ইসলাম ধর্ম যে ঐতিহ্যের অংশ, সেই সেমেটিক ধারায় ভ্রমণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ। সেমেটিক বিশ্বাস অনুসারে আদি পিতা আদম এবং আদি মাতা হাওয়া যখন স্বর্গ থেকে নির্বাসিত হন, তখন বাবা আদম শরণদ্বীপ তথা বর্তমান শ্রীলংকায় আর মা হাওয়া আরবের জেদ্দায় নিজেদের আবিষ্কার করেন। পরস্পরের এই জুদায়ী বা বিচ্ছেদ ঘোচানোর নিমিত্তেই মূলত শুরু হয় আদি ভ্রমণ। তারা উভয়েই পরস্পরকে খুঁজতে গিয়ে নানা পথ প্রান্তর পরিভ্রমণ শেষে আরাফাতের ময়দানে মিলিত হন। সেই কারণে এ আরাফাতের ময়দান ইসলাম ধর্মে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। হজব্রত পালনের সময় এ আরাফাতের ময়দানে হাজিদের বাধ্যতামূলক অবস্থান গ্রহণ করতে হয়। সুতরাং ইসলাম ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে এটা দেখা যায় যে আদি মাতা হজরত হাওয়ার মাধ্যমেই মুসলিম নারীদের ভ্রমণের সূচনা হয়। এ ব্যাপক অর্থে আমরা বহু প্রাচীন কাল থেকেই মুসলিম নারীদের ভ্রমণের ইতিহাস পাব।
এখন
আমরা তার দুটি উদাহরণ তুলে ধরব। প্রথমটি হজরত সারাহ এবং হজরত হাজেরার ভ্রমণ। তারা উভয়েই মুসলিম মিল্লাতের পিতা হজরত ইব্রাহিমের বিবি ছিলেন এবং দুজনেই তাদের স্বামীর সঙ্গে নানা দেশ পরিভ্রমণ করেন। দ্বিতীয় উদাহরণটি হলো হজরত মুসার সময়কালে। নবুয়ত প্রাপ্তির আগে হজরত মুসা যখন বনি ইসরায়েলিদের অধিকার আদায় করতে গিয়ে তত্কালীন ফারাওয়ের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন, তখন আত্মরক্ষার তাগিদে তিনি মিসর থেকে মাদায়েনে চলে আসেন। সেখানে আল্লাহর নবী হজরত শোয়াইবের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। হজরত শোয়াইব আলাইহিস সালাম নিজ কন্যা রাহেলাকে হজরত মুসার সঙ্গে বিয়ে দেন। বিবাহ-পরবর্তী বেশ কিছুদিন মাদায়েনে অবস্থান করার পর তিনি মিসরে ফিরে যাওয়ার জন্য হজরত শোয়াইবের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করেন। অনুমতি পাওয়ার পর তিনি প্রস্তুতি গ্রহণপূর্বক সফর শুরু করেন। বিবি রাহেলাও তার সফরসঙ্গী হন। আবার নবুয়তপ্রাপ্তির পর ফেরাউনের অত্যাচার থেকে বনি ইসরায়েলকে বাঁচাতে মহান রবের নির্দেশে নবী মুসা যখন তাদের নিয়ে দেশত্যাগ করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন, তখন সেই সফরে নারীরাও ছিলেন। একইভাবে, শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর
আবির্ভাবের পরেও মুসলিম নারীদের এমনতর সফরের কথা জানা যায়। যেমনটা আমরা দেখি নবী পত্নী হজরত আয়েশা সিদ্দিকার ক্ষেত্রে। তিনি বিভিন্ন যুদ্ধযাত্রায় নবীর কাফেলায় শামিল ছিলেন। আবার নবী যখন হিজরত করে মক্কা থেকে মদিনায় যান, তখন তার এবং তার মহিমান্বিত সাহাবাদের পরিবারের নারীরাও হিজরত করে মক্কা থেকে মদিনায় গমন করেন। এরপর আমরা দেখি নবীর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন সপরিবারে কারবালায় যাচ্ছেন, যে কাফেলায় তার বিবি, কন্যাসহ পরিবারের সব নারী সদস্যও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
আরো
পরে সুফিদের মধ্যে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হজরত রাবেয়া বসরীকে আমরা দেখি যে তিনি হজব্রত পালনের উদ্দেশে বসরা থেকে পবিত্র মক্কা নগরীতে সফর করছেন। এছাড়া আমরা এখানে নাম নিতে পারি হজরত বিবি জুলাইখার, যিনি নিজ যুগের ‘রাবেয়া বসরী’ নামে খ্যাত ছিলেন এবং যিনি জগদ্বিখ্যাত আউলিয়া হজরত খাজা নিজামউদ্দিনের মহীয়সী মাতা, মোটামুটিভাবে ত্রয়োদশ শতকের প্রথম ভাগে মধ্যপ্রাচ্যের বুখারা শহরে মোঙ্গলদের উৎপাত শুরু হলে তিনি স্বীয় পিতা খাজা আরব এবং চাচা খাজা আলীর সঙ্গে বুখারা থেকে সফর করে বর্তমান পাকিস্তানের লাহোর শহরে এসে উপস্থিত হন। সেখানে কিছুকাল অবস্থান করার পর তিনি তার পরিবারের সঙ্গে পুনরায় সফর করে ভারতের উত্তর প্রদেশের বাদায়ুন শহরে চলে আসেন। সেখানে তিনি চাচাতো ভাই খাজা আহমদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং এ দম্পতির ঘর আলো করে জন্ম নেন হজরত খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া। খাজা নিজামউদ্দিনের পিতা তার শৈশবেই এন্তেকাল করেন। তার বয়স যখন ষোল বছর, তখন বিবি জুলাইখা উচ্চ শিক্ষা দানের উদ্দেশ্যে তাকে এবং তার বোন ও গৃহপরিচারিকাকে নিয়ে পুনরায় বাদায়ুন থেকে সফর করে দিল্লিতে আসেন।
তবে
সুপ্রাচীন কাল থেকেই মুসলিম নারীরা ভ্রমণের সঙ্গে জড়িত থাকলেও তা মূলত ছিল পরিবার কিংবা সম্প্রদায়ের সঙ্গে ভ্রমণ। নিজেদের উদ্যোগ কিংবা স্বাধীন ইচ্ছায় কেউ ভ্রমণ করেছেন কিনা, এ বিষয়ে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। ভ্রমণকারী কিংবা ভ্রমণবৃত্তান্ত রচনাকারী হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ক্ষেত্রে নারীরা অদ্যাবধি এতটাই বঞ্চিত যে এ ধরনের কোনো ঐতিহাসিক চরিত্রের কথা স্মরণ করতে পাঠককে রীতিমতো সংগ্রাম করতে হবে। ভ্রমণ করার জন্য প্রয়োজন স্বাধীনতা, স্বাধীন ইচ্ছা, কষ্টসহিষ্ণুতা, উদ্যোগ। যেগুলো নারীদের আছে বলে সাধারণত অস্বীকার করা হয়। একজন নারী ভ্রমণের ক্ষেত্রে সাধারণত যেসব প্রতিকূলতার মুখোমুখি হন, একজন মুসলমান নারীর ক্ষেত্রে পর্দা প্রথা, পুরুষ অভিভাবকের প্রয়োজনীয়তা, হালাল খাবারের সীমাবদ্ধতা প্রভৃতি কারণে সেই জটিলতা আরো বেড়ে যায়। যে কারণে সাদিকা দৌলতাবাদী নামের এক ইরানি মুসলমান নারী ফ্রান্সে পৌঁছলে, সেখানকার এক অভিবাসন কর্মকর্তা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি
বিশ্বাসই করতে পারছি না যে আমি একজন ইরানি মুসলমান নারীর সঙ্গে কথা বলছি! এখন, আমাকে বলুন, সম্পূর্ণ পথ আপনি কার সঙ্গে এসেছেন? আমি বোঝাতে চাইছি, কে আপনাকে নিয়ে এসেছে?...একজন
ইরানি মুসলমান নারী একাকী ভ্রমণ করে তেহরান থেকে ফ্রান্সে এসেছে! আপনার সরকার কীভাবে আপনাকে যাত্রার অনুমতি দিল? এ পাসপোর্ট আপনি কোথায় পেলেন?’ অথচ
সময়টা তখন ১৯২৬ সাল! আরেকজন ভ্রমণকারী হায়দরাবাদের বেগম সারবুলান্দ জঙ্গ তার ভ্রমণের এক পর্যায়ে দামেস্কে গিয়ে গোসল করা নিয়ে জটিলতার মুখোমুখি হন। তিনি এবং তার স্বামী যেই হোটেলে ওঠেন, সেখানে কোনো গোসলখানা ছিল না। হোটেল কর্তৃপক্ষ তাদের জানাল, গোসল করতে হলে শহরের হাম্মামখানায় যেতে হবে, যেখানে নারীদের জন্য একটি এবং পুরুষদের জন্য একটি হাম্মামখানা রয়েছে। এ রকম গণহাম্মামখানায় গোসল করতে হবে এই ভেবে প্রথম থেকেই তিনি বিব্রত ছিলেন। আর হাম্মামখানায় গিয়ে তো অবস্থা আরো খারাপ! সেখানে তাকে হাম্মামখানার নিয়ম অনুসারে সব জামাকাপড় খুলে তোয়ালে জড়িয়ে নিতে বলা হলো, যা ছিল তার জন্য চরম বিব্রতকর, কেননা, এমনতর সংস্কৃতির সঙ্গে তিনি এর আগে পরিচিত ছিলেন না। আবার গোসল না করেও তার কোনো উপায় ছিল না, কারণ দীর্ঘ ট্রেন ভ্রমণে তিনি তখন ক্লান্ত এবং অশুচি হয়ে পড়েছিলেন, যেই অবস্থায় তার পক্ষে নামাজ আদায় করা এবং পুণ্যস্থান পরিদর্শন করা সম্ভব ছিল না। তবে এ ধরনের নানাবিধ সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও মোটামুটিভাবে অষ্টাদশ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ইরান,
তুরস্ক এবং ব্রিটিশ ভারত থেকে বহু মুসলমান নারী ভ্রমণকারী পাওয়া যায়, যারা তাদের ভ্রমণবৃত্তান্ত লিখে রেখেছিলেন, যেগুলো পরে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়। এসব ভ্রমণকারীর মধ্যে কেউ কেউ শাসক ছিলেন, আবার কেউবা ছিলেন সংস্কারক, তীর্থযাত্রী, সুফি, সাধারণ গৃহিণী, ধর্মান্তরি, বন্দি, সাহিত্যিক ইত্যাদি। তাদের পরিচয়ের এ বৈচিত্র্যের মতোই তাদের যাত্রাপথও ছিল বৈচিত্র্যময়। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসব মুসলমান নারী তাদের যাত্রা শুরু করেন, আর তাদের গন্তব্যস্থল ছিল জাভা থেকে আলাবামা, লন্ডন থেকে মক্কার মতো বিবিধ ও বিস্তৃত। ভ্রমণকালীন দেশে-বিদেশে নারীদের জীবনের প্রতি তাদের দৃষ্টি ছিল এবং কোথাও উত্তম কোনো অভিজ্ঞতা লাভ করলে তা দ্বারা নিজেদের সমাজ উন্নত করার একটি সচেতন প্রয়াস তাদের মধ্যে ছিল। ভ্রমণ করার সঙ্গে সঙ্গে ভ্রমণবৃত্তান্ত লিখে রাখা এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা বয়ান করার এক আন্তরিক প্রচেষ্টাও তাদের মধ্যে লক্ষ করা যায়। অনেক ভ্রমণকারী তাদের ভ্রমণকৃত গন্তব্যস্থলগুলো এবং যেসব স্থান তারা অতিক্রম করেছেন, সেগুলো সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এ প্রয়াস তাদের লেখাকে ঐতিহাসিকদের জন্য মূল্যবান দলিলে পরিণত করেছে। তবে এসব ভ্রমণলিপির মূল আকর্ষণ হলো এগুলো মূলত লেখকদের আত্মজীবনী, যা থেকে এ নারীদের সম্পর্কে জানা যায়। সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ব্যতীত এ মুসলমান নারীদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল যে তারা প্রত্যেকেই ছিলেন সমাজের প্রতিপত্তিশালী ও বিত্তবান পরিবারের সদস্য কিংবা বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত, যা তাদের বিপত্সংকুল এবং ব্যয়বহুল ভ্রমণে সক্ষম করেছে। জাহানারা বেগম, সিকান্দার বেগম, মালেক হানুম, জয়নব হানুম, নজলী বেগম এরা রাজপরিবারের সদস্য এবং প্রভূত ক্ষমতা ও সম্পদের অধিকারী ছিলেন। প্রতিপত্তিশালী ও বিত্তবান পরিবারের সন্তানদের মধ্যে ছিলেন আতিয়া ফয়েজী, শরীফা হামিদ আলী, বেগম সরবুলান্দ জঙ্গ প্রমুখ। লেখাপড়া জানার কারণে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত মুসলিম নারী ভ্রমণকারীদের মধ্যে দিলশাদ ও নুর বেগমের নাম উল্লেখযোগ্য। মোটা দাগে, সেকালের মুসলমান নারীদের ভ্রমণকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত, তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে ভ্রমণ। হজ ও ওমরা পালনার্থে পবিত্র মক্কায় গমন, জিয়ারতের জন্য মদিনা শরিফ, ইরান ও ইরাকে শিয়া তীর্থস্থানগুলো ভ্রমণ এ ভাগের অন্তর্ভুক্ত। এখন পর্যন্ত পাওয়া হজযাত্রার প্রথম নারী লেখক সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানা যায় না। এটি ফার্সি ভাষায় লিখিত। এখানে লেখক নিজেকে ‘ইসপাহানী রমণী’ হিসেবে পরিচিত করান। তিনি মির্জা খলিল নামক এক সাফাভিদ কর্মকর্তার বিধবা স্ত্রী ছিলেন। সপ্তদশ শতকের শেষভাগে তিনি তার এ সফর শুরু করেন। ব্যয়বহুল ও বিপজ্জনক হেজাজ ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা এবং অর্থ দুটোই তার ছিল। স্বামীর মৃত্যুশোক প্রশমিত করার জন্য তিনি এ সফর করেন। তিনি শিয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
প্রথম
ভারতীয় নারী শাসক হিসেবে হজযাত্রা করেছেন নবাব সিকান্দার বেগম (১৮১৬-৬৮) এবং ভারতীয় নারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম এর বৃত্তান্ত প্রকাশ করেছেন। তিনি ঔপনিবেশিক ভারতের স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য ভোপালের শাসক ছিলেন। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের সময় ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আনুগত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে সার্বভৌম শাসকের মর্যাদা দেয়া হয় এবং ব্রিটিশ রাজত্বে রানী ভিক্টোরিয়ার পাশাপাশি একমাত্র নারী নাইটের মর্যাদায় ভূষিত করা হয়। তিনি ভোপালের রাজস্ব ও বিচার ব্যবস্থা, সামরিক ও পুলিশ বাহিনী, পরিবহন, শিক্ষা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার সংস্কার সাধন করেন। ১৮৬৩ সালের শেষ ভাগে তিনি ভোপাল থেকে হজযাত্রা শুরু করেন এবং এগারো মাস পরে ফিরে আসেন। ‘তারিখ-ই-সফর-ই মক্কা’ (মক্কা
সফরের ইতিহাস) নামে উর্দু ভাষায় তিনি তার সফরনামা রচনা করেন, যা তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। ভোপালের আরেক শাসক নবাব সুলতান জাহান বেগম (১৮৫৮-১৯৩০) ছিলেন নবাব সিকান্দার বেগমের নাতনি। তিনি এক ডজনেরও বেশি উর্দু গ্রন্থের রচয়িতা, যার মধ্যে রয়েছে তার তিন ভলিউমের আত্মজীবনী, শিক্ষা, পর্দাপ্রথা, স্বাস্থ্য এবং নারী অধিকার নিয়ে সংস্কারমূলক নির্দেশিকা, শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ, এমনকি একটি রান্নার বইও। আপাদমস্তক আফগানি বোরকায় আবৃত হয়েই তিনি ভারতবর্ষ এবং বিদেশে ভ্রমণ করেছেন। ঈসায়ী ১৯০৩-৪, ১৯১১ এবং ১৯২৫-২৬ সময়কালে তিনি মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের নানা দেশ ভ্রমণ করেন। তার দাদির অনুসরণে তিনি হজব্রত পালনের উদ্দেশে হেজাজ গমনের মাধ্যমে তার প্রথম ভ্রমণ শুরু করেন। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে তিনি ভোপাল থেকে যাত্রা শুরু করেন এবং পাঁচ মাস পর ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে ফিরে আসেন। ‘রাওজাত আল রিয়াহীন’ (সুগন্ধি
বাগান) শিরোনামে উর্দুতে তিনি তার ভ্রমণবৃত্তান্ত রচনা করেন। উপমহাদেশের আরেক গুরুত্বপূর্ণ মুসলমান নারী ভ্রমণকারী হলেন নিশাত আল নিসা বেগম, যিনি বেগম হাসরাত মোহানি নামে পরিচিত। ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামে তিনি এক প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ভারতে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানে আন্দোলনের ক্ষেত্রে তিনি প্রথম মুসলিম নারীদের একজন ছিলেন। তিনি ও তার স্বামী, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব মাওলানা হাসরাত মোহানি একত্রে হজব্রত পালন করেন। হজ পালনকারী প্রথম ইউরোপীয় মুসলমান নারী হিসেবে যাকে দাবি করা হয়, তার নাম লেডি এভেলিন কোবল্ড, ধর্মান্তরিত হওয়ার পর যিনি জয়নব কোবল্ড নামে পরিচিত হন। হজব্রত পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা-মদিনায় যাওয়া ছাড়াও অনেকেই ইরান ও ইরাকে নবী পরিবারের সদস্যদের মাজার জিয়ারতের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করেন। এদের মধ্যে একজন হলেন মাহমুদ রিজভিয়া। করাচির এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান এ উর্দু লেখক কারবালা, কুফা ও নাজাফে ভ্রমণ করে নবী পরিবারের সদস্যদের মাজার জিয়ারত করেন। এ-সংক্রান্ত তার উর্দু ভ্রমণলিপি ‘দুনিয়া-এ-শাহারযাদ’ নামে ১৯৪৫ সালে প্রকাশিত হয়।
মুসলিম
নারীদের ভ্রমণের দ্বিতীয় ভাগটি হলো নারী মুক্তি আন্দোলন ও রাজনৈতিক কারণে ভ্রমণ। নারী মুক্তির প্রশ্নে ভ্রমণকারীদের মধ্যে প্রথম দিককার উল্লেখযোগ্য তিনজন হলেন তিন তুর্কি লেখিকা—মালেক হানিম (১৮১৪-৭৩), তিনি
গ্রিসে ভ্রমণ করেন, জয়নব হানুম (মৃত্যু-১৯২৩), তিনি
ইউরোপের বিভিন্ন দেশ সফর করেন এবং সালমা একরাম (১৯০২-৮৬), যিনি
নিউইয়র্ককে বেছে নিয়েছিলেন তার গন্তব্যস্থল হিসেবে। হুদা শরাভি (১৮৭৯-১৯৪৭) ছিলেন মিসরীয় নারীবাদী নেত্রী। তিনি ১৯২৩ সালে রোমে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নারী সংঘের এক সভায় যোগদানের উদ্দেশ্যে তথায় সফর করেন। আরেক মিসরীয় নারীবাদী নেত্রী ছিলেন আমিনা সাঈদ (১৯১৪-৯৫)। একজন সাংবাদিক ও নারী অধিকার কর্মী হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। এছাড়া ডিসেম্বর, ১৯৪৫ থেকে জানুয়ারি, ১৯৪৬ পর্যন্ত ভারতের হায়দরাবাদে অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় নারী সম্মেলনে মিসরীয় প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করতে গিয়ে তিনি ভারতবর্ষ সফর করেন। শরীফা হামিদ আলী (১৮৮৩-১৯৪৭) জাতিসংঘে ভারতীয় প্রতিনিধি ছিলেন। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের নবগঠিত ‘কমিশন অন দ্য স্ট্যাটাস অব উইমেন’-এর প্রথম অধিবেশনে তিনি ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন।
মুসলমান
নারীদের ভ্রমণের তৃতীয় ভাগটি হলো শিক্ষার উদ্দেশ্যে ভ্রমণ। এ ভাগে যেসব নারী রয়েছেন, তারা প্রত্যেকেই প্রভাবশালী ও বিত্তশালী পরিবারের সন্তান ছিলেন। বোম্বের বিখ্যাত তায়েবজি পরিবারের আতিয়া ফয়েজী, তার বোন নজলী বেগম এবং জ্ঞাতি বোন সাফিয়া জাবির আলী ও শরিফা হামিদ আলীর নাম এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। আতিয়া ফয়েজী (১৮৭৭-১৯৬৭) ও তার স্বামী, বিখ্যাত চিত্রকর ও লেখক স্যামুয়েল রাহামিন, শিল্পের বিভিন্ন শাখা, যেমন চিত্রকলা, সংগীত, নৃত্য, নাট্যকলায় উৎসাহ প্রদান ও পৃষ্ঠপোষকতা করার উদ্দেশ্যে ভারতবর্ষ, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায় ব্যাপকভাবে ভ্রমণ করেন। শাহ বানু বেগম ওরফে মায়মুনা সুলতান (১৯০০-৮২) ছিলেন ভোপালের রানী সুলতান জাহান বেগমের পুত্রবধূ। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে, মাত্র এগারো বছর বয়সে তিনি ব্রিটেন, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণ করেন। ইরানি নারী সাদিকা দৌলতাবাদী (১৮৮২-১৯৬১) ১৯২৩ সালে প্রথম ইরানের বাইরে তার ভ্রমণ শুরু করেন। জল ও স্থলপথে তিনি বাগদাদ, আলেপ্পো, বৈরুত, মাঁর্সেই, বার্ন, বার্লিন হয়ে অবশেষে প্যারিসে এসে পৌঁছান। তিনি ১৯২৭ সাল পর্যন্ত প্যারিসের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ডিপ্লোমা কোর্সে অধ্যয়ন করেন।
মুসলিম
নারীদের ভ্রমণের চতুর্থ ভাগটি হলো পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে পরিবারের পুরুষ সদস্যদের প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে ভ্রমণ, বাধ্যতামূলক কিংবা স্রেফ বিনোদনের উদ্দেশ্যে আনন্দ ভ্রমণ। বাংলাদেশের রংপুরের পায়রাবন্দে জন্ম নেয়া নারী শিক্ষার পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২) এমনই একটি আনন্দ ভ্রমণ করেন বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে, হিমালয়ে। সফরসঙ্গী ছিলেন তার স্বামী জনাব সাখাওয়াত হোসেন। এ ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি ‘কূপমণ্ডূকের হিমালয় দর্শন’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। রাজকুমারী জাহানারা (১৬১৪-৮১) ছিলেন মোগল সম্রাট শাহজাহান ও তার বিবি মমতাজ মহলের কন্যা। তিনি তার পিতা এবং ভাইয়ের সঙ্গে মোগল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমণ করেন। এ ভাগে আরেকজনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি হলেন দিলশাদ (১৮০০-১৯০০?)। তিনি বর্তমান তাজিকিস্তানের একটি স্বায়ত্তশাসিত নগর রাষ্ট্র উরা-টেপেতে জন্মগ্রহণ করেন। সতেরো বছর বয়সে বহিঃশত্রু দ্বারা তার জন্মস্থান আক্রান্ত হলে আরো বহু নগরবাসীর সঙ্গে তাকেও জোরপূর্বক বন্দি অবস্থায় খোকান্দ নামক শহরে নিয়ে আসা হয়। সেখানেই তিনি তার জীবনের অধিকাংশ সময় কাটান। এ জোরপূর্বক হিজরতের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি ‘তারিখ-ই-মুহাজিরান’ (মুহাজিরদের
ইতিহাস) নামে একটি আত্মজীবনী রচনা করেন।
প্রিয়
পাঠক, ওপরের আলোচনা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে বিগত তিন শতাব্দীতে পাওয়া মুসলমান নারী, যারা ভ্রমণ করেছেন এবং ভ্রমণবৃত্তান্ত রচনা করেছেন, তারা প্রত্যেকেই লেখাপড়া জানা, সুশিক্ষিত, সমাজের অগ্রসর, অভিজাত, প্রতিপত্তিশালী ও বিত্তবান অংশের সদস্য। তাহলে সেই সময়ের অক্ষরজ্ঞানহীন, সমাজের অনগ্রসর, প্রতিপত্তিহীন, নিম্নবর্গের যেসব মুসলমান নারী, তাদের কি আদৌ কোনো ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নেই? থাকলে সেটা কেমন? সেই বিষয়ে তেমন কিছুই জানা যায় না। আজ এ একবিংশ শতাব্দীতে এসেও, যখন পরিবহন ব্যবস্থা হয়েছে আরো উন্নত, বিমান যোগাযোগ হয়েছে সুলভ, এ অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি? এখনো আমরা নারী ভ্রমণকারী হিসেবে তাদেরই পাচ্ছি, যারা সমাজের উচ্চবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত অংশের সদস্য, যারা লেখাপড়া জানা কিংবা পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থানের কারণে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত। পক্ষান্তরে, নিম্নবর্গীয় যেসব নারী কাজের সূত্রে কিংবা বিবিধ কারণে বাধ্য হচ্ছেন এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাতে তাদের জবান কি আমরা শুনতে পাই? তাদের এ অভিজ্ঞতা লেখার সামর্থ্য নেই, আর তাদের সেই অভিজ্ঞতা শোনার তাগিদ আমরা অনুভব করছি কি? মোদ্দা কথা, বিগত শতাব্দীগুলোতে এবং বর্তমানে পাওয়া উচ্চবিত্ত, প্রভাবশালী কিংবা লেখাপড়া জানা ইত্যাদি কারণে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত মুসলিম নারী ভ্রমণকারীদের পাশাপাশি সমাজের অনগ্রসর, নিম্নবিত্ত এবং সুবিধাবঞ্চিত নারীদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা অতীতে কেমন ছিল ও বর্তমানে তা কেমন, সে দিকটাও খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
নিজাম আশ শামস: লেখক ও অনুবাদক






