তার ভাগ্যে লেখা আছে সে নাকি রাজপরিবারের কলঙ্কের কারণ হবে। তাই তাকে ‘কাষ্ঠপেটিকা’য় শুইয়ে ভাসিয়ে দেয়া হলো সিন্ধু নদে। ভাম্বোরের এক ধোপার হাতে পড়ল সে। ধোপার ঘরেই মানুষ হলো। সাসি নামের এ কন্যার রূপের আলো ছড়িয়ে পড়ল পুরো দেশে। কেচের রাজপুত্র পন্নু শুনল সে রূপের প্রশংসা। সাসিকে দেখতে সে গেল ভাম্বোরের ধোপাদের গ্রামে। সাসিকে দেখেই প্রথম নজরে প্রেম। কিন্তু সে প্রেম পূর্ণতা পাওয়া কি সহজ?
প্রেমের গল্পের শুরু থেকেই সম্ভবত এমন একটা করে ব্যাজ থাকে। প্রেমিক-প্রেমিকাদের দেশ, কুল, গোত্র বা সামাজিক অবস্থান ভিন্ন হয়। আর জনপ্রিয় প্রতিটি প্রেমের গল্পই নাটকীয়। ব্যতিক্রম না সিন্ধের লোকগল্পে থাকা প্রেমকাহিনীও। সাসি-পন্নু, সোহনী-মেহের, লিলার-চানেসার, নূরী-জাম তামাচি, উমর-মারভি বহুকাল ধরে সিন্ধের লোকমুখে প্রচারিত। এছাড়া সিন্ধের লোকগল্পে যুক্ত হয়েছে পাঞ্জাবের জনপ্রিয় হীর-রাঞ্ঝা। এমনকি সাসি-পন্নুও পাঞ্জাবি প্রেমকাহিনী হিসেবেই মূলত জনপ্রিয়।
লোকগল্পের ধর্ম হলো ভৌগোলিক সীমানা পার করা। সাসি-পন্নুর গল্পেও ব্যতিক্রম হয়নি। জনপ্রিয় এ প্রেমকাহিনী ৯০০ বছর আগে থেকে কথিত বলে ধারণা করা হয়। সিন্ধে ইসলাম প্রবেশের সময়কালই এ গল্পের সূচনাকাল ধরা হয়। গল্পটি মুসলিমদের সঙ্গে এসেছিল কিনা তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে মুসলিমপ্রধান অঞ্চলগুলোয় সাসি-পন্নুর গীত গাওয়া হয়। এ গল্প পাঞ্জাবেও জনপ্রিয়। পাশাপাশি মাকরান, আফগানিস্তান এমনকি জেরুজালেমেও গল্পটি শোনা যায়। লোকসাহিত্যের গবেষকদের কেউ কেউ মনে করেন এ বালুচ জুটির গল্প একসময় ফারসিভাষী কবিরা সিন্ধ থেকে ধার করেছিলেন। এরপর তারা জামির ইউসুফ-জুলেখার ফর্ম অনুসরণ করে নিজেদের মতো লিখেছেন।
তবে এ লোককাহিনীতে প্রভাব দেখা যায় রামায়ণের। সাসির সঙ্গে পন্নুর বিয়েতে মত ছিল না পন্নুর ভাইদের। কিন্তু পন্নুর জেদের কাছে তারা হার মানে। বিয়ে হয়ে যায়। এরপর বিয়ের রাতে পন্নুর ভাইয়েরা পন্নুকে প্রচুর মদ পান করায়। ঘুমের ঘোরেই তাকে নিয়ে যায় কেচে। ঘুম থেকে জেগে সাসি বিষয়টা বুঝতে পারলে সে কেচের দিকে রওনা হয় খালি পায়ে। নানা বিপদ তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। একসময় সাসি প্রার্থনা করে তাকে যেন মাটিতে মিশিয়ে ফেলা হয়। মাটি ভাগ হয়ে গেলে সে ধরণিতে প্রবেশ করে। ওদিকে পন্নুও ঘুম থেকে জেগে বুঝতে পারে তার কী হয়েছে। সে বিলাপ করতে করতে মারা যায়। পন্নুকে যে উপত্যকায় কবর দেয়া হয় সেখানেই ভূমিশয্যা নিয়েছিল সাসি।

প্রেমিকের কাছে যেতে নদী পার হচ্ছে সোহনী ছবি: লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি মিউজিয়াম অব আর্ট
সাসির ভূমিশয্যা গ্রহণ করার বিষয়টি রামায়ণের সঙ্গে মিলে যায়। আসলে লোকসাহিত্য বা লোকগল্পের চরিত্রই এই। তারা গ্রহণ করে বিভিন্ন প্রভাব। নিজেদের সাজিয়ে নেয় নিজের মতো। সে কারণেই পাঞ্জাবের প্রেমকাহিনী থাকে সিন্ধেও। পাঞ্জাবের সোহনী-মহিওয়াল সিন্ধে হয়ে যায় সোহনী-মেহের।
গল্পটা লোকসাহিত্যের আগ্রহী পাঠকের জানা। সোহনী নামের মেয়েটির বিয়ে হলে তাকে ছেড়ে আসতে হয় প্রেমিককে। কিন্তু সে প্রতি রাতে একটি মাটির ঘড়া (পাতিল) বুকের জড়িয়ে নিয়ে সিন্ধু নদ পার হয়ে তার প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করতে যায়। বিষয়টি তার ননদের চোখে পড়লে এক রাতে ননদটি সব পাতিল ভেঙে রাখে। সোহনী সে রাতে কাঁচা মাটির ঘড়া নিয়ে নদ পার হতে যায়। ঘড়া গলে ডুবে মৃত্যু হয় তার। পাঞ্জাবি সংস্করণে এ নদী চেনাব আর সিন্ধি লোকগল্পে নদীটি সিন্ধু। মজার ব্যাপার হলো পাঞ্জাবে সোহনীর প্রেমিক মহিওয়াল আর সিন্ধে মেহের।
আবার রাজস্থানী গল্পও এসে জুড়ে যায় সিন্ধের মাটির সঙ্গে। তেমনই একটি গল্প মুমাল-রানোর। গল্পটা সিন্ধ আর রাজস্থানের সীমানার। সে কারণে দুই অঞ্চলই একে গ্রহণ করেছে। এ গল্পেও প্রধান হয়ে উঠেছে মুমালের রমণীয় সৌন্দর্য। সেই সঙ্গে আছে মুমালের প্রতি রানোর ভালোবাসার টান ও তাদের প্রতিকূল অবস্থা। এ গল্পও ট্র্যাজেডিতে শেষ হয়।
পাঞ্জাবে চারটি রোমান্টিক-ট্র্যাজেডি সবচেয়ে জনপ্রিয়। কিন্তু সিন্ধে মূলত সাত নায়িকা প্রাধান্য পেয়েছেন। বিষয়টি সিন্ধের লোকগল্পের ট্র্যাজেডি ও প্রেমকাহিনীকে আলাদা করে তোলে। এ সাত নারী বা সাত নায়িকাকে পাওয়া যায় সিন্ধের সুফি ও কবি শাহ আবদুল লতিফ ভিট্টাইয়ের কবিতায়। তার ‘শাহ জো রিসালো’য় থাকা এ সাতজন হলেন—সাসি, মুমাল, মারভি, নূরী, সোহনী, লিলান ও সোরথ।
এ নায়িকাদের বা রোমান্টিক-ট্র্যাজেডির মধ্যে প্রেম বা ভালোবাসা যেমন আছে, তেমনি আছে জেদ, বীরত্ব এমনকি দেশপ্রেমও। মারভির গল্পটি তেমনই।
খাসখেলি মেয়ে ছিল মারভি। যেমনটা আমরা জানি, লোকসাহিত্যের নায়িকারা হবেন সুন্দরী, মারভিও ব্যতিক্রম না। সে রূপের কিসসা শুনে উমরকোটের রাজা উমর তাকে অপহরণ করেন। তবে মারভিকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন উমর। রাজি হয়নি মারভি। কারণ তার মনে হয়েছিল, উমর তাকে অপহরণ করে তার পাশাপাশি তার মাটিরও (দেশ কনসেপ্টটা তখন ছিল না) অমর্যাদা করেছে। মারভিকে কয়েদ রাখা হয় উমরকোট কেল্লার বন্দিশালায়। কয়েক বছর পর তার জেদের কাছে হার মানেন উমর। মারভিকে মুক্ত করেন তিনি। মারভি তার গ্রামে এলে তাকে সীতার মতোই দিতে হয়েছিল সতীত্বের পরীক্ষা। সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে সমগ্র খাসখেল উৎসব করার পাশাপাশি মারভির বীরত্ব নিয়ে গান বেঁধেছিল।
প্রেমকাহিনী না, উমর-মারভির গল্প সিন্ধের মানুষ মনে রেখেছে মারভির বীরত্বের কারণে। আর বীরত্ব যে কেবল পুরুষের বাধা না তাও প্রমাণ করেছেন তিনি। মারভির এ গল্প আবদুল লতিফ ভিট্টাইয়ের কবিতায় বেঁচে থাকলেও মারভির কথা প্রথম লিখেছিলেন শাহ আবদুল করিম বুলরি। চতুর্দশ শতাব্দীর এ কবি ছিলেন শাহ আবদুল লতিফের প্রপিতামহ।
‘শাহ জো রিসালো’য় থাকা অন্যান্য প্রেমকাহিনী ও চরিত্রদের গল্পও বহুবার বলা হয়েছে। শাহ আবদুল লতিফ একা বলেননি। তার সমসাময়িকরা বলেছেন, পরবর্তীকালেও বলা হয়েছে। আর এ কাহিনীগুলোর মধ্যে জুড়ে আছে সিন্ধের ইতিহাস। যেমন নূরী ও জাম তামাচির গল্প নিছক একটি প্রেমকাহিনী নয়। জাম তামাচি ছিলেন সামা রাজপুত্র। সামা পরিবারের ইতিহাস আছে এ গল্পের মধ্যে। আছে জেরুক ও ঠটটার মধ্যে থাকা তিনটি হ্রদের কথা। ইতিহাসের পাশাপাশি হারিয়ে যাওয়া ভূপ্রকৃতিকেও ধরে রেখেছে এ গল্প।
প্রেমের মধ্যে বীররস যেমন আছে, তেমনি আছে রাজত্ব ও বীরত্বের একক ভিন্ন গল্পও। দোদো চানেসারের গীতিকাব্যটি সে ধারারই। এতে দেখা যায় দোদো বিন ভোঙ্গাদের পুত্র দ্বিতীয় দোদোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তারই ভাই চানেসার। সেজন্য দিল্লিতে গিয়ে আলাউদ্দিন খিলজির সাহায্য নিয়েছিল চানেসার। সে যুদ্ধে সিন্ধি সেনাদের প্রবল বিক্রমের পরও পরাজিত হয় তারা। চানেসারের কাপুরুষতা নিয়ে বিদ্রূপ করেছিল দোদো। আর মৃত্যুর সময় দোদোর হাতে ধরা ছিল তলোয়ার।
এ গীতিকাব্যে দোদোর বীরত্ব যেমন আছে, তেমনি আছে সিন্ধের ইতিহাসও। সুমরু বংশের এ দুই ভাইয়ের গল্প আমাদের জানায় লোহারের মেয়ে ছিল চানেসারের মা। অন্যদিকে দোদোর মা ছিল রাজপুত। ফলে বাবার মৃত্যুর পর তাকেই অভিজাতরা নতুন রাজা ঘোষণা করে। কিন্তু এতে রেগে গিয়েছিল চানেসার। এদিকে দিল্লির মুসলিম সৈন্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করে সে বুঝেছিল এরা মিত্র নয়। শেষ অবধি তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে চানেসারও মারা যায়।
শাহ আবদুল লতিফ ভিট্টাই তার কবিতায় সিন্ধি প্রেমকাহিনী যেভাবে ধরে রেখেছেন, একইভাবে সিন্ধি গায়করা পথেঘাটে ঘুরে এসব গান গেয়েছেন। সিন্ধির পাশাপাশি পাঞ্জাবি, হিন্দি, গুজরাটি, দারি, পশতু থেকে ফারসিতেও কাহিনীগুলোকে উপজীব্য করে লেখা হয়েছে এ কবিতা ও গদ্য। আধুনিক সময়েও কবিতায়-গল্পে এসেছে। যেমন দোদোর এ গল্প নিয়েই বিংশ শতাব্দীর কবি শেখ আয়াজ লিখেছেন ‘দোদে সুমরে জো মওত’। উমর-মারভির গল্প থেকে তৈরি হয়েছে মঞ্চনাটক, টিভি নাটক ও চলচ্চিত্র। সোহনী-মহিওয়াল নিয়ে গানের অভাব নেই। তবে কোক স্টুডিও এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। ‘পার চানা দে’ (সোহনী-মহিওয়াল), ‘দাস্তান-এ-মুমাল রানো’র পর সিজন ১৫-তে আসা ‘আয়ি আয়ি’ গানটি মূলত ‘উমর-মারভি’র গল্প থেকে অনুপ্রাণিত। এভাবেই শতাব্দীর পর শতাব্দী বীরত্ব ও প্রেমকাহিনী ভেসে বেড়ায় সিন্ধের হাওয়ায়।
মাহমুদুর রহমান: লেখক ও সাংবাদিক










