রনেন বার্গমানিয়ান । অনুবাদ: শওকত হোসেন

এফ-১৫ বিমানগুলোর রাডারে ভূমধ্যসাগরের ৩৭০ মাইল অভ্যন্তরে আকাশে একটা পরিবহন বিমান ডিএইচসি-৫ বাফেলোর সংকেত ধরা পড়ল। দ্রুত কাছাকাছি ছুটে গেল ফাইটারগুলো। লেজে আঁকা নম্বর আর নীল-বাদামি লেখাগুলো পড়ল ওরা। আসল প্লেনের খোঁজ মিলেছে, নিশ্চিত হয়ে গেল।

রেডিও সচল করল পুরোভাগে থাকা পাইলট। ‘আমাদের কাজে নামার অনুমতি আছে তো?’

তারিখটা ছিল ১৯৮২ সালের ২৩ অক্টোবর। তেল আবিবের জমিনের গভীরে ইসরায়েলি এয়ারফোর্সের মূল কমান্ড কন্ট্রোল ক্যানারি সাংকেতিক নামের বাংকারে লাউড স্পিকারে পাইলটের কথা ছড়িয়ে পড়ল। কমান্ডিং অফিসারের দিকে স্থির সবার নজর। সবাই ধরে নিয়েছে, গুলি ছোড়ারই হুকুম হবে। কিন্তু সাধারণভাবে চকিত সিদ্ধান্ত নেয়ার লোক হলেও দ্বিধায় ভুগছিলেন বিমান বাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল ডেভিড ইভরি। প্রয়োজনীয় সবকিছুই যুদ্ধবিমানগুলোর নাগালে থাকার কথা জানা আছে তার: পজিটিভ ভিজুয়াল আইডেন্টিফিকেশন, নির্জন উন্মুক্ত আকাশে নির্বিঘ্ন লক্ষ্যবস্তু। প্রতিরক্ষামন্ত্রী এরিয়েল শ্যারনের তরফ থেকে বিমান ও ওটার যাত্রীকে শেষ করার হুকুম এসেছে। ওদের দায়িত্ব— ইভরির দায়িত্ব— নিশানা ভেদ করা, বাছাই করা নয়।

কিন্তু সন্দেহের ছায়া ইভরির মনে। ‘নেগেটিভ,’ পাইলটকে বললেন তিনি। ‘আই রিপিট। নেগেটিভ অন ওপেনিং ফায়ার।’

এর আগের দিন ইসরায়েলের বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হাতে সামরিক এ অপারেশনটি— ফিলিস্তিনি লিবারেশন আর্মির চেয়ারম্যান ও ইসরায়েল রাষ্ট্রের শত্রু ইয়াসির আরাফাতের পরিকল্পিত হত্যা প্রয়াস— সূচিত হয়েছিল। বিদেশে লোকবল নিয়োগ ও পারিচালনার দায়িত্বে থাকা মোসাদের ইউনিট তসোমেত পিএলওর দুজন ইনফর্মারের কাছ থেকে আরাফাতের পরদিন ব্যক্তিগত বিমানে কায়রোর পথে রওনা হওয়ার খবর পায়। সঙ্গে সঙ্গে মোসাদের গুপ্তহত্যার দায়িত্বে থাকা ইউনিট সিসেরা দুজন অপারেটিভকে আরো তথ্য জোগাড়ের জন্য কাজে লাগায়। এথেন্স এয়ারপোর্টের শিথিল নিরাপত্তা ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে ব্যক্তিগত বিমান রাখার জায়গায় আরাফাতের অপেক্ষায় ছিল ওরা।

শ্যারন এদিকে অপারেশনে নামার জন্য ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলোর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাফায়েল ইতানকে চাপ দিয়ে যাচ্ছিলেন। বিমান বাহিনী তেল আবিব এয়ারফোর্স বেজ থেকে নিমেষে উড়াল দেয়ার জন্য দুটো এফ-১৫ ফাইটারকে সতর্ক অবস্থায় রেখেছিল। সদাসতর্ক ইভরি স্বয়ং লিড পাইলটকে ব্রিফ করেছেন। ইসরায়েল ভুল কোনো এয়ারক্র্যাফট ধ্বংস করলে পরিণতি বিপর্যয়কর হয়ে দাঁড়ানোর ব্যাপারটা তার কাছে স্পষ্ট ছিল। ‘আমার পরিষ্কার নির্দেশ ছাড়া গুলি ছুড়বে না’— পাইলটকে বলে দিয়েছেন তিনি। ‘ক্লিয়ার? এমনকি যোগাযোগে কোনো বিপত্তি হলে, আমার নির্দেশ না শুনলে’— আবার নির্দেশের ওপর জোর দিলেন তিনি— ‘গুলি ছুড়বে না।’

২৩ অক্টোবর বেলা ২টা ৫ মিনেটে এথেন্সে মোসাদ হেডকোয়ার্টারে ফোন করল সিসেরা অপরাটিভদের একজন। ‘পজিটিভ আইডি।’ তার উত্তেজনা রীতিমতো টের পাওয়া যাচ্ছিল। পিএলও নেতা ও তার লোকজনকে সবুজ চিহ্ন আর রেজিস্ট্রেশন নম্বর ১১৬৯ লেখা একটা ডিএইচসি-৫ বাফেলো বিমানে ওঠার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে দেখার কথা বলল সে।

এ তথ্য ক্যানারিকে পাঠাল মোসাদ। ইভরির কাছে অবশ্য একটা কিছু গড়বড় ঠেকেছিল। ‘ব্যাপারটা ঠিক মাথায় ঢোকেনি আমার’— অনেক বছর পর তেল আবিবমুখী নিজের এক্সিকিউটিভ স্যুটে বসে বলেছেন তিনি। তখন বেগিন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করছিলেন। ‘আরাফাত কেন কায়রো যাবেন, বোধগম্য হয়নি আমার। গোয়েন্দা সূত্রমতে, তখন সেখানে পাওয়ার মতো কিছুই ছিল না তার। আর গেলেও অমন ট্রান্সপোর্ট প্লেনে কেন? তার মতো লোকের পক্ষে আদৌ সম্মানজনক নয়। আসলেই তিনি কিনা, নিশ্চিত করতে বলেছিলাম মোসাদকে।’

দুই সিসেরা অপারেটিভই আরো একবার মানুষটি আরাফাত বলেই জোর দিয়েছে। ‘লক্ষ্যবস্তু ফাঁকি দিতে দাড়ি বড় করেছেন’— জানাল ওরা। ইতিবাচক শনাক্তকরণকে নিশ্চিত করল মোসাদ।

বিকাল সাড়ে ৪টায় বিমান আকাশে ওড়ার কথা জানাল অপারেটিভরা। টেলিফোনে শ্যারনের কাছ থেকে ওটা ধ্বংসের আনুষ্ঠানিক নির্দেশ পেলেন ইভরি। এফ-১৫ বিমানে পাইলটদের ওড়ার নির্দেশ দিলেন তিনি। শ্লথ ট্রান্সপোর্ট প্লেনের নাগাল পেতে মোটেও বেশি সময় লাগবে না।

জেটবিমানগুলো কাছাকাছি যাওয়ার মুহূর্তেও সন্দিহান ছিলেন ইভারি। সহকারীকে ফের মোসাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে বিমানে আরাফাতের মতো চেহারার কেউ নয়, বরং তারই হাজির থাকার বিষয়টি আবারো নিশ্চিত করার দাবি জানালেন। বিরল ক্ষেত্রেই আবেগের প্রকাশ ঘটিয়ে থাকেন ইভরি। ‘কিন্তু বুঝতে পারছিলাম, তিনি বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে আছেন’— বলেছেন সে সময় উপস্থিত তার একজন কর্মী।

সময় আদায় করার দরকার ছিল ইভরির। তিনি এও জানতেন যে, পাইলটরা অত্যুৎসাহী হয়ে উঠতে পারে। অনেক সময় লক্ষ্যবস্তু নিশানা করে গুলি করার ছুঁতা খোঁজে ওরা, যেমন রেডিও স্ট্যাটিককেই গুলিবর্ষণের নির্দেশ ধরে নিতে পারে। ‘গুলি করবে না’— তাদের মনে করিয়ে দিলেন তিনি। ‘রেডিও কন্ট্যাক্ট না থাকলে একদম গুলি করবে না।’

কী ঘটছে এবং তার নির্দেশ মানা হলো কিনা জানতে বারবার ফোন করছিলেন ইতান। এমনকি সিসেরা অপারেটিভরা মানুষটি আরাফাত হওয়ার ব্যাপারটি বারবার নিশ্চিত করলেও প্রতিবার একই জবাব দিয়েছেন ইভারি। ‘রাফুল’— ইতানের ডাকনাম ব্যবহার করে বলেছেন ইভরি, ‘আমরা এখনো চূড়ান্ত নিশ্চয়তা পাইনি।’

ইভরি আলাদাভাবে মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স ডিরেক্টরেটকে (আমান নামে পরিচিত) ও মোসাদকে ভিজুয়াল আইডেন্টিফিকেশন অপর্যাপ্ত হওয়ার কথা জানিয়ে রেখেছিলেন। আরাফাতের ওই বিমানে থাকার ব্যাপারটা ফের যাচাইয়ের নিশ্চয়তা দাবি করেছেন তিনি। ঠিক তখনই রাডার ব্লিপ পেয়ে গুলিবর্ষণের অনুমতি চাইল পাইলটরা।

বেশিক্ষণ দ্বিধায় ভোগার জো ছিল না ইভরির। সরাসরি নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তাকে। অচিরেই বিমানটিকে ধ্বংস না করলে ইতান ও শ্যারনের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। উত্তেজনা বেড়ে উঠছে। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে।

ঠিক তখন ৫টা বাজার ৫ মিনিট বাকি, ফাইটার আকাশে ওঠার পর ২৫ মিনিট কেটে গেছে, একটা ফোন বেজে উঠল ক্যানারিতে। সরাসরি মোসাদ হেডকোয়ার্টারের সঙ্গে সংযুক্ত সিকিউর লাইন ছিল সেটা। ‘সন্দেহে দেখা দিয়েছে’— বিব্রত সুরে জানাল লাইনের অন্য প্রান্তের কণ্ঠ। মোসাদের অন্যান্য সূত্র গ্রিসের কোথাও আরাফাতের না থাকার ওপর জোর দিয়েছে। বিমানের ওই লোক কিছুতেই আরাফাত হতে পারেন না।

নতুন কোনো নির্দেশ না থাকায় এফ-১৫ বিমান দুটো বাফেলোকে অনুসরণ চালিয়ে যায়। নিজের নির্দেশের পুনরাবৃত্তি করলেন ইভরি। ‘আমরা আরো তথ্যের অপেক্ষা করছি। লক্ষ্যবস্তুর ওপর চোখ রেখে অপেক্ষায় থাকো।’

বিকাল ৫টা ২৩ মিনিটে আরেকটা খবর এল ক্যানারিতে। মোসাদ ও আমানের বিভিন্ন সূত্র বিমানের ওই মানুষটি ফাথি আরাফাত বলে জানাল। ইয়াসিরের মতো চেহারার তার ছোট ভাই। শিশুরোগ চিকিৎসক ও ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা। তার সঙ্গে রয়েছে এক মাস আগে শাবরা ও শাতিলার শরণার্থী শিবিরে ম্যারোনাইট ক্রিশ্চান ফালাঞ্জিস্টদের হত্যাযজ্ঞ থেকে রক্ষা পাওয়া ৩০ জন আহত ফিলিস্তিনি শিশু। চিকিৎসার জন্য ওদের কায়রো নিয়ে যাচ্ছেন ফাথি আরাফাত।

স্বস্তির সঙ্গে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ইভরি। ‘ফিরে এসো’— পাইলটদের নির্দেশ দিলেন তিনি। ‘ঘরে ফিরে এসো।’

১৯৮২ সালের অক্টোবরের সেই দিনটিতে ইভরি সামনে থাকা বিকল্পটি (ইসরায়েল) জাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাসজুড়ে বহু ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের মোকাবেলা করা দ্বিধারই একটি নজির। গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিমালা ও জাতির আত্মরক্ষার সহজাত প্রবৃত্তির ভেতর সহিংস ও অনেক সময় সমন্বয়ের অতীত সংঘাত।

ইসরায়েলে কর্মরত সাংবাদিক হিসেবে আমি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রতিরক্ষা সংগঠনের শত শত লোকের সাক্ষাত্কার নিয়েছি এবং হাজারো গোপন নথি নিয়ে গবেষণা করেছি। তাতে এমনকি ইসরায়েলের কুখ্যাতির পরিপ্রেক্ষিতেও এক গোপন ও বিস্ময়কর ইতিহাস উন্মোচিত হয়েছে। আমি যাদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের অনেকেই তারা কোন কারণে কী করেছেন, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে স্রেফ বাবিলনীয় তালমুদ থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন: ‘কেউ তোমাকে হত্যা করতে চাইলে তুমিই আগে রুখে দাঁড়িয়ে হত্যা করো।’ আমার রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে লক্ষ করেছি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমল থেকে ইসরায়েল পশ্চিমের অন্য কোনো দেশের চেয়ে ঢের বেশি গুপ্তহত্যা ও টার্গেটেড কিলিংয়ের ঘটনা ঘটিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই বেসামরিক নাগরিকের জীবন বিপন্ন করে। তবে দেশের প্রতিরক্ষা কৌশল নিয়ে এক গভীর— এবং প্রায়ই তিক্ত— অভ্যন্তরীণ বিতর্কের দীর্ঘ ইতিহাসও লক্ষ করেছি। কোনো জাতি কি সন্ত্রাসী কৌশল কাজে লাগাতে পারে? এর মাশুল কী? সীমরেখা কোথায়?

লোকজন ক্রমেই মুখ খুলতে চাইছে। উত্তর তেল আবিবের এক কাফেতে জনৈক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে ২০১১ সালে এক সাক্ষাত্কারে প্রথমবারের মতো ১৯৮২ সালে আরাফাতকে বহনকারী ট্রান্সপোর্ট বিমান ধ্বংস করার জন্য শ্যারনের নির্দেশের কথা শুনি। সবিস্তারে সবকিছু বললেও ঘটনা প্রকাশের ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত আরোপ করেন তিনি। প্রকাশের জন্য অন্য একজনকে বর্ণনা দিতে হয়েছে। কেবল এভাবেই এ ঘটনার কথা প্রকাশ করতে পারতাম আমি। ওই লোকের সঙ্গে দেখা করতে গেছি। জানা ছিল, ঘটনার ব্যাপারে মুখ খুলতে তাকে রাজি করানো বেশ কঠিন হবে। আসল কথায় যাওয়ার আগে ঘোরানো কথাবার্তা দিয়ে শুরু করলাম। মূল প্রসঙ্গে আসতেই স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। কিছুটা বিষণ্ন অভিব্যক্তি দেখা দিল তার চোখে-মুখে। ‘৩০ বছরের বেশি সময় ধরে অপেক্ষায় আছি, কেউ এসে আমার কাছে ঘটনার কথা জিজ্ঞেস করবে’— বললেন তিনি।

২০০৪ সালে পরলোকগত ক্যারিশম্যাটিক পিএলও নেতা আরাফাতের মতো আর কোনো লক্ষ্যবস্তুই ইসরায়েলি ঘাতক বাহিনীকে নাকাল, ক্ষুব্ধ ও ফাঁকি দিতে পারেনি। অনেক সময় স্রেফ পালিয়ে গেছেন তিনি। অনেক সময় দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে নিশ্চিত না হওয়ায় বা বেসামরিক নাগরিকদের পক্ষে ঝুঁকিবহুল হয়ে যায় বলে কাজ স্থগিত রেখেছেন। বারবার আরাফাতকে হত্যা করার ইসরায়েলি আকাঙ্ক্ষা কোনো জাতি টিকে থাকার জন্য কী করতে পারে আর কী পারে না, সে বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে গেছে ইসরায়েলকে।

১৯৫৯ সালে আরাফাত পিএলওর পূর্বসূরি ফাতাহ প্রতিষ্ঠা করার সময় মোসাদ তাকে ও তার বন্ধুদের ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী হিসেবে নাকচ করে দিয়েছিল। ১৯৬৫ সাল নাগাদ ফাতাহ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো গেরিলা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম শুরু করলে ইউরোপে মোসাদ অপারেশন্সের প্রধান রাফি (আইডিএফ জেনারেল রাফুল ইতানের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই) মোসাদ ডিরেক্টর মেইর আমিতকে সিসেরাকে ফ্রাংকফুর্টে আরাফাতের অপারেশনাল ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহূত অ্যাপার্টমেন্টে হানা দিয়ে তাকে হত্যার নির্দেশ দিতে বলেছিলেন। ‘অনায়াসেই কাজটা করতে পারি আমরা’— আমিতকে লিখেছিলেন তিনি। ‘টার্গেটের নাগাল পাওয়ার সুযোগ আছে আমাদের। এ সুযোগ আর কখনো পাব না’— ইতানের মতে, সাইন অফ করতে অস্বীকার গেছেন আমিত। তার কাছে দলটাকে তরুণ একটা ঠগের জমায়েত ছাড়া কিছুই মনে হয়নি। ‘ওদের আমার কথা কানে না তোলাটা বড্ড খারাপ ছিল’— অনেক দশক পর আমাকে বলেছেন ইতান। ‘প্রচুর খাটুনি, যন্ত্রণা আর দুঃখ থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারতাম আমরা।’

যদিও শেষতক ইতানের দৃষ্টিভঙ্গিই টিকে গেছে। অনেক বছর ধরে পিএলও নেতাকে হত্যা করাই গোটা ফিলিস্তিনি সমস্যা মেটানোর ক্ষেত্রে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। ‘ইসরায়েলকে অবশ্যই সশস্ত্র সংগঠনগুলোর মূলে আঘাত হানতে হবে’— ১৯৬০-এর দশকে জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরে শিন বেতের অধিনায়ক ইয়েহুদা আরবেল তার ডায়েরিতে লিখেছিলেন। ‘আবু আম্মারের— আরাফাত— ধ্বংস ফিলিস্তিনি সমস্যা সমাধানের একটা পূর্বশর্ত।’

অসংখ্যবার ঠিক এ কাজটাই করতে চেয়েছে ইসরায়েল। অনেক সময় এসবে প্রত্যক্ষ সামরিক তত্পরতাও জড়িত ছিল। ছয়দিনের যুদ্ধের পর পরই আরাফাত পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরে লাগাতার গেরিলা তত্পরতা শুরু করেন। গোপন খবর পেয়ে ইসরায়েলি সেনাদল তার ঘাঁটির একটা বাড়িতে হানা দেয়। কিন্তু মাত্র অল্প কয়েক মিনিট দেরি হয়ে গিয়েছিল। টেবিলের ওপর তার খাবার তখনো গরম ছিল।

কিছু কিছু পরিকল্পনা ঢের বেশি বিশদ ছিল। ‘দ্য মাঞ্চুরিয়ান ক্যান্ডিডেট’ ছবি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ইসরায়েলিরা ১৯৬৮ সালে জনৈক ফিলিস্তিনি বন্দিকে প্রোগ্রামড কিলারে পরিণত করার প্রয়াসে তিন মাস ব্যয় করে। মিশন বাস্তবায়নের জন্য মুক্তি দেয়ার ৫ ঘণ্টার মধ্যেই স্থানীয় পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে নিজের পিস্তল সোপর্দ করে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা আরাফাতকে হত্যার লক্ষ্যে তার মগজ ধোলাইয়ের চেষ্টা করেছে বলে জানায়।

এগুলো ও এমন আরো বহু প্রয়াস ব্যর্থ হয়। সেগুলো ইসরায়েলকে কেবল বিব্রতকর অবস্থায়ই ফেলেনি, বরং নিজের অলৌকিক বেঁচে যাওয়ার কাহিনী উল্লেখের সুবাদে আরাফাতের জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে।

স্বজাতির শ্রদ্ধা নিশ্চিত করার বাইরে আরাফাত দেশে দেশে প্রচুর বন্ধু জোগাড়ের কাজ শুরু করেছিলেন। পূর্ব জার্মান নেতা এরিখ হোনেকার, ফিদেল কাস্ত্রোর মতো সত্যিকারের বিপ্লবী মনে করতেন তাকে। তার গুপ্তচররা ফিলিস্তিনিদের গোয়েন্দা তথ্য ও অস্ত্রশন্ত্রের জোগান দিয়েছে। একই সময়ে সিআইএ এক ধরনের গোপন কায়দায় সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সমর্থিত প্রয়াসে আরাফাতকে লালন করেছে। ১৯৭০-এর দশক শেষ হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে আরফাত যেন ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছেন বলে মনে হয়েছে। বিপুল সমর্থন নিয়ে রাষ্ট্রের ডি ফ্যাক্টো প্রধান ছিলেন তিনি। এ রকম একজন মানুষের প্রকাশ্য হত্যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমস্ত রীতিনীতির বরখেলাপ হয়ে দাঁড়াত। ইসরায়েল চেয়ে চেয়ে দেখেছে আর দাঁত কিড়মিড় করে গেছে।

১৯৭৯ সাল নাগাদ যেন ইসরায়েল ও পিএলও হামলা ও পাল্টা হামলার আপাত অন্তহীন একটা নকশায় জড়িয়ে গিয়েছিল। তার পরই ভয়ঙ্কর এক হত্যাকাণ্ড উত্তেজনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ২২ এপ্রিল ১৯৭৯ পিএলওর সহযোগী একটি গ্রুপ প্যালেস্টাইন লিবারেশন ফ্রন্টের একটি সন্ত্রাসী দল রাবারের নৌকায় চেপে লেবানিজ সীমান্ত থেকে ছয় মাইল দক্ষিণ নাহারিয়া সৈকতে নামে। চার সদস্যের একজন ছিল সামির কান্তার। তখন তার বয়স ছিল ১৬ বছর। জোর করে একটা বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা চালাতে গিয়ে তাদের আটকে প্রয়াসী এক পুলিশকে হত্যার পর ভয় পেয়ে পালানোর সময় একটা অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে ড্যানি হারান ও তার মেয়ে চার বছর বয়সী এইনাতকে জিম্মি করে ওরা। টেনে-হিঁচড়ে সৈকতে নিয়ে যায় ওদের। আগেই সেখানে সৈনিক ও পুলিশ মোতায়েন ছিল। সশস্ত্র লড়াই বেধে যায়। ড্যানিকে গুলি করে হত্যা করে কান্তার, তারপর এইনাতের মাথায় রাইফেলের বাঁটের ক্রমাগত আঘাতে মেরে ফেলে তাকেও। ড্যানির স্ত্রী স্মাদার তাদের দুই বছর বয়সী মেয়ে ইয়েলকে নিয়ে খাটের নিচে লুকিয়ে ছিল। হানাদাররা যাতে ওদের খোঁজ না পায়, সেজন্য চিত্কার ঠেকাতে ছোট বাচ্চার মুখে হাতচাপা দিয়ে রেখেছিল স্মাদার। ভয়ের চোটে বাচ্চাটাকে মেরেই ফেলে সে।

নাহারিয়া নৃশংসতার পরিপ্রেক্ষিতে আইডিএফ জেনারেল রাফুল ইতান আঞ্চলিক কমান্ডার আভিগদোর বেন-গালকে সহজ একটা নির্দেশ দিন: ‘সব কটাকে মেরে ফেলো’, মানে পিএলওর সব সদস্য ও লেবাননে এ সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত সবাই। ইতানের আশীর্বাদ নিয়ে বেন-গাল স্পেশাল অপারেশনে আইডিএফের সেরা বিশেষজ্ঞ মেইর দাগানকে দক্ষিণ লেবাননে এ প্রয়াসে নেতৃত্ব দেয়ার দায়িত্ব দেন। ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব লেবানন ফ্রম ফরেনার্স গড়ে তোলেন এ তিনজন। বলতে গেলে, সেনাবাহিনীর বাকি অংশ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা সরকারের অজ্ঞাতেই এ অপারেশন চলতে থাকে। (আমি ২০০৪ সালে পরলোকগত ইতানের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলিনি।)

১৯৭৯ ও ১৯৮৩ সালের গোড়ার দিকের মধ্যবর্তী সময়ে এ ফ্রন্ট শত শত লোক হত্যা করে। ডেভিড আগামন আইডিএফের নর্দার্ন কমান্ড স্টাফ ও দাগানের গোপন অপারেশন জানা অল্প কয়েকজনের একজন। ‘লক্ষ্য’ বলেছেন তিনি, ‘কোনো আলামত না রেখে লেবাননে ফিলিস্তিনি ও সিরীয়দের ভেতর গোলমাল বাধানো, ওদের ভেতর অবিরাম হামলার ভেতর থাকার অনুভূতি জাগানো ও নিরাপত্তাহীনতার ধারণা রোপণ করা।’ কাজটা করতে গিয়ে দাগান ও তার কর্মীরা স্থানীয় লেবানিজদের নিয়োগ দেন: ফিলিস্তিনিদের অপছন্দ করে এবং লেবানন থেকে তাদের বিতাড়িত করতে চায় এমন দ্রুজ, ক্রিশ্চান ও শিয়া মুসলিম।

৫ আগস্ট ১৯৮১, প্রধানমন্ত্রী মেনাচিম বেগিন এরিয়েল শ্যারনকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিয়োগ দেন। ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার আগে আন্ডারগ্রাউন্ড আন্দোলনের বীর ছিলেন তিনি। সাবেক জেনারেলের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ছিল তার। ‘সেনাবাহিনীর এক মহান অধিনায়ক’— তাকে বলতেন তিনি। কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মানার বেলায় শ্যারনের ইচ্ছার ব্যাপারে তার মনে ঘোরতর সন্দেহ ছিল। ‘শ্যারন ট্যাংকবহর নিয়ে নেসেটে হামলা চালিয়ে বসতে পারেন’— এর দুই বছর আগেই বেগিনের অন্যতম সহকারী কিছুটা রসিকতার সঙ্গেই বলেছিলেন কথাটা।

দ্রুত দান বাড়িয়ে তোলেন শ্যারন। আরাফাতের দিকে নতুন করে নজর ফেলেন তিনি এবং বেন-গাল ও দাগানকে এমন একটা অপারেশন বাস্তবায়নের সবুজ সংকেত দেন, যেটা বাস্তবায়ন হলে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসই পাল্টে দেবে। ১ জানুয়ারি, ১৯৮২ বৈরুত স্টেডিয়ামে পিএলওর ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানানোর বার্ষিকী পালনের উদ্দেশ্যে নির্মাণাধীন বিশাল মঞ্চের নিচে বিপুল বিস্ফোরণক্ষমতার বোমা পেতে রাখার কথা ছিল অপারেশন অলিম্পিয়ার দায়িত্বে থাকা ইসরায়েলি এজেন্টদের। একটা বোতামে চাপ দিয়েই গোটা ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের ধ্বংস সাধন করবে তারা।

সবকিছু তৈরি ছিল। ডায়াসের নিচে শক্তিশালী বিস্ফোরক এরই মধ্যে পোঁতা হয়ে গেছে, সেই সঙ্গে বিস্ফোরকবোঝাই তিনটা বাহনও ছিল, স্টেডিয়ামের আশপাশে পার্ক করে রাখার কথা ছিল সেগুলো। ডায়াসের বোমা বিস্ফোরণের মিনিটখানেক বাদেই ফাটবে ওগুলো। আতঙ্ক তুঙ্গে থাকার সময় প্রাথমিক বিস্ফোরণ থেকে বেঁচে যাওয়ারা অকুস্থল থেকে পালানোর চেষ্টা করবে। চূড়ান্ত প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ নর্দার্ন কমান্ডের কোনো কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভাষ্যে, ‘এমনকি লেবাননের প্রেক্ষিতেও নজিরবিহীন’ হবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু আমানের একদল উদ্বিগ্ন কর্মকর্তাসহ উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী বেগিনের কাছে গিয়ে দাগানের নির্দেশ রদ করার দাবি জানালেন। ‘আপনি স্রেফ গোটা স্টেডিয়ামভর্তি লোক মেরে ফেলতে পারেন না’— জনৈক কর্মকর্তা বেগিনকে বলার কথা স্মরণ করেছেন। ‘সারা দুনিয়া আমাদের পিছে লাগবে’— অপারেশন বাতিল করে দিয়েছিলেন বেগিন।

ততদিনে শ্যারন আরো বিরাট এক প্রকল্পে হাত দিয়ে বসেছেন। ৬ জুন আইডিএফ ক্ষিপ্রগতিতে লেবাননের সীমান্ত অতিক্রম করে ঢুকে পড়ে। ৭৬ হাজার সৈনিক, ৮০০ ট্যাংক আর দেড় হাজার আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার সজ্জিত এক বাহিনী উত্তরে অগ্রসর হয়ে মাত্র দুই সপ্তাহর ভেতর বৈরুতের পশ্চিমের বিভিন্ন মহল্লায় ভয়াবহ অবরোধ ও বোমাবর্ষণ শুরু করে। এ যুদ্ধকে শ্যারন ইসরায়েলিদের প্রতি হুমকি সৃষ্টিকারী পিএলও আর্টিলারি উচ্ছেদের লক্ষ্যে সীমিত হামলা হিসেবে তুলে ধরেন। কিন্তু আদতে ঢের মারাত্মক লক্ষ্য ছিল তার: ইসরায়েলি বাহিনী লেবানন অধিকার করে ফিলিস্তিনিদের জর্দানে বিতাড়িত করবে। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি অংশ হাশেমিয় রাজ্যের বদলে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। শ্যারনের মতে, এটা পশ্চিত তীরে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ফিলিস্তিনিদের দাবি বানচাল করে দেবে। এভাবে পশ্চিম তীর ইসরায়েলের অংশ হয়ে যাবে। এ অকল্পনীয় পরিকল্পনায় আরো জোরালো জটিল উপাদান ছিল: ইয়াসির আরাফাতকে হত্যা। যেকোনো সন্ত্রাসী সংগঠনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ক্ষয়ক্ষতির মতো একে সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্বাস করতেন শ্যারন।

এ উদ্দেশ্যে সল্ট ফিশ নামে একটা স্পেশাল টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়। শ্যারন তার দুজন স্পেশাল অপস বিশেষজ্ঞ দাগান ও সে সময়ের কাউন্টার টেরোর-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রাফুল ইতানকে এর তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেন। ‘আমার মনে হয়েছে, তাকে কতল করা গেলে ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে যাবে’— আমাকে বলেছেন দাগান। ‘আরাফাত কেবল ফিলিস্তিনিদেরই নেতা ছিলেন না, বরং ফিলিস্তিনি জাতির এক ধরনের প্রতিষ্ঠাতা পিতার মতো ছিলেন। তাকে হত্যা করা হলে পিএলওর অভ্যন্তরে বিপুল অন্তঃকোন্দল শুরু হয়ে যেত, ফলে তাত্পর্যপূর্ণভাবে তাদের পক্ষে কোনো ধরনের কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিঘ্নিত হতো।’

ইসারয়েলি সেনাবাহিনীর অভিজাত কমান্ডো ইউনিট সায়েরেত মাতকালের বিদায়ী প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল উজি দায়ান সল্ট ফিশের দায়িত্ব হাতে তুলে নেন। আমান বৈরুতের বিভিন্ন টেলিফোন এক্সচেঞ্জে আড়িপেতে আরাফাতের চলাফেরার খবর পাওয়ার চেষ্টা চালাতে থাকে। আক্রমণের সবচেয়ে পছন্দের কায়দা হবে বিমান হামলা। ‘খুবই জটিল একটা মিশন ছিল সেটা’— বলেছেন দায়ান। ‘কোনো দালান বা গুহাটা ঠিক জায়গা বুঝতে, ম্যাপে সেটা চিহ্নিত করতে, ঠিকমতো কোঅর্ডিনেট নির্ধারণে, এয়ারফোর্সকে বিমান উড়িয়ে বোমাবর্ষণের জন্য যথেষ্ট সময় দিতে সেসব ওদের কাছে পৌঁছে দিতে, বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়েছে আমাদের।’

৩ জুলাই, ১৯৮২ এক বামপন্থী ইসরায়েলি সাময়িকী সম্পাদক উরি আভনেরি একজন রিপোর্টার ও ফটোগ্রাফার নিয়ে বৈরুতের যুদ্ধরেখা পেরিয়ে শহরের কেন্দ্রস্থলে আরাফাতের সাক্ষাত্কার নিতে হাজির হন। ইসরায়েলে এ সাক্ষাত্কার দারুণ বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। আরাফাতকে দেশের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা হতো, এটা ছিল ইসরায়েলিদের সঙ্গে তার প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক। সল্ট ফিশ টিম ওই তিন সাংবাদিকের অজান্তে আততায়ীদের একটা দলকে আরাফাতের কাছে পৌঁছে দেয়ার সুযোগ কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সল্ট টিমের সদস্যদের ভেতর তর্ক বেধে যায়: ইসরায়েলি নাগরিকদের জীবন বিপদাপন্ন, হত্যা করা কি ঠিক হচ্ছে? উত্তরটা, সিদ্ধান্তে পৌঁছে তারা, হ্যাঁ, ঠিক। কিন্তু মোসাদ হয়তো আভনেরির ওপর নজর রাখছে, সন্দেহ করে বসলেন আরাফাত। তার নিরাপত্তা প্রহরীরা কঠিন পাল্টা হেঁয়ালিময় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। সল্ট টিম দক্ষিণ বৈরুতের রাস্তায় দিশা হারিয়ে ফেলে।

দিনগুলো গড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্যারন ও রাফুল ইতান (আইডিএফ জেনারেল) আরাফাতের একটা ব্যবস্থা নিতে বিমান বাহিনী ও সল্ট টিমের ওপর চাপ বাড়াতে থাকেন। ‘মনের অবস্থাটা ছিল এমন যে, যেন শ্যারনের ব্যক্তিগত কিছু এটা’— বলেছেন ইভরি। ‘আমার মনে হয়েছে, যেন বেসামরিকদের বিপদে ফেলে দেয়ার আশঙ্কাসহ গোলমেলে ছিল ব্যাপারটা।’ উজি দায়ানের অনুভূতিও একই রকম। ‘আরাফাত দুটো কারণে বেঁচে গেছেন’— বলেছেন তিনি। ‘তার অন্তহীন ভাগ্য আর আমি।’

আরাফাতকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু ভাবলেও সেটা বেসামরিক লোকজনকে হত্যার ভেতর দিয়ে নয় বলে মনে করতেন দায়ান। ‘রাফুল ক্রোধে ফেটে যাচ্ছিলেন’— বলে গেছেন দায়ান। ‘আমাকে ফোন করে তিনি বলতেন, ‘আমি জানি, আপনার কাছে অমুক অমুক জায়গার ব্যাপারে তথ্য আছে। আকাশে প্লেন পাঠাচ্ছেন না কেন?’ আমার জবাব হতো, ধারেকাছে প্রচুর লোকজন থাকায় সেটা সম্ভব নয়। রাফুল বলতেন, ‘ওসব ভুলে যান। আমিই সব দায়দায়িত্ব নেব।’ আমি সেটা হতে দিতে তৈরি ছিলাম না।

সম্ভবত এ ধরনের প্রতিরোধের কথা আঁচ করেই ইতান একপর্যায়ে আরো প্রত্যক্ষ ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় এয়ারফোর্স অপারেশন্স ডিপার্টমেন্টের প্রধান আভিয়েম সেলাকে তার সঙ্গে দেখা করতে বলেন। সেলা বিমান বাহিনীর সম্ভাব্য কমান্ডার বিবেচিত প্রতিশ্রুতিশীল কর্মকর্তা ছিলেন।

সেলাকে স্বাগত জানিয়ে ইতান তাকে বললেন পরদিন ক্যানারিতে কাজ করার বদলে ‘একটা সফরে যেতে হবে’।

‘একসঙ্গে আমাদের গতবারের সফরের মতো কিছু?’ মে মাসে আক্রমণের প্রস্তুতি ও আরাফাতকে হত্যা প্রয়াসের ইঙ্গিত দিয়ে জানতে চাইলেন সেলা।

‘অনেকটা সে রকম কিছুই’— জবাব দিলেন ইতান। ‘তবে আকাশ থেকে। আগামীকাল হাটজরে আমার সঙ্গে দেখা করবে।’ এটা দক্ষিণের একটা এয়ারফোর্স বেস। ‘প্লেন চালাবে তুমি, আমি নেভিগেট করব আর কম্ব্যাট সিস্টেম অপারেট করব। বৈরুতে বোমা ফেলতে যাচ্ছি আমরা।’

কথাটা ঠিকমতো শুনতে পাননি বলেই ধরেন নিলেন সেলা। ‘আগাগোড়া পাগলামি ছিল সেটা’— আমাকে বলেছেন তিনি। ‘রীতিমতো ঝাঁকুনি খেয়েছিলাম। অন্য কেউ যদি আমাকে বলত যে, আদৌ বিমানচালক নন যিনি, সেই চিফ অব স্টাফ পরিবর্তনের খাতিরে বৈরুতে বোমা ফেলার সময় এয়ারফোর্স অপারেশন্স ডিপার্টমেন্টের প্রধানের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন, কস্মিনকালেও বিশ্বাস করতাম না।’

পরদিন হাটজরে মিলিত হলেন ওরা। একটা এফ-ফোর ফাইটারে চেপে অন্য তিনটি প্লেনসহ পশ্চিম বৈরুতের এক অফিসের ওপর বোমা ফেলতে রওনা হয়ে গেলেন। সেখানে সল্ট ফিশর অপারেটিভদের তথ্যমতে, একটা সভায় যোগ দেয়ার কথা ছিল আরাফাতের। ‘নিজের নেভিগেশন চালিয়ে গেছি আমি,’ বলেছেন সেলা।  ‘গোলাবারুদের দিকটা রাফুল দেখেছেন, এখনকার বিচারে খুবই আদিম পর্যায়ের ছিল সেসব। লক্ষ্যবস্তুর ওপর দুই দফা বোমা হামলা চালালাম, তারপর নিশানা ভেদ করেছি কিনা দেখতে তৃতীয় দফা। বেশ খুশি ছিলেন রাফুল। আমরা ইসরায়েলে ফিরে আসি।’ সময়ের কারণে ফের বেঁচে যান আরাফাত। তিনি পৌঁছার সামান্যই আগে পড়েছিল বোমাগুলো।

অবশ্য আরাফাতকে হত্যায় শ্যারনের ইচ্ছায় কখনই ভাটা পড়েনি। বৈরুতের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পিএলও নেতারা ও তাদের বাহিনী প্রত্যাহূত হলে শ্যারন ও ইতান ‘স্রেফ তাকে হত্যা করতে রীতিমতো অস্থির হয়ে গিয়েছিলেন’— বলেছেন আমোস গিলবোয়া। তখন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও আমানের গবেষণা বিভাগের প্রধান ছিলেন তিনি। শ্যারনের দল তখন বুঝতে পেরেছিল যে, প্রকাশ্য হত্যা আরাফাতকে শহীদে পরিণত করবে। অটল শ্যারন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে পিএলও নেতাকে সরিয়ে দেয়ার আরো সূক্ষ্ম কৌশলের তালাশ করার নির্দেশ দিয়েছেন। অপারেশন সল্ট ফিশ পরিণত হয়েছিল অপারেশন গোল্ডফিশে। কিন্তু মিশন একই রয়ে গেছে। এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন শ্যারন। প্রতিদিনই গোল্ডফিশ টিম গিলবোয়ার অফিসে জড়ো হতো। ‘আমাদের হাতে হাজার গুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ শত শত বিষয় ছিল’— স্মৃতিচারণ করেছেন গিলবোয়া। কিন্তু জোর করেছেন শ্যারন।

এমনকি অক্টোবর ১৯৮২-এর বিপর্যয়ও— একজন ভীতসন্ত্রস্ত পাইলটের হাতে একটা ফ্লাইট ক্রু, একজন ডাক্তার ও ৩০ জন আহত শিশুকে হত্যার করার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার সেই ঘটনা— শ্যারনের হাতকে দুর্বল করেনি বা আকাশে আরাফাতকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার ধারণা থেকে সরিয়ে আনতে পারেনি। আসলে আরো বেপরোয়া হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। মোসাদ যখন জানাল যে, আরাফাত প্রায়ই নিজের ও সহকারীদের জন্য গোটা প্রথম শ্রেণী বা বিজনেস ক্লাস কেবিন ভাড়া করে বাণিজ্যিক বিমানে চলাফেরা করছেন, শ্যারন এ ধরনের ফ্লাইটগুলো বৈধ লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে স্থির করলেন। উপকূল থেকে বহু দূরে খোলা সাগরে গুলি করে বিমান ধ্বংস করতে হবে, যাতে উদ্ধারকারীরা ধ্বংসাবশেষের খোঁজ পেয়ে ক্ষেপাণাস্ত্রের কারণে নাকি ইঞ্জিন বিকল হওয়ায় বিমান ক্র্যাশ করেছে স্থির করতে অনেক সময় লেগে যায়। উদ্ধারকাজ আরো কঠিন করে তুলতে গভীর জলই বেশি পছন্দের ছিল।

বিমান বাহিনী বিশদ পরিকল্পনার ছক কষেছিল। তারা ভূমধ্যসাগরের ওপর এমন একটা এলাকা চিহ্নিত করে, যেখানে বাণিজ্যিক বিমানের আনাগোনা থাকলেও কোনো দেশের তরফে অবিরাম রাডার কাভারেজ ছিল না। তাছাড়া সাগরের গভীরতা তিন মাইল হওয়ায় উদ্ধার তত্পরতা নিদারুণ কঠিন, এমনিক অসম্ভব হয়ে দাঁড়াত। এ আদর্শ জায়গায় আক্রমণ পরিচালনার মানে অবশ্য ছিল সুযোগের সংকীর্ণ সম্ভাবনা।

ইসরায়েলি আকাশসীমা থেকে বহু দূরে হওয়ার কারণে অপারেশনটা ইসরায়েলের রাডার ও রেডিও আওতার বাইরে ঘটবে বলে বিমান বাহিনীকে রাডার ও কমিউনিকেশন্স সরঞ্জাম সজ্জিত একটা বোয়িং ৭০৭-এ এয়ারবোর্ন কমান্ড পোস্ট স্থাপন করতে হয়েছিল। এ এয়ারক্র্যাফট থেকে সেলারই অপারেশনে নেতৃত্ব দেয়ার কথা ছিল।

শ্যারনের প্রত্যক্ষ নির্দেশে আরাফাতের ওপর অব্যাহত নজরদারি চালানো হচ্ছিল। চারটি এফ-সিক্সটিন ও এফ-ফিফটিন ফাইটারকে ইন্টারসেপশন অ্যালার্ট অবস্থায় রাখা হয়েছিল। ১৯৮২ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৮৩ সালের জানুয়ারি অবধি নয় সপ্তাহ সময়ে এ বিমানগুলো কমসেকম পাঁচবার কথিত আরাফাতকে বহনকারী বিমান ধ্বংস করার জন্য আকাশে উড়াল দিয়েছে, কিন্তু টেকঅফের অল্প পরই আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে সেগুলোকে।

এসব অপারেশনের ক্ষেত্রে গিলবোয়া বারবার জোরালো বিরোধিতার কথা তুলে ধরেছেন। ‘আমার কাছে এটা স্পষ্ট ছিল যে, এয়ারফোর্স যতদূর সম্ভব সুন্দরভাবেই কাজটা সারতে পারবে’— বলেছেন তিনি। ‘কিন্তু বাড়তি দায়িত্ব ছিল আমার।’ প্রতিটি অপারেশনের রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন গিলবোয়ার কাজ ছিল। ‘চিফ অব স্টাফ ইতানকে আমি বলেছিলাম, আমরা একটা সিভিলিয়ান বিমান ধ্বংস করেছি জানাজানি হলে সেটা আন্তর্জাতিক মহলে জাতিকে ধ্বংস করে দিতে পারে।’

একবার ভূমধ্যসাগরের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া একটা বাণিজ্যিক বিমান আরাফাতকে বহন করে আম্মান থেকে তিউনিসিয়ায় নিয়ে যাচ্ছে ভেবে ইসরায়েলি জেটবিমানগুলো ছুটে যাওয়ার সময় গিলবোয়াকে তাদের লক্ষ্যবস্তু সত্যি ওই বিমানে আছে বলে মনে করেন কিনা জিজ্ঞেস করেছিলেন ইতান। ক্যানারির অভ্যন্তরে সেন্ট্রাল স্পেসে ছিলেন ওরা।

‘চিফ অব স্টাফ, আপনি কি সত্যিই আমার ধারণার কথা শুনতে চান?’ জিজ্ঞেস করেছেন গিলবোয়া। মাথা দুলিয়েছেন ইতান।

বুকের ভেতর হূিপণ্ডের লম্ফনের শব্দ যেন শুনতে পাচ্ছিলেন গিলবোয়া। প্রথমে ওই বিমানে আরাফাতের থাকার সব সম্ভাবনার বিশদ বিবরণ দেয়ার পর ওটায় তার না থাকার কারণগুলো তুলে ধরে বিরত রেখেছিলেন তাকে।

অধৈর্য হয়ে পড়েছিলেন ইতান। ‘গিলবোয়া’— গর্জে উঠেছেন তিনি। ‘হ্যাঁ কিংবা না?’

