সে সময়ের উত্তাল রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রেক্ষাপটে ব্যাংকটি কীভাবে তার প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তন করেছিল এবং আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছিল, তার ইতিহাস অত্যন্ত ঘটনাবহুল।

মিস্টার হার্ডির অবসরের পর ১৮৮৭ সালের ১৪ জুলাই ব্যাংকটির সেক্রেটারি ও কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন মিস্টার ক্রুইকশ্যাঙ্ক। তখনই ব্যাংকটি এক নতুন যুগে পদার্পণ করে। বিশেষ করে ১৮৯০-৯২ সালের মধ্যবর্তী সময়ে রুপির বিনিময় মূল্যের অনিশ্চয়তা এবং বাজারে অর্থের চাহিদার তীব্র ওঠানামা সত্ত্বেও ব্যাংক তার বাণিজ্যিক দৃঢ়তা বজায় রাখে। এ প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝেও ব্যাংক অব বেঙ্গল তার আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয় এবং পরবর্তী ১৮ বছর ধরে নিয়মিত ১০ শতাংশ লভ্যাংশ প্রদানের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখে। এ সময়ের মধ্যেই ব্যাংকের সংরক্ষিত তহবিলে প্রায় ৮০ লাখ রুপি যোগ করতে সক্ষম হয়।

​ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সংস্কার ছিল সে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে পরিচালকদের পারিশ্রমিক বা ফি অপরিবর্তিত থাকার পর ১৮৮৯ সালে গভর্নর জেনারেল ইন কাউন্সিলের অনুমোদনে ব্যাংকের উপবিধি বা ‘বাই-ল’ সংশোধন করা হয়। এটি অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাংকের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব ও ব্যাপকতাকে স্বীকৃতি দেয়ার একটি প্রয়াস ছিল।

সাপ্তাহিক ও দৈনিক কমিটির সভায় উপস্থিতির জন্য পরিচালকদের সম্মানী বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিকেও নজর দেয়া হয়। ১৮৮৭ সালে প্রধান কার্যালয়ের জন্য পুনরায় একজন স্থায়ী চিকিৎসা কর্মকর্তা বা মেডিকেল অফিসার নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয় এবং ডক্টর ডব্লিউ কোল্টারকে এ পদে পদায়ন করা হয়। কর্মীদের কল্যাণে ‘৫ শতাংশ বিশেষ সঞ্চয় তহবিল’ গঠন করা ছিল গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ফলে ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের ব্যাংকের প্রতি আরো অনুগত ও কর্মঠ করে তোলে।

​এ কার্যক্রম ছিল সমসাময়িক অন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য অনুকরণীয়।

১৮৮৯ সালে প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে স্থির থাকা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বেতন কাঠামো ঢেলে সাজানো হয়। সম্পাদকের বেতন মাসিক ২ হাজার ৬০০ থেকে বাড়িয়ে ৪ হাজার রুপি এবং উপসম্পাদকের বেতন ২ হাজার রুপি করা হয়। একই সঙ্গে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদের বেতনও যুগোপযোগী করা হয়। রুপির বিনিময় মূল্যের ঐতিহাসিক পতনের ফলে কর্মকর্তাদের যে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গিয়েছিল, তা মোকাবেলায় ভারত সরকারের আদলে ‘বিনিময় ক্ষতিপূরণ ভাতা’ প্রবর্তন করা হয়। পেনশনের ক্ষেত্রেও আনা হয় বড় ধরনের পরিবর্তন। ২০-৩০ বছর চাকরির পর শেষ পাঁচ বছরের গড় বেতনের একটি সম্মানজনক অংশ পেনশনের জন্য নির্ধারণ হয় এবং বার্ষিক পেনশনের সর্বোচ্চ সীমা ৭ হাজার ৫০০ রুপি পর্যন্ত উন্নীত করা হয়। এ উদ্যোগগুলো কর্মকর্তাদের ভবিষ্যৎকে যেমন সুরক্ষিত করেছিল, তেমনি তাদের পেশাদারত্ব বাড়িয়েছিল।

​সরকারের সঙ্গে ব্যাংকের সম্পর্ক কেবল ব্যবসায়িক লেনদেনে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল জাতীয় অর্থনীতি পরিচালনার অংশ। ১৮৯৪ সালে সরকার যখন ৪ শতাংশ সুদের প্রমিসরি নোটগুলোকে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে রূপান্তরের বিশাল দায়িত্ব ব্যাংকের ওপর ন্যস্ত করে, তখন ব্যাংকজুড়ে এক কর্মযজ্ঞ শুরু হয়। অন্যান্য বিভাগ থেকে জনবল সরিয়ে এনে এ কাজ সম্পন্ন করতে গিয়ে কর্মীদের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়লেও তারা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তা শেষ করেন। এ সাফল্যের জন্য গভর্নর জেনারেল ইন কাউন্সিল ব্যাংককে আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদ জানান। ১৮৯৮ সালে স্বাক্ষরিত নতুন ১০ বছর মেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে প্রধান কার্যালয় এবং শাখাগুলোয় সরকারি কাজ পরিচালনার পদ্ধতিকে একটি একক ও সুশৃঙ্খল কাঠামোর আওতায় আনা হয়। ফলে ব্যাংকিং কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা বাড়ে। যদিও ১৮৯৬ সালে সেভিংস ব্যাংক কার্যক্রম পোস্ট অফিসের অধীনে চলে যায়, তবু কারেন্সি চেস্ট বা সরকারি মুদ্রাভাণ্ডার রক্ষণাবেক্ষণের মতো স্পর্শকাতর দায়িত্ব ব্যাংকের ওপরই অর্পিত ছিল।

e1

১৮৮৬ সালে আকিয়াব শাখার একটি বিল এক্সচেঞ্জের কাগজ

​বিংশ শতাব্দীর প্রাক্কালে ভারতে একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সেন্ট্রাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিতর্কটি ছিল এ সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। ১৮৯৯ সালে সরকার প্রেসিডেন্সি ব্যাংকগুলোর ওপর আরোপিত কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করা এবং এগুলোকে একীভূত করার সুদূরপ্রসারী প্রস্তাব দেয়। ব্যাংক অব বেঙ্গল এ প্রস্তাবকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে। তৎকালীন ফাইন্যান্সিয়াল মেম্বার মিস্টার ডকিন্স এবং পরবর্তী সময়ে স্যার এডওয়ার্ড লর সঙ্গে আলোচনার সময় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করে। তারা লন্ডনের অর্থবাজার থেকে সরাসরি ঋণ নেয়ার ক্ষমতা এবং জরুরি সংকটের সময় সরকারি ‘রিজার্ভ ট্রেজারি’ বা ‘কারেন্সি রিজার্ভ’ থেকে অর্থ পাওয়ার নিশ্চয়তা চান। যদিও সরকার কারেন্সি রিজার্ভের অলঙ্ঘনীয়তা রক্ষার দোহাই দিয়ে কিছু প্রস্তাব এড়িয়ে যায়, তবে তারা স্বীকার করে ভারতের ক্রমবর্ধমান রফতানি ও আমদানির জন্য ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো একান্ত প্রয়োজন। এ আলোচনাগুলোয় ছিল আধুনিক ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও পরবর্তীকালে ‘রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া’ গঠনের প্রাথমিক সোপান।

​ব্যাংকের ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত বিস্তার প্রতিষ্ঠানটিকে সাধারণ মানুষের আরো কাছে নিয়ে যায়। ১৮৯৩ সালে সিরাজগঞ্জ শাখা পুনরায় চালু এবং ১৮৯৪ সালে জলপাইগুড়িতে নতুন শাখা স্থাপনের মাধ্যমে উত্তর ও পূর্ববঙ্গের কৃষি ও বাণিজ্যিক অর্থনীতির সঙ্গে ব্যাংক সরাসরি যুক্ত হয়। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল ১৯০৪ সালে কলকাতার ১৫২ নম্বর হ্যারিসন রোডে ‘বড়বাজার শাখা’ প্রতিষ্ঠা। এটি ছিল মূলত স্থানীয় ভারতীয় ব্যবসায়ীদের সুবিধার কথা ভেবে নেয়া একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ। একই সময়ে প্রধান কার্যালয়ের কার্যক্রম এতই প্রসারিত হয় যে স্ট্র্যান্ড রোড ও এসপ্ল্যানেড ইস্টের জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে ভবন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়। যদিও এ অধিগ্রহণ নিয়ে মালিক পক্ষের সঙ্গে দীর্ঘ আইনি লড়াই চলেছিল, তবু ব্যাংক তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়নি। পাশাপাশি কর্মকর্তাদের জন্য ‘হিন্দুস্তানি’ ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তটি ছিল সময়োপযোগী, যা স্থানীয় জনসাধারণের সঙ্গে ব্যাংকের সম্পর্ক আরো দৃঢ় করে।

​সামাজিক দায়বদ্ধতা ও কর্মকর্তাদের সম্মানের ক্ষেত্রেও ব্যাংকটি নজির স্থাপন করে। ১৮৯৮ সালে উপসম্পাদক মিস্টার এএম লিন্ডসেকে লন্ডনের কারেন্সি কমিটির সামনে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য মনোনীত করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে তাকে ‘সিআইই’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার বোয়ার যুদ্ধে অংশ নেয়া কর্মকর্তা মিস্টার ফ্রেজার এবং মিস্টার গ্রেভসের সাহসিকতাকে ব্যাংক যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে এবং তাদের যুদ্ধের সময়কে পেনশনের জন্য প্রকৃত চাকরিকাল হিসেবে গণ্য করার উদারতা দেখায়।

এছাড়া আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল ১৯০২ সালে কর্মকর্তাদের প্রয়াত হওয়ার পর তাদের বিধবা স্ত্রী ও অনাথ সন্তানদের জন্য ‘উইডোজ ফান্ড’ বা কল্যাণ তহবিল গঠন করা। এতে কর্মকর্তাদের বেতনের একটি অংশ এবং ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিশেষ ভর্তুকির মাধ্যমে একটি স্থায়ী সুরক্ষাবলয় তৈরি হয়।

সবশেষে ১৯০৪ সালে লন্ডনে ‘ব্যাংক অব বেঙ্গল ডিনার ক্লাব’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের মধ্যে সম্পর্ক আদান-প্রদানের নতুন মাধ্যম তৈরি হয়। এ দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য ইতিহাসই মূলত ব্যাংক অব বেঙ্গলকে আজকের আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার এক শক্তিশালী অগ্রজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

রুদ্র ইকবাল: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা