১৯২২ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে এর আবিষ্কার আধুনিক বিশ্বের সামনে উন্মোচন করে এক সুসংগঠিত, উন্নত ও সমৃদ্ধ নগরজীবনের চিত্র, যা সে সময়ের অনেক সভ্যতার তুলনায় কোনো অংশে কম ছিল না। ভৌগোলিক দিক থেকে মহেঞ্জোদারোর অবস্থান ছিল বর্তমান সিন্ধের লারকানা জেলায়।

প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে পাওয়া গেছে এ প্রাচীন নগর। এখনো দেখা যায় তার অবশেষ। প্রথম দর্শনেই মহেঞ্জোদারো বিস্মিত করে। উঁচু কোনো অংশে দাঁড়ালে চারদিকে ছড়িয়ে থাকা ইটের দেয়াল, রাস্তার রেখাচিত্র ও স্থাপনার ভিত্তি অতীতের এক সুপরিকল্পিত শহরের মানচিত্র চোখের সামনে তুলে ধরে। এখানে দ্বিতীয় শতকের একটি বৌদ্ধ স্তূপ আজও দাঁড়িয়ে আছে, যা প্রমাণ করে এ স্থান বহু যুগ যুগ ধরে মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র ছিল। স্তূপটির নিচে আরো প্রাচীন স্থাপনার স্তর লুকিয়ে আছে, যা এ নগরীর দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে।

খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৫০০ অব্দের মহেঞ্জোদারো ছিল এক প্রাণবন্ত মহানগর। সোজাসুজি গ্রিড-পদ্ধতিতে নির্মিত রাস্তা, সমান মাপের পোড়ামাটির ইট দিয়ে গড়া বাড়িঘর, প্রশস্ত প্রধান সড়ক এবং সুচিন্তিত নিকাশী ব্যবস্থা—সবকিছুতেই ছিল পরিকল্পনার ছাপ। নগরীর প্রধান সড়কগুলো উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম অক্ষ বরাবর নির্মিত, যা বায়ুপ্রবাহ ও চলাচলের সুবিধা নিশ্চিত করত। ছোট ছোট গলিপথ প্রধান সড়কের সঙ্গে যুক্ত ছিল, যা শহরটিকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামো প্রদান করেছিল।

মহেঞ্জোদারোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল এর উন্নত নিকাশী ব্যবস্থা। প্রতিটি বাড়িতে স্নানাগার ও শৌচাগারের ব্যবস্থা ছিল এবং অনেক ক্ষেত্রে দ্বিতল ভবনেও পানি নিষ্কাশনের আলাদা ব্যবস্থা দেখা যায়। পোড়ামাটির পাইপের মাধ্যমে বর্জ্য পানি ঢেকে রাখা নর্দমা দিয়ে প্রবাহিত হতো। এসব নর্দমা নিয়মিত পরিষ্কার রাখার ব্যবস্থাও ছিল। এখন পর্যন্ত ৭০০-এরও বেশি কূপের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে পানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে নগরবাসীরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল। এমন উন্নত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা সে সময়ের জন্য ছিল অত্যন্ত অগ্রসর চিন্তার পরিচয়।

মহেঞ্জোদারোর উচ্চ দুর্গটির (সিটাডেল ডিস্ট্রিক্ট নামে পরিচিত) এলাকায় অবস্থিত ‘গ্রেট বাথ’ মহেঞ্জোদারোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। প্রায় ১২ মিটার লম্বা ও সাত মিটার চওড়া এ জলাধার সম্ভবত ধর্মীয় আচার বা সামাজিক সমাবেশের কেন্দ্র ছিল। পাকা ইট ও জলরোধী উপাদান ব্যবহার করে এটি নির্মিত হয়েছিল। এটি প্রকৌশল দক্ষতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এছাড়া সম্ভাব্য শস্যাগার, প্রশাসনিক ভবন ও পুরোহিতদের শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত স্থাপনাগুলো প্রমাণ করে এ নগরীর একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছিল।

a

নগরের দুটি অংশ ছিল—উচ্চ ও নিম্ন। নিম্ননগর এলাকায় আবাসিক ভবনগুলোর পরিকল্পনাও অত্যন্ত উন্নত ছিল। অধিকাংশ বাড়ি ছিল অভ্যন্তরীণ আঙিনাকেন্দ্রিক, যা গোপনীয়তা ও পারিবারিক জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করত। অনেক বাড়িতে সিঁড়ির চিহ্ন পাওয়া গেছে। এ থেকে বোঝা যায় মধ্য ও নিম্নবিত্তদের এলাকায়ও বহুতল বা বহুস্তরবিশিষ্ট ভবন ছিল। মৃৎপাত্র তৈরির চুল্লি, ধাতুশিল্পের নিদর্শন ও কারিগরদের কর্মশালার চিহ্ন থেকে বোঝা যায়, এ নগরী ছিল শিল্প ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

শিল্পকলায়ও মহেঞ্জোদারোর বাসিন্দারা ছিলেন অনন্য। ‘প্রিস্ট-কিং’ নামে পরিচিত দাড়িওয়ালা পুরুষের পাথরের ভাস্কর্যটি ওই সভ্যতার কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি। অন্যদিকে ব্রোঞ্জে নির্মিত ‘ড্যান্সিং গার্ল’ মূর্তিটি সূক্ষ্ম কারুশিল্প ও নান্দনিকতার এক অসাধারণ উদাহরণ। টেরাকোটা খেলনা, গহনা, পুথি ও অলংকারে যে সূক্ষ্মতা দেখা যায়, তা প্রমাণ করে তাদের সৃজনশীলতা ও নান্দনিক রুচি ছিল অত্যন্ত উন্নত।

তবে মহেঞ্জোদারোর সবচেয়ে বড় রহস্য এর ভাষা। সিলমোহরে উৎকীর্ণ সিন্ধু লিপি এখনো পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এসব সিলমোহরে বিভিন্ন প্রাণীর চিত্র—বিশেষ করে একশৃঙ্গ প্রাণী—এবং প্রতীক দেখা যায়। ধারণা করা হয়, এগুলো বাণিজ্যিক লেনদেন, ধর্মীয় বিশ্বাস বা প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার হতো। কিন্তু ভাষার অজানা রয়ে যাওয়া এ সভ্যতাকে আরো রহস্যময় করে তুলেছে।

গবেষকদের মতে, এখন পর্যন্ত মহেঞ্জোদারোর মাত্র ১০ শতাংশ অংশ খনন করা হয়েছে। সাম্প্রতিক জরিপে ধারণা করা হচ্ছে, নগরীর বিস্তৃতি আরো অনেক দূর পর্যন্ত ছিল—সম্ভবত সিন্ধু নদীর তলদেশ এবং বর্তমান বিমানবন্দর এলাকার বাইরেও। অর্থাৎ এখনো বহু নিদর্শন মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। তবে নতুন করে খননের আগে সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি, কারণ উন্মুক্ত স্থাপনাগুলো প্রাকৃতিক ক্ষয়ের মুখে দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

নগরীর পতন সম্পর্কে বিভিন্ন মত রয়েছে। অনেকে মনে করেন, বারবার বন্যা ও পরিবেশগত পরিবর্তনের ফলে বাণিজ্য ব্যাহত হয় এবং ধীরে ধীরে নগরবাসী অন্যত্র সরে যায়। আজও বন্যা ও লবণাক্ততা এ ঐতিহ্যবাহী স্থানের প্রধান হুমকি। মাটির লবণাক্ত উপাদান ইটের ভেতর দিয়ে ওপরে উঠে স্ফটিক আকারে জমে দেয়ালকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করছে। সাম্প্রতিক মৌসুমি বন্যায় বহু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং উচ্চ জলস্তর নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে জটিল করে তুলেছে।

সংরক্ষণে প্রয়োজন নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। কিন্তু জনবল সংকট, প্রশাসনিক জটিলতা ও পর্যাপ্ত তহবিলের অভাব সংরক্ষণ কার্যক্রমকে দুর্বল করে দিয়েছে। অনেক সময় প্রয়োজনীয় কাজ সময়মতো না হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি বেড়ে যায়। ফলে শতবর্ষ আগে আবিষ্কৃত এ বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান আজও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

পর্যটনের ক্ষেত্রেও উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে। পর্যাপ্ত তথ্যফলক, ডিজিটাল প্রদর্শনী, ত্রিমাত্রিক মডেল বা পুনর্নির্মিত দৃশ্য উপস্থাপন করলে দর্শনার্থীরা প্রাচীন নগরজীবন সম্পর্কে আরো পরিষ্কার ধারণা পেতে পারেন। জাদুঘর ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এ স্থানের গুরুত্ব তুলে ধরতে সহায়ক হতে পারে। মহেঞ্জোদারো কেবল ইতিহাসের স্মারক নয়; এটি জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক পর্যটনের এক সম্ভাবনাময় কেন্দ্র।

মহেঞ্জোদারো আমাদের শেখায়, সভ্যতার প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে সুশৃঙ্খল নগর-পরিকল্পনা, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংগঠনে। সমসাময়িক অনেক সভ্যতা যেখানে বিশাল স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে মনোযোগী ছিল, সেখানে মহেঞ্জোদারো নাগরিক জীবনের মানোন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল। এ দৃষ্টিভঙ্গিই একে আলাদা মর্যাদা দেয়।

আসরার আবেদিন: প্রাবন্ধিক