সিন্ধু নদকেন্দ্রিক ভৌগোলিক সুবিধা, স্থল ও সমুদ্রপথের সংযোগ এবং উৎপাদনশীল অর্থনীতি এ অঞ্চলকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। বৈদিক সাহিত্য ও বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার থেকে জানা যায়—বস্ত্র, পুথি, নীল, সিলমোহর, ঘোড়া ও খাদ্যশস্যের মাধ্যমে সিন্ধ প্রাচীন বিশ্বের বাণিজ্য মানচিত্রে বিশেষ স্থান অধিকার করেছিল।
সনাতন ধর্মের সর্বপ্রাচীন গ্রন্থ ঋগ্বেদে এটি একটি সমৃদ্ধ ভূমি হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। সেখানে সিন্ধকে ‘চির যৌবন ও সৌন্দর্যের দেশ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে প্রদেশের উৎপাদন ও সমৃদ্ধ বাণিজ্যের চিত্রও উঠে এসেছে। তবে ঋগ্বেদের সিন্ধের যে বর্ণনা আছে তার সঠিক সময় নিয়ে মতভেদ আছে। কিছু ঐতিহাসিক এটিকে খ্রিস্টপূর্ব ১০০০-১৫০০ সালের মধ্যে মনে করেন। কেউ কেউ কয়েক সহস্রাব্দ আগের সময়ে বলে মত দিয়েছেন।
সিন্ধের ভোগোলিক বাস্তবতা ও বাণিজ্যিক রুট
প্রাচীনকাল থেকেই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সিন্ধ বাণিজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এর কেন্দ্র সিন্ধু নদ উত্তর দিক থেকে দক্ষিণে তির্যকভাবে প্রবাহিত হয়ে বিস্তৃত বদ্বীপ গঠন করে আরব সাগরে পতিত হয়েছে। এ ভৌগোলিক বিন্যাস সিন্ধকে একই সঙ্গে স্থল ও সমুদ্র বাণিজ্যের সংযোগস্থলে পরিণত করে। উত্তর-পশ্চিমের গিরিপথগুলো মধ্য এশিয়া ও ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, আর নদীপথ অভ্যন্তরভাগের পণ্যকে সহজে বদ্বীপের বন্দরাঞ্চলে পৌঁছে দিত। ফলে সিন্ধ এক প্রাকৃতিক ট্রানজিট অঞ্চলে রূপ নেয়, যেখানে বিদেশী ও দেশীয় বাণিজ্যধারা এসে মিলিত হতো।
সিন্ধের বাণিজ্যিক কাঠামো তিনটি প্রধান আঞ্চলিক কেন্দ্রকে ঘিরে গড়ে ওঠে। এগুলো হলো উত্তরাঞ্চল, কেন্দ্রভাগ ও বদ্বীপ অঞ্চল। উত্তরাঞ্চলীয় বাণিজ্য কেন্দ্রে অন্তর্ভুক্ত ছিল আলোড়, সুক্কুর, শিকারপুর ও লারকানা—যেখানে উত্তর দিক থেকে আগত পণ্যসামগ্রী মজুদ করা হতো। কেন্দ্রভাগের বাণিজ্যিক কার্যক্রম আবর্তিত হয়েছে প্রাচীন সেহওয়ান-শহরকে কেন্দ্র করে, যা পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলীয় পণ্যবিনিময়ের সংযোগস্থল ছিল। বদ্বীপ অঞ্চলে অবস্থিত বন্দরগুলো—বিশেষত ঠাট্টা, হায়দরাবাদ ও করাচি—সমুদ্রপথে আগত বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে ওঠে। এ তিন অঞ্চলের পারস্পরিক সংযোগ সিন্ধকে একটি সমন্বিত বাণিজ্য ব্যবস্থায় সমৃদ্ধ করে, যার মাধ্যমে দেশীয় পণ্য দ্রুত রফতানি এবং বৈদেশিক দ্রব্য আমদানি সম্ভব হতো।
সিন্ধু নদ শুধু আঞ্চলিক নয়, এশীয় বাণিজ্যেরও এক প্রধান ধমনি হিসেবে স্বীকৃত ছিল। আলেকজান্ডারের অভিযানের প্রেক্ষাপটেও এ বাণিজ্যিক আকর্ষণ কাজ করেছিল; তার নৌসেনাপতি নেয়ারখাসের যাত্রাবিবরণে তা প্রতিফলিত হয়। গ্রিক-রোমান গ্রন্থ ‘পেরিপ্লাস’, আরব ভূগোলবিদদের বিবরণ, অষ্টম শতাব্দীর আরব বিজয়সংক্রান্ত দলিল, মধ্যযুগীয় পর্যটক আল-রেরুনি ও ইবনে বতুতার বর্ণনা, এমনকি সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নথিও এ নদকেন্দ্রিক বাণিজ্যের ধারাবাহিকতার সাক্ষ্য বহন করে।
বাণিজ্যিক নৌকা ‘ডুনডি (Doondee)’
