জাঁ দিলিল্লে ও জুডিথ উডসওয়ার্থ

অনুবাদ: জি এইচ হাবীব

(ত্রিংশ কিস্তি)

হোর্হে লুইস বোর্হেস এবং আর্জেন্টিনার সাহিত্যের জন্ম

 

স্বাধীনতা লাভের (১৮১০-১৮১৬ খ্রি.) পর অর্জিত সমতল এবং জনবিরল তৃণভূমির দিকে তাকিয়ে রিও ডি লা প্লাটার বুদ্ধিজীবীরা নিঃসন্দেহে এই আশা করেছিলেন যে, স্পেনের সঙ্গে বিচ্ছেদটি কেবল সাংস্কৃতিক নয়, রাজনৈতিকও হবে। তারা ভাষা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন (স্বাধীন আর্জেন্টিনা কি হিস্পানিতে কথা বলে চলবে?), চিন্তিত ছিলেন একটি চিন্তা-ঘরানার সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও, যেটা ছিল সাবেক মেট্রোপলিসের চিন্তা-ঘরানা, যেটাকে তারা অসহিষ্ণু এবং অগভীর বলে মনে করতেন। এই বুদ্ধিজীবীরা— মারিয়ানো মোরেনো, হুয়ান মারিয়া গুইতেরেয, এস্তেবান এচেবরিয়া, হুয়ান বাতিস্তা আলবেরদি এবং ডমিংগো ফাউস্তিনো সারমিয়েন্তো ফরাসি বা ইংরেজি পড়ে বা বলেই বড় হয়েছেন। হার্ডার এবং অন্যান্য রোমান্টিকের সঙ্গে তাদের পরিচয় ছিল; তারা (স্পেন বাদে) বাদবাকি ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রময় ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। এবং অনুবাদ ছিল এমনই একটি কাজ, যেটার প্রচার-প্রসারের জন্য তারা কাজ করেছিলেন, নয়তো সেটা নিজেরাই চর্চা করেছেন। খানিকটা সফলতার সঙ্গে তারা একটা সাহিত্যিক পদ্ধতি, যেমন গাউচো সাহিত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তবে সেটার ভিত্তি ছিল মূলত রাজনৈতিক বা আত্মজৈবনিক রচনাবলি। একটি সংস্কৃতি গঠন ও পুনর্গঠনের জন্য অসংখ্য যেসব উপাদান অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, সেগুলো সেখানে ছিল না। এসব মানুষ পেশাদার লেখক ছিল না, ছিল রাজনীতিক, গভর্নর, কূটনীতিক। প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনা সংস্থা এবং বিশেষায়িত খবরের কাগজের অভাব ছিল সেখানে। সর্বোপরি, আর্জেন্টিনার সাহিত্যের পাঠকের সংখ্যা ছিল নিতান্তই অল্প। শিক্ষিত লোকজন হিস্পানি ভাষায় রচিত কিছু পড়ত না বললেই চলে, এবং জনসাধারণ, ঔপনিবেশিক অবহেলার একটি দুর্ভাগ্যজনক ঐতিহ্যের কারণে ছিল — কার্যত — অশিক্ষিত।

হোর্হে লুইস বোর্হেস (১৮৯৯-১৯৮৬) যখন সাহিত্য রচনা শুরু করেন, ততদিনে এ অবস্থা বদলে গিয়েছিল। ১৮৮৪ সালের সাধারণ শিক্ষা আইন স্বদেশী জনসাধারণের সাক্ষরতার নিশ্চয়তা দিয়েছিল। লাখ লাখ যেসব বিদেশী তখন আর্জেন্টিনায় পৌঁছাচ্ছিল, তাদেরকে হিস্পানি শেখানো হচ্ছিল। দেশে যা লেখা হচ্ছিল, সেসবের দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছিলেন তরুণ প্রকাশকরা এবং তাদের বেশির ভাগই ছিলেন ইহুদি অভিবাসীদের প্রথম প্রজন্ম এবং তখন সাহিত্য পত্রিকা (জার্নাল) এবং সংবাদপত্রের সাহিত্য সাময়িকীর একটা জোয়ার এসেছিল। আর্জেন্টিনার সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করার জন্য দাপ্তরিক করণ-কৌশল তৈরি করা হয়েছিল: ১৯১৩ সালে বুয়েন্স আয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্জেন্টিনার সাহিত্যের একটি চেয়ার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯২২ সালে আর্জেন্টিনীয় সাহিত্য ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়, সেই সঙ্গে প্রচুর অর্থমূল্যের সাহিত্য পুরস্কারের ঘোষণা দেয়া হয়।

পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি যতই ত্বরিত এবং মৌলিক হোক না কেন, এসবের কোনোটিই সত্যিকারের মহৎ সাহিত্য-সৃষ্টির নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তরুণ বোর্হেস এবং তার সমসাময়িক সাহিত্যিকরা, যারা তার মতো আভাঁ-গার্দ সাহিত্য এবং আধুনিক সংস্কৃতি সম্পর্কে আগ্রহী ছিলেন, তারা এ কাজে নিবিষ্ট ছিলেন। তিনি মনে করতেন ভাষা নিয়ে সতর্ক এবং নিয়মবদ্ধভাবে কাজ করা এবং ঐতিহ্যের একটি মুক্ত পাঠের মাধ্যমেই কেবল সাহিত্যে মৌলিকতা অর্জন করা যেতে পারে বলে ।

আর্জেন্টিনার সাহিত্যের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ১৯২০-এর দশকে তিনি ধারাবাহিকভাবে কিছু লেখা লেখেন। ১০০ বছরের পুরনো হলেও আর্জেন্টিনার সাহিত্য ছিল, তার বিবেচনায়, ভীষণভাবে ফরাসি এবং হিস্পানি সাহিত্য-প্রভাবিত এবং নিজস্ব কণ্ঠস্বরহীন। বোর্হেস তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় দুটো মৌলিক বা অপরিহার্য বিষয় নিয়ে কাজ করলেন: ভাষা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। যে সাফল্যজনক পদ্ধতিতে অন্য ভাষাগুলো বাস্তবতা তুলে ধরেছে, সেখান থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তিনি অনুবাদের মাধ্যমে তার নিজের ভাষার সমৃদ্ধি অর্জনের একটি নীতির কথা বললেন। তিনি তার দেশের ‘বাচিক ঐতিহ্য’র (oral tradition) বা ‘প্রাপ্তবয়স্কদের কথোপকথনমূলক গদ্য’র ভক্ত ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ‘মার্বেল পাথরের ভাষা’ লাতিনেরও খুব প্রশংসা করতেন, যে ভাষাটিকে হিস্পানির স্বর্ণযুগের কুয়েভেদো, সার্বান্তেস, তরেস ভিয়াগোয়েল অথবা Epístola moral a Fabio-এর অজ্ঞাতনামা লেখক হিস্পানি ভাষায় পুনঃসৃষ্টি করেছেন।

 বোর্হেস যেভাবে ঐতিহ্যের সমস্যাটি মোকাবেলা করেছেন, তা আরো অনেক ব্যাপক। এটিকে ১৯৫৩ সালে ‘El escritor argentino y la tradición, আর্জেন্টিনীয় লেখক এবং ঐতিহ্য’ শিরোনামের একটি রচনার মাধ্যমে একটি পদ্ধতিগত রূপ দেয়া হয়, যা আসলে বোর্হেসের সামগ্রিক সাহিত্যকর্মের ভিত্তিস্বরূপ। সর্বদক্ষিণ প্রান্তে বসবাসকারী এবং পূর্বসঞ্জাত কোনো ধারণাবর্জিত আর্জেন্টিনীয়দের পুব ও পশ্চিমের সংস্কৃতি ঘেঁটে দেখার এবং মহাবিশ্বরূপ ‘গ্রন্থাগার’ থেকে পাঠ করার পক্ষে কোনো বাধা ছিল না (এখানে স্মর্তব্য যে, বোর্হেস বাস্তবেও একজন গ্রন্থাগারিক হিসেবে কাজ করেছেন)। জগতের সাহিত্যিক বিস্ময়গুলো বোর্হেস অত্যন্ত উপভোগ করতেন:  ভার্জিল, সহস্র এক আরব্য রজনী, দান্তে, শেক্সপিয়র ও সার্বান্তেস। পাশ্চাত্যের প্রামাণ্য সাহিত্যের (canonical Western literature) প্রান্তের বাইরে ছিল এমন রচনা ও (তার মতো) সাহিত্যকদের তিনি সন্ধান করে বেড়িয়েছেন: ধর্মদ্বেষী মতবাদ বা আন্দোলনের নেতারা, ইহুদি মরমীবাদী, মধ্যযুগীয় চিনীয় গল্প কথক এবং পারসিক কবিরা।

 বোর্হেসের এই দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে ছিল Bildung -এর ধারণা, যা গোড়ার দিকের জার্মান রোমান্টিকদের দর্শনের কেন্দ্রীয় ধারণাগুলোর অন্যতম।

 {Bildung বলতে কেবলই শিক্ষা বা ‘সংস্কৃতি’ বোঝায় না; সেসঙ্গে সে শিক্ষা ও সংস্কৃতি অর্জন বা তৈরি করার প্রক্রিয়াকেও বোঝায়।}

আর সেখানেই পাঠকদের গুরুত্ব। বোর্হেস এমন একজন ব্যক্তিকে আবিষ্কার করেছেন, যিনি একটি টেক্সট থেকে অসংখ্য টেক্সট সৃষ্টি করতে পারেন। এই হাইপোথিসিসটি — যেটি ‘Pierre Menard, auto del Quijote’ ১৯৩৯, বা ‘পিয়েরে মেনার্দ,  কিহোতের লেখক’ গল্পে অনূদিত হয়েছিল— লেখকত্বের অত্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী উত্পীড়ন বন্ধ করতে সহায়তা করেছিল এবং তিনি তা পুনঃস্থাপন করেছিলেন পঠন দিয়ে, যা আরো সভ্য বা ভদ্র এবং গভীরতর সৃজনশীল কর্ম।

{গল্পটি প্রথমে ১৯৩৯ সালের মে মাসে Sur নামের জার্নালে বেরিয়েছিল, পরে তা Ficciones (১৯৪৪) গ্রন্থভুক্ত হয়।}

 মৌলিকত্বের ধারণাটি অষ্টাদশ শতকের একটি তাত্ত্বিক মানসকল্প। এই সময়ের আগে আসলে পঠন এবং তারপর ‘অনুবাদ’ বা ভিনদেশী উৎসকে অনুকরণের মাধ্যমে মহৎ সাহিত্যিক ঐতিহ্য গঠিত হয়েছিল। ধারাবাহিক কিছু রচনা যেমন ‘La flor de Coleridge, কোলরিজের ফুল, ১৯৪৫’ এবং ‘La esfera de Pascal, প্যাসকেলের গোলক ১৯৫১’- এর মধ্যে দিয়ে বোর্হেস দেখিয়েছেন কী করে বিশেষ কিছু প্রতিমা, রূপক বা ধারণা এক লেখক থেকে আরেক লেখকের কাছে, এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় চলে এসেছে। ‘স্বত্ব বা মালিকানার শিথিলতা’র ধারণাটি আবিষ্কার করে তিনি লিখলেন কী করে ঊনবিংশ শতকের আইরিশ লেখক এডওয়ার্ড ফিটজেরাল্ড একটি পারসিক কাব্যে তার নিজের কণ্ঠস্বর আবিষ্কার করেন এবং Rubáiyat of Omar Khayyám নামে সেটির একটি ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশ করেন, যার কিছু কিছু অংশ বোর্হেসের বাবা হোর্হে গিয়ের্মো বোর্হেস হাসলাম অনুবাদ করেছিলেন। অনুবাদের ওপর তার তাত্ত্বিক রচনায়, বোর্হেস বলেছেন কাফকা কী করে তার পূর্বসূরি তৈরি করেছিলেন, এবং অনুবাদকর্মের সঙ্গে বোর্হেস খুব ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি মনে করতেন, যেকোনো লেখকের জন্য অতীতের শব্দাবলি আসলে সমসাময়িক, কারণ সাহিত্য জাতীয়তা বা কালের তফাৎ স্বীকার করে না।   

 বোর্হেসের যাবতীয় রচনা— তাত্ত্বিক রচনা, ফিকশন এবং সতর্ক ও সযত্ন রচিত পাদটীকাগুলো অনুবাদ ও সৃজনের মধ্যে এক সুস্পষ্ট একাত্মতার কথা বলে। অনুবাদ মানে নেহাত অন্য একটি ভাষায় সব টেক্সটের সঞ্চালন বা স্থানান্তর নয়। অনুবাদের সত্যিকারের কাজ শৈলীগত পদ্ধতি, নতুন কাব্য-রূপ, বর্ণনাপদ্ধতি এবং আদর্শ, এমনকী সত্য ও সৌন্দর্য পরিবাহিত করা। ‘Las versions homéricas, হোমারের রচনার অনুবাদ, ১৯৩২’ নামক রচনায় বোর্হেস গ্রিক থেকে ইংরেজিতে অনূদিত বেশকিছু খণ্ডাংশ হিস্পানিতে অনুবাদ করতে গিয়ে সেসব নিয়ে মন্তব্য করেছেন। খানিকটা অনন্য এ পদ্ধতিটি পুনরাবৃত এবং সম্প্রসারিত হয়েছিল তার ‘Los traductores de las 1001 noches, সহস্র এক আরব্য রজনীর অনুবাদ, ১৯৩৬’ নামক রচনায় যেখানে তিনি আরবি টেক্সটগুলোর ফরাসি ইংরেজি এবং জার্মান ভাষায় চালিয়ে যাওয়ার ওপর কিছু মন্তব্য করেছেন, সেসঙ্গে সেগুলোকে তিনি নিজের ভাষায় অনুবাদও করেছেন। ভাষাগুলোকে বদ্ধ প্রতীকী মহাবিশ্ব হিসেবে মোটেই না দেখে বোর্হেস সেগুলোকে কাব্যিক এবং বর্ণনামূলক প্রক্রিয়ার ভাণ্ডার হিসেবে দেখেছেন, যা পৃথিবীর যেকোনো লেখক ব্যবহার বা আত্মসাৎ করতে পারেন।

(ক্রমশ...)

 

মৌলিকত্বের ধারণাটি অষ্টাদশ শতকের একটি তাত্ত্বিক মানসকল্প। এ সময়ের আগে আসলে পঠন এবং তারপর ‘অনুবাদ’ বা ভিনদেশী উৎসকে অনুকরণের মাধ্যমে মহৎ সাহিত্যিক ঐতিহ্য গঠিত হয়েছিল। ধারাবাহিক কিছু রচনা যেমন ‘La flor de Coleridge, কোলরিজের ফুল, ১৯৪৫’ এবং ‘La esfera de Pascal, প্যাসকেলের গোলক ১৯৫১’- এর মধ্য দিয়ে বোর্হেস দেখিয়েছেন কী করে বিশেষ কিছু প্রতিমা, রূপক বা ধারণা এক লেখক থেকে আরেক লেখকের কাছে, এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় চলে এসেছে। ‘স্বত্ব বা মালিকানার শিথিলতা’র ধারণাটি আবিষ্কার করে তিনি লিখলেন কী করে উনবিংশ শতকের আইরিশ লেখক এডওয়ার্ড ফিটজেরাল্ড একটি পারসিক কাব্যে তার নিজের কণ্ঠস্বর আবিষ্কার করেন