পরিচালক ফ্রিত্জ
ল্যাং ১৯২৭
সালে নির্মাণ
করেছিলেন এক
এক্সপ্রেশনিস্ট মাস্টারপিস।
নির্বাক যুগের
এ ছবির
নাম মেট্রোপলিস।
ডিস্টোপিয়ান এ
ছবিতে কাহিনীকার
ছিলেন জার্মান
ঔপন্যাসিক, চিত্রনাট্যকার,
পরিচালক থিয়া
ভন হার্বো।
ছবিতে পরিচালক
ও কাহিনীকার
দেখিয়েছেন মেট্রোপলিসের
ডিস্টোপিয়ান ভবিষ্যৎ।
ছবিতে দেখা
যায় স্কাইস্ক্যাপারের
এক নগরে
গভীরভাবে বিভক্ত
মানুষের জীবন।
একদিকে ধনীরা
মেতে আছেন
খেলাধুলায়, বাগানে-প্রাসাদে।
অন্যদিকে শহরের
ভূগর্ভে কাজ
করেন শ্রমিকরা।
বিরাটাকায় এক
যন্ত্রকে সেবা
করাই তাদের
কাজ, যে
যন্ত্র শহুরে
ধনীদের জন্য
সব রকম
সুবিধা নিশ্চিত
করে।
মেট্রোপলিস নির্মাণের ধারণা ফ্রিত্জ ল্যাংয়ের মাথায় এসেছিল আধুনিক ও বাস্তব দুনিয়ার মেট্রোপলিস নিউইয়র্ককে দেখে। ‘ছবিটি জন্ম হয়েছিল ১৯২৪ সালের অক্টোবরে, যখন আমি প্রথমবার নিউইয়র্কের স্কাইস্ক্যাপারগুলোকে দেখেছিলাম।’ সেবারই তিনি প্রথমবার নিউইয়র্ক সফর করেছিলেন, উল্লেখ করেন, ‘আমি রাস্তাগুলোর দিকে তাকালাম—ঝকমকে বাতি আর লম্বা লম্বা সব ভবন—আর এখানেই আমি মেট্রোপলিসের ধারণা পেয়ে যাই।’
‘নগরকে
মনে হয়
শয়তানের মতো,
সরু গলিগুলো
যেন খনির
গ্যালারি’—ই
এম ফর্স্টারের
উপন্যাস হাওয়ার্ডস
এন্ডে। বিচ্ছিন্ন
আধুনিক সত্তার
জন্ম বড়
নগরে, মেট্রোপলিসে;
ছোট শহর
কিংবা গ্রামে
নয়। আধুনিক
সাহিত্যে তাই
নগর নিজেই
শরীর হয়ে
উঠেছে, যার
মধ্যে লেখকরা
নির্মাণ করেছেন
গল্প, উপন্যাস
কিংবা কবিতা।
দ্য
কন্ডিশন ফর
ওয়ার্কিং ক্লাস বইয়ে
১৮৪৫ সালে
ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস
লিখেছিলেন, ‘রাস্তার
ভিড়ভাট্টা বিরক্তিকর,
এটা মানুষের
প্রকৃতির কাছে
বিতৃষ্ণাদায়ক। সমাজের
বিভিন্ন শ্রেণী
ও পদবির
হাজার হাজর
মানুষ একে
অন্যের পাশ
কাটিয়ে যাচ্ছে...
তারা এমনভাবে
চলে যাচ্ছে
যেন নিজেদের
মধ্যে কোনো
মিল নেই,
কেউই যেন
কারো সঙ্গে
সম্পর্কযুক্ত নন।’
মডার্নিস্ট সাহিত্যে নগর একটি গুরুত্বপূর্ণ মোটিফ। হবেই বা না কেন, নগর তো আধুনিকতারই বাহন। প্রাচীনকালেও নগরগুলো সে সময়ে সমাজের তুলনায় আধুনিক ছিল, সেখানে বাস করত অপেক্ষাকৃত নতুন ভাবনার মানুষ। অসংখ্য উপন্যাস, কবিতায় এসেছে মানুষকে নগরের উপহার দেয়া শক, উচ্ছ্বাস, বিচ্ছিন্নতা, পরিচয়হীনতা, দ্বিধা কিংবা রোমাঞ্চ। মেট্রোপলিস মানে প্রান্ত নয়, একেবারে নগর সমাজের কেন্দ্রভূমি। গ্রিকদের থেকে আসা মেট্রোপলিস শব্দের মানে মাতৃশহর। সহজ কথায় নগরের শীর্ষ, নগরের কেন্দ্র। এ নগর জন্ম দেয় বিচ্ছিন্ন, অস্তিত্ব নিয়ে সন্দিহান মানুষের। এমন মানুষকেই সাহিত্যে প্রথম আলোচনায় নিয়ে আসেন ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ার। তিনি উদযাপন করেছেন ‘ফ্লানো’র জীবন। এ ফ্লানো হচ্ছেন সেই ভবঘুরে প্রকৃতির মানুষ যিনি সবার অজ্ঞাতেই নগর জীবনকে পর্যবেক্ষণ করে চলেন। এ মানুষেরাই আধুনিক মানুষ। এঙ্গেলসের বর্ণনা মতো এরা ভিড় হারিয়ে যাওয়া কিংবা বিরক্ত হওয়া মানুষ নন। বরং এরা ভিড়ের মধ্যে নিজের পরিচয় অজ্ঞাত হয়ে যাওয়াকেই উপভোগ করেন। ১৮৬৩ সালে বোদলেয়ার যুগসন্ধিক্ষণকে চিহ্নিত করে লেখা প্রবন্ধ ‘দ্য পেইন্টার অব মডার্ন লাইফ’-এ লিখেছেন, ‘ভিড়েই তার আবাস, যেমনটা পাখির জন্য বাতাস কিংবা মাছের জন্য জল। তার নেশা আর পেশা এ ভিড়ের শরীরের একটু অংশ হওয়া। একজন আদর্শ ফ্লানোর, কিংবা প্যাশনেট দর্শকের জন্য জনতার ভিড়ের কেন্দ্রে আবাস তৈরি, তাদের স্রোতের জোয়ার-ভাটায়, পলাতক আর অসীমের মধ্যে থাকাটাই চরম আনন্দের।’ ফ্ল্যানো মোটেই কোনো ভ্রামণিক নন, বরং তিনি একজন সংবেদনশীল নগরবাসী যিনি তার চোখে নগরকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন। বোদলেয়ারের চোখে এ মানুষরা একটি সচেতন ক্যালিডোস্কোপ।
১৮৩১ থেকে
১৯২৫ সময়কালে
লন্ডন ছিল
দুনিয়ার সবচেয়ে
বড় শহর।
এর গোলকধাঁধার
মতো ভূগোল
আর দিকভোলানো
কুয়াশা যেন
আধুনিক জীবনের
নানা অস্পষ্টতাকে
ব্যাখ্যা করার
জন্য দারুণ
এক সুযোগ।
আর্থার কোনান
ডয়েলের অনেক
কাহিনী কিংবা
জোসেফ কনরাডের
দ্য
সিক্রেট এজেন্ট লন্ডনকে
ঘিরেই। ই
এম ফস্টারের
হাওয়ার্ডস
এন্ডও
দেখায় লন্ডনের
জীবন। বিভিন্ন
চরিত্রের কাছে
লন্ডনের মানে
ভিন্ন। কারো
কাছে এ
নগর সংস্কৃতি,
সভ্যতা ও
মানবিকতার কেন্দ্র,
আবার কারো
কাছে বঞ্চনা
ও শোষণের
কারখানা।
কোনো এক
বিখ্যাত ভূগোলবিদ
বলেছেন, শহর
হচ্ছে বিভিন্ন
ন্যারেটিভের ছেদবিন্দু।
চার্লস ডিকেন্সের
অতি বিখ্যাত
উপন্যাস আ
টেল অব
টু সিটিজে
পাওয়া যায়
লন্ডন আর
প্যারিসকে কেন্দ্র
করে ঐতিহাসিক
গল্প। আছে
জেমস জয়েসের
ডাবলিনারস। সাদাত
হাসান মান্টো
বলেছিলেন, ‘এখন
আমি পাকিস্তানে।
কাল হয়তো
অন্য কোথাও
থাকব। কিন্তু
যেখানেই যাই
না কেন
আমি যা
তা বোম্বের
তৈরি। আমি
যেখানেই বাস
করি না
কেন, সবখানেই
বোম্বে আমার
সঙ্গে থাকে।...এমন
সময় ছিল
যখন বোম্বেতে
আমি ক্ষুধার
যন্ত্রণা ভোগ
করেছি। আবার
এমন সময়
এসেছে যখন
অনেক টাকা
রোজগার করে
ভালোই সময়
কাটিয়েছি। এ
শহরকেই আমি
ভালোবেসেছি এবং
এখনো ভালোবাসি।’
কোনো এক
শহর কোনো
লেখকের জীবনে
কত গভীরভাবে
জড়িয়ে যেতে
পারে তার
সাক্ষ্য মান্টোর
নিচের বাক্যগুলো—
সাড়ে চার
বছর আগে
আমার আরেক
বাড়ি বোম্বাইকে
বিদায় জানাতে
যেমন লেগেছিল
সে অনুভূতি
আমার মনে
এখনো তেমনই
জীবন্ত। জীবনের
সবচেয়ে কঠিন,
সুখী ও
স্মরণীয় সময়গুলো
যে শহরে
কাটিয়েছি তাকে
ছেড়ে আসতে
মন বিষাদে
ক্লান্ত হয়েছিল।
পরিবার থেকে
পরিত্যক্ত, উন্মূল
এক তরুণকে
বোম্বে তার
কোলে টেনে
নিয়েছিল আর
তাকে বলেছিল,
‘এখানে
তুমি দিনে
দুই পয়সা
কিংবা লাখ
টাকাতে আনন্দে
থাকতে পারবে।
আবার এ
শহরে তুমি
দুনিয়ার সবচেয়ে
দুর্দশাগ্রস্ত মানুষটিও
হতে পারো,
তা তুমি
যত টাকাই
উপার্জন করো
না কেন।
সবকিছুই তোমার
ওপর নির্ভর
করে। এখানে
তুমি যা
খুশি তাই
করতে পারো;
কেউ ডেকে
বাজে কথা
বলবে না।
পরিস্থিতি যত
কঠিনই হোক
না কেন
সবকিছু তোমাকে
একাই মোকাবেলা
করতে হবে।
কারো হস্তক্ষেপ
কিংবা সাহায্য
ছাড়া তুমি,
কেবল তুমিই,
তোমার জীবনের
সব গুরুত্বপূর্ণ
সিদ্ধান্ত নেবে।
চাইলে তুমি
রাস্তায় ঘুমিয়ে
থাকতে পারো,
আবার এমনও
হতে পারে
যে তুমি
কোনো প্রাসাদে
ঘুমাচ্ছ।’
মান্টোর বোম্বাই
থেকে যাওয়া
যাক মন্ট্রিলের
অলিগলিতে, যেখানে
খোদাই হয়ে
আছে লেনার্ড
কোহেনের জীবন।
কোহেনের জন্ম
মন্ট্রিলে, আজীবন
এ শহরকে
ভালোবেসেছেন। জীবনে
তিনি বহুবার
আবাস বদলেছেন
কিন্তু মন্ট্রিলকে
ভোলেননি। এ
শহরে তিনি
বারবার ফিরেছেন।
যে মন্ট্রিলকে
কোহেন চিত্রিত
করেছেন শব্দে,
সেখানে পাওয়া
যায় এর
দ্বান্দ্বিক রূপ—পুরনো
ও আধুনিক,
ধার্মিক ও
সেক্যুলার, ফরাসি
ও ইংরেজি।
তার কবিতা
আর গানে
এমন সব
বিষয় এসেছে
যেগুলো মানুষ
নরম চাদরে
আড়াল করে
রাখতে চায়।
বিখ্যাত গান
সুজান-এ
এসেছে মন্ট্রিলের
ভাস্কর্য ‘আওয়ার
লেডি অব
দ্য হারবার’।
লেনার্ডের মৃত্যুর
পর মন্ট্রিলে
তার দুটো
মু্যুরাল আঁকা
হয়। একটি
এঁকেছিলেন কেভিন
লেডো, অন্যটি
জিন পেন্ডন
ও এল
ম্যাক। শেষেরটার
নাম দেয়া
হয় ‘টাওয়ার
অব সংস’।
এ ম্যুরালটিতে
মনে হয়
কোহেন তার
প্রিয় মন্ট্রিলের
দিগন্তে চেয়ে
আছেন।
আমার আত্মা
বাস করে
বুয়েনস এইরেসের
গলিতে—বলেছিলেন
আর্জেন্টাইন লেখক
শব্দ আর
কল্পনার ধাঁধা
তৈরি করা
জাদুকর হোর্হে
লুই বোর্হেস।
ঘর থেকে
কখনই খুব
একটা বের
হতেন না
তিনি, তদুপরি
জীবনের বড়
একটা সময়
তার চোখে
আলো ছিল
না, মানে
অন্ধ হয়ে
গিয়েছিলেন। তার
পরও বুয়েনস
এইরেস তার
মনে আর
কল্পনাজুড়ে। বলাই
বাহুল্য এটি
আর্জেন্টিনার সবচেয়ে
বড় শহর,
প্রধান মেট্রোপলিস
ও রাজধানী।
এ শহর
তার কাছে
জীবন্ত এক
পুরাণ। নিজের
দ্য
মিথিক্যাল ফাউন্ডেশন অব বুয়েনস
এইরেস
কবিতায় লিখেছেন—
বুয়েনস এইরেসের
কোনো দিন
পত্তন হয়েছিল—এ
কথা বিশ্বাস
করা কঠিন;
এ শহরকে
মনে হয়
বাতাস আর
পানির মতোই
চিরন্তন।
শানজিদ অর্ণব: লেখক ও সাংবাদিক





