[খুলনার সন্তান সতীশচন্দ্র মিত্রের জন্ম ১৮৭২ সালে। শিক্ষাজীবনে পেয়েছিলেন ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের সন্নিধ্য। ১৯০০ সাল থেকে সতীশচন্দ্র যশোর ও খুলনা অঞ্চলের ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহ শুরু করেছিলেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’র প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৯১৪ সালে এবং দ্বিতীয় খণ্ড ১৯২২-এ। এখানে দ্বিতীয় খণ্ড থেকে যশোরে নীল চাষ ও বিদ্রোহ-সংশ্লিষ্ট অংশটির সংক্ষেপিত রূপে সংকলিত হলো। বর্তমান শিরোনামটি আমাদের দেয়া]

চিনির পর নীলই যশোরের প্রধান বাণিজ্য দ্রব্য ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীকেই যশোরের নীলের যুগ ধরা যায়। তন্মধ্যে ১৮১০ হইতে ১৮৬০ পর্যন্ত উহার ক্রমোন্নতির কাল। ১৮৫৮ অব্দে যে বিদ্রোহ উপস্থিত হয়, তাহাতে উহার সর্বনাশের সূত্রপাত হয় এবং শতাব্দী শেষ হইবার পূর্বেই নীলের চাষ একেবারে বন্ধ হয়। নীলের নতুন রকম বাণিজ্য-প্রণালী বিলাতি লোকে এদেশে আনেন বটে, কিন্তু নীল জিনিসটি এদেশে নতুন নহে। অতি প্রাচীনকাল হইতে নীল রঙের কথা ভারতবাসীদের জানা ছিল এবং তাহারা উহা প্রস্তুত করিতে জানিতেন। ধ্যানস্থ আর্যঋষিগণ আকাশের রঙ হইতে পালনকর্তা বিষ্ণুর বর্ণ নির্ণয় করিয়াছিলেন এবং পটে বা প্রতীকে সেই নীল বর্ণ প্রতিফলিত করিতেন। প্লিনি প্রভৃতি প্রাচীন রোমক পণ্ডিতগণ ইন্ডিকাম (Indicum) বলিয়া উহার বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন। ইংরেজি ইন্ডিগো (Indigo) কথা বা যে গাছ হইতে নীল হয়, সেই গাছের বৈজ্ঞানিক (Indigofera Tinctoria) নামের সঙ্গে ইন্দ বা হিন্দুস্থানের সম্বন্ধ চিরগ্রথিত রহিয়াছে।

আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরী’তে দেখিতে পাই, গুজরাটের অন্তর্গত আহমেদাবাদে এবং আগ্রার নিকটবর্তী বায়নাতে উত্কৃষ্ট নীল রঙ প্রস্তুত হইয়া কনস্টান্টিনোপলে যাইত, কিন্তু তখন সেই উত্কৃষ্ট দ্রব্যের মণকরা মূল্য ১০-১২ টাকার অধিক ছিল না। ১৬৩১ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ বণিকেরা আগ্রায় যথেষ্ট নীল সংগ্রহ করেন; কিন্তু সে সময়ে পারস্য ও ইংল্যান্ডে উহার বিক্রয় কমিয়া যাওয়ায় ইংরেজদিগের যথেষ্ট লোকসান সহ্য করিতে হয়। বার্নিয়ারের ভ্রমণকাহিনী হইতে জানি, বায়না প্রভৃতি স্থানে নীল সংগ্রহ করিবার জন্য ওলন্দাজ বণিকেরা তথায় বাসা করিয়া থাকিতেন। ভারতবর্ষে তখন কি প্রণালীতে নীল প্রস্তুত হইত, তাহা জানিতে পারা যায় নাই এবং বৈদেশিক বণিকেরাও উহা শিখিতে পারেন নাই।

ইংরেজ আমলের প্রথম ভাগে আমেরিকা হইতে নীল উৎপাদনের নতুন প্রণালী এদেশে আসে এবং উহার প্রথম প্রবর্তক হইয়াছিলেন একজন ফরাসি বণিক লুই বোনড। তিনি ১৭৩৭ অব্দের ফ্রান্সের অন্তর্গত মার্সেল শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং অল্প বয়সে পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে গিয়া দৈবক্রমে নীলের ব্যবসায় শিক্ষা করেন। তিনি ১৭৭৭ অব্দে বঙ্গ দেশে আসিয়া চন্দননগরে অধিষ্ঠান করত নিকটবর্তী তালডাঙ্গা ও গোন্দল  পাড়ায় দুইটি নীলকুঠি খুলেন; উহার চিহ্ন এখনো বিদ্যমান আছে। বোনড একজন অদ্ভুতকর্মা লোক; তিনি কয়েক বছর পরে মালদহে গিয়া আর একটি নীলকুঠি নির্মাণ করেন; সেদেশে চুণের অভাব দেখিয়া তিনি একটি মুসলমান কবরখানা হইতে মনুষ্যাস্থি উঠাইয়া উহাই পোড়াইয়া চুণ প্রস্তুত করিয়া লইয়াছিলেন। ১৮১৪ অব্দে তিনি বাঁকীপুরের নীল ব্যবসায়ে যোগ দেন এবং পরে কিছুদিনের জন্য যশোরের অন্তর্গত নহাটা কারবারের মালিক ছিলেন। সর্বশেষ তিনি কালনা নীলকুঠি হইতে এক বছরে ১ হাজার ৪০০ মণ নীল রফতানি করেন। ১৮২১ অব্দে তাহার মৃত্যু হয়। তিনিই ভারতবর্ষের মধ্যে সর্বপ্রথম ইউরোপীয় নীলকর। বঙ্গদেশে নীলের চাষের সংবাদ ১৭৮৯ অব্দের ২৯ অক্টোবরের সরকারি ঘোষণাপত্র হইতে প্রথম জানা যায়।

যশোরের কথা বলিতে গেলে, তথায় ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে কোনো বৈদেশিক নীলকরের কুঠি স্থাপিত হইবার প্রমাণ নাই। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ডিরেক্টরের অনুমতি ব্যতীত কোনো পাশ্চাত্য বণিক কারখানার জন্য এদেশে কোনো জমি লইতে পারিতেন না। ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে বোনড নামক এক ব্যক্তি উক্ত সভার অনুমতি লইয়া যশোরের অন্তর্গত রূপদিয়াতে এই জেলার সর্বপ্রথম কুঠি নির্মাণ করেন। ভৈরবের কূলে এখনো তাহার ভগ্নাবশেষ রহিয়াছে। পরের বছর টাফট সাহেব মহম্মদশাহীতে কুঠি খুলিবার আদেশ পান। ১৮০০ অব্দে টেলার সাহেব কয়েকটি কুঠি খোলেন এবং পরের বছর এন্ডারসন যশোরের কাছে বারান্দী ও নীলগঞ্জে এবং খুলনার কাছে দৌলতপুরে কুঠি করেন। এগুলির ভগ্নাবশেষ এখন একপ্রকার বিলুপ্ত হইতেছে। এই সময়ে প্রতি বছর বৈদেশিকদিগের নামের লিস্ট দাখিল করিতে হইত। ১৮০৫ অব্দে নিম্নলিখিত কুঠিয়াল সাহেবদিগের নাম পাওয়া যায়: [কুঠির নাম বাংলায় এবং মালিকের নাম ইংরেজিতে প্রদত্ত হইল] Deverell—ঝিনাইদহের নিকটবর্তী হাজরাপুর; Brisbane—কোটচাঁদপুরের কাছে দাঁতিয়ারকাটি; Taylor and Knudson—মীরপুর; Reeves—সিন্দুরিয়া; Razet—নহাটা; ইত্যাদি। এই রূপে ১৮১১ অব্দে যশোর ও ঢাকা জেলা নীলকুঠিতে পূর্ণ হইয়া গিয়াছিল।

সঙ্গে সঙ্গে কুঠিয়াল সাহেবেরা নিজ নিজ এলাকার সীমা ও প্রজাবিলি লইয়া বিবাদ আরম্ভ করিয়াছিলেন। ঝিঙ্গারগাছার কুঠির Jennings সাহেব এবং রূপদিয়ার Bond সাহেব যশোরে অভিযোগ করলেন। কালেক্টর (Thmaos Powney) তত্ক্ষণাৎ এক সাময়িক ইস্তাহার জারী করিয়া দিলেন যে, এক কুঠির ১০ মাইলের মধ্যে অন্য কুঠি বসিতে পারিবে না। এজন্য আইন প্রণয়নের আবশ্যকতা বিষয়ে তিনি গভর্নর জেনারেলকে লিখিলেন। কিন্তু লর্ড মিন্টো কালেক্টরের কথায় সম্মত হইলেন না। তিনি লিখিলেন, এরূপ আইন হইলে ২০ মাইল বা লক্ষাধিক বিঘা জমির উপর একজন নীলকরের প্রাধান্য স্থাপিত হইবে; তখন জমিদারদিগের ন্যায্য অধিকারের উপর হস্তার্পণ করা হইবে এবং প্রতিযোগিতার অভাবে প্রজার লভ্যাংশ কম হইয়া পড়িবে। সুতরাং আইন হইল না; তবে ঐ সময়ে নীলকরদিগের অত্যাচার নিবারণের জন্য কতগুলি নিয়ম প্রচারিত হইয়াছিল। সে অত্যাচারের কথা পরে বলিতেছি।

কালেক্টরের ইস্তাহার উঠিয়া গেলে নীলকরগণ দ্বিগুণ উৎসাহে সর্বত্র নীলকুঠি স্থাপন করিতে লাগিলেন। উহার ফলে প্রতিবছর যথেষ্ট নীল প্রস্তুত হইত এবং বিলাতে ও বিদেশের সকল বিপণিতে বঙ্গীয় নীলের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। এমনকি, কথিত আছে, ১৮১৫-১৬ অব্দে বঙ্গদেশ হইতে সমগ্র পৃথিবীর লোকের প্রয়োজনীয় নীল সরবরাহ করা হইয়াছিল। আর এই নীলই সর্বোত্কৃষ্ট ছিল, বিশেষত নদীয়া ও যশোর জেলার নীল জগতের মধ্যে অতুলনীয়।

প্রথমত জমিদারের অধীন অল্প অল্প জমি-জমা লইয়া সাহেবেরা প্রধানত স্থানীয় রাইয়তের সাহায্যে নীলের চাষ করাইতেছিলেন। পরে ১৮১৯ অব্দের অষ্টম আইনে জমিদারদিগকে পত্তনী তালুক বন্দোবস্ত করিবার অধিকার দেওয়ায় এক এক পরগনার মধ্যে অসংখ্য তালুকের সৃষ্টি হইল এবং জমিদারগণ নবাগত নীলকরদিগের নিকট হইতে উচ্চহারে সেলামী  লইয়া নীলের ব্যবসায়ে যোগ দিলেন। উহাদের মধ্যে নড়াইলের জমিদারেরা অগ্রণী। সাহেবদিগের সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিয়া কাজ চালাইবার জন্য উহারা সাহেব ম্যানেজার রাখিয়াছিলেন। এখনও নড়াইলের নিকটবর্তী ঘোড়াখালিতে নীলকুঠির পার্শ্বে সেই আমলের সাহেব ম্যানেজারের বাড়ি আছে। উহা এখন উঁহাদের জমিদারির প্রধান ম্যানেজারের আবাস বাটিকা।

নদীয়া-যশোরের নীলের খ্যাতি বিলাতে পৌঁছিলে, বহু ধনীর পুত্র এ ব্যবসায়ে বড়লোক হইবার আশায় এদেশে আসিতে লাগিলেন। কেহ নিজে স্বত্বাধিকারী থাকিয়া, কেহ কেহ বা কয়েকজন মিলিয়া যৌথ কোম্পানি স্থাপন পূর্বক এক একটি বিস্তৃত Concerns বা কারবার খুলিতেন, উহাকে সাধারণ লোকে হৌস্ বা কান্সরণ বলিত। কথাটা চলিত হইয়া গিয়াছে বলিয়া আমরা কারবার বা কান্সরণ উভয় কথাই ব্যবহার করিব। এক একটি কান্সরণের মধ্যে নানা স্থানে কতকগুলি করিয়া কুঠি (factory) থাকিত, সকলগুলির কার্যব্যবস্থায় একই কর্তৃপক্ষের দ্বারা হইত। সর্বোপরি যিনি কর্তা বা ম্যানেজার তাহাকে বড় সাহেব এবং তাহার সহকারীকে ছোট সাহেব বলা হইত। কান্সরণের মধ্যে প্রধান কুঠির নাম ছিল সদর কুঠি। কারবারের পরিমাণ বড় না হইলে, একজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষই যাবতীয় কর্তব্য সম্পাদন করিতেন। কার্যকারিতা শক্তিই বৃটিশকে রাজার জাতি করিয়াছে।

ম্যানেজারের অধীন কয়েকজন দেশীয় কর্মচারী থাকিতেন, তন্মধ্যে প্রধান ছিলেন নায়েব বা দেওয়ান। উহার বেতন ৫০ টাকা, সে আমলে তাহাই উচ্চহার। নায়েবের অধীন থাকিতেন গোমস্তা। রাইয়তদিগের হিসাবপত্রের সহিত উহাদের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ছিল; এজন্য তাহারা প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্যভাবে দস্তুরী বা উেকাচ গ্রহণ করিয়া বেশ দু’পয়সা আয় করিতেন। সাহেবদিগের অবোধ্য অশ্লীল গালাগালি এবং সময়মতো বুটের আঘাত উহারা বেশ হজম করিতে জানিতেন এবং কোন প্রকার মিথ্যা প্রবঞ্চনা বা চক্রান্তে পশ্চাত্পদ না হইয়া ইহারাই অনেক স্থলে দেশীয় প্রজার সর্বনাশ বা মর্মান্তিক যাতনার হেতু হইয়া দাঁড়াইতেন। ভালো লোক কেহ থাকিতেন না, তাহা বলিতেছি না; তবে সাধারণত ভালো থাকা যাইত না। সত্যের অনুরোধে বলিতে হয়, দেশীয় লোকে দেশ ও স্বজাতির পানে চাহিয়া আত্মসম্মান বজায় রাখিয়া চলিলে, নিশ্চয়ই নীলের ব্যবসায় এত কলঙ্কিত হইত না। গোমস্তা ব্যতীত, জমি মাপের জন্য আমিন, নীল মাপের জন্য ওজনদার, কুলি খাটাইবার জন্য জমাদার বা সর্দ্দার, খবর প্রেরণ ও সময়মত রাইয়তদিগকে কাজের জন্য কয়েকজন করিয়া তাগিদগীর বা তাইদগীর থাকিত।

সমগ্র যশোর জেলার উত্পন্ন নীলের হিসাব হইতে দেখা যায়, ১৮৪৯- ৫০ অব্দেই সর্বাপেক্ষা অধিক নীল উত্পন্ন হয়, উহার পরিমাণ ১৬,৮১৮ মণ। আকস্মিক বন্যাদির জন্য ১৮৫৫-৫৬ অব্দে নীলের পরিমাণ কমিয়া ৬,৫৮৫ মণ মাত্র হয়। ১৮৪৯ হইতে ১৮৫৯ পর্যন্ত ১০ বছরের গড় ধরিলে প্রতি বছর ১০,৭৯১ মণ উত্পন্ন হইত। ১৮৫০ অব্দকেই বঙ্গীয় নীল ব্যবসায়ের উচ্চ সীমা বলা যায়। ১৮৬০ অব্দের পর হইতে উহার ক্রমে অবনতি হইতে হইতে ৩০ বছর মধ্যে সম্পূর্ণ পতন হয়।

১৮১০ হইতে নীলকরদিগের অত্যাচারের বার্তা শোনা যায়। ঐ বছর ৪ জন নীলকরের লাইসেন্স কাড়িয়া লওয়া হয় এবং অন্য সকলে যাহাতে রাইয়তের উপর কোন মারপিট বা অত্যাচার না করে তজ্জন্য হুকুম জারি হয়। কিন্তু তবুও অত্যাচার থামে না। প্রজাকে জোর করিয়া দাদন দিবার যে অভ্যাস ১৮১০ অব্দে ছিল, তাহা ১৮৫৯ অব্দেও যায় নাই। প্রথমে নীলকরেরা আত্মকলহ করিতেন, শেষে কলিকাতায় তাহাদের সমিতি (Indigo Planters Association) গঠিত হইলে সে বিবাদ থামিল, কিন্তু উহারা তালুকাদির মালিক হওয়ার পর রাইয়তের উপর অত্যাচার বাড়িল। তাহার ফলে খ্রিস্টধর্মে জাতি যাওয়ার ভয়ের মত, নীলকেও প্রজারা শত্রু মনে করিল। কথা উঠিল—‘জমির শত্রু নীল, কাজের শত্রু ঢিল (আলস্য), আর জাতির শত্রু পাদ্রী হিল (রেভারেন্ড হিল)।’

তখন হইতে প্রজারা নীলকরের বিরুদ্ধে অত্যাচারের অভিযোগ আনিতেন, সাহেবরাও চুক্তিভঙ্গের আপত্তি করিতেন। কিন্তু গভর্নমেন্ট গোলমাল মিটাইবার জন্য বিশেষ কোন ব্যবস্থা করিলেন না। ১৮৩০ অব্দে এক আইন (Regulation V of 1830) পাশ হইল, তদ্দারা চুক্তিভঙ্গের জন্য ফৌজদারী মোকদ্দমা হইত; পাঁচ বছর পরে বেন্টিঙ্ক এ আইন তুলিয়া দিলেন। লর্ড মেকলের মতে দেওয়ানি আদালতেই চুক্তিভঙ্গ মামলা হওয়া স্থির হইল। মহামান্য হ্যালিডে যখন বাংলার প্রথম ছোটলাট হন, তখন তিনি এসব বিষয়ে কিছুই মনোযোগ করিতেন না; এমনকি, তিনি নীল-প্রধান জেলায় নীলকর সাহেবকে সহকারী অবৈতনিক ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত করিতে লাগিলেন (১৮৫৯)। সাধারণ লোকে ভাবিল বুঝি গভর্নমেন্ট নীলের অংশীদার। নীলকরেরা এই সুযোগ ধরিয়া অত্যাচারের মাত্রা বাড়াইলেন। উহা হইতে কিরূপে নীল-বিদ্রোহ উপস্থিত হইল, তাহাই এখন বলিব।

নীলের চাষে লাভ নাই, তাহা প্রজারা বুঝিলেন। তখন হইতে তাহারা নীলচাষ না করিয়া কাল কাটাইবার চেষ্টা করিতেন। কুঠিয়াল সাহেবেরা নানাভাবে ভয় দেখাইয়া মারিয়া ধরিয়া অত্যাচার করিয়া তাহাদিগকে নীলবুননে বাধ্য করিতেন। এবং সাদা কাগজে একবার-নামা লেখাইয়া লইতেন। সব সাহেব একরূপ ছিলেন না। তাহাদের মধ্যে আদর্শ ইংরাজ-চরিত্রের লোকও ছিলেন। আমরা এখানে শুধু অত্যাচারীর কথাই বলিতেছি। এই অত্যাচার যে কত প্রকারের ছিল, তাহা বলিবার নহে। রাইয়তের খেজুর বন কাটিয়া উপড়াইয়া তাহাতে নীলের ক্ষেত করা হইত; পলায়িত প্রজার ঘর ভাঙ্গিয়া ভিটার উপর নীলের চাষ করা হইত; এমনকি ঘর জ্বালাইয়া দিয়া উৎপাত করিয়া অবাধ্য রাইয়তকে তাড়াইয়া দেওয়া হইত। অনেক সময়ে কুঠির লোকেরা বিদ্রোহী প্রজার ঘটিবাটি গরু-বাছুর ধরিয়া আনিত; একবার বারাসাতের ম্যাজিস্ট্রেট মহামান্য ইডেন সাহেব একটি কুঠি হইতে ২/৩ শত আবদ্ধ গরু খালাস করিয়া আনিয়াছিলেন, কিন্তু নীলকরের ভয় এত বেশি ছিল যে, কয়েকদিন মধ্যে লোকে নিজের গরু লইতে আসিতেও সাহসী হইতেছিলেন না। কুঠিতে কুঠিতে কয়েদ ঘর ছিল; চুক্তি ভঙ্গ করিলে রাইয়তদিগকে কুঠিতে ধরিয়া লইয়া নানা নবোদ্ভাবিত কৌশলে পীড়ন করিবার পর, কয়েদ করিয়া রাখা হইত। যশোরের এক কুঠিতে গিয়া এক জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট স্বয়ং কয়েদ হইতে কতগুলি লোককে খালাস করিয়া দিয়া কুঠির লোকদিগকে শাস্তি দিয়াছিলেন। কয়েদকরা লোকদিগের যাহাতে সন্ধান না মিলে, তজ্জন্য তাহাদিগকে নানা কুঠিতে ঘুরাইয়া লইত। এজন্য নীলকরেরা চৌদ্দ কুঠির জল খাওয়াইবার ভয় দেখাইত। কোন কোন হতভাগ্যদের আবদ্ধের যে একেবারেই সন্ধান হইত না, তাহাও ছোটলাট সাহেব বিশ্বাস করিয়াছিলেন। মোল্লাহাটির লারমুর সাহেবের আরও এক নতুন কীর্তি ছিল; তাহার কুঠিতে রাইয়তদিগকে প্রহার করিবার জন্য আরও যে এক প্রকার নতুন লগুড় তৈয়ার করা হইয়াছিল, তাহার নাম ‘রামকান্ত’ বা ‘শ্যামচাঁদ’। এই শ্যামচাঁদের আঘাতে রাইয়তেরা জর্জরিত হইতেন। কুঠির লোকেরা প্রচার করিয়া দিয়াছিল যে, চুক্তিভঙ্গের শাস্তির জন্য সরকার হইতে ‘এক মুগুরের’ আইন পাস হইতেছে, চুক্তিমত নীল না বুনিলে মুগুরের ঘা সহ্য করিতে হইবে। এই মুগুরের আইন ও শ্যামচাঁদের ভয়ে অশিক্ষিত দরিদ্র রাইয়তেরা থরহরি কম্পবান হইতেন। নীল বুনিতে না চাহিলে ক্রোধান্ধ কুঠিয়ালেরা গুলি করিয়া খুন করিত, গ্রামকে গ্রাম উজাড় উৎসন্ন করিয়া দিত। এই জন্যই কথা উঠিয়াছিল: মনুষ্যরক্তে কলঙ্কিত না হইয়া কোন নীলের বাক্স ইংল্যান্ডে যাইত না। ইহার উপর আরও ছিল; ভারতীয় প্রজা সব সহ্য করেন, স্ত্রী-কন্যার সম্ভ্রমহানি সহ্য করেন না। নীলকর সাহেবদিগের মধ্যে এমনও দুর্বৃত্ত ছিল যাহারা জোর করিয়া কৃষককন্যাদিগকে ধরিয়া লইয়া কুঠিতে আনিয়া অপমান করিত। এই সব অত্যাচারের ফলে অবশেষে আগুন জ্বলিয়া উঠিল। বিশ বছর ধরিয়া অসহায় প্রজাকুল নীলের চাষ করিবে না বলিয়া নানা চেষ্টা করিতেছিলেন, কিন্তু নীলকরদিগের ছল বল হইতে নিষ্কৃতি পান নাই। এইবার যখন লারমুর প্রভৃতির অত্যাচার চরমে পৌঁছিল, সহূদয় ইডেন সাহেবের পরোয়ানায় যখন তাহাদিগকে বুঝাইয়া দিল যে, নীলের চাষ করা না করা রাইয়তের সম্পূর্ণ ইচ্ছাধীন, তখন তাহারা দলবদ্ধ হইয়া প্রতিজ্ঞা করিয়া বলিলেন, প্রাণ থাকিতে তাহারা আর নীল বপন করিবেন না। সম্মিলিত প্রজাশক্তির এই কঠোর প্রতিজ্ঞা কেহ ভঙ্গ করিতে পারিল না। ১৮৫৮ অব্দে দেশময় নীল-বিদ্রোহ দেখা দিল।