‘তাহিরপুর’
এখন একটা
গণ্ডগ্রাম। অথচ
যশোরের প্রথম
ভারী কারখানা
গড়ে উঠেছিল
এখানেই। ঔপনিবেশিক
আমলে খেজুরের
রস থেকে
তৈরি হতো
চিনি। সেই
চিনি রফতানি
করা হতো
কলকাতাসহ ইউরোপে।
কারখানার পাশাপাশি
সেখানে তৈরি
হয়েছিল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের
থাকার কোয়ার্টার।
এখন সে
সবের কিছুই
নেই। সবই
ধ্বংসস্তূপে পরিণত
হয়েছে। কয়েকদিন
আগে সেখানে
গিয়েছিলাম। দেখলাম
ছড়ানো-ছিটানো
ইটের টুকরা,
কারখানার ধ্বংসাবশেষ।
শুধু স্মৃতিচিহ্ন
হিসেবে রয়েছে
কপোতাক্ষ নদের
তীরে একটি
পিলারের ধ্বংসাবশেষ।
যেখানে বাঁধা
হতো বড়
বড় জাহাজ,
নৌকা।
তাহিরপুরের অবস্থান
যশোরের চৌগাছা
উপজেলার হাকিমপুর
ইউনিয়নে। চৌগাছা
সদর থেকে
টানা উত্তর
দিকে ১০
কিলোমিটার যাওয়ার
পর হাকিমপুর
বাজার। সেখান
থেকে পিচের
রাস্তা ধরে
এক কিলোমিটার
পশ্চিমে গেলেই
তাহিরপুর। কপোতাক্ষ
নদের পূর্ব
পাশের এই
গ্রামে গড়ে
উঠেছিল ওই
চিনির কারখানা।
‘A Report on the District of Jessore(1871)
গ্রন্থের লেখক
J.
Westland, Esq, C.S যিনি
যশোরের ম্যাজিস্ট্রেট
ও কালেক্টর
ছিলেন, তিনি
লিখেছেন, ‘Sugar,
which is now so important a manufacture, distinguished Jessore in those days
also. It is mentioned as one of the evils of the 1787 inundation that it would
diminish the date-sugar manufacture. In the table of 1791 we find the sugar
produce put down at 20,000 maunds, of which half was exported to calcutta; and
the greater part of this was date-sugar.’
যশোহর-খুলনার
ইতিহাস গ্রন্থের প্রণেতা
সতীশচন্দ্র মিত্র
(দ্বিতীয় খণ্ড)
লিখেছেন, ঊনবিংশ
শতাব্দীর প্রথম
ভাগে বিলাতি
ব্যবসায়ীরা চিনির
কারবার করতে
বঙ্গে আসেন।
বর্তমানে ভারতের
পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের
অন্তর্গত ধোবা
নামক স্থানে
ব্লেক (Blake)
সাহেব
প্রথম ইংরেজ
কুঠি স্থাপন
করেন। কিন্তু
তার চিনির
ব্যবসা লোকসান
হতে থাকলে
তিনি ওই
কারখানা পরিচালনা
করতে অক্ষম
হন। পরে
তিনি সেই
কারখানা একটি
কোম্পানির নিকট
হস্তান্তর করেন
এবং তার
পুঁজি প্রত্যাহার
করে নেন।
সেটি তিনি
বিক্রি করেন
সাড়ে ৪
লাখ টাকায়।
পরে ধোবা
চিনি কোম্পানি
যশোরের কেশবপুরের
ত্রিমোহিনী এবং
বর্তমান ঝিনাইদহের
কোটচাঁদপুরে চিনির
কারখানা বসিয়েছিল।
ত্রিমোহিনী চিনি
কারখানার মালিক
ছিলেন সেন্টসবারি
এবং কোটচাঁদপুর
কারখানার মালিক
ছিলেন নিউহাউজ
সাহেব। একই
সময়ে কলকাতার
Gladstone
Wzllie & Co. চৌগাছায়
এসে কারখানা
খোলেন। প্রথমে
স্মিথ ও
পরে ম্যাকলিয়ড
(Mcleod) সাহেব
ম্যানেজার ছিলেন।
ম্যাকলিয়ড প্রথমে
স্থানীয় সব
খেজুর রস
কিনে নিয়ে
গুড় ও
চিনি প্রস্তুত
করতেন। বড়
বড় খেজুর
ক্ষেতে রস
ঢেলে দিলে
একটি নলের
সাহায্যে তা
কারখানায় পৌঁছে
যেত। সতীশচন্দ্র
মিত্র যশোর
খুলনার ইতিহাস
গ্রন্থ প্রথম
খণ্ড প্রকাশিত
হয়েছে ১৯১৪
সালে, আর
দ্বিতীয় খণ্ড
প্রকাশিত হয়েছে
১৯২২ সালে।
এ বই
লেখার সময়
তিনি তাহিরপুর
পরিদর্শন করেছেন।
তিনি তার
বইতে উল্লেখ
করেছেন, ‘কারখানার
পার্শ্বে সাহেবদের
যে সুন্দর
পাকা আবাস
বাটিকা ছিল,
তাহা এখনও
বসোপযোগী রহিয়াছে।
চারিপার্শ্বে এখনও
সুন্দর কলমের
বাগান, কবর
স্থান ও
সন্তান-সন্ততির
অকাল মৃত্যুজনিত
মর্মস্পর্শী স্মারকলিপি
আছে।’ কিন্তু
এখন তার
কিছুই নেই।
কোটচাঁদপুর, কেশবপুর,
ত্রিমোহিনী, ঝিকরগাছা
ও নারিকেলবাড়িয়ায়
এ কোম্পানির
কারখানা ছিল।
কিন্তু ১৮৫০
সালে সব
উঠে যায়,
কেবল কোটচাঁদপুর
ও চৌগাছায়
থাকে।
১৮৬১ সালে
নিউহাউজ সাহেব
চৌগাছার কারখানার
শাখারূপে কপোতাক্ষ
ও ভৈরবের
সঙ্গমস্থলে তাহিরপুর
নামক স্থানে
একটি চিনির
কারখানা খুলে
ইউরোপীয় মতে
চিনি প্রস্তুত
করতে থাকেন।
তার সঙ্গে
রাম মদ
প্রস্তুত করার
ভাটিখানারও যোগ
হয়। কিন্তু
পরে দেনা
বাড়তে থাকায়
১৮৮০ সালের
পর এমেট
চেম্বার্স কোম্পানির
নিকট কারখানা
বিক্রি করা
হয়। সাহেবরা
এসে কারখানা
ও বাড়ি
যথেষ্ট উন্নতি
করেছিলেন। তারা
হাড়ের গুঁড়ার
সাহায্যে চিনি
পরিষ্কার করার
নতুন পদ্ধতি
প্রবর্তন করার
চেষ্টা করেন।
কিন্তু কিছুতেই
কিছু হলো
না। ১৮৮৪
সালে ওই
কোম্পানি উঠে
গেল। এরপর
বালুচরনিবাসী ধনপত
সিংহ তা
কিনে নেন
এবং তিনি
মৃত্যুকাল (১৯০৬)
পর্যন্ত ওই
কারখানা চালিয়েছিলেন।
তার মৃত্যুর
পর ১৯০৯
সালে কাশিমবাজারের
মহারাজ মণীন্দ্রচন্দ্র,
হাইকোর্টের জজ
সারদা চরণ
মিত্র, নাড়াজোলের
রাজা বাহাদুর
প্রভৃতি ব্যক্তিরা
রায় বাহাদুর
ধনপতি সিংহের
সম্পত্তি খরিদ
করে নেন।
এরপর ‘তারপুর
চিনির কারবার’
নামে যৌথ
ব্যবসা খোলেন
এবং ইউরোপ,
আমেরিকা ও
জাপান থেকে
বিশেষজ্ঞ এনে
কাজ শুরু
করেন। তার
পরও কারখানা
চলেনি।
তবে এ
কথা ঠিক,
ওই কারখানা
বন্ধ হয়ে
গেলেও স্থানীয়ভাবে
মানুষ খেজুর
গুড় থেকে
চিনি তৈরি
করত। এর
মধ্যে যশোরের
রাজারহাট, খাজুরা,
মণিরামপুর, ঝিকরগাছা,
বসুন্দিয়া, নওয়াপাড়ায়
চিনির কারখানা
ছিল। কোটচাঁদপুরে
শতাধিক কারখানায়
চিনি তৈরি
হতো। সেখানে
কাজ করত
কয়েক হাজার
মানুষ। শীতকালে
গুড়ের গাড়িতে
রাস্তা বন্ধ
হয়ে যেত।
গুড়ের ভাঁড়
ভাঙা চাড়া
বা খাপড়া
পর্বতের সমান
উঁচু হয়ে
থাকত। ভাঁড়
ভাঙা দিয়ে
কোটচাঁদপুরে পাকা
রাস্তাও তৈরি
হয়েছিল। কেশবপুরে
এক সময়
‘কারখানা
পাড়া’ ও
‘কলকাতা
পট্টী’ ছিল।
কলকাতার বড়
ব্যবসায়ী এখানে
এসে চিনির
কারবার করতেন।
চৌগাছা ও
ত্রিমোহিনীতে বহু
কারখানা ছিল।
সতীশচন্দ্র মিত্র
বলেছেন, ‘এখন
মাত্র কোটচাঁদপুরে
শতাধিকের স্থলে
৩০/৩২টি,
চৌগাছায় একটি,
ত্রিমোহিনীতে ও
কেশবপুরে পাঁচ-সাতটি
করে কারখানা
চলছে।’
১৮৭৪ সালে
কোটচাঁদপুরে ৬৩
কারখানায় ৯
লাখ ৩৮
হাজার ৮৫০
টাকা খাটিয়ে
১ লাখ
৫৬ হাজার
৪৭৫ মণ
চিনি পাওয়া
যায়। আর
১৮৮৯ সালে
৮-৯
লাখ টাকা
খাটিয়ে ১৭
হাজার ৫০০
মণ চিনি
পাওয়া গিয়েছিল।
এক সময়
এ কারখানাগুলো
বন্ধ হয়ে
যায়। মূলত
১৮৯০ সালের
দিকে আখ
থেকে সাদা
চিনি উৎপাদন
শুরু হলে
খেজুর গুড়
থেকে চিনির
উৎপাদনে ধস
নামে। একে
একে কারখানাগুলোও
বন্ধ হয়ে
যায়। যশোরের
চিনি কারখানা
বন্ধ হওয়ার
পেছনে কারণগুলো
ব্যাখ্যা করেছেন
L.S.S.
O’ Malley. তার
Bengal
District Gazetteers, Jessore. (Calcutta: Bengal Secretaril Book depot.1912,
p-90) গ্রন্থে।
তিনি বলেছেন,
‘after
they had developed the industry, native merchants stepped in and appropriated
the trade to which they had given birth. The demand for native refined sugar
was greater than that for the first rate sugar manufactured by European means,
and the European consequently lost the trade.’
আগেই বলেছি
ইংরেজদের ফ্যাক্টরি
ব্যর্থতায় পর্যবসিত
হলেও বহু
দেশী ফ্যাক্টরি
চালু ছিল।
তবে দেশী
চিনি শিল্পকে
রক্ষা করতে
সরকার সে
সময় বিদেশ
থেকে আমদানীকৃত
চিনির ওপর
শুল্ক বৃদ্ধি
করেছিল। ড.
মোহাম্মদ মুহিবউল্যাহ
ছিদ্দিকীর লেখা
‘জসরের
ইতিহাস প্রসঙ্গ’
বইতে তিনি
উল্লেখ করেছেন,
‘জসরের
কালেক্টর রিপোর্ট
করে যে
আমদানীকৃত চিনির
ওপর শুল্ক
আরোপ দেশী
চিনি শিল্পকে
রক্ষা করতে
ব্যর্থ হয়।
কারণ শুল্কের
পরিমাণ এত
কম এবং
আমদানির পরিমাণ
এত ব্যাপক
যে তার
কোনো সুফল
বা প্রভাব
দেশী ফ্যাক্টরিগুলোর
ওপর পড়েনি।
এছাড়া প্রকৌশলগত
পশ্চাত্পদতা জসরে
চিনি শিল্পের
পতন তরান্বিত
করেছিল।...খেজুরের
রস ও
আখ থেকে
অপরিশোধিত চিনি
প্রচুর পরিমাণে
প্রাচীন পদ্ধতিতে
তৈরি হতো।
কিন্তু পরিশোধিত
আধুনিক মেশিনে
তৈরি চিনির
চাহিদা দিন
দিন বৃদ্ধি
পেয়েছিল, ফলে
যশোরের চিনি
শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত
হয়। সুতরাং
জনগণের মধ্যে
আধুনিক মেশিনে
তৈরি পরিশোধিত
চিনির চাহিদা
বৃদ্ধির কারণে
ইংল্যান্ড থেকে
তার আমদানিও
বৃদ্ধি পায়।’
কেন যশোরে
চিনির কারখানাগুলো
গড়ে উঠেছিল?
এ প্রশ্নের
উত্তর খুঁজতে
গিয়ে জানা
যায়, এ
চিনি তৈরি
করতে এক
ধরনের শেওলা
লাগে। যেটা
যশোর অঞ্চলেই
হয়। তার
নাম পাটা
শেওলা। প্রবীণ
ব্যক্তিরা জানান,
চিনি তৈরি
করার জন্য
প্রথমে ভাঁড়
ভেঙে তা
থেকে গুড়
নিয়ে বড়
বড় মাটির
নাদায় বা
জ্বালুয়ায় জ্বাল
দেয়া হয়।
প্রত্যেক নাদায়
দু-এক
মুষ্টি বীজগুড়
(মাতগুড় জ্বালিয়ে
শুষ্ক ও
নীরস করলেই
বীজ হয়)
মেশালেই গুড়
একবারের বেশি
জ্বাল দিতে
হয় না,
একবার জ্বালালেই
বীজের গুণে
গুড় থেকে
মাত নিঃসরণের
ক্ষমতা বাড়ে।
জ্বাল থেকে
নামিয়ে গুড়কে
ঠাণ্ডা বা
শীতল করে
তার ওপর
সেই পাটা
শেওলা দিয়ে
রাখতে হয়
কয়েক দিন।
এরপর সেই
গুড় থেকে
ওপরে চিনি
তৈরি হয়।
আর পাত্রের
নিচে যে
গুড় থাকে
তা আগের
মতো করে
আবার চিনি
তৈরি করা
হতো।
এভাবে পাকা
ও দলুয়া
দুই ধরনের
চিনি তৈরি
করা হতো
যশোরে। পাকা
চিনিই বিদেশে
রফতানি হয়েছে।
দলুয়া চিনি
ইউরোপে যেত
না। পাকা
চিনি বাড়িতে
সাধারণ ব্যবহার
ও সন্দেশ
তৈরি করতে
ময়রারা ব্যবহার
করতেন। ‘বাংলাদেশ
জেলা গেজেটীয়ার
বৃহত্তর যশোর’
গ্রন্থে (মাহবুব
তালুকদার সম্পাদিত-১৯৯৬)
বলা হয়েছে,
যশোরের খেজুরের
গুড় থেকে
তৈরি চিনি
দিয়ে ময়রা
সম্প্রদায়ের মানুষ
প্রথম মিষ্টি
তৈরি করেন।
১৮২০ সাল
থেকে তারা
এ ব্যবসা
শুরু করেন।
এ ব্যাপারে
বিখ্যাত ব্যবসায়ী
হিসেবে নদীয়া
জেলার দৌলতগঞ্জ
এলাকার রাম
সেন, বর্ধমান
জেলার সাতগাছিয়া
এলাকার ভগবান
দে এবং
নদীয়া জেলার
শান্তিপুর এলাকার
দশরথ ইন্দ্রের
নাম উল্লেখ
করা যায়।
এরা কালক্রমে
চিনি ব্যবসাকে
তাদের একচেটিয়া
ব্যবসায় পরিণত
করে।
উনিশ শতকে যশোরের চিনি শিল্পে কারখানার সংখ্যা, উৎপাদন ও উৎপাদিতের মূল্যের বিবরণ:
তথ্যসূত্র
১। যশোহর-খুলনার
ইতিহাস-দ্বিতীয়
খণ্ড,
সতীশচন্দ্র
মিত্র,
দে’জ
পাবলিশিং,
কলকাতা।
২। জসরের ইতিহাস
প্রসঙ্গ,
ড.
মোহাম্মদ
মুহিবউল্যাহ
ছিদ্দিকী,
আহমদ
পাবলিশিং
হাউজ,
ঢাকা।
৩। বাংলাদেশ জেলা
গেজেটীয়ার বৃহত্তর যশোর,
মাহবুব
তালুকদার
সম্পাদিত
(১৯৯৬)
৪। A Report on the District of Jessore(1871)-J.
Westland, Esq, C.S-Printed at the bengal secretariat office.
৫। Bengal District Gazetteers,
Jessore. (Calcutta: Bengal Secretaril Book depot- L.S.S. O’ Malley-1912.
সাজেদ রহমান: সাংবাদিক, যশোর






