রাহিল বেগম
শেরওয়ানিয়া অল
ইন্ডিয়া উইমেনস
মুসলিম লীগের
প্রতিষ্ঠাতা। বিবি
রাহিলা খাতুন
তার উরফ
বা উপনাম।
জন্ম ১৮৯৪
সালে, ভারতের
আলিগড়ে। উত্তর
ভারতের প্রভাবশালী
শেরওয়ানি পরিবারের
সদস্য হিসেবে
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক
জীবন পার
করেছেন তিনি।
মেয়েদের জন্য
শিক্ষা, সংস্কার,
সফর ও
দেশান্তর সব
মিলে এক
ঘটনাবহুল জীবন।
১৯২৩ সালে
হজব্রত পালন
করতে তিনি
মক্কায় গমন
করেন। তার
বিচিত্র অভিজ্ঞতা
তিনি উর্দুতে
জাদ আল-সাবিল
নামে একটি
সফরনামায় অন্তর্ভুক্ত
করেন।
অভিজাত পরিবারের
দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে
তিনি সাধারণ
মানুষকে দেখতেন।
তাই ক্ষমাসুন্দর
কিংবা অনুকম্পার
চোখ তার
ছিল না।
উত্তর ভারতের
সুবিধাপ্রাপ্ত অংশে
থেকে তিনি
হয়তো সাধারণের
দুর্দশাকেও সেভাবে
অনুভব করতে
পারেননি। আবার
ধর্মীয় শিক্ষাও
ভারতের পশ্চাত্পদ
মুসলিমদের চারিত্রিক
ত্রুটিকে দূর
করতে পারেনি।
হজকাফেলায় তাই
এমন কিছুর
দেখা পেয়ে
তিনি তা
সহজে মেনে
নিতে পারেননি।
তারই বিচিত্র
অভিজ্ঞতার কিছু
অংশ ড্যানিয়েল
ম্যাক্রোভিচ উর্দু
থেকে ইংরেজিতে
অনুবাদ করেছেন।
উর্দু বইটি
না পাওয়ায়
তার ইংরেজি
অনুবাদেই আস্থা
রাখতে হলো।
তা থেকে
কিছু অংশ
অনুবাদ করে
এখানে অন্তর্ভুক্ত
হলো—
আজ সকাল
ভোরে ভোরে
আমাদের কাছে
চা এল।
তখন আমি
নামাজ পড়েও
শেষ করতে
পারিনি। চা
পান শেষে
নিজের কামরা
থেকে বেরিয়ে
দেখলাম, শুকনো
ঊষর ভূমির
আর চিহ্নমাত্র
নেই—কেবল
আকাশ আর
পানি। আগে
সব সময়
শুনতাম, সর্বত্র
নীল আকাশ
ছাড়া আর
কিছু না
দেখলে নাকি
ভয়ের উদ্রেক
হয়। তখন
নাকি মাথা
ঘুরে, বমি
বমি লাগে...কিন্তু
আমার মোটেই
তেমনটা হলো
না। না
মাথা ঘুরল,
না বমি
এল, না
ভীত-সন্ত্রস্ত
হলাম। তাই
বোরকা পরে
কে কী
করছে তা
দেখার জন্য
জাহাজের এদিক-ওদিক
হাঁটলাম। প্রধান
ডেকের দুপাশে
এবং ফার্স্ট
ক্লাসে সর্বত্র
দেখলাম সবাই
খুশি খুশি
খানাপিনা করছে।
মোদ্দা কথা
হলো, সন্তুষ্টচিত্তে
আমরা সফর
শুরু করলাম।
খোদাকে শুকরিয়া।
আমাদের জাহাজের
ওজন দশ
হাজার টন।
মস্ত আকারের
এবং গুণে-মানে
বুলান্দ। এর
আগে তা
জর্মন নেভির
অধিকারভুক্ত ছিল।
কিন্তু বছরখানেক
আগে নামাজি
সাহেব এটা
কিনে নেন।
এটাকে ডকের
বাকি জাহাজগুলোর
সমপর্যায়ে নিয়ে
যেতেই তিনি
তা করেন।
এতে কোম্পানিটি
বেশ সফলতাও
পেয়েছে। জাহাজটি
হুবহু নিয়মিত
ডাকজাহাজের মতো।
সবকিছু তার
সেরা। সব
সাজানো-গোছানো,
পরিষ্কার। সময়ের
প্রতি একনিষ্ঠতা
তার প্রবল।
যা প্রয়োজন
হতে পারে
তাই হাজির
আছে। নালিশ
করবে, উচ্চ-নীচ
কেউ কোনো
সুযোগ পায়
না। জাহাজটির
খাবার যতখানি
খাওয়ার সৌভাগ্য
হয়েছে তাতে
তা উমদা
লেগেছে। কোনো
জরুরত আছে
কিনা জাহাজের
কর্মকর্তারা হরপল
তা এসে
খবর নিতেন।
আমার ভাই
মুহাম্মদ শিস
খানকে তারা
বেশ আদর-আপ্যায়ন
করল। জাহাজের
গতি এমন
ছিল, নিজেদের
কামরায় বসে
থেকে আমরা
বুঝতে পারতাম
না সেটা
চলছে, না
থেমে আছে...নিজেদের
মহলেও এতটা
আরাম পাই
না আমরা।
কিছুর প্রয়োজনে
নিজেদের ব্যাগ
খোলার দরকার
পড়েনি আমাদের।
তোয়ালে, তক্তপোশসহ
যা যা
প্রয়োজন সব
দেয়া আছে।
তাই লকারে
রাখা বাক্সপেটরা
একবারের জন্যও
খুলতে হয়নি।
আরামে আমাদের
একেকটা দিন
কেটে যাচ্ছিল।
তবুও মুসলিমরা
নাখান্দা। জাহাজে
ধনী-গরিব
সব ধরনের
লোক মিলিয়ে
প্রায় ১২
হাজারের মতো
যাত্রী ছিল।
সবার একই
হালত। এত
আরামে থেকেও
তাদের কোনো
শুকরিয়া নেই।
নিত্য তারা
হাঙ্গামা করে।
নিত্য এ
ওরটা, ও
এরটা চুরি
করে। বেচারা
কর্মকর্তারা সেগুলোর
সমাধান করতে
করতে কাহিল।
জাহাজের প্রধান
কর্মকর্তা উর্দু
ভালো বুঝতে
পারত না।
তাই অনুবাদ
করতে আমার
ভাই মুহাম্মদ
শিস খানের
ডাক পড়ত।
এতেও বিধি
বাম। প্রায়
ব্যক্তি আমাদের
খারাপ ভাবতে
শুরু করল।
জাহাজিদের সঙ্গে
আমাদের একটা
আঁতাত আছে
বলে ধরে
নিল। এমন
কিছু হলে
মুসলিমরা সচরাচর
ভাইদের নিজেদের
পক্ষে নিয়ে
আসতে তত্পর
হয়ে ওঠে।
আর এ
মুসলিম ভাই-বেরাদাররা
চীনা শ্রমিকদের
সঙ্গে যাচ্ছেতাই
ব্যবহার করত।
অথচ এ
শ্রমিকরা তাদের
সেবায় নিরত
থাকত, ঝটপট
ও সানন্দে
হাজিদের ময়লা
পরিষ্কার করত।
কিন্তু খ্রিস্টীয়
ধর্মে বিশ্বাসী
ছিল বলে
হাজিরা তাদের
ভাঙ্গি মনে
করতেন। এমনকি
গলিয়ারা দিয়ে
প্রবেশ করতে
পর্যন্ত দিতেন
না। হাজিরা
মনে করতেন,
অচ্ছুত এ
চীনাদের সংস্পর্শে
তাদের জামা-কাপড়
নোংরা হয়ে
যাবে। বরং
তারা নামাজি
সাহেবের সমালোচনা
করে বলতেন,
কেমন মুসলিম
এ! চীনা
লোকদের কাজে
রেখে নিজের
মুসলিম ভাইদের
অপবিত্র করছেন।
হাঁটার সময়ে
যাত্রীরা তাদের
পিঠে চাপড়
মারতেন, লাঠি
দিয়ে খোঁচা
দিতেন, ইচ্ছা
করে ধাক্কা
দিতেন। চীনাদের
নিয়ে তাদের
একের পর
এক শিকওয়া।
কর্তৃপক্ষ সব
অগ্রাহ্য করলে
হাজিরা বলে
বসতেন, কর্তৃপক্ষ
ভাঙ্গিদের অনুগ্রহ
করছে। বেচারা
কর্মকর্তারা এমনটা
না করতে
হাজিদের কাছে
অনুনয়-বিনয়
করতেন। বলতেন,
চীনার যদি
ধর্মঘট করে
বসে তাহলে
ম্যাসাকার হয়ে
যাবে। উত্তরে
যাত্রীরা বলে
বসলেন, তাতে
ভালোই হবে।
নামাজি সাহেব
তার উপযুক্ত
প্রতিদান পাবেন...
এরপর আমাদের
মোহতারামা বোনদের
কথা বলতে
হয় যারা
পান চিবিয়ে
পিক বাইরে
ফেলেন। প্রায়ই
তারা বায়ুর
বিপরীতে পিক
ফেলেন। তাতে
তা হাজারো
ফোঁটায় বণ্টিত
হয়ে কামরায়
এসে ঢুকে।
কখনো তা
কোনো ফিরিঙ্গির
মুখের ওপর
এসে পড়ে,
কখনো অন্যের
কাপড় নাশ
করে। আমার
কাছে নালিশ
জানানোর সময়
লোকগুলো কোনো
দম নেয়
না। নালিশ
আমি করতে
গেলেই তারা
আমার একহাত
নেয়। মিস্টার
হেডলি নামে
এক ব্যবসায়ীর
ছেলের সঙ্গে
আমার ভাইয়ে
দোস্তি হয়।
একবার সে
আমার ভাইকে
তার বিছানার
চাদর দেখিয়ে
এভাবে আর
পিক না
ফেলতে হাজিদের
অনুরোধ করতে
বলল। অবশ্য
তত দিনে
হাজিদের কাছে
আমরা বদনাম
কামাই করেছি
অনেক। হাজিরা
বলাবলি শুরু
করল, আমরা
অনেকটা কাফের
হয়ে গিয়েছি,
তাই তাদের
আর সমর্থন
করব না।
হায়! বাধ্য
হয়েই লিখছি—অশিক্ষিত
এসব হাজি
ঘোড়া বা
ছাগলের সঙ্গে
একই কায়দায়
নড়বড়ে মালবাহী
জাহাজে করে
সফর করার
লায়েক, যেখানে
তারা আর
মাথা তুলতে
পারবেন না।
লোকেরা ফিসফিস
করে বলতে
লাগল, আমরা
গুপ্ত পুলিশের
লোক। নচেৎ
আমরা কেন
অবশিষ্ট হাজিদের
সঙ্গে এমন
আচরণ করব?
‘আমরা
যদি বলি,
এখন রাত
তাহলে তাদের
উচিত আমাদের
কথা মেনে
নেয়া। মুহাম্মদ
শিস খানের
দিকে তাকিয়ে
দেখো! কীভাবে
সকাল থেকে
সন্ধ্যা পর্যন্ত
ইংরেজটার সঙ্গে
বকবক করে
যাচ্ছে! তারা
দুজন অবশ্যই
আমাদের নিয়ে
কথা বলছে।
তারা এখানে
হজ করতে
আসেনি। ইংরেজরা
তাদের পাঠিয়েছে
হজ নষ্ট
করতে। জাহাজের
ক্রুরা তাদের
সঙ্গে কেমন
আচরণ করে
তাকিয়ে দেখো।
তারা এদের
হুকুম তামিল
করতে সদাপ্রস্তুত।
রোজ চারবার
তারা এদের
ঘর পরিষ্কার
করে। এদের
কেদারা ডেকে
নিয়ে যায়।
আবার সময়মতো
কামরায় ঢুকিয়ে
দিয়ে যায়।
কিছু বলতে
হয় না
এদের। এমনকি
জাহাজের বাবুর্চিখানার
তৈরি খাবার
খায় এরা।
এদের সঙ্গে
আলোচনা না
করে কর্মকর্তারা
কোনো সিদ্ধান্ত
পর্যন্ত নেন
না। কোনো
রাখঢাক নেই।
সবাই এটা
জানে। অপেক্ষা
করো আর
চেয়ে চেয়ে
দেখো, তারা
কীসব দুষ্কর্ম
করে। এ
জাহাজে ওঠা
আমাদের উচিত
হয়নি।’...ফারসি
নীতিবাক্য মেনে
আমরা সর্বদা
নিশ্চুপ থেকেছি।
তারা ভাবল,
আমরা তাদের
ভয় পেয়েছি...
আমাদের জাহাজে
একটা আরব
পরিবার ছিল।
নারী-পুরুষ
মিলিয়ে ২০-২৫
জন। ফার্স্ট
ক্লাসের চার-পাঁচটা
কামরা তাদের
দখলে। বাহরাইনের
ব্যবসায়ী তারা।
এ জাহাজে
ওঠার আগে
তারা বসরা
থেকে করাচি
হয়ে বোম্বে
গিয়েছিল। রোজ
তারা আস্ত
একটা মেষ
জবাই দেয়।
মাশাল্লাহ! রোজ
তারা পুরোটা
খেয়ে সাবাড়
করে। কারণ
তারা ২৫
জন। সঙ্গে
তাদের চাকর-নফর
তো রয়েছেই।
যেমন লোকসংখ্যা
তেমন তাদের
তল্পিতল্পা। সঙ্গে
প্রায় ১৫-২০টার
মতো বিছানা।
আমি হিসাব
করে দেখলাম,
তাদের নিজেদেরই
একটা জাহাজ
লাগে। অত্যুক্তি
করছি না।
তাদের দুইটা
পাচক ২৪
ঘণ্টা রান্না
করেই যাচ্ছে।
মাশাল্লাহ! তাদের
রান্নার তৈজসপত্রও
বিশালাকার। এসব
বিষয়ে ভারতীয়দের
তারা পেছনে
ফেলে গিয়েছে।
সপ্তাহে নাকি
তাদের দুই
কেনেস্তারা ঘি
লাগত। ভাবতেই
পারছেন, তাহলে
তারা কতখানি
ঘি সঙ্গে
এনেছে...
ভারতীয়রা সম্ভাব্য
সর্বপ্রকারে তাদের
মানবতা খুইয়ে
বসেছিল। বাঙালি
ও বিহারিদের
ক্ষেত্রে এ
কথা সর্বপ্রকারে
সত্য। আল্লাহ!
আমাদের যেন
আর তাদের
সঙ্গে সফর
করতে না
হয়। চূড়ান্ত
অসৎ, অপরিষ্কার
ও অভদ্র
তারা। এসবের
প্রমাণ তারাই
দিয়েছে। কোনো
কিছু করার
উত্তম পদ্ধতি
যতই তুমি
তাদের দেখিয়ে
দাও না
কেন তারা
ইচ্ছাপূর্বক উল্টোটাই
করবে। এর
জন্য প্রয়োজন
হলে তারা
হিংসা ও
রেষারেষি করবে...
কাহিন মাশরিক: লেখক





