মহারাজা প্রতাপাদিত্যের বীরত্বগাথা প্রকাশ করতে গিয়ে ভারতচন্দ্র লিখেছেন,

‘যশোর নগর ধাম

প্রতাপ আদিত্য নাম’

মহারাজা প্রতাপাদিত্য রায় (১৫৬১-১৬১১ খ্রি.) বঙ্গদেশের যশোহর রাজ্যের নৃপতি, যিনি আগ্রাসী মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এক স্বাধীন রাজ্যের নৃপতি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি বাংলার বারোভুঁইয়ার অন্যতম প্রতাপশালী শাসক ছিলেন। মোগল শাসনাধীন ভারতে স্বাধীন ‘স্বরাজ’ স্থাপন করেন এ বাঙালি রাজা। তার রাজ্য উত্তর চব্বিশ পরগনা থেকে শুরু করে, বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়া, যশোর ও নড়াইল ও সন্দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। যশোরের ইতিহাস প্রতাপাদিত্যের ইতিহাস। তার ২৫ বছরের রাজত্বকালের গৌরবগাথা আজও যশোর-খুলনা অঞ্চলে বিদ্যমান। ক্যালকাটা রিভিউতে ব্রিটিশ পুলিশ কর্তা পি. লিও ফকনার হয়্যার প্রতাপাদিত্য রেনড শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন ১৯২০ সালে। সে প্রবন্ধের নির্বাচিত অংশের অনুবাদ—

জেমস ওয়েস্টল্যান্ড ১৮৭৪ সালে যশোর জেলা সম্পর্কে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, বিক্রমাদিত্যের এক ছেলে ছিল, যার নাম ছিল প্রতাপাদিত্য। তিনি সূর্যের নিচে পৃথিবীর সব সুন্দর গুণের অধিকারী। তিনি পিতার সমসাময়িক সময়ে নিজ গুণে পুরনা যশোর শহরের ধুমঘাটে এক নতুন নগরের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে পিতার মৃত্যুর পর তিনি যশোরের সব সম্পদের একমাত্র উত্তরসূরি হয়েছিলেন।

তখনকার সময়ে খুলনা জেলা চব্বিশ পরগনার অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তার বয়স যখন মাত্র পাঁচদিন তখন সূতিকাগৃহে তার মায়ের মৃত্যু হয়। শ্রীহরি পত্নী বিয়োগে যেমন মর্মাহত হলেন তেমনি পুত্রের পিতৃঘাতী হওয়া নিশ্চিত মেনে নিয়ে অশান্তি ভোগ করতে লাগলেন। সুতরাং প্রথম হতেই তিনি প্রতাপের ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন।

বাল্যকালেই প্রতাপ যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতা অর্জন করেন। তিনি তরবারি, তীর চালনা ও মল্লযুদ্ধে শিক্ষা গ্রহণ করে সুন্দরবনে শিকার করে বেড়াতেন। তার দুরন্তপনায় অতিষ্ঠ হয়ে বিক্রমাদিত্য বসন্ত রায়ের সঙ্গে পরামর্শ করে তাকে রাজনৈতিক শিক্ষার জন্য রাজধানী আগ্রায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। উদ্দেশ্য ছিল বাদশাহ আকবরের দরবারে যশোর রাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করতে গেলে রাজবাড়ীর উপদ্রব দূরীভূত হবে। তার অনুপস্থিতিকালে ভ্রাতৃদ্বয় কিছুকাল নিশ্চিন্তে রাজ্য শাসন করতে পারবেন।

প্রতাপ সেখানে বিশাল ভারত সাম্রাজ্য পরিচালনার বিষয়ে বিশেষ করে রাজপুত বীরদেব কীর্তিকলাপ সন্বন্ধে অনেক কিছু জানতে পারলেন। রাজধানী আগ্রায় তিনি প্রায় তিন বছর ছিলেন। ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে টোডরমল বঙ্গের জায়গিরদের বিদ্রোহ দমন করার জন্য বঙ্গে আগমন করেন। পরবর্তী সময়ে বঙ্গের শাসনকর্তা নিযুক্ত হয়ে অতি সুন্দরভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। টোডরমলের অনুপস্থিতিতে প্রতাপ কৌশল অবলম্বন করে যশোর রাজ্যের সনদ নিজ হাতে নিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন।

আনন্দ নাথ রায় ১৯১১ সালে প্রকাশিত ‘বার ভূঁইয়া’ শিরোনামের একটি রচনায় বলেন, প্রতাপাদিত্য দিল্লি থেকে ফিরে আসার পর বসন্তের সাহায্য ও সদিচ্ছায় রাজ্য পরিচালনা শুরু করেন। তিনি ‘রাজা’ উপাধি গ্রহণ করেন। নিজের পরিকল্পনা গোপন রেখে মোগল সম্রাটের নির্দেশ পালন করতে লাগলেন। ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি তার রাজ্যের মধ্যে দুর্গ তৈরি করতে লাগলেন। এ সময়ই ধুমঘাটে রাজধানী শহর নির্মিত হয়, যা নির্মাণ করতে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের পাঁচ বছর লেগেছিল ।

নিখিল নাথ রায় ১৯০৬ সালে মুদ্রিত ‘প্রতাপাদিত্য’ রচনায় উল্লেখ করেন, ‘প্রতাপাদিত্য তার পিতা ও পিতৃব্যের মতো একই জায়গায় বসবাস করতে অনিচ্ছুক ছিলেন। তাই নিজের জন্য একটি রাজধানী (নগর) স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন এবং যশোরের দক্ষিণ-পশ্চিমে ধুমঘাট নামে একটি গ্রামে প্রাসাদ নির্মাণ শুরু করেন। কালের পরিক্রমায় ধুমঘাট একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর হয়ে ওঠে এবং যশোরের খুব কাছেই ১০ বর্গমাইল পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। পরবর্তী সময়ে এ জনপদ যশোর রাজ্যের রাজধানী হয়ে ওঠে।

‘চন্ডিকান’ (চাঁদেকান) এবং ‘ধুমঘাটে’র সঠিক অবস্থান সম্পর্কে মতভেদ আছে। ঈশ্বরীপুরে এখনো মহারাজা প্রতাপাদিত্যের রাজমহলের ধ্বংসাবশেষ চোখে পড়ে। ফাদার হোস্টেন ‘বাংলার বারো ভূঁইয়া বা জমিদার’ নামক গবেষণাপত্রে লিখেছেন যে মধুমতীর তীরে কালীগঞ্জের নতুন বাজারের কাছেই চন্ডিকান রাজ্যের অবস্থান। এখন আমাদের জানতে হবে চন্ডিকান কোথায়? বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাচীন ধুমঘাট আর চন্ডিকান রাজ্য অভিন্ন। এটি কালীগঞ্জের কাছেই অবস্থিত। এ মতের প্রধান কারণ হলো ‘চাঁদেকান’ বা ‘চন্ডিকান’ ঐতিহাসিকভাবে প্রতাপাদিত্যের রাজধানী ধুমঘাটের অনুরূপ। জেসুইট পাদ্রিরা যখন চন্ডিকান পরিভ্রমণে আসেন, তখন প্রতাপাদিত্যের রাজ্য ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায় চলে এসেছিল। পরবর্তী সময়ে এ অঞ্চল পুরনো নামের বিকৃত উচ্চারণে ‘চাঁদ খান’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

ক্যাথলিক ঐতিহাসিক পিয়েরে দ্য জারিকের মতে, ১৬০২ সালে চট্টগ্রামে ফার্নান্দেজ নিহত হওয়ার পর জেসুইটরা চন্ডিকানে পালিয়ে আসে। তখনকার দিনে চট্টগ্রাম ছিল আরাকান রাজ্যের অধীনে। আরাকান রাজা মিন রাযাগি বিপুলসংখ্যক পর্তুগিজ পাদ্রিদের হত্যা করে। এদিকে চন্ডিকানে প্রতাপাদিত্য তাদের সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিলেও আরাকান রাজের সঙ্গে বন্ধুত্বের আশায় পর্তুগিজ পাদ্রিকে ব্যবহার করার ছক কষতে থাকেন। আরাকান রাজের পাঠানো গুপ্তচর পর্তুগিজ কমান্ডার কারভালহোকে হত্যা করে। এ খবর চন্ডিকানে এসে পৌঁছে পরদিন মধ্যরাতে। এ থেকেও এ দুটি স্থানের দূরত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। প্রতাপাদিত্য তার বাবার শহর যশোরে বাস না করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং ধুমঘাটে শহর প্রতিষ্ঠা করেন। এভাবেই তিনি চাঁদ খানে রাজধানীর জায়গাটি বেছে নিয়েছেন এবং প্রতাপাদিত্য এটি সরিয়ে নেয়ার কিছুকাল পর্যন্ত চাঁদ খানের নাম ধরে রাখতে পেরেছিল।

নিখিল নাথ রায়ের রচনায় স্যার টমাস রোয়ের ১৬১৭ সালের একটি মানচিত্র উল্লেখ করা হয়। সেখানে চন্ডিকান রাজ্যের অবস্থান চিহ্নিত করা হয়। পরে ফাদার হোস্টেন ১৬৩২ সালে একই স্থানে চন্ডিকান রাজ্যের কথা উল্লেখ করেন।

ধারণা করা হয়, প্রতাপাদিত্যের প্রতিদ্বন্দ্বী দুর্গ ও নগর চন্ডিকানের (যশোর) নিকটবর্তী গ্রাম ধুমঘাটে নির্মিত হয়েছিল। মি. বেভেরিজ বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন কেন তিনি চন্ডিকান ও ধুমঘাটকে অভিন্ন মনে করেন। তত্ত্বটি অনেকাংশেই যুক্তিসংগত। কারণ বিক্রমের সদর দপ্তর ও প্রতাপের নতুন রাজধানী খুব কাছাকাছি ছিল বলেই মনে হয়। যখন প্রতাপাদিত্য ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে তুলে নিয়েছিলেন তখন তাকে বেশি বেগ পেতে হয়নি। ঈশ্বরীপুরের অবস্থান কালীগঞ্জের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে। আর ঈশ্বরীপুরের আট মাইল উত্তর-পূর্বে প্রতাপনগর গ্রাম। এখানে এখন দৃশ্যমান স্থাপনা না থাকলেও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় দুর্গের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। বর্তমানে প্রতাপনগরের একমাত্র নিদর্শন হিসেবে একটি পুলিশ ফাঁড়ি অবশিষ্ট আছে।

ঈশ্বরীপুরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ধ্বংসস্তূপ হলো টেঙ্গা মসজিদ। এটি প্রায় ৫০ গজ দীর্ঘ একটি বড় ভবন। পাঁচটি গম্বুজ দ্বারা বেষ্টিত এ স্থাপনা স্থানীয় হিন্দু-মুসলিম সবার কাছে সমানভাবে আরাধ্য। ভেতর থেকে গম্বুজগুলো ৩৫ ফুট উঁচু। এর মধ্যে তিনটি গম্বুজ ঘূর্ণিঝড়ের ঝাপটা মোকাবেলা করে আজও জরাজীর্ণ অবস্থায় টিকে আছে। মসজিদটি সংরক্ষণের জন্য প্রাথমিক পদক্ষেপ না নেয়া হলে এটি অচিরেই ভেঙে পড়ার আশঙ্কা আছে। মসজিদ প্রাঙ্গণে কিছু কবরের ধ্বংসাবশেষ আছে। ধারণা করা হয়, এগুলো রাজা মান সিংহের সেনাপতিদের কবর, যারা প্রতাপাদিত্যের সঙ্গে লড়াইয়ে প্রাণ হারিয়েছিল।

