জাহানারা ছিলেন মোগল বাদশাহ শাহজাহানের জ্যেষ্ঠ কন্যা। ছোটবেলা থেকেই জাহানারা মোগল দরবারের রীতি অনুসারে ধর্মীয় শিক্ষা, পারস্যের সাহিত্য ও অভিজাত রীতিনীতি সম্পর্কে শিক্ষালাভ করেন। কিন্তু মমতাজ মহলের মৃত্যুর পর ঘরোয়া দায়িত্ব জাহানারার ওপর এসে পড়ে। প্রথমেই তিনি তার ছোট ভাই দারা শুকোর বিয়ে অনুষ্ঠানের দায়িত্বটি পালন করেন। মমতাজের মৃত্যুর পর শাহজাহান তার কন্যা জাহানারার ওপর এত নির্ভর করতে শুরু করেন যে জাহানারাকে রাজকীয় সিলমোহর প্রদানের পাশাপাশি সাহিবাত আল-জামানী উপাধি দেয়া হয়। সমসাময়িক নানা মোগল সূত্রে তাকে বেগম সাহেব ও পাদিশাহ বেগম বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি শ্রীনগরে মোল্লা শাহ মসজিদ, একটি বাগান, সরাইখানা ও আগ্রায় জুম্মা মসজিদসহ বহু স্থাপনা তৈরিতেও অবদান রেখেছেন। সুফিবাদের প্রতি জাহানারার আগ্রহ ছিল। দারা শুকোর সঙ্গে এ বিষয়ে তিনি আলোচনা করতেন। সুফিবাদ নিয়ে তিনি ফারসি ভাষায় দুটি বই লিখেছেন।মুনিস আল-আরভায় চিশতিয়া তরিকার সুফিদের ইতিহাস নিয়ে কাজ করেছেন। এ বইয়েরসাহিবিয়া শিরোনামের অংশটিতে মোল্লা শাহর সঙ্গে তার সাক্ষাতের বিষয়টি এসেছে। মিয়া মীরের এ শিষ্য সে সময়ে কাশ্মীরে অবস্থান করছিলেন।

উত্তরাধিকার যুদ্ধের আগে জাহানারা তার পিতা শাহজাহান ও ভাই দারার সঙ্গে সাম্রাজ্যের নানা অংশ ঘুরেছেন। তার ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় তিনি কাশ্মীরের প্রকৃতি ও তার আধ্যাত্মিক গুরুর সম্পর্কে লিখেছেন। জাহানারার বর্ণনার সারাংশ পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হলো—

 

আমার শ্রদ্ধেয় পিতা কাবুল থেকে লাহোরের উদ্দেশে যাত্রা করলেন ১৬৩৯ সালের ১৯ নভেম্বর। সত্য অনুসন্ধানে আমার আগ্রহ আরো বেড়ে গেল, কেননা সেখানে বহু শায়খ ও মহৎ মানুষের বসবাস। আমি একজন গুরুর সন্ধানে ছিলাম, যিনি আমাকে সঠিক পথের সন্ধান দেবেন। আমি মূলত চিশতি তরিকার সাধকদের মধ্যে আমার গুরুর সন্ধান করেছি। যেখানেই আমি একজনের সম্বন্ধে শুনেছি, কাউকে না কাউকে তার সম্পর্কে অনুসন্ধানে প্রেরণ করতাম। আমি নানাজনের কাছ থেকেই নানা প্রার্থনার ধারা সম্পর্কে জেনেছি কিন্তু হজরত মিয়া মীরের নানা শিষ্যদের কাছ থেকে সংবাদ পাওয়ার পূর্ব অবধি কোনো ব্যাপারেই নিশ্চিত ছিলাম না।

আমি সবসময়ই কান খোলা রাখতাম যেন এ ধরনের কোনো সন্তের সম্পর্কে সহজেই জানতে পারি। একজন সত্যিকারের সন্ত যদি তার শিষ্যের পোশাকের প্রান্ত স্পর্শ করেন (এভাবে শিষ্যত্ব দেয়া হতো বা আশীর্বাদের প্রথা ছিল) তাহলে তার পক্ষে সত্যের পথ খুঁজে না পাওয়া অসম্ভব। চিশতি তরিকার মধ্য থেকে কোনো গুরু লাভ করলে ভালো হতো কিন্তু তারা দুনিয়ার বিষয়আশয়ও মানুষের থেকে দূরে থাকে বলে তাদের সন্ধান লাভ দুরূহ।

আমার জীবনের অনেকগুলো মুহূর্ত—প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত প্রিয় ও প্রাচুর্যময় এবং যা অতীত তা ফেরত পাওয়া যায় না—অকারণেই বিনষ্ট হয়েছে। সাতাশ বছর বয়সে তাই আমি স্রষ্টার প্রতি মনোযোগী হলাম। এজন্য আমার প্রয়োজন ছিল উপযুক্ত একজন গুরু তা তিনি যে তরিকারই হোন না কেন। আর যেহেতু আমি আমার লক্ষ্যের প্রতি সৎ ছিলাম, সর্বশক্তিমান স্রষ্টা আমাকে আমার সত্যের পথে চলার জন্য একটি ব্যবস্থা করে দিলেন। আমার বাবা কাশ্মীর যাত্রা করলেন। সে এমন এক স্থান যার জন্য আলাদা করে কোনো প্রশংসা কিংবা বিশেষণের প্রয়োজন হয় না।

আমি ১৬৪০ খ্রিস্টাব্দের ৩১ মার্চ কাশ্মীর পৌঁছাই। আমি সে স্থানের অবস্থা ও বাস্তবতা সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতাম না। সেখানে পৌঁছে বহুজনের কাছ থেকে জানলাম কাশ্মীর সে সময় সন্তদের উপস্থিতিতে পূর্ণ এবং তাদের শীর্ষে আছেন হজরত মোল্লা শাহ (আল্লাহ তার ওপর শান্তি বর্ষণ করুন)। তার পদস্পর্শে এ অঞ্চল স্বর্গের টুকরো উদ্যানে পরিণত হয়েছে। কাদিরি তরিকায় তার সতীর্থরা গুণবান এবং বিশেষভাবে তার গুরু হজরত মিয়া মীর এ তরিকার অবস্থান আরো উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।

আমার প্রিয় ভাই (দারা শুকো) যে কিনা উচ্চপদ লাভ করেছে এবং ঈশ্বর ও সত্য সম্পর্কে আমার সন্ধান সম্পর্কে জানে, সেও মিয়া মীরজির প্রতি অনুগত। সে হজরতের সান্নিধ্যে সময় কাটাত এবং বহু সময় ধরে হজরতের বাণী শ্রবণের মাধ্যমে নিজের মধ্যে একধরনের পরিবর্তন আসে। এর সঙ্গে সে হজরতের অনুগত হয়ে ওঠে। আমিও আমার সন্ধানে সফল হয়ে উঠতে চেষ্টা করি। আমি জ্ঞাত ছিলাম যেকোনো ধরনের উপহার প্রেরণ করা সহবতের লঙ্ঘন, তবু আমার খেদমতগারকে দিয়ে নিজ হাতে রান্না করা খাবার ও কিছু চিঠি প্রেরণ করেছিলাম। প্রথমে তিনি কোনো উত্তর করতেন না। কিন্তু ধীরে ধীরে আমার ভাই তার অনুগত হয়ে উঠলে তার মাধ্যমে সত্যের পথে আমার সন্ধানের কথা তিনি জ্ঞাত হন। অতঃপর ধীরে ধীরে তিনি নিশ্চিত হন যে আমার উদ্দেশ্য একমাত্র সত্যের পর ও ঈশ্বরের নৈকট্য। তিনি দয়ার্দ্র হয়ে ওঠেন এবং আমার জিজ্ঞাসার উত্তর দিতেও আরম্ভ করেন।

আমি আমার ভাইয়ের মাধ্যমে জীবনের সত্য, উচ্চ স্থান ও হজরতের সম্পর্কে জানতে শুরু করি। তখন আমার আর কোনো সন্দেহ ছিল না। আরেকটি ঘটনায় আমি তার আরেকটি সৌন্দর্য দেখতে পাই। আমার মহান পিতা তাকে জানার উদ্দেশ্যে আহ্বান করেন এবং তিনি বলেন, ‘কেবল আল্লাহ ও তার নবীকে অনুসরণ করুন...।’

হজরতের সৌন্দর্য চাক্ষুষ করার আগেই আমার ভাই তার একটি প্রতিকৃতি আমাকে উপহার দিল। আমি বিশ্বাস ও নিবেদনের দৃষ্টি দিয়ে সে প্রতিকৃতি অবলোকন করেছি। হজরতের নির্দেশ অনুসারে প্রথম দিন সে (দারা শুকো) আমাকে পীরের প্রতিকৃতির প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে আল্লাহর নবী, তার চার সাহাবি ও অন্যান্য পবিত্র মানুষদের ধ্যানে ব্যস্ত রাখল। আমি সেদিন গোসল করে পবিত্র পোশাক পরিধান করলাম। সারা দিনের রোজার পর হজরত প্রেরিত ফল দ্বারা রোজা ভাঙলাম। হজরতের শিষ্য মোল্লা সাইদের ঘর থেকে আসা খাবারের কিছু অংশ খেলাম। গভীর রাত অবধি আমি আমার ঘরের ‘মসজিদে’ বসে প্রার্থনা করলাম।

আমি চিশতি তরিকার অনুসারী ছিলাম। সেখান থেকে কাদিরি তরিকায় যাওয়া উচিত হবে কিনা তা নিয়ে ছিল সংকোচ। এতে আমি কি আদৌ কিছু লাভ করব? ঠিক সে মুহূর্তে আমি নিদ্রা আর জাগরণের মধ্যম পর্যায়ে উপনীত হলাম। আমার মনে হলো সেখানে আল্লাহর নবী (সা.), তার অনুসারী ও আল্লাহর অলিদের আগমন ঘটেছে। নবীর (সা.) সঙ্গে ছিলেন তার চার সাহাবি। হজরত আখুন্দ সাহেব নবীর পায়ের কাছে মাথা রাখলেন। নবী বলে উঠলেন, ‘ও মোল্লা শাহ! তুমি তৈমুরিদের মধ্যে আলোর শিখা এনেছ।’

....

প্রায় ছয় মাস আমরা কাশ্মীরে অবস্থান করেছি। আমি নানা সময়ে হজরতের কাছে আবেদন করেছি। তিনি কখনো কখনো আমাকে উত্তর করেছেন। তিনি কোনো জাগতিক বস্তু বা আনন্দের মুখাপেক্ষী নন, তবু আমি নানা সময়ে তাকে সুগন্ধি ও আমার রন্ধন করা নানা খাবার প্রেরণ করেছি। মোহাম্মদের (সা.) রীতিতে নেই এমন কোনো কাজ থেকে বিরত থেকেছি আমি। আর পেয়েছি এক জ্যোতির্ময় গুরুর সন্ধান।

কাশ্মীর থেকে প্রত্যাবর্তনের তিন-চারদিন আগে এক বৃহস্পতিবারে আমি মাগরিবের নামাজ পড়ছিলাম এবং তখন আমি পীরের উপস্থিতি অনুভব করি। আমি তখন আশা করছিলাম তিনি যেন তার উত্তরীয়টি আমার মাথায় অর্পণ করেন। পরের সকালে আমার খিতমতগার পূরন এসে জানাল বিগত সন্ধ্যায় সে হয়রতের খেদমতে ছিল। এ সময় তিনি নিজের কাঁধ থেকে উত্তরীয় খুলে পূরনের হাতে দিয়েছেন। আমি সে উত্তরীয় গ্রহণ করে চোখে ঠেকিয়ে মাথায় তুলে নিই।

আমি দুবার হজরতের সাক্ষাৎ লাভ করেছিলাম। একবার আমার ভাইয়ের সঙ্গে। দ্বিতীয়বার, যখন আমি লাহোর থেকে বেরিয়ে আসি। আমি তাকে আবেদন করেছিলাম যে চলতি পথে সম্ভব হলে আমি তার দর্শন ও আশীর্বাদপ্রার্থী। হজরত আমার আবেদনে সাড়া দিয়েছিলেন। মালবেরি গাছের ছায়ায় তিনি বসেছিলেন একটি রক্তিম শাল গায়ে। আমি ছিলাম হাতির হাওদায়। গাছটির কাছে গিয়ে হাতিটিকে থামাই। পূর্ণচন্দ্রের মতো তার জ্যোতি দর্শন করে উপযুক্ত পীর লাভ করে আমার হূদয় পরিপূর্ণ হয়েছিল।

তাকে বিদায় জানিয়ে আমি অশ্রুপূর্ণ চোখে নিজের পথে রওনা হই। আমার অন্তর ও বাহির জাগতিক সব বিষয় থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। ভারাক্রান্ত হূদয়ে আমি দেখলাম হজরতও সে স্থান ত্যাগ করে নিজের গৃহের দিকে গমন করছিলেন।

 

মাহমুদুর রহমান: লেখক