মাত্র ৪৫ বছর আগে ১৯৭৫ সালে সারা পৃথিবীতে যত মানুষ বাস করত, ২০২০ সালে পৃথিবীর শহরগুলোয় বাস করে তার চেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ। ১৯০০ সালে পৃথিবীজুড়ে নগরের বাসিন্দা ছিল মোট জনসংখ্যার ১৫ ভাগের কম; ১৯৬০ সালে তা দ্বিগুণ ছাড়িয়ে ৩৪ ভাগ পৌঁছে আর ২০২০ সালে ৫৬ দশমিক ২ ভাগ। এ সময় দুনিয়ার নগর জনসংখ্যা ৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন।

নিচের মানুষের শহরমুখীনতার ধারাটি তুলে ধরব।

ক. ১৯৬০ সালে নগর জনসংখ্যা এক বিলিয়ন স্পর্শ করে।

খ.   ১৯৮৫ সালে নগর জনসংখ্যা দুই বিলিয়ন স্পর্শ করে। এক থেকে দুই বিলিয়নে পৌঁছতে সময় নেয় ২৫ বছর।

গ.   ২০০৩ সালে নগর জনসংখ্যা দুই থেকে তিন বিলিয়নে পৌঁছতে সময় নেয় ১৮ বছর।

ঘ.   ২০১৫ সালে নগর জনসংখ্যা তিন থেকে চার বিলিয়নে পৌঁছতে সময় নেয় ১২ বছর।

ঙ. ২০২৮ সালে নগর জনসংখ্যা চার থেকে পাঁচ বিলিয়নে পৌঁছবে, সময় নেবে ১৩ বছর।

চ.   ২০৪০ সালে জনসংখ্যা পাঁচ থেকে ছয় বিলিয়নে পৌঁছবে, আর সময় নেবে ১২ বছর।

মেট্রোপলিসের বিকাশ অনুধাবনে এ তথ্যগুলো সহায়ক হবে। পৃথিবীর প্রাচীনতম শহর দামেস্ক সিরিয়ার রাজধানী, এখান নগর গোড়াপত্তনের ইতিহাস প্রায় ১১ হাজার বছরের পুরনো। প্যালেস্টাইনে পশ্চিম উপকূলের জেরিকো শহর খ্রিস্টপূর্ব ৬৮০০ অব্দে স্থাপিত, এটি পৃথিবীর প্রথম দেয়ালঘেরা শহর, সিরিয়ার আলেপ্পো শহর আট হাজার বছরের পুরনো। সভ্যতার দোলক হিসেবে খ্যাত এথেন্স দামেস্কের সমবয়সী। গ্রিসের আর্গস লেবাননের বিবলস সাত হাজার বছরের পুরনো। প্রাচীন অনেক নগর বিলুপ্ত হয়েছে, নতুন সৃষ্টি হয়েছে, পৌরসভা নগরের ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব নিয়েছে। বৃহৎ নগর, মাদার সিটি বা মোট্রেপলিস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যেসব শহর, যার মৌল প্রেরণা অর্থনৈতিক কার্যক্রম। রাজনীতিরও তা কেন্দ্রস্থল।

[ইউটোপিয়া, ডিস্টোপিয়া, মেট্রোপলিস, কসমোপলিস]

১৫১৬ সালে স্যার টমাস মোর ‘ইউটোপিয়া’ ধারাণাটি নিয়ে এলেন— একটি কল্পিত দ্বীপ দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে একটি নাগরিক দ্বীপ। গ্রিক শব্দ ইউটোপিয়ার দুটো মানে; একটি হচ্ছে নো প্লেস—এমন কোনো জায়গা নেই, অন্যটি হচ্ছে গুড প্লেস—ভালো জায়গা। কেউ কেউ মনে করেন মানুষের যেসব সুন্দর মেট্রোপলিসের প্রত্যাশা সেটাই ইউটোপিয়া। ভিক্টর হুগো ভবিষ্যৎ সৃষ্টির জন্য স্বপ্নের কথা বলেছেন, আজকের যা ইউটোপিয়া, আগামীকালের তাই বাস্তবতা। সভ্যতার শুরু থেকে এ পর্যন্ত যত নগরসেবা-সুবিধা সৃষ্টি হয়েছে, সবই কোনো এক সময় ইউটোপিয়াই ছিল।

লাইম্যান টাওয়ার সার্জেন্ট লিখেছেন, বহু বৈচিত্র্যের কারণে ইউটোপিয়ায় বিরূপ প্রকৃতির মানুষকে একসঙ্গে থাকতে হয়। সমাজতন্ত্রী, ধনতন্ত্রী, রাজতন্ত্রী, গনতন্ত্রী, নৈরাজ্যবাদী, নরীবাদী, সাম্যবাদী, বর্ণবাদী, বামপন্থী, ডানপন্থী, সংস্কারপন্থী, পিতৃতান্ত্রিক, একক পরিবার, যৌথ পরিবার, সমকামী, উভয়কামী, নগ্নতাবাদী। এ ধরনের মানুষ মেট্রোপলিসে বাস করে। ইউটোপিয়ানদের স্বপ্নের মতো মেট্রোপলিটন স্বপ্নও কখনো ফুরানোর নয়। কিন্তু সেখানে যে বৈশিষ্ট্যগুলো কাজ করে তা ইউটোপিয়ার উল্টো ডিস্টোপিয়ান।

যেমন মেট্রোপলিটন নিয়ন্ত্রণের তিনটি বড় হাতিয়ার হচ্ছে করপোরেট নিয়ন্ত্রণ, আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ। এর সঙ্গে যোগ হতে পারে দার্শনিক কিংবা ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ, যা একনায়কের শাসন বা ধর্মভিত্তিক শাসন থেকে উদ্ভূত।

নগরায়ণ মানে গ্রামের লোক শহরে এনে জড়ো করা কিংবা শহরের সীমানা বাড়ানো নয়, আসলে তা হচ্ছে নগরে রূপান্তরকরণ—নগর উপযোগী শিল্পকাঠামো, ভৌত অবকাঠামো কর্মসংস্থান, বাসযোগ্যতা এবং নিরাপত্তা সৃষ্টি করা। নগর বৃদ্ধির কয়েকটি মৌল কারণ হচ্ছে গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন, শহুরে মানুষের স্বাভাবিক সংখ্যা বৃদ্ধি এবং আগের চেয়ে দীর্ঘজীবন, অধিকতর সুবিধাজনক শহরে ক্রসবর্ডার মাইগ্রেশন, ভূমির পুনরায় শ্রেণীকরণ, তাতে একদা গ্রামীণ হিসাবে কিংবা কৃষিজমি হিসেবে চিহ্নিত ভূমির ব্যবহার বদলে যাওয়া শহুরে ভূমি হিসেবে শ্রেণীকৃত।

মেট্রোপলিসে বিভিন্ন পেশার অভিজ্ঞতার সমন্বয় ও বিনিয়োগ অনিবার্য হয়ে উঠছে: ডেমোগ্রাফার, সোশিওলজিস্ট, পলিটিক্যাল সায়েন্টিস্ট, এনথ্রোপলজিস্ট, ইকোনমিস্ট, ইঞ্জিনিয়ার, টাউন প্লানার, আর্কিটেক্ট, ইকোলজিস্ট, হাইড্রোলজিস্ট এবং সর্বোপরি অর্থের জোগানদাতা। একটি মেট্রোপলিটন শহর—মানুষের কোল থেকে কবর পর্যন্ত থাকা ৬৩ ধরনের চাহিদা—তাত্ত্বিকভাবে তার সবকিছুর জোগান দেবে ও সব ধরনের সেবা প্রদান করবে। আধুনিক মেট্রোপলিটন উন্নয়নে যোগ হয়েছে পরিবেশ ও বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জগুলো।

গড়ে ওটা নয় হাজার মেট্রোপলিসের একটি সাধারণ চিত্র হচ্ছে এখনো সংখ্যাগরিষ্ঠ নগরবাসী দারিদ্র্যপীড়িত, মেট্রোপলিসের ভেতরে ও মেট্রোপলিসগুলোর মধ্যে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। দরিদ্র দেশগুলোর ঘোষিত মেট্রোপলিসের জীবন একই সঙ্গে অস্বাস্থ্যকর ও ভীতিকর। বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন সুবিধা এখন প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছতে পারেনি। স্বাস্থ্যসেবা দুর্বল, অবকাঠামো অপর্যাপ্ত, সাধারণ মানুষ মেট্রোপলিটন প্রতারণার শিকার। নিরাপত্তা সংকট তীব্র। রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক এলিটদের শোষণের প্রধান ক্ষেত্র প্রান্তীয় মেট্রোপলিস। এসব মেট্রোপলিসের মধ্যে বেশ কিছুসংখ্যক মহানগরী কসমোপলিটন সিটি হিসেব আত্মপ্রকাশ করেছে। যেমন নিউইয়র্ক বা লন্ডনের মতো নগরী একই সঙ্গে মেট্রোপলিটন ও কসমোপলিটন।

কসমোপলিটনের মূল গ্রিক শব্দ কসমস থেকে উদ্ভূত। কসমস মানে মহাবিশ্ব। কসমোপলিটন শহর হচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ, বিভিন্ন জাতি, বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মেল্টিং পট, এমন শহরে বিভিন্ন দেশের মানুষ বাস করে তাতে বিভিন্ন ভাষা সংস্কৃতি ও আচারের সমন্বয় ঘটে। কসমোপলিটন শহরের আরো উদাহরণ হচ্ছে প্যারিস, সিডনি, টরন্টো।

৯ হাজার মেট্রোপলিটন নগর!

নগরবাসীর জন্য পৃথিবীতে ঘোষিত এবং ঘোষিত হতে যাচ্ছে, এমন মেট্রোপলিটন শহরের সংখ্যা নয় হাজার ছাড়িয়ে। তবে এর মাত্র এক ভাগ শহরের প্রতিষ্ঠিত লোকসংখ্যা ৫০ লাখের বেশি আর তাতেই মেট্রোপলিটনে জনসংখ্যা ২৬ শতাংশের বাস। নগর গবেষকরা মনে করেন যদিও কোনো কোনো অঞ্চলে মেট্রোশহরের লোকসংখ্যা কমছে, যদিও মোট জনসংখ্যার এর প্রভাব সামান্যই। বরং আগামী তিন দশকে আরো চার হাজার মেট্রোপলিটন এলাকা বিশ্বমানচিত্রে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে।

জনসংখ্যার বিচারে তিন কোটি ছাড়ানো মেট্রোপলিটন শহর দুটো টোকিও (৩৭ দশমিক ৩৯ মিলিয়ন) ও দিল্লি (৩০ দশমিক ২৯ মিলিয়ন)। দুই কোটি ছাড়ানো কয়েকটি শহর সাও পাওলো (২২ দশমিক ০৪), ঢাকা (২১ দশমিক ০৫), কায়রো (২০ দশমিক ৯০), বেইজিং (২০ দশমিক ৪৬), মুম্বাই (২০ দশমিক ৭৮)। অধিক জনসংখ্যার ২০টি মেট্রোপলিটন এলাকার অবশিষ্ট ১১টির সবই লোকসংখ্যা ১৩ দশমিক ৩৫ মিলিয়নের ওপর। নিম্নক্রম অনুসারে শহরগুলো হচ্ছে জাপানের ওসাকা, পাকিস্তানের করাচি, চীনের চঙকিঙ্গ, তুরস্কের ইস্তানবুল, আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেস, ভারতের কলকাতা, নাইজেরিয়ার লাগোস, কঙ্গোর কিনসাশা, ফিলিপিন্সের ম্যানিলা, চীনের তিয়ানজিন ও ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো।

এটা সত্য চীনের সাংহাই কিংবা জাপানের ওসাকায় সেখানকার জনগণের নগর সেবা প্রত্যাশার যতটা মেটে, ঢাকা ও তৃতীয় বিশ্বের অনেক শহরে তা প্রত্যাশাও করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রেই মেট্রোপলিটন মানুষকে প্রমিত মানের সেবার জোগান দেয়া নগর সরকার কিংবা রাষ্ট্রের ক্ষমতার বাইরে, কিন্তু তা নগরের আকার ও জনঘনত্ব বৃদ্ধি রোধ করতে পারছে না।

সেরা নগর সেবার মেট্রোপলিস

পৃথিবীর অনেক সংস্থা অনেক ধরনের সংখ্যা ও সূচক ব্যবহার করে নগরের মাননির্ধারণ করে থাকে। করোনাভাইরাস সংক্রমণ এবং কভিড ১৯-এর তাণ্ডব এতদিনের অনেক মেট্রোপলিটন সাফল্যকে চ্যালেঞ্জ করে বসেছে। যদি মাথাপিছু আয়ে শীর্ষ থাকা কিংবা প্রান্তিক শিক্ষায় অন্যসব মেট্রোপলিসকে মার দেয়া কিংবা বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শহর যদি করোনাভাইরাস সংক্রমণ ও মৃত্যু থেকে তার অধিবাসীকে রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তাহলে শ্রেষ্ঠত্বের র্যাঙ্কিং অর্থহীন হয়ে যায়।

ইকোনমিস্ট ইন্টিলিজেন্স ইউনিট ঘোষিত ২০১৯ সালের সবচেয়ে বাসযোগ্য নগর নির্বাচনে স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, অবকাঠামো ও পরিবেশ বিবেচনায় আনা হয়েছে। এ তালিখায় প্রথম ২৫টি নগর হচ্ছে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা, সুইজারল্যান্ড, জুরিখ, কানাডার ভ্যাঙ্কবার, নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড, জার্মানির মিউনিখ, জার্মানির ডুসেলডর্ফ, ফ্রাঙ্কফুট, ডেনমার্কের কোপেনহোগন, সুইজারল্যান্ডের বাজেল, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি, নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম, জার্মানির বার্লিন, সুইজারল্যান্ডের বার্ন, নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটন, কানাডার টরন্টো, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন, কানাডার অটোয়া, জার্মানির হামবুর্গ, অস্ট্রেলিয়ার পার্থ, কানাডার মান্ট্রিয়েল, জার্মানির নুরেমবার্গ, সুইডেনের স্টকহোম, নরওয়ের অসলো, সিঙ্গাপুর।

এ হিসাবের সঙ্গে মানুষের আর্থিক সম্মতির বিবেচনায় সবচেয়ে সস্তা ও সবচেয়ে বেশি খরচের ১০টি নগরীর নাম উল্লেখ করা সমীচীন হবে। সবচেয়ে বেশি খরচের শহরগুলো হচ্ছে সুইজারল্যান্ডের জুরিখ, নরওয়ের অসলো, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটি, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি, ফ্রান্সের প্যারিস, নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম, যুক্তরাষ্ট্রের হুনুলুলু, জাপানের টোকিও, কানাডার ভ্যাঙ্কবার ও জার্মানির হামবুর্গ। সবচেয়ে কম খরচের ১০টি নগরী হচ্ছে ভারতের দিল্লি, পোল্যান্ডের লোদজ, পোল্যান্ডের ক্র্যাকো, রোমানিয়ার বুখারেস্ট, চেক রিপাবলিকের প্রাগ, মরক্কোর ক্যাসাব্লাঙ্কা, হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট, পেরুর নিমা, থাইল্যান্ডের ব্যাংকক ও স্পেনের ভ্যালেন্সিয়া।

সবচেয়ে বেশি খরচ আর সবচেয়ে কম খরচের দুটো নগরীই মেগা মেট্রোপলিস। একটি জুরিখ একটি দিল্লি। পার্চেজিং পাওয়ার প্যারেটির হিসাবে দুই মেট্রোপলিসের ব্যয়ের একটি তুলনামূলক বিবরণী দেখা যেতে পারে। মেট্রোপলিস মানুষের জীবনমান উন্নত করে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে অর্থের জোগান আসে মেট্রোপলিটন নাগরিকের করের টাকা থেকেই। তার মেট্রোপলিসের সাফল্যের চাবিকাঠি অর্থ নয়, সুশাসন। রাজনৈতিক সদিচ্ছাই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মেট্রোপলিসে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছে।

 

এমএ মোমেন : সাবেক সরকারি কর্মকর্তা