছোট করে দিনমান দেখে, সে চোখ সুতীক্ষ করত অন্ধকার দেখে’, সরু টানের গভীর কালো রেখা আঁকতে পারে ও অনায়াসে, এমনকি কাজল পরতে পরতে ও শরতের মেঘ কল্পনা করে। মিসরির মতো সুনিপুণ, চেকনাই পাচিল ঘেরা ওর মণি দুটিতে অমোঘ দ্যুতি। ঠোঁটে লিপস্টিক, গালে ব্লন্ড রুজ আর চোখে এমারাল্ড গ্রিন আইশ্যাডো মাখতে আর আয়না লাগে না। শুধু মাকে ডেকে কাছে আসতে বলে। মা বলে, সব ঠিক আছে হেমা, কয়টা ছুটা চুল কপাল থেকে গুছিয়ে নেবে হেমা তখন। মা যখন হেমার আয়না। ও বোঝে সকালের ক্লাশে ক্রিস্তফ এসেছে। ঘড়িতে ঠিক ৯টা ৫, তার কোনো গন্ধ থাকে না, শুধু কষ কষ একটা অনুভূতি। হ্যালো রুম্মানা গুডমর্নিং... রুমানার নিবিড় ঘোর আসে। শেষ রাতের শীতের গন্ধ, মাঝরাতের কালবৈশাখীর ভেজা ভেজা জানালার পর্দা ঘরের ছাদ স্পর্শ করার হড়াস-ধড়াস বাসি গন্ধগুলো, শাঁখারীবাজারের স্যাঁকরার দোকানের ঘ-র-র-র আওয়াজ, পলা আর সোনা-মিনা বাজিমাত ডিজাইন। গন্ধের একটা আস্ত সিন্ধুক খুলে যায়। রুমানাকে নিতে আসে স্কিস্তফ। একটা অচেনা ভেজা গন্ধ আসে তখন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে ওকে পিটার এলার্ড পর্যন্ত পৌঁছে দিতে।
রুমানা... ‘হ্যালো... ডিয়ার’ কণ্ঠস্বরকে চেনে। গন্ধটা ঘাস ঘাস, তার সঙ্গে ইংলিশ শব্দ, ঢ্যাঙা অতীব অরণ্যচারী ডাহুক, এ মুল্লুকে এ স্বরে দুপুরের রোজমেরির রস খেয়ে ঢাউস অকাতর দুর্ধর্ষ ডাকটা কানে আসে। মনুষ্যসমাজের প্রতি এ গীতধ্বনি রুমানার চেনা, ঠিক আন্দাজ পায় হয়তো মধ্যদুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে, মা হয়তো ভাত নিয়ে বসে আছে। রুমানার জীবনে আর কোনো বই, কাগজপত্তর, রুল টানা অভিসারিকা অফসেট নেই। নিউমার্কেটের ম্যাট দিস্তা কর্ণফুলী পেপারের সঘন গন্ধটা তবু পায় ও। রুমানার খুব চারকোল প্রিয় ছিল, কাল মোটা খড়খড়ে ঝাঁঝরা নিবে চিনেরির বেঙ্গলি ভিলেজ সিন এঁকেছিল। সুলেখা ক্যালিগ্রাফিক অ্যাসিড ফ্রি পিগমেন্ট ইনকে লিখেছিল, ‘আই লাভ ইউ।’ কিন্তু এখন এসব নেই ওর জীবনে। স্টাডি টেবিলে আর স্টাডি নেই। পরিবেশবান্ধব রুমানা এখন। বই নেই। কাগজ নেই। অজস্র সিডির স্তূপ। একটা অদ্ভুত কম্পিউটারে রুমানা পাঁচ হাজার শব্দের রিসার্চ পেপার লেখে, কি প্যাডে কোনো অ্যালফাবেট নেই। সেখানে গাঢ় অন্ধকার প্লাস্টিক ফ্রেমে টেপরেকর্ডার শুধু। রুমানা একটা আস্ত সেনটেন্স উচ্চারণ করে, সেটা টাইপ হয় স্ক্রিনে। প্রত্যুত্তর, প্রতিহাস্য বিনিময়, চোখটা মেলে রাখা যেদিক থেকে আওয়াজটা আসছে, পাথরকে সজাগ রাখা ব্রেনের সিগনালের নার্ভকে জুতসই মনুষ্যপ্রজাতির প্রতি, যেন তোমার চোখ নেই, কিন্তু তুমি বাগদা চিংড়ি পছন্দ করতে পারো রুমানা। তুমি টিউলিপ ফেস্টিভ্যালে যেতে পারো, যেন তুমি চোখের অনুভূতি নিয়ে বেঁচে থাকো রুমানা। করিডোরে কাঠের রেলিং বরাবর একাই হেঁটে যায় ক্যাফেতে। অনেকখানি ক্রিমার মেশানো গরম কফিতে চুমুক দিতে দিতে ফোনের টেক্সট বাটনটা অন করে ও। এলার্ড হলের ২০১ নম্বর ক্লাসরুমের কাছে এসে রুমানা জানে, আজ বাড়ি ফিরতে দেরি হবে। ক্রিস্তফ নামিয়ে দেবে স্পেসিফিক স্পিরিটের কাছে, একা জঙ্গলের রাস্তা ধরে হেঁটে যেতে হবে বাসায়। পুরনো রাস্তার ছাতিম বনটা মিলেছে জারুল গুল্মের তেতো গন্ধতে। হেমলক ধলতার পাড়ঘেঁষে রয়েছে, আর অন্য পাশে ক্যালমিয়া মাউন্টেন লরেল বরাবর পাখির কিচমিচে ধড়াস শব্দগুলো যে উঁচু গাছটাকে ঘিরে ওরিগন গ্র্যাপের বিশাল ছায়াটা একদম নারকেল গাছের মতো টইটম্বুর গন্ধে ঠাসা। তারপর ঠিক বাতাবি লেবু আর কুণ্ডলি পাকানো নদীর গন্ধটা সেজের বাতির মতো জ্বলে উঠবে, রুমানা কষে আরো ছয় ক্রোশ হাঁটবে। ২৬৬৪ টেনিস ক্রিসেন্ট, আকাডিয়া পার্কের সঙ্গেই ইউসটেরিয়া গাছটা। সেটা ওর কাছে আজ অবধি ধানমন্ডির বারান্দায় ঝিঙের আকড়ি। অশরীরী চামেলি ফুটেছে ঢালের সময়, এভাবে ঠিক খয়েরি রঙের পাইন উড দরজাটিতে এলানো একটা নিঃসঙ্গ পাতলা তিন রঙের অ্যালুমিনিয়ামের ছড়ি অপেক্ষা করে। সেটাই রুমানার চন্দ্রালোক। কত খাদে পা ঠেকল, মেপে, উঁচু-নিচুতা, আগাছা, বালুঘাট, বৃষ্টির জল, টিলার বাঁক কখনো অসমান স্পিরিয়ার বাকলে ঠেকলে ছড়িটা ঘুড়িয়ে নেয় ও ডান দিকে একটুকরো সমুদ্র বের হাওয়ার দিকে। হাওয়াটা গায়ে বিঁধে পথ দেখায়। আর বাদবাকি ঘরের সিঁড়ি, জানালাঘেঁষে সবুজ সোফা, কাঠের টেবিলে ঈষৎ জড়সড় হাইড্রেনজিয়া, কিচেনে জলের গ্লাসে ট্যাপ ছেড়ে জল ঢালা, সাইড টেবিলে স্ফটিক কাচের বাতিদানিটা বাঁচিয়ে বন্ধ ঘড়িতে দম দেয়া। সেন্ট জন্স রেসিডেন্সে থাকত ও যখন চোখ ছিল। ব্রেন্দা এলে ওর চোখ থাকার সময় আসে। চোখ থাকা আর না থাকা।
যেদিন ফেস্টিভ্যাল নাইটে রুমানা বয়কট করেছিল ডিনার পার্টি। বাংলাদেশের পতাকা নেই কেন? রুমানা দেশে চলে গেল সেবার। বন্ধুরা বিদায় দিল সন্ধ্যার অন্ধকারে। রোমহর্ষক ছিল না তো জীবন। সূর্য দিকনির্ণয় করা, আকাশের সপ্তর্ষি খোঁজা, শীতের ঝিলম বনে জিহ্বা দিয়ে কুয়াশা খাওয়া থেকে কখনো মনে হয়নি চোখ চলে যাবে। যখন ফিরে এল আবার এই শহরে, তখন বন্ধুরা দেখল ওর চোখের জায়গাটা শূন্য কোটর, দুমড়ানো লেপাপোছা একটা ঢালু সমতল। রুমানার প্রস্তরীভূত চোখে বুঝি জল গড়াবে না আর। কিন্তু ব্রেন্দাকে স্বর শুনে বলে দিচ্ছে কে ওহাহেদ, কে সারা আর কে ক্রিস্তফ। কিন্তু সেন্ট জোন্স কলেজ থেকে লিন্ডা এল বাংলাদেশের ফ্ল্যাগ নিয়ে। লিন্ডা গ্রে ত্রস্ত স্বরে, ‘আমরা দুঃখিত রুমানা... মাই ডিয়ার, তোমার ফ্ল্যাগ এনেছি, কিন্তু তুমি তা দেখতে পেলে না আর।’ রুমানার সার্জারি হওয়া নাকটা জোড়া লাগেনি তখনো, আধখোলা একটা বাঁক তেছড়ে নেমে গেছে ঠোঁটের ঢালুতে। দূরে মনোরম লিলির সুবাস সেই শব্দহীন স্মিতহাস্য মুখে, নির্বাপিত চোখের ভেতরে যেটুকু ঔদ্ধত্য ছিল, তা যেন আবার আবির্ভূত হতে চাইল। বেদনা প্রকাশের ভাষা পাথরের নেই। সঘন ধন্দে সে পাথরের চোখে শুধু নিবিড় আলো জেলে রাখা।
দেশের স্মৃতিতে এখন শুধু শুকিয়ে যাওয়া রক্তের গন্ধ। শুধু ছিন্ন চোখের কোটর, বাসি রক্তের মধ্যে দলা পাকানো চুলের রিবন, ছাপা ক্রেপ কটনের সেমিজ আর শ্যাওলান্বিত একটা কষটে গন্ধওয়ালা চাদর। হাসপাতালের ১২ নম্বর কেবিনের বিছানা, সার্জারি টেবিলে দুমড়ানো রুমানা শুকিয়ে যাওয়া শক্ত কাঠের মতো কালসিটে রক্তের ভেতর আঁশটে নির্মম অন্ধকারে শুয়ে শুয়ে শুনেছিল ডাক্তারের কথা, ‘দেখার সম্ভাবনা জিরো পার্সেন্ট।’
দিন এখন বহুদূর, অন্য ভূমণ্ডলের সমুদ্র তলদেশের বাষ্পসম্ভূত মেঘ নিয়ে আসে ওর কাছে। এই মেঘ ও খুঁজেছিল যেদিন ওর চোখ চলে গেল। ১১ তারিখ সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখে কাজলও পরেছিল। আয়নায় নিজেকে আলাদা লাগছিল কিনা ভাবে মাঝে মাঝে। জানালার গরাদে পাখি ওড়া দেখেছিল। নিজেকে শেষ দেখার স্মৃতিটা মুছে যাচ্ছে ক্রমশ। শেষ নিজেকে দেখা কত বছর আগে? চোখ চলে যাওয়ার দিনটা মনে পড়ে ওর। ভ্যাপসা গরমে বারান্দায় বসে ছিল, টবে গোলাপ কলি এসেছে, সেটা মন দিয়ে দেখছিল। কিন্তু খটমটে দানা পাকানো শুকনো দেবে যাওয়া মাটিতে গোলাপ কলির অবস্থা ঝুরঝুরে। ডাল এলিয়ে পড়ছে। যদি জানত, এই তার শেষ দুপুরের অবশ বৃক্ষপত্র দেখা। ঝিম গ্রীষ্ম তাপদগ্ধ আনুশের রুবিয়া বয়েলের নীল নীল কুশি ফুলের জামা পরে ছিল রৌদ্রপাতার মতো লাগছিল ওকে। স্বচ্ছ, গাঢ় গ্রিবা তুলে ওর হাসিটা শেষ দেখা। ঘামে দগদগে হয়ে ভোরবেলা সাদা রিবনে অসহিষ্ণু চুলগুলোয় গিঁট দিতে দিতে দেখছিল সরু মায়াবদ্ধ বকপাখি ডিজাইনের চুলের কাঁটাটা। সেটা চুল থেকে খুলে টোপাজ দুলের সঙ্গেই রেখেছিল, এই তার কল্কে ডিজাইনের কানের দুলের সঙ্গে দেখতে পাওয়া শেষ সন্ধ্যাখানি। এই তার শেষ আয়না দেখা। শেষ নিজেকে দেখা। অনিক্স রাশের কাজল ছিল, ধেবড়ে লেপ্টে যায়নি তখনো। কিন্তু চোখ যখন চলে গেল, ছিঁড়ে গেল শিরা, মণি উপড়ে এল, তখন কি ওষ্ঠ নিঃসৃত লালার সঙ্গে ছিটকে বেরিয়ে এসেছিল দলা পাকানো চোখ দুটিও? কাজল কি তখনো অক্ষত ছিল? সার্জারি টেবিলে পড়ে ছিল একদলা ঘন অনিক্স রাশ আরক্ত চক্ষুদ্বয়? কেমন লাগছিল দেখতে ওর চোখ ছাড়া উদোম মুখটা?
রুমানা সেদিন ঘুম চোখে জুট সিল্কের পাখা দিয়ে বাতাস করেছিল আনুশেকে, ঘেমে নেয়ে গিয়েছিল ও। সেদিন আকাশ ছিল প্রমত্ত, নির্জলা। আনুশে মায়ের গাঘেঁষে খেলছিল। রুমানা আনুশেকে জড়িয়ে আদর করে। মায়ের সঙ্গে আনুশের গ্রীষ্মের দুপুর গড়িয়ে যায়। রুমানা ল্যাপটপে কাজ করে। রোববারের চিঠিপত্তর, কফি মগে চুমুক দিতে দিতে সম্মোহিত ও। সারার দেয়া ন্যাচারাল ডিফুজারটা সাজিমাটি ভিজে ভিজে গন্ধে ভরে উঠছে। স্নানঘর থেকে গন্ধটা শুরু হয়। সপ্ত সমুদ্র থেকে আহরিত বিমোহন। ব্রেন্দা লিখেছে, ‘তুমি কি দেশে গিয়ে আমাদের ভুলে গেলে রুমানা? ওয়াহিদ, নাফিস সবাই তোমাকে মিস করছে অনেক, এমনকি স্তেফানের লাইকা পর্যন্ত সন্ধ্যাবেলা কুঁই কুঁই করে ২২৫ নম্বর ঘরের করিডোর থেকে নড়ে না।’
‘শিশমহলের হাজার হাজার করতার তবু কেন এত নিঃসঙ্গ?’ রুমানা মনে করতে পারে না কোথায় পড়েছে লাইনটা?
কেউ জানতে পারে না, ফিনকি ছোটা রক্তের বিচিত্র মথিত তামাটে হাঁ করে খোলা পাংশুটে চক্ষুগহ্বর থেকে রুমানার চোখ বেরিয়ে পড়েছে, এক সর্বনাশী নিনাদিত অন্ধকারে চিরকালের মতো ডুবে যাচ্ছে ও। জবজবে লাল রক্তের ঝরনাধারায় সার্জারি টেবিলের নীল রটেনডাম ওয়ালক্লথটা ভিজে যাচ্ছে। নার্স সাদা ব্যান্ডেজের গাট্টিকে চেপে ধরে আছে রুমানার চোখের ফাঁকা জায়গায়, ঝাঁঝালো বিকট শব্দ আর কষ কষ রগড়ে গন্ধ ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে দুমড়ে দিচ্ছে। অন্ধকার বন্ধনচ্ছিন্ন একদলা মরা কোটর শুধু, ক্ষতটা হাঁ করে খোলা, চোখের সঙ্গে আর যা কিছু থাকে— ভ্রু, নাক, তাও নেই। ভ্রুর নিচ থেকে গাঢ় রক্তাক্ত ক্ষতটাকে ভয়ঙ্কর রগড়ানো আদপোড়া ধুন্দল মনে হচ্ছে। একটা মরা ফোঁড়ার মতো, ছোপ ছোপ রক্তের বেগুনি ফুলকি। টর্চ জ্বেলে ডাক্তার নিবিষ্ট দেখে। ঢল ছিদ্র, মুখটা খসখসে আধখোলা, কালসিটে ড্যাম্প, ম্লান তিক্ত ত্রূদ্ধর অন্ধকার ভেদ করে একটা কোনো আলো আসছে না আর। শূন্য চোখের কোটর থেকে রক্ত বন্ধ হয়েছে মাত্র। হাই পাওয়ার পেথিডিনে রুমানাকে অচেতন করার চেষ্টা হচ্ছে। ডাক্তার ওর নাড়ি পরীক্ষা করে। যদিও এখন আর আন্দাজ করা যায় না, ও ঘুমিয়েছে কিনা। যে চোখ বন্ধ করে রুমানা ঘুমাত, সেই চোখ এখন আর নেই, যে আলোয় চোখ মেলার কথা, সে হাই ভোল্টেজ বাল্ব জ্বেলে দেয়া হয়েছে, রুমানা দগদগে বাসি রক্তমাখা আঠালো চুল-মুখ একাকার তাম্রবর্ণের জট বাঁধা শক্ত জামার খুটে আঙুল পেঁচিয়ে ক্লোরোফিলের অচৈতন্যে নিঃসাড় পড়ে আছে। আনুশেকেও আর ডাকছে না। ও কি আসলে জেগে আছে? আর জেগে থাকলেও ও আসলে ঘোর কৃষ্ণবর্ণের অন্ধকারে কী করে জাগছে, জেগে ওর আনুশের জন্য কবরী পাতার কষ জোগাড় করার কথা ছিল, কাচের শিশিতে গুবরে পোকার গুটি অভুক্ত রয়েছে, দগ্ধ পতঙ্গ বোতলের মুখ বন্ধ করে জলে ডোবাতে হবে, রুপার খোল আসবে শ্রাবণে, ঘুটে বেল কাঠ ঘষে রাখার কথা। শ্রাবণ আসার আগেই ওর চোখ আসবে তো? যে শ্রাবণে আনুশে ১৬ হবে, ন্যাচারাল ট্রেজার থেকে খোয়া ভেঙে চুর্ণী লাল স্যাফায়ার উদ্ভিন্ন জলধারার শেষ সূর্যরশ্মি বোতলে পুরতে হবে মনে মনে তিন সংকল্প গুনে। এই মানবাধিকার মনুষ্যচক্র, দূরের আওয়াজগুলো আর দ্বিপ্রহরের ঘোর অমানিশায় রুমানার হাত দুটি সিক্ত ঘাসের মতো নুয়ে পড়ে আছে সাদা চাদরে। দুস্তর শূূন্যতায়, নিঝুম অন্ধকারে তন্দ্রাচ্ছন্ন হতেও যে চোখ লাগে, যে চোখ ওর শনিবার রাতেও কাঠের টেবিলে সাদা মগে চা, চাঁদ দেখায় ছিল, সেই চোখ আর নেই। দুঃখ দিগন্ত রেখা, রোদ-ঝড়, একাদশী অঘ্রাণে আনুশের মুখটা অনেক দিনের পুরনো করতে, বারবার দেখে নেয়ার ছুঁতো খুঁজতে যে চোখ লাগে, সে চোখ আর নেই রুমানার।