ঐতিহাসিকভাবে ইন্ডাস নদ ছিল সিন্ধর বাণিজ্যের প্রধান পথ (ইন্ডাস সিন্ধু নদের গ্রিক বা আন্তর্জাতিক রূপ, যা বিদেশী লেখক ও ঐতিহাসিকরা এ নাম ব্যবহার করতেন)। সিন্ধু অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ইতিহাসে ‘ডুনডি” (Doondee)’ নামক নৌযানের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইন্ডাস নদকে কেন্দ্র করে যে নদীনির্ভর বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তার প্রধান বাহন ছিল এই ডুনডি। স্থলপথের সীমাবদ্ধতা ও মরুপ্রধান ভূপ্রকৃতির কারণে সিন্ধ অঞ্চলে নদপথই ছিল সবচেয়ে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও কার্যকর পরিবহন ব্যবস্থা। সে ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ডুনডি নৌকা।
বাণিজ্যিক সড়কপথ
সিন্ধ দীর্ঘকাল ধরে মধ্য এশিয়ার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত। যদিও ইন্ডাস নদ উত্তরাঞ্চলের অভ্যন্তরভাগ দিয়ে প্রবাহিত হয়নি, তবু সিন্ধ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মধ্য এশিয়া, পারস্য ও ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে সংযোগস্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মৌসুম অনুযায়ী নদীপথের প্রাকৃতিক স্বভাবের প্রভাবে নৌ-চলাচলের অসুবিধার কারণে বণিকেরা স্থলভিত্তিক সুপ্রতিষ্ঠিত সড়কপথের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এতেই প্রাচীনকাল থেকেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক মহাসড়ক গড়ে ওঠে।
প্রাচীনকালে সিন্ধের বিস্তৃতি ছিল বর্তমানের তুলনায় অনেক বেশি—উত্তরে কাশ্মীর, দক্ষিণে সুরাট, পূর্বে কনৌজ এবং পশ্চিমে মাকরান পর্যন্ত। পরবর্তীকালে ইসলামী শাসনামলে সিন্ধ প্রশাসনিকভাবে মুলতান থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো।
বাণিজ্য ও পণ্য
ভারতের সরকারি প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের আবিষ্কৃত নিদর্শনগুলো থেকে সিন্ধের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। সিন্ধে প্রাচীনতম সভ্যতার নিদর্শনে দেখা যায় এটি কোনো একক শহর ছিল না, ৬০টির বেশি কেন্দ্রের সমষ্টি। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থানগুলো হলো মহেঞ্জোদারো, চানহুজোদারো, ঝুকার ও আমরি।
এ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলো সিন্ধের প্রাচীন বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছে, যার মধ্যে মহেঞ্জোদারো সবচেয়ে সমৃদ্ধ স্থান হিসেবে বিবেচিত।
সিন্ধের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা ও বাণিজ্যিক ইতিহাসের আলোকে দেখা যায়, সিন্ধের বিভিন্ন স্থানগুলোর বয়স প্রায়ই মেসোপটেমিয়ার স্থাপনার সমসাময়িক। অর্থাৎ সিন্ধের নগরায়ণ মেসোপটেমিয়া সভ্যতার সমসাময়িক। কারণ মেসোপটেমিয়া থেকে সিন্ধে উৎপাদিত অনেক সামগ্রী পাওয়া গেছে। উদাহরণস্বরূপ, লাগাস ও উম্মা থেকে সিন্ধের বিশেষ সিল আবিষ্কৃত হয়েছে। এ কারণে বলা হয় মহেঞ্জোদারো সভ্যতা অন্তত ৫০০০ বছর পুরনো।
বস্ত্র ও তুলা
মহেঞ্জোদারো ও অন্যান্য সিন্ধি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান থেকে উদ্ধার হওয়া নিদর্শনপ্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, সিন্ধিরা ছিল উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী। তারা বিশেষ কিছু শিল্পে পারদর্শী ছিল। ইন্ডাস নদ উপত্যকার শিল্পের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল বস্ত্র শিল্প। মহেঞ্জোদারো থেকে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন বস্তু প্রমাণ করে সেখানে সুতার কাজ প্রচলিত ছিল। এটি পরবর্তীকালে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত হয়।
