১৯১২ সালে প্রকাশিত যশোর ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার (বাঁয়ে)। ১৮৭১ সালে যশোরের কালেক্টর ও ম্যাজিস্ট্রেট জে ওয়েস্টল্যান্ডের ‘আ রিপোর্ট অন দ্য ডিস্ট্রিক্ট অব যশোর’
ইংরেজ ঔপনিবেশিক
শাসনযন্ত্রের ভেতরে
ও বাইরে
থাকা ব্যক্তি—উভয়ের
কাছেই একাধিক
কৌতূহলোদ্দীপক কারণে
সেকালের যশোর
জেলা বিশেষ
আগ্রহ আর
উত্কণ্ঠার এক
বিষয় বলে
গণ্য হতো।
আগ্রহের কারণ
অবশ্যই যশোরের
সবুজে-শ্যামলে
ছাওয়া নয়নাভিরাম
ভূ-প্রকৃতি,
স্থানীয় মনোহর
কুটির শিল্প
ও অভিজাত
স্থাপত্যে ঋদ্ধ
নগর কাঠামো
এবং উত্কণ্ঠার
হেতু হলো
এই, বাংলার
এ বিশেষ
প্রশাসনিক অঞ্চলটি
বহু রকম
দুর্ঘটময় ঘটনায়
প্রায়ই অস্থির
হয়ে রইত,
তা কালান্তক
মহামারী কলেরা
কি ম্যালেরিয়া
হোক বা
‘নেটিভ’দের
আইন অমান্য
করে শাসকশ্রেণীর
হাড় কাঁপিয়ে
দেয়া বিদ্রোহই
হোক। ঔপনিবেশিক
আমলে ইংরেজদের
হাতে তৈরি
প্রশাসনিক নথিপত্রে
যশোরের কথা
মেলে বেশ
সবিস্তারেই।
উনিশ শতকের
গোড়াতেই যশোর
জেলা ওয়াকিফহাল
ব্যক্তিদের দৃষ্টি
কাড়ে পুরোপুরি
নেতিবাচক এক
কারণে। এলাকাটি
নাকি কলেরা,
আরো বিশেষ
করে বললে
‘এশিয়াটিক
কলেরা’র
উত্পত্তিস্থল। তবে
প্রখ্যাত ইংরেজ
ডাক্তার, চিকিৎসাবিজ্ঞানী
জন ম্যাকফারসন
(১৮১৭-৯০)
তার জরিপ
ও গবেষণানির্ভর
বই ‘অ্যানালস
অব কলেরা’য়
(১৮৭২) এ
সম্পর্কে খানিক
দ্বিমত পোষণ
করেন। ‘...হাইজিন
ও শারীরবিজ্ঞান
সম্পর্কে সর্বসাম্প্রতিক
এবং সর্বাধিক
খবরাখবর রাখেন
এমন অনেক
নির্ভরযোগ্য সূত্র
আমাদের জানাচ্ছে,
কলেরা রোগটি
১৮১৭ সালে
আদতে উদ্ভূত
হয়েছে সুন্দরবন
এলাকায়, কিংবা
যশোরের একটি
ক্ষুদ্র প্রান্তে...’—নিজের
বইতে ম্যাকফারসন
এ তথ্য
দেয়ার পর
আরো জানিয়েছেন,
ওই বছর
যশোর জেলায়
কলেরা এতটাই
ছড়িয়েছিল যে
তখন সেখানকার
স্থানীয় আদালত
সাময়িকভাবে বন্ধ
করে দিতে
হয়। তথ্যটি
তিনি আবার
পেয়েছিলেন যশোরের
বাসিন্দা জনৈক
মি. বার্নসের
থেকে। তবে
পূর্বোক্ত তথ্যগুলোতে
সীমাবদ্ধ থেকে
নিজে কোনো
সিদ্ধান্ত টানেননি
ম্যাকফারসন। তাই
পরে লিখেছেন,
‘...১৮১৭-এর
কলেরা মহামারী
যশোর থেকে
উদ্ভূত এমন
কথা সাধারণত
বলা হয়ে
থাকে; কিন্তু
ওই একই
বছরের মার্চেই
[কলকাতার] ফোর্ট
উইলিয়ামে কলেরায়
আক্রান্ত হয়ে
এক ব্যক্তির
মৃত্যু হয়েছিল।...মে
ও জুনে
কিশোরগঞ্জ ও
ময়মনসিংহ জেলায়
কলেরা মহামারী
আকারে ছড়িয়ে
পড়ে।...কলেরা
যশোরে আগস্টের
আগে আসেনি
এবং তাও
মাসের মাঝামাঝি
সময়ে।...’
ম্যাকফারসন গবেষকের
দৃষ্টিতে এ
মন্তব্য করতে
অবশ্য ভোলেন
না যে
যশোরেই কলেরা
মহামারী সবচেয়ে
ভয়ংকর রূপ
ধারণ করেছিল।
ডা. ম্যাকফারসনের
গবেষণা থেকে
এটা স্পষ্ট
হয়ে ওঠে
যে যশোরে
কলেরার বাড়বাড়ন্ত
থাকলেও অন্য
অনেক ইংরেজ
জেলাটিকে কলেরার
একক উৎসভূমি
হিসেবে অভিযুক্ত
করার যে
ধুয়া উনিশ
শতকে তুলেছিলেন,
তার কোনো
বৈজ্ঞানিক বা
তথ্যভিত্তিক সত্যতা
অন্তত নেই।
কলেরা ছাড়াও
যশোরে ম্যালেরিয়ার
বাড়বাড়ন্তের কথা
উঠে এসেছে
ইংরেজ সরকারের
তৈরি একাধিক
প্রতিবেদনে। ‘গভর্নমেন্ট
অব বেঙ্গল’-এর
জনস্বাস্থ্য বিভাগের
তরফ থেকে
১৯২৫ সালে
‘ম্যালেরিয়া
অ্যান্ড এগ্রিকালচার
ইন বেঙ্গল’
শীর্ষক একটি
প্রতিবেদন প্রকাশ
পায়। জনস্বাস্থ্য
বিভাগের পরিচালক
চেস এ.
বেন্টলি প্রণীত
ওই প্রতিবেদনে
যশোর জেলা
সম্পর্কে লেখা
হয়, বছরের
কিছু মাস
সেখানে কার্যত
অনেক এলাকা
পানিতে তলিয়ে
যায়। বছরের
বড় একটা
সময় কৃষিজমির
জলমগ্ন হয়ে
থাকাটা কৃষির
জন্য যেমন
ক্ষতিকর তেমনি
তা ম্যালেরিয়ার
প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধিতেও
ভূমিকা রাখে।
বেন্টলি সাহেবের
তৈরি করা
প্রতিবেদনে আরেকটি
কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য
মেলে; তা
হলো, ১৮৪২
সালে বাংলায়
ম্যালেরিয়া-সংক্রান্ত
এক জরিপে
বলা হয়,
খোদ কলকাতা
বা বাংলার
অন্য জেলার
(যেমন তত্কালের
অখণ্ড চব্বিশ
পরগনা) চেয়ে
যশোরে ম্যালেরিয়া
জ্বরে আক্রান্তদের
মৃত্যুহার ঢের
ঢের বেশি
ছিল। যশোর
জেলায় ম্যালেরিয়ার
এ উপদ্রব
দূর হয়নি
বিশ শতকে
এসেও। তাই
বেন্টলির রিপোর্টে
পরিস্থিতির নির্মম
চিত্র তুলে
ধরার পাশাপাশি
ভবিষ্যতে যশোর
থেকে ম্যালেরিয়া
নির্মূল কীভাবে
করা যায়,
সে বিষয়ে
বিশিষ্ট কজন
স্থানীয় ব্যক্তির
দেয়া উল্লেখযোগ্য
নিদানও দেয়া
হয়েছিল। তবে
বেন্টলি নিজে
কোনো দৃঢ়
প্রস্তাব নিজে
থেকে রাখেননি।
পয়োনিষ্কাশন বিষয়ে
তখনকার বিশেষজ্ঞ
প্রকৌশলী বাবু
ভোলানাথ ব্যানার্জির
বরাত দিয়ে
বেন্টলি লিখেছেন,
‘...জেলার
যেসব অংশে
জলসংকট রয়েছে
এবং যেসব
এলাকা বড়
নদী ও
উচ্চভূমি থেকে
অনেকটা দূরে
দূরে অবস্থিত—জেলার
সবচেয়ে বেশি
ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকা
আদপে সেগুলোই।...অধিকাংশ
গ্রামেই বৃহদাকৃতির
পুকুর নেই,
অগত্যা গ্রামবাসীকে
লম্বা পথ
হেঁটে নিকটতম
নদী বা
বিলে পানীয়
জল আনতে
যেতে হয়।...আর
সেগুলো ম্যালেরিয়ার
বীজ থেকে
মুক্ত নয়।...’
প্রকৌশলী ভোলানাথের
মন্তব্যের একদম
বিপরীত কথাও
বেন্টলি উদ্ধৃত
করেছেন, সেটি
১৯০৫ সালে
প্রচারপত্র আকারে
ছাপিয়ে প্রকাশ
করেছিলেন যশোর
মিউনিসিপ্যালিটির তদানীন্তন
সভাপতি আইনজীবী
উমেশচন্দ্র ঘোষ।
বিবৃতিটি এমন:
‘...যেসব
মানুষ বিলের
ধারঘেঁষা গ্রামগুলোতে
বসবাস করে,
তারা বলিষ্ঠ
ও স্বাস্থ্যবান।...বিলের
অস্তিত্ব যে
জেলায় ম্যালেরিয়ার
আনাগোনার মূল
কারণ মোটেও
নয়, সে
বিষয়ে কোনো
দ্বিমত থাকার
সুযোগ নেই।...’
দুই প্রতিষ্ঠিত
স্থানীয় বাঙালির
বক্তব্যের এমন
তারতম্য দেখে
বোঝা যায়,
ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব
সম্পর্কে সেকালের
যশোরে দ্বিমত
না থাকলেও
তার উৎস
যে ঠিক
কোথায়, তা
নিয়ে ভালো
রকমের মতান্তর
ঠিকই বিরাজ
করত।
তবে এ
নিয়ে দ্বিমত
করার সুযোগ
ছিল না
যে ম্যালেরিয়া
ধারাবাহিকভাবে যশোর
জেলার অধিবাসীদের
প্রাণ হরণ
ঠিকই বছরের
পর বছর
ধরে করে
চলেছিল। ১৯১২
সালে প্রকাশিত
যশোরের জেলা
গেজেটিয়ারে প্রাপ্ত
তথ্য অনুযায়ী
১৯০৬-০৭
সময়ে এককভাবে
জেলায় ম্যালেরিয়া
আক্রান্ত হয়ে
মৃত্যু ঘটে
১৯-২০
হাজার জনের।
ওই একই
সময়ে ১২
বছরের নিচে
বয়স জেলার
এমন ৬৪৪
জন শিশুর
রক্ত পরীক্ষা
করে দেখা
যায়, শতকরা
৬৬ শতাংশের
শরীরেই ম্যালেরিয়ার
জীবাণু পাওয়া
গেছে।
যশোরে ম্যালেরিয়া
বা কলেরার
তীব্র প্রাদুর্ভাবের
সঙ্গে বন্যার
আন্তঃসম্পর্ক নিয়েও
ইংরেজদের নথিপত্রে
কি লেখাজোখায়
অনেক বাক্য
ব্যয় করা
হয়েছে। বস্তুত
যশোরের ইতিকথা
লিপিবদ্ধ করার
ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক
দুর্যোগ তথা
বিশেষত বন্যার
বিবরণীকে তারা
যারপরনাই গুরুত্ব
দিয়েছেন। ১৮৭১
সালে যশোরের
প্রাক্তন কালেক্টর
ও ম্যাজিস্ট্রেট
জে ওয়েস্টল্যান্ড
‘আ
রিপোর্ট অন
দ্য ডিস্ট্রিক্ট
অব যশোর:
ইট’স
অ্যান্টিকুইটিজ, ইটস
হিস্ট্রি অ্যান্ড
ইটস কমার্স’
শিরোনামে প্রায়
৩০০ পৃষ্ঠার
একটি সুলিখিত
প্রতিবেদন তৈরি
করেন। তাতে
একটা অংশজুড়ে
আছে বন্যার
কথা। ওয়েস্টল্যান্ড
সতেরো শতক
থেকে যশোরে
কয়টি বড়
আকারের বন্যা
হয়েছে, তার
একটা খতিয়ান
দিয়েছেন। ১৭৯০
সালের বন্যায়
জেলার ইসফপুর
ও সাইদপুর
জমিদারি এস্টেট
এলাকা বিশেষভাবে
ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এলাকা দুটির
ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো
মেরামতিতে তখনকার
১ হাজার
২০০ টাকা
খরচ হয়েছিল।
কিন্তু সবচেয়ে
বেশি ক্ষতি
হয়েছিল যে
এলাকার, সেই
মোহাম্মদশাহীর অবকাঠামো-রাস্তাঘাট
মেরামতের জন্য
প্রয়োজন ছিল
১৩ হাজার
৬৪৯ টাকার;
অত টাকা
তখন আর
তদানীন্তন কালেক্টর
বরাদ্দ পাননি।
১৭৯৮, ১৭৯৯,
১৮০০, ১৮০১
ও ১৮০২
পরপর এই
পাঁচ বছরেও
জেলায় বন্যা
হয়। এ
কয় বছরের
জন্য জেলার
অবকাঠামো মেরামতির
খরচ পড়েছিল
যথাক্রমে ১
হাজার ৪০০,
১৫ হাজার,
৬ হাজার
৯৯৯, ২৮
হাজার ও
২৭ হাজার
২৮৭ রুপি।
তবু ওয়েস্টল্যান্ডের
খেদ এই
যে এত
কম টাকায়
বন্যার কারণে
সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি
পুষিয়ে নেয়া
সম্ভবপর হওয়ার
নয়। সরকারের
আরো বরাদ্দ
বাড়ানো উচিত।
যশোর জেলা
গেজেটিয়ারেও বন্যার
ভয়াল বিবরণ
পাই। বিশেষত
১৮৩৮-এর
বন্যাকে সবচেয়ে
মর্মান্তিক ও
প্রাণঘাতী বলে
গেজেটিয়ারে উল্লেখ
করা হয়েছে।
ওই বছর
এত বেশি
পরিমাণে ফসলি
জমি ক্ষতিগ্রস্ত
হয়েছিল ও
গবাদিপশু মারা
পড়েছিল যে
প্রায় মানবিক
বিপর্যয় দেখা
দেয়ার উপক্রম
হয়। ১৯০৯
সালের ১৭
অক্টোবর জেলায়
একটা বড়সড়
সাইক্লোন কীভাবে
আঘাত হেনেছিল
সেই রোমহর্ষক
বিবরণ গেজেটিয়ারে
আছে। যশোর
সদরে বেলা
২টায় তা
প্রথম আঘাত
হানলেও পূর্ণশক্তি
নিয়ে বনগাঁ
এলাকায় প্রবেশ
করে রাত
১০টায়। ওইদিন
১২ ইঞ্চির
মতো উচ্চতায়
বৃষ্টিপাত হয়েছিল।
১১ হাজার
৫৭টি দেশীয়
নৌকা ওই
সাইক্লোনের আঘাতে
ডুবে যায়।
৪ লাখ
৪৬ হাজার
৯০৬টির মতো
ঘরবাড়ি পুরোপুরি
বা আংশিক
ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্রেফ বাঁশ
দিয়ে তৈরি
করায় বহু
ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ
ধূলিসাৎ হয়ে
গিয়েছিল। যশোর
শহরে এত
গাছ ভেঙে
পড়েছিল যে
পুরো যাতায়াত
ব্যবস্থা সম্পূর্ণ
বন্ধ হয়ে
যায়। গাছ
কাটার জন্য
স্থানীয় মজুর
বা কুলিদেরও
পাওয়া যাচ্ছিল
না, এমনকি
ভালো পারিশ্রমিক
সেধেও। কারণ
তারা যখন
যার যার
নিজের ঘরবাড়ি
মেরামত করতে
ব্যস্ত ছিল।
অগত্যা উপায়
না দেখে
জেলখানার বন্দিদের
ভেঙে পড়া
গাছপালা সরাতে
নামানো হয়।
পুরো জেলায়
সেবার স্রেফ
ফলদ বৃক্ষই
ভেঙে পড়েছিল
৬ লাখ
৬২ হাজার
৩৩৬টি। গবাদিপশু
মারা যায়
৮ হাজার
২৭৪টি। অবকাঠামো
ও কৃষিক্ষেত্রে
ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক
হলেও ওই
সাইক্লোনে মানুষের
প্রাণহানি তুলনায়
কম হয়েছিল।
৭০ জনের
মৃত্যুর খবর
পাওয়া যায়,
যাদের মধ্যে
৪০ জনই
সদর এলাকার
বাসিন্দা। এদের
মধ্যে ৩৬
জন মারা
যায় মাথার
ওপর ছাদ
ধসে, ১১
জন গাছ
থেকে পড়ে
ও ১৬
জন জলে
ডুবে।
শুধু একতরফাভাবে
যশোরের রোগ-জর্জরিত
অবস্থার বর্ণনাই
রয়েছে সরকারি
কাগজপত্রে—এমনটি
অবশ্য নয়।
সে সময়ের
যশোর জেলার
চিনি শিল্পের
রমরমা প্রসার
ও বাণিজ্যের
উল্লেখ একাধিক
দাপ্তরিক নথি
ও নথিপুস্তকে
মেলে। যশোরের
গুড় ও
চিনি শিল্প
নিয়ে ওয়েস্টল্যান্ড
সাহেবও বিস্তারিত
লিখেছেন। সম্ভবত
উনিশ শতকে
জেলার গুড়
আর চিনি
উৎপাদনের আখ্যান
নিয়ে এটিই
একমাত্র লিখিত
বিবরণী। যশোরের
কোন জায়গায়
গুড় ও
চিনির উৎপাদন
সবচেয়ে বেশি
ছিল, তা
তার লেখা
থেকেই পড়ে
জানা যাক:
‘...কোটচাঁদপুর
এখন অব্দি
সবচেয়ে বড়
চিনি উৎপাদনশীল
এলাকা।...এটি
এবং এর
সংলগ্ন আরেকটি
গ্রাম সুলাইমানপুরের
মোড়ে মোড়ে
চিনিকল। এ
এলাকায় উৎপাদিত
বেশির ভাগ
চিনিই চলে
যায় কলকাতায়,
তবে প্রায়
সোয়া শতাংশ
বা তিনভাগের
একভাগ বাকরগঞ্জ
জেলার নলছিটি
ও ঝালকাঠিতেও
যায়।...কোটচাঁদপুর
থেকে কলকাতায়
[চিনি পৌঁছানোর
জন্য] দুটি
রুট আছে,
একটি নদীপথে—আরেকটি
স্থলপথে।...স্থলপথে
ইস্টার্ন বেঙ্গল
রেলওয়ের কিষাণগঞ্জ
ও রামনগর
স্টেশন পর্যন্ত
চিনির বস্ত
যায় বস্তুত,
তারপর তা
ট্রেনে চেপে
কলকাতা রওনা
হয়।...একই
প্রক্রিয়ায় গুড়ও
পাঠানো হয়ে
থাকে।...কোটচাঁদপুর
এবং তত্সংলগ্ন
এলাকায় প্রতি
বছর এক
লক্ষ মণের
কাছাকাছি চিনি
তৈরি হয়।
যার বাজারমূল্য
প্রায় ৬
লাখ রুপি।...জেলায়
উৎপাদিত চিনির
প্রায় সোয়া
শতাংশই এখান
থেকে আসে।...’
তবে যশোরের
সেরা গুড়
মিলত তখন
অন্য জায়গায়।
সেটি হলো
ঝিকরগাছা। ওয়েস্টল্যান্ড
লিখেছেন, ‘...চিনি
উৎপাদনের চেয়ে
এখানে গুড়
কেনা-বেচাই
বেশি হয়।
মাত্র তিন
কি চারটি
চিনিকল রয়েছে
এখানে।...’
ওয়েস্টল্যান্ডের চোখে,
চিনির ব্যবসা
ছিল তখনকার
যশোর জেলার
সমৃদ্ধির অন্যতম
উৎস। তার
হিসাবে এক
বছরেই জেলায়
গড়ে ২৫-৩০
লাখ রুপি
বাজারমূল্যের চিনি
উৎপাদিত হতো
(পরিমাণের দিক
থেকে আনুমানিক
চার লাখ
মণ); যা
থেকে শুল্কই
পাওয়া যেত
প্রায় ৩
লাখ ২৪
হাজার রুপি।
তবে বিস্ময়ের
সঙ্গে ওয়েস্টল্যান্ড
এও খেয়াল
করেন যে
যশোর জেলায়—বিশেষ
করে এর
পশ্চিমাংশে চাল
উৎপাদন নেহাতই
নগণ্য। বাকরগঞ্জের
নলছিটি ও
ঝালকাঠির চালের
বাজার থেকেই
যশোরের চাহিদার
বেশির ভাগটা
মেটে। জেলার
সুন্দরবন লাগোয়া
ভূখণ্ডের কোনো
কোনো অংশে
ধান বোনা
হতো বটে,
কিন্তু ‘কত
ধানে কত
চাল’ সেই
হিসাবে বসলে
তা আস্ত
একটা জেলার
ভাতের চাহিদা
মেটানোর মতো
যথেষ্ট ছিল
বলে মনে
হয় না।
ওয়েস্টল্যান্ড খেয়াল
করেছিলেন, সাধারণ
নৈতিক দৃষ্টিতে
আপাতভাবে ‘অগ্রহণযোগ্য’
কিন্তু অর্থকরী
কটি ফসল
চাষের প্রবণতাও
যশোর জেলায়
ছিল। তার
প্রতিবেদনের একটি
অংশের উপশিরোনামই
এমন—‘যশোর,
আ গাঞ্জা
ডিস্ট্রিক্ট’।
তিনি লিখেছেন:
‘...যশোর
জেলার মধ্যে
বেশ ব্যাপকভাবে
গাঁজার চাষ
হয়। বিশেষ
করে কেশবপুরের
রামচন্দ্রপুর ও
তারাগুনিয়ায়।...এমনকি
জেলার উত্তর-পূর্ব
কোনার অল্প
কিছু এলাকাতেও
এর চাষ
হয়ে থাকে।...’
জেলার কালেক্টর
হিসেবে দায়িত্ব
পালনের সময়
ওয়েস্টল্যান্ড দেখেছিলেন
বছরের জানুয়ারি
থেকে এপ্রিল—মাত্র
চার মাসেই
দেশের বিভিন্ন
জায়গা থেকে
ব্যাপারীরা এসে
৫০-৬০
হাজার মণ
গাঁজা কিনে
নিয়ে যাচ্ছে।
গাঁজা বিক্রির
মূল কেন্দ্র
ছিল কেশবপুর,
ফকিরহাট ও
নোয়াপাড়া। প্রতি
মণ গাঁজা
তখন ৪-৫
টাকা পাইকারি
দরে বিক্রি
হতো। কিন্তু
গাঁজা বিক্রির
পয়সা থেকে
আবগারি শুল্ক
আদায়ের জন্য
ভারি হ্যাপা
পোহাতে হতো
সরকারি কর্তাদের।
কারণ অনেক
সময় গাঁজা
ক্রয়ে ইচ্ছুক
ব্যাপারীরা আসত
রীতিমতো মধ্যরাতে।
এসে যত
দ্রুত সম্ভব
ক্রয় প্রক্রিয়া
শেষ করে
চম্পট দিত।
বিরাট পরিমাণে
গাঁজা এভাবে
যশোর থেকে
বিনা শুল্কেই
দেশের অন্য
এলাকায় খুচরা
বিক্রির জন্য
পৌঁছে যেত।
গাঁজার পাশাপাশি
আফিম চাষও
উনিশ শতকে
যশোরে চলত।
তবে আফিম
গাঁজার মতো
খুচরা আকারে
ও খোলাবাজারে
বিক্রি করা
নিষিদ্ধ ছিল।
চিকিৎসাদ্রব্য হিসেবে
ব্যবহারের জন্য
জেলা কালেক্টর
কখনো কখনো
ক্ষুদ্র লটে
আফিম ক্রয়-বিক্রয়ের
অনুমতি দিতেন।
এ অনুমতির
ফাঁকফোকর বের
করে তা
কাজে লাগিয়ে
জেলার কোনো
কোনো অসাধু
ব্যবসায়ী গোপনে
চড়া দামে
নেশারুদের কাছে
আফিম বিক্রি
অবশ্য করত।
এমনটি ঘটছে
কিনা তা
দেখার জন্য
জেলার হাটে-বাজারে
ঝটিকা অভিযান
চালালেও অবশ্য
খুব লাভ
হতো না।
চাহিদা থাকার
জন্য জেলায়
আড়ালে-আবডালে
খুচরা আকারে
আফিম বিক্রি
চলতেই থাকত।
এছাড়া ছিল
এ দুইয়ের
তুলনায় সামাজিকভাবে
তখন খানিক
গণ্য হওয়া
দেশী তামাকও।
দেশী তামাক
হুঁকায় ভরে
সেবনের ক্ষেত্রে
দরকারি অনুষঙ্গ
ছিল চিটা
গুড়, জেলার
গুড়ের কারিগররা
তাই ধূমপায়ীদের
চাহিদার কথা
মাথায় রেখে
আলাদা করে
চিটা গুড়ও
তৈরি করে
রাখতেন। কৃষিকাজের
পাশাপাশি কাঠের
তৈরি চিরুনি
ও বোতাম
তৈরির শিল্পও
যশোরের মানুষের
অন্যতম মুখ্য
পেশা বলে
গণ্য হতো
তখন। বেতের
ঝুড়ি ও
পাটি নির্মাণ
আর কাঠ
শিল্পের কাজ
করেও অন্ন
জুটত অনেকের।
বিশেষ করে
যশোরে কাঠের
চিরুনির খ্যাতি
বাংলা মুলুকজুড়েই
ছড়িয়ে পড়েছিল।
ওয়েস্টল্যান্ডের বিবরণী
ও জেলা
গেজেটিয়ারেও যশোরের
চিরুনি শিল্পের
কথা গুরুত্বের
সঙ্গে রয়েছে।
জেলাবাসী পেশাজীবীদের
আয়ই বা
কেমন ছিল
সেকালের যশোরে?
তাও সাহেবসুবারা
নথিবদ্ধ করতে
ভোলেননি। একজন
দক্ষ রাজমিস্ত্রির
দিনপ্রতি গড়
বেতন ছিল
১৮৯৪-৯৫
সালে ৮
টাকা, ১৯০৯-১০-এ
গিয়ে তা
অল্প বেড়ে
হয় ১০
টাকা ৮
পয়সা। আর
তুলনায় নবিশ
রাজমিস্ত্রির বেতন
পূর্বোক্ত প্রথম
কালপর্বে ছিল
৫ টাকা,
দ্বিতীয় কালপর্বে
৮ টাকা।
১৮৯৪-৯৫-এ
দক্ষ কাঠমিস্ত্রি
ও কামারের
দিনপ্রতি গড়
আয় ছিল
অভিন্ন: ১০
টাকা ৮
পয়সা এবং
১৯০৯-১০-এ
গিয়ে দেখা
যাচ্ছে, এ
দুই পেশাজীবীরই
আয় ৮
পয়সা করে
কমে গেছে।
কেন এমন
হলো, তার
ব্যাখ্যা অবশ্য
সাহেবরা দেননি।
সময়ের নিরিখে
জেলায় সবচেয়ে
আয় বেড়েছিল
কুলিদের; প্রাপ্তবয়স্ক
পুরুষ কুলিদের
দিনের রোজগার
উনিশ শতকের
শেষ দশকে
৪ টাকা
থাকলেও বিশ
শতকের প্রথম
দশকে তা
৮ টাকা
হয়। কিন্তু
দুঃখের বিষয়,
তখন লিঙ্গভিত্তিক
আয়বৈষম্য ছিল
প্রকট, পুরুষ
কুলিদের বিপরীতে
উনিশ ও
বিশ শতকে
নারী কুলিদের
দৈনন্দিন আয়
যথাক্রমে ছিল
২ টাকা
৮ পয়সা
ও ৫
টাকা।
রোজগারের এ
টাকা দিয়ে
খাদ্যদ্রব্য কিনতে
গেলে যশোর
জেলার মানুষের
কেমন খরচ
পড়ত, তার
হিসাবও গেজেটিয়ারে
মেলে। ১৯০৫-০৬
সালে সাধারণ
চাল কিনতে
গেলে টাকায়
১০ সের
অনায়াসে মিলত।
কিন্তু ১৯০৭-এ
গিয়ে ১
টাকার বিনিময়ে
কমে গিয়ে
সাত সের
চাল পাওয়া
যেতে থাকে।
একইভাবেই ১৯০৫-এ
১ টাকার
বিনিময়ে যথাক্রমে
৯ সের
বার্লি, ১৩
সের ছোলা
ও ১৩
সের লবণ
পাওয়া গেলেও
১৯০৭-এ
গিয়ে টাকাপ্রতি
হিসাবটা ঠেকে
৮ সের
বার্লি, ১০
সের ছোলা
ও ১১
সের লবণে।
ঔপনিবেশিক শাসকশ্রেণীর
হাতে তৈরি
বলে সরকারি
নথিপত্রকে অবহেলা
করার কিছু
নেই। যশোরের
ক্ষেত্রে যেমনটা
দেখতে পাই,
এ জেলার
নিকট অতীতের
স্থানীয় ইতিহাস
রচনার ক্ষেত্রে
সরকারি এসব
দলিলই হতে
পারে এক
বিরাট দুর্লভ
তথ্য আকর।
একপেশে চোখে
বিচার না
করে যাচাই
করে এসব
দলিলপত্রের খুঁটিনাটি
তলিয়ে দেখাও
তাই জেলাভিত্তিক
ইতিহাস রচনার
জন্য জরুরি
বৈকি।
মুহিত হাসান: নন-ফিকশন লেখক






