অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুর জেলার মহকুমা শহর মাদারিপুর, সেই শহর থেকেও বেশ দূরে ইজপাড়া একটি অতি সাধারণ গ্রাম। মাইয বা মাইজ মানে খুব সম্ভবত মধ্যম, বাঙাল ভাষায় মজো ভাইকে বলে মাইজাভাই। আঞ্চলিক অভিধানে মাইজ-এর একটা অন্য অর্থও আছে, মাইজপাতা মানে গাছের কচি পাতা।
শুধু মাইজপাড়া নয়, পূর্ব মাইজপাড়া। তার মানে নিশ্চয়ই একটা পশ্চিম মাইজপাড়াও ছিল বা আছে। অবশ্য এ নিয়মের ব্যতিক্রমও হয়। যেমন এখন পশ্চিমবঙ্গ নামে একটি রাজ্য আছে, (আগে যাকে প্রদেশ বলা হতো) কিন্তু পূর্ববঙ্গ বলে এখন আর পৃথিবীতে কিছু নেই। এই পশ্চিমবঙ্গের আবার উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গ হিসেবেও ভাগ করা হয়, কিন্তু পূর্ববঙ্গ অদৃশ্য।
ওই পুব মাইজপাড়া গ্রামের এক প্রান্তে ছিল একটি ব্রাহ্মণ পল্লী। একটি বেশ বড় আকারের চৌকো উঠোনের চারদিকে চারটি বাড়ি। পঞ্চম একটি বাড়ি এক কোণের দিকে, বোঝা যায় পরের দিকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে, তাই বর্গক্ষেত্রটির পাশে জায়গা পায়নি। সেই পঞ্চম বাড়িটি আকারেও ছোট, চেহারায় মলিন, তাতে অন্যদের তুলনায় এক দরিদ্র পরিবারের বাস। সেই পরিবারের কর্তার নাম অবিনাশচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়, আমার পিতামহ। তিনি ছিলেন সামান্য এক টোলের পণ্ডিত।
সেই সময়ে অবিনাশচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায় নামে একজন লেখকও ছিলেন। কলকাতায় ইস্কুলের নিচু ক্লাসে আমাদের ‘চাণক্য শ্লোক’ নামে একটি চটি বই পড়তে হত, সেই শ্লোকগুলির পদ্য-অনুবাদক অবিনাশচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়, আমি সহপাঠীদের কাছে চাল মেরে বলতাম, ইনি আমার ঠাকুর্দা। একেবারে নির্জলা মিথ্যে কথা। আমাদের বংশে কেউ কখনও লেখালেখির ধার ধারেননি।
...
মাইজপাড়ার দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে অবিনাশচন্দ্রের সন্তানদের নামকরণের কোনও পদ্ধতি ছিল না। বড় ছেলের নাম বিনয়কৃষ্ণ, মধ্যমের নাম কালীপদ, ছোট ছেলে দেবপ্রিয়। বৈমাত্রিক আর দুটি ভাইয়ের নাম হরিপদ ও তারাপদ, এঁদের মধ্যে হরিপদ পুলিশে চাকরি নিয়ে আত্মহত্যা করেছিল, এ ঘটনা ক্ষীণভাবে শুনেছি। অপর ভাই তারাপদ সন্ন্যাসী হয়ে যায়। সেই অজ পাড়াগাঁ থেকে কালীপদ কলেজে পড়তে এসেছিল কলকাতায়। তৎকালীন গ্রামীণ সমাজে অনেক পরিবারেরই অন্তত একটি ছেলেকে, যদি লেখাপড়ায় একটু মাথা থাকত, কষ্টেসৃষ্টেও পাঠানো হত শহরে, যাতে সে দুটো-একটা পাস দিয়ে কোনওক্রমে একটা চাকরি জোগাড় করতে পারে। পথের পাঁচালীর অপুর মতন হাজার হাজার অপু ভরিয়ে রাখত শিয়ালদা অঞ্চলের মেসবাড়িগুলি। নিজস্ব ধানজমি থেকে সংবৎসরের খোরাকি জুটে যেতে পারে, কিন্তু অন্যান্য অভাব মেটাতে চাকরির নগদ টাকা বিশেষ প্রয়োজনীয়।
গ্রাম্য টুলো পণ্ডিতের ছেলে শহরে এসে শিক্ষকতা শুরু করলে, তা যথেষ্ট পদোন্নতিই বলতে হবে। মেসবাড়িতে থাকা, দেশের বাড়ি থেকে টাকা আসার কোনও সম্ভাবনা নেই, কালীপদকে অর্থের জন্য অনেক উদ্বৃত্তি করতে হত, তাই বিএ পড়তে পড়তেই তিনি চাকরির সন্ধান করছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর চাকরি পাওয়া ও বিবাহের মধ্যে হয়তো একটি যোগসূত্র ছিল। অধ্যাপক সুরেন্দ্রমোহন বেশ প্রতিপত্তিশালী, অনেক কলেজ ও স্কুল কমিটির সঙ্গে তিনি যুক্ত, কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটের টাউন স্কুলের তিনি সভাপতি, সেই স্কুলে তিনি কালীপদ নামে যুবকটিকে চাকরিতে ঢুকিয়ে দেন। তাঁর ভাগনিকে বিয়ে করা ওই চাকরির শর্ত ছিল কি না জানি না, তবে এ রকম প্রায়ই হয়তো হত। তখন বিবাহ ব্যাপারে প্রধান বিবেচ্য জাত-পাত, কুলিন ব্রাহ্মণরা বেশি বেশি স্পর্শকাতর। কৌলীন্যের মধ্যেও কত রকম ভাগাভাগি, রাঢ়ী, বারেন্দ্র, শ্রোত্রীয় (বাঙাল ভাষায় ছুরিত্তির), বৈদিক, ভঙ্গকুলীন ইত্যাদি। বংশে একটি বিয়েও ঠিক-ঠিক স্ববর্ণে না হলে সবাই পতিত হয়ে যেত। উপাধ্যায় যুক্ত পদবীধারী রাঢ়ী ব্রাহ্মণরা নিজেদের মনে করতেন বর্ণশ্রেষ্ঠ। নিজেরাই নিজেদের শ্রেষ্ঠ বানিয়েছিলেন আর কী!
...
সেই উনিশশো চৌত্রিশ সালে সারা পৃথিবীতে কিংবা সারা দেশে, কিংবা কলকাতা শহরে, এমনকি কাছাকাছি ঢাকাতেও কীসব ঘটনা ঘটছে, তার কোনও রেশই আমগ্রাম বা মাইজপাড়ার মতন গ্রামে পৌঁছয় না। ইংরিজিতে যাকে বলে ব্যাক অফ বিয়ন্ড, এইসব গ্রামগুলির সেই অবস্থা। বিদ্যুৎ কেউ চোখে দেখেনি, গ্রাম থেকে যারা শহরে আসে, তারা সুইচ টিপলে আলো জ্বলে আর কল খুললে জল বেরোয়, এই ব্যাপারগুলি ম্যাজিকের মতন মনে করে, তাদের বিস্ময়ের ঘোর কাটতে চায় না। ট্রানজিস্টার রেডিয়ো তখনও আবিষ্কৃত হয়েছে কি না জানি না, অন্তত ভারতে পৌঁছয়নি, খবরের কাগজও আসে না। সুতরাং বিহারে যখন সাঙ্ঘাতিক ভূমিকম্প হয়ে গেল, তখনও পূর্ব বাংলার গ্রামগুলি নিস্তরঙ্গ।
...
বছরে দুবার, প্রায় দেড় মাস-দু মাসের জন্য যেতাম গ্রামে। গ্রীষ্মের ছুটিতে আমাদের নিজেদের বাড়ি মাইজপাড়া, সেখানকার দিনগুলি প্রায় বৈচিত্র্যহীন, কোনও উৎসব ছিল না। পুজোর ছুটিতে যেতাম আমগ্রামে, মায়ের মামাবাড়িতে। মাইজপাড়ায় আমাদের পল্লীর ধারেকাছে পুজোর আয়োজন ছিল না, আর আমগ্রামে গাঙ্গুলিদের বাড়িতেই খুব ধুমধাম করে হত দুর্গাপুজো। সেখানে সবার জন্যই আগ্রহ ও ব্যাকুলতা ছিল খুব বেশি। ভাদ্র মাস শেষ হতে না হতেই দিন গোনা শুরু হত।
...
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অন্যতম শিকার আমার বাবা। স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে গেল অনির্দিষ্টকালের জন্য, বে-সরকারি স্কুলে ছাত্রদের মাইনে থেকেই শিক্ষকদের বেতন হয়। স্কুল বন্ধ, বাবা বেকার হয়ে গেলেন, তখন আর সংসার চালাবেন কী করে, আমাদের পাঠিয়ে দিলেন গ্রামের বাড়িতে।
সেবারে আমি মাইজপাড়া গ্রামের বীরমোহন বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। টিনের চালের ঘর, বেশ পরিচ্ছন্ন, পেছন দিকে টলটলে জলের সুন্দর একটা বড় দিঘি। স্কুলটি আমাদের বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে, হেঁটে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। হাঁটতে ভালোই লাগে, শুধু একটা বিশাল অশ্বত্থ গাছতলায় শ্মশান, সেখান দিয়ে চোখ বুজে যাই, হঠাৎ হঠাৎ সে গাছের কোটর থেকে ডেকে ওঠে তক্ষক সাপ। সে সাপকে কখনও চোখে দেখা যায় না। তবু ডাক শুনলেই ছমছম করে বুক। আর একটি বাড়ি, সেটিও গাঙ্গুলিবাড়ি। কিন্তু তাঁরা খুব ধনী, অনেকখানি জায়গা নিয়ে তাঁদের প্রাসাদোপম হর্য্য, শুনেছি তাঁদের বন্দুক আছে, এবং আছে একটি বিলিতি কুকুর, আমরা বলতাম ডালকুত্তা, তার গম্ভীর ঘেউ ঘেউ শুনলে রক্ত হিম হয়ে যায়। সে বাড়ির গেটের সামনেটা পার হতাম দৌড়ে।
টাউন স্কুলে আমাদের কোনও মুসলমান সহপাঠী ছিল না। গ্রামের স্কুলে হিন্দু-মুসলমান মিশ্র ছাত্র। হেডমাস্টার লস্কর সাহেবকে মনে হত চলন্ত পর্বত, কিন্তু তাঁর ব্যবহার ছিল নরম, তাঁর এক ছেলে হেডমাস্টার-পুত্র হওয়ার যোগ্যতায় বেশ অহংকারী ধরনের। প্রথম প্রথম আমি ছিলাম অন্যদের কাছে কৌতূহলের সামগ্রী। আমার গায়ে শহরে গন্ধ, আমার মতন চেন লাগানো গেঞ্জি অন্যরা আগে দেখেনি। আমার একটি মাউথ অর্গান ছিল। সেটাও অনেকের কাছে অভিনব। ওই মাউথ অর্গানটি কিছুদিন পরে একটা উঁচু ক্লাসের ছেলে কেড়ে নেয়।
...
মাদারিপুর একটি গঞ্জ, অনেক দোকানপাট, অনেক খদ্দের ও ব্যাপারি। পাশের নদীটার নাম আড়িয়াল খাঁ। কলকাতার পাশে গঙ্গা কতবার দেখেছি, আরও কত নদী পার হয়ে আসতে হয় এখানে, তবু আড়িয়াল খাঁ-ই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। নামটার মধ্যেই বিশেষ দার্য্য রয়েছে। আগে মনে করতাম, এ নদী বুঝি কোনও ডাকাতের নামে, পরে শুনেছি কোনও ফকিরের। বর্ষার সময় আড়িয়াল খাঁ-র রূপ কোনও লুটেরার মতনই দুর্দান্ত, ঢেউ যেন ফুঁসছে, অনবরত পাড় ভাঙছে। নদী যেন কামড়ে কামড়ে খেয়ে নিচ্ছে তটরেখা। এক একটা গাছ উল্টে যাচ্ছে শিকড় সমেত। সে দৃশ্য অন্যদের কাছে ভয়ঙ্কর, কিন্তু একটি বালকের চোখে মোহময়।
নদীতে জাল ফেলে ধরা হচ্ছে ইলিশ মাছ। যেসব মাছের গায়ের রং একেবারে সাদা, তারা সূর্যের আলো সহ্য করতে পারে না। জল থেকে তোলার পরই মারা যায়, তাই জ্যান্ত ইলিশ সচরাচর কেউ দেখতে পায় না। আমরা জালে-ওঠা ইলিশ দু-একবার মাত্র লাফাতে দেখেছি।
এক একটা নৌকো ঘাটে এসে ভিড়লেই ক্রেতারা এসে ভিড় জমায়। ওজন-টোজনের কোনও বালাই নেই, মাছের আকার অনুযায়ী দাম। ক্রেতার তুলনায় মাছ অনেক বেশি, তাই বেশ দরাদরি চলে। একবার আমার কাকা দুআনা (বারো পয়সা) দিয়ে একটা প্রায় দু কিলো সাইজের ইলিশ কিনলেন। দলটির মধ্যে আমিই সর্বকনিষ্ঠ, একজন জেলের হঠাৎ কী খেয়াল হল, একটা ছোট ইলিশ (ছ’-সাতশো গ্রাম) আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, এটা দা ঠাউরের জইন্যি মাগনা দিলাম। দা ঠাউর অর্থাৎ দাদাঠাকুর, আমাদের মতন উচ্চবর্ণের বালকদের নিম্নবর্ণের লোকেরা এই নামে সম্বোধন করত। কেন ওই জেলেটি আমাকে দাম না নিয়ে একটি মাছ দিল? অত ছোট মাছ বিক্রি হবার সম্ভাবনা নেই বলে? কিংবা, আমার বয়েসি তার কোনও ছেলে আছে, যার মুখখানি আমারই মতন, হয়তো সে ছেলেটি বেঁচে নেই, কিংবা সে ভেবেছে যে তার মৃত সন্তানটিই আবার বামুনের ঘরে জন্মেছে...। তখন অবশ্য এসব কথা ভাবিনি, পরবর্তীকালের চিন্তা। রোদে পোড়া তামাটে মুখ, রুখু দাড়ি, জ্বলজ্বলে চোখ, সেই খর্বকায় জেলেটির কথা আমার পরিষ্কার মনে আছে।
...
মাদারিপুরে চালের দোকানের সামনে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে ম্লান মুখে। দোকানের মালিক হাত নেড়ে জানাচ্ছেন, চাল নেই, চাল নেই! সন্ধেয় অন্ধকারে সে দোকানেরই পেছনের দরজা দিয়ে সম্পন্ন গৃহস্থেরা থলে ভরা চাল নিয়ে সরে পড়ছে চুপি চুপি। এ দেশের মানুষ কেড়ে খেতে জানে না, নিজের কপালে হাত চাপড়ায়। সৈন্যদের জন্য প্রচুর খাদ্য গুদামবন্দি রয়েছে, সিংহলে রপ্তানি যাচ্ছে চাল, তবু এখানকার অভুক্ত মানুষরা লুটতরাজ শুরু করেনি। ‘এই সব মূঢ়, ম্লান, মূক মুখে দিতে হবে ভাষা’, কে দেবে সেই ভাষা, সে নেতৃত্ব কোথায়?
(সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আত্মজৈবনিক ‘অর্ধেক জীবন’ থেকে সংকলিত)









