মেহেরমাহ খানম ইরানের কাজার রাজবংশীয় যুবরাজ ফরহাদ মির্জার মেয়ে। পরিবার তার নাম রেখেছিল ইসমত আল-সালতানেহ। পিতা-মাতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে ১৮৮০ সালে তিনি ইরানের রাজধানী তেহরান থেকে হজের উদ্দেশে মক্কায় যাত্রা করেন। এ ভ্রমণ নিয়ে ‘সাফারনমেয়ে মাক্কে’ নামে তিনি একটি সফরনামা লেখেন যা ইরানে বহুল জনপ্রিয় হয় এবং বারবার ছাপানো হয়। মূলত রোজনামচা বা প্রাত্যহিক ঘটনাবলি লিপিবদ্ধ করার ধাঁচে এটি লিখিত হয়। এর পূর্বাপর লিখিত বিভিন্ন ইরানি সফরনামার মতো এতে হজে গমনকালে ইরানিরা যেসব সমস্যা ও উত্পীড়নের মুখোমুখি হতো সেগুলো একে একে উঠে আসে। প্রতিকূল আবহাওয়া, অসুস্থতা, ডাকাতি প্রভৃতি বিরূপতার মুখোমুখি হতো হজ কাফেলাগুলো। এছাড়া শিয়াদের লক্ষ্য করে অনেক সময় সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনও চালানো হতো।

তার সফরনামায় দিনের উল্লেখপূর্বক বিভিন্ন ঘটনা লিপিবদ্ধ হয়েছে। এসব থেকে স্পষ্ট হয় যে হিজরি ১২৯৭ সন রমজান মাসে (৩১ আগস্ট, ১৮৮০ খ্রি.) মেহেরমাহ খানম কাজার পরিবারের দুজন মহিলাকে সঙ্গে নিয়ে হজযাত্রা করেন। তাদের সঙ্গে দুজন দাসী ছিল। এ সফরের সময়ে তারা ইরানের পশ্চিম দিকে রওনা হয়ে ইরাক হয়ে সৌদি গমন করেন। তারা শিয়া ধর্মীয় তীর্থগুলো জিয়ারত করেন। ইরানি এ শাহজাদি রাজরীতি অনুসারে হাওদায় চড়ে ভ্রমণ করেছেন। হাওদা মূলত হাতি বা উটের পিঠে বিছিয়ে দেয়া এক ধরনের রাজসিক খাট। সময়ে সময়ে তিনি ঘোড়ার পিঠেও সওয়ার করেছেন। এভাবে বিভিন্ন কারাভানসরাইয়ে অবস্থানপূর্বক কাজিমিয়াহ, নাজাফ ও কারবালা হয়ে আরবের মরুময় পথ পাড়ি দিয়ে তিনি নভেম্বরের মাঝামাঝি মক্কায় পৌঁছে হজে অংশ নেন। সেখানে তিন সপ্তাহ থেকে মদিনায় গমন করেন। এরপর জেদ্দায় গিয়ে সেখান থেকে সমুদ্রপথে ইরানের বন্দরনগরী বুশেহরে আসেন। সেখানে স্থলপথে শিরাজ, এসফাহান, কাশান ও ঘোম ভ্রমণ করতে করতে তিনি ১৮৮১ সালের জুনে তেহরানে ফিরে আসেন। বিচিত্র অভিজ্ঞতায় ভরপুর এ ভ্রমণে সাড়ে নয় মাস সময় লেগেছিল তার। ‘সাফারনমেয়ে মাক্কে’র কিয়দংশ ফারসি থেকে অনুবাদ করে এখানে দেয়া হলো—

 

রোজ মঙ্গলবার। ২৪ রমজান। সন ১২৯৭ হিজরি। আরো ৪ ঘণ্টা পর সূর্য পাটে যাবে। ধনু রাশির১ শুভ দিনক্ষণ দেখে রাজধানী তেহরান থেকে ইমামজাদা হাসান অভিমুখে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। শহরে পৌঁছে যাওয়ার পর বিদায় দিতে আমাদের সঙ্গে যারা এসেছিলেন তারা ঘোড়ার গাড়িতে করে চলে গেলেন। সঙ্গে থাকা বোচকাবুচকি ফেলে গেলেন। কয়েকজন হামসফর অবশ্য ইমামজাদা হাসানে থেকে গেলেন। আমরা শহরের উদ্দেশে স্থানটি ছেড়ে গেলে তারা ফিরে যাবেন এমন মনোবাসনা তাদের।

তবে কাতিরচি২ যারা তাদের রেওয়াজ হলো তারা প্রথম মনজিলে বিশ্রাম নেবেই। অগত্যা বুধবার রাতটা ইমামজাদা হাসানে কাটাতে হলো। ২৫ তারিখ রোজ বুধবার মরহুম হাজি মোহাম্মদ বাকের খানের আত্মীয়া হাজিয়ে আম্মে খানম এলেন এবং প্রায় ২ ঘণ্টা আমাদের কাছে বসে থেকে প্রস্থান করলেন। শাহজাদির বোন ও তার কয়েকজন সখী সন্ধ্যা পর্যন্ত থেকে এরপর শহরে ফিরে গেলেন। ইয়ার-দোস্তদের থেকে বিদায় নেয়ার অনুভূতি বিস্ময়কর। এটা সত্য যে, বিদায়ের মুহূর্তে দরজা-দেয়াল পর্যন্ত বিলাপ করতে থাকে। কবি সাদি কত সুন্দর বলেছেন, “কায সাঙ্গ নালে খীযাদ রূযে ভেদায়ে ইয়ারান” (ইয়ার-দোস্তদের বিদায়ের দিন যেন পাথরও পরিতাপ করতে থাকে)। মির্জা মোহাম্মদ তকী, মির্জা মোস্তফার ছেলেমেয়েসহ আরো যারা থেকে গিয়েছিলেন আমাদের প্রস্থানের পরে তারাও শহরে ফিরে গেলেন। ২৬ তারিখের রাতের ৫ ঘণ্টা অতিক্রান্ত হলে আমরা পবিত্র তীর্থস্থলের ভেতরটা দেখে বাইরে এলাম। আমরা রওনা হলে একটা আসনের ওপর বসে হাজি আখুন্দ দোয়া করছিলেন এবং আমাদের পেছন থেকে আজান দিচ্ছিলেন। আমার খালাতো বোন অর্থাৎ মরহুম মুহাম্মদ রহিম খান কাজারের কন্যা, মরহুম ফতেহ আলি খানের আত্মীয়া, একটি শ্বেতাঙ্গ ও একটি কৃষ্ণাঙ্গ দাসী আমার সফরসঙ্গী ছিল।

রোজ বৃহস্পতিবার ২৬ রমজান আমরা রুবাত করিমে পৌঁছাই। পানির নহরের পাশে একটা বাগানের অভ্যন্তরে আমরা তাঁবু গাড়লাম। বাগানে ছিল উত্কৃষ্ট মানের আঙুর গাছ ও ফল। বাগানটা কার এবং এর দেখাশোনা কে করছে তা বাগানের বৃদ্ধা মালীর কাছে জানতে চাইলাম। বৃদ্ধা বলল, আনিস উদ দৌলা এর মালিক, মালিকের ভাই মোহাম্মদ হাসান খান এর দেখাশোনা করছেন। রোজ শুক্রবার রাতে রুবাত করিম থেকে যাত্রা করে সেদিন অর্থাৎ ২৭ তারিখ খানাবাদ প্রবেশ করলাম। পথিমধ্যে ধ্বংসপ্রাপ্ত একটা গ্রাম পড়ল। আশপাশের লোকদের জিজ্ঞাসা করে জানা গেল, এটা খালেস৩ জমি। খালেস জমির প্রতি রাজার সঠিক মনোযোগ নেই দেখে আজব লাগল। হায়! খানাবাদের ভাগ্য নিষ্ফলা বৃক্ষের মতো, এর পানি লবণাক্ত। খরবুজার এক ফালি মাঠের পাশে আমরা তাঁবু গাড়লাম। ভূস্বামী এক বৃদ্ধ মহিলা। তিনি একটা খরবুজা নিয়ে এলেন। ভালো করে না পাকলেও সেটা চাকুর এক ঘায়ে দ্বিখণ্ডিত হওয়ার মতো নরম ছিল। খানাবাদে পোস্টঅফিসও ছিল, আবার টেলিগ্রাফ অফিসও ছিল। কয়েকটা চিঠি লিখে শহরে প্রেরণ করলাম। টেলিগ্রামও করা হলো।

রোজ শনিবার। ২৮ রোজার দিন। খানাবাদ থেকে যাত্রা করে কুশাক এলাম। কুশাক একটা ঊষর গ্রাম। মোহাম্মদ মোরাদখান জারানদি এর মালিক। এখানে এসেও একটা নহরের কিনারে তাঁবু গাড়লাম। কুশাকের পানি সুমিষ্ট।

রোজ রোববার। ২৯ রোজার দিন। কুশাক থেকে রওনা হয়ে জানবালান এলাম। রাস্তা একটু কষ্টকর ছিল। কারণ অনেক চরাই-উত্রাই পেরিয়ে আসতে হয়েছে। এ গ্রামটা রেজাকুলি খানের পুত্র আহমদ খানের। গ্রামটা বেশ বড়। কেল্লাগুলোর প্রাচীর উঁচু ও শক্ত। সাধারণত এমনটা কোথাও দেখা যায় না।

সোমবার রাত। রমজানুল মুবারকের ৩০ তারিখ। রাত নেমে আসার ৩ ঘণ্টা পর রওনা হয়ে আমরা সূর্যোদয়ের সময়ে নওবারান প্রবেশ করলাম। এটাও অনেক বড় একটা গ্রাম। শহর থেকে টেলিগ্রাফের উত্তর এল। আল্লাহ তাআলা যেন হজরত আকদাস শাহরিয়ারির হায়াত দারাজ করেন। মানুষের কারণে স্বস্তি এল। কারণ যেখানেই যাই তারা পরস্পরের খবর রাখে। শেহরিভার মাসের ১৫ তারিখের এমন সময়ে নওবারানের আবহাওয়া বেশ ভালো থাকে। মনে হয়, তা শেমিরানের আবহাওয়া থেকে বেশ ভালো...

সন্ধ্যা নামার ৫ ঘণ্টা পরে আমরা কাজিমিয়ার উদ্দেশে রওনা হলাম। দুজন কাজিমির প্রতি সালাম। দুপুরের আগেই আমরা বাগদাদে হাজির হলাম। সাহায্যার্থে কয়েকজন আমাদের কাছে এসেছিলেন। নিরাপদে আমরা সেতু পার হয়ে কাজিমিয়ায় প্রবেশ করলাম। চাকর-নফররা ধরে বসল যেন তাদের ওখানে আস্তানা গাড়ি। তাদের ফরিয়াদ আরশ তক পৌঁছল। সবশেষে মোল্লা আব্বাস রওজাহখানের গৃহে প্রবেশ করলাম। জিয়ারতের উদ্দেশ্যে গোসল করতে সূর্যাস্তের সময়ে আমরা হাম্মামে গেলাম। রাতে জিয়ারত করতে পবিত্র তীর্থস্থানে তাশরিফ নিলাম। জিয়ারত করে ফিরে এলাম...

দিনের আলো ফোটার ২ ঘণ্টা পরে হজরত মুসলিমের সন্তানদের গম্বুজ মোবারক নজরে এল। পথ চলতে ভালো কষ্ট হচ্ছিল। তাই হাওদা থেকে নেমে ঘোড়ায় চড়ে ওই দুই বুজুর্গের মকবরা জেয়ারত করতে গেলাম। ১ ঘণ্টা পরে কয়েকজন আরব নজরে পড়ল। স্থানটি তাদের জিম্মায় রয়েছে বলে দাবি করল তারা। জিয়ারত করে আমরা ফিরে এলাম এবং মুসাইয়িবে প্রবেশ করলাম। দুপুরের আগে আমরা সেতু পার হলাম। সেতুর মাঝে যখন ছিলাম তখন এক আরব হঠাৎ কোত্থেকে এসে আমার ঘোড়াকে ভেসকি দিল। আল্লাহর কী ইচ্ছা! আমার পাশে হাঁটা অবস্থায় একজন ছিল। সে ঘোড়াটি ধরে ফেলল। না হলে তা পানিতে পড়তে যাচ্ছিল...

দুপুরের পরে আমরা নাজাফ প্রবেশ করলাম। সঙ্গে চাকর-নফর ছিল অনেক। তারা জিয়ারতনামা যারা পড়বেন তাদের সঙ্গে যেতে চাইলেন না। তাই আজ আর জিয়ারত করা হলো না। জিয়ারতের জন্য অজু-গোসল করে আমরা খালা শাহজাদি হাজ্জিয়ের সঙ্গে প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলাম। সেখানে প্রবেশ করা মাত্রই দেখলাম জিয়ারতকারীরা হাঙ্গামা করছে। বাধ্য হয়েই ফিরে এলাম। ছাদের ওপর গম্বুজ মোবারকের রুবারু জিয়ারত করলাম...

সূর্য ডোবার ৪ ঘণ্টা পরে আমরা কারবালায় প্রবেশ করলাম। দিনটি রোজ বুধবার। তাঁবু দিয়ে ঘেরা জায়গাটার শেষ প্রান্তে নেমে অজু করলাম। ওখানে হজরত কাসিম আলীর বাসরঘরের একটা নমুনা তৈরি করে স্থাপন হয়েছে। তাঁবুর সন্নিকটে জোহর ও আসরের নামাজ পড়লাম। তার বর্শা মোবারক এখানে একটা কুয়োতে পড়ে গিয়েছিল। ওখান থেকে প্রবাহিত পানিতে তার সহযোদ্ধারা গোসল করে জিহাদে গমন করেছিল। একটা আরব কুয়া থেকে পানি তুলতে গেল। যেইনা সে কুয়ায় নামল আমার খালাতো বোন বলে উঠল, লোকটা যেন কুয়ায় পড়ে না যায়। কুয়ার মাঝখান থেকে আরব লোকটা বলল, আজব! আমি তো কুয়ায় পড়ে যাচ্ছি। তার মুখ থেকে এ কথা বেরুতে না বেরুতেই অসাবধানতায় সে কুয়ায় পড়ে গেল। দেখে আমরাও না হেসে পারলাম না। কুয়া থেকে উঠে লোকটি ফারসি ও আরবিতে বলল, তুমি বললে কুয়াতে না পড়তে, তাই পড়লাম, নচেৎ পড়তাম না... রোজ বৃহস্পতিবার। জিলকদ মাসের প্রথম দিন। সকালে আমরা প্রয়াত শাহজাদির কবর জিয়ারত করলাম। সুরা রহমান ও সুরা ফাতিহা পড়লাম। সেখান থেকে উঠে আমি জান বিবির কবরে গেলাম। ইনি শাহজাদা নওয়াব আলি সরকারের মা। কোরআন খুললে একই সুরা আর-রহমান এল। সেটা পড়ে সুরা আম্মা৪ পড়লাম মরহুম ইমাদুদ দৌলার জন্য, আরেকটা সুরা ইউসাব্বিহু লিল্লাহ৫ পড়লাম সারিমুদ দৌলার জন্য। পড়ে উঠলাম। দুই দণ্ডের এ পৃথিবীর এক বিন্দু ভরসা নেই ভেবে কষ্ট পেলাম, কান্না পেল অনেক, আল্লাহর কাছে মাফ চাইলাম। এরপর হজরত আব্বাসের (আ.) দরগায় এলাম...

পরের দিন শুক্রবার রাত ২টায় আমরা হোসেনের (আ.) পবিত্র দরগায় গেলাম। সেখানে তুলনামূলক কম লোক থাকলেও একটা জমায়েত নজরে এল। আর তাই কেউই কবরের মাটি স্পর্শ করতে পারল না। জিয়ারত করলাম, নামাজ পড়লাম। জুমার রাত ছিল বলে দোয়া-এ-কোমায়েল পড়লাম। এরপর ঘরে ফিরে এলাম। জুমার দিন সকালে অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করলাম। আহলে হজ যারা তারা সবাই বাইরে গিয়েছেন। দুপুরের দিকে অজু করে দরগা জিয়ারত করলাম এবং এর চৌকাঠ চুম্বন করলাম। নামাজ শেষ করে আমরা হজরত আব্বাসের (আ.) মকবরা জিয়ারত করলাম, চৌকাঠ চুম্বন করলাম... মরুভূমিতে আহলে হজগণের জন্য তাঁবু গাড়ল তারা। পরিশ্রান্ত অবস্থায় তাঁবুতে প্রবেশ করার সময়ে পত্রবাহকরা চলে যাচ্ছিল প্রায়। লেখায় ব্যস্ত হলাম আমি।

 

তথ্য নির্দেশ

১. ধনু রাশি বলতে সফরের সময় ইংরেজি মাস আগস্ট-সেপ্টেম্বরকে নির্দেশ করছে। ইংরেজি অনুবাদে সফর শুরুর দিন ৩১ আগস্ট

২. কাতিরচি: খচ্চরটানা গাড়ির চালক

৩. সম্রাট কর্তৃক গৃহীত খাসজমি

৪. সুরা নাবা

৫. সুরা জুমুআহ

 

ইসফানদিয়র আরিওন: লেখক ও অনুবাদক