এ বিবর্তনের কেন্দ্রে ছিল ‘ব্যাংক অব বেঙ্গল’। ১৮৩৯-৫৯ সালের দুই দশক কেবল ব্যবসায়িক মুনাফার হিসাব ছিল না। এটি ছিল বিদ্রোহের আগুন, অভ্যন্তরীণ জালিয়াতি ও প্রশাসনিক দ্বন্দ্বে পোড়া একটি প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার লড়াই। বর্তমানে আধুনিক ব্যাংকিংয়ের যে স্বচ্ছতা ও পেশাদারত্ব আমরা দেখি, তার কঠিন শৈশব রচিত হয়েছিল সেই দুই দশকের রোমাঞ্চকর ও সংকটময় অভিজ্ঞতায়।

ব্যাংক অব বেঙ্গলের প্রথম বড় পদক্ষেপ ছিল মফস্বলে ব্যবসা বিস্তারের উদ্যোগ নেয়া। কলকাতার নিরাপদ সীমানা ছাড়িয়ে বাণিজ্যের গভীরে যাওয়ার প্রথম রোমাঞ্চকর পরীক্ষাটি শুরু হয় ১৮৩৯ সালে। উত্তর ভারতের তুলা ও শস্য বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র মির্জাপুরে ব্যাংক অব বেঙ্গল তাদের প্রথম শাখা বা ‘এজেন্সি’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। ক্লড হ্যামিলটনকে এ শাখার প্রথম এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল।

আজকের দিনে অর্থ স্থানান্তর ১ সেকেন্ডের ব্যাপার হলেও তখন কলকাতা থেকে মির্জাপুরে নৌকাযোগে অর্থ পৌঁছাতে সময় লাগত প্রায় পাঁচ-ছয় সপ্তাহ। অন্যদিকে নদীপথে ডাকাত আর ঝড়-বৃষ্টির আতঙ্ক ছিল নিত্যসঙ্গী। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রথম ছয় মাসে প্রায় ১৩ হাজার ৭৯১ রুপি মুনাফা করে ব্যাংকটির এ শাখা তার প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করেছিল। সেই থেকে মফস্বল এলাকায় ব্যাংকের শাখা স্থাপন শুরু হয়।

সে সময়ের যোগাযোগ ব্যবস্থা আর নিরাপত্তার অভাব ব্যাংকটিকে বারবার ভাবিয়ে তুলছিল। ব্যবসায়িক দিক থেকে শাখাটি লাভের মুখ দেখলেও অপারেশনাল জটিলতা ও দূরবর্তী নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতার কারণে শেষ পর্যন্ত ১৮৪৮ সালের জানুয়ারিতে মির্জাপুর এজেন্সিটি বন্ধ করে দেয়া হয়। তবে বন্ধ হয়ে গেলেও ভারতীয় ব্যাংকিং ইতিহাসে এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

মির্জাপুর এজেন্সির বন্ধ হওয়াটা ব্যাংকের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রার পথে কোনো চিরস্থায়ী অন্তরায় বা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বরং এটি ছিল প্রতিষ্ঠানটির একটি কৌশলগত বিরতি। ব্যাংকটির পরিসর যখন আরো বিস্তৃত হচ্ছে, তখন তার প্রশাসনিক নেতৃত্ব নিয়েও শুরু হয় টানাপড়েন। তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী, ব্যাংকের সচিব হতেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উচ্চপদস্থ সরকারি আমলারা।

e3

মেজর উইলিয়াম এরস্কিন ১৮৫৭ সালে দশ রুপির এই নোট চালু করেন ছবি: এনডব্লিউবি ব্লগ

১৮৩৯ সালে সচিব জর্জ উদনির পদত্যাগের পর আমানতকারীরা দাবি তোলেন, ব্যাংক পরিচালনার ভার সরকারি আমলার বদলে কোনো পেশাদার বাণিজ্যিক ব্যাংকারকে দিতে হবে। অংশীদারদের চাপে ১৮৪০ সালে টমাস ব্র্যাকেনকে নিয়োগ দেয়া হয়। ব্রিটিশ সরকার এ সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে তাদের পক্ষ থেকে দেয়া সচিবের বেতন বন্ধ করে দেয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, আমলাদের বদলে ব্যবসায়িক লোক বসালে সরকারি আস্থায় ফাটল ধরতে পারে। এমনকি কাগজের নোটের লেনদেনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

কিন্তু তখনকার ছয়জন মার্চেন্ট ডিরেক্টর তাদের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। তাদের এ অনড় অবস্থান স্পষ্ট করে যে ব্যাংক অব বেঙ্গল কেবল ব্রিটিশ শাসনের আজ্ঞাবহ কোনো সরকারি দপ্তর বা ফাইলবন্দি কার্যালয় নয়। বরং এটি একটি স্বাধীন বাণিজ্যিক সত্তা, যা আমলাতন্ত্রের খোলস ছেড়ে পেশাদারত্বের শক্তিতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছে। তাদের এ জেদই ব্যাংকটিকে ভবিষ্যতে একটি আধুনিক স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের বীজ বুনে দিয়েছিল।

১৮৪০ সালের মাঝামাঝি সময়ে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা চরমে ওঠে। ক্যাশ শাখা থেকে ৩৪ হাজার রুপির মতো বড় অংকের অর্থ লোপাট হওয়ার ঘটনায় জনমনে আস্থার সংকট দেখা দেয়। সে সময়ের অনেক ছোট ছোট ব্যাংক তখন দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছিল। এ ধাক্কা সামলাতে ১৮৫৫-৫৬ সালে ব্যাংকটি এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেয়। বেঙ্গল চেম্বার অব কমার্সের অনুরোধে তারা প্রতি সপ্তাহে ব্যাংকের স্বর্ণ ও রুপার রিজার্ভ এবং প্রচলিত নোটের পরিমাণ সংবাদপত্রে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয়। যদিও সরকার তখন তাদের নিজস্ব ট্রেজারি রিপোর্ট দিতে রাজি ছিল না। কিন্তু ব্যাংক অব বেঙ্গল স্বচ্ছতার নতুন এ মানদণ্ড তৈরি করে দেয়।

১৮৫৬ সালের জানুয়ারিতে এ সাপ্তাহিক স্টেটমেন্ট প্রকাশ করা শুরু হয়। ১৮৫৭ সাল থেকে নিয়মিত অর্ধবার্ষিক রিপোর্ট প্রকাশ শুরু হয়। আজকের আধুনিক ব্যাংকিংয়ে আমরা যে জবাবদিহির কথা বলি, তার ভিত্তি ছিল এ সাপ্তাহিক ও ষাণ্মাসিক হিসাব প্রকাশের রীতি।

অন্যদিকে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ ব্যাংক অব বেঙ্গলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা হয়ে আসে। পুরো ভারত যখন উত্তাল, তখন কলকাতার আমানতকারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কাগজের নোটের ওপর মানুষের বিশ্বাস এমনভাবে উবে যায় যে তারা দলে দলে ব্যাংকে ভিড় করে কাগজের নোটের বদলে রৌপ্য মুদ্রা দাবি করতে থাকেন। পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে ৪ শতাংশ সুদের সরকারি বন্ডের দামও তখন ২৫ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে যায়। এ ‘ব্যাংক রান’ পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৮৫৭ সালের জুনে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ৫৩তম রেজিমেন্টের সশস্ত্র প্রহরীদের মোতায়েন করা হয়। সে সময় ভল্টের প্রবেশপথে রাত-দিন চলত সৈনিকদের বুটের শব্দ। উত্তাল সে সময়েও ব্যাংক তার দরজা খোলা রেখেছিল।

বিদ্রোহের সে বছরে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে অর্থবাজার এতটাই সংকীর্ণ হয়ে পড়েছিল যে জামানত থাকা সত্ত্বেও ব্যাংক নতুন ঋণ দিতে পারছিল না। তখন সরকারি ও বাণিজ্যিক পরিচালকদের মধ্যে নীতিগত বিরোধ দেখা দেয়। সরকারি পক্ষ চাইছিল কঠোরভাবে ঋণের রাশ টেনে ধরতে, অন্যদিকে ব্যবসায়িক পরিচালকরা চাইছিলেন কিছুটা নমনীয় হতে। শেষ পর্যন্ত কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমেই ব্যাংকটি নিজেকে দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে বাঁচায়। বিস্ময়করভাবে এত ঝামেলার মধ্যেও ১৮৫৭ সালের শেষে ব্যাংকটি সাড়ে ১৪ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়।

WhatsApp-Image-2026-04-27-at-3.31

ব্যাংক অব বেঙ্গল; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি ছবি

বিদ্রোহের ডামাডোলে ব্যাংকের ভেতরেও এক অভিনব অপরাধ ডানা মেলেছিল। ১৮৫৮ সালে দেখা যায় নোট বিনিময় বিভাগের কয়েকজন কর্মচারী সুকৌশলে বাতিল করা নোটের বান্ডিল থেকে ভালো নোট সরিয়ে নিয়ে জালিয়াতি করছেন। এ জালিয়াতিতে প্রায় ২০ হাজার ১০০ রুপি হারিয়ে যায়।

এ ঘটনায় ব্যাংক দ্রুত প্রশাসনিক সংস্কার আনে। এর পর পরই নোটে স্বাক্ষর করার পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আনা হয়। নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা করা হয় আগের চেয়েও কঠোর। সেক্রেটারি, ডেপুটি সেক্রেটারি ও অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছাড়া ডিরেক্টরদের স্বাক্ষরের নিয়ম বাতিল করা হয়।

১৮৩৯-৫৯ সালের মধ্যে ভারতের ব্যাংকিং মানচিত্র বদলে যায়। ব্যাংক অব বোম্বে বা ব্যাংক অব মাদ্রাজ ছাড়াও অনেক বেসরকারি ব্যাংকের জন্ম হয় এ সময়ে। কিন্তু ব্যাংক অব বেঙ্গল যে দৃঢ়তার সঙ্গে টিকে ছিল, অনেকে তা পারেনি। সে সময়ে নর্থ-ওয়েস্টার্ন ব্যাংক, দিল্লি ব্যাংকিং করপোরেশন কিংবা ওরিয়েন্টাল ব্যাংকিং করপোরেশনের মতো অনেক প্রতিষ্ঠানের উত্থান ঘটেছিল। কিন্তু এর মধ্যে অনেকেই বাজার সংকটে বিলুপ্ত হয়ে যায়। যেমন ১৮৫৭ সালে লন্ডন অ্যান্ড ইস্টার্ন ব্যাংকের পতনের খবর যখন ‘ইলেকট্রিক টেলিগ্রাফে’ কলকাতায় পৌঁছে, তখন বাজারে রীতিমতো হাহাকার পড়ে গিয়েছিল। বেনারস ব্যাংকের মতো অনেক প্রতিষ্ঠান যখন দেউলিয়া হয়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, তখন ঢাকা ব্যাংকের মতো অনেক সফল প্রতিষ্ঠানও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ব্যাংক অব বেঙ্গলের বিশাল ছাতার নিচে একীভূত হতে বাধ্য হয়েছিল।

১৮৫৯ সালে ব্যাংক অব বেঙ্গলের দীর্ঘদিনের সেক্রেটারি জেবি প্লাম্ব পদত্যাগ করেন। এ সময় নতুন সচিব হিসেবে নিয়োগ পান ইংল্যান্ডের ক্যালিডোনিয়ান ব্যাংকিং কোম্পানির অভিজ্ঞ ব্যাংকার জর্জ ডিকসন। এটি ছিল ব্যাংকিংয়ের চূড়ান্ত পেশাদারীকরণের দিকে এক বড় পদক্ষেপ।

১৮৩৯-৫৯ সাল পর্যন্ত দুই দশকের বন্ধুর পথচলা কেবল একটি ব্যাংকের টিকে থাকার লড়াই ছিল না, বরং তা ছিল উপমহাদেশের গোটা ব্যাংকিং ব্যবস্থার এক অগ্নিপরীক্ষা। মির্জাপুর এজেন্সির প্রথম নৌকাযাত্রা থেকে শুরু করে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সময় ভল্টে সশস্ত্র প্রহরার সেই রুদ্ধশ্বাস দিনগুলো—প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল আধুনিক অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের একেকটি শক্ত ভিত।

বহু ব্যাংকের উত্থান ও পতন প্রত্যক্ষ করার এ কালখণ্ডে ব্যাংক অব বেঙ্গল যে সততার সঙ্গে সাপ্তাহিক খতিয়ান প্রকাশের প্রথা চালু করেছিল তা তাকে একটি সুদৃঢ় মহীরুহে পরিণত করেছিল। মূলত এর শুরু কঠিন যাত্রা আর দুঃসাহসিক বিবর্তনের পথ ধরেই আজকের আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার জয়যাত্রা শুরু হয়। এ কারণেই শেষ পর্যন্ত এটি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম ব্যাংকিং মহীরুহ ‘স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া’র পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিল।

মাহফুজা মিম: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা