মূল: সালমান রুশদি । অনুবাদ: আলম খোরশেদ

এক ছিল ছোট মেয়ে নিকারাগুয়ার

হাসিমুখে হয় এক জাগুয়ার সওয়ার।

যুগল ভ্রমণ শেষ হলে পর

মেয়েটিকে নিয়ে পেটের ভেতর,

মিটি মিটি চোখে দেখো হাসে জাগুয়ার।

নিকারাগুয়ায় আমার শেষ রাতটি ছিল উষ্ণ ও তারাখচিত। আমি সেটা প্রধানত সাহিত্যের গল্প করে কাটিয়েছিলাম তুলিতা ও সের্হিও রামিরেসের বাড়িতে। আমি শুনেছিলাম লা প্রেন্সার ‘সাহিত্যিক পুরোহিত’ পাবলো আন্তোনিও কুয়াদ্রা, বিপ্লবের বিরুদ্ধে থাকা একমাত্র উল্লেখযোগ্য নিকারাগুয়ান কবির রচনাবলির একটি সংগ্রহ প্রকাশ করছে রাষ্ট্র পরিচালিত, নবনিকারাগুয়ান প্রকাশনী; না, সেখানে বইয়ের ব্যাপারে কোনো ধরনের সেন্সর প্রথা ছিল না। (সেসব প্রায়ই বিক্রিও হতো ভালো, ১০ হাজার কপি নিমেষেই নিঃশেষ হয়ে যেত। নিকারাগুয়ার জনসংখ্যার ২০ গুণ বেশি লোকের দেশ ব্রিটেনের লেখকরা এ সংখ্যাকে ঈর্ষা করতেন নিঃসন্দেহে।)

সোমোসার আমলে গোটা নিকারাগুয়ায় কোনো প্রকাশনা সংস্থা ছিল না। নিকারাগুয়ান লেখকদের প্রকাশিত হওয়ার একমাত্র পথ ছিল স্প্যানিশভাষী অঞ্চলের অন্যত্র কোনো প্রকাশনার মাধ্যমে বই প্রকাশ করে সেগুলো স্বদেশে আনার ব্যবস্থা করা, যদি সম্ভব হয়। সেই পশুর আমল থেকে ৪৬ বছরের ভয়ের রাজত্ব থেকে অবস্থার কতটা উন্নতি হয়েছে, এটি ছিল তার আরেকটি স্মারক। 

সের্হিও রামিরেসের দারুণ উপন্যাস দে দিও মিয়েদো লা সাংগ্রে?, যার অর্থ ‘তুমি কি রক্ত দেখে ভয় পেয়েছিলে?’ নেয়া হয়েছিল একটি শিশুতোষ ছড়া থেকে (‘তোমার মা কি শূকরটিকে মেরেছিল? তুমি কি তার রক্ত দেখে ভয় পেয়েছিলে?’)। ইংরেজি শিরোনাম ‘টু বারি আওয়ার ফাদার্স’ কথাটি নেয়া হয়েছিল আরিস্তোফানেসের দ্য বার্ডস থেকে:

‘সারসের জন্ম হয়েছিল আর সব প্রাণীর, এমনকি পৃথিবীরও জন্মের আগে। তার বাবা অসুখে মারা গিয়েছিল, যখন পৃথিবীরও অস্তিত্ব ছিল না। পাঁচদিন ধরে তাকে সমাহিত করা হয়নি। তখন সারস প্রয়োজনের তাগিদে নিজের হাতে তার বাবাকে কবর দিয়েছিল।’

নিকারাগুয়ায় ঘুরে বেড়ানোর সময়টাতে বইটি আমার সঙ্গে ছিল। এর পটভূমি সান্দিনোর আমলের, অনেকগুলো পরস্পর সংযুক্ত গল্প বলে তা, যেগুলোর একটিকে আরেকটির সঙ্গে দারুণ দক্ষতায় বুনে দেয়া হয়েছিল: তিন বন্ধুর গল্প, তিনজন বিপ্লবী, তালেনো, হিলগেরো ও ইন্দিও লারিয়োস, যে নিকারাগুয়ার সবচেয়ে ‘ঈপ্সিত’ ব্যক্তি হিসেবে কুখ্যাত হয়, যদিও খুব বেশি কিছু সে করেনি, গুয়াতেমালায় বসে বাচ্চাদের পার্টির জন্য পিনিয়াতা তৈরি করা ছাড়া, যুদ্ধের জন্য তার স্পৃহা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল; ন্যাশনাল গার্ডের কর্নেল কাতালিনো লোপেস ও আরো অসংখ্য সাধারণ লোকের গল্প; বারম্যান, বারের খদ্দের, গিটারবাদক, জেলে, বিশ্বাসঘাতক, বেশ্যা ইত্যাদি। এতে পালা করে দেখানো হয়েছে জঘন্য সব ঘটনা, যেমন লাঠির আগায় করে সান্দিনোর জেনারেল পেদ্রো আলতামিরানোর মাথাকে মানাগুয়ায় আনা এবং হাস্যকর রকম বিশ্রী কাজ, ১৯৫৩ সালের মিস নিকারাগুয়া প্রতিযোগিতার আয়োজন। আর এ সবকিছুর পেছনেই ছিল সেই অদৃশ্য স্বৈরাচারের দুষ্ট উপস্থিতি, যাকে কেবল এল ওম্র্বে বলে সম্বোধন করা হচ্ছিল। মনে মনে কিংবা স্মৃতির মধ্যে পূর্বপুরুষকে সমাহিত করার মধ্যে তাদের অমরত্ব দেয়ার একটা ব্যাপার ছিল, যে একমাত্র ধরন, মানুষেরা একে অন্যকে দিতে পারত। অবশ্য এ স্মৃতিও তাদের সারা জীবন তাড়া করে ফিরত।

বইয়ের শুরুতে ব্যবহূত আরিস্তোফানেসের উদ্ধৃতিটি আমাকে আকৃষ্ট করে, পৃথিবীর অস্তিত্ব ছিল না তখন। এখানে আমি ভাবি, উরিয়েল মোলিনার আঁকা সোমোসার নিকারাগুয়াকে বন্দি হিসেবে, নির্বাসিত হিসেবে দেখানোর প্রতিধ্বনি ছিল। আরিস্তোফানেসের উদ্ধৃতির নিকারাগুয়ান অর্থ একটাই হতে পারে, সে সময় দেশটা সেখানে ছিল না। ভূমিহীন, জাতিহীন, মানুষেরা নিজেদের পিতাদের নিজ হাতে কবর দিত নিজেদের মধ্যে। কেননা নিজ সত্তাটুকুই ছিল একমাত্র ভূমি, যার ওপর তারা দাঁড়াতে পারত।

আমি যেহেতু সদ্য বইটি পড়া শেষ করেছি, আমি রামিরেসকে সেসব প্রশ্নই করা শুরু করলাম, লেখকেরা যা ঘৃণা করেন: ‘কতটা বাস্তব এর কাহিনী? চরিত্রগুলোকে কি জীবন থেকেই নেয়া হয়েছে?’, ‘এরা সব সত্য’— তিনি বলেন। ‘উপন্যাসের প্রতিটা জিনিস সত্যিকারের ঘটনা থেকে আসা।’ বইটা লেখার আগে রামিরেস সান্দিনোর আমল সম্পর্কে কয়েক বছর ধরে পড়াশোনা করেন। ‘সেখানে সত্যি সত্যি ইন্দিও লারিয়োসের মতো একজন ছিল’— তিনি বলেন। ‘সবসময় অনুসন্ধান তালিকার সবার উপরে, অথচ তিনি নিকারাগুয়াতেই ছিলেন না, তার মাথাও খারাপ ছিল। আর সত্যিকারের কাতারিনো লোপেস ছিল সোমোসা গার্সিয়ার একজন চামচা, বাস্তবের মানুয়েল গোমেস। তবে হিলগেরো ও অন্যদের থেকে তিনি যে মার খান (উপন্যাসে তিন বিপ্লবী ন্যাশনাল গার্ডের কর্নেলকে বন্দি করে প্রচুর হেনস্তা করেন।) সেটা ঘটেছিল আরেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে। লোকেরা এমন ইঙ্গিত দিত যে, তাকে বলাত্কারও করা হয়েছিল।’

‘আপনি উপন্যাসে কখনো পরিষ্কার করে বলেন না, কাতারিনোকে কী করা হয়েছিল।’

‘অনেক সম্ভাবনাই ছিল’— আয়েশ করে বলেন রামিরেস। ‘আমি একটাকে বেছে নিতে চাইনি। আর অন্য যে বিষয়টা খুবই সত্য ছিল সেটা হলো, তিনি বলে চলেন, ‘এই মিস নিকারাগুয়ার কাণ্ডটা।’ জনৈকা মিস বেরমুদেস, একজন গুয়ার্দিয়া অফিসারের কন্যা, এ শিরোনামের এক প্রার্থী ছিল, যার বিরুদ্ধে ছিল মিস মোরালেস না রোসালেস কী যেন। ভোট দেয়ার জন্য আপনাকে খবরের কাগজের একটা কুপন কেটে নিতে হতো। তার পৈতৃক পরিচয়ের কারণে মিস বেরমুদেসের প্রার্থিতার সঙ্গে সরকারের একটা সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে গিয়েছিল। তাই লোকেরা তার বিরোধীকে ভোট দেয়া শুরু করে। এল ওম্ব্রের কানে যখন এ কথা যায়, তখন তিনি জোর দিয়ে বলেন, যেকোনোভাবেই হোক মিস বেরমুদেসকে জেতাতে হবে। তার অধস্তনরা অসংখ্য নকল ফর্ম ছাপিয়ে নিজেরা সেগুলো পূরণ করে বেরমুদেসকে ভোট দেয়। পুরো ব্যাপারটাই একটা রাজনৈতিক ক্রীড়া হয়ে ওঠে। ফলাফল ঘোষণার দিনে জানানো হয় যে, মিস বেরমুদেস সামান্য ব্যবধানে জিতেছেন। ‘অবশ্যই সবাই জানত যে, এটা সাজানো’— সের্হিও বলেন। ‘কেউই তার জন্য ভোট দেয়নি, শত হলেও। সে খুব ভালাভাবেই হারত। ফলে এটা নিয়ে খুব হইচই হয়েছিল। এমন মজাদার একটা ঘটনাকে ব্যবহার না করে থাকতে পারিনি আমি।’

অনেক বছর ধরেই তাকে ঔপন্যাসিক বলা হলে তিনি এক রকম জালিয়াত মনে করতেন নিজেকে। ‘আমি সেই বইটা লিখেছিলাম অনেক আগে, এরপর কেবল রাজনৈতিক লেখাই লিখেছি। আমার মনে হচ্ছিল আমি আমার পুরনো পুঁজি ভাঙিয়ে খাচ্ছি’— তবে এখন তিনি নতুন একটি উপন্যাস লিখছেন, প্রতিদিন ২ ঘণ্টা করে লেখেন, খুব ভোরে। ‘এটা এমন একটি বই, যা কেউ ভাবেনি আমি লিখব’— তিনি আনন্দচিত্তে বলেন। এটা একটা হত্যারহস্য, কয়েক বছর আগের একটি মামলা অবলম্বনে লেখা। খুবই উত্তেজক বিষয়।

তার সেই রসালো গল্পখানি নিয়ে তাকে খুব প্রীত দেখাচ্ছিল। ‘আমি একটি খসড়া শেষ করেছি’— তিনি বলেন। ‘এটা লিখতে তিন বছর লেগেছে এবং আমি কোনো উপরাষ্ট্রপতিও ছিলাম না।’

গ্রান্ড হোটেলের ধ্বংসস্তূপে দেখা সেই অসহ্য সুন্দরী কবি জ্যোকোন্দা বেল্লি, তার জার্মান প্রকাশক ও ফটোগ্রাফার সহকারে আসেন। আমি তাকে জানাই যে, মার্গারেট র্যান্ডালের সঙ্গে তার সাক্ষাত্কারটি আমি পাঠ করেছি। ওহ, তিনি বলেন, ‘আমি তারপর আমার মত পাল্টে ফেলেছি পুরোপুরি।’ তখন তিনি তার লেখালেখি সব বাদ দিয়ে জাতি গঠনের কাজে মনোনিবেশের পক্ষে ছিলেন। ‘আমি এখন আমার কাজ বাদ দিয়ে উপন্যাস লিখতে বসেছি’— তিনি বলেন। ‘এটি আমার প্রথম ভয় পাইয়ে দেয়া কাজ।’

আমি বলি, এই কবি অধ্যুষিত দেশে তুলনামূলকভাবে কম ঔপন্যাসিকের সংখ্যাটা আমার মনে প্রশ্ন জাগায়। ‘উপন্যাস লেখার কোনো সময়ই ছিল না কোনোদিন আমাদের’— তিনি বলেন। ‘আপনি অন্যান্য কাজের মধ্যে কবিতাকে গুঁজে দিতে পারেন। উপন্যাস নয়।’

অর্থাৎ অন্য অনেক কিছুর অভাবের মাঝেও সম্প্রতি একটা পণ্যের খানিকটা আধিক্য দেখা যাচ্ছিল: সময়। অথবা, হয়তো লোকেরা ভাবছিল, এটাও বুঝি ফুরিয়ে যাবে। ফলে বেশি দেরি না করে যতটুকু বাকি আছে সেটাকেই আঁকড়ে ধরছিল? ফটোগ্রাফার জ্যোকোন্দাকে গ্রাস করে ফেলছিলেন, সম্ভাব্য সব কোনা থেকেই তার ছবি তুলে যাচ্ছিলেন। ‘তা ভ্রমণ কেমন ছিল?’ তিনি জিজ্ঞাসা করেন।

‘আমিও চটজলদি কিছু ছবি তুলে নিয়েছি মাত্র’— আমি বলি। ‘কয়েক সপ্তাহে এর চেয়ে বেশি আর কিছু করা যায় না।’

জ্যোকোন্দার দ্রুতচিত্র: সোমোসার সময়, ফ্রেন্তে দ্বারা নিয়োগ পাওয়ার পর তিনি মানাগুয়ার একটি বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানে কপি লেখার কাজ করতেন। আমার সময়ে আমি নিজেও সেটা করেছি, তাই বলি: ‘খুব ভালো। লজ্জাকর অতীতবিশিষ্ট আরেকজনকে পাওয়া গেল।’ বিজ্ঞাপন মালিক তাকে নিয়ে কোনো সন্দেহ করেননি। তারপর সেই দিন আসে, যখন তিনি জানতে পারেন যে, কর্তৃপক্ষ তাকে পাকড়াও করতে আসছে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি একটি গোপন পথে দেশত্যাগ করে কোস্টারিকায় চলে যান। দুদিন বাদে গুয়ার্দিয়ারা বিজ্ঞাপনী সংস্থায় আসে তাকে গ্রেফতার করার জন্য। তার প্রাক্তন সহকর্মীরা গভীরভাবে মর্মাহত হয়: জ্যোকোন্দা? অসম্ভব, কী সুন্দর আর ভালো মেয়েই না ছিল সে। বিক্রেতার নিষ্কলুষতা, তিনি বলেন। এটাই তাঁকে কয়েক বছর নিরাপদ রাখে।

বিদায় নেয়ার সময় আচমকা আমি আবিষ্কার করি যে, জ্যোকোন্দা বেল্লি ও সের্হিও রামিরেস দুজনই যে ইংরেজ ঔপন্যাসিককে প্রশংসা করতেন, তিনি হলেন লরেন্স ডারেল। ‘আমি জীবনেও এটা ধারণা করতে পারতাম না’— আমি বলি।

‘আমি জানি, ইংল্যান্ডে তার সম্পর্কে কোনো কথা বলা হয় না’— জ্যোকোন্দা বলেন, যিনি কিছুকাল সাফোকে কাটিয়েছিলেন। ‘হয়তো বা তিনি ইংরেজদের জন্য অতি-অনিংরেজ’— সের্হিও বলেন, তিনি ডারেলকে প্রশংসা ও তার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন অনেক আগে থেকেই। ‘এখন আমি তাকে আবার পড়ার সাহস পাই না’— তিনি বলেন, ‘যদি আর আগের মতো না লাগে।’

অই কথার উপরেই আমি শুভরাত্রি বলি।

‘আবার আসবেন’— সের্হিও রামিরেস বলেন। ‘আপনার কি মনে হয়, আপনি আবারো আসবেন?’ ‘আমি ফিরে আসব।’

নিকারাগুয়া ভ্রমণের পুরোটা সময় সব গান আর কবিতার মধ্যেও আমি সেই নিকারগুয়ার বাচ্চা মেয়ে, তার জাগুয়ারে চড়া ও রূপান্তরিত হাসিটুকুর লিমেরিকটি নিয়ে খুব ধন্দের মধ্যে ছিলাম। মাঝেমধ্যে খুব রাগ হতো আমার এর ওপর, কিছুতেই ভুলতে না ওেয়া একটি ছড়াগানের মতো। সেই শেষ রাতে, এটি আমার স্বপ্নে হানা দেয়, বলা যায় সেই হাসিটা, জাগুয়ারের মুখের সেই হাসিটা, তবে সেখানে কোনো মুখ ছিল না। আমি একটি আকারবিহীন, ক্রমপাল্টানো নিসর্গের মধ্যে সেই হাঁ-করা মুখের দ্বারা তাড়িত হচ্ছিলাম, যাকে অনেকটা সেই চেশায়ার বিড়ালের হাসির সঙ্গে তুলনা করা যেত, যদি তার লম্বা দাঁত বাঁকানো ও অতিনাটকীয়ভাবে রক্তে রঞ্জিত না হতো। আমার স্বপ্নে আমার জীবন নিয়ে আমি পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম জাগুয়ারের সেই হাসির তাড়া খেয়ে।

আমি দুঃস্বপ্ন, ঘাম ও লিমেরিকের এক তালগোল পাকানো পিণ্ডের মাঝখানে জেগে উঠি। জাগ্রতাবস্থায় কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে একটু শান্ত বোধ করলে আমার হঠাৎ মনে হলো যে, এ লিমেরিকটিকে সাম্প্রতিক নিকারাগুয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করলে তা রক্ষণশীল ও বিপ্লবী দুই ধরনের পাঠই সম্ভব এই অর্থে যে, সেখানে দুটো লিমেরিক, দুজন মিস নিকারাগুয়া ও দুটো জাগুয়ার বিদ্যমান, যার মধ্যে আপনার পছন্দমতো একটিকে ভোট দেয়া বাঞ্ছনীয়। যদি বাচ্চা মেয়েটিকে বিপ্লব হিসেবে গণ্য করা হয়, সাত বছর বয়সী, সজীব এখনো যৌবনের আদর্শবাদে পূর্ণ, তাহলে নিশ্চয়ই জাগুয়ারটি ভূ-রাজনীতি তথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতীক; শত হলেও ৫০ বছর ধরে ‘উপনিবেশায়িত পশ্চাদ্ভূমি’কে মুক্তাঞ্চলে পরিণত করতে চাইলে আপনি যদি দুর্বল হন আর শত্রু প্রায় সর্বশক্তিমানের সমতুল্য, সেটা জাগুয়ারের পিঠে চড়ে বসার মতোই তো। এটা ছিল বামপন্থী ব্যাখ্যা; কিন্তু যদি বাচ্চা মেয়েটা নিজেই হয়ে থাকে নিকারাগুয়া আর জাগুয়ার বিপ্লব? হ্যাঁ? তাহলে?

আমি চোখ বন্ধ করে আমার নিকারাগুয়ার দ্রুতচিত্রের সংগ্রহকে দেখতে চেষ্টা করি। অবশেষে আমি দুই জাগুয়ার ও দুই মিস নিকারাগুয়ার মধ্যে একজনকে বেছে নিতে পারি। আমি সেই ছবিটা, যাকে বেঠিক মনে হচ্ছিল ছিঁড়ে ফেলে দিই। যেটাকে আমি রক্ষা করি, তাতে জাগুয়ারের পিঠের মেয়েটিকে দেখতে মোনালিসার মতো লাগছিল আর তার হাসিটি জ্যোকোন্দার।

পরদিন আমি যখন বিমানবন্দরে যাচ্ছিলাম গাড়ি করে, মানাগুয়ার পোস্টারগুলো বলছিল ‘বিদায়।’ ‘যক্ষ্মা ভালো হয়।’ ‘রক্ষণশীলতার নাম পরিবার।’ ‘ইয়াংকি হানাদার নিপাত যাক।’ ‘কে-অথরিন বালাইনাশক।’ ‘রক্ষণশীলতা হচ্ছে গির্জার প্রতি ভক্তি।’ ‘বাহাই ধর্মকে আবিষ্কার করুন।’

গাড়ির রেডিওতে শোনা যাচ্ছিল, দানিয়েল ওর্তেগা জাতিসংঘে বক্তৃতা দিচ্ছেন। অনুবাদ উপযোগী গতিতে তিনি আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখার কথা বলেন, নিকারাগুয়ার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ওপর জোর দিয়ে। নিকারাগুয়া বনাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দানিয়েল বনাম গলিয়াথ। আন্তর্জাতিক আদালতের রায়টাই ছিল তার গুলতির পাথর।

ইঁদুর গর্জন করে ওঠে।

আমার অভ্যন্তর বিরোধের নিষ্পত্তি হয়নি তখনো। সান্দিনিস্তাদের আমার এক প্রকার অভিজাতই মনে হচ্ছিল। তারা বিশ্বাস করত, তারা বিপ্লবের আগুনে পুড়ে নিখাদ হয়ে উঠেছিল, হয়ে উঠেছিল ‘নতুন মানুষ’ এবং সন্দেহ নেই, প্রায়ই তারা অনুভব করত, যারা এ আগুনের ভেতর দিয়ে গেছে, তারাই কেবল শাসনভারের অধিকারী। কিন্তু অবিশ্বাস-অযোগ্য সত্য হলো, বিয়োলেতা দে চামোররো যা-ই বলুন না কেন, তারা ব্যালটের মাধ্যমেই ক্ষমতায় এসেছিল এবং দেশের বৈধ শাসনকর্তা।

তাদের কেউ কেউ সম্ভবত ‘কমিউনিস্ট’ ছিল, এমনকি ‘মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট’ (যদিও যেসব নেতার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, তাদের কট্টর আদর্শবাদীদের থেকে অনেক দূরবর্তী বলেই মনে হয়েছে আমার)। তবে নিকারাগুয়া যদি একটি সোভিয়েতজাতীয় রাষ্ট্রই হয়ে ওঠে, আমি তাহলে সত্যিই বিস্মিত হব।

আমি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দক্ষতা, তাদের ইচ্ছাশক্তি ও সততারও প্রশংসা করি। হেরাল্ড ট্রিবিউনের একটি সাম্প্রতিক নিবন্ধে জন কেনেথ গলব্রেথ লেখেন, রিগান প্রশাসন ও ‘নৈতিক নোংরামি’ নিয়ে। তিনি লেখেন, আমেরিকায় একদা যাদের হাতে টাকা ছিল, তারা রাজনীতিতে নামতেন, আর এখন যারা রাজনীতিতে আছেন, তারা টাকা উপায়ে নামেন। ‘আমি পূর্বতন প্রণোদনা পছন্দ করি।’ তিনি বলেন।

এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে, এ ধরনের প্রশাসন মিগেল দেসকোতোর মতো মানুষের ওপর নৈতিক প্রভুত্ব দাবি করতে পারে।

রেডিওতে ওর্তেগা তখনো কথা বলছিলেন। আমার মনে পড়ে তাকে জিজ্ঞাসা করার কথা, যুক্তরাষ্ট্র কেন নিকারাগুয়া বিষয়ে এমন অনড় অবস্থান নিয়েছে। তিনি জবাবে বলেন, ‘এটা শুধু আমাদের বিষয় নয়। রিগান যা করতে চায়, সেটা হচ্ছে আমাদের পরাজিত করার মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে একটা বার্তা পাঠানো। এফএসএলএনের পরাজয়ের বার্তাটা হবে সহজ ও সরব: ভাইয়েরা, আত্মসমর্পণ করো। এটা মেনে নাও যে, তোমরা আমেরিকা সাম্রাজ্যেরই অংশ। প্রতিরোধ অর্থহীন; এতে আগের চেয়ে আরো খারাপ অবস্থাই ডেকে আনবে তোমরা। ‘স্রেফ আমরা যেভাবে বলি সেভাবে চলো।’

‘সেজন্যই’— ওর্তেগা বলেছিলেন, ‘আমরা লড়াই করছি পুরো মধ্য আমেরিকার জন্যই। আমরা যুদ্ধ করছি এটা বলার জন্য যে, আমরা কারো বাড়ির পেছনের উঠান নই। এটা আমাদের নিজেদের দেশ।’

হয়তো বা ডেভিড ও গলিয়াথ একটি ভুল উপমা ছিল। হয়তো নিকারাগুয়ার এ সংগ্রামকে আরো ভালো তুলনা করা যায় বিখ্যাত ফরাসি কমিক বই গসচিনি ও উদেরজোয় উল্লিখিত গলেদর লড়াইয়ের সঙ্গে: অ্যাসটারিক্স, ওবেলিক্স ও বাকিদের, নিজেদের ছোট্ট গুহায় বসে শক্তিশালী জুল সেজার ও তার রোমান বাহিনীর সঙ্গে লড়াই। রেডিওতে ওর্তেগার বক্তৃতা শুনতে শুনতে আমি এক নতুন গলেক আবিষ্কার করি: সান্দিনিক্স।

সকালের খবরের কাগজ কন্ট্রা আক্রমণের সংবাদ দেয়। হিনোতেগা প্রদেশের সেমপোপেরা নামের একটি জায়গায় এ আক্রমণে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের তিনজন নিকারাগুয়ার: উইলিয়াম ব্লান্দোন ও মারিয়ো আসেবেদো এফএসএলএনের সদস্য আর একজন ফরাসি নিকারাগুয়ান জোয়েল ফ্ল্যুয়ু। বাকিদের একজন সুইস নাগরিক, ক্লদ লেভ্রাজ ও একজন পশ্চিম জার্মানির এরিখ কভের স্টাইন। (এ হত্যাকাণ্ডের দরুন নিকারাগুয়ার সরকার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সব বিদেশী সাহায্যকর্মীকে নিষিদ্ধ করে। আমার প্রত্যাবর্তনের পর শোনা সবচেয়ে মর্মান্তিক খবর এটা। এর পরও কন্ট্রা নেতৃত্ব ঘোষণা করে, অনুমেয়ভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের আশীর্বাদ নিয়ে, এখন থেকে রণাঙ্গনে যেকোনো বিদেশী সাহায্যকর্মীকে শত্রুদের চর হিসেবে গণ্য করা হবে।)

দানিয়েল ওর্তেগা জাতিসংঘে শান্তির জন্য আবেদন জানানো শেষ করেন, যখন তার অজান্তেই মৃত্যুনৃত্য নিকারাগুয়ায় তার সবচেয়ে ধীর ও মারাত্মক পদক্ষেপটি ফেলেন।

 

১৯৮৭ সালে প্রকাশিত সালমান রুশদির প্রথম মননশীল গ্রন্থ, ‘দ্য জাগুয়ার স্মাইল: অ্যা নিকারাগুয়ান জার্নি’র সমনামী অধ্যায়টির অনুবাদ। গ্রন্থটি এ বছরের অমর একুশে গ্রন্থমেলায়  প্রকাশিত হবে।