বাঙালি জীবনে
কি আদৌ
কোনো সজীব-সচল
মেট্রোপলিসের স্মৃতি
রয়েছে? যেমনটা
নিউইয়র্ক বা
লন্ডন? গ্রিক
শব্দ ‘মেট্রোপলিস’,
যার অর্থ
বাংলায় ভাবানুবাদে
দাঁড়ায় ‘মাতৃশহর’
বা ‘মায়ের
তূল্য নগর’—তেমন
কোনো সার্থক
মহানগরীর কথা
কি বাংলার
ইতিহাসে মেলে?
প্রথমেই কয়েকটা
উদ্ভট প্রশ্ন
তোলার জন্য
দুঃখিত; কিন্তু
অবস্থাদৃষ্টে মনে
হয় মেট্রোপলিস-সংক্রান্ত
যে মোটাদাগের
ধারণা বা
অভিজ্ঞতা আমাদের
মধ্যে জনপ্রিয়
(অর্থাৎ কেবল
এর আকারগত
দিকটি)—তার
বাইরে এর
সূক্ষ্ম অথচ
আবশ্যিক যেসব
দরকারি বৈশিষ্ট্য
রয়েছে, যুগে
যুগে বঙ্গভূমির
কোনো কোনো
শহর সেই
বৈশিষ্ট্যগুলো ধারণ
করার দিকে
ধাবিত হয়েছিল।
কিন্তু দুঃখের
বিষয়, সেই
শহরগুলোর অধিকাংশই
পরে কালের
আঘাতে বিলুপ্ত
হয়েছে বা
মেট্রোপলিসের বৈশিষ্ট্যগুচ্ছকে
কিছুকালের জন্য
ধরে রাখতে
পারলেও পরে
সেই অবস্থান
থেকে তার
বিচ্যুতি ঘটেছে।
এখন কেউ
কেউ হয়তো
তেড়ে এসে
বলবেন, পাশ্চাত্যের
‘মেট্রোপলিস’-এর
ধারণা কি
মহানগর নির্মাণসংক্রান্ত
বিবেচনা প্রাচ্যে
কিংবা এ
কাদামাটির বাংলা
মুলুকে খাটে?
এ সূত্রে
বলি, পশ্চিমা
এক গবেষক-সাংবাদিক
বেন উইলসন
কিন্তু তার
সদ্য প্রকাশিত
পরিশ্রমী বিপুলাকায়
গ্রন্থ ‘মেট্রোপলিস:
আ হিস্ট্রি
অব হিউম্যানকাইন্ডস
গ্রেটেস্ট ইনভেনশন’-এ
স্পষ্ট করেই
লিখেছেন—প্রাচীনকালের
ভারতীয় উপমহাদেশের
হরপ্পা কি
মধ্যযুগের বাগদাদ
দুটিই কিন্তু
যেকোনো দিক
থেকেই সার্থক
মেট্রোপলিস ছিল।
নগর নির্মাণের
ইতিহাস লেখার
বেলায় বেন
উইলসনের মতো
গোরা লেখক
যখন এমন
উদারতা বা
বিশ্ববিস্মৃত দৃষ্টিভঙ্গির
প্রকাশ ঘটাতে
পারেন, তখন
‘প্রাচ্যের
গর্বিত বাসিন্দা’
এই আমরা
স্রেফ অজ্ঞানতার
বালুতে মাথা
গুঁজে থাকব?
না, বরং
বাংলায় নগর
নির্মাণের ইতিহাসের
দিকে তাকিয়ে
এ অঞ্চলের
মেট্রোপলিসগুলোর (পণ্ডিতদের
রাগ কমানোর
কথা ভেবে
‘সম্ভাব্য’
মেট্রোপলিসও বলা
চলে) দিকে
চোখ ফেরানোই
হবে উত্তম
কাজ।
খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক
ষষ্ঠ-পঞ্চম
শতকের বাংলার
উয়ারী-বটেশ্বর
জনপদের কথাই
ধরা যাক।
অক্লান্ত প্রত্নতাত্ত্বিক
অনুসন্ধানের ফলে
উয়ারী-বটেশ্বরে
তখন গড়ে
ওঠা দুর্গনগর
সম্পর্কে যা
জানা যাচ্ছে,
তাতে একে
আদি যুগের
মেট্রোপলিস বলে
আখ্যায়িত করা
যেতেই পারে।
প্রাচীন যুগের
অন্যতম বাণিজ্যকেন্দ্র
হিসেবে উয়ারী-বটেশ্বরের
সঙ্গে জলপথে
যোগাযোগ ছিল
দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়া ও
রোমান সাম্রাজ্যের।
এ শহরে
যেমন বণিকের
বসবাস ছিল,
তেমনি ছিল
ধাতব কী
মৃত্দ্রব্য উৎপাদনকারী
কারিগরের উপস্থিতি।
ছিল রাজকর্মচারী,
পুরোহিত-পণ্ডিত
ও খাদ্য
উৎপাদনকারীদের আবাসও।
গোছানো নগর
নির্মাণ ও
সমৃদ্ধ প্রশাসন
ব্যবস্থার কারণে
উয়ারী-বটেশ্বর
বাংলার আদি
বাসিন্দাদের কাছে
মেট্রোপলিস বলে
গণ্য হতো,
এমনটা আন্দাজ
করা হয়তো
আকাশকুসুম কল্পনা
নয়।
মধ্যযুগের বাংলায়
প্রথম সার্থক
মেট্রোপলিসের নির্মাতা
সম্ভবত ইলিয়াস
শাহ। ১৩৪৩
সালে তার
হাতে পাণ্ডুয়া
রাজধানী হিসেবে
স্বীকৃতি পেল,
তখন থেকেই
শহরটির নতুনভাবে
নির্মিত হওয়ার
শুরু। পাণ্ডুয়া
পঞ্চদশ শতাব্দীতে
বিশেষভাবে দৃষ্টি
আকর্ষণ করেছিল
চীনা বণিকদের।
গোলাম হুসেন
সেলিমের ইতিহাসগ্রন্থ
‘রিয়াজ-উস-সালাতিন’-এ
প্রদত্ত বিবরণ
অনুযায়ী ওই
সময়ে পাণ্ডুয়ায়
বেশ জনসমাগম
ঘটেছিল। চীনা
বণিকরা সেখানকার
সমৃদ্ধির স্পষ্ট
চিত্র তুলে
ধরেছেন হিন্দু-মুসলমান
নির্বিশেষে জনসাধারণের
বাহ্যিক পরিচ্ছদের
বর্ণনার মাধ্যমে।
সেই সময়ের
পাণ্ডুয়ায় প্রায়
সবাই ভেড়ার
চামড়ার তৈরি
পাদুকা ব্যবহার
করে, নারীদের
পোশাক তৈরি
হতো রেশম
দিয়ে এবং
প্রায় সবাই
গলায় সোনার
হার কি
আঙুলে আংটি
পরত। মেট্রোপলিস
হিসেবে পাণ্ডুয়ার
দিন অস্ত
যায় পঞ্চদশ
শতাব্দীর মাঝামাঝি
গৌড়ে সুলতানি
সাম্রাজ্যের রাজধানী
স্থানান্তরিত হওয়ার
পর। গৌড়
তখন ক্রমে
ক্রমে পাণ্ডুয়ার
মতোই জনসমাগমের
কারণে পূর্ণ ও
বণিকদের আগমণে
মুখর হয়ে
উঠেছিল। পরবর্তীকালের
প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে
এও উঠে
এসেছে যে
গৌড়ে তখন
শিক্ষাসংক্রান্ত তত্পরতাও
ছিল ব্যাপক।
১৫২১ সালে
জনৈক পর্তুগিজ
দোভাষীর দেয়া
গৌড়ের বিবরণ
উদ্ধৃত করে
ইতিহাসবিদ অনিরুদ্ধ
রায় জানাচ্ছেন,
গৌড় তখন
ছিল একটি
‘জনাকীর্ণ
শহর এবং
লোকের ভিড়ে
পথ চলা
মুশকিল।...অভিজাতরা
যখন পালকি
করে দরবারে
যাচ্ছেন, তখন
সামনে তাদের
লোকরা লাঠি
দিয়ে লোক
সরাচ্ছে...।’
সেই পর্তুগিজ
দোভাষী আরো
জানিয়েছেন, গৌড়ের
ভিন্ন ভিন্ন
এলাকায় একেক
রকম জিনিস
বিক্রির বাজার
ছিল। যেমন
কোনো এলাকায়
বিক্রি হতো
শুধুই মিষ্টি,
কোনো এলাকায়
অস্ত্রশস্ত্র বা
কোনো এলাকায়
ঘোড়সওয়ারের জন্য
প্রয়োজনীয় সাজসরঞ্জাম।
দোভাষী আরো
জানিয়েছেন, তিনি
সুলতানি দরবারে
গিয়ে দেখেছেন
যে স্বয়ং
সুলতান দরবারের
সামনের মাঠে
বসে পোলো
খেলা উপভোগ
করছেন।
নদীয়ার নবদ্বীপ
অঞ্চল মধ্যযুগের
একটা সময়জুড়ে
পরিচিত ছিল
বিশ্ববিদ্যালয়নগর হিসেবেই।
পরে তা
বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত
হলে সাময়িকভাবে
তার মধ্যে
মেট্রোপলিসের লক্ষণ
দেখা যায়,
কিন্তু তা
বেশিদিন স্থায়ী
হয়নি। পর্তুগিজ-সুলতানি
শাসকদের দ্বন্দ্বে
টালমাটাল সপ্তগ্রামের
ক্ষেত্রেও একই
কথা খাটে।
মধ্যযুগের বাংলার
আরেক মেট্রোপলিস
ছিল যশোর।
সপ্তদশ শতাব্দীতে
ছাপা হওয়া
একটি মানচিত্রে
বলা হয়েছে
বঙ্গীয় উপকূল
অঞ্চলে যে
কয়টি শহর
রয়েছে, তাদের
মধ্যে সর্বাধিক
গুরুত্বপূর্ণ শহর
হলো যশোর।
একটি সার্থক
মেট্রোপলিসের অন্যতম
বৈশিষ্ট্য যে
জাতধর্ম-সমন্বয়,
তা কিন্তু
সপ্তদশ শতাব্দীতে
‘যশোহর’-এ
দেখা যায়।
যশোরে জেসুইট
পাদ্রীদের জন্য
গির্জা বানানোর
ব্যবস্থা সেখানকার
শাসক প্রতাপাদিত্য
করে দিয়েছিলেন,
বৈষ্ণবদের জন্য
বানিয়ে দিয়েছিলেন
মন্দির এবং
মুসলিম নারীদের
জন্য নির্দিষ্ট
মসজিদও ছিল
সেখানে। পর্তুগিজদের
পাশাপাশি ছিল
আফগানদের বসতি।
আরেকটু পিছিয়ে
সোনারগাঁর দিকে
চোখ ফেরালে
এই ‘বহু
মত বহু
জাতি’-র
আবাসের ব্যাপারটি
যে সেখানেও
ছিল, তা
বোঝা যায়।
১৫৮৬ সালে
সোনারগাঁ এসেছিলেন
ইংরেজ পর্যটক
র্যালফ ফিচ—তিনি
জানাচ্ছেন, ওই
সময় সোনারগাঁয়
একাধিক ঘর
গুজরাটি বণিক
ছিল। সিংহল-সুমাত্রা
থেকে মালাক্কা
পর্যন্ত পৌঁছে
যেত সেখানে
উৎপাদিত বস্ত্র।
সমৃদ্ধি ছিল
প্রায় সব
গৃহেই। এর
১০০ বছর
আগে এক
পর্তুগিজের বর্ণনায়ও
সোনারগাঁর উন্নত
জীবনযাত্রা ও
পরিকল্পিত নগরবিন্যাসের
কথা উঠে
এসেছে।
ঢাকা শহরের
নির্মাণের শুরুটা
কি মেট্রোপলিস
হিসেবে? একে
মোগলদের রাজধানী
ঘোষণা করাটা
তারই প্রথম
পদক্ষেপ? এ
বিষয়ে খুব
বেশি প্রমাণ
পাওয়া যায়
না। বরং
বলতে হয়
সুবেদার ইসলাম
খানের যুদ্ধযাত্রা
করে ঢাকায়
আগমণের পর
এ নগরীর
উত্থানের শুরু।
তাই খুব
আটঘাট বেঁধে
শহরটি নির্মাণের
উদ্দেশ্যেই তাকে
রাজধানী হিসেবে
স্বীকৃতি দেয়া
হয়েছিল এমনটি
নয়। ঢাকা
তার যাত্রার
কাল থেকেই
রাজনৈতিক নানা
টালমাটাল পরিস্থিতির
কারণে থিতু
হয়ে দাঁড়ানোর
সময় পেয়েছে
কম। এমনটা
বলা যায়
মুর্শিদাবাদের ক্ষেত্রেও।
সমৃদ্ধ নগর,
কিন্তু তা
নানা উত্থান-পতনের
মুখোমুখি হতে
হতে আর
সার্থক মেট্রোপলিসের
রূপ পেল
না।
কিন্তু সার্থক
মেট্রোপলিস যেন
হয়ে উঠতে
চাইছিল অতীতের
চট্টগ্রাম। বাণিজ্য
হোক কি
সাহিত্যচর্চায়, সাধু-সন্ত-আউলিয়াদের
সমন্বয়বাদী তত্পরতা
থেকে ভিনদেশীদের
আকর্ষণ করার
বেলায়—মধ্যযুগের
চট্টগ্রাম যেন
নিজেই এক
বিপুল বৈচিত্র্যময়
জগৎ। সে
ধারা চট্টগ্রাম
ইংরেজ শাসনামলে
আর বজায়
তো থাকেনি।
তবে উত্থান
ঘটল কলকাতার।
বিপুল-বিস্তৃত
এক সাম্রাজ্যের
রাজধানী। ফলে
তার মধ্যে
মেট্রোপলিসের তাবৎ
বৈশিষ্ট্য ক্রমে
ক্রমে অনিবার্যভাবে
স্পষ্ট হয়ে
উঠতে থাকল।
জাত-ধর্ম-সংস্কৃতির
সমন্বয় ও
বিস্তারে এক
রঙদার শহর
তা উঠল,
যেখানে কিনা
সবারই ঠাঁই।
কিন্তু প্রথমত
বঙ্গভঙ্গ ও
দিল্লিতে ভারতীয়
সাম্রাজ্যের রাজধানী
স্থানান্তর এবং
পরে স্বাধীন
ভারতবর্ষে নানা
কারণে অবমূল্যায়ন
হওয়ার কারণে
কলকাতার মেট্রোপলিস-প্রতিচ্ছবি
আজ অনেকটাই
ম্রিয়মাণ।
বাংলাদেশের রাজধানী
ঢাকা এখন
মেট্রোপলিসরূপে পরিগণিত
হোক, এমনটা
অনেকেরই চাওয়া।
আকৃতিগত দিক
থেকে ঢাকা
মেট্রোপলিস বটে।
কিন্তু গোড়ায়
যে সূক্ষ্ম
বৈশিষ্ট্যগুলো একটি
মহানগরকে সার্থক
মেট্রোপলিস করে
তোলে তা
কি ঢাকার
আছে? ঐতিহাসিকভাবেই
(পত্তনকাল থেকেই
ধরছি) ঢাকার
নগরবিন্যাসে এলোমেলোভাব
লক্ষণীয়। আকারে
ও অর্থের
ছড়াছড়িতে আজ
তা বিশালত্বের
দাবিদার হলেও
তার নগরবিন্যাসের
আদিকালের ত্রুটিগুলো
কখনো মেরামতের
কথা ভাবা
হয়নি। তার
ওপর আছে
নাগরিক উদারতা,
জনসমষ্টির বৈচিত্র্য
ও সাংস্কৃতিক
কর্মকাণ্ডের অভাব।
শুধু শত
শত আকাশচুম্বী
অবকাঠামো শহরকে
মেট্রোপলিস করে
তোলে না।
এর জন্য
নাগরিকের মনকেও
মেট্রোপলিসের উপযোগী
করা জরুরি,
এমনকি আবশ্যিকও।
তথ্যসূত্র:
মধ্যযুগের
ভারতীয় শহর—অনিরুদ্ধ
রায়
বাংলার
শহর ঔপনিবেশিক
পর্ব—শেখর
ভৌমিক ও
অরিন্দম চক্রবর্তী
সম্পাদিত
ভারতকোষ
ও বাংলাপিডিয়ার
একাধিক ভুক্তি
মুহিত হাসান: নন-ফিকশন লেখক