সুতার ঘূর্ণন যন্ত্র সহজ ও দামি উভয় ধরনের ব্যবহার হতো। যাতে সংশ্লিষ্টরা ব্যক্তিগত ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে মানিয়ে যন্ত্র কিনতে পারতেন। প্রায় প্রতিটি বসতির স্থান থেকে এগুলো পাওয়া গেছে। কিন্তু কোনো কাপড় পাঁচ হাজার বছর ধরে অবিকৃত থাকা সম্ভব নয়, তাই কোনো স্থল থেকে বড় টুকরো কাপড় উদ্ধার হয়নি। কেবল একটি ছোট কটন কাপড়ের টুকরো উদ্ধার হয়েছে, যা একটি রুপার অলংকারের সঙ্গে আটকে ছিল। ভারতের কেন্দ্রীয় কটন অনুসন্ধান কমিটির প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞরা এটি পরীক্ষা করেছেন। বিস্তারিত পরীক্ষায় প্রমাণ মিলেছে যে সিন্ধি তাঁতির দক্ষতা এবং কাপড়ের জন্য বেছে নেয়া তুলার গুণমান অত্যন্ত উৎকৃষ্ট ছিল।
অন্যান্য শিল্প ও পণ্য
সিন্ধ খোদাই করা সিলমোহর নির্মাণেও বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছিল। এসব সিলের সুনির্দিষ্ট ব্যবহার আজও নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও ধারণা করা হয়, এগুলো বাণিজ্যিক চিহ্ন বা তাবিজসদৃশ প্রতীক হিসেবে ব্যবহার হতো। নির্মাণে সূক্ষ্ম কারিগরি দক্ষতার প্রয়োগ প্রমাণ করে যে সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যেই তৈরি হয়েছিল। ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদী-উপত্যকার অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থলে সিন্ধু ধাঁচের এ সিলমোহর আবিষ্কৃত হয়। এ আবিষ্কার মহেঞ্জোদারো সভ্যতার সময় নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ঘোড়া প্রতিপালনের জন্য সিন্ধ ছিল অত্যন্ত উপযোগী। বৈদিক বর্ণনায় সিন্ধ সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘তার রয়েছে উৎকৃষ্ট জাতের ঘোড়া।’ পালি গ্রন্থগুলোও এ মতকে সমর্থন করে। সিন্ধ থেকে শতশত ঘোড়া বিভিন্ন জায়গায় রফতানি করা হতো।
সে সময় সিন্ধের আরেকটি বাণিজ্যপণ্য ছিল খাদ্যশস্য। বিভিন্ন বর্ণনায় সিন্ধকে খাদ্য রফতানিকারক অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বৈদিক কবি যেমন বলেছেন, ‘সে (সিন্ধ) সুন্দরভাবে সজ্জিত এবং তার রয়েছে বিপুল খাদ্যভাণ্ডার।’ এত বিপুল খাদ্যভাণ্ডার কেবল অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য নয়, বরং মুনাফার উদ্দেশ্যে রফতানির জন্যই ব্যবহার হতো—এমন অনুমান করা যুক্তিসংগত।
আমদানি পণ্য
ভারতের ভূতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের স্যার ই প্যাসকো মহেঞ্জোদারোয় ব্যবহৃত ধাতু ও খনিজ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে মত প্রকাশ করেছেন যে মহেঞ্জোদারোর আবাসনের সাতটি স্তর থেকে উদ্ধারকৃত নিদর্শনগুলোর উপাদান বিচার করলে বোঝা যায়—সিন্ধে যেসব কাঁচামালের ঘাটতি ছিল, সেগুলো বাইরে থেকে আমদানি করতে হতো। এ তালিকায় ধাতুর মধ্যে ছিল স্বর্ণ, রুপা, তামা, সিসা ও টিন। আর অন্যান্য উপাদানের মধ্যে ছিল বিভিন্ন প্রকার পাথর (যেগুলো পুথি তৈরিতে ব্যবহার হতো), রক ক্রিস্টাল, স্লেট, বিটুমেন, লাল ওখার, ব্যাসল্ট প্রভৃতি।
সিন্ধু নদ, বিস্তৃত বদ্বীপ, গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ এবং ‘ডুনডি’ নৌযানের মতো পরিবহন ব্যবস্থা মিলিয়ে এখানে গড়ে ওঠে শক্তিশালী বাণিজ্য অবকাঠামো। মহেঞ্জোদারোসহ বিভিন্ন প্রত্নস্থলের নিদর্শন প্রমাণ করে যে সিন্ধ প্রাচীন বিশ্বের উৎপাদন, কারিগরি দক্ষতা ও রফতানি বাণিজ্যে বিশেষ স্থান অধিকার করেছিল।
[নিবন্ধটির অধিকাংশ তথ্য পাকিস্তানের ইউনিভার্সিটি অব সিন্ধের ইনস্টিটিউট অব সিন্ধোলজি থেকে প্রকাশিত সিএল মারিওয়ালার, ‘হিস্ট্রি অব দ্য কমার্স অব সিন্ধ (ফ্রম আরলি টাইমস টু ১৫২৬ এডি)’ শীর্ষক গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে।]
বাশার খান: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা










