ইকবালুন্নিসা হোসেন (১৮৯৭-১৯৫৪) ছিলেন একজন ভারতীয় শিক্ষাবিদ ও অ্যাক্টিভিস্ট। তার দুটো বড় কাজ রয়েছে, যদিও তা এখন আলোচিত হয় না বললেই চলে। এর একটি হলো Changing India: A Muslim Woman Speaks শিরোনামে প্রবন্ধের সংকলন, যা ১৯৪০ সালে বেঙ্গালুরু থেকে প্রকাশিত হয়। চার বছর পরে Purdah and Polygamy: Life in an Indian Muslim Household শিরোনামে একটি উপন্যাসও প্রকাশিত হয়। ১৫ বছর বয়সে সৈয়দ গোলাম হোসেনের সঙ্গে বিয়ের পর ১৯৪৪ নাগাদ ইকবালুন্নিসা সাত সন্তানের জননী হয়েছিলেন। সৈয়দ হোসেন ছিলেন মহীশূর প্রিন্সলি স্টেটের একজন কর্মকর্তা। ইকবালুন্নিসার পারিবারিক ইতিহাস আগ্রহজাগানিয়া। তার বাবা গোলাম মহিউদ্দিন পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি নিজেকে টিপু সুলতানের উত্তরাধিকারী হিসেবে দাবি করেন।

ইকবালুন্নিসার পিতা তাকে গৃহেই উর্দু, ফারসি ও আরবি শিক্ষা দেন। ১৯৩০ সাল নাগাদ ইকবাল নিজেই বেশকিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এর মধ্যে একটি গার্লস মিডল স্কুল, নারীদের জন্য ভকেশনাল ট্রেনিং স্কুল ও বেঙ্গালুরুর একটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অন্যতম। লাহোর (১৯৩১), মাদ্রাজ (১৯৩১-৩২) ও লক্ষেৗয়ে (১৯৩২-৩৩) অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া ওমেন’স কনফারেন্সে তিনি মহীশূরের প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন।

মহীশূরের মহারানী কলেজে কলা বিভাগে মাস্টার্স করার পর তিনি ব্রিটেনে গমনের সিদ্ধান্ত নেন। ব্রিটেনে তিনি তার জ্যেষ্ঠ পুত্র বশির আল-জামানের সঙ্গে গিয়েছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল ইউনিভার্সিটি অব লিডসে শিক্ষার ওপর একটি ডিপ্লোমা গ্রহণ করা। লিডসে ইকবাল নানা ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। ভারতে ফিরে এসে তিনি এ সম্পর্কে দুটি ভাষণ দিয়েছিলেন। তার জবানেই বাকিটা জানা যাক—

 

১৯৩০ সালে মহীশূর থেকে ডিগ্রি পাওয়ার পর আমার মধ্যে ইংল্যান্ড গমনের ইচ্ছা জাগে। কিন্তু আমার লিঙ্গ ও ছয় সন্তানের কথা ভেবে সন্দেহ ছিল যে ইচ্ছা পূরণ হবে কিনা। মাঝে মাঝে মনে হতো এ এক অলস মস্তিষ্কের ভাবনা। কিন্তু তিন বছর পর তা সত্য হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলো। আমার জ্যেষ্ঠ পুত্র ১৯৩৩ সালে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে ইংল্যান্ডে গিয়ে আইসিএসের ট্রেনিং নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আমি ভাবলাম এবার আমার দীর্ঘ দুই বছরের লালিত স্বপ্ন সত্য করার সুযোগ এসেছে। আজকে আমি আপনাদের সঙ্গে এ যাত্রা করার ক্ষেত্রে আমার সামনে আসা বাধা বিপত্তি নিয়েও কথা বলতে চাই।

আমি আমাদের সরকারের কাছে একটি বৃত্তির আবেদন করলাম কিন্তু তা আমলে নেয়া হলো না। আমাকে জানানো হলো যে আমাদের দেশের নীতি অনুসারে বয়সী নারীকে এ ধরনের শিক্ষাবৃত্তি দেয়ার কোনো নীতি নেই। ফলে এ নিয়ে আলোচনারও অবকাশ নেই। আমার কষ্ট হয়েছিল, তবু আমি সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে গিয়ে স্বপ্ন পূরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। ১০ সেপ্টেম্বর আমি আমার ছেলের সঙ্গে কলম্বোর উদ্দেশে বেঙ্গালুরু ত্যাগ করি। আমার সন্তানদের মনের অবস্থা নিয়ে বলার কিছু নেই। আমরা একটি সস্তা জাপানি জাহাজে যাত্রা করি এবং ২৫ দিন পর ইংল্যান্ডে পৌঁছাই। এ যাত্রায় আমাদের অশেষ দুর্ভোগ হয়েছিল। আমি ১৭ দিনই শয্যাগত ছিলাম এবং পানি ও ফল ছাড়া কিছু খেতে পারিনি। ৮ অক্টোবর আমরা অবশেষে লন্ডনে গিয়ে পৌঁছলাম।

আমার অর্থনৈতিক অবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকার উপযুক্ত ছিল না, তাই আমি একটি সস্তা বাসস্থানের ব্যবস্থা করে নিই। পরদিন সকালে ভারতীয় দূতাবাসের সেক্রেটারি মি. ঘোষ আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে গেলেন। আমাদের প্রথমে এডুকেশন হাউজে মিস ব্ল্যাকবার্নের কাছে যেতে বলা হয়। তিনি নারী বিভাগের প্রিন্সিপাল ছিলেন। আমি অবাক হয়ে দেখলাম তিনি নিজেই আমাদের স্বাগত জানালেন এবং বললেন যে তিনি চিন্তিত হয়েছিলেন। তিনি আমাকে আমার যাত্রাসহ ভারতের নানা বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করে জেনে নিলেন। এরপর কথোপকথনে বিশ্ববিদ্যালয়, এখানে শেখানো হয় এমন সব বিষয় ও আমার পছন্দ সম্পর্কে কথা উঠল। তিনি আমার অতীত পড়াশোনা সম্পর্কে জেনে নিলেন এবং এরপর ডিপার্টমেন্টের প্রধান, প্রফেসর স্মিথের সঙ্গে আমার দেখা হয়।

সকাল ১০টায় মিস ব্ল্যাকবার্নের একটি লেকচার ছিল। তিনি আমাকে তার সঙ্গে নিয়ে যান। ক্লাসে ৬০ জন ছাত্রীর মধ্যে কোনো মিসেস ছিল না (সবাই ছিল অবিবাহিত)। লেকচারের পর ব্ল্যাকবার্ন আমাকে মিস হিবগেমের কাছে নিয়ে যেতে বলেন। তিনি ছিলেন হলের সেক্রেটারি। এরপর আমার জিনিসপত্র লজিং থেকে আনার ব্যবস্থা করানো হয়। নৈশভোজের সময় ঘণ্টা বেজে উঠল এবং সুন্দরী এক ছাত্রী আমার কামরায় এসে আমাকে কমন রুমে নিয়ে যাওয়ার কথা বলল। সেখানে গিয়ে আমার এক নতুন অভিজ্ঞতা হলো। এখানে সবাই বন্ধুভাবাপন্ন। আমি দেখলাম ওয়ার্ডেন পিয়ানো বাজাচ্ছেন আর সব ছাত্রী সে বাজনার সঙ্গে নাচছে। আমি এ কথাগুলো বলে ইংল্যান্ডে প্রফেসরের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পর্কের রূপটি বোঝাতে চাচ্ছি।

আপনারা নিশ্চয়ই জানতে চাইবেন ইংল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের কী ধরনের প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ভারতের সঙ্গে লিডসের ধরার ভিন্নতা রয়েছে। শিক্ষার্থীরা বেলা ১১টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ক্লাসে বসে এবং প্রভাষকরা বিভিন্ন বিষয়ে লেকচার দেন। লিডসের মতো ইংল্যান্ডের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাপদ্ধতি একই ধারার। পরীক্ষার বিষয়টি সব দেশেই আছে, তবে ভারতের অভিভাবকরা পড়াশোনাকে কেবল চাকরি পাওয়ার মাধ্যম বলে মনে করার কারণে তাদের কাছে শিক্ষার তুলনায় পরীক্ষার ফলাফলই বড়। ইংল্যান্ডে তেমনটি নয়। একটি প্রবাদ সবাই জানেন, ‘সুস্থ শরীরে সুস্থ মন’ কিন্তু ভারতে এ কথা কেউ মানে না। তাই ভারতে জ্ঞানীদের মধ্যে অনেকেই শারীরিকভাবে দুর্বল।

লিডসের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের মাথায় অকারণে অধিক তথ্যের ভার অর্পণ না করে তাদের মানসিক শক্তিতে বলীয়ান করতে হবে। এর মাধ্যমে পরবর্তী জীবনে তাদের দায়িত্ব পালনের জন্য গড়ে তোলা হয়। তারা হয়ে ওঠেন সুনাগরিক। তারা জানেন শুধু ক্লাসরুমে লেকচার শুনে এ ধরনের মানুষ বা সুনাগরিক তৈরি করা সম্ভব হয় না। এজন্য ক্লাসরুমের বাইরে শিক্ষার্থীদের মাঠে নানা অ্যাথলেটিক কাজ ও সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে যুক্ত করা হয়। আপনারা জিজ্ঞেস করতে পারেন ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটিগুলো এ ধরনের লক্ষ্য অর্জন করে। শিক্ষার্থীরা ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এখানে তিনটি বিষয় জানানো হয়

১. তাকে জানানো হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে তাকে সব শেখানো হবে না। তাকে তার চোখ খোলা রেখে নিজে অনেক কিছু শিখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যান্ডবুক ও নোটিস বোর্ডগুলো কেবল নির্দেশনা।

২. তাদের সামাজিক বিষয়গুলো শেখানো হয় এবং বোঝানো হয় সমাজ কখনো নিষ্ক্রিয় নাগরিক চায় না। তাকে বোঝানো হয় সমাজে অধ্যবসায়, আগ্রহ ও দায়িত্ব নিয়ে কাজ করা তার কর্তব্য।

৩. খেলাধুলা বা অ্যাথলেটিক নানা কর্মকাণ্ডে তার অংশ নেয়া উচিত।

সংক্ষেপে বলতে হয়, ভারতে শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে চিন্তাবৃত্তি তৈরি করার প্রবণতা দেখা যায়। চেষ্টাটা একপক্ষীয় ও সীমিতভাবে শিক্ষার্থীদের তৈরি করে। আমি বলব না যে ইংল্যান্ডের নীতিই সর্বোত্কৃষ্ট, তবে শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গভাবে তৈরি করায় তাদের চেষ্টাটা ভালো। ভারতের বর্তমান ধারার শিক্ষায় শিক্ষার্থীরা সব বিষয়ের প্রাথমিক জ্ঞান রাখে কিন্তু কোনো বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। এর বাইরে তাদের প্রফেসরদের সঙ্গে সহজে মেশা ও তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নেয়ার জন্য স্বাধীনতা দেয়া উচিত। ইংল্যান্ডে কোনো শিক্ষার্থী তার শিক্ষকদের মধ্যখানে থেকে নিজেকে তাদের তুলনায় হীন মনে করে না। ইংল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উদ্দেশ্য হচ্ছে শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দূরদৃষ্টি তৈরি করা। যে বিষয়গুলো পড়ানো হয় তা মূলত এক ধরনের সূচনা এবং বিশ্ববিদ্যালয় একজন শিক্ষার্থীর জীবনের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে।

 

আসরার আবেদিন: প্রাবন্ধিক