সিন্ধুর তীরেই গড়ে উঠেছিল প্রাচীন জনপদ, সমুদ্রবন্দর, ধর্মীয় শিক্ষা কেন্দ্র। সময়ের স্রোতে এখানেই বদলে গেছে বিশ্বাসের মানচিত্র ও শাসনের ভাষা। সিন্ধুর প্রাচীন ইতিহাসের বহু অধ্যায় এখনো রহস্যের আবরণে আচ্ছন্ন। তেমনই এক পর্ব হলো ৭১১ খ্রিস্টাব্দে আরব শাসনের সূচনার পূর্ববর্তী সময়। যখন এ ভূখণ্ড বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য শাসনের অধীনে ছিল। আরবদের আগমনের আগেও সিন্ধু কোনো প্রান্তিক ভূখণ্ড ছিল না। এটি ছিল ইন্ডাস অববাহিকার এক সমৃদ্ধ রাষ্ট্র ব্যবস্থা। সমসাময়িক বর্ণনায় এ রাজ্যের সীমানা উত্তরে কাশ্মীরের উপত্যকা পর্যন্ত এবং দক্ষিণে আরব সাগরের উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পূর্বে থর মরুভূমি আর পশ্চিমে কাইকানান বা কালাত অঞ্চলের পাহাড়ি ভূখণ্ড ছিল এর প্রাকৃতিক সীমা। ফলে এটি ছিল উত্তর ভারত, মধ্য এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যপথের সংযোগস্থলে অবস্থিত এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র।

ডাচ গবেষক জে. ই. ভ্যান লোহুইজেন-ডি লিউ তার ১৯৮১ সালের প্রবন্ধে সিন্ধুকে চিহ্নিত করেছেন সমৃদ্ধ ভূখণ্ড হিসেবে। তার মতে এটি ছিল, বাণিজ্যের বিকাশে বস্তুগতভাবে ধনী এবং বহুধর্মীয় বিন্যাসের কারণে সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ। সপ্তম শতাব্দীতে মাত্র ছয় দশকের ব্যবধানে এ ভূখণ্ড বৌদ্ধ শাসন থেকে ব্রাহ্মণ আধিপত্য এবং সেখান থেকে মুসলিম বিজয়ের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছিল তিনটি বৃহৎ রাজবংশীয় রূপান্তর।

সপ্তম শতকে রাজবংশীয় রূপান্তরকে বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে আরো প্রাচীন সিন্ধুর দিকে। যার দীর্ঘ সভ্যতাগত ধারাবাহিকতার ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছিল পরবর্তী রাষ্ট্র ব্যবস্থা। মূলত এটি ছিল দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীনতম ধারাবাহিক সভ্যতার কেন্দ্র। হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোর সুপরিকল্পিত নগর, ইটের স্থাপত্য, সুশৃঙ্খল নিকাশ ব্যবস্থা এবং বাণিজ্য সিন্ধুকে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দেই এক সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত করেছিল। সে নগরসভ্যতার পতনের পরও সিন্ধুর জীবন থেমে যায়নি; বরং নদীঘেঁষা জনপদ, আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন্দ্র এবং ধর্মীয় সংস্কৃতির সমন্বয়ে এখানে ধীরে ধীরে নতুন সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠে। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে সিন্ধু আখেমেনীয় পারস্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হলে এটি প্রথমবারের মতো একটি বৃহৎ সাম্রাজ্যিক প্রশাসনিক ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা লাভ করে। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬-৩২৫ সালে আলেকজান্ডারের অভিযান সিন্ধুকে গ্রিক জগতের সঙ্গে সংযোগ ঘটালেও তার প্রভাব ছিল স্বল্পস্থায়ী। মৌর্য সাম্রাজ্যের অধীনে এ ভূখণ্ড আবারো একটি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়। সম্রাট অশোকের সময় বৌদ্ধধর্ম এখানে গভীর শিকড় গেড়ে বসে। মধ্য এশিয়া, উত্তর ভারত ও আরব সাগরীয় বাণিজ্যপথের সংযোগস্থল হিসেবে সিন্ধু ছিল বণিকগোষ্ঠী, ধর্মীয় সম্প্রদায় ও আঞ্চলিক শক্তির মিলনক্ষেত্র। ফলে এখানে একদিকে বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, অন্যদিকে ব্রাহ্মণ্য সামাজিক কাঠামো দুটিই পাশাপাশি বিকশিত হতে থাকে। এ দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার ভেতর দিয়েই উত্থান ঘটে রাই রাজবংশের। যারা আনুমানিক পঞ্চম শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে সপ্তম শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত সিন্ধু শাসন করে।

সপ্তম শতাব্দীর সূচনালগ্নে সিন্ধু ছিল রাই রাজবংশের অধীনে এক সুসংগঠিত রাজ্য, যার শাসন বহু প্রজন্ম ধরে ইন্ডাস অববাহিকার রাজনৈতিক ধারাবাহিকতাকে ধরে রেখেছিল। রাই শাসকদের অধীনে রাজা ছিলেন প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। তিনি একাধারে সেনাপতি, প্রধান বিচারক ও রাজস্ব ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক। তার অধীনে মন্ত্রী, দাপ্তরিক লিপিকার ও প্রাদেশিক প্রশাসনের একটি সুসংগঠিত কাঠামো ছিল। এ ব্যবস্থার কারণে আইন-শৃঙ্খলা, বাণিজ্যিক নিরাপত্তা ও কৃষি উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং সিন্ধু দীর্ঘ সময় এক ধরনের রাজনৈতিক স্থিতি লাভ করে—যা সমসাময়িক বর্ণনাগুলোতে প্রতিফলিত হয়েছে।

সিন্ধুর প্রাচীন ইতিহাসের অনেক বর্ণনা পাওয়া যায় ‘চাচনামা’য়। এটি সিন্ধুর প্রাক-আরব যুগের ইতিহাস নিয়ে রচিত প্রাচীনতম বর্ণনামূলক ফারসি ক্রনিকল। যা ত্রয়োদশ শতাব্দীতে আলী কুফি সংকলন করেন এবং পরবর্তী সময়ে মির্জা কালিচ বেগ ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। চাচনামায় পাওয়া যায় সিন্ধুর ধারাবাহিক শাসনে প্রথম বড় আঘাত আসে ৬২৬ খ্রিস্টাব্দে, রাই সেহরাসের শাসনামলে। নিমরুজের রাজার বাহিনী আকস্মিকভাবে মাকরান অতিক্রম করে সিন্ধু আক্রমণ করে। সিন্ধুর সেনাবাহিনী আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও এ যুদ্ধে নিহত হন রাজা নিজেই। সিংহাসনে আরোহণ করেন তার পুত্র সাহাসি দ্বিতীয়, যিনি ৬২৬-৬৫২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন এবং পিতার রেখে যাওয়া রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ধরে রাখার চেষ্টা করেন।

সিন্ধুর সামাজিক ও ধর্মীয় চিত্র সম্পর্কে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ধারণা মেলে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাংয়ের কাছ থেকে। তিনি ৬৪২ খ্রিস্টাব্দে এ অঞ্চল সফর করেছিলেন। হিউয়েন সাংয়ের বিবরণ থেকে জানা যায়, সিন্ধুতে ওই সময় তিনি অসংখ্য বৌদ্ধবিহার দেখেছিলেন। যেগুলোতে হাজার হাজার ভিক্ষু অবস্থান করতেন। ইতিহাসবিদদের মতে, এত বিপুলসংখ্যক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকা একটি সমৃদ্ধ কৃষি ও বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতির উপস্থিতিরই ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে তিনি বেশকিছু হিন্দু মন্দিরের কথাও উল্লেখ করেন। যা প্রমাণ করে যে বৌদ্ধধর্ম প্রাধান্যশীল হলেও ধর্মীয় বৈচিত্র্য সিন্ধুর সামাজিক কাঠামোর একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য ছিল। হিউয়েন সাংয়ের মতে, এখানকার মানুষ ছিল দৃঢ়প্রকৃতি ও উদ্যমী। শস্য উৎপাদন, পশুসম্পদ এবং লবণ রফতানির জন্য তাদের খ্যাতি ছিল। বিশেষ করে লবণের বাণিজ্য সিন্ধুকে দূরবর্তী অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। আর দূরদেশ থেকে আসত নানা বিলাসপণ্য। ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যপথের একটি সক্রিয় অংশ ছিল সিন্ধু। এই সমৃদ্ধ অর্থনীতির একটি বড় ভিত্তি ছিল সমুদ্রবন্দর দেবল। এটি ছিল পূর্ব ও পশ্চিমের জাহাজের মধ্যবর্তী নোঙরস্থল, যেখানে ভারতীয় উপমহাদেশ, আরব ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বণিকদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। এ ভূখণ্ড শুধু কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল ছিল না; এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নেটওয়ার্কেরও সক্রিয় অংশ ছিল।

তবে রাই সেহরাসের মৃত্যুর পর থেকে যে অস্থিরতার সূচনা হয়, তা ভবিষ্যতের ক্ষমতা পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে দেয়। বাহ্যিক আক্রমণ প্রতিহত করা গেলেও অভ্যন্তরীণ কাঠামোর ভেতরে যে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, সেটিই পরবর্তী সময়ে ব্রাহ্মণ্য শক্তির উত্থান এবং শেষ পর্যন্ত আরব বিজয়ের পটভূমি নির্মাণ করে।

সাহাসি দীর্ঘ আটাশ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। তার শাসনামলে সিন্ধুর রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত কেন্দ্র ধীরে ধীরে সিংহাসন থেকে সরে এসে এক ব্যক্তির হাতে সঞ্চিত হতে থাকে। তিনি ব্রাহ্মণ মন্ত্রী চাচ। জন্মে অভিজাত না হলেও অসামান্য প্রশাসনিক দক্ষতা, মেধা ও কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি রাজ্যের সর্বাধিক বিশ্বস্ত ব্যক্তিতে পরিণত হন। রাজদরবারের নিত্যকার কার্যক্রম, প্রাদেশিক শাসন, সামরিক প্রস্তুতি সব ক্ষেত্রেই তার প্রভাব এতটাই বিস্তৃত ছিল যে রাজকীয় কর্তৃত্বের বড় অংশ তার ব্যক্তিগত ক্ষমতার পরিসরে এসে পড়ে। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ এইচটি ল্যামব্রিক সিন্ধুর প্রাক-আরব যুগের ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন, রাজার পূর্ণ আস্থা ও সমর্থন তাকে এমন অবস্থানে পৌঁছে দেয়, যেখানে সিন্ধু ও তার অধীন অঞ্চলগুলোর ওপর তার ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব প্রায় নিরঙ্কুশ হয়ে ওঠে।

কিন্তু এ ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের পেছনে শুধু প্রশাসনিক বাস্তবতা ছিল না, রাজদরবারের অভ্যন্তরীণ সম্পর্কও ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ রানি সুহান্দি, যিনি দৃঢ় মানসিকতা ও তীব্র ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন, রাজা সাহাসির ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। রাজকার্যের প্রয়োজনে প্রাসাদে আসা-যাওয়ার মধ্যেই চাচের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। পরবর্তী বর্ণনায় এ সম্পর্ককে রোমান্টিক রূপে তুলে ধরা হলেও, এর অন্তরালে ছিল কঠোর রাজনৈতিক বাস্তবতা। নিঃসন্তান রাজার মৃত্যুর পর ক্ষমতা রাজপরিবারের অন্য কারো কাছে চলে গেলে রানির জীবন ও সম্পদ উভয়ই বিপন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। একইভাবে রাজার অনুপস্থিতিতে চাচের অবস্থানও হয়ে উঠত অনিশ্চিত। এ যৌথ অনিরাপত্তাই তাদের মধ্যে একধরনের রাজনৈতিক মৈত্রী গড়ে তোলে।

রাজা যখন মরণাপন্ন তখন সিন্ধুর রাজধানী আলোর থেকে রাজার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীদের প্রাসাদে ডেকে এনে আটক ও হত্যা করা হয়। তাদের স্থলে এমন ব্যক্তিদের বসানো হয়, যারা রানীর প্রতি অনুগত। অসুস্থ রাজার পক্ষ থেকে চাচকে রাজ্যের কার্যত প্রতিনিধি ঘোষণা করা হয়। রাজার মৃত্যুর পর রানীকে বিবাহ করে চাচ আনুষ্ঠানিকভাবে সিংহাসনে আরোহণ করেন। এ ঘটনার মধ্য দিয়েই সিন্ধুতে বৌদ্ধ শাসনের অবসান এবং ব্রাহ্মণ্য শাসনের সূচনা ঘটে। তবে সিংহাসনে বসাই শেষ কথা ছিল না। প্রাদেশিক গভর্নরদের বিদ্রোহ, প্রতিবেশী শক্তির আক্রমণ এবং নতুন শাসকের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন—সব মিলিয়ে চাচকে তার শাসনের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হয়। প্রায় দুই-তিন বছর ধরে সামরিক শক্তি, কূটনীতি এবং রাজদরবারে তার পূর্ববর্তী প্রভাব—এ তিনের সমন্বয়ে তিনি রাজধানী ও কেন্দ্রীয় অঞ্চলকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন। ল্যামব্রিকের ভাষায়, শক্তি, কৌশল এবং প্রাক্তন রাজার বিধবার প্রভাবের মিশ্রণে তিনি নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন।

সপ্তম শতাব্দীতে চাচের শাসনামলে সিন্ধু রাজ্য ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে এক সুসংহত রাজনৈতিক সত্তায় রূপ নেয়। ইন্ডাস অববাহিকার উত্তরাংশ বাদে প্রায় সমগ্র অঞ্চলই তার কর্তৃত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ বিস্তৃত ভূখণ্ডকে শুধু সামরিক অভিযানের মাধ্যমে নয়, প্রতীকী এক পদ্ধতিতে সীমানা নির্ধারণের মাধ্যমে চিহ্নিত করেছিলেন তিনি। সীমান্ত অঞ্চলে বৃক্ষ রোপণের প্রথা তিনি চালু করেন। চাচনামার বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ও লেখক জন কেয় উল্লেখ করেন, উত্তরে তার অগ্রযাত্রা কাশ্মীর পর্যন্ত পৌঁছেছিল। যেখানে তিনি চিনার ও দেবদারুর মতো পাহাড়ি বৃক্ষ রোপণ করে সীমান্ত চিহ্নিত করেন। আবার পশ্চিমে মাকরানের উপকূলীয় অঞ্চলে খেজুরগাছ রোপণের মধ্য দিয়ে তিনি তার আধিপত্যের স্বাক্ষর রাখেন। এ বিস্তারের প্রেক্ষাপটে কেয় মন্তব্য করেন, উত্তর-পশ্চিমে প্রাচীন গান্ধার বাদ দিলে চাচের রাজ্য ভৌগোলিকভাবে এক ধরনের ‘প্রোটো-পাকিস্তান’-এর রূপ লাভ করেছিল।

চাচের কৃতিত্ব শুধু ভূখণ্ড বিস্তারে নয়, রাষ্ট্রকে প্রশাসনিকভাবে পুনর্গঠিত করাও তার শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তিনি পুরো রাজ্যকে চারটি প্রদেশে বিভক্ত করেন। যেখানে গভর্নরদের মাধ্যমে শাসন পরিচালিত হতো। এ প্রাদেশিক বিন্যাসে বর্তমান সিন্ধ ও পাঞ্জাব উভয় অঞ্চলের অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। ব্রাহ্মণ্যবাদ প্রদেশে ইন্ডাসের পূর্বদিকে মধ্য সিন্ধ, নিম্ন সিন্ধ এবং সম্ভবত কচ্ছ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল ছিল। সেহওয়ান বা সিওয়িস্তান প্রদেশে বর্তমান লারকানা ও দাদুর বিস্তীর্ণ এলাকা অন্তর্ভুক্ত ছিল। অন্যদিকে পাঞ্জাব অঞ্চলের অন্তর্গত আসকালন্দ মোটামুটি বর্তমান বাহাওয়ালপুর ও সংলগ্ন এলাকার সমতুল্য ছিল এবং মুলতান প্রদেশ উত্তরে সল্ট রেঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে কাশ্মীর সীমান্তে পৌঁছেছিল।

রাজধানী আলোর ছিল এ রাজ্যের রাজনৈতিক কেন্দ্র, যা ইন্ডাস নদীর তীরে অবস্থিত হওয়ায় বাণিজ্য ও যোগাযোগের দিক থেকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সমুদ্রবন্দর দেবল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করত, আর নীরুন, ব্রাহ্মণ্যবাদ, সেহওয়ান ও মুলতান ছিল প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান নগর। এ নগরজাল শুধু রাজস্ব সংগ্রহ ও সামরিক নিয়ন্ত্রণকেই সহজ করেনি; এটি সিন্ধুকে উত্তর ভারত ও আরব সাগরের মধ্যবর্তী বাণিজ্যপথের একটি সক্রিয় কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

প্রায় চার দশকের শাসনে চাচ নিজেকে একজন দক্ষ প্রশাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার শাসনকে পরবর্তী আরব ঐতিহাসিকরাও উচ্চ মূল্যায়ন করেছিলেন। যা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। কেয়ের ভাষায়, একজন ‘অমুসলিম’ শাসক হয়েও তিনি মুসলিম শাসকদের মানদণ্ডে প্রশংসিত হয়েছিলেন। এ মূল্যায়ন শুধু ব্যক্তিগত দক্ষতার স্বীকৃতি নয়, এটি প্রমাণ করে যে চাচের নির্মিত রাষ্ট্র ব্যবস্থা ছিল সুসংগঠিত, কার্যকর এবং তার সময়ের আঞ্চলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ এক শক্তি।

চাচের দীর্ঘ শাসনের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে সিন্ধুর রাজনৈতিক ইতিহাস নতুন সংকটপর্বে প্রবেশ করে। তার জীবদ্দশাতেই উত্তরাধিকার প্রশ্নটি জটিল হয়ে উঠেছিল। রানি সুহান্দির গর্ভে জন্ম নেয়া দুই পুত্র দাহরসিয়াহ ও দাহির এবং অন্য স্ত্রীর কন্যা বাইকে ঘিরে রাজপরিবারের ভেতরে ক্ষমতার ত্রিমুখী সমীকরণ তৈরি হয়। চাচের মৃত্যুর পর সাময়িকভাবে তার ভাই চন্দর সিংহাসনে আরোহণ করলেও শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয় কনিষ্ঠ পুত্র দাহিরের হাতে।

সিন্ধু তার পূর্ববর্তী ইতিহাস অনুযায়ী একাধিকবার আরবদের আক্রমণ প্রতিহত করা হয়েছিল। কিন্তু দাহিরের সময় এসে যে রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়, তা রাষ্ট্রের প্রতিরোধক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। ফলে ৭১১ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিমের অভিযানের মুখে সিন্ধুর পতন কেবল একটি সামরিক পরাজয় ছিল না, এটি ছিল অভ্যন্তরীণ বৈধতা-সংকটে আক্রান্ত এক রাজশক্তির অবশ্যম্ভাবী পরিণতি।

মাহফুজ রাহমান: সাংবাদিক, বণিক বার্তা