সৈয়দ মনজুর মুরশেদের জন্ম ১৮৯৯ সালে। ফলে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসের বেশকিছু সন্ধিক্ষণের সাক্ষী তিনি হতে পেরেছিলেন। প্রকৃতির পাশাপাশি পারিবারিক ঐতিহ্যও এ বিষয়ে তাকে সাহায্য করেছে। তার পিতা আবদুস সালেক ছিলেন যশোর জেলার মাগুরা সাব-ডিভিশনের মহকুমা শাসক বা এসডিও। তখন এসডিওর জন্য বরাদ্দকৃত বাংলোতে শৈশব কেটেছে মনজুরের। ১৯০৭ কিংবা ১৯০৮ সালের শুরুতে মনজুরের পরিবার আবদুস সালেকের বদলি সূত্রে মাগুরা ত্যাগ করে। মনজুরের পিতার নতুন কর্মস্থল সাঁওতাল পরগনার দেওঘরে।

মনজুরের নানাবাড়ি ছিল বরিশাল। দেওঘরে সালেকের পোস্টিং ছিল সাময়িককালের জন্য। তাই শুরুতে ঠিক হয়েছিল মনজুর তার নানার বাড়িতেই থাকবেন। কিন্তু এখানে মনজুরের দূরসম্পর্কের ভাই-বোনেরা কেউই পড়াশোনা নিয়ে আগ্রহী ছিলেন না, যার প্রভাব মনজুরের ওপর পড়ছিল। বাবা আবদুস সালেক সেটা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনি ছেলেকে কিছুদিনের মধ্যেই নিজের কাছে নিয়ে গেলেন। মনজুরের পেছনে পড়ে রইল বরিশাল আর তার ডানপিটে ভাই-বোনদের খেলাধুলার উদ্দাম স্মৃতি।

দেওঘরে ছিল সাঁওতালদের বাস। এখানে ছিল হিন্দু-মুসলিম-আদিবাসীদের এক মিশ্র সংস্কৃতি। এই পরিবেশ মনজুরকে ভালোই আকর্ষণ করেছিল। এক সাঁওতালের সঙ্গে তার কিছুটা বন্ধুত্বও হয়েছিল। বরিশাল ছেড়ে একসময় যেমন তার দেওঘর আসতে কষ্ট হয়েছিল, তেমনি এবার যখন দেওঘর ছাড়ার সময় হলো তখন মনজুরের মন খারাপ হয়েছিল। এখানকার প্রকৃতিও তাকে আকর্ষণ করেছিল, কারণ শোনা যেত এখানে আছে রহস্যময় উষ্ণ প্রস্রবণ। আর সাঁওতালদের কাছেও তিনি এই প্রস্রবণ সম্পর্কে নানা রোমাঞ্চকর গল্প শুনেছিলেন।

দেওঘরের সাময়িক বাস শেষ হলে আবদুস সালেক বদলি হন বিহারের ভাগলপুর জেলার বাঁকা মহকুমায়। মনজুরের বড় চাচা আব্দুল মালেকও তখন ভাগলপুর জেলা সদরে কর্মরত, তিনি ছিলেন প্রাদেশিক সিভিল সার্ভিসের আধিকারিক। বাঁকায় রানী মাখকুমারী হায়ার এডুকেশন স্কুলে চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি করা হলো মনজুরকে। নিজেদের বাড়ি থেকে চাচা আব্দুল মালেকের সরকারি বাংলো ৩০ মাইল দূরে। পথে পার হতে হতো চনন নদী। মাঝে মাঝেই চাচার বাড়িতে যেতেন। তার চাচার বাংলো গোলকুঠি নামে পরিচিত ছিল। বিকালে এই বাংলোর চারপাশে ঘুরতে বের হতেন মনজুর। নানা ধরনের মানুষ তখন বৈকালিক ভ্রমণে বের হতো। এ সময় এক অভিজাত ব্রিটিশ দম্পতি মনজুরের মনে দাগ কেটে যায়। এবং তার পরিণতি তার পরিণত মানসেও পরবর্তীকালে দেখা যাবে। এ দম্পতি একটি সুসজ্জিত ঘোড়ায় টানা টমটমে বৈকালিক ভ্রমণে বের হতেন। তাদের সাজসজ্জা ছিল আভিজাত্যময়। তাদের পোশাকে যেন ধুলা না লাগে, সেজন্য তাদের কোলের ওপর কাপড় বিছানো থাকত, হাতে থাকত গ্লাভস। এই শ্বেতাঙ্গ আভিজাত্য তাকে আকর্ষণ করেছিল, যদিও তখন তাদের সামনে নিজে কিছুটা হীনম্মন্যতায় ভুগেছিলেন।&dquote;&dquote;

চাচা আব্দুল মালেক ছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলমান। নিয়মিত নামাজ পড়তেন। কিন্তু জীবনযাত্রার প্রায় সব বিষয়েই তিনি পছন্দ করতেন ব্রিটিশ রীতি। এমনকি ব্রিটিশ পণ্যের প্রতি তার পক্ষপাত ছিল। ইংরেজি ভাষা ও ব্রিটিশ সংস্কৃতির প্রতি ভারতীয় মুসলিমদের নেতিবাচক মনোভাব ততদিনে কাটতে শুরু করেছে, উল্টো তারা এখান নানাভাবে ব্রিটিশ সভ্যতার সঙ্গে আদান-প্রদানে আগ্রহী হয়েছিলেন। আব্দুল মালেক যেমন ব্রিটিশ শাসনে বড় সরকারি পদে চাকরি করছিলেন, তেমনি ভাগলপুরে তখন বেশ কয়েকজন মুসলিম ব্যারিস্টার ছিলেন। এ সময় এ ধরনের মুসলিম পরিবারগুলোয় পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের সংস্কৃতির মিশেল দেখা যেত। খাবার ঘর, শোয়ার ঘরের সাজসজ্জা ছিল পাশ্চাত্য ধাঁচে কিন্তু নিজেদের কাজের লোকরা ভারতীয় পোশাকই পরত। খাবার পরিবেশিত হতো পাশ্চাত্য কেতায়, তবে খাবারের পদে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের প্রভাব ছিল।

এই আমলে মনজুর যখন জনাব মালেকের বাড়িতে যেতেন, তখন সেখানে থাকতেন আরএস হোসেন। তিনি তখন বিধবা। তার স্বামী ছিলেন প্রাদেশিক সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি না থাকলেও ইংরেজি ও বাংলা ভাষার ওপর খুব ভালো দখল ছিল আরএস হোসেনের। ছোটদের জন্য তিনি সুলতানা’স ড্রিম নামে একটি পুস্তিকা লিখেছিলেন এবং এটি কিশোর মনজুরকে বেশ আকৃষ্ট করেছিল। সেসময় আরএস হোসেন মেয়েদের জন্য ছোট একটা স্কুলও খুলেছেন। তার লেখা রত্নাধার হাইস্কুলে পাঠ্যপুস্তকের স্বীকৃতি পেয়েছে। তার মতিচুর গ্রন্থটি তখন বেশ প্রশংসিত। স্বামীর মৃত্যুর পর আত্মীয়দের নানা হেনস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি মালেক সাহেবের গোলকুঠিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পাঠক হয়তো চিনে ফেলেছেন, ইনি বাংলার মুসলিম নারীদের শিক্ষার অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন।&dquote;&dquote;

গোলকুঠিতে অবস্থানের সময় চাচা মালেকের তৃতীয় কন্যা হাসিনার সঙ্গে মনজুরের দারুণ ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল। হাসিনা ছিলেন বুদ্ধিমতী, বাক্পটীয়সী। বাড়ির লনে তারা নানা ধরনের খেলায় মেতে থাকতেন। হাসিনার বয়স তখন ছয় বছর। একদিন হাসিনার বিয়ে ঠিক হলো। শুরুতে বিষয়টির তাত্পর্য বুঝতে না পারলেও হাসিনা শ্বশুরবাড়িতে চলে যাওয়ার পর কিশোর হূদয়ে হাহাকার অনুভব করেছিলেন। এই হাসিনা অনেক বছর পর তার জীবনসঙ্গী হয়ে আবার ফিরে এসেছিলেন। সেই গল্প সময়মতো আসবে।

গোলকুঠির উত্ফুল্ল, সরব পরিবেশের তুলনায় মনজুরের নিজের বাড়িটি ছিল শান্ত। এই পরিবেশ তার মধ্যে এক গাম্ভীর্যের জন্ম দিয়েছিল। মনজুরের পিতা সালেক সাহেব ছিলেন বিলাতি জীবনধারা দিয়ে প্রভাবিত। ঘরের সাজসজ্জা এবং পোশাক ছিল পাশ্চাত্য ভাবধারার। বাঁকার বাড়িতে একটি চরিত্র মনজুরের ওপর প্রভাব রেখেছিল, তিনি ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের ওভারসিয়ার কাজি সাহেব। এই কাজি সাহেব এক টাট্টু ঘোড়ায় চেপে মনজুরদের বাড়িতে আসতেন। এলেই মনজুরকে বলতেন, ‘‘আমি তোমায় শতরঞ্জ শেখাব। নবাবদের খেলা...। তোমার যা বুদ্ধি, তাতে ক’দিনেই আমায় হারাতে পারবে।’’

পিতার পরে এবার মনজুরের মায়ের সম্পর্কে কিছু জানা যাক। মনজুরের মা ছিলেন তত্কালীন পূর্ববঙ্গের বাখরগঞ্জ জেলার সদর বরিশালের মেয়ে। মনজুরের নানা মহম্মদ ওয়াজেদ ছিলেন বরিশালের গণ্যমান্য ব্যক্তি। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের গ্র্যাজুয়েট এবং পরবর্তীতে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান। বরিশালে তার ছিল আলিশান দোতলা বাড়ি। মহম্মদ ওয়াজেদের বড় ছেলে, মনজুরের বড় মামা ছিলেন আবুল কাশেম ফজলুল হক। ইনিই অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে ফজলুল হক।&dquote;&dquote;

১৯১১ সাল পর্যন্ত জনাব সালেক বাঁকার এসডিও ছিলেন। এরপর তিনি সপরিবারে কলকাতায় চলে যান। মনজুরকে ভর্তি করা হলো ক্যালকাটা মাদ্রাসায়। এই মাদ্রাসার ছাত্র থাকা অবস্থায় মনজুর এক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলেন। ১৯১২ সালের ১২ ডিসেম্বর রাজা পঞ্চম জর্জ ও রানী মেরি কলকাতা এসেছিলেন। পুরো কলকাতা সেদিন কম্পমান। রাস্তাঘাট রাজা-রানীর পোস্টারে, পতাকায় শোভিত। বাছাই করা স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের রাজা-রানীর সম্মানে আয়োজিত শোভাযাত্রা দেখার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। সবাই নতুন পোশাকে হাজির। মনজুর পিতার কাছে নতুন স্যুটের জন্য বায়না ধরলেন। বাবাও খুশিমনে পুত্রের জন্য ভিকুনা টার্কিশ স্যুট নিয়ে এলেন। মনজুরদের সেদিন শেখানো হয়েছিল ‘শাহনশাহ জিন্দাবাদ, মালেকা জিন্দাবাদ’ বলে স্লোগান দিতে। সেদিন বয়সের কারণে এসবের রাজনৈতিক গুরুত্ব মনজুর বুঝতে না পারলেও স্কটল্যান্ডের ব্যাগপাইপারদের তার খুব আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল।

মনজুর ১৯১৫ সালে ফার্স্ট ডিভিশনে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করলেন। এরপর ভর্তি হন সেন্ট জেভিয়ার্সে। এর দুই বছর পর ইন্টারমিডিয়েট পাস করে তিনি ইংরেজি অনার্স নিয়ে ভর্তি হন প্রেসিডেন্সিতে। ১৯১৭ সালের শেষদিকে বড় মামা শেরেবাংলা ফজলুল হকের প্রভাবে, সংস্পর্শে রাজনীতির প্রাথমিক পাঠ পেয়ে যান। সেসময় সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের সভা হয়েছিল ওয়েলিংটনের হ্যালিডে পার্কে। বড় মামা ফজলুল হক তখন একাধারে কংগ্রেসের সম্পাদক ও প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি। মুসলিম লীগের সেই সভায় বক্তা ছিলেন সরোজিনী নাইডু, মতিলাল নেহরু, ড. সইফুদ্দিন কিচলু, পণ্ডিত মদনমোহন মালব্য, সৈয়দ হুসেন, মহম্মদ আলী জিন্নাহ, বিপিন পাল প্রমুখ। এই বিরাট ব্যক্তিত্বদের বক্তব্য শুনে মনজুর সেদিন মুগ্ধ হয়েছিলেন। রাজনীতির আকর্ষণে এ সময় পড়াশোনা থেকে মনজুরের আকর্ষণ একটু একটু করে কমছিল। ১৯১৮ সালের শেষদিকে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের বার্ষিক সভার স্থান নির্ধারিত হয়েছিল দিল্লি। বাবার ইচ্ছা ছিল না ছেলেকে সেখানে যেতে দেবেন, কিন্তু ফজলুল হকই তাকে রাজি করালেন। মুশকিল হলো হক সাহেবের বক্তব্য লেখা হয়নি, সেটা সবার নজরে এল ট্রেন দিল্লির কাছাকাছি পৌঁছতে। রাতে খাওয়ার পর হক সাহেব ভাষণটি মুখে মনজুরকে বলছিলেন এবং মনজুর সেটা লিখে নিচ্ছিলেন। কিন্তু কয়েক লাইন বলার পরই ফজলুল হক ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি ভাষণের বিষয় বুঝিয়ে দিয়ে সেটা মনজুরকে লেখার দায়িত্ব দিয়ে ঘুমিয়ে গেলেন। উত্তেজনা আর শঙ্কা নিয়ে মনজুর সারা রাত সেই ভাষণ লিখলেন। সকালে হক সাহেব সেই ভাষণ পড়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, ‘খুব ভালো হয়েছে, বেটা। আমি যা আশা করেছিলাম, তার চেয়ে ঢের ভালো।’

কর্মজীবনে প্রবেশ করতে গিয়ে নানা ঝক্কি পোহাতে হয়েছিল মনজুরকে। তিনি প্রাদেশিক সিভিল সার্ভিসে ঢুকতে চাইছিলেন কিন্তু সুযোগ মিলছিল না। তারপর একসময় বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসে সুযোগ মিলে গেল। ১৯১৯ সালের ২৬ নভেম্বর তার নিয়োগের গেজেট প্রকাশিত হয়েছিল। চাকরি প্রাপ্তি উপলক্ষে তিনি প্রথম অভিনন্দন বার্তাটি পেয়েছিলেন শৈশবের সাথী হাসিনার কাছ থেকে। হাসিনা তখন বরিশালে স্বামীর ঘর করছেন। হাসিনার টেলিগ্রামে লেখা ছিল, ‘May Mowla make Mubarak.’

পরবর্তী পর্বে মনজুরের জীবনে বিরাট প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন গায়িকা গহরজান। অবস্থা এমন হয়েছিল মনজুর না গেলে গহরজান তার মুশায়েরাই শুরু করতেন না। এ সময় মনজুর কাব্য, সুরের নেশায় মজে গিয়েছিলেন। এদিকে গহরজানের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে মনজুরের পিতা উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন।

পুত্রের বিয়ে নিয়ে মনজুরের পিতার উদ্বেগ বাড়ছিল। এর মধ্যেই ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহর কন্যা শাহাবজাদি ফারহাত বানু’র জন্য মনজুরের বিয়ের প্রস্তাব এল। কয়েক মাসের মধ্যেই মনজুর ও ফারহাত বানোর বিয়ে সম্পন্ন হলো ঢাকায়। এ বিয়ের কিছুদিন আগে নবাব সলিমুল্লাহ (১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি) মারা যান।

কিছুদিন পর কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের উদ্বোধন হয়েছিল। অনুষ্ঠানে মনজুর দাওয়াত পেয়েছিলেন। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যুবরাজ এডওয়ার্ড, প্রিন্স অব ওয়েলস। যুবরাজের সঙ্গে মনজুরের সেদিন কুশল বিনিময় হয়।

কিছুদিন বরিশালে দয়িত্ব পালন করে মনজুর আবার ফিরে যান পশ্চিম বাংলায়। একসময় তার কর্মস্থল হলো বোলপুর। এবার তার সাক্ষাৎ হলো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে। কবি তখন শান্তিনিকেতন গড়ে তুলছেন। বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের পরিচালনা করছিলেন শ্রী কালীমোহন বাবু। কালী বাবুর হাত ধরেই মনজুরের রবীন্দ্রনাথের কবিতার সঙ্গে পরিচয়। একটি কবিতা শুনেই মনজুর রবীন্দ্রনাথের ভক্ত হয়ে গেলেন। কবির সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন, সে খবর কবির কাছে পৌঁছেও গেল। এদিকে রবীন্দ্রনাথও মনে মনে মনজুরের খোঁজ করছিলেন। মনজুর প্রতিদিন দাপ্তরিক কাজ শেষ করে ঘোড়ায় করে ফিরতেন। তার ফেরার পথটা ছিল রবীন্দ্রনাথের বাড়ির পাশ দিয়েই। রবীন্দ্রনাথ প্রতি সন্ধ্যায় এই ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দের উৎস সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। সপ্তাহখানেক বাদে কবির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হলো।

১৯২৭ সালে দুই শিশুকন্যাকে রেখে মনজুরের স্ত্রী মারা গেলেন। মনজুর এ পরিণতির জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন কিন্তু দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন শিশুকন্যাদের জন্য। ওদিকে বরিশালে তার শিশুকালের খেলার সাথী হাসিনার জীবনেও ঘটছে নানা ঘটনা। স্বামীর সঙ্গে হাসিনার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় এবং তিনি কলকাতায় এসে তার সুফি শেখের কাছে আশ্রয় নেন। গার্ডনার লেনে শেখের খানকা থেকে কিছু দূরে একটি বাড়িতে তার জায়গা হয়। তখন তার চরম আর্থিক দুরবস্থা।

এবার মনজুরের সঙ্গে দেখা হলো হাসিনার। কেউই আবেগ চেপে রাখতে পারছিলেন না। মনজুর যা বোঝার বুঝে নিলেন। সুফি শেখের আশীর্বাদ নিয়ে হাসিনার মায়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন। এতে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হলেন মনজুরের বাবা, তার ইচ্ছা ছিল ছেলেকে আবার কোনো খানদানি ঘরে বিয়ে দেবেন। ১৯৩০ সালে প্রায় অশিক্ষিত, দরিদ্র হাসিনা খাতুনকে বিয়ে করলেন মনজুর।

বিয়ের পর শুরুর দিকে মেমসাহেবদের সঙ্গে মিশতে গিয়ে অস্বস্তিতে পড়তেন হাসিনা, ইংরেজি সে রকম জানতেন না। কিছুদিন পর কলকাতায় শিক্ষা দপ্তরে যোগ দেন মনজুর। কিন্তু টাইফয়েডে পরে মর মর অবস্থা হলো তার। এরপর মনজুর-হাসিনার জীবনে এক কঠিন সময় হাজির হয়। একদিকে মনজুরের ভগ্ন শরীর, অন্যদিকে আর্থিক অনটন। কিন্তু কঠিন সময়েও হাসিনা সবকিছু দক্ষ হাতে চালিয়ে নিচ্ছিলেন। প্রায় বছরখানেক পর মনজুর আবার শিক্ষা দপ্তরে যোগ দিলেন।

এতক্ষণ পুরো গল্পটা ছিল মনজুরের কিন্তু এবার কাহিনীতে যুক্ত হতে যাচ্ছেন হাসিনা মুরশেদ। হাসিনা একসময় ব্রতচারী আন্দোলনের ভক্ত হয়ে পড়েন। হাসিনা এবার নিজেকে নতুন জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে চেষ্টা শুরু করেছিলেন। পুরো জীবনে তিনি একটি ইংরেজি বই পড়েছিলেন, তা হলো ল্যাম্বের ‘টেলস ফ্রম শেক্সপিয়ার’। এবার তিনি ধ্রুপদী ইংরেজি সাহিত্য পড়তে শুরু করলেন। ধীরে ধীরে অনুশীলন করছিলেন ইংরেজি শব্দ। কন্যার পরে তখন জন্ম নিয়েছে একটি পুত্রসন্তান— মুশতাক। দ্বিতীয় যে ইংরেজি বইটি তিনি পড়েছেন সেটা হলো চার্লস ডিকেন্সের ডেভিড কপারফিল্ড। ধীরে ধীরে হাসিনা সাহিত্য ছেড়ে সমাজ-ইতিহাস নিয়েও পড়তে শুরু করলেন—ইংল্যান্ডের ইতিহাস, অটোমান সাম্রাজ্য, ইউরোপের ইতিহাস, ফরাসি বিদ্রোহ, সাম্যবাদ। বাদ গেল না রবীন্দ্রনাথের গোরা, চোখের বালি ও শরত্চন্দ্রের পরিণীতা। বাংলা-ইংরেজির পাশাপাশি উর্দু-ফার্সি সাহিত্যও পড়ছিলেন—গালিব, হালি, দাগ, সৌদা, জামি, আমীর খসরুর কবিতা। স্বল্পশিক্ষিত হাসিনা নিজের চেষ্টায় স্বশিক্ষায় আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছিলেন।

এবার মনজুর স্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের প্রস্তাব দিলেন। স্ত্রীকে বললেন, ‘তুমি তো ম্যাট্রিক পরীক্ষায় বসতে পারো?’ এ প্রশ্নে হাসিনা অবাক। মনজুর তখন বললেন, ম্যাট্রিকে বাংলা ও ইংরেজির যা সিলেবাস, তার চেয়ে তোমার পড়াশোনা অনেক বেশি। একটু চেষ্টা করলে ইতিহাস-ভূগোলও শেষ করে ফেলতে পারবে। চিন্তাভরা চোখে হাসিনা স্বামীকে বললেন, এই বয়সে তার ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেয়া মানাবে না। আরো বললেন, মেমসাহেবদের সঙ্গে কথা বলার মতো যোগ্যতা অর্জন করতেই কেবল নিজে নিজে এত দিন কিছু পড়াশোনা করেছেন। মনজুর উৎসাহ দিতে লাগলেন। শুরুতে কিছুটা লাজুক ভঙ্গিতে ‘না’ করলেও শিগগিরই হাসিনা ম্যাট্রিক পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করে দিলেন। দুই বছর পড়াশোনা করলেন। এরপর মনজুরের উৎসাহে টেস্ট পরীক্ষাও দিয়ে ফেললেন। সব বিষয়ে ভালো করলেও অংকে ফেল করলেন। আত্মমর্যাদায় ঘা লাগল হাসিনার, সে বছর আর পরীক্ষা দিলেন না। তবে অধ্যবসায় নিয়ে গণিতের চর্চা শুরু করলেন। একসময় সব সহজ হয়ে গেল।

মনজুর ছিলেন শিক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তা। তাই অনেক বিদ্বান, শিক্ষকের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। অধ্যাপক তারকনাথ হাসিনাকে ইংরেজি শেখাতেন। এর মধ্যে সনেটের মতো ইংরেজিতে কাব্যও লিখে ফেললেন হাসিনা। দেখে তো মনজুর অভিভূত। এরপর ঘটল আরো অভাবনীয় ঘটনা। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে রাজ্যের মধ্যে অন্যতম ফল করলেন হাসিনা, সব বিষয়ে স্টার পেলেন, আর গণিতেই পেলেন সবচেয়ে বেশি নম্বর। এরপর ইন্টারমিডিয়েটও পাস করে ফেললেন। এরপর অর্থনীতিতে স্নাতক হলেন প্রথম বিভাগ পেয়ে। ততদিনে মনজুরের আর্থিক অবস্থাও ফিরে গেছে। এদিকে হাসিনার সাফল্যের কথা তখন মানুষের মুখে মুখে। এবার আত্মীয়রা বললেন, বঙ্গীয় আইন সভার নির্বাচনে মুসলিম নারীদের জন্য নির্দিষ্ট আসনে হাসিনার নির্বাচনে দাঁড়ানো উচিত।

হাসিনা মুরশেদ নির্বাচনে দাঁড়ালেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন দুজন। কলকাতা মুসলিম লীগের প্রার্থী হলেন হাসিনা। প্রচারণায় অনেক বাধা পেলেন। কিন্তু শেষমেশ নির্বাচনে হাসিনাই জিতলেন। হাসিনা মুরশেদ বাংলার প্রথম মুসলিম নারী সদস্য হিসেবে বিধানসভায় পা রাখলেন। বিধানসভায় তার প্রথম ভাষণই সাড়া ফেলে দিল। স্টার অব ইন্ডিয়া পত্রিকা লিখল, বিধানসভায় কোয়ালিশন পার্টির এক উল্লেখযোগ্য মহিলা সদস্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন মিসেস হাসিনা মুরশেদ। গতকাল বাজেট বক্তৃতায় তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

১৯৩৭ সালে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হলেন ফজলুল হক। শিক্ষা দপ্তর তিনি নিজের হাতেই রাখলেন। আর সেই দপ্তরেরই চাকুরে তার ভাগ্নে মনজুর মুরশেদ। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান। স্বামী-স্ত্রী দুজনই তখন ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। নারীশিক্ষা ও ক্ষমতায়ন নিয়ে হাসিনার বিশেষ আগ্রহ ছিল এবং ক্ষমতায় থেকে তিনি এ বিষয়ে যথাসাধ্য চেষ্টা করছিলেন। ১৯৩৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর স্টেটসম্যান পত্রিকা লিখেছিল—

“গতকাল কলকাতায় সারা ভারত শিক্ষা সম্মেলনের মহিলা বিভাগে উল্লেখযোগ্য বক্তব্য রাখেন মিসেস হাসিনা মুরশেদ, এমএলএ। তাঁর বিষয় ছিল ‘আজকের শিক্ষা ব্যবস্থায় মহিলাদের ভূমিকা’। তিনি বলেন, ‘...শিক্ষা ক্ষেত্রে মহিলাদের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া জাতি হিসাবে ভারতবাসীর পূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়।”

অন্যদিকে হাসিনা মুখ্যমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক আতিথ্যকর্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন। ১১ নম্বর সার্কাস রেঞ্জে তার এবং মুরশেদের বাড়িটাই ছিল সরকারের দেশী-বিদেশী অতিথিদের অভ্যর্থনা কেন্দ্র। এজন্য বাড়িতে ব্যাঙ্কুয়েট হলও তৈরি করা হয়েছিল।

১৯৩৯ সালে লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ প্রতিষ্ঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল হাসিনা মুরশেদের। ১৯৪৪ সালে ঢাকায় বদলি হলেন মনজুর। তবে সন্তানরা রয়ে গিয়েছিল কলকাতাতেই। মনজুর ঢাকার অতিরিক্ত জেলা শাসক হিসেবে যোগ দেন। রমনার এক সার্কিট হাউজ তার জন্য বরাদ্দ দেয়া হলো। আর হাসিনার জীবন কাটতে শুরু করল কলকাতা ও ঢাকার মধ্যে। দুই বছর ঢাকায় থেকে ১৯৪৬ সালের আগস্টে হাওড়ায় বদলি হয়ে গেলেন মনজুর।

১৯৪০-এর দশক ভারতীয় রাজনীতির এক কালপর্ব। এ সময় মনজুর ও হাসিনার সার্কাস রেঞ্জের বাড়িতে বহু গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও বিদেশী অতিথির যাতায়াত ছিল। ক্রিপস মিশনের স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসকে চিঠি লিখে হাসিনা জানতে চেয়েছিলেন ভারতের নারীদের ব্যাপারে তাদের ভাবনা কী। তার সে চিঠির জবাবও দিয়েছিলেন ক্রিপস। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ স্বাধীন হলো। জন্ম হলো ভারত ও পাকিস্তানের। দেশভাগ মনজুরের পরিবারের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। পুত্র তানভির তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মেয়ে লামিয়াও ঢাকায় চলে যান। কিন্তু মনজুর ও হাসিনা কলকাতাতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মনজুর স্বাধীন ভারতে প্রথম ব্যাচের আইএএস হলেন। হাসিনা ১৯৫৭ সালে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে অবসর নেন।

সৈয়দ মনজুর মুরশেদ তার জীবনের নানা ঘটনা দিনলিপিতে লিখে রেখেছিলেন। বহু বছর সে ডায়েরি পরিবারের তোরঙ্গে আবদ্ধ হয়ে ছিল। তারপর একদিন তার নাতনি আশনা সেন ধুলো ঝেড়ে তোরঙ্গ খুলে মনজুরের ডায়েরিটি বের করেন। সে ডায়েরিকে অবলম্বন করে আশনা বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী মনজুর-হাসিনা দম্পতির জীবনকাহিনী লিখে ফেলেন। বইয়ের নাম দেন দ্য রাস্টেড ট্রাংক। সেই তোরঙ্গে আশনা আরো পেয়েছিলেন মনজুরকে লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠি, হাসিনাকে লেখা স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসের চিঠি। দ্য রাস্টেড ট্রাংক অবলম্বনেই এ রচনাটি রচিত হয়েছে। সৈয়দ মনজুর মুরশেদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ১৯৬৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর, আর তার বছর দুয়েক আগে প্রয়াত হন হাসিনা মুরশেদ।