প্রাচীন ভারতের
হরপ্পা সভ্যতার
ধ্বংসাবশেষ পাওয়া
গেছে প্রায়
১০ লাখ
বর্গকিলোমিটারের বেশি
অঞ্চলজুড়ে। পাওয়া
গেছে অন্তত
১ হাজার
৫০০ স্থাপনা।
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন
সাক্ষ্য দিচ্ছে
এখানকার অত্যন্ত
উন্নত নগরব্যবস্থার।
এ সভ্যতার
বেশ কয়েকটি
মেট্রোপলিস ছিল—হরপ্পা,
মহেনজোদারো, রাখিগড়ি,
কালিবাঙ্গান, লোথালনাম,
ধোলাভিরা। হাজারো
মানুষের বসবাস
ছিল এসব
শহরে। এ
শহরগুলোয় দক্ষিণ
ও মধ্য
এশিয়ার বিভিন্ন
প্রান্ত থেকে
মূল্যবান পণ্য
হাজির হতো।
হরপ্পার বণিকরা
মেসোপটেমিয়ার নগরাঞ্চলে
দোকান গড়েছিলেন।
মেসোপটেমিয়ার নগরগুলোর
শাসকরা হরপ্পার
কারখানায় তৈরি
পণ্য পছন্দ
করতেন। উভয়
সভ্যতাতেই নগরের
এক ধরনের
সমান্তরাল বিকাশ
দেখা গিয়েছিল।
প্রাচীন ভারতের
মেট্রোপলিস ছিল
এ হরপ্পা
বা সিন্ধু
সভ্যতার নগরগুলোই।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা
মহেনজোদারোতে প্রায়
এক লাখ
মানুষের বসবাস
ছিল। ফলে
এটি পরিণত
হয়েছিল ব্রোঞ্জ
যুগের সবচেয়ে
বড় শহরে
এবং সমকালের
সবচেয়ে উদ্ভাবনী
মেট্রোপলিস।
এ নগরগুলোর
গঠন কেমন
ছিল? এ
প্রশ্নের উত্তর
পেতে হলে
যেতে হবে
সিন্ধু-সরস্বতী
বা হরপ্পা-সভ্যতার
কোনো শহরের
ধ্বংসাবশেষ। হরপ্পা
সভ্যতার খননকার্যের
প্রত্নতাত্বিক নথিগুলো
ঘাঁটলে আশ্চর্য
হতে হয়
সেখানকার শহরগুলোর
সুব্যবস্থা দেখে।
নানা ধরনের
সুন্দর বাঁধানো
রাস্তা, দুই
ধারে সুপরিকল্পিত
বাড়ির সারি,
উচ্চমানের নিকাশি
ব্যবস্থা, ইত্যাদি
দেখলে বোঝা
যায় তত্কালীন
সিন্ধু-সরস্বতী
সভ্যতার মানুষের
জীবনযাত্রা বেশ
উন্নত মানেরই
ছিল। টাইম
মেশিনে চড়ে
তারা যদি
কোনোভাবে আজকের
কোনো ভারতীয়
শহরে এসে
পড়েন, প্রাথমিক
চটকাটা কেটে
যাওয়ার পর
নিছক নাগরিক
জীবনযাত্রার দিক
থেকে বিচার
করলে তারা
সম্ভবত একটু
হতাশই হবেন।
যেকোনো সভ্যতা
শুরু হয়
যখন মানুষ
সেখানে স্থায়ীভাবে
বসবাস শুরু
করে। আর
স্থায়ীভাবে থাকতে
গেলে তৈরি
করতে হবে
বাড়ি। এ
কারণেই যেকোনো
সভ্যতার মানদণ্ড
হিসেবে ধরা
হয় সেখানকার
বাড়িগুলো, যথা—প্রসাদ,
মন্দির, সাধারণের
থাকার বাড়ি,
বাজার ইত্যাদি।
এ বাড়িগুলো
কতটা বিজ্ঞানসম্মত
উপায়ে বানানো,
তাতে কী
ধরনের নির্মাণসামগ্রী
ব্যবহার হয়েছে,
সেগুলো কতটাইবা
প্রকৃতির সঙ্গে
মানানসই, এসব
তথ্য জানান
দেয় যে
একটা সভ্যতা
কতটা উচ্চমানের
ছিল। এ
কারণেই বেদ,
পুরাণ, মহাভারত,
রামায়ণ, জাতকের
গল্প বা
অন্যান্য পুরনো
বইয়ে লেখকদের
স্থাপত্য নিয়ে
আগ্রহ আমাদের
অবাক করে
না। একটি
সভ্যতার যুগচিত্র
তুলে ধরতে
তার স্থাপত্যের
বর্ণনা একটি
অতিপ্রাচীন রীতি
এবং অত্যন্ত
জরুরি।
হরপ্পা সভ্যতার
বিকাশ মূলত
৫৫০০ থেকে
১৫০০ খ্রিস্টপূর্ব
সময়জুড়ে। হরপ্পা
সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক
নথি, যা
একাধিক সাইট
বা খননকার্য
থেকে পাওয়া
গেছে, তার
থেকে এর
স্থাপত্যের মূল
বৈশিষ্ট্য হলো
শহর ঘেরা
উঁচু প্রাচীর,
বহু কামরার
বাড়ি— যেগুলো
কখনো-কখনো
দ্বিতলও হতো,
আলাদা স্নানঘর,
শৌচালয়, অতি
উন্নত মানের
জলনিকাশি এবং
জল সংরক্ষণ
ব্যবস্থা। এ
যুগের শহরগুলোর
নকশায় দেখা
যায় শহরের
পশ্চিম অংশটিতে
একটি টিলা
বা নিয়েতার
ওপর একটি
ছোট দুর্গ
তৈরি হতো,
আর শহরের
পূর্ব অংশে
আমজনতার শহর।
এ নকশা
আমরা দেখি
মহেনজোদারো এবং
কালিবাঙ্গান শহর
দুটিতে। লোথালনামক
বন্দর শহরে
দুর্গটি টিলার
ওপর তৈরি
হয়নি বটে,
তবে আমজনতার
শহর থেকে
দুর্গটি আলাদা
রাখার জন্যে
মাঝে একটি
দেয়াল তোলা
হয়েছে। ধোলাভিরা
শহরে আবার
এ দুর্গ
আর আমজনতার
শহরের মাঝখানে
আবার একটি
‘মধ্যশহর’
তৈরি করা
হয়েছিল, এসব
শহরেই ওই
পশ্চিম অংশটি
বা দুর্গের
কাছের অংশতে
সম্ভবত ধনী
ও প্রতিপত্তিশালীরা
থাকতেন, কারণ
এ অংশেই
থাকত শহরের
প্রধান স্থানগুলো—স্নানঘর,
শস্যগুদাম, পুরোহিতদের
বাড়ি ইত্যাদি।
আমজনতার শহরটি
আমজনতার জন্যেই
তৈরি হতো—সেখানের
বাড়িগুলো ছোট
ও ঈষৎ
ঘিঞ্জি, রাস্তা
পরিবর্তিত হয়ে
গেছে গলিতে।
ওই দুর্গ
ও সাধারণ
শহর দুটিকে
পরিক্রম করে
থাকত একটি
প্রাচীর, আর
তার বাইরে
পরিখা। প্রাচীরটি
হতো সমান্তরাল
চতুর্ভুজ, তাতে
নিয়মিত ব্যবধানে
থাকত চওড়া
দরজা এবং
লাগোয়া সুউচ্চ
চূড়া। শহরের
রাস্তা ছিল
চওড়া, সমান্তরাল;
মাটির ইট
দিয়ে তৈরি।
লোথাল শহরে
তার ওপর
সুরকি ছড়ানো
থাকত। রাস্তার
কোনার দিকের
বাড়িগুলোকে অনেক
সময় অর্ধগোলাকৃতি
করা হতো
বা তার
বাইরে একটি
বাড়তি বেড়া
দেয়া হতো,
যাতে পথচলতি
জনগণের অন্যমনস্ক
ধাক্কায় তার
ক্ষয়ক্ষতি না
হয়। রাস্তার
ধারে থাকত
নিকাশি ব্যবস্থা,
যা ঢাকা
থাকত ইট
ও পাথর
দ্বারা। এ
নিকাশি ব্যবস্থা
প্রত্যেকটি বাড়ি
পর্যন্ত ছিল;
দ্বিতলবাড়ি হলে
দ্বিতল থেকে
একতলা পর্যন্ত
নিকাশির পাইপ
পোঁতা থাকত
বাড়ির দেয়ালের
মধ্য দিয়ে।
নিয়মিত দূরত্বে
ম্যানহোল থাকত,
যাতে কঠিন
বর্জ্য পদার্থ
সহজে বের
করে আনা
যায়। এ
নিকাশি ব্যবস্থা
দিয়ে বর্জ্য
পদার্থ এসে
পড়ত কালভার্টে,
তারপর সেখান
থেকে শহরের
বাইরে। এ
নিকাশি ব্যবস্থার
থেকে আলাদা
ছিল বৃষ্টির
জলধরার ব্যবস্থা।
এ ধরনের
বিশাল ও
সুপরিকল্পিত নিকাশি
ও জলের
ব্যবস্থা আমরা
তত্কালীন বা
এর অব্যবহিত
পরের অন্য
কোনো দেশের
সভ্যতায় দেখতে
পাইনি।
বাড়ির আকার
ও প্রকার
আলাদা আলাদা
হতো এবং
তাতে একাধিক
ঘর থাকত।
মাঝখানে উঠোন,
দুই পাশে
সিঁড়ি দিয়ে
দোতলায় যাওয়ার
ব্যবস্থা। ঘরগুলোর
মেঝে হয়
ইটের টাইল
দিয়ে তৈরি
হতো অথবা
প্লাস্টার করা
থাকত—কখনো
কখনো মাটি
ও বালির
মেঝেও দেখা
গেছে। বাড়ি
তৈরিতে যে
ইট ব্যবহার
করা হতো
তা পোড়ামাটির,
১/২/৪
অনুপাত বজায়
রেখে এবং
একই মাপের।
প্রতিটি বাড়িতে
নিজস্ব শৌচাগার
ও স্নানঘর
থাকত, তবে
খুব ছোট
বাড়ি হলে
একাধিক বাড়ির
জন্যে একটি
শৌচাগার ও
স্নানঘরও দেখা
গেছে। স্নানঘরে
আজকের দিনের
মতো একদিকে
ঢাল দিয়ে
ড্রেন দিয়ে
জল বের
করার ব্যবস্থা
থাকত। শৌচাগারে
থাকত একটি
বড় পাত্র,
যা কমোড
হিসেবে কাজ
করত। মাটিতে
বসানো এ
পাত্রতে একটি
ছিদ্র করা
থাকত, যা
দিয়ে বর্জ্য
পদার্থ বেরিয়ে
ওই নিকাশি
ব্যবস্থায় পড়ত।
অনেক সময়
এর জন্য
ঢাল দেয়া
চ্যানেল তৈরি
করা হতো,
যাতে বর্জ্য
পদার্থ সহজে
নিকাশির চ্যানেলে
পড়তে পারে।
এছাড়া খাবার
জল ধরার
ব্যবস্থা, বৃষ্টির
জলধরার ব্যবস্থা—সব
মিলিয়ে হরপ্পার
লোকদের জলব্যবস্থা
এখনকার অনেক
শহরকেই টেক্কা
দিতে পারে।
এ তো
গেল সিন্ধু
সভ্যতার কথা।
যদি ভারতীয়
স্থাপত্যের মূল
রীতিনীতি জানতে
হয়, তাহলে
আমাদের পড়তে
হবে বাস্তুশাস্ত্র,
যা ভারতীয়
শিল্পশাস্ত্রের অংশ।
বস্তুত বাস্তুশাস্ত্রের
পরিধি স্থাপত্যশিল্পের
চেয়ে ঢের
বেশি বিস্তৃত।
শুধু গৃহ
নির্মাণ নয়—
বাগান নির্মাণ,
শহরের প্ল্যান
বা নকশা,
বাজারের প্ল্যান,
ড্রেনের ব্যবস্থা,
বাঁধ, নৌকাঘাট
এ সবই
বাস্তুশাস্ত্রের অন্তর্গত।
শুধু তাই
নয়, বাড়ির
আসবাবপত্রর ডিজাইন,
পোশাকের ডিজাইন,
বাড়িতে রাখা
বা দেয়ালে
খোদাই করা
মূর্তির ডিজাইন—সবই
এর মধ্যে
পড়ে। অর্থাৎ
আজকের দিনের
হিসেবে স্থাপত্যশিল্প,
ইঞ্জিনিয়ারিং (সিভিল
ও আর্কিটেকচার),
ইন্টিরিয়ার ডিজাইন,
ফ্যাশন ডিজাইন—সবই
এর অন্তর্গত।
এ ব্যাপারে
যে মহাগ্রন্থটি
আমরা প্রামাণ্য
বলে ধরে
নিই, তার
নাম ‘মানাসেরা
শিল্প-শাস্ত্র’।
৭০ অধ্যায়ের
এ বইটি
শুরুতেই বলে
‘বাস্তু
হচ্ছে সেই
স্থান, যেখানে
মানুষ ও
দেবতা একত্রে
অধিষ্ঠান করেন।’
ধারা (যা
ধারণ করে—অর্থাৎ
জমি), হর্ম্য
(অর্থাৎ গৃহ),
যান (অর্থাৎ
যাতায়াতের ব্যবস্থা)
ও পর্যঙ্ক
(অর্থাৎ বিছানা)।
সে যুগে
গৃহ বা
শহর নির্মাণ
করতেন নগরবর্ধকরা
(আর্কিটেক্ট), সঙ্গে
থাকত ইষ্টক
বর্ধকি (অর্থাৎ
রাজমিস্ত্রি) ও
বর্ধকি (অর্থাৎ
ছুতোরমিস্ত্রি)।
এ মিস্ত্রিরা
নিজস্ব গ্রাম
বা অঞ্চলে
থাকতেন—অর্থাৎ
কোনো একটি
গ্রামে হয়তো
কেবল রাজমিস্ত্রিই
থাকে। এ
ধরনের আঠারোটি
বৃত্তি ছিল—বর্ধকি,
চিত্রকর ইত্যাদি
যাকে নিয়ন্ত্রণ
করত তাদের
সমবায় সংঘ।
সে যুগে
শহর নির্মাণে
গুরুত্ব পেত
পরিখা নির্মাণ,
প্রাচীর নির্মাণ,
গোপুর অথবা
প্রবেশদ্বার নির্মাণ,
প্রতিরক্ষা, দ্বারকোটক
(গেট), দেবস্থান,
রাজপ্রাসাদ, পান্থশালা
ইত্যাদি। এছাড়া
থাকত তুলনায়
স্বল্প গুরুত্বের
গৃহ, নিবেশ
(বড়গৃহ), দানশালা,
অন্তরাপণ (বাজার),
আপণ (দোকান),
শস্যাগার ইত্যাদি।
এছাড়া তৈরি
হতো পার্ক,
সিংহতক (শহরের
মধ্যের প্রধান
স্থান), রাজমার্গ
(প্রধান রাস্তা),
বীথি (সাধারণ
রাস্তা), পতথি
(গলিপথ) ইত্যাদি।
অনেক ক্ষেত্রে
একেকটি রাস্তা
বা বীথি
বর্ণ অনুযায়ী
ব্যবহূত হতো—অর্থাৎ
বৈশ্যদের রাস্তা
ইত্যাদি।
আজো যখন
আমরা নানা
যুগের শহরের
ধ্বংসস্তূপের মধ্যে
দিয়ে হেঁটে
যাই, এ
স্থাপত্যের মূল
রূপরেখাটা চিনতে
কষ্ট হয়
না। সে
সাঁচি, অমরাবতীর
মতো প্রাচীন
শহরই হোক
অথবা জয়পুর-গোয়ালিয়র-বিজাপুরের
মতো মধ্যযুগের
শহরই হোক।
অতীত তার
ছায়া ফেলে
গেছে এ
শহরগুলোর ওপরেও।
মণিদীপা দে: ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ভ্রমণবিষয়ক লেখিকা