যমুনা ও ইছামতির মিলনস্থলের দক্ষিণে পুরনো দুর্গের ধ্বংসাবশেষ আজও দৃশ্যমান। এখন কোনো ভবনই দাঁড়িয়ে নেই, কিন্তু উঁচু বেড়িবাঁধগুলোর অস্তিত্ব এক সমৃদ্ধ সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। বেড়িবাঁধের চারপাশের স্থাপনাগুলো ‘টাওয়ার অব লন্ডনে’র চারপাশে খনন করা খনির অনুরূপ। এ সময়ের কিছু নিদর্শন দৌলতপুর কলেজের জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। কলকাতায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সংগ্রহশালায়ও কিছু নিদর্শনের দেখা মেলে। সম্প্রতি কিছু অস্বাভাবিক আকারের হাড় পাওয়া গেছে, যা প্রতাপের হস্তীবাহিনীর বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দুর্গের উত্তর-পূর্ব দিকে ছিল ‘বারোদুয়ারি’ (প্রতাপাদিত্যের সভাকক্ষ)। দেয়ালের ধ্বংসাবশেষ থেকে এর খুব সামান্য অংশ এখন দেখা যায়। ইমারতটি নির্মাণে বিশেষ ধরনের নকশাদার ইট ব্যবহার করা হয়েছিল। সভাকক্ষের দক্ষিণে একটি বড় দীঘি আছে, স্থানীয়রা যাকে এখনো ‘বারোদুয়ারী পুকুর’ বলে জানে।

প্রাসাদের হাম্মামখানা (স্নানাগার) এখন পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে মেরামতযোগ্য অবস্থায় আছে। এ থেকে তখনকার দিনের স্থাপত্য শিল্পের নিদর্শন বোঝা যায়। ধারণা করা হয়, ভবনটি দ্বিতল বা ত্রিতলবিশিষ্ট ছিল। ভবনে তিনটি কামরা আছে। এর পূর্ব দিকে দুটি জলাধার ও একটি কূপ রয়েছে। প্রতিটি ঘরে একটি খিলানযুক্ত সিলিং রয়েছে এবং দেয়ালের মধ্য দিয়ে পাঁচটি গর্ত (সম্ভবত পাইপের জন্য) এখনো দৃশ্যমান। পশ্চিম দিকের কক্ষটির একটি দেয়াল ও ছাদের একটি অংশ খসে পড়েছে। হাম্মামখানার পাশেই অনেক ইট ও স্তম্ভ আবিষ্কৃত হয়েছে।

মসজিদের পূর্ব দিকে আছে ‘কালী মন্দির’। আয়তাকার ভবনটি ১২১৬ সালের দিকে নির্মিত হয়। বিক্রমাদিত্য যখন চন্ডিকানে (যশোর) পিছু হটেন, তখন সেখানে এ কালী মন্দির দেখতে পান। আনোরি নামে এক ব্রাহ্মণ এটি নির্মাণ করেছিল। ধুমঘাটে রাজ্য স্থাপন করার পর প্রতাপ পারিবারিকভাবে কালী পূজা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তাদের উদ্যোগেই মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করা হয়।

মুসলমানদের মসজিদ ও হিন্দুদের মন্দির ছাড়াও খ্রিস্টানদের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গির্জাও সে সময় নির্মিত হয়।

পিয়েরে দ্য জারিকের ইতিহাস থেকে জানা যায়, চারজন জেসুইট মিশনারি ১৫৯৮ ও ১৫৯৯ সালে বাংলায় এসেছিলেন। তারা হলেন ফ্রান্সিস ফার্নান্দেজ, ডমিনিক দা সোসা, দ্য ফনসেকা ও আন্দ্রে বোয়েস।

সোসা ১৫৯৯ সালের মে মাসে চট্টগ্রাম ত্যাগ করেন এবং একই বছরের অক্টোবরে চন্ডিকানে আসেন। ফনসেকা প্রথমে বাকলায় রাজা রামচন্দ্রের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। যুবক রামচন্দ্র তাকে উষ্ণভাবে গ্রহণ করেন এবং তাকে প্রতাপের রাজ্যে ভ্রমণের অনুমতি দান করেন। পরবর্তী সময়ে রাজা রামচন্দ্রের সঙ্গে প্রতাপ তার মেয়ে বিমলার বিয়ে দেন। এ বিয়ের ঘটনাটি ঐতিহাসিকভাবে কৌতূহলোদ্দীপক। এ বিয়ের ঘটনাবলি একাংশ নিয়েই রবীন্দ্রনাথ তার উপন্যাস ‘বৌ ঠাকুরাণীর হাট’ রচনা করেন।

ফাদার ফনসেকা চন্ডিকানে পৌঁছেন ১৫৯৯-এর ১৫ নভেম্বর। সেখানে তিনি একটি গির্জা নির্মাণের অনুমতি চাইলে উদার মনের ও সহনশীল রাজা তাকে অনুমতি প্রদান করেন। এটিই বাংলার প্রথম খ্রিস্টান গির্জা। অত্যন্ত আড়ম্বরের মধ্য দিয়ে গির্জাটি উদ্বোধন করা হয়।

ঈশ্বরীপুরে এখনো গির্জার ধ্বংসাবশেষের দেখা মেলে। স্থাপনাটি যশোরেশ্বরী মন্দিরের দক্ষিণ-পূর্ব থেকে কিছুটা দূরে এবং অন্যান্য ভবনের মতোই একটি প্রাচীর দ্বারা সুরক্ষিত। সম্প্রতি গির্জার পাশেই একটি কবরস্থান আবিষ্কৃত হয়েছে। পঞ্চায়েত শ্রীশচন্দ্র চ্যাটার্জী অধিকারীর মতে, সেখানে পাওয়া ৪০টি কঙ্কাল খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের। কবরগুলো পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সেগুলো মুসলিমদের রীতি অনুযায়ী উত্তর-দক্ষিণমুখী ছিল না। কাজেই ঈশ্বরীপুর শুধু হিন্দুদের কাছে কালী মন্দিরের জন্য এবং সুসজ্জিত টেঙ্গা মসজিদের জন্য মুসলমানদের আগ্রহের বিষয় নয়। সেই সঙ্গে খ্রিস্টানদের বিশেষত ক্যাথলিকদের জন্য এক পবিত্র ভূমি।

প্রতাপাদিত্যের রাজ্যে পাদ্রিদের এ সুরক্ষা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৬০২ সালে তিনি তাদের রাজত্ব থেকে বহিষ্কার করেন। তারা পরিকল্পিতভাবে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। ফাদার ফার্নান্দেজ সবচেয়ে অমানবিক আচরণের শিকার হয়ে চট্টগ্রামের একটি কারাগারে তার শেষ পরিণতি ভোগ করেন। শেষ পর্যন্ত চন্ডিকানের রাজা দাউদ খানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে প্রতাপ দিল্লির সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসেন। প্রতাপকে বশীভূত করার জন্য বাংলার গভর্নর মান সিংহকে নিযুক্ত করা হয়। অবশেষে ভবানন্দের সহায়তায় তিনি প্রতাপাদিত্যকে জীবিত বন্দি করতে সফল হন। ভবানন্দ তাকে একটা জটিল ও অপরিচিত সুন্দরবনের পথ দিয়ে যশোরে নিয়ে যান। বন্দি প্রতাপকে রাজকীয় ব্যবস্থাপনায় দিল্লিতে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়, কিন্তু খাঁচায় বন্দি হওয়ার অসম্মানের কাছে তিনি মৃত্যুকেই শ্রেয় মনে করলেন। বেনারসে পৌঁছার পর তিনি লুকিয়ে রাখা বিষপান করে আত্মহত্যা করেন।