পরে ১৮০৯ সালে ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড মিন্টোর জারি করা সনদের মাধ্যমে এর নাম পরিবর্তন করে ‘ব্যাংক অব বেঙ্গল’ রাখা হয়। এটি ছিল ভারতে ব্রিটিশ আশীর্বাদপুষ্ট প্রথম আধুনিক ব্যাংকগুলোর একটি, যা উপমহাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সূচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে বাংলার প্রাথমিক অর্থনৈতিক ইতিহাসে ব্যাংকটির অবদান ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এটি বাংলায় আর্থিক লেনদেনকে সংগঠিত ও আধুনিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে সহায়তা করে।
বেঙ্গল ব্যাংক পরিচালকদের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় ১৮০৯ সালের ২ জানুয়ারি। এ সভায় উপস্থিত পরিচালকরা হলেন আরডব্লিউ কক্স, এসজি টাকার, উইলিয়াম এগারটন, এ কলভিন, জেডব্লিউ ফুলটন, জি টেইলার, জন পামার, জেমস আলেকজান্ডার ও মহারাজা সুকুময় রায়।
পরিচালকরা মিস্টার টাকারকে সভাপতি, মিস্টার হর্টনকে সচিব ও কোষাধ্যক্ষ এবং রামচন্দ্র রায়কে খাজাঞ্চি (আর্থিক ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা) হিসেবে নিয়োগ দেন।
এছাড়া সিদ্ধান্ত হয় ব্যাংক অব কলকাতার কর্মীদের ব্যাংক অব বেঙ্গলের কাজে নিয়োগ দেয়া হবে।
আরো সিদ্ধান্ত হয় পরিচালকদের সভা সপ্তাহে দুবার সোম ও বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় অনুষ্ঠিত হবে। কোষাধ্যক্ষকে অনুমতি দেয়া হয় তিনি উপযুক্ত সরকারি সিকিউরিটি বা স্বর্ণের বিপরীতে মধ্যবর্তী দিনে ঋণ প্রদান করতে পারবেন।
গভর্নর জেনারেল লর্ড মিন্টো ব্যাংকের একটি সনদে স্বাক্ষর করেন। সনদটি সে সময়কার আর্থিক ও মুদ্রানীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এতে উল্লেখযোগ্য কিছু শর্ত ছিল। যেমন একজন শেয়ারহোল্ডার সর্বোচ্চ ১ লাখ রুপি শেয়ার রাখতে পারবে, যাতে ব্যাংকটি কয়েকজন একচেটিয়া মালিকের হাতে না পড়ে।
সরকারকে ঋণ দেয়ার সীমা নির্ধারণের বিষয়টি ছিল জটিল। এ প্রসঙ্গে মিস্টার ব্রুনিয়েট তার ‘অ্যাকাউন্ট অব দ্য প্রেসিডেন্সি ব্যাংকস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন ‘নিয়মটি সম্ভবত ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের নীতিমালা থেকে গ্রহণ করা হয়েছিল। ১৬৯৫ সালের আইন অনুযায়ী ব্যাংক অব ইংল্যান্ড পার্লামেন্টের অনুমতি ছাড়া ব্যাংক সরকারকে ঋণ দিতে পারত না। এ নিয়ম শুধু ব্যাংকের ক্ষমতাই নয়, রাজশক্তির ক্ষমতাকেও সীমিত করেছিল। পরবর্তী সময়ে উইলিয়াম পিট ১৭৯৩ সালে এ বিধান শিথিল করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকটি আর্থিক সংকটে পড়ে। সে অভিজ্ঞতা থেকেই ব্যাংক অব বেঙ্গলের প্রতিষ্ঠাতারা সতর্ক ছিলেন। আরো একটি বিষয় হলো ১৮৩৯ সালে সুদের আইনে পরিবর্তন আনার আগ পর্যন্ত ব্যাংক অব ইংল্যান্ড ৫ শতাংশের বেশি সুদ নিতে পারত না। এভাবে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড থেকে ব্যাংক অব বেঙ্গল গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতাগুলো গ্রহণ করেছিল।’
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল—ব্যাংকের মোট দায় (নোট ইস্যু, আমানতসহ) ৫০ লাখ সিক্কার (সমকালীন মুদ্রা) মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। এটি ছিল ব্যাংকের মূলধনের সমান। এছাড়া বছরে দুবার শেয়ারহোল্ডারদের সভা করার বিধান করা হয়।
১৮০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি সরকার আদেশ দেয়, ব্যাংকের নোটের বিপরীতে নিরাপত্তা (গ্যারান্টি) হিসেবে ২০ লাখ সিক্কা জমা রাখতে হবে, যাতে মানুষ নিশ্চিন্তে ওই নোট ব্যবহার করতে পারে। সে বছরের মার্চে ব্যাংক লবণ ও আফিমের বিপরীতে ঋণ দেয়ার অনুমতি চায়, যা মঞ্জুর করা হয়।
প্রথম দিকের বছরগুলোয় ব্যাংকের কার্যক্রম মোটামুটি নির্বিঘ্নে চললেও কিছু ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যেমন ১৮১১ সালে ৫০০ সিক্কার একটি জাল নোট পাওয়া গেলে পরিচালকরা সিদ্ধান্ত নেন জনস্বার্থে সেটি পরিশোধ করা হবে। কারণ তা না করলে ব্যাংক নোটের প্রতি আস্থা কমে যেতে পারে।
ব্যাংক অব বেঙ্গলের কাগজের মুদ্রা চালু ও তার প্রভাব
১৮১২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ব্যাংক অব বেঙ্গল ভারতীয় উপমহাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয়। তারা প্রথমবারের মতো কাগুজে মুদ্রা চালু করে। এ উদ্যোগ শুধু লেনদেনের পদ্ধতিতেই পরিবর্তন আনেনি, বরং আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কাগুজে মুদ্রা চালুর আগে উপমহাদেশে অর্থনৈতিক লেনদেন প্রধানত স্বর্ণ, রুপা ও তামার মুদ্রার মাধ্যমে হতো। মোগল শাসনামলে রুপার মুদ্রা ছিল একটি স্থিতিশীল ও বহুল ব্যবহৃত মুদ্রা। কিন্তু মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পর অর্থনৈতিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের ফলে একটি নতুন ও কার্যকর মুদ্রা ব্যবস্থার প্রয়োজন দেখা দেয়।
ব্যাংক অব বেঙ্গল প্রথম দিকে ২৫০ ও ৫০০ সিক্কার নোট চালু করে। এগুলো ছিল মূলত প্রতিশ্রুতিপত্র, যেখানে ব্যাংক নির্দিষ্ট মূল্য পরিশোধের নিশ্চয়তা দিত। নোটগুলোর নকশায় বাংলা, ফারসি ও হিন্দি ভাষার ব্যবহার এবং শৈল্পিক অলংকরণ ছিল, যা তৎকালীন সমাজের বহুসাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরত। পরবর্তী সময়ে ১০, ৫০ ও ১০০ সিক্কাসহ বিভিন্ন মূল্যমানের নোট চালু হয়, যা লেনদেনকে আরো সহজ ও বহুমুখী করে তোলে।
ব্যাংক অব বেঙ্গলের কাগুজে মুদ্রা চালু অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে। ভারী ধাতব মুদ্রার পরিবর্তে হালকা কাগুজে নোট ব্যবহারে ব্যবসা-বাণিজ্য দ্রুত ও সহজ হয়। বৃহৎ অংকের লেনদেন সহজ হওয়ায় অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়ে। একটি নির্ভরযোগ্য বিনিময়মাধ্যম গড়ে ওঠে, যা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কমাতে সহায়ক হয়। গ্রামাঞ্চলেও লেনদেনের গতি বাড়ে, কারণ কাগুজে মুদ্রা বহন করা সহজ ছিল।
বার্ষিক ব্যয় বৃদ্ধি
১৮১৯ সালে শেয়ারহোল্ডারদের এক বিশেষ সভায় ব্যাংকের বার্ষিক ব্যয়ের সীমা ৩০ হাজার সিক্কা টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ হাজার করা হয়। এ খরচ বাড়ানোর একটি প্রধান কারণ হিসেবে পরিচালকরা উল্লেখ করেন তখন কলকাতায় বাড়ি ভাড়া বেড়ে গিয়েছিল।
ব্যাংকের মূলধন বাড়ানোর প্রচেষ্টা
ওপরের ঘটনাগুলোর প্রায় তিন বছর পর ১৮২২ সালের জুনে ব্যাংকের পরিচালকরা তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড হেস্টিংসের কাছে একটি চিঠি দেন। এতে তারা ব্যাংকের মূলধন ৫০ লাখ সিক্কা থেকে বাড়িয়ে ১ কোটি সিক্কা করার প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি সনদের কিছু পরিবর্তনের কথাও বলেন।
মূলধন বাড়ানোর বিষয়ে পরিচালকরা ব্যাখ্যা করে জানান ১৮০৬ সালের পর থেকে কলকাতার জনসংখ্যা ও বাণিজ্য অনেক বেড়েছে। তখন (১৮০৬ সালে) ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সময় ৫০ লাখ সিক্কার মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছিল। সে সময় এ টাকা হয়তো প্রয়োজনের চেয়েও বেশি ছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম হয়ে গেছে।
আসলে ১৮০৬ সালে ৫০ লাখ সিক্কার পুরোটা ব্যাংকিং কাজে লাভজনকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। এর একটি অংশ সরকারি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ করা হয়েছিল। এরপর ১৮০৯-১০ সালে বাণিজ্যে মন্দা দেখা দেয়, ফলে ঋণের চাহিদাও কম ছিল।
কিন্তু পরে বাণিজ্য আবার বাড়তে শুরু করলে কলকাতার ব্যবসায়িক পরিবেশ বদলে যায়। তখন থেকে প্রায়ই এমন পরিস্থিতি হয়েছে ব্যাংক অব বেঙ্গল প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণ দিতে পারেনি। ফলে ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়েন।
তবে সবসময় চাহিদা একরকম ছিল না—কখনো অর্থ কাজে লাগানোর সুযোগ কম ছিল, আবার কখনো চাহিদা বেশি ছিল। অর্থাৎ, বাণিজ্যে ওঠানামা চলতেই থাকত।
তবু সমকালীন অভিজ্ঞতা বিশেষ করে নিজেদের ব্যাংক ও কলকাতার অন্যান্য ব্যাংকের অবস্থা দেখে পরিচালকদের মনে হয়েছে তাদের ঋণ দেয়ার ক্ষমতা সীমিত। নতুন ব্যাংক গড়ে ওঠাও এর প্রমাণ। এ কারণেই তারা মনে করেন তখনই ব্যাংকের মূলধন বাড়ানোর আবেদন করা যথাযথ সময়। এর জবাবে সরকার ব্যাংকে একটি চিঠি পাঠায়। সেখানে ব্যাংকের পরিচালকদের মতামতকে পুরোপুরি সমর্থন করা হয়নি।
১৮২৩ সালে সনদ নবায়ন
উপরোক্ত আলোচনা ও মতবিনিময়ের পর সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যাংক অব বেঙ্গলের সনদ ১৮২৩ সালে নবায়ন করা হয়। নতুন সনদে আগের বেশির ভাগ শর্তই বহাল রাখা হয়। অবশ্য কিছু সংশোধনী অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এ নবায়নের মাধ্যমে ব্যাংকের কার্যক্রম আরো কয়েক বছরের জন্য স্থিতিশীলতা লাভ করে এবং পরিচালকদের প্রস্তাবিত পরিবর্তনের একটি অংশ বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়। তবে সরকার ব্যাংকের সব প্রস্তাব মেনে নেয়নি।
জালিয়াতি ও তার প্রভাব
১৮২৩ সালের দিকে ব্যাংকের বিরুদ্ধে একটি জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। ফলে ১৮২৪ সালের লভ্যাংশ কমিয়ে আড়াই শতাংশ করা হয়। ঘটনাটি ছিল এমন— একটি কোম্পানির ঋণের কাগজ (যার ভিত্তিতে ব্যাংক ৪০ হাজার সিক্কা দিয়েছিল) চুরি হয়ে যায়। পরে সে একই কাগজ আবার ব্যাংকের কাছেই বন্ধক রেখে টাকা নেয়ার চেষ্টা করা হয়। কীভাবে কাগজটি সিন্দুক থেকে বের হলো, তা ব্যাংকের সেক্রেটারি বা পরিচালকরাও বুঝে উঠতে পারেননি। তখন ব্যাংকের খাজাঞ্চি ও সেক্রেটারির কাছে লোহার সিন্দুকের চাবি থাকত। তবু কীভাবে কাগজটি চুরি হলো, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
পুলিশ সন্দেহ করেছিল খাজাঞ্চির এক সহকারীকে, কিন্তু প্রমাণ না থাকায় আদালতে এ-সংক্রান্ত মামলা খারিজ হয়ে যায়। এ বছর মিস্টার হেন্ডারসন অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে নিয়োগ পান। এ ঘটনার ফলে ব্যাংকের লাভ কমে যায় এবং সংশ্লিষ্ট বছরে শেয়ারহোল্ডারদের প্রদত্ত লভ্যাংশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
১৮২৫: সম্প্রসারণের সূচনা ও নতুন ভবন
১৮২৫ সালে ব্যাংক প্রথমবারের মতো কলকাতার বাইরে কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। বাণিজ্যের প্রসার ও পশ্চিমাঞ্চলে অর্থ প্রেরণের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে বেনারসে একজন এজেন্ট নিয়োগের প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়, যা পরে সরকার অনুমোদন করে। এর মাধ্যমে ব্যাংক তার কার্যক্রমের ভৌগোলিক বিস্তৃতি শুরু করে।
একই বছরে ব্যাংক একটি নতুন ভবন নির্মাণ করে, যার ব্যয় ছিল প্রায় ৬১ হাজার ৫০০ সিক্কা।
১৮২৬ সালে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল—সরকার ব্যাংকের সেক্রেটারিকে গ্র্যান্ড জুরিতে (বড় জুরি সদস্য হিসেবে কাজ করা) অংশ নেয়া থেকে অব্যাহতি দেয়। ১৮২৭ সালে ব্যাংক প্রথমবার ‘পোস্ট বিল’ নামে একটি আর্থিক সেবা চালু করে, যার অনুমতি সরকার আগেই দিয়েছিল।
এছাড়া ওই বছরই ব্যাংক একটি সিদ্ধান্ত নেয়, জনসাধারণের সুবিধার জন্য একটি আলাদা কক্ষ রাখা হবে, যেখানে সরকারের ইস্যু করা ঋণপত্র বা বন্ডের লেনদেন করা যাবে। প্রতিদিন বেলা ২টা-৩টা পর্যন্ত এ কক্ষ খোলা থাকবে। যারা এসব লেনদেন করতে চান, তারা সেখানে এসে একসঙ্গে কাজ করতে পারবেন।
১৮৩০ সালের জালিয়াতি: একটি বড় সংকট
১৮৩০ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিস্টার জেএ ডোরিনকে (সিভিল সার্ভিস অফিসার) ব্যাংকের সেক্রেটারি ও ট্রেজারার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি ১৮২৬ সাল থেকে মিস্টার গ্লাসের স্থলে একই পদে অস্থায়ীভাবে কাজ করছিলেন। এ সময় (১৮৩০ সালে) ব্যাংক আবারো একটি বড় ধরনের জালিয়াতির সম্মুখীন হয়। রাজকিশোর দত্ত নামের এক ব্যক্তি জাল সরকারি ঋণপত্র ব্যবহার করে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ সিক্কা ঋণ গ্রহণ করে। কাগজপত্রগুলো এতটাই নিখুঁতভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল যে ব্যাংকের কর্মকর্তারা প্রথমে তা শনাক্ত করতে পারেননি। পরে একই নম্বরের ঋণপত্র পুনরায় উপস্থাপিত হলে জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ পায়। শেষ পর্যন্ত যখন ডুপ্লিকেট নম্বরগুলো যাচাই করা হয়। তখন দেখা যায় ব্যাংকে জমা দেয়া কাগজগুলো আসলে জাল ছিল। সমস্যা আরো জটিল হয়, কারণ স্বাক্ষরগুলো এত নিখুঁতভাবে নকল করা হয়েছিল যে যেসব সরকারি কর্মকর্তার নাম ছিল, তারাও নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি এগুলো ভুয়া।
এ ঘটনায় ব্যাংক বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। সরকার এর বিপরীতে ক্ষতিপূরণ দিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং ব্যাংক আদালতের দ্বারস্থ হলেও সাফল্য পায়নি। শুধু তা-ই নয়, বিষয়টি ইংল্যান্ডের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ডিরেক্টরদের কাছে পাঠানো হয়। ১৮৩৪ সালে কোম্পানি ব্যাংকের দাবি নাকচ করে দেয়। প্রিভি কাউন্সিলেও আপিল করে কোনো প্রতিকার মেলেনি। ফলে ওই বছর শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ প্রদান করা সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি ব্যাংকের শেয়ারের বাজারমূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। লভ্যাংশ না দেয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে ব্যাংকের শেয়ারের দাম ৬ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ এবং পরে ৪ হাজার সিক্কায় নেমে যায়। বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, তবে এটি সাময়িক ছিল। পরে যারা কম দামে শেয়ার কিনেছিলেন, তারা লাভবান হন এবং পরের বছর দাম আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।
এর পরও বিষয়টি শেষ হয়নি। ১৮৩৫ সালের জানুয়ারিতে ব্যাংকের পরিচালকেরা গভর্নর জেনারেলের কাছে আবেদন করে বলেন, প্রিভি কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের কারণে শেয়ারহোল্ডাররা বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তাই সরকার যেন ন্যায্য ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেয়।
এরপর ১৮৩৬ সালের মার্চে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ডিরেক্টররা এর জবাব দেন। তারা জানান, তারা ব্যাংকের ক্ষতির প্রতি সহানুভূতিশীল। কিন্তু আদালতের রায় তারা বদলাতে পারবেন না। তাদের মতে, এ ক্ষতির জন্য ব্যাংকও কিছুটা দায়ী। কারণ ব্যাংক অব বেঙ্গল কর্তৃপক্ষ অনিয়ম রোধে যথেষ্ট সতর্ক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। আবার ব্যাংকের কর্মচারীদের দিক থেকেও কোনো দোষ স্বীকার করা হয়নি।
১৮৩৭: নতুন ব্যাংক পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্ক এবং ১৮৩৮ সালের মূলধন বৃদ্ধি
১৮৩৭ সালে একটি নতুন ধরনের ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে ব্যাংক অব বেঙ্গলের পরিচালকরা এ পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন। তাদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ বিদ্যমান ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। শেয়ারহোল্ডাররাও পরিচালকদের এ মতামত সমর্থন করেন। ফলে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন হয়নি।
১৮৩৮ সালে ব্যাংকের মূলধন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়। আগে ৭৫ লাখ সিক্কা টাকা মূলধন থাকলেও তা বাড়িয়ে ১ কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার সিক্কা টাকা নির্ধারণ করা হয়। এ বৃদ্ধি ব্যাংকের কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও বর্ধিত বাণিজ্যিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে গৃহীত হয়।
১৮৩৯: নতুন আইন ও কাঠামোগত পরিবর্তন
১৮৩৯ সালে একটি নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়, যা ব্যাংকের পূর্ববর্তী সনদকে প্রতিস্থাপন করে। এ আইনের মাধ্যমে ব্যাংকের কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়।
নতুন বিধান অনুযায়ী—
- ব্যাংকের বার্ষিক ব্যয়ের সীমা বাড়িয়ে ৬০ হাজার সিক্কা করা হয়।
- একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণ প্রদানের সর্বোচ্চ সীমা ১ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ সিক্কা করা হয়।
- ব্যাংকের নোট ইস্যুর সীমা নির্ধারণ করা হয় ২ কোটিতে।
- একটি রিজার্ভ ফান্ড গঠনের অনুমতি দেয়া হয়, তবে তা ব্যাংকের মূলধনের ৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।
- শাখা ব্যাংক স্থাপনের অনুমোদন দেয়া হয়।
- এ আইন ১ মে ১৮৪৬ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে এবং এরপর পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত তা বহাল থাকবে।
- এ আইন কার্যকর থাকার ফলে ব্যাংকের কার্যক্রম আরো সুসংগঠিত ও আধুনিক রূপ লাভ করে।
১৮০৯-৩৯ সালে ব্যাংক অব বেঙ্গলের বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটি নানা চ্যালেঞ্জ, বিশেষত জালিয়াতি ও আর্থিক সংকট মোকাবেলা করেও ধীরে ধীরে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছে। মূলধন বৃদ্ধি, নতুন নীতিমালা প্রণয়ন ও কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে ব্যাংকটি তখন উপমহাদেশের একটি প্রধান আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
তথ্যসূত্র:
১. জিপি সাইমেস স্কাটের ‘দ্য হিস্ট্রি অব দ্য ব্যাংক অব বেঙ্গল: অ্যান ইপিটম অব আ হানড্রেড ইয়ারস অব ব্যাংকিং ইন ইন্ডিয়া’ শীর্ষক গ্রন্থ।
২. অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম সম্পাদিত ‘বাংলাপিডিয়া’র অনলাইন সংস্করণ।
৩. ইন্ডিয়া টুডেতে প্রকাশিত ‘হোয়েন দ্য ব্যাংক অব বেঙ্গল ইস্যুড ইন্ডিয়াস ফার্স্ট পেপার কারেন্সি ইন ১৮১২’ শীর্ষক প্রতিবেদন, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪।
বাশার খান: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা









