উপনিবেশ থেকে কোনো অংশ স্বাধীন হওয়ার পর এর ইতিহাসের একটা অংশ থেকে যায় ঔপনিবেশিক আমলে সেখানে কাজ করা সরকারি কর্মকর্তাদের বয়ানে। বিশেষত ভারতীয় উপমহাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টা ঘটে। এখানকার ছোট একটা গ্রামেরও অতীত হয়তো পাওয়া যায় কোনো ব্রিটিশ সিভিল সার্ভেন্টের স্মৃতিকথায়। মাদারীপুরকেও তেমনি খুঁজে পাওয়া গেল উইলিয়াম হানবেরি সমারেজ স্মিথের লেখায়।
১৯১১ সালে সিডনিতে জন্ম সমারেজ স্মিথের। তিনি ১৯৩৪-৪৭ সাল পর্যন্ত আইসিএস হিসেবে ভারতীয় উপমহাদেশে দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে ১৯৪৬-৪৭ সালে তিনি বাংলার গভর্নরের ডেপুটি সেক্রেটারি ছিলেন। এরপর চার্চ অব ইংল্যান্ডের অর্থ বিভাগের সহকারী সচিব ও পরে আর্টবিশপের সেক্রেটারি ফর অ্যাপয়েন্টমেন্টসের দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত তার লেখা ‘আ ইয়াং ম্যান’স কান্ট্রি: লেটারস অব আ সাবডিভিশনাল অফিসার অব দি ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস ১৯৩৬-৩৭’ বইয়ের কিছু অংশে উঠে এসেছে মাদারীপুরের কথা।
এ বইয়ের পটভূমি অংশে স্মিথ লিখেছেন, ‘আমার বাবা ছিলেন একজন নিয়মানুবর্তী মানুষ। আমি যখন ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে ছিলাম সে সময় ১৯৩৪-৪৭ সালের মধ্যে আমার মা ও বাবার কাছে ভারত থেকে যে চিঠিপত্রগুলো লিখেছিলাম তা তিনি দুটো বড় বক্স ফাইলে তারিখ অনুযায়ী সাজিয়ে রেখেছিলেন। ১৯৫০ সালে তিনি মারা যাওয়ার পর এগুলো আমার হাতে আসে, কিন্তু আমি ভালো করে এগুলোর দিকে নজর দিইনি।
‘১৯৭৫ সালে আমি অবসরে গেলে অন্য কিছু করার জন্য বাড়তি সময় পাই। আমি অনেক দিন ধরেই ভেবেছি ১৩ বছর আমি ভারতে কাজ করেছি, তার মাঝে জুলাই ১৯৩৬ থেকে অক্টোবর ১৯৩৭ ছিল সবচেয়ে স্মরণীয়। ওই সময়ে আমি পূর্ব বাংলায় ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমায় মহকুমা প্রশাসক পদে কাজ করেছি। আমি যখন যাই, তখন ওই মহকুমার জনসংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি আর আমার বয়স ২৫-এরও কম! এটা সত্য ব্রিটিশদের জন্য ভারত পুরোপুরিই ছিল “আ ইয়াং ম্যান’স কান্ট্রি” যুবকদের দেশ বা যৌবনের দেশ, তবে একেবারে যুবকদের নয়ও।’
স্মিথ মনে করেন, এ চিঠিগুলো কেবল ইতিহাসের ছাত্রদের নয়, সাধারণ পাঠকদের জন্যও চিত্তাকর্ষক হবে। কারণ মাদারীপুর মহকুমা (এখন জেলা) বর্তমান বাংলাদেশের অংশ। তিনি যখন সেখানে কাজ করেছেন তার পরের রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্পর্কে নিজের ভালো ধারণা নেই বলে স্বীকার করেছেন স্মিথ। তবে ভৌগোলিক পরিবর্তন যেহেতু হয়নি, তাই ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশকে তিনি তুলে ধরতে চেয়েছেন।
সিভিল সার্ভিসে যোগদানের বিষয় নিয়ে স্মিথ লিখেছেন, ‘আমি যখন ক্যামব্রিজে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছিলাম, তখন সিভিল সার্ভিসে যোগদানের চিন্তা মাথায় আসে। ভারতীয় সিভিল সার্ভিস (ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস) আর বিলাতের সিভিল সার্ভিসে প্রবেশের জন্য তখন পরীক্ষা একটিই ছিল।’
১৯৩৩ সালের জুনে গণিত ও আইন বিষয় নিয়ে স্মিথ তার ডিগ্রি কোর্স সমাপ্ত করেন। এক মাসের প্রস্তুতি নিয়ে তিনি বারলিংটন গার্ডেনসে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন। স্মিথ জানাচ্ছেন, এটা ছিল একটা পরীক্ষামূলক প্রস্তুতি, কারণ তার লক্ষ্য ছিল হোম সিভিল সার্ভিস তথা ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসে যোগদান করা। তিনি জানান, ভারত সম্পর্কে তার তেমন কোনো ধারণা ছিল না। তবে হোম সিভিল সার্ভিসের জন্য স্মিথের বয়স তখনো এক বছর কম ছিল। পরীক্ষায় তিনি ভালো করেন। ভারতে যাওয়া নিয়ে দোটানা থাকলেও শেষে তিনি ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ভারত সম্পর্কে ধারণা না থাকয় তিনি নিজের ফুফা স্যার উইলিয়াম বার্টনের পরামর্শ নেন। স্মিথ লেখেন, ‘তিনি আমার বাবার এক জ্ঞ্যাতি বোনকে বিয়ে করেছিলেন। স্যার বার্টন ভারতে একটি সফল পেশাজীবন যাপন করেছিলেন। ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে পাঞ্জাবে কাজ করার পর তিনি ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল সার্ভিসে বদলি হন আর সবচেয়ে প্রত্যাশিত দুটি পদ, মহীশুর ও হায়দরাবাদে রেসিডেন্সের দায়িত্ব পালন করার পর ১৯৩০ সালে অবসরে যান। পরামর্শ চাইলে তিনি নয়টি প্রদেশের একটি অগ্রাধিকার তালিকা করে দিলেন, তখনো সিন্ধ ও ওড়িশা আলাদা প্রদেশ হয়নি। তালিকার একেবারে চূড়ায় পাঞ্জাব আর একেবারে তলানিতে বাংলা! আমি স্যার বার্টনের পরামর্শ অনুযায়ী ইন্ডিয়া অফিসকে জানিয়ে দিলাম। তবে আমার তালিকায় আমি বাংলাকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম, যা আমার সঙ্গে নির্বাচিত অনেকেই করেনি। আমার ভাগ্যে পড়ল বাংলা!’
সিভিল সার্ভিসে বা ইংল্যান্ড থেকে আসতে চাওয়া তরুণ সিভিল সার্ভেন্টদের মধ্যে বাংলা অজনপ্রিয় ছিল। এর অনেক কারণও ছিল। স্মিথ জানান, অনেক কারণের মধ্যে ছিল উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া, রাজনৈতিক অস্থিরতার দীর্ঘ ইতিহাস আর মানুষের অসামরিক চরিত্র (অবশ্য অসামরিক চরিত্র বলতে লেখক কী বোঝাতে চেয়েছেন তা তর্কযোগ্য)। এছাড়া ছিল স্বদেশী আন্দোলন, যাকে সন্ত্রাসবাদী চরিত্র বলে উল্লেখ করা হয়েছে। স্মিথ লেখেন, ‘ওই নির্দিষ্ট সময়ে এর অজনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ ছিল সন্ত্রাসবাদের বিস্তার। ১৯৩০ সালের এপ্রিলে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন থেকে শুরু করে এর পরবর্তী দুই বছরে অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটে। তার চেয়ে বেশি হয় হত্যা প্রচেষ্টা। এসব হত্যাকাণ্ড ও হত্যাচেষ্টার ভুক্তভোগীদের মাঝে ছিলেন দুজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, একজন জেলা জজ একজন আইজি প্রিজন। স্যার জন এন্ডারসনের কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়ার এক মাস আগে বাংলার গভর্নর স্যার স্ট্যানলি জ্যাকসন নিজে ১৯৩২ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে যান। স্যার জন এন্ডারসনের দায়িত্ব গ্রহণের চার মাসের মধ্যে আরো একজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও একজন জেলা পুলিশ সুপার নিহত হন। ১৯৩৩ সালের দিকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়, কিন্তু আবহাওয়াবিদদের ভাষায়, পরবর্তী অবস্থা তখনো স্থিতিশীল ছিল না। (এ প্যারার জন্য আমি ইয়ারস অব চেঞ্জ ইন বেঙ্গল অ্যান্ড আসাম গ্রন্থের লেখক স্যার রবার্ট রিডের কাছে কৃতজ্ঞ)’
কলকাতায় এসে স্মিথ জানতে পারেন উত্তরবঙ্গের রাজশাহী জেলায় অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তার প্রথম পদায়ন হয়েছে। স্মিথ জানিয়েছেন, তার রাজশাহীবাসের অভিজ্ঞতা অধিকাংশই আনন্দের। এজন্য তিনি বন্ধুভাবাপন্ন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও তার স্ত্রীকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তিনি উত্তর দিনাজপুর জেলায় প্রশিক্ষণে ছিলেন। সেখান থেকে দূর দিগন্তে পূর্ব হিমালয়ের চূড়াসমূহ পরিষ্কার দিনে দেখা যেত বলে তিনি জানান।
প্রথম ১৮ মাস তার এভাবেই কেটেছিল। এরপর তিনি মাদারীপুর যান। সেখান থেকে পরিবারের কাছে বেশকিছু চিঠি লিখেছিলেন। তাতে মাদারীপুরের স্পষ্ট চিত্র মেলে।
মাদারীপুর নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ফরিদপুর জেলার অবস্থান ঢাকা জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমে, গঙ্গার (পদ্মার) ওপারে। ১৯৩১ ও ১৯৪১ সালের দশসালা জনশুমারির সংখ্যা গড় করলে ১৯৩৬ সালে ফরিদপুর জেলার জনসংখ্যা অনুমান ২৬ লাখ ৫০ হাজার (এ দশকে বৃদ্ধির হার ছিল ২০ শতাংশেরও বেশি)। ফরিদপুর জেলার চারটি মহকুমার মধ্যে দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত মাদারীপুর ছিল বৃহত্তম আর এর জনসংখ্যা ছিল ১১ লাখ ৫০ হাজার। মাদারীপুরের আয়তন বর্ণনা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। ১৯৪১ সালে এটি ছিল ৯৬১ বর্গমাইল। যদিও ১৯৩১ সালে আকার বলা হয়েছিল ৭১৬ বর্গমাইল। নদীর ভাঙাগড়ায় চর এলাকায় পরিবর্তনই এর কারণ। মহকুমায় শহর একটিই, মাদারীপুর আর গ্রামের সংখ্যা ছিল সহস্রাধিক। জনসংখ্যার ঘনত্ব ছিল অত্যধিক, প্রতি বর্গমাইলে প্রায় ১ হাজার ৩০০।’
সত্যি বলতে, সংখ্যা দিয়ে অনেক সময়ই স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায় না। তাই তিনি অন্যভাবে প্রকাশ করে চিত্রটি স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। ইংল্যান্ডবাসীকে বোঝাতে তিনি বলেছেন যে জনসংখ্যা ও আয়তনের দিক দিয়ে মাদারীপুর হার্টফোর্ডশায়ারের সঙ্গে তুলনীয়।
মাদারীপুরের জনসংখ্যার বিবরণ দিতে গিয়ে স্মিথ লিখেছেন, ‘জনসংখ্যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মুসলমান আর কিঞ্চিদধিক এক-চতুর্থাংশ হিন্দু। হিন্দুদের এক-তৃতীয়াংশ ছিল শিডিউলড কাস্ট বা অস্পৃশ্য। জনসংখ্যার শতকরা মাত্র আট ভাগ ছিল শিক্ষিত বা অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন। তার মধ্যে ৪০ হাজার ছিল মুসলমান ও ৪০ হাজার ছিল হিন্দু অর্থাৎ আনুপাতিক হারে হিন্দু জনসংখ্যার মধ্যে শিক্ষার হার ছিল অনেক বেশি। এদের মাঝে কেবল ২০ হাজার জন ছিলেন ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত।’
এরপর তিনি জেলার পরিবেশ ও আবহাওয়ার জন্য মি. এলএসএস ও’ম্যালির লেখা ফরিদপুর জেলা গেজেটিয়ার দেখার কথা বলেছেন। সেখানে আছে—
জেলার আবহাওয়া গরম-ঠাণ্ডা বিবেচনায় চরমভাবাপন্ন নয় আর তাপমাত্রার পরিবর্তনও তুলনামূলকভাবে সামান্য, এপ্রিল-সেপ্টেম্বরে গড় তাপমাত্রা থাকে ৮৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট (২৮ দশমিক ৩৩ সেন্টিগ্রেড) এবং শীতকালে এটি নেমে যায় ৬৬ ডিগ্রি ফারেনহাইটে (১৮ দশমিক ৮৮ সেন্টিগ্রেড)। জানুয়ারিতে সর্বনিম্ন গড় তাপমাত্রা ৫৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট (১১ দশমিক ৬৬ সেন্টিগ্রেড) পর্যন্ত নেমে যায়। একই সঙ্গে আর্দ্রতা থাকে অনেক বেশি। ফলে অনেকেই এ আবহাওয়া আরামদায়ক বলে মনে করে থাকেন। একদম শীতকাল ছাড়া শুকনো বাতাসের সাক্ষাৎ মেলে না। এমনকি মার্চেও প্রায়ই ঝড় হওয়ায় বাতাসে আর্দ্রতা থাকে। বৃষ্টির সময়ে যখন পূর্ব বা দক্ষিণ-পূর্বদিক থেকে জলীয় বাষ্পবাহী বাতাস বয়, তা সাংঘাতিক আর্দ্র অবস্থা তৈরি করে, কিন্তু প্রবল দক্ষিণা বায়ু উষ্ণতাকে সহনীয় পর্যায়ে রাখে। জেলার বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ৭৩ ইঞ্চি, পালং থানায় সর্বোচ্চ ৯৪ ইঞ্চি। বর্ষাকালে জুন-সেপ্টেম্বর মাসগুলোয় মাসিক গড় বৃষ্টিপাত ১৩ থেকে ১৪ দশমিক ৫ ইঞ্চি, তবে সেপ্টেম্বরে এটা ৯ ইঞ্চিতে নেমে আসে। মে ও অক্টোবরে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ যথাক্রমে ৯ ও ৬ ইঞ্চি। আর কখনো এর সঙ্গে উপকূলীয় ঘূর্ণিঝড় যোগ হলে একনাগাড়ে কয়েকদিন বৃষ্টি হতে থাকে।
মাদারীপুরের কথা লিখতে গিয়ে তিনি ইংল্যান্ডের সঙ্গে তুলনা করেছেন। লিখেছেন, ‘ইংল্যান্ডের নদীগুলো স্থির, এ অর্থে যে এগুলো একই খাতে প্রবাহিত হয়। টেমস নদী এখন যে খাতে প্রবাহিত হচ্ছে, স্যাক্সন যুগেও একই খাতে প্রবাহিত হতো। বাংলায় নদীগুলো প্রতি বছরেই খাত পরিবর্তন করে। বিষয়টি বোঝা দরকার এজন্য যে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার মানুষ কীভাবে বাস করে এ থেকে তা ধারণা করা যাবে। এখানে আবারো আমরা ও’ম্যালীর বক্তব্য দেখতে পারি।’
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তর (১৭৯৩) সময় থেকে প্রায় সব নদী তার গতিপথ এমনভাবে পাল্টেছে যে তার পুরনো খাত এখন শুকনো ডাঙ্গা। নদীর ভাঙা-গড়া এখনো সমানেই চলছে, বিশেষ করে পদ্মা-মেঘনা অববাহিকায়, পানিপ্রবাহ এখানে বালুচরের এপার থেকে সততই ওপারে যাচ্ছে, আবার ওপার থেকে এপারে আসছে। ফলে এখানে জমির উপরিভাগ প্রতিনিয়তই পরিবর্তন হচ্ছে। ওপরের জমি আর নদীর পাড় দুইই ভেঙে যাচ্ছে, আবার নদী খাতের বদলের সঙ্গে সঙ্গে নতুন ভূমি গড়ে উঠছে, একদিকে ভাঙছে অন্যদিকে গড়ছে। একদিকে নদী পাড় ভেঙে গ্রাম গ্রাস করে নিচ্ছে, আবার অন্যদিকে পলি জমে নতুন গ্রামের জায়গা গড়ে উঠছে। একইভাবে নদীর মাঝেও পলি জমে চর ভূমি বা ‘দিয়ারা’ জেগে উঠছে, আবার নদীর নতুন খাতে প্রবাহের সঙ্গে তা ভেসেও যাচ্ছে। এ চর জমিগুলো স্থায়ী গোলযোগের উৎস, পুনঃপুনঃ দাঙ্গা সৃষ্টিকারী আর মামলা-মোকদ্দমার ভিত্তি তৈরি করে। এ জটিল চর ভূমিতে স্থায়ী ল্যান্ডমার্ক না থাকায় জমির সীমানা চিহ্নিত করা বা জমিটি নতুন জেগে ওঠা চর নাকি বর্তমান ভূমির সম্প্রসারণ নাকি স্বস্থল পয়স্থি (Reformation in situ) নির্ধারণ করা খুবই জটিল একটি প্রক্রিয়া। আর নদী প্রতি বছরই এ ধ্বংস আর নবায়ন প্রক্রিয়া চালু রাখে।
মাদারীপুর-ফরিদপুর অঞ্চলে নদীর গতিপথ বদল, নদী ভাঙা ও চর জেগে ওঠার বিষয়টি এখানে উল্লেখ করেছেন। ফলে চর দখলে মারামারি হতো। জোর যার মুল্লুক তার। স্মিথ জানান, এ পরিস্থিতির কারণেই ১৯২০ সালে বেঙ্গল এলুভিয়াল ল্যান্ড অ্যাক্ট পাস করা হয়। এ রকম নবগঠিত চর ভূমির জন্য সৃষ্ট অশান্তি ও দাঙ্গা রোধের জন্যই এ আইন পাস করা হয়।
মাদারীপুর নিয়ে তিনি আরো লেখেন, ‘আমি উল্লেখ করেছিলাম যে মাদারীপুর মহকুমায় প্রতি বর্গমাইলে ১ হাজার ৩০০ লোক বাস করে। যেকোনো বিচারেই এটি ঘনবসতি এবং পুরো মহকুমায় কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া তা প্রায় সমভাবে বিন্যস্ত ছিল। প্রায় পুরো জনগোষ্ঠীর পেশা ছিল চাষাবাদ আর তাদের প্রধান দুটো ফসল ছিল ধান ও পাট। ধান ছিল প্রধান খাদ্যশস্য। এর প্রধান দুটো প্রকারভেদ ছিল আউশ বা গ্রীষ্ককালের ধান আর আমন বা শীতকালের ধান। আমন ছিল প্রধান ফসল এবং নভেম্বর/ডিসেম্বরে তা কাটা হতো। পাট ছিল অর্থকরী ফসল, যা এপ্রিলে রোপণ করে আগস্টে কাটা হতো। কাটার পর ছোট ছোট নৌকায় করে তা গুদামজাত করার এলাকায় নিয়ে আসা হতো, মাদারীপুরের প্রধান পাটকেন্দ্র ছিল চর মুগুরিয়া, যা পরবর্তী পত্রে অনেকবার আসবে। সেখান থেকে পাট নিয়ে যাওয়া হতো কলকাতার উত্তরে হুগলি নদীর তীরে লাইনে ধরে থাকা জুট মিলগুলোয়।’
সমারেজ স্মিথ তার কর্মজীবনে একজন দক্ষ প্রশাসক ছিলেন বলে জানা যায়। তিনি সিভিল সার্ভিসে যোগ দেয়ার আগে বাংলা শেখার একটা কোর্স করেছিলেন। সিভিল সার্ভিস ছাড়ার পর চার্চের কাজে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে চার্চের কাজে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে ভ্রমণ করেছিলেন।
আসরার আবেদিন: প্রাবন্ধিক









