মাদারীপুর ছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক কেন্দ্র। এখানকার শিক্ষিত তরুণেরা স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় বিপ্লবী পথে নেমেছিলেন। কেউ কেউ জীবন দিয়েছেন। মাদারীপুরের বিপ্লবীদের আত্মত্যাগ বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বেদনাময় ও গৌরবময় অধ্যায়।

বাংলায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে ফরায়েজী আন্দোলনের কথা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। এ আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ও প্রতিষ্ঠাতা হাজী শরীয়তুল্লাহ (১৭৮১-১৮৪০)। তিনি ১৭৮১ সালে তৎকালীন ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমাধীন শ্যামাইল গ্রামের তালুকদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আবদুল জলিল তালুকদার।

ফরায়েজী শব্দটি ‘ফরজ’ থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহ নির্দেশিত অবশ্যপালনীয় কর্তব্য। শুরুতে ফরায়েজী আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল ধর্ম সংস্কার। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এ আন্দোলনে আর্থসামাজিক সংস্কারে বিস্তার লাভ করে।

উনিশ শতকে নতুন জমিদাররা সরকার কর্তৃক অনুমোদিত নয়, এমন বহু অতিরিক্ত কর কৃষকদের ওপর চাপিয়ে দেয়। হাজী শরীয়তুল্লাহ এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন এবং জমিদারদের অবৈধ কর না দিতে তার শিষ্যদের নির্দেশ দেন। জমিদাররা ঈদুল আজহা উপলক্ষে গরু জবাইয়ের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেয়। শরীয়তুল্লাহ এ নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করার জন্য মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করেন। ১৮৩৭ সালে জমিদাররা শরীয়তুল্লাহকে তিতুমীরের মতো আলাদা স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার অভিযোগে অভিযুক্ত করে। তারা ফরায়েজীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দায়ের করে। এ কাজে ইউরোপীয় নীলকর ব্যবসায়ীরা সহযোগিতা করে। পরে ফরিদপুর অঞ্চলে শান্তি ভঙ্গ ও গোলযোগ সৃষ্টির অভিযোগে ১৮৩৯ সালে শরীয়তুল্লাহকে একাধিকবার পুলিশি হেফাজতে নেয়া হয়। পরের বছর ১৮৪০ সালে হাজী শরীয়তুল্লাহ মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তার একমাত্র পুত্র মুহসীনউদ্দীন ওরফে দুদু মিয়া ফরায়েজী আন্দোলনের হাল ধরেন। দুদু মিয়া জমিদারদের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে আরো শক্তিশালী করেন। স্থানীয় কানাইপুরের শিকদার পরিবার ও ফরিদপুরের ঘোষদের সঙ্গে তার অনুসারীদের সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে মদন ঘোষ নিহত হন। ফলে ১১৭ জন ফরায়েজী আন্দোলনকারী গ্রেফতার করে ব্রিটিশ পুলিশ। এ ঘটনায় ফরায়েজী আন্দোলন আরো বিস্তৃত হয়।

১৯০৫-১১ সালে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন ও পরবর্তী বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে তৎকালীন মাদারীপুর মহকুমায় সংঘটিত কর্মকাণ্ড বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

মাদারীপুর সমিতি বঙ্গভঙ্গবিরোধী বাংলার একটি সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠন। ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে পূর্ণচন্দ্র দাস চরমপন্থার মাধ্যমে ইংরেজ শাসনের হাত থেকে দেশকে স্বাধীন করতে এই ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। এই সমিতি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে বৈপ্লবিক আন্দোলন পরিচালনা করত।

সমসাময়িক ব্রিটিশ প্রশাসনিক প্রতিবেদনে মাদারীপুরকে ‘দেশদ্রোহ ও রাজনৈতিক ডাকাতির অন্যতম উর্বর কেন্দ্র’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ তথ্য জানা যায় ১৯২৫ সালে ব্রিটিশ সরকারের উদ্যোগে প্রকাশিত ফরিদপুর জেলা গেজেটিয়ার থেকে। সেখানে উল্লেখ, ১৯১৮ সালে বিচারপতি রাওলাটের কমিটির প্রতিবেদনে মাদারীপুরের বিপ্লবীদের সম্পর্কে বলা হয়—

ফরিদপুর জেলার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত মাদারীপুর মহকুমায় একটি স্বাধীন বিপ্লবী দল গঠিত হয়। এটি এমন এক এলাকা, যেখানে অসংখ্য নদী ও খাল রয়েছে। ... এখানে বছরের অধিকাংশ সময় স্থলপথে যোগাযোগ প্রায় অসম্ভব। মাদারীপুরের আন্দোলনকারীদের আদর্শ ও কৌশল ঢাকার বিপ্লবী দলের সঙ্গে অনেকটাই মিল ছিল। তারা ১৯১২ সালে তিনটি গেরিলা ধাচের অভিযান পরিচালনা করে। নিজেদের সুরক্ষার জন্য তারা বাড়ি থেকে দূরে গিয়ে কাজ করত। তাদের সব অভিযানই পদ্মার ওপারে, অর্থাৎ ঢাকা জেলায় সংঘটিত হয়। এসব হামলায় প্রায় ১১ হাজার টাকার সম্পদ লুট হয়।

এসব কর্মকাণ্ডের নেতৃত্বে ছিল প্রধানত ছাত্রসমাজের তরুণরা। এ বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের অপরাধে মাদারীপুরের এক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন দুজন ছাত্রকে ফাঁসি দেয়া হয়। আরেক ছাত্র পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। এছাড়া কয়েকজনকে কারাদণ্ড দেয়া হয়। কাউকে আবার ভালো আচরণের অঙ্গীকার নিয়ে মুক্তি দেয়া হয়।

স্বদেশী আন্দোলনের সময় ক্যাচেল নামে এক ব্রিটিশ নাগরিক মাদারীপুর ইংরেজি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র অনন্তমোহন দাসের বিরুদ্ধে নালিশ করে যে ছাত্রটি তাকে আঘাত করেছে। এ অপরাধে অনন্তমোহনকে সমকালীন আইনের ১৪৭ ধারা অনুসারে ছয় সপ্তাহের সশ্রম জেল দেয়া হয়। ছেলেটির বাড়ি মাদারীপুরের চরমুগুরিয়ায়।

মাদারীপুরের বাজিতপুরে স্বদেশী আন্দোলনের দায়ের করা মামলায় উমেশচন্দ্র বাগচি নামক এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, স্থানীয় কলেজের শ্রীযুক্ত রসিকবাবুব আদেশে উমেশ বাগচির দোকান থেকে বিদেশী চিনি দিয়ে তৈরি সোয়া পাঁচ সের বাতাসা জোর করে নিয়ে যায় (কিছু ছাত্র)। এ সময় দোকানের মালিক উমেশচন্দ্র বাগচিকে মারধর করা হয়। এ অপরাধে বাজিতপুর ইংরেজি স্কুলের ছাত্র বসিকচন্দ্র বাগচীকে তিন মাস সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০০ টাকা জরিমানা এবং অন্য তিন ছাত্রকে একই শাস্তি দেয়া হয়।

মাহমুদ হাসান: প্রাবন্ধিক