দীর্ঘ ভ্রমণে
খুলনা হয়ে
যশোরে প্রবেশ
করেন সাইকেল
ভ্রামণিক ডব্লিউএস
বার্ক। সেটা
ছিল ১৮৯৮
সাল। যাবেন
বনগাঁ। যশোরে
নেমে প্রাতরাশ
সারলেন একটি
ডাকবাংলোয়। যশোর
শহরেই জেলা
সদর দপ্তরের
অবস্থান। জেলার
নিজস্ব উৎপাদিত
পণ্য ও
আমদানির কেন্দ্র
এ শহর।
বার্ক তখন
যশোর শহরে
কী কী
দেখেছিলেন? বিভিন্ন
সরকারি দপ্তর,
কারাগার, গির্জা,
পাবলিক লাইব্রেরি,
দুটি সিমেট্রি,
হাসপাতাল ও
মন্দির। বার্ক
মন্দিরগুলোর স্থাপত্যশৈলীর
প্রশংসা করেছেন।
রেলস্টেশন থেকে
চাঁচড়া রাজবাড়ী
এক মাইল
দক্ষিণে অবস্থিত।
বাড়ির ধ্বংসাবশেষ
দেখেছেন বার্ক।
পাশেই একটি
দীঘি আছে,
যার নাম
চোরমারা। এমন
নামকরণের কারণ
হিসেবে বার্কের
মনে হয়েছে
কাছেই ছিল
চাঁচড়া রাজার
কারাগার, সেখানেই
হয়তো চোরদের
বন্দি রাখা
হতো। নির্যাতনও
করা হতো
না তা-ইবা
কে জানে।
এ রকম
প্রেক্ষিত থেকেই
এমন নাম
প্রচলিত হয়েছিল।
এসব বার্ক
লিপিবদ্ধ করেছেন
১৮৯৮ সালে
প্রকাশিত তার
গ্রন্থ ‘সাইক্লিং
ইন বেঙ্গল’-এ।
বার্ক জানাচ্ছেন,
বনগাঁ থেকে
যশোরের দূরত্ব
২৭ মাইল
এবং সড়কটি
অতি চমত্কার।
পুরো রাস্তাটি
মসৃণ এবং
গাছপালায় ছাওয়া।
বার্কের মতে,
এটা বেঙ্গল
প্রেসিডেন্সির অন্যতম
সেরা সড়ক।
এ সড়ক
ধরে বার্ক
বেনাপোল হয়ে
বনগাঁ গিয়েছিলেন।
আমরা বুঝতে
পারি, দীর্ঘ
এ পথই
বিখ্যাত ‘যশোর
রোড’।
১৮৪০ সালে
যশোরের তত্কালীন
জমিদার কালী
পোদ্দার যশোর
থেকে কালীঘাট
পর্যন্ত এ
রাস্তার কড়ই
গাছগুলো রোপণ
করেন, যাতে
তীর্থস্নানে যাওয়ার
পথে তার
মা ও
অন্য পুণ্যার্থীরা
গাছের ছায়ার
স্বস্তিতে যাত্রাস্থানে
পৌঁছতে পারেন।
পরবর্তী সময়ে
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের
সময় পাকিস্তানি
সেনাবাহিনীর গণহত্যা
থেকে বাঁচতে
এ সড়ক
ধরেই দলে
দলে মানুষ
সীমান্ত পাড়ি
দিয়েছিল। মার্কিন
কবি অ্যালেন
গিনসবার্গ সে
ইতিহাস স্মরণীয়
করে রেখেছেন
‘সেপ্টেম্বর
অন যশোর
রোড’ শীর্ষক
বিখ্যাত কবিতায়।
যশোর বাংলার
প্রাচীনতম এক
সমৃদ্ধ ভূখণ্ড।
প্রাচীন থেকে
আধুনিককালে তার
ইতিহাসে জড়িয়ে
আছে বৈচিত্র্যময়
নানা বাঁক।
অনেকের ধারণা
হতে পারে,
যশোহর নামটি
যশোর নামটির
কোনো অঞ্চলিক
উচ্চারণ। যদিও
ইতিহাস ঘাঁটলে
মেলে ভিন্ন
তথ্য। আরবি
ভাষায় ‘জসর’
শব্দের অর্থ
সেতু। যেহেতু
যশোর জলবহুল
অঞ্চল, তাই
সেতু বা
সাঁকোহেতু জসর
থেকে যশোর।
এমনটা লিখেছেন
কানিংহাম। কিন্তু
এখানেই ঐতিহাসিকের
দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে
নাক গলালেন
সতীশচন্দ্র মিত্র—‘কিন্তু
মুসলমান অধিকারের
পূর্ব হইতে
যশোর নামের
উল্লেখ দেখা
যায়। যশোর
একটি পীঠস্থান;
পীঠস্থানের তালিকায়
যশোরের নাম
আছে। অন্যান্য
প্রাচীন সংস্কৃত
গ্রন্থে যেখানে
যশোর রাজ্যের
প্রসঙ্গ আছে,
সেখানে “যশোর”
নামই দৃষ্ট
হয়; “যশোহর”
নাম নাই।
প্রতাপাদিত্য এ
যশোর রাজ্যের
রাজ হইয়াছিলেন।
বর্তমান খুলনা
জেলার দক্ষিণাংশে
অবস্থিত কালীগঞ্জ
হইতে ১২
মাইল দক্ষিণে
সুন্দরবন অঞ্চলে
তাহার রাজধানী
ছিল। সে
রাজধানীর নামও
যশোর। এই
রাজধানীর অন্তর্গত
ঈশ্বরীপুর নামক
স্থানে এখন
যশোরেশ্বরী দেবীর
পীঠমন্দির ও
মূর্তি আছে।’
পাওয়া গেল
যশোর নামের
সুলুক। কিন্তু
যশোর তাহলে
কবে যশোহর
হলো? এ
প্রশ্নের জবাবও
দিয়েছেন সতীশচন্দ্র
মিত্র। লিখেছেন,
‘প্রতাপাদিত্যের
পিতা বিক্রমাদিত্যের
রাজত্বকালে প্রথম
“যশোহর”
নাম হয়।
যশোর বনস্থলী
আবাদ করিয়া
তথায় নগরী
স্থাপনাকালে প্রতাপাদিত্যের
খুল্লতাত সুকবি
বসন্তরায় যশোরকে
যশোহর করিয়াছিলেন,
ইহাই বিশ্বাসযোগ্য
এবং এই
রূপ প্রবাদও
প্রচলিত রহিয়াছে।’
যশোহর নামকরণের
পেছনে কিছু
সূত্র সতীশচন্দ্র
উল্লেখ করেছেন।
বাংলার শেষ
পাঠান রাজা
দাউদ শাহ
মোগলদের হাতে
পরাজিত হয়ে
পালানোর সময়
গৌড়ের ধনভাণ্ডার
প্রতাপাদিত্যের হাতে
সমর্পণ করেন।
এ থেকে
অনেকে অনুমান
করেন গৌড়ের
যশ যশোর
নগরীতে প্রতিস্থাপিত
হওয়ায় নাম
হয়েছিল যশোহর।
আবার আরেক
মতানুসারে গৌড়ের
সঙ্গে তুলনার
কোনো বিষয়
ছিল না।
যশোর নিজের
সমৃদ্ধি গৌরবেই
‘অত্যধিক
যশস্বী’ হয়ে
যশোহর নাম
হয়েছিল। এভাবে
বহুদিন কাটল
যশোহর নামেই।
এরপর এল
ইংরেজ আমল।
১৭৮৯ সালে
ব্রিটিশ প্রশাসনের
আমলে যশোহর
ফিরে গেল
তার পুরনো
নামে—যশোর।
ইতিহাসে যশোর
রাজ্যের পত্তন
হয়েছিল ১৫৭৪
সালে। দাউদ
খাঁর ক্ষমতাগ্রহণের
মাধ্যমেই যশোর
রাজ্য প্রতিষ্ঠিত
হয়। নতুন
এ নগর
রাজ্য গঠিত
হয়ে নানা
ধরনের স্থাপনা
নির্মিত হয়।
পরবর্তী সময়ে
বিক্রমাদিত্য, তার
সহকারী বসন্ত
রায় এ
রাজ্য সুসংহত
করেন। এরপর
ইতিহাসের মঞ্চে
আসেন বাংলার
বারো ভূঁইয়ার
অন্যতম প্রতাপাদিত্য।
তার পতনের
পর চাঁচড়ার
রাজবংশীয়রা এ
যশোর রাজ্যের
কিছু অংশ
শাসন করেছিলেন।
তারা তখন
যশোরের রাজার
সম্মান পেয়েছিলেন।
অমিত রহমান: লেখক






