ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালে মাদারীপুর ছিল কৃষিপ্রধান এলাকা। তবে সেখানে শিল্প ও বাণিজ্যও বিশেষভাবে গড়ে উঠেছিল। স্থানীয় নদী, খাল ও বিলবাহিত এ অঞ্চলের প্রধান যোগাযোগমাধ্যম জলপথ। মাদারীপুর ছিল ফরিদপুর জেলার মহকুমা। তবে শিল্প ক্ষেত্রে এর পরিচয় নিজস্ব।
মাদারীপুর মহকুমার মানুষ বিভিন্ন ধরনের শিল্পের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তদের অধিকাংশ শিল্পই ছিল হাতের কাজ বা গৃহভিত্তিক শিল্প, যা মূলত গ্রামীণ জনগণের নিত্যপ্রয়োজন মেটাত। কৃষিকাজ ছিল মাদারীপুরবাসীর প্রধান পেশা। তখন পাট ছাড়া এখানে তেমন কোনো সংগঠিত শিল্প ছিল না। এসব তথ্য জানা যায় ১৯২৫ সালে প্রকাশিত ফরিদপুর জেলা গেজেটিয়ার থেকে। ব্রিটিশ সরকারের কর্মকর্তা এলএসএস ওম্যালি (সিআইই) রচিত এ গেজেটিয়ার কলকাতার বেঙ্গল সচিবালয় বুক বিভাগ থেকে প্রকাশিত হয়। এ নিবন্ধ লিখতে বেশির ভাগ তথ্য উল্লেখিত গেজেটিয়ার থেকেই গৃহীত হয়েছে।
১৯২১ সালের সাধারণ আদমশুমারির সঙ্গে করা শিল্প গণনার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফরিদপুরে তখন ২৫টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছিল। এর মধ্যে পাট প্রক্রিয়াকরণের প্রতিষ্ঠান ছিল ২০টি। দুটি ইট ও টালি তৈরির কারখানা ছিল। অবশ্য সাধারণ গণনা অনুযায়ী, সে সময় ৪ হাজার ৮৩৮ জন শ্রমিক পাট প্রক্রিয়াকরণের কাজে জীবিকা নির্বাহ করতেন। প্রকৃতপক্ষে পাটের মৌসুম, অর্থাৎ আগস্ট-সেপ্টেম্বর এ শিল্পে কর্মরত মানুষের সংখ্যা বহু গুণ বেড়ে যেত।
১৯২১-২২ সালে করা অন্য এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, ফরিদপুর জেলায় মোট ৪৭টি পাট প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠান ছিল। এ শিল্পের প্রধান কেন্দ্র ছিল মাদারীপুর। এখানকার উল্লেখযোগ্য পাটকলের মালিক ছিলেন এলআর রডরিক, এএইচ স্ট্যানসবেরি, ডব্লিউএনবি ক্যাচেল ও মনমোহন গাঙ্গুলি। উল্লেখযোগ্য অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছিল কুমারখালীতে ইউনিয়ন জুট কোম্পানি, চর মুগুরিয়ায় লডেল অ্যান্ড ক্লার্ক লিমিটেড ও শিবচরে আরএম শাহ।
টাইলস শিল্প
টালি বা টাইলস তৈরিও মাদারীপুরের এক প্রাচীন ও গৃহভিত্তিক শিল্প। জেলার অনেক অঞ্চলে পাওয়া যায় উৎকৃষ্ট মানের কাদামাটি, যা টালি তৈরির জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। মাদারীপুরের পাশাপাশি ফরিদপুর সদর, রাজবাড়ী, ভাঙ্গা অঞ্চলে এ শিল্প তখন প্রসার লাভ করেছিল।
টাইলস তৈরির কাজ সাধারণত ইট তৈরির মৌসুমেই হতো। অর্থাৎ শীত ও গ্রীষ্মকালে। এ সময় মাটি শুকিয়ে পোড়ানোর উপযুক্ত মৌসুম। বর্ষাকালে টালি তৈরির কাজ বন্ধ থাকত, কারণ অতিরিক্ত আর্দ্রতায় মাটির টাইলস সহজে ফেটে যেত বা বিকৃত হয়ে পড়ত।
প্রক্রিয়াটি ছিল সম্পূর্ণ হাতে করা। প্রথমে নির্বাচিত মাটি কাদায় পরিণত করা এবং তা সমতল ছাঁচে ঢেলে পাতলা আকারে তৈরি করা হতো। রোদে ভালোভাবে শুকানোর পর টালিগুলো খোলা চুলায় বা অস্থায়ী ভাটায় পোড়ানো হতো।
মাদারীপুরে প্রস্তুত করা টাইলস সাধারণত ছোট আকারের ও হালকা ধরনের। এগুলো ঘরের ছাউনি, বারান্দা বা গুদামঘর ঢাকার কাজে ব্যবহার করা হতো। শহর ও বড় গ্রামে ধীরে ধীরে খড়ের পরিবর্তে পোড়ামাটির টাইলস ব্যবহারের প্রচলন বাড়তে থাকে, বিশেষ করে শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে।