‘আমার মন বলছে’— বলেছেন গিলবোয়া, ‘ওই প্লেনে তিনি নেই।’

ঘুরে দাঁড়িয়ে কামরার একপাশে রাখা লাল সিকিউর টেলিফোনের দিকে এগিয়ে গেছেন ইতান। শ্যারনকে বলেছেন, আরো একটা দিনের জন্য অপারেশন স্থগিত রাখতে হবে।

আরেকবার এয়ারফোর্স বোয়িংয়ের ফ্লাইং কমান্ড পোস্টের রেডিওগুলো গোটা অপারেশনকে অসম্ভব করে তুলতে যোগাযোগরুদ্ধ করে ভুল ফ্রিকোয়েন্সিতে স্থির রাখা হয়েছিল। আরেক ঘটনায় সেলা লক্ষ্যবস্তু বিমান শনাক্তকরণে অনেক দেরি হয়ে গেছে এবং আক্রমণ ধরা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে স্রেফ ভুল বুঝিয়েছেন ইতানকে। অন্যান্য ঘটনায়, ‘আমরা কেবল কী ঘটেছে জানাজানি হবে না, এমন জায়গা থেকে বিমান দূরে চলে যাওয়া পর্যন্ত সময় ক্ষেপণ করেছি।’ শেষ পর্যন্ত শ্যারনের ইচ্ছাকৃত যুদ্ধাপরাধের পরিকল্পনা তার নিজস্ব বিবেকহীনতার কারণে পথচ্যুত হয়। ইসরায়েলি জনগণ ও বিপুল আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে বেগিন বৈরুত শরাণার্থী শিবিরে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের তদন্তের জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনে বাধ্য হন। কমিশন ফালাঞ্জ মিলিশিয়াই হত্যাযজ্ঞের জন্য প্রত্যক্ষভাবে দায়ী ছিল বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছে, কিন্তু শ্যারনসহ অন্য ইসরায়েলিদের জবাবদিহির আওতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে বলেও সিদ্ধান্তে দেয়। কারণ নৃশংসতা দেখানোর সুযোগ থাকায় ফালাঞ্জদের সংগঠনটিকে কাজে লাগানোর ব্যাপারটা পরিষ্কার ছিল। প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন শ্যারন। ‘ধীরে ধীরে এ সচেতনতা গড়ে ওঠে যে, আরাফাত একটি রাজনৈতিক বিষয় ছিল’— বলেছেন গিলবোয়া, ‘তাকে অবশ্যই গুপ্তহত্যার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে দেখা যাবে না।’

অবশ্যই এ ধাক্কা সামলে নিয়ে ২০০১ সালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন শ্যারন। জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসনের সঙ্গে ক্রমে তার একটা সমঝোতা গড়ে ওঠে। এ সমঝোতার অধীনে দেশের ইতিহাসে টার্গেটেড কিলিংয়ের বিশাল অভিযানে নামলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়ে যাবে। শ্যারন অধিকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চলগুলোয় বসতি স্থাপন বন্ধ করবেন। আরাফাতকে দূরে সরিয়ে রাখা হবে।

অভিযানে কাজ হয়েছে বলে মনে হয়েছে। হামাস যুদ্ধবিরতি চায় ও আত্মঘাতী বোমারু পাঠানো বন্ধ করে। তবে শ্যারনও পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে গেছেন। প্রথমবারের মতো ফিলিস্তিনিদের সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান বিবেচনা করতে শুরু করেছিলেন তিনি। ‘শ্যারন যখন বুঝতে পারলেন যে, বসতিগুলো সুবিধার চেয়ে বরং বোঝা’— বলেছেন শ্যারনের চিফ অব স্টাফ ও ঘনিষ্ঠ পরামর্শক দোভ ওয়েইসগ্লাস, ‘সেগুলো উচ্ছেদ করে বসতিকারীদের দিকে পেছন ফেরা তার জন্য আদৌ সমস্যা হয়নি।’ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ শ্যারন ‘শান্তিকামী হয়ে ওঠা রণক্লান্ত জেনারেল হিসেবে মঞ্চ ত্যাগ করতে চেয়েছেন।’

একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সৃষ্টি ঠেকানোর কোনো উপায় নেই, এটা মেনে নিতে রাজি হয়েছেন শ্যারন। কিন্তু তা এর নেতার প্রতি তার ঘৃণা এতটুকু কমায়নি। ইসরায়েলে আরাফাতের মোকাবেলা করার কৌশল নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছিল। বহু পরামর্শই দেয়া হয়েছে: কোনো বিরান দ্বীপে নির্বাসিত করা হোক তাকে, ইন্টারনেটে তার বিব্রতকর ভিডিও প্রচার করা হোক, তার অফিস থেকে উদ্ধার করা সন্ত্রাসীদের কাছে অর্থ স্থানান্তর-সংক্রান্ত বিভিন্ন দলিল ফাঁস করা হোক। গোয়েন্দা সংস্থা ও সেনাবাহিনীর কোনো কোনো প্রধান এবং কেবিনেটমন্ত্রীরা তখনো তাকে হত্যা করা উচিত বলে মনে করছিলেন।

কিন্তু, তারপর সহসা অসংখ্যবার মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়েছিলেন যে মানুষটি, সেই আরাফাত স্ট্রোকে পর্যবসিত এক রহস্যময় সংক্রমণের কাছে পরাস্ত হলেন। ১১ নভেম্বর, ২০০৪ তারিখে ৭৫ বছর বয়সে মারা যান তিনি। আজো ফরেনসিক মেডিসিন এক্সপার্ট ও ল্যাবরেটরির প্রধানদের ভেতর মৃত্যুর কারণ এবং আরাফাতের পোশাক ও দেহাবশেষে গুপ্তহত্যায় ব্যবহূত তেজষ্ক্রিয় পদার্থ পোলেনিয়াম পাওয়া গেছে কি যায়নি, তা নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে। ইসরায়েলি মুখপাত্ররা স্পষ্ট ভাষায় আরাফাতের মৃত্যুর সঙ্গে তাদের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে গেছেন।

২০১৬ সালে ক্যান্সারের কাছে পরাস্ত হয়ে মৃত্যুর আগে আমাদের শেষ কথোপকথনের একটিতে মেইর দাগান আরাফাতকে হত্যার জন্য কেন জীবনের একটা বিরাট অংশ খরচ করেছেন, তার ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন, যেখানে তাকে হত্যা করলে তার দেশের সামনে দাঁড়ানো বিরাট সমস্যার খুব একটা ফয়সালা হবে না। ‘শ্যারন আরাফাতকে খুনি মনে করতেন। ইহুদি ঘাতক’— বলেছেন তিনি। ‘শ্যারন স্বয়ং যথেষ্ট কঠিন মানুষ ছিলেন, একেবারেই উদাসীন এবং অনেক সময় রীতিমতো বেজন্মাও। কিন্তু প্রতিটি সন্ত্রাসী হামলার ক্ষয়ক্ষতিকে ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছেন। এমন কিছু ব্যাপার আছে যে, স্রেফ উড়িয়ে দেয়া যায় না।’