বিশের দশকে ব্রিটিশ প্রশাসনিক প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে— শহর ও বড় গ্রামের বাড়িগুলোয় দেশী টাইলসের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। কারণ এগুলো টেকসই এবং এ ধরনের বাড়িতে খড়ের ছাউনির তুলনায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি অনেক কম।
তবে তখনো টাইলস তৈরির ব্যবসা পুরোপুরি বাণিজ্যিক রূপ নেয়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি ছিল স্থানীয় ব্যবহার ও ক্ষুদ্র বেচাকেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ। অবশ্য ফরিদপুর শহর ও রাজবাড়ী অঞ্চলের বাজারগুলোয় মাদারীপুরের টাইলসের ভালো চাহিদা ছিল। বিশেষ করে সেখানকার সরকারি অফিস, বিদ্যালয় ও ব্যবসায়িক দোকানপাটে ছাউনি হিসেবে টালি ব্যবহার করা হতো।
পিতল শিল্প
ফরিদপুর জেলার পিতল ও ধাতব কাজ কখনই খুব বড় শিল্প হিসেবে গড়ে ওঠেনি। তবে মাদারীপুরে এর ভালো কাজ হতো। গৃহস্থালি কাজে প্রয়োজনীয় পাত্র হিসেবে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প। তাদের কাজ সাধারণত পারিবারিকভাবে শেখানো হতো এবং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে চলে আসত।
সবচেয়ে ভালো পিতলের কাজ দেখা যেত মাদারীপুর ও রাজবাড়ী মহকুমায়। এখানে তৈরি জিনিসপত্র স্থানীয় হাটবাজারে বিক্রি ছাড়াও মাঝে মাঝে কলকাতার পাইকারদের কাছেও রফতানি করা হতো। তবে সময়ের পরিবর্তনে ধীরে ধীরে এ শিল্পের অবনতি ঘটে। কারণ বাজারে কারখানায় তৈরি সস্তা অ্যালুমিনিয়াম ও লোহার পণ্য সহজলভ্য হয়ে পড়ে। ফলে হাতে বানানো পিতলের সামগ্রীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
মৎস্যসম্পদ
মহকুমা মাদারীপুরের অর্থনৈতিক জীবনে মাছ ধরা পেশা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জেলাটি তখন অসংখ্য নদী, খাল, বিল ও হাওরে পরিপূর্ণ ছিল। এর মধ্যে পদ্মা, আড়িয়াল খাঁ, মধুমতি, চন্দনা ও গড়াই নদী অন্যতম। এসব জলাশয়ে সারা বছরই বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। ১৯২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ফরিদপুরে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ সরাসরি মৎস্য শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিল। এদের বেশির ভাগই ছিল মাদারীপুরের পেশাদার জেলে।
যোগাযোগমাধ্যম
নদীপথই ছিল মাদারীপুরের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। বর্ষাকালে প্রায় সমগ্র এলাকা জলের নিচে থাকত। কোথাও অগভীর, কোথাও গভীর পানি। ফলে অধিকাংশ জায়গায় নৌকাই ছিল একমাত্র যাতায়াতের উপায়। বিশেষ করে জেলার দক্ষিণ-পূর্বাংশে এত বেশি খাল ও বিল রয়েছে যে সেগুলোই প্রাকৃতিক মহাসড়কের কাজ করত। ব্রিটিশ গেজেটিয়ারে এখানে দক্ষিণ-পূর্বাংশে বলতে মাদারীপুরকেই বোঝানো হয়েছে।
জেলার উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের এ বৈপরীত্য সম্পর্কে মি. জ্যাক তার ‘ইকোনমিক লাইফ অব আ বেঙ্গল ডিসট্রিক্ট’ গ্রন্থে লিখেছেন—
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে রাস্তা এতই কম যে বর্ষার পর নদীগুলো শুকিয়ে গেলে পণ্য পরিবহন কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। এতে বাণিজ্য একেবারে স্থবির হয়ে যায়, বিশেষত এ সময়েই প্রধান ফসল কাটা শেষ হয় এবং কৃষকের হাতে কিছু অর্থ আসে। কিন্তু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সারা বছরের বাণিজ্য জলপথে চলে। নদী ও খালের প্রাচুর্যে প্রতিটি গ্রামই জলপথের সঙ্গে যুক্ত। জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারিতে যদি কেউ জেলার উত্তর দিক থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমের দিকে হাঁটেন, তিনি দুটি অঞ্চলের তীব্র পার্থক্য সহজেই টের পাবেন। একদিকে অনুন্নত, স্থবির ও দরিদ্র অঞ্চল, অন্যদিকে নদী-খালে ভরা নৌকার চলাচল, সরগরম হাটবাজার ও প্রাণবন্ত, সমৃদ্ধ জনজীবন।
স্টিমার ও জলপথ যোগাযোগ
পদ্মা নদীতে প্রতিদিন যাত্রীবাহী স্টিমার চলতো গোয়ালন্দ থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত এবং গোয়ালন্দ থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত। স্টিমারগুলো পথে তেপাখোলা, তারাপাশা (মাদারীপুর স্টিমার লাইনের সংযোগ কেন্দ্র) ও হরিরামপুরে থামে।
তখন মাদারীপুর ছিল স্টিমার চলাচলের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বসম্পন্ন কেন্দ্র। কারণ এটি একাধিক স্টিমার রুটের মিলনস্থল। এখান থেকে একটি সার্ভিস চলত বরিশাল পর্যন্ত, মাঝপথে চরমাধবদিয়া, খাজুরতলা, গৌরনদী ইত্যাদি ঘাটে থামত। আরেকটি রুট মাদারীপুর বিল হয়ে গোপালগঞ্জ ও খুলনা পর্যন্ত যেত। তৃতীয়টি তারাপাশা হয়ে গোয়ালন্দ-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচল করত।
মাদারীপুর বিল রুট একটি খাল, যা কুমার নদকে মধুমতি নদীর সঙ্গে যুক্ত করেছে। এদের মাঝখানে এক বিশাল জলাশয় রয়েছে, যা বছরের বড় অংশে শুকনো থাকে, কিন্তু বর্ষায় এটি মাদারীপুরসহ পূর্ববঙ্গের অন্যান্য জেলা থেকে খুলনা পর্যন্ত নৌপথের সংযোগ দেয়। এখান থেকে খুলনা ও কলকাতায় রেল বা সুন্দরবন পথে যাওয়া যেত।
এ রুট নির্মাণ শুরু হয় ১৯০০ সালে; বর্ষাকালে ছয় ফুট গভীর ড্রাফটের স্টিমার চলাচলের উপযোগী করতে এটি খনন ও প্রশস্ত করা হয়। পরে আরো খনন করে সারা বছর চলাচলের উপযোগী করা হয়। ১৯২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত এ জলপথ নির্মাণে ব্যয় হয় তখনকার ভারতীয় ৬০ লাখ রুপি। খালের দৈর্ঘ্য ৩৮ মাইল এবং বছরে প্রায় ১০ লাখ টন পণ্য এ পথে পরিবহন করা হতো। যার আনুমানিক মূল্য ছিল ২৯ কোটি ২৫ লাখ রুপি। এ সংখ্যা থেকেই এ পথের গুরুত্ব ও অর্থনৈতিক মূল্য স্পষ্ট হয়।
ব্রিটিশ শাসনামলে মাদারীপুর অঞ্চলে কৃষিপ্রধান থাকলেও স্থানীয় শিল্প ও মৎস্য শিল্প অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাট, ইট, টাইলস ও পিতল শিল্প স্থানীয় জনজীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিল। নদীপথ ও স্টিমার যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হওয়ায় মাদারীপুর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব লাভ করে। ফলে সে সময়ের মাদারীপুর কেবল কৃষি কেন্দ্র নয়, বরং স্থানীয় শিল্প ও বাণিজ্যের সংমিশ্রণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হতো।
নীরব হাসান: লেখক ও গবেষক